📄 দরসে নিজামীর অন্যান্য মাদ্রাসা সমূহ
ভারতবর্ষে দারুল উলূম দেওবন্দ এবং মাযাহারুল উলূম ছাড়াও এ পদ্ধতির অনুসারী বিপুল সংখ্যক দ্বীনি মাদ্রাসা রয়েছে যেখানে উক্ত মাদ্রাসাদ্বয়ের সিলেবাস (দরসে নিজামী) অনুসারে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে দারুল উলূমের শিক্ষাসংক্রান্ত সম্পর্ক রয়েছে। এসব মাদ্রাসা ধর্মের প্রসার, জ্ঞানের বিকাশ, আক্বিদার সংস্কার এবং মুসলমানদের ধর্মীয় খিদমত আঞ্জাম দেয়ার ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রেখে যাচ্ছে। এসব মাদ্রাসার মধ্যে উত্তর ভারতের মুরাদাবাদ এর শাহী মাদ্রাসা এবং দারভাঙ্গার এমদাদিয়া মাদ্রাসা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আহলে হাদীস মতাবলম্বীদেরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদ্রাসা রয়েছে। এর মধ্যে মাদ্রাসা রহমানিয়া দিল্লি, জামেয়া সালাফিয়া বেনারস, মাদ্রাসা আহমদিয়া সালাফিয়া, লাহরিসরাই (দারভাঙ্গা) বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ভারত বিভক্তির পর দিল্লির মাদ্রাসা রহমানিয়া বন্ধ হয়ে যায়। লাহারিসরাই এবং বেনারসের মাদ্রাসা স্বীয় খিদমতে রত আছে।
সরকারি, আধা সরকারি মাদ্রাসা সমূহের মধ্যে মাদ্রাসা আলিয়া রামপুরা, মাদ্রাসা আলিয়া কোলকাতা, মাদ্রাসা শামসুল হুদা পাটনা অন্যতম বৃহৎ দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপরিচিত। এককালে রামপুরা আলিয়া মাদ্রাসা এবং কোলকাতা মাদ্রাসা উঁচুমাপের শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হতো। এর সুযোগ্য, বিজ্ঞ, মেধাবী, প্রতিভাবান ছাত্র-শিক্ষকগণের সুখ্যাতি সর্বত্র সুবিদিত। শিয়া-ইসনা আশরিয়াদেরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদ্রাসা রয়েছে। শিয়ামতাবলম্বীদের অধিকাংশ শিক্ষাকেন্দ্র লক্ষ্ণৌতে অবস্থিত। এসব মাদ্রাসার মধ্যে সুলতানুল আউলিয়া মাদারিস, মাদ্রাসা নাযেমিয়া এবং মাদ্রাসাতুল ওয়ায়েজীন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ ভারতে (যেখানে জনগণের মাঝে ধর্মীয় চেতনা শিক্ষানুরাগ তুলনামূলক অধিক মাত্রায় বর্তমান) প্রচুর সংখ্যক আরবী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। হায়দ্রাবাদে মাদ্রাসা নিযামিয়া, উমনাবাদ এর জামেয়া দারুস সালাম, ভেলোরের "আল-বাকিয়াতুস সালিহাত" বিশেষভাবে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ।
এককালে মাদ্রাসা জামালিয়া এক বহুমাত্রিক ও উন্নয়নশীল ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাতির প্রথম কাতারে ছিল। দীর্ঘদিন ধরে তা বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি এটি পুনরায় চালু করার প্রয়াস পরিলক্ষিত হচ্ছে। মালাবার অঞ্চলে যা বর্তমান নতুন বৃহৎ এলাকা কেরালার অন্তর্ভূক্ত, প্রবল ধর্মানুরাগ ও আরবী ভাষার সাথে নিবিড় সম্পৃক্ততায় সমগ্র ভারতের সর্বাধিক অগ্রসর জনপদ হিসেবে পরিচিত। এই এলাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আরবী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার মধ্যে রওজাতুল উলূম, মদীনাতুল উলূম, সুল্লামুস্ সালাম সহ আরো কতিপয় মাদ্রাসা রয়েছে যা কালিকাট এবং তৎপার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থিত। এতদঞ্চলের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, স্থানীয় ভাষা মালইয়ালম ও ইংরেজীর পরই আরবীর স্থান। যেটি দ্বিতীয় অগ্রগণ্য ভাষা হিসেবে মুসলমানদের স্কুল কলেজ সমূহে পড়ানো হয়ে থাকে। কেরালা সরকারের শিক্ষামন্ত্রণালয় আরবী ভাষার জন্য স্বতন্ত্র পাঠ্যক্রম পর্যন্ত তৈরী করেছে যা চমৎকাররূপে সফল হয়েছে।
গুজরাটেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন পুরাতন মাদ্রাসা। এর মধ্যে ডাভিলের জামেয়া ইসলামিয়া এককালে সেখানকার বৃহৎ ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্ররূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল। যার সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলীর মধ্যে দারুল উলুম দেওবন্দের শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক হযরত মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী ও (রহ.) মাওলানা শাব্বির আহমদ ওসমানী (রহ.) প্রমুখের নাম প্রণিধানযোগ্য। রান্দিরের জামিয়া হোছাইনিয়া, জামিয়া আশরাফিয়া, ছাপী ও অনিন্দের কতিপয় আরবী মাদ্রাসা সমূহ এবং তারাকসীরের ফালাহ-ই-দারাইন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান। ভারতের স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে দারুল উলূম হায়দ্রাবাদ, জামিয়া সুবুল আস-সালাম হায়দ্রাবাদ, জামিয়া সুবুল আর-রাশাদ, বাংলোর এবং জামিয়া মুহাম্মদীয়া মালিগাঁও সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। অনুরূপ অন্যান্য শহরগুলোতে বড় বড় আরবী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জামিয়া পর্যায়ের বিদ্যাপীঠ অবস্থিত। বিহারে জামিয়া রহমানিয়া মুঙ্গিরা, দারবাঙ্গা মাদ্রাসা ইমদাদিয়া প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।¹
টিকাঃ
১. নানা অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ক্রমশ অব্যাহত রয়েছে। যার সঠিক পরিসংখ্যান তৈরী দুঃসাধ্য কাজ। প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান গুলোর নাম এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
📄 দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা লক্ষ্ণৌ
খ্রিষ্টান মিশনারীর সাথে ধর্ম বিষয়ক বিতর্কের বিখ্যাত বিতার্কিক তাবলীগী ও বিতর্ক বিষয়ক সাময়িকী 'তুহফায়ে মুহাম্মদীয়া' এর সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা প্রধান, অনুভূতিপ্রবণ গভীর অধ্যবসায়ী, গবেষক সুলভ প্রতিভার অধিকারী মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মদ আলী কানপূরী মুঙ্গিরী উপলব্ধি করলেন, ইউরোপীয় সভ্যতার সর্বগ্রাসী প্রভাবের মুকাবিলায় আধুনিক দায়ী এবং ইসলামের যোগ্য মুখপাত্র সৃষ্টির জন্য প্রাচীন শিক্ষাপদ্ধতি, প্রাচীন ইলমে কালাম তথা অলঙ্কার শাস্ত্র এবং পুরাতন শিক্ষাব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর ও ফলপ্রসূ নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি ব্যাপক সংস্কারকৃত শিক্ষাক্রম। যাতে অকেজো প্রাচীনপন্থী শিক্ষানীতির সংস্কার এবং ফলপ্রসূ-উপকারী নতুনত্বের সংযোজন হবে।
এটি ছিল সেসময়কালের প্রেক্ষাপট যখন ফিক্ বিষয়ক বিভিন্ন মতাদর্শ ও মাযহাব অবলম্বী মুসলমানদের যেমন- হানাফী, শাফেয়ী, আহলে হাদীস প্রভৃতির মধ্যে পারস্পরিক বিতর্ক ছিল তুঙ্গে। যার ফলশ্রুতিতে অরাজকতা, দীর্ঘ মামলা-মোকাদ্দামা এবং মুসলমানদের মনগড়া বাড়াবাড়ির ধারা অব্যাহত ছিল।
তিনি উপলব্ধি করলেন, যতদিন মুসলমানরা, ওলামা ও শিক্ষিত সমাজ শিক্ষামুখী, উদার মানসিকতা, খুটিনাটি ও বিচ্ছিন্ন বিষয়াদির ব্যাপারে উদারতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম না হবেন ততদিন এ সমস্যার সমাধান হবেনা। দু'টি লক্ষ্যকে সামনে রেখে সমকালীন ওলামায়ে কেরামের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শে প্রথমে ১৩১০ হিজরীতে 'নাদওয়াতুল উলামা' নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। অতঃপর একটি আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। অতঃপর ১৩১২ হিজরীতে শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র লক্ষ্ণৌতে সমকালীন সমমনা ওলামায়ে কেরাম ঘনিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতায় 'নাদওয়াতুল উলামা লক্ষ্ণৌ' প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতের অধিকাংশ সংস্কারমনা, আন্তরিক-দরদী, নেতৃত্বস্থানীয় ওলামা, অগ্রসর আধুনিক শিক্ষিত মহল এবং জাতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফোরামের সচেতন পৃষ্ঠপোষগণ এ আন্দোলনের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। এবং ব্যবস্থাপনা ফোরামের সদস্য হিসেবে কার্যকরি পরিষদের কর্মতৎপরতার পরিসরে কর্মী হিসেবে প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে আল্লামা শিবলী নো'মানী, মাওলানা হাবীবুর রহমান খান শিরওয়ানী, মাওলানা আবদুল হক হক্কানী, মাওলানা শাহ্ সুলাইমান ফুলওয়ারী, মুনশী আতহার আলী কারকুবী, মুনশী ইহতেশাম আলী কারকুবী, মাওলানা ইব্রাহীম আরভী, কাজী মুহাম্মদ সুলাইমান মানসূরপুরী, মাওলানা সানাউল্লাহ্ অমৃতসরী, স্যার রহীম বক্শ, মাওলানা মসীজ্জামান খান, (উস্তাদ মীর মাহবুব আল খান নেযাম দক্ষিণাত্য), মাওলানা খলিলুর রহমান সাহারানপুরী, (পুত্র মাওলানা আহমদ আলী সাহেব মুহাদ্দিস), মাওলানা হাকীম সাইয়েদ আবদুল হাই হাসানী (রহ.), নবাব সাইয়েদ আলী হাসান খান, (পুত্র নবাব সিদ্দিক হাসান খান ভূপালের রাজা) এবং মাওলানা হাকীম ডা. সৈয়দ আবদুল আলীর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।¹ "প্রত্যেক প্রাচীন শিক্ষাপদ্ধতি থেকে বিন্দুমাত্র পরিবর্তিত অবস্থান এক ধরণের বিদ'আত ও বিকৃতি।” এবং বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের লাগামহীন আধুনিক পন্থা- যারা মনে করে "প্রত্যেক নতুন বস্তু সমাদর যোগ্য ও পূরণো মানেই পরিতাজ্য" দ্বীনি মাদ্রাসা সমূহের শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যসূচী বিষয়ক এধরণের বিপরীতমুখী চিন্তাধারার মাঝামাঝিই 'দারুল উলূম নদওয়াতুল উলামা'র অবস্থান। এর প্রতিষ্ঠাতাগণ উপলব্দি করতে সক্ষম হন যে, প্রাচীন ও আধুনিকতার বাড়াবাড়িমূলক অবস্থান, ওলামায়ে কেরামের প্রবল মতানৈক্য ও বিভক্তি, একদেশদর্শিতা ও ফিক্হী মতবিরোধের তীব্রতা ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংস ও পতনকেই তরান্বিত করবে। নতুন ও পুরনোর সমন্বয় এবং ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যপন্থার মূলনীতির উপর নাদওয়াতুল উলামা লক্ষ্ণৌ-এর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। এর দায়িত্বশীলবৃন্দের চিন্তাধারা ছিল দ্বীন একটি শ্বাশত ও চিরন্তন বস্তু যাতে পরিবর্তন- পরিবর্ধনের কোন অবকাশ নেই কিন্তু জ্ঞান ও শিক্ষা বরাবরই পরিবর্তনশীল। যাতে সময়ের চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিবর্ধন একটি স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা। 'নাদওয়াতুল উলামা লক্ষ্ণৌ'-এর প্রকৃত লক্ষ্য আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতভূক্ত বিভিন্ন মতাবলম্বী গোষ্ঠীর মাঝে (যারা আকীদা ও ইসলামের মৌলিক বিষয়াদিতে একই বিশ্বাসের অনুসারী) ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা। সূচনালগ্ন থেকেই 'নাদওয়াতুল উলামা' ইসলামী শিক্ষা ও পাঠ্যক্রমকে পরিবর্তনশীল এবং প্রয়োজন অনুপাতে পরিমার্জন, সংস্কারের উপযোগী মনে করে। দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামা একটি চিরন্তন সংবিধান ও জীবন পথের শ্বাশত গাইডবুক হিসেবে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়ে থাকে এবং ক্রমান্বয়ে ও দীর্ঘমেয়াদী পাঠ্যসূচীতে তা অন্তর্ভূক্ত করেছে। আরবী ভাষা ও সাহিত্যকেও একটি জীবন্ত ও গতিশীল ভাষা হিসেবে গুরুত্ববহ বিবেচনায় মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। কারণ আরবী ভাষাই কুরআন-হাদীস বুঝার চাবিকাঠি ও তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের রহস্য উন্মোচন সহায়িকা। নদওয়াতুল উলামা কখনো আরবী ভাষাকে মৃত ভাষা (যে ভাষায় কথা বলার ও লেখার লোক পৃথিবীতে দূর্লভ) হিসেবে ভাবেনি অথচ ভারতবর্ষ আরবীর সাথে ঠিক এমন আচরণই করে যাচ্ছিল। যেসব প্রাচীন বিষয়াদির উপকারিতা কালের প্রবাহে হ্রাস পেয়েছে নাদওয়া সে সব বিষয় পাঠ্যসূচী থেকে বাদ দিয়েছে অথবা তার পরিমাণ অনেক কমিয়ে দিয়েছে তার স্থলে এমনসব আধুনিক বিষয় সংযোজন করেছে যা বর্তমান যুগে মুসলিম উম্মাহর বৈশ্বিক পরিসরে খিদমত আঞ্জাম দিতে সক্ষম এমন আলিমদের জন্য অতীব জরুরী।
সূচনালগ্ন থেকেই দারুল উলূম একটি ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করে আসছে, আধুনিক পৃথিবীর সামনে বিশ্বজনীন জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে প্রভাববিস্তারশীল পন্থায় ও নতুন ধাঁচে উপস্থাপন করতে সক্ষম একটি দাওয়াতী কাফেলা সৃষ্টি করা হবে। আলহামদুলিল্লাহ্! নদওয়া তার লক্ষের পথে সন্তোষজনক সাফল্য অর্জন করেছে এবং খুব স্বল্প সময়ে এমন সব ইসলামী পন্ডিত- ওলামা তৈরী হয়েছে যারা আধুনিক ইসলামী দুনিয়ার জন্য অনুসরণ যোগ্য। এসব সুযোগ্য ব্যক্তিবর্গ ইসলামী সাহিত্য, অলঙ্করণ শাস্ত্র, ইতিহাস, সীরাতে নববী (স.) প্রভৃতি বিষয়ে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ সৃষ্টি করে পৃথিবীকে চমৎকৃত করেছেন।
দারুল উলূম থেকে সৃষ্ট এসব ভূবনখ্যাত প্রতিভার মধ্যে মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী (রহ.) ও মাওলানা আবদুল বা'রী নদভীর (রহ.) নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। প্রথমোক্ত ব্যক্তি আল্লামা শিবলী নো'মানী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইসলামী শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান 'দারুল মুসান্নিফীন' আজমগড়ের প্রধান পরিচালক ছিলেন। তাঁর তত্ত্বাবধানেই দারুল উলূম নদওয়ার সুযোগ্য সন্তানরা ইসলামী সাহিত্য, ইতিহাস এবং ইসলামী গবেষণামূলক বিভিন্ন রচনাকর্ম এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকাশনার জন্য পেশ করেছেন। অতঃপর তিনি ভূপাল সরকার ও পাকিস্তানে গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গবেষণা বিষয়ক খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। দ্বিতীয়োক্ত আধুনিক দর্শন শাস্ত্রের উঁচু মাপের শিক্ষক, পন্ডিত ও হায়দ্রাবাদ উসমানিয়া ইউনিভার্সিটির বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। তিনি অত্যন্ত মূল্যবান, তথ্যবহুল ও গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে। উল্লিখিত ব্যক্তিদ্বয় ছাড়াও 'নদওয়াতুল উলামা' লক্ষ্ণৌ থেকে পর্যাপ্ত সংখ্যক লেখক, গবেষক, শিক্ষা ও সামাজিক পরিমন্ডলে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তিবর্গ সৃষ্টি হয়েছেন।
টিকাঃ
১. সর্বশেষ উল্লিখিত ৫জন যথাক্রমে নদওয়াতুল উলামার পরিচালক ছিলেন, ডা. সাইয়েদ আবদুল আলীর আমলে নদওয়াতুল উলামা সার্বিকভাবে ব্যাপক উন্নতি লাভ করে। (মৃত্যুঃ ৭ মে ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দ)
📄 পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাব্যবস্থায় নদওয়াতুল উলামার চিন্তাধারা ও বৈপ্লবিক কার্যক্রম
নাদওয়াতুল উলামার সবচেয়ে বড় অবদান হলো পাঠক্রমের সেই নতুন রূপরেখা যা এখানে প্রণীত হবার পর বহু সংখ্যক মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ তা সাদরে গ্রহণ করেছে। অতঃপর সেটা অথবা তার আদলে নতুন সিলেবাস প্রবর্তন ও প্রণয়ন করেছে। এই সিলেবাস সাম্প্রতিক কালের বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসাগুলোতে প্রচলিত সিলেবাসগুলোর সর্বজন গ্রাহ্য মূলনীতিকে গ্রহণ করেই বিন্যাস করা হয়েছে, শিক্ষার দ্বিমূখী ধারাকে এক ধারায কেন্দ্রীভূত করার প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে এবং সমকালীন জীবন সমস্যার সমাধানে যুগোপযোগী ও প্রয়োজনীয় সংযোজন করা হয়েছে। সিলেবাসকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক এ ধারাবাহিক ক্রমানুাসারে বিন্যস্ত করা হয়েছে। এবং এতে ধর্মীয় বিষয়াদি স্বীয় কলেবরে অক্ষুন্ন রেখে আনুষঙ্গিক বিষয়াদিকে প্রয়োজনীয় সংযোজন বিয়োজন করে পাঠ্যক্রমকে পূর্ণাঙ্গ এবং চাহিদা পূরণের উপযোগী করে সাজানো হয়েছে।
এর ফলশ্রুতিতে নদওয়াতুল উলামা থেকে এমন বেশ কিছু সংখ্যক প্রতিভাধর যোগ্য ব্যক্তি সৃষ্টি হয়েছেন যারা কেবল উর্দু ভাষাতেই নয় আরবী ভাষায়ও স্বীয় অনন্য যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। আরবী ভাষায় তাঁদের রচনাকর্ম ও সৃজনশীল অবদানকে শিক্ষিত ও বিদগ্ধ মহল সপ্রশংস স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাঁরা গবেষণা ও সাহিত্য বিষয়ক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক একাডেমী প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং নাদওয়াতুল উলামার চিন্তা-চেতনার আলোকে পরিচালিত ডজন খানেক মাদ্রাসা দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশের বাইরে মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে নেপালের দারুল উলূম নুরুল ইসলাম জিলপাপুর, বাংলাদেশে দারুল মাআরিফ আল-ইসলামিয়া, মালয়েশিয়ায় দারুতি তারবিয়্যা আল ইসলামিয়া সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। দেশের অভ্যন্তরে দারুল উলূমের মডেলে 'দারুল উলূম তাজুল মাসাজিদ' ভূপাল, 'কাশেফুল উলুম' আওরঙ্গাবাদ, 'জামিয়া ইসলামিয়া' বাটকল, 'ফালাহুল মুসলিমীন' রায়বেরেলী সর্বশ্রেষ্ঠ মাদ্রাসা তথা ইসলামী বিদ্যাপীঠ হিসেবে সুপরিচিত।
📄 মাদ্রাসাতুল ইসলাহ সরাইমীর
১৯০৯ ইংরেজী সালে দারুল উলূমের পদ্ধতি অনুসরণে আজমগড় জিলার সরাইমীর অঞ্চলে মাওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহী (রহ.) মাদ্রাসাতুল ইসলাহ এর ভিত্তি স্থাপন করেছেন। এ মাদ্রাসায় কুরআনের তাফসীর ও চর্চাকে অত্যধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। মাওলানা হামীদুদ্দীন (রহ.) স্বীয় তাফসীরে যে পদ্ধতির ভিত্ রচনা করেছেন, মাদ্রাসার শিক্ষকমন্ডলী ও ছাত্ররা ঠিক এ পদ্ধতি অনুসরণ করেই অধ্যয়ন করে থাকেন। অনাড়ম্বর বসবাস ও শিক্ষার অনুকুল পরিবেশের বিবেচনায় এটি শ্রেষ্ঠ মাদ্রাসা।