📄 দারুল উলুম দেওবন্দ
১৮৫৭ সালের আযাদী আন্দোলন ও জিহাদের (যার নেতৃত্ব দিয়ে দিয়েছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ) বিপর্যয়ের পর বিশেষতঃ মুসলমানদের মাঝে হীনমন্যতা, পরাজয়ের গ্লানী ও হতাশার এক ব্যাপক মহামারী পরিলক্ষিত হয়। ইংরেজ সরকারের (যারা ধর্মীয়ভাবে খ্রিস্টান ছিল) সফলতার প্রেক্ষিতে খ্রিষ্টান মিশনারী এবং ধর্মযাজকদের সাহস অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। এবং তাঁরা পরিস্কার ভাষায় এই দম্ভোক্তি করতে শুরু করে যে, এই ভারতবর্ষ ঈসা মসীহ (আ.) এর উপহার ও তাঁর প্রদত্ত আমানত এবং এদেশে খ্রিস্টধর্ম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে তাঁরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। অপরদিকে মুসলমানদের মাঝে পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা, জীবন দর্শন ও সংস্কৃতির প্রভাবে ধর্মীয় ও চারিত্রিক বিশৃংখলা দেখা দেয়।
স্বীয় ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতার বিস্তৃতি ঘটতে থাকে এবং সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, আগামী প্রজন্ম নিশ্চিতভাবে স্বীয় ধর্ম বিশ্বাস, সভ্যতা, সংস্কৃতি তাহযীব-তামাদ্দুন এবং শরীয়ত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
এহেন পরিস্থিতিতে ভারতবর্ষের ওলামায়ে কেরাম ধর্মীয় ও শিক্ষাগত সম্পদের সুরক্ষা এবং মুসলমানদের ধর্মীয় বন্ধন হিফাযত এবং চেতনাবোধের সংরক্ষণকল্পে এমন ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন আবশ্যক মনে করলেন যা রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর ধর্মীয় ও চারিত্রিক পতনকে রুখতে সক্ষম হবে এবং এসব শিক্ষাঙ্গন থেকে এমন সব সুদক্ষ ইসলামী পন্ডিত সৃষ্টি হবেন যাঁরা ইসলামী শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ে গভীর ব্যুৎপত্তির অধিকারী হবেন। যাঁদের মধ্যে একই সাথে দাওয়াতী হৃদয়, সৈনিকসুলভ খিদমত এবং ইসলামী জ্ঞানের বিকাশ ও মানসিকতা বিদ্যমান থাকবে পূর্ণমাত্রায়। যাঁরা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই এদেশে মুসলমানদের ধর্মীয় খিদমত, পথনির্দেশনা, জ্ঞানের প্রসার ও সংরক্ষণের গুরুদায়িত্ব আঞ্জাম দিতে সক্ষম হবেন। এ ধারাবাহিকতায় দারুল উলূম দেওবন্দ সর্বপ্রথম এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। প্রাথমিক অবস্থায় দারুল উলূম দেওবন্দ ছোটখাট মাদ্রাসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়, যার কোন গুরুত্ব ছিলনা কিন্তু মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষক-কর্মচারীদের নিষ্ঠা, আত্মত্যাগ ও আন্তরিকতার ফলে দ্রুত উন্নতির পথে ধাবিত হয়। বর্তমানে দারুল উলূম দেওবন্দ বড় মাপের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় তথা পুরো এশিয়ার সবচে বড় দ্বীনি দরসগাহে পরিণত হয়েছে। ১২৮৩ হিজরীতে সাহারানপুরের এক পল্লী দেওবন্দ নামক এলাকার এক ছোট মসজিদের চত্বরে এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপিত হয়। শুরুতে এটি একটি ইবতেদায়ী মাদ্রাসা ছিল যা দেওবন্দের এক বুযুর্গ হাজী মুহাম্মদ আবেদ সাহেব (রহ.) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কিন্তু যাবতীয় উন্নয়ন, খ্যাতি, সর্বজনগ্রহণযোগ্যতা হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুভী (রহ.) এর অনুপম নিষ্ঠা, উঁচু মাপের লিল্লাহিয়্যাত, সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাস, দূরদৃষ্টি, এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তা-চেতনার পবিত্র ফসল। প্রারম্ভকাল থেকেই তিনি এর সকল ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কর্মকান্ডে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি তাঁর সমুদয় মেধা, প্রতিভা, জ্ঞান ও চিন্তাশক্তিকে এতে কেন্দ্রীভূত করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দারুল উলূম দেওবন্দ উঁচুমাপের নিষ্ঠাবান ব্যবস্থাপক ব্যক্তিবর্গ ও বুযর্গ আসাতিজা-শিক্ষকমন্ডলীর সহযোগিতায় ধন্য হয়েছে।
যার ফলশ্রুতিতে তাকওয়া, পবিত্রতা, নিষ্ঠা, বিনয়-বিনম্রতার প্রাণ পুরো পরিবেশকে জীবন্ত করে রাখে। এসব মহৎগুণাবলীতে সমৃদ্ধ মহান শিক্ষকমন্ডলীর মধ্যে মাওলানা ইয়াকুব নানুতুভী, শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসান দেওবন্দী, মুফতী আযীযুর রহমান দেওবন্দী, মাওলানা গোলাম রাসূল বেলায়তী, মাওলানা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী, মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী, মাওলানা আসগর হোসাইন দেওবন্দী এবং মাওলানা এজায আলী সাহেব প্রমুখের নাম অবিস্মরণীয়। দারুল উলূম দেওবন্দের কর্মপরিধি দিন দিন বিস্তৃত হতে চলেছে। তার খ্যাতি এর শিক্ষক মন্ডলীর জ্ঞান গভীরতা, যোগ্যতা, তাকওয়া, হাদীস ও ফিক্ শাস্ত্রে তাদের বুৎপত্তির আলোচনা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমশঃ যুগ-যুগান্তরে। যার ফলে ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের প্রচুর সংখ্যক জ্ঞান পিপাসু ছাত্র জ্ঞানার্জনের মহান লক্ষ্য নিয়ে দারুল উলূমে ভর্তি হয়। ১৩৮০ হিজরী সালের পরিসংখ্যান মতে ছাত্রসংখ্যা ছিল দেড়হাজার বর্তমানে এ সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এক'শ বছরের ইতিহাসে দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে শিক্ষা সমাপনকারী ছাত্রদের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে ৫হাজার নিয়ম মাফিক সনদ অর্জনকারী ছাত্র রয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র সমূহ থেকে আগত ছাত্রদের সংখ্যা ৫ শতাধিক। যার মধ্যে দাগিস্তান, আফগানিস্তান, কীব, বুখারা, কাজান, রাশিয়া, আজারবাইজান, মধ্য এশিয়া, এশিয়া মাইনর, তিব্বত, চীন, ভারত সাগর উপকূলীয় রাষ্ট্র সমূহ সহ অন্যান্য দেশের ছাত্র রয়েছে।
ভারতীয় মুসলমানদের জীবনধারায় দারুল উলূম দেওবন্দের সন্তানদের সংস্কারধর্মী কর্মকান্ডের সুদূর প্রসারী প্রভাব সুস্পষ্ট। বিদআত- কুসংস্কারের মূলোৎপাটন, আক্বিদা বিশ্বাসের সংস্কার, তাবলীগে দ্বীন ও ভ্রান্ত সম্প্রদায় সমূহের সাথে জ্ঞানগর্ভ বিতর্ক ইত্যাদি তাঁদের ঐতিহাসিক অবদানের স্বর্ণালী অধ্যায়। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তিত্ব রাজনীতির ময়দানে এবং প্রিয় স্বদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁরা সত্যোচ্চারণ ও নির্ভিক ভূমিকা পালনে ও পূর্বসূরী ওলামায়ে কেরামের দৃষ্টান্তকে নবরূপে জাতির সামনে উপস্থাপনে সচেষ্ট হয়েছেন।
ইসলামের উপর অবিচল-দৃঢ়পদ, হানাফী মাযহাবের উপর বলিষ্ঠ ও অনঢ় অবস্থান পূর্বসূরীদের বর্ণনার সযত্ন সংরক্ষণ এবং সুন্নাত বিরোধী ক্রিয়াকলাপের প্রতিরোধ দারুল উলূম দেওবন্দের উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য হয়ে আছে।
📄 মাদ্রাসা মাযাহারুল উলুম
অপর বৃহৎ ইসলামী শিক্ষা নিকেতন মাদ্রাসা মাযাহারুল উলূম সাহারানপুরে অবস্থিত। ছাত্রসংখ্যা এবং ইসলামী শিক্ষার নিবিড় পরিবেশ বিচারে দারুল উলূম দেওবন্দের পরই এর অবস্থান। ১২৮৩ হিজরী সালে মাওলানা সা'আদত আলী সাহেব সাহারানপুরীর পবিত্র হস্ত মুবারকে এর ভিত্তি স্থাপিত। মাওলানা মুযহির নানুতুভীর নামে (সামান্য পরিবর্তন সহ) এর নামকরণ করা হয় মাযাহারুল উলূম। মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী, মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরী এবং মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর পবিত্র পৃষ্ঠপোষকতায় ধারাবাহিকভাবে ধন্য এ প্রতিষ্ঠান। এর সুযোগ্য নিষ্ঠাবান শিক্ষকমন্ডলীর মধ্যে মাওলানা সাবিত আলী, মাওলানা ইনায়েত আলী, মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরী, মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া কান্দলভী, মাওলানা আবদুল লতীফ সাহারানপুরী, মাওলানা ইলিয়াস দেহলভী, মাওলানা আবদুর রহমান কামিলপুরী, শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া এবং মাওলানা আসাদুল্লাহ সাহেবের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
মাদ্রাসা মাযাহারুল উলূম স্বীয় বৈশিষ্ট্য, ঐতিহ্য, মূলনীতি, আক্বিদা-বিশ্বাসের বিবেচনায় দারুল উলূম দেওবন্দের অভিন্ন মতাদর্শের অনুসারী। এখান থেকেও বিপুল সংখ্যক নিষ্ঠাবান জ্ঞান সেবক সৃষ্টি হয়েছেন, যারা হাদীস শাস্ত্রের খিদমতে গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য অবদান রেখেছেন এবং একাধিক হাদীস বিষয়ক ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনার মহান কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। এখানকার বিপুল সংখ্যক ছাত্র-শিক্ষক স্বীয় জীবনধারা, অল্পেতুষ্টি এবং ধর্মের উপর অবিচলতায় বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
📄 দরসে নিজামীর অন্যান্য মাদ্রাসা সমূহ
ভারতবর্ষে দারুল উলূম দেওবন্দ এবং মাযাহারুল উলূম ছাড়াও এ পদ্ধতির অনুসারী বিপুল সংখ্যক দ্বীনি মাদ্রাসা রয়েছে যেখানে উক্ত মাদ্রাসাদ্বয়ের সিলেবাস (দরসে নিজামী) অনুসারে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে দারুল উলূমের শিক্ষাসংক্রান্ত সম্পর্ক রয়েছে। এসব মাদ্রাসা ধর্মের প্রসার, জ্ঞানের বিকাশ, আক্বিদার সংস্কার এবং মুসলমানদের ধর্মীয় খিদমত আঞ্জাম দেয়ার ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রেখে যাচ্ছে। এসব মাদ্রাসার মধ্যে উত্তর ভারতের মুরাদাবাদ এর শাহী মাদ্রাসা এবং দারভাঙ্গার এমদাদিয়া মাদ্রাসা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আহলে হাদীস মতাবলম্বীদেরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদ্রাসা রয়েছে। এর মধ্যে মাদ্রাসা রহমানিয়া দিল্লি, জামেয়া সালাফিয়া বেনারস, মাদ্রাসা আহমদিয়া সালাফিয়া, লাহরিসরাই (দারভাঙ্গা) বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ভারত বিভক্তির পর দিল্লির মাদ্রাসা রহমানিয়া বন্ধ হয়ে যায়। লাহারিসরাই এবং বেনারসের মাদ্রাসা স্বীয় খিদমতে রত আছে।
সরকারি, আধা সরকারি মাদ্রাসা সমূহের মধ্যে মাদ্রাসা আলিয়া রামপুরা, মাদ্রাসা আলিয়া কোলকাতা, মাদ্রাসা শামসুল হুদা পাটনা অন্যতম বৃহৎ দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপরিচিত। এককালে রামপুরা আলিয়া মাদ্রাসা এবং কোলকাতা মাদ্রাসা উঁচুমাপের শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হতো। এর সুযোগ্য, বিজ্ঞ, মেধাবী, প্রতিভাবান ছাত্র-শিক্ষকগণের সুখ্যাতি সর্বত্র সুবিদিত। শিয়া-ইসনা আশরিয়াদেরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদ্রাসা রয়েছে। শিয়ামতাবলম্বীদের অধিকাংশ শিক্ষাকেন্দ্র লক্ষ্ণৌতে অবস্থিত। এসব মাদ্রাসার মধ্যে সুলতানুল আউলিয়া মাদারিস, মাদ্রাসা নাযেমিয়া এবং মাদ্রাসাতুল ওয়ায়েজীন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ ভারতে (যেখানে জনগণের মাঝে ধর্মীয় চেতনা শিক্ষানুরাগ তুলনামূলক অধিক মাত্রায় বর্তমান) প্রচুর সংখ্যক আরবী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। হায়দ্রাবাদে মাদ্রাসা নিযামিয়া, উমনাবাদ এর জামেয়া দারুস সালাম, ভেলোরের "আল-বাকিয়াতুস সালিহাত" বিশেষভাবে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ।
এককালে মাদ্রাসা জামালিয়া এক বহুমাত্রিক ও উন্নয়নশীল ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাতির প্রথম কাতারে ছিল। দীর্ঘদিন ধরে তা বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি এটি পুনরায় চালু করার প্রয়াস পরিলক্ষিত হচ্ছে। মালাবার অঞ্চলে যা বর্তমান নতুন বৃহৎ এলাকা কেরালার অন্তর্ভূক্ত, প্রবল ধর্মানুরাগ ও আরবী ভাষার সাথে নিবিড় সম্পৃক্ততায় সমগ্র ভারতের সর্বাধিক অগ্রসর জনপদ হিসেবে পরিচিত। এই এলাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আরবী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার মধ্যে রওজাতুল উলূম, মদীনাতুল উলূম, সুল্লামুস্ সালাম সহ আরো কতিপয় মাদ্রাসা রয়েছে যা কালিকাট এবং তৎপার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থিত। এতদঞ্চলের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, স্থানীয় ভাষা মালইয়ালম ও ইংরেজীর পরই আরবীর স্থান। যেটি দ্বিতীয় অগ্রগণ্য ভাষা হিসেবে মুসলমানদের স্কুল কলেজ সমূহে পড়ানো হয়ে থাকে। কেরালা সরকারের শিক্ষামন্ত্রণালয় আরবী ভাষার জন্য স্বতন্ত্র পাঠ্যক্রম পর্যন্ত তৈরী করেছে যা চমৎকাররূপে সফল হয়েছে।
গুজরাটেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন পুরাতন মাদ্রাসা। এর মধ্যে ডাভিলের জামেয়া ইসলামিয়া এককালে সেখানকার বৃহৎ ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্ররূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল। যার সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলীর মধ্যে দারুল উলুম দেওবন্দের শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক হযরত মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী ও (রহ.) মাওলানা শাব্বির আহমদ ওসমানী (রহ.) প্রমুখের নাম প্রণিধানযোগ্য। রান্দিরের জামিয়া হোছাইনিয়া, জামিয়া আশরাফিয়া, ছাপী ও অনিন্দের কতিপয় আরবী মাদ্রাসা সমূহ এবং তারাকসীরের ফালাহ-ই-দারাইন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান। ভারতের স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে দারুল উলূম হায়দ্রাবাদ, জামিয়া সুবুল আস-সালাম হায়দ্রাবাদ, জামিয়া সুবুল আর-রাশাদ, বাংলোর এবং জামিয়া মুহাম্মদীয়া মালিগাঁও সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। অনুরূপ অন্যান্য শহরগুলোতে বড় বড় আরবী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জামিয়া পর্যায়ের বিদ্যাপীঠ অবস্থিত। বিহারে জামিয়া রহমানিয়া মুঙ্গিরা, দারবাঙ্গা মাদ্রাসা ইমদাদিয়া প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।¹
টিকাঃ
১. নানা অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ক্রমশ অব্যাহত রয়েছে। যার সঠিক পরিসংখ্যান তৈরী দুঃসাধ্য কাজ। প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান গুলোর নাম এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
📄 দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা লক্ষ্ণৌ
খ্রিষ্টান মিশনারীর সাথে ধর্ম বিষয়ক বিতর্কের বিখ্যাত বিতার্কিক তাবলীগী ও বিতর্ক বিষয়ক সাময়িকী 'তুহফায়ে মুহাম্মদীয়া' এর সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা প্রধান, অনুভূতিপ্রবণ গভীর অধ্যবসায়ী, গবেষক সুলভ প্রতিভার অধিকারী মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মদ আলী কানপূরী মুঙ্গিরী উপলব্ধি করলেন, ইউরোপীয় সভ্যতার সর্বগ্রাসী প্রভাবের মুকাবিলায় আধুনিক দায়ী এবং ইসলামের যোগ্য মুখপাত্র সৃষ্টির জন্য প্রাচীন শিক্ষাপদ্ধতি, প্রাচীন ইলমে কালাম তথা অলঙ্কার শাস্ত্র এবং পুরাতন শিক্ষাব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর ও ফলপ্রসূ নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি ব্যাপক সংস্কারকৃত শিক্ষাক্রম। যাতে অকেজো প্রাচীনপন্থী শিক্ষানীতির সংস্কার এবং ফলপ্রসূ-উপকারী নতুনত্বের সংযোজন হবে।
এটি ছিল সেসময়কালের প্রেক্ষাপট যখন ফিক্ বিষয়ক বিভিন্ন মতাদর্শ ও মাযহাব অবলম্বী মুসলমানদের যেমন- হানাফী, শাফেয়ী, আহলে হাদীস প্রভৃতির মধ্যে পারস্পরিক বিতর্ক ছিল তুঙ্গে। যার ফলশ্রুতিতে অরাজকতা, দীর্ঘ মামলা-মোকাদ্দামা এবং মুসলমানদের মনগড়া বাড়াবাড়ির ধারা অব্যাহত ছিল।
তিনি উপলব্ধি করলেন, যতদিন মুসলমানরা, ওলামা ও শিক্ষিত সমাজ শিক্ষামুখী, উদার মানসিকতা, খুটিনাটি ও বিচ্ছিন্ন বিষয়াদির ব্যাপারে উদারতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম না হবেন ততদিন এ সমস্যার সমাধান হবেনা। দু'টি লক্ষ্যকে সামনে রেখে সমকালীন ওলামায়ে কেরামের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শে প্রথমে ১৩১০ হিজরীতে 'নাদওয়াতুল উলামা' নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। অতঃপর একটি আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। অতঃপর ১৩১২ হিজরীতে শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র লক্ষ্ণৌতে সমকালীন সমমনা ওলামায়ে কেরাম ঘনিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতায় 'নাদওয়াতুল উলামা লক্ষ্ণৌ' প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতের অধিকাংশ সংস্কারমনা, আন্তরিক-দরদী, নেতৃত্বস্থানীয় ওলামা, অগ্রসর আধুনিক শিক্ষিত মহল এবং জাতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফোরামের সচেতন পৃষ্ঠপোষগণ এ আন্দোলনের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। এবং ব্যবস্থাপনা ফোরামের সদস্য হিসেবে কার্যকরি পরিষদের কর্মতৎপরতার পরিসরে কর্মী হিসেবে প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে আল্লামা শিবলী নো'মানী, মাওলানা হাবীবুর রহমান খান শিরওয়ানী, মাওলানা আবদুল হক হক্কানী, মাওলানা শাহ্ সুলাইমান ফুলওয়ারী, মুনশী আতহার আলী কারকুবী, মুনশী ইহতেশাম আলী কারকুবী, মাওলানা ইব্রাহীম আরভী, কাজী মুহাম্মদ সুলাইমান মানসূরপুরী, মাওলানা সানাউল্লাহ্ অমৃতসরী, স্যার রহীম বক্শ, মাওলানা মসীজ্জামান খান, (উস্তাদ মীর মাহবুব আল খান নেযাম দক্ষিণাত্য), মাওলানা খলিলুর রহমান সাহারানপুরী, (পুত্র মাওলানা আহমদ আলী সাহেব মুহাদ্দিস), মাওলানা হাকীম সাইয়েদ আবদুল হাই হাসানী (রহ.), নবাব সাইয়েদ আলী হাসান খান, (পুত্র নবাব সিদ্দিক হাসান খান ভূপালের রাজা) এবং মাওলানা হাকীম ডা. সৈয়দ আবদুল আলীর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।¹ "প্রত্যেক প্রাচীন শিক্ষাপদ্ধতি থেকে বিন্দুমাত্র পরিবর্তিত অবস্থান এক ধরণের বিদ'আত ও বিকৃতি।” এবং বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের লাগামহীন আধুনিক পন্থা- যারা মনে করে "প্রত্যেক নতুন বস্তু সমাদর যোগ্য ও পূরণো মানেই পরিতাজ্য" দ্বীনি মাদ্রাসা সমূহের শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যসূচী বিষয়ক এধরণের বিপরীতমুখী চিন্তাধারার মাঝামাঝিই 'দারুল উলূম নদওয়াতুল উলামা'র অবস্থান। এর প্রতিষ্ঠাতাগণ উপলব্দি করতে সক্ষম হন যে, প্রাচীন ও আধুনিকতার বাড়াবাড়িমূলক অবস্থান, ওলামায়ে কেরামের প্রবল মতানৈক্য ও বিভক্তি, একদেশদর্শিতা ও ফিক্হী মতবিরোধের তীব্রতা ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংস ও পতনকেই তরান্বিত করবে। নতুন ও পুরনোর সমন্বয় এবং ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যপন্থার মূলনীতির উপর নাদওয়াতুল উলামা লক্ষ্ণৌ-এর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। এর দায়িত্বশীলবৃন্দের চিন্তাধারা ছিল দ্বীন একটি শ্বাশত ও চিরন্তন বস্তু যাতে পরিবর্তন- পরিবর্ধনের কোন অবকাশ নেই কিন্তু জ্ঞান ও শিক্ষা বরাবরই পরিবর্তনশীল। যাতে সময়ের চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিবর্ধন একটি স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা। 'নাদওয়াতুল উলামা লক্ষ্ণৌ'-এর প্রকৃত লক্ষ্য আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতভূক্ত বিভিন্ন মতাবলম্বী গোষ্ঠীর মাঝে (যারা আকীদা ও ইসলামের মৌলিক বিষয়াদিতে একই বিশ্বাসের অনুসারী) ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা। সূচনালগ্ন থেকেই 'নাদওয়াতুল উলামা' ইসলামী শিক্ষা ও পাঠ্যক্রমকে পরিবর্তনশীল এবং প্রয়োজন অনুপাতে পরিমার্জন, সংস্কারের উপযোগী মনে করে। দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামা একটি চিরন্তন সংবিধান ও জীবন পথের শ্বাশত গাইডবুক হিসেবে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়ে থাকে এবং ক্রমান্বয়ে ও দীর্ঘমেয়াদী পাঠ্যসূচীতে তা অন্তর্ভূক্ত করেছে। আরবী ভাষা ও সাহিত্যকেও একটি জীবন্ত ও গতিশীল ভাষা হিসেবে গুরুত্ববহ বিবেচনায় মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। কারণ আরবী ভাষাই কুরআন-হাদীস বুঝার চাবিকাঠি ও তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের রহস্য উন্মোচন সহায়িকা। নদওয়াতুল উলামা কখনো আরবী ভাষাকে মৃত ভাষা (যে ভাষায় কথা বলার ও লেখার লোক পৃথিবীতে দূর্লভ) হিসেবে ভাবেনি অথচ ভারতবর্ষ আরবীর সাথে ঠিক এমন আচরণই করে যাচ্ছিল। যেসব প্রাচীন বিষয়াদির উপকারিতা কালের প্রবাহে হ্রাস পেয়েছে নাদওয়া সে সব বিষয় পাঠ্যসূচী থেকে বাদ দিয়েছে অথবা তার পরিমাণ অনেক কমিয়ে দিয়েছে তার স্থলে এমনসব আধুনিক বিষয় সংযোজন করেছে যা বর্তমান যুগে মুসলিম উম্মাহর বৈশ্বিক পরিসরে খিদমত আঞ্জাম দিতে সক্ষম এমন আলিমদের জন্য অতীব জরুরী।
সূচনালগ্ন থেকেই দারুল উলূম একটি ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করে আসছে, আধুনিক পৃথিবীর সামনে বিশ্বজনীন জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে প্রভাববিস্তারশীল পন্থায় ও নতুন ধাঁচে উপস্থাপন করতে সক্ষম একটি দাওয়াতী কাফেলা সৃষ্টি করা হবে। আলহামদুলিল্লাহ্! নদওয়া তার লক্ষের পথে সন্তোষজনক সাফল্য অর্জন করেছে এবং খুব স্বল্প সময়ে এমন সব ইসলামী পন্ডিত- ওলামা তৈরী হয়েছে যারা আধুনিক ইসলামী দুনিয়ার জন্য অনুসরণ যোগ্য। এসব সুযোগ্য ব্যক্তিবর্গ ইসলামী সাহিত্য, অলঙ্করণ শাস্ত্র, ইতিহাস, সীরাতে নববী (স.) প্রভৃতি বিষয়ে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ সৃষ্টি করে পৃথিবীকে চমৎকৃত করেছেন।
দারুল উলূম থেকে সৃষ্ট এসব ভূবনখ্যাত প্রতিভার মধ্যে মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী (রহ.) ও মাওলানা আবদুল বা'রী নদভীর (রহ.) নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। প্রথমোক্ত ব্যক্তি আল্লামা শিবলী নো'মানী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইসলামী শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান 'দারুল মুসান্নিফীন' আজমগড়ের প্রধান পরিচালক ছিলেন। তাঁর তত্ত্বাবধানেই দারুল উলূম নদওয়ার সুযোগ্য সন্তানরা ইসলামী সাহিত্য, ইতিহাস এবং ইসলামী গবেষণামূলক বিভিন্ন রচনাকর্ম এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকাশনার জন্য পেশ করেছেন। অতঃপর তিনি ভূপাল সরকার ও পাকিস্তানে গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গবেষণা বিষয়ক খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। দ্বিতীয়োক্ত আধুনিক দর্শন শাস্ত্রের উঁচু মাপের শিক্ষক, পন্ডিত ও হায়দ্রাবাদ উসমানিয়া ইউনিভার্সিটির বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। তিনি অত্যন্ত মূল্যবান, তথ্যবহুল ও গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে। উল্লিখিত ব্যক্তিদ্বয় ছাড়াও 'নদওয়াতুল উলামা' লক্ষ্ণৌ থেকে পর্যাপ্ত সংখ্যক লেখক, গবেষক, শিক্ষা ও সামাজিক পরিমন্ডলে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তিবর্গ সৃষ্টি হয়েছেন।
টিকাঃ
১. সর্বশেষ উল্লিখিত ৫জন যথাক্রমে নদওয়াতুল উলামার পরিচালক ছিলেন, ডা. সাইয়েদ আবদুল আলীর আমলে নদওয়াতুল উলামা সার্বিকভাবে ব্যাপক উন্নতি লাভ করে। (মৃত্যুঃ ৭ মে ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দ)