📄 আত্মশুদ্ধি ও আহলে দীলের সাথে সম্পর্ক
প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থার যারা কর্ণধার তাঁদের উল্লেখযোগ্য একটি বৈশিষ্ট্য হলো- ইলমী যোগ্যতা, পান্ডিত্য জগতজুড়া সুনাম-সুখ্যাতির পাশাপাশি তাঁরা আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের প্রতিও মনোনিবেশ করতেন। তাঁরা ইল্মে যাহির অর্জনের জন্য যোগ্য শিক্ষক ও দক্ষ আলেমের সাহচর্য যেমন অপরিহার্য জ্ঞান করতেন-তেমনি নিজেদের আধ্যাত্মিক পূর্ণতা অর্জনের জন্য খাঁটি পীর-আওলিয়া ও অধ্যাত্মিক সাধকদের দরবারে ধর্না দেয়াকেও আবশ্যক মনে করতেন। এতে করে তাঁদের সুনাম-সুখ্যাতি ও মর্যাদা কোন ভাবে ক্ষুন্ন হতোনা। একদিকে যুগের রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের সামনে তাদেরকে আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ও রাজকীয় মন-মেজাযে দেখা যেতো অপরদিকে তাঁদের আধ্যাত্মিক গুরু পীর-মাশায়েখদের সামনে দেখা যেতো পরম বিনয়ী ও নিষ্প্রাণ দেহের মতো। আত্মগৌরব ও বিনয়ের এই দুই বিপরীতমুখী গুণের দূর্লভ সমাবেশ ছিল সেসব নিষ্ঠাবান আলেমদের চরিত্রের অন্যতম ভূষণ। ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে এই বাস্তবতাটি কেউ অস্বীকার করতে পারবেনা যে, যেসব ব্যক্তিত্বকে আল্লাহ তা'লা সার্বজনীন গ্রহনযোগ্যতা, সমাদর ও অমর খ্যাতি দান করেছেন এবং যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতে বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে ইলমের খিদমত করে গেছেন তাঁদের সাথে সমকালীন কোন না কোন পীর-বুযুর্গের সাথে অবশ্যই সম্পর্ক ছিল। সর্ব প্রথম ভারতের শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে তিন জন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব হয়। তাদের ছাত্র-শিষ্যরাই পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে জ্ঞানের প্রদ্বীপ জ্বেলে রেখেছিলেন। তাঁরা হলেন, মাওলানা আবদুল মুক্তাদির কিন্দী থানেশ্বরী (মৃ.৭৯১ হি.) তাঁর ছাত্র মাওলানা খাজগী দেহলভী (মৃ.৮০৯) এবং শেখ আহমদ থানেশ্বরী (মৃ.৮০১)। এ তিনজনই 'চেরাগে দেহলী' (দিল্লির প্রদীপ) নামে খ্যাত শেখ নাসির উদ্দীন এর দীক্ষাপ্রাপ্ত মুরীদ ছিলেন।
শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে অপর এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন আল্লামা ওজীহুদ্দীন নাসরুল্লাহ্ গুজরাটী (মৃ.৮৯৮ হি.) যিনি জীবনের ৬৭টি বছর আহমদাবাদে মা'কুলাত ও মানকুলাত পড়ানোর মধ্যে অতিবাহিত করেন। তার জীবদ্দশাতেই তাঁর ছাত্ররা আহমদাবাদ থেকে লাহোর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল এবং নিজ নিজ স্থানে ইল্মের খিদমতে নিয়োজিত ছিল। জীবদ্দশাতেই তিনি উস্তাজুল আসাতিজা অভিধায় ভূষিত হয়েছিলেন। জাহানাবাদ, জৌনপুর ও লক্ষ্ণৌ শহরের আশে পাশে তিনিই ছিলেন একমাত্র জ্ঞানের প্রদীপ যার আলোয় সমগ্র অঞ্চল আলোকিত ছিল। তিনি ছিলেন শেখ মুহাম্মদ গাউস গোয়ালিয়ারী এর একজন বিশিষ্ট মুরীদ ও খলিফা। তিনি তাঁর পীরের আন্তরিক দোয়া লাভে ধন্য হয়েছিলেন।
অনুরূপভাবে শাহ পীর মুহাম্মদ লাখনোভী এবং মাওলানা গোলাম নকশবন্দ উভয়ে চিশতিয়া তরিকার বায়আত ও এযাযত প্রাপ্ত ছিলেন। তাঁরা একই সাথে মাদ্রাসা ও খানকার কাজ করতেন।
ভারতবর্ষ থেকে শুরু করে আফগানিস্তান-ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সর্বজনগ্রাহ্য পাঠ্যক্রম ও সিলেবাসের সফল প্রবর্তক মোল্লা নিজামুদ্দীন সাহালভী (রহ.) (মৃ.১১৬১ হি.)। কাদেরিয়া সিলসিলার বিখ্যাত পীর সৈয়দ আবদুর রাজ্জাক বানসাভী (রহ.) এর একনিষ্ঠ ভক্ত ও শিষ্যই ছিলেন না বরং এ মহান সাধকের আক্বিদা-বিশ্বাসই ছিল তাঁর জীবন দর্শন। তাঁর ভালবাসায় তিনি ছিলেন আকণ্ঠ নিমজ্জিত। 'মানাকিবে রাজ্জাকিয়া' গ্রন্থের প্রতিটি শব্দে পীরের প্রতি তাঁর অগাধ ভক্তি ও ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী শিক্ষানিকেতন দারুল উলূম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা ও দেওবন্দ সংস্কার আন্দোলনের পথিকৃৎ আল্লামা কাসেম নানুতুভী (রহ.) ও তাঁর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও মুরুব্বী আল্লামা রশীদ আহমদ গংগোহী (রহ.) উভয়ে হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কীর (রহ.) খলিফা ছিলেন। নাদওয়াতুল উলামা লক্ষ্ণৌ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সাইয়েদ আহমদ আলী মুংগীরী (রহ.) ছিলেন মাওলানা ফজলে রহমান গঞ্জেমুরাদাবাদী (রহ.) এর খলিফা। এভাবে ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে প্রতিটি সন্ধিক্ষণে কোন না কোন অধ্যাত্মিক সাধক ও পীরের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। যার সুদৃষ্টি সে কাজের মধ্যে ইখলাস, লিল্লাহিয়্যাত ও সার্বজনীন প্রভাব সৃষ্টি করেছিল।
এটাও বড় শিক্ষণীয়, লক্ষণীয় এবং কাকতালীয় নয় যে, অধিকাংশ বড় বড় নামকরা আলেমদের এমন সব অধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের সাথে সম্পর্ক ছিল যারা অনেক সময় লোকসমাজে আলেম হিসেবে পরিচিত ছিলেন না এবং আলেম হিসেবে তাদের কোন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও ছিলনা। যেমন- সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.) এর সাথে সৈয়দ ইসমাঈল শহীদ (রহ.) ও আবদুল হাই বোরহানভী (রহ.) -এর মতো যুগের অদ্বিতীয় আলেমের সম্পর্ক, সৈয়দ আবদুর রাজ্জাক বানসাভীর সাথে মোল্লা নিজামুদ্দীনের (রহ.) মতো জগদ্বিখ্যাত আলেমের সম্পর্ক। হযরত ইমদাদুল্লাহ্ মুহাজির মক্কীর (রহ.) সাথে মুজতাহিদ পর্যায়ের আলেম মাওলানা কাসেম নানুতুভীর (রহ.) সম্পর্ক। এ বিস্ময়কর বাস্তবতা সেসব মহান আলেমের নিষ্ঠা, অকৃত্রিম সত্যানুসন্ধিৎসা ও হৃদয়ের বিশালতার প্রমাণ বহন করে। আর এই নিষ্ঠা ও লিল্লাহিয়্যাতই তাদের প্রতিটি কাজকে সুপ্রসারিত, সুদৃঢ় ও সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। জ্ঞানের গভীরতা ও ব্যাপক অধ্যয়ন ও গবেষণার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক প্রয়োজন ও রোগ- ব্যাধির অনুভব ও তার প্রতিকারের জন্য স্বপ্রণোদিত উদ্যোগ এবং ইলমে সাথে সাথে একনিষ্ঠতা অর্জন ও আল্লাহর সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ার অধীর আগ্রহ সৃষ্টি করা ছিল সেই প্রাচীন শিক্ষা ব্যবস্থার একটি আলোকোজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য। যার একটি সুফল ছিল এই যে, সেই শিক্ষাব্যবস্থার জিম্মাদার আলেমদের সাথে সাধারণ মানুষের একটি সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, যা তাঁদের জীবনকে প্রভাবিত করে। দ্বিতীয় সুফল ছিল এই যে, তাঁরা সমকালীন পুঁজিবাদী তৎপরতার লোভনীয় হাতছানি এবং শাসক শ্রেণীর সাথে সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে অনেক নৈতিক দূর্বলতা থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন, যা সাধারণ জ্ঞান ও মেধার মাধ্যমে সম্ভব নয়। যে একাগ্রতা- নিষ্ঠা ও ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে সেইসব ওলামায়ে কেরাম ৭/৮শ' বছর পর্যন্ত নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এলাকার পর এলাকা আলোকিত করেছেন। তা ছিল সেই সাহচর্য, আধ্যাত্মিক সাধনা ও আত্মশুদ্ধিরই ফল যা তারা সেই সব আধ্যাত্মিক কেন্দ্র ও মহান ব্যক্তিদের সংস্পর্শে লাভ করেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত আরবী মাদ্রাসাগুলোতে লেখা-পড়া শেষ করে কোন আধ্যাত্মিক পীরের সাহচর্য লাভ করে আত্মশুদ্ধি করার একটি রীতি চালু হয়ে যায়। এমন একটি নিয়ম হয়ে যায় যে, কিছু সময় সেসব আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলোতে অতিবাহিত করে এমন কিছু পূর্ণতা অর্জন করা শুধু মাত্র জ্ঞান অর্জন করে লাভ করা সম্ভব নয়। মাওলানা লুতফুল্লাহ্ সাহেবের দরসগাহে ইলম অর্জন করে ছাত্ররা পূর্বাঞ্চলের হেদায়তের কেন্দ্র মাওলানা ফজলে রহমান গঞ্জেমুরাদাবাদীর (রহ.) খেদমতে উপস্থিত হতেন। ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মাদ্রাসাগুলোর (দেওবন্দ সাহারানপুর) ছাত্রদের ঝোঁক ছিল থানাভোন ও গংগোহ এর দিকে, যেখানে হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কী (রহ.), হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গংগোহী এবং তাঁদের খলিফারা শিক্ষা-দীক্ষা ও দাওয়াত প্রসারের কাজে নিমগ্ন ছিলেন।