📄 মুসলিম সভ্যতায় ভারতীয় প্রভাব
ভারতে দীর্ঘকাল অবস্থান, নাগরিকত্ব গ্রহণ এখানকার সভ্যতা ও সামাজিকতা এবং অপরাপর সম্প্রদায়ের সংমিশ্রনের যে প্রভাব মুসলমানদের জীবনে ও সভ্যতায় ফুটে উঠেছে তার অন্যতম হচ্ছে, এমন এক বহুল প্রচলিত, অমায়িক, সর্বজনীন ভাষা, (উর্দু) যার মধ্যে আরবী, ফার্সি, তুর্কি ও সংস্কৃতের অনেক শব্দ ভান্ডার ও রূপ-মাধুরী নিহিত রয়েছে। দ্বিতীয়তঃ অভিজাত শ্রেণী ও শহরবাসীর সে পরিধেয়, যা ভারতের উৎপাদিত এবং যা সুরুচি ও মার্জিত স্টাইলের এক সুদৃষ্টান্ত। পক্ষান্তরে সে সামাজিকতা ও সভ্যতা, যা দিল্লি, লক্ষ্ণৌ, হায়দ্রাবাদ ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় শহরে মুঘল শাসনের শেষ দিকে প্রকাশ পেয়েছে, তার মধ্যে মেধা, উৎকৃষ্টতা, চমৎকারিত্ব ও মার্জিত গুনাবলী পরতে পরতে দৃষ্টিগোচর হয়। পিতা-মাতার প্রতি অগাধ সম্মান প্রদর্শন, তাদের সামনে লজ্জাশীলতা ও শিষ্টাচারের বিশেষ নিয়ম, নারীদের অত্যধিক পর্দা ও বিশেষ জীবনধারা যেমন কতক বৈশিষ্ট্য, যা অধিকাংশ ভিনদেশীয় মুসলমানগণের মধ্যে অনুপস্থিত। এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ভারতের বিশেষ অবস্থা, শাসক শ্রেণীর উন্নত রুচিবোধ ও প্রাচীন রীতিনীতির বিরাট দখল রয়েছে।
সর্বদা একই বংশ ও সমশ্রেণীর পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা এবং পারিবারিক বিশেষ নিয়ম-নীতি ও সীমারেখার বাইরে না যাওয়া ভারতের মুসলিম সভ্যতার এমন কতক বিশেষত্ব, যার মধ্যে ভারতের গোষ্ঠীগত রীতিধারা ও সামাজিক স্থায়ী কাঠামোর অত্যধিক কর্তৃত্ব রয়েছে। বহির্ভারতের মুসলমান, যারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে শুধু আভিজাত্য ও ব্যক্তিত্বের প্রতি লক্ষ্য রাখে, একই গোত্রে বিবাহ সম্পাদনের পক্ষপাতী নয়, তারা এ প্রথাকে অদ্ভুত এবং ভারতীয় বৈশিষ্ট্য বলে গণ্য করে।
বিয়ে, মৃত্যু ও অন্যান্য উৎসব- অনুষ্ঠানের অত্যধিক গুরুত্বদান, তাতে সামর্থের চেয়ে বাড়তি ব্যয় এবং আড়ম্বর ও জাঁকজমকপূর্ণ পন্থায় উদযাপন করা ইত্যাদিও ভারতীয় সভ্যতা ও সামাজিকতার বিশেষত্ব, যা মুসলিম জাতিকে এ অঞ্চলে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। অথচ এসব বিষয়ে ইসলামী রীতি ও আদর্শ একেবারেই সাদাসিধে।
এভাবে প্রভূ ও ভৃত্যের মাঝে এমন দূরত্ব যেন তারা ভিন্ন জাতের দু' প্রাণী, সাথে সাথে মাঝে-মধ্যে তাদের সাথে অচ্যুত সুলভ ব্যবহার ইত্যাদি সবই ভারতে ইসলামী সভ্যতার পতনকালের স্মারক, জমিদারী প্রথা, মাতব্বরী ভাবধারা এবং অন্য কৃষ্টির সংমিশ্রনের ফলশ্রুতি ও ভারতীয় বৈশিষ্ট্য।
এভাবে পেশার ভিত্তিতে সামাজিক বিভাজনও ভারতীয় সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য। মাটি ও এখানকার সভ্যতা ও উত্তরাধিকার সংস্কৃতি ভারতের মুসলমানদেরকে অজস্র বহুমূল্য- উপহার দিয়েছে, যা ভারতীয় ইসলামী সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ও গৌরবমন্ডিত স্বত্বাধিকার। ভারতীয় মুসলমানগণ পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাব ও তার ক্ষতিকর আক্রমণের মুকাবিলার ক্ষেত্রে এহেন সফলতা এবং নিজেদের ব্যক্তিত্বকে পূর্ণ স্বকীয়তায় প্রতিষ্ঠিত রাখে ইত্যাদি গুণাবলী অন্যান্য মুসলিম দেশে বিরল। এভাবে তাদের চিন্তার গভীরতা ও সূক্ষ্মতা, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি সবই ভারতের শক্তির ফলাফল, যা বহুকাল থেকে এ অঞ্চলে ক্রিয়াশীল রয়েছে। ভারতের মুসলমানগণ একটি নতুন ইসলামী ভারতীয় সভ্যতার গোড়াপত্তন করেছেন এবং এমন নীতিধারার রূপ দিয়েছেন যার মধ্যে ইসলামের বিশ্বজনীন সভ্যতা ও দর্শন একই সাথে পরিলক্ষিত হয়।
সাথে সাথে ইসলামী চিন্তাধারা ও নৈতিকতা অপরাপর অতিথি সভ্যতা অনেক পরিবর্তনও গ্রহন করেছে। যদিও এসব সভ্যতা ও বিজয়ী জাতির জীবনধারার বৈশিষ্ট্যের সাথে ভারতের পুরনো সভ্যতার কোন সম্পৃক্ততা নেই। ভারতের এক সংবেদনশীল কবি ও জাগ্রত মুসলিম বিবেক খাজা আলতাফ হোসাইন হালী (রহ.) তার কবিতায়ও এ ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন।¹ বাস্তবতা হল এই, কোন সভ্যতা অন্য সভ্যতাকে কেবল প্রভাবিত করে নিজে প্রভাব গ্রহন করে না, বিশ্ব ইতিহাসের এমন ঘটনা বিরল কাহিনী। এটা মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতি বিরোধী। কারণ মানব জীবন আদান-প্রদানের মর্যাদাপূর্ণ নীতিতে বিশ্বাস করে। আর এরই মাঝে তার বিকাশ, উন্নতি, বিশালতা ও পরিবর্তনের রহস্য নিহিত রয়েছে।
টিকাঃ
১. দ্রষ্টব্য হালীর কবিতা "শিকওয়ায়ে হিন্দ" কুল্লিয়াতে হালী।