📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 চিত্রকলা বিষয়ে ইসলামী নীতিমালা

📄 চিত্রকলা বিষয়ে ইসলামী নীতিমালা


ইসলামী সভ্যতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, বাস্তব অনুরাগ ও ঐকান্তিকতা। ইসলাম চিত্রকলা ও সুকুমার বৃত্তির চর্চা ও ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করেছে। ইসলামী সংস্কৃতি, পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্য, সৌষ্ঠবপূর্ণ রুচিবোধকে মূল্যায়ন করেছে। কিন্তু যেসব বিলাস সামগ্রী ইউরোপীয়রা চিত্রকলা (Fine Arts) খেতাবে ভূষিত করেছে, তার কতিপয় দিক ইসলামী সভ্যতার দৃষ্টিকোণে অবৈধ। যেমন-নৃত্যশিল্প, প্রাণীর চিত্রাঙ্কণ, মূর্তি নির্মাণ, ভাষ্কর্য স্থাপন ইত্যাদি। ইসলাম এ বিষয়ে সতর্কতা ও ন্যায় সঙ্গত নির্দেশনা দিয়েছে। সুর সঙ্গীতের গুনগুন ও গুঞ্জরণ এক বিশেষ শর্তসাপেক্ষে সতর্কতার সাথে বিহিত ও বৈধ। শিল্পকলায় সর্বদা নিমগ্ন থাকা ইসলামী সভ্যতার চেতনা ও তাৎপর্য বিরোধী এবং খোদাভীতি, পরকাল ভাবনা ও চারিত্রিক উন্নতির পথে বাধা যা একজন মুসলমানের কাছে আশা করা যায়। ইসলামী সভ্যতা ও শরীয়তের পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান না থাকলে ভারতের মুসলমানগণ এমন এমন জনপদে ভারসাম্যপূর্ণ নীতির উপর টিকে থাকা অসম্ভব ছিল। ভারতের 'অধিবাসীরা আদিকাল থেকে শিল্পকলা ও সুকুমার বৃত্তির চর্চায় অনুরাগী এবং এগুলো তাদের উপাসনার এক বিশেষ অঙ্গ। উক্ত সঙ্গতিপূর্ণ নীতি সর্বাবস্থায় মুসলমানের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 ইসলামের চারিত্রিক নীতি

📄 ইসলামের চারিত্রিক নীতি


ইসলামী আদর্শিক নীতিমালার সেব সব অধ্যায়, যা বিশেষভাবে মুসলিম সভ্যতাকে প্রভাবিত করেছে এবং তাকে একটি বিশ্বজনীন সমতা ও একতা দান করেছে তা হচ্ছে, আতিথেয়তা, পরোপকার ও বদান্যতা। এগুলো প্রকৃত পক্ষে ইসলামী সভ্যতার গোড়াপত্তনকারী সায়্যিদিনা ইব্রাহীম (আ.) এর মানসিক বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবগত সুরুচিবোধেরই পরিচায়ক। কুরআন মজীদে হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর আলোচনায় যার বিশেষ উল্লেখ রয়েছে। 'তোমরা কি সে সব মেহমানদের অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত? যাঁদের ইব্রাহীম সশ্রদ্ধ আতিথ্যদানে ধন্য হয়েছেন।''¹ ওই সব জাতির মধ্যে যারা বংশপরম্পরায় ও বিশ্বাসগত দিক থেকে তাঁর উত্তরসূরী ও প্রতিনিধি এবং যারা তাঁর সভ্যতায় প্রভাবিত, অতিথি সেবা ও মেহমানদারীর এমন এক ব্যাপক যোগ্যতা ও আগ্রহ পাওয়া যায়, যা সে সময়ের সকল ইতিহাসবিদ ও পর্যটকদেরকে আকৃষ্ট করেছে। তাঁদের লেখা ও বর্ণনায় এর ব্যাপক আলোচনাও বিদ্যমান। মধ্যএশিয়ার সেসব দেশে এখনও যার অধিবাসীরা পাশ্চাত্য সভ্যতায় নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেনি, আজও তাঁদের মধ্যে মেহমানদারীর এক অপরূপ ঝলক লক্ষ্য করা যায়। যা কখনও ইবনে বতুতা, কখনও ইবনে জুবাইর কে স্বদেশের সহানুভূতি ও ভালবাসার পরশ দিয়ে ধন্য করেছে।

ভারতের মুসলমান ইসলামী সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র ও ইসলাম প্রচারের সময়-কাল থেকে দূরবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও স্বীয় মেহমানদারী ও মেজবানী রুচিবোধে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। মেহমানের আনাগোনা, মুসলমানের পারিবারিক রীতি, যার কমবেশি প্রচলন আজও বিদ্যমান। জাগতিক পরিবর্তন যদিও তার মধ্যে বড় ধরণের ব্যবধান সৃষ্টি করেছে, তার পরেও সকল মুসলমান অন্য যে কোন মুসলমানের গমনাগমনে আনন্দ উপভোগ করেন এবং তার সেবা ও মেহমানদারীকে সৌভাগ্য ও ইসলামী আদর্শ মনে করে।

টিকাঃ
১. সূরা যারিয়াত, আয়াত : ২৪।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 মুসলিম সভ্যতায় ভারতীয় প্রভাব

📄 মুসলিম সভ্যতায় ভারতীয় প্রভাব


ভারতে দীর্ঘকাল অবস্থান, নাগরিকত্ব গ্রহণ এখানকার সভ্যতা ও সামাজিকতা এবং অপরাপর সম্প্রদায়ের সংমিশ্রনের যে প্রভাব মুসলমানদের জীবনে ও সভ্যতায় ফুটে উঠেছে তার অন্যতম হচ্ছে, এমন এক বহুল প্রচলিত, অমায়িক, সর্বজনীন ভাষা, (উর্দু) যার মধ্যে আরবী, ফার্সি, তুর্কি ও সংস্কৃতের অনেক শব্দ ভান্ডার ও রূপ-মাধুরী নিহিত রয়েছে। দ্বিতীয়তঃ অভিজাত শ্রেণী ও শহরবাসীর সে পরিধেয়, যা ভারতের উৎপাদিত এবং যা সুরুচি ও মার্জিত স্টাইলের এক সুদৃষ্টান্ত। পক্ষান্তরে সে সামাজিকতা ও সভ্যতা, যা দিল্লি, লক্ষ্ণৌ, হায়দ্রাবাদ ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় শহরে মুঘল শাসনের শেষ দিকে প্রকাশ পেয়েছে, তার মধ্যে মেধা, উৎকৃষ্টতা, চমৎকারিত্ব ও মার্জিত গুনাবলী পরতে পরতে দৃষ্টিগোচর হয়। পিতা-মাতার প্রতি অগাধ সম্মান প্রদর্শন, তাদের সামনে লজ্জাশীলতা ও শিষ্টাচারের বিশেষ নিয়ম, নারীদের অত্যধিক পর্দা ও বিশেষ জীবনধারা যেমন কতক বৈশিষ্ট্য, যা অধিকাংশ ভিনদেশীয় মুসলমানগণের মধ্যে অনুপস্থিত। এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ভারতের বিশেষ অবস্থা, শাসক শ্রেণীর উন্নত রুচিবোধ ও প্রাচীন রীতিনীতির বিরাট দখল রয়েছে।

সর্বদা একই বংশ ও সমশ্রেণীর পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা এবং পারিবারিক বিশেষ নিয়ম-নীতি ও সীমারেখার বাইরে না যাওয়া ভারতের মুসলিম সভ্যতার এমন কতক বিশেষত্ব, যার মধ্যে ভারতের গোষ্ঠীগত রীতিধারা ও সামাজিক স্থায়ী কাঠামোর অত্যধিক কর্তৃত্ব রয়েছে। বহির্ভারতের মুসলমান, যারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে শুধু আভিজাত্য ও ব্যক্তিত্বের প্রতি লক্ষ্য রাখে, একই গোত্রে বিবাহ সম্পাদনের পক্ষপাতী নয়, তারা এ প্রথাকে অদ্ভুত এবং ভারতীয় বৈশিষ্ট্য বলে গণ্য করে।

বিয়ে, মৃত্যু ও অন্যান্য উৎসব- অনুষ্ঠানের অত্যধিক গুরুত্বদান, তাতে সামর্থের চেয়ে বাড়তি ব্যয় এবং আড়ম্বর ও জাঁকজমকপূর্ণ পন্থায় উদযাপন করা ইত্যাদিও ভারতীয় সভ্যতা ও সামাজিকতার বিশেষত্ব, যা মুসলিম জাতিকে এ অঞ্চলে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। অথচ এসব বিষয়ে ইসলামী রীতি ও আদর্শ একেবারেই সাদাসিধে।

এভাবে প্রভূ ও ভৃত্যের মাঝে এমন দূরত্ব যেন তারা ভিন্ন জাতের দু' প্রাণী, সাথে সাথে মাঝে-মধ্যে তাদের সাথে অচ্যুত সুলভ ব্যবহার ইত্যাদি সবই ভারতে ইসলামী সভ্যতার পতনকালের স্মারক, জমিদারী প্রথা, মাতব্বরী ভাবধারা এবং অন্য কৃষ্টির সংমিশ্রনের ফলশ্রুতি ও ভারতীয় বৈশিষ্ট্য।

এভাবে পেশার ভিত্তিতে সামাজিক বিভাজনও ভারতীয় সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য। মাটি ও এখানকার সভ্যতা ও উত্তরাধিকার সংস্কৃতি ভারতের মুসলমানদেরকে অজস্র বহুমূল্য- উপহার দিয়েছে, যা ভারতীয় ইসলামী সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ও গৌরবমন্ডিত স্বত্বাধিকার। ভারতীয় মুসলমানগণ পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাব ও তার ক্ষতিকর আক্রমণের মুকাবিলার ক্ষেত্রে এহেন সফলতা এবং নিজেদের ব্যক্তিত্বকে পূর্ণ স্বকীয়তায় প্রতিষ্ঠিত রাখে ইত্যাদি গুণাবলী অন্যান্য মুসলিম দেশে বিরল। এভাবে তাদের চিন্তার গভীরতা ও সূক্ষ্মতা, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি সবই ভারতের শক্তির ফলাফল, যা বহুকাল থেকে এ অঞ্চলে ক্রিয়াশীল রয়েছে। ভারতের মুসলমানগণ একটি নতুন ইসলামী ভারতীয় সভ্যতার গোড়াপত্তন করেছেন এবং এমন নীতিধারার রূপ দিয়েছেন যার মধ্যে ইসলামের বিশ্বজনীন সভ্যতা ও দর্শন একই সাথে পরিলক্ষিত হয়।

সাথে সাথে ইসলামী চিন্তাধারা ও নৈতিকতা অপরাপর অতিথি সভ্যতা অনেক পরিবর্তনও গ্রহন করেছে। যদিও এসব সভ্যতা ও বিজয়ী জাতির জীবনধারার বৈশিষ্ট্যের সাথে ভারতের পুরনো সভ্যতার কোন সম্পৃক্ততা নেই। ভারতের এক সংবেদনশীল কবি ও জাগ্রত মুসলিম বিবেক খাজা আলতাফ হোসাইন হালী (রহ.) তার কবিতায়ও এ ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন।¹ বাস্তবতা হল এই, কোন সভ্যতা অন্য সভ্যতাকে কেবল প্রভাবিত করে নিজে প্রভাব গ্রহন করে না, বিশ্ব ইতিহাসের এমন ঘটনা বিরল কাহিনী। এটা মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতি বিরোধী। কারণ মানব জীবন আদান-প্রদানের মর্যাদাপূর্ণ নীতিতে বিশ্বাস করে। আর এরই মাঝে তার বিকাশ, উন্নতি, বিশালতা ও পরিবর্তনের রহস্য নিহিত রয়েছে।

টিকাঃ
১. দ্রষ্টব্য হালীর কবিতা "শিকওয়ায়ে হিন্দ" কুল্লিয়াতে হালী।

ফন্ট সাইজ
15px
17px