📄 তৃতীয় নিদর্শন, ভদ্রতা, মহত্ত্ব ও মানবজাতির সমতায় বিশ্বাস
ভারতীয় ইসলামী সভ্যতার তৃতীয় বিশ্বজনীন নিদর্শন হচ্ছে, মানুষের মর্যাদা, মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাস। সে বিশ্বাসের স্বাভাবিক ফলশ্রুতি হচ্ছে, মুসলমানগণ বর্ণ বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার অভ্যাস ও রীতি হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। মুসলমানগণ অন্যলোকের সাথে অবাধে খেতে প্রস্তুত, অপরকে নিজের খাদ্যে সঙ্গী করতে অভ্যস্ত। ভিন্ন মতের বহুলোক সংকোচহীনভাবে এক থালায় বসে আহার করে। একে অপরের উচ্ছিষ্ট খায় ও ঝুটা পানি পান করে। 'ধনী-গরীব কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে' এক সারিতে নামায আদায় করে। নিম্নবংশীয়, অথচ জ্ঞানে পারদর্শী ব্যক্তি ইমাম হতে পারবে আর উচ্চ বংশের ভদ্র-শিষ্ট ও উর্ধ্বতন আমীর-উমারাহগন তারই ইমামতিতে নামায পড়তে বাধ্য।
📄 গৌণ ও আনুষঙ্গিক বৈশিষ্ট্যসমূহ
পূর্বোক্ত মৌলিক বৈশিষ্ট্য সমূহের সাথে, সে ইবরাহিমী সভ্যতার কতক গৌণ ও আনুষাঙ্গিক বৈশিষ্ট্য সমূহ বিদ্যমান, যা দুনিয়ার সকল মুসলমানদের মধ্যে সম্মিলিত ভাবে পরিলক্ষিত হয়, যেমন- ডান হাতে ভাল কাজ সম্পাদন, ডান হাতে পানাহার ও ডান হাতে আদান-প্রদান। এভাবে পোষাক-পরিচ্ছদেও কিছু বিধি-নিষেধ রয়েছে যেমন- জামা-কাপড় দ্বারা শরীর পরিবৃতি, হাঁটু সমাচ্ছাদিত ও পায়ের গিঁট অনাবৃত থাকা, পুরুষের জন্য রেশমী বস্ত্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং পবিত্রতা রক্ষায় সতর্কতা অবলম্বন ইত্যাদি। সাধারণভাবে যেখানে ইসলামী সভ্যতা স্বীয় মূলনীতিতে প্রতিষ্ঠিত, সেখানে উক্ত বিধি-নিষেধের অনুসরণ লক্ষণীয়। উক্ত বিধি-বিধানের বিরোধিতা সভ্যতার দূর্বলতা ও বাহ্যিক প্রভাবের ফলাফল বিবেচিত হবে।
📄 চিত্রকলা বিষয়ে ইসলামী নীতিমালা
ইসলামী সভ্যতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, বাস্তব অনুরাগ ও ঐকান্তিকতা। ইসলাম চিত্রকলা ও সুকুমার বৃত্তির চর্চা ও ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করেছে। ইসলামী সংস্কৃতি, পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্য, সৌষ্ঠবপূর্ণ রুচিবোধকে মূল্যায়ন করেছে। কিন্তু যেসব বিলাস সামগ্রী ইউরোপীয়রা চিত্রকলা (Fine Arts) খেতাবে ভূষিত করেছে, তার কতিপয় দিক ইসলামী সভ্যতার দৃষ্টিকোণে অবৈধ। যেমন-নৃত্যশিল্প, প্রাণীর চিত্রাঙ্কণ, মূর্তি নির্মাণ, ভাষ্কর্য স্থাপন ইত্যাদি। ইসলাম এ বিষয়ে সতর্কতা ও ন্যায় সঙ্গত নির্দেশনা দিয়েছে। সুর সঙ্গীতের গুনগুন ও গুঞ্জরণ এক বিশেষ শর্তসাপেক্ষে সতর্কতার সাথে বিহিত ও বৈধ। শিল্পকলায় সর্বদা নিমগ্ন থাকা ইসলামী সভ্যতার চেতনা ও তাৎপর্য বিরোধী এবং খোদাভীতি, পরকাল ভাবনা ও চারিত্রিক উন্নতির পথে বাধা যা একজন মুসলমানের কাছে আশা করা যায়। ইসলামী সভ্যতা ও শরীয়তের পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান না থাকলে ভারতের মুসলমানগণ এমন এমন জনপদে ভারসাম্যপূর্ণ নীতির উপর টিকে থাকা অসম্ভব ছিল। ভারতের 'অধিবাসীরা আদিকাল থেকে শিল্পকলা ও সুকুমার বৃত্তির চর্চায় অনুরাগী এবং এগুলো তাদের উপাসনার এক বিশেষ অঙ্গ। উক্ত সঙ্গতিপূর্ণ নীতি সর্বাবস্থায় মুসলমানের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য।
📄 ইসলামের চারিত্রিক নীতি
ইসলামী আদর্শিক নীতিমালার সেব সব অধ্যায়, যা বিশেষভাবে মুসলিম সভ্যতাকে প্রভাবিত করেছে এবং তাকে একটি বিশ্বজনীন সমতা ও একতা দান করেছে তা হচ্ছে, আতিথেয়তা, পরোপকার ও বদান্যতা। এগুলো প্রকৃত পক্ষে ইসলামী সভ্যতার গোড়াপত্তনকারী সায়্যিদিনা ইব্রাহীম (আ.) এর মানসিক বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবগত সুরুচিবোধেরই পরিচায়ক। কুরআন মজীদে হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর আলোচনায় যার বিশেষ উল্লেখ রয়েছে। 'তোমরা কি সে সব মেহমানদের অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত? যাঁদের ইব্রাহীম সশ্রদ্ধ আতিথ্যদানে ধন্য হয়েছেন।''¹ ওই সব জাতির মধ্যে যারা বংশপরম্পরায় ও বিশ্বাসগত দিক থেকে তাঁর উত্তরসূরী ও প্রতিনিধি এবং যারা তাঁর সভ্যতায় প্রভাবিত, অতিথি সেবা ও মেহমানদারীর এমন এক ব্যাপক যোগ্যতা ও আগ্রহ পাওয়া যায়, যা সে সময়ের সকল ইতিহাসবিদ ও পর্যটকদেরকে আকৃষ্ট করেছে। তাঁদের লেখা ও বর্ণনায় এর ব্যাপক আলোচনাও বিদ্যমান। মধ্যএশিয়ার সেসব দেশে এখনও যার অধিবাসীরা পাশ্চাত্য সভ্যতায় নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেনি, আজও তাঁদের মধ্যে মেহমানদারীর এক অপরূপ ঝলক লক্ষ্য করা যায়। যা কখনও ইবনে বতুতা, কখনও ইবনে জুবাইর কে স্বদেশের সহানুভূতি ও ভালবাসার পরশ দিয়ে ধন্য করেছে।
ভারতের মুসলমান ইসলামী সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র ও ইসলাম প্রচারের সময়-কাল থেকে দূরবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও স্বীয় মেহমানদারী ও মেজবানী রুচিবোধে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। মেহমানের আনাগোনা, মুসলমানের পারিবারিক রীতি, যার কমবেশি প্রচলন আজও বিদ্যমান। জাগতিক পরিবর্তন যদিও তার মধ্যে বড় ধরণের ব্যবধান সৃষ্টি করেছে, তার পরেও সকল মুসলমান অন্য যে কোন মুসলমানের গমনাগমনে আনন্দ উপভোগ করেন এবং তার সেবা ও মেহমানদারীকে সৌভাগ্য ও ইসলামী আদর্শ মনে করে।
টিকাঃ
১. সূরা যারিয়াত, আয়াত : ২৪।