📄 সর্বজনীন নিদর্শন একত্ববাদের বিশ্বাস
মুসলিম সভ্যতার দ্বিতীয় বিশ্বজনীন নিদর্শন ও প্রতীক একত্ববাদের বিশ্বাস, যা তাদের আকায়েদ (ধর্মমত) থেকে আ'মাল (কর্মকান্ড) এবং ইবাদত-বন্দেগী থেকে উৎসব পালনাবধি স্তরে স্তরে পরিদৃষ্ট হয়। তাদের মসজিদের মিনার চূড়া হতে প্রত্যহ পাঁচবার এ মতাদর্শের ঘোষণা হয়, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ ইবাদত-বন্দেগীর উপযোগী নয়। তাদের ঘর-বাড়ি, মনোহর দৃশ্যভূমি সবই ইসলামী মূলনীতির ভিত্তিতে প্রতিমা পূজা ও বহু ইশ্বরবাদের নিদর্শন হতে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখা অত্যন্ত বাঞ্চনীয়। ছবি, ভাস্কর্য ও প্রতিমা তাদের জন্য একেবারেই নিষিদ্ধ। এমনকি মুসলিম শিশু কিশোরের খেলনাপাতিতেও তা কঠোরভাবে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ধর্মীয় উৎসবাদি হোক বা রাজকীয় আনন্দানুষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতা কিংবা ধর্ম গুরুর জন্ম দিনে পালন পতাকা উত্তোলন পর্ব, ছবি, প্রতিমূর্তি ও প্রতিমার সামনে মাথা ঝোঁকানো কিংবা তাদের পুষ্পমাল্যার্পণ মুসলিম জাতির জন্য সম্পূর্ণ হারাম ও তাদের সভ্যতার চেতনা পরিপন্থী। মুসলিম জাতি যেখানেই স্বীয় ইসলামী সভ্যতার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে উপর্যুক্ত কর্মাদি থেকে কঠোরভাবে দূরে থাকবে। উৎসব অনুষ্ঠানে শপথ ও অঙ্গিকার গ্রহণে, বয়জ্যেষ্ঠদের ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনে এবং বিনম্রতা প্রকাশে হিজাযী তাওহীদের সীমালঙ্ঘণ ও অন্য জাতির অনুকরণ ইসলামী চেতনা ও আদর্শ হতে বিচ্যুতির নামান্তর।
📄 তৃতীয় নিদর্শন, ভদ্রতা, মহত্ত্ব ও মানবজাতির সমতায় বিশ্বাস
ভারতীয় ইসলামী সভ্যতার তৃতীয় বিশ্বজনীন নিদর্শন হচ্ছে, মানুষের মর্যাদা, মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাস। সে বিশ্বাসের স্বাভাবিক ফলশ্রুতি হচ্ছে, মুসলমানগণ বর্ণ বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার অভ্যাস ও রীতি হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। মুসলমানগণ অন্যলোকের সাথে অবাধে খেতে প্রস্তুত, অপরকে নিজের খাদ্যে সঙ্গী করতে অভ্যস্ত। ভিন্ন মতের বহুলোক সংকোচহীনভাবে এক থালায় বসে আহার করে। একে অপরের উচ্ছিষ্ট খায় ও ঝুটা পানি পান করে। 'ধনী-গরীব কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে' এক সারিতে নামায আদায় করে। নিম্নবংশীয়, অথচ জ্ঞানে পারদর্শী ব্যক্তি ইমাম হতে পারবে আর উচ্চ বংশের ভদ্র-শিষ্ট ও উর্ধ্বতন আমীর-উমারাহগন তারই ইমামতিতে নামায পড়তে বাধ্য।
📄 গৌণ ও আনুষঙ্গিক বৈশিষ্ট্যসমূহ
পূর্বোক্ত মৌলিক বৈশিষ্ট্য সমূহের সাথে, সে ইবরাহিমী সভ্যতার কতক গৌণ ও আনুষাঙ্গিক বৈশিষ্ট্য সমূহ বিদ্যমান, যা দুনিয়ার সকল মুসলমানদের মধ্যে সম্মিলিত ভাবে পরিলক্ষিত হয়, যেমন- ডান হাতে ভাল কাজ সম্পাদন, ডান হাতে পানাহার ও ডান হাতে আদান-প্রদান। এভাবে পোষাক-পরিচ্ছদেও কিছু বিধি-নিষেধ রয়েছে যেমন- জামা-কাপড় দ্বারা শরীর পরিবৃতি, হাঁটু সমাচ্ছাদিত ও পায়ের গিঁট অনাবৃত থাকা, পুরুষের জন্য রেশমী বস্ত্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং পবিত্রতা রক্ষায় সতর্কতা অবলম্বন ইত্যাদি। সাধারণভাবে যেখানে ইসলামী সভ্যতা স্বীয় মূলনীতিতে প্রতিষ্ঠিত, সেখানে উক্ত বিধি-নিষেধের অনুসরণ লক্ষণীয়। উক্ত বিধি-বিধানের বিরোধিতা সভ্যতার দূর্বলতা ও বাহ্যিক প্রভাবের ফলাফল বিবেচিত হবে।
📄 চিত্রকলা বিষয়ে ইসলামী নীতিমালা
ইসলামী সভ্যতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, বাস্তব অনুরাগ ও ঐকান্তিকতা। ইসলাম চিত্রকলা ও সুকুমার বৃত্তির চর্চা ও ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করেছে। ইসলামী সংস্কৃতি, পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্য, সৌষ্ঠবপূর্ণ রুচিবোধকে মূল্যায়ন করেছে। কিন্তু যেসব বিলাস সামগ্রী ইউরোপীয়রা চিত্রকলা (Fine Arts) খেতাবে ভূষিত করেছে, তার কতিপয় দিক ইসলামী সভ্যতার দৃষ্টিকোণে অবৈধ। যেমন-নৃত্যশিল্প, প্রাণীর চিত্রাঙ্কণ, মূর্তি নির্মাণ, ভাষ্কর্য স্থাপন ইত্যাদি। ইসলাম এ বিষয়ে সতর্কতা ও ন্যায় সঙ্গত নির্দেশনা দিয়েছে। সুর সঙ্গীতের গুনগুন ও গুঞ্জরণ এক বিশেষ শর্তসাপেক্ষে সতর্কতার সাথে বিহিত ও বৈধ। শিল্পকলায় সর্বদা নিমগ্ন থাকা ইসলামী সভ্যতার চেতনা ও তাৎপর্য বিরোধী এবং খোদাভীতি, পরকাল ভাবনা ও চারিত্রিক উন্নতির পথে বাধা যা একজন মুসলমানের কাছে আশা করা যায়। ইসলামী সভ্যতা ও শরীয়তের পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান না থাকলে ভারতের মুসলমানগণ এমন এমন জনপদে ভারসাম্যপূর্ণ নীতির উপর টিকে থাকা অসম্ভব ছিল। ভারতের 'অধিবাসীরা আদিকাল থেকে শিল্পকলা ও সুকুমার বৃত্তির চর্চায় অনুরাগী এবং এগুলো তাদের উপাসনার এক বিশেষ অঙ্গ। উক্ত সঙ্গতিপূর্ণ নীতি সর্বাবস্থায় মুসলমানের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য।