📄 ইব্রাহীমী সভ্যতার বৈশিষ্ট্য
প্রথম যৌথ উপাদানের (আকায়েদ, ইসলামী জীবন ও নৈতিকতার) দিক দিয়ে ভারতের মুসলমানও দুনিয়ার অপরাপর মুসলমানগণের ন্যায় এক বিশেষ সভ্যতার অধিকারী। যার অভিব্যক্তির জন্য 'ইব্রাহিমী সভ্যতা'র চেয়ে অধিক উপযোগী ও ব্যাপক কোন শব্দ নেই। ইবরাহিমী সভ্যতার তিনটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেগুলো তার পুরো ধ্যান-ধারণা ও জীবনধারায় এক বিশেষ প্রতিপত্তি সৃষ্টি করেছে। এ প্রতিপত্তি মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দৃষ্টিগোচর হয় এবং মানুষের সচেতন কর্মকান্ড তার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। ইবরাহিমী সভ্যতার তিন মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে:
এক: আল্লাহর অস্তিত্বে দৃঢ়বিশ্বাস, সর্বদা অন্তরে তার অনড়াবস্থান ও মুখে তার সম্যক প্রকাশ।
দুই: একত্ববাদে পূর্ণাস্থা (যেভাবে ইবরাহিমী ধারা আম্বিয়ায়ে কেরাম [আ.] শিক্ষা দিয়েছেন, যার পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা পবিত্র কুরআনে রয়েছে)
তিন: নৈতিক উৎকর্ষ, মানবিক সমতার বাধ্যবাধকতা ও শাশ্বত কল্পনা, যা কোন মুসলমানের স্মৃতিশক্তি থেকে কখনো বিলুপ্ত হতে পারে না। এসব স্বতন্ত্র বিষয়াদিই একমাত্র ইব্রাহিমী সভ্যতাকে দুনিয়ার অপরাপর সভ্যতার বিপরীতে এক অভিনব রূপে চিত্রিত করেছে।
উল্লিখিত বৈশিষ্ট্য সমূহ এত প্রকাশ্য ও প্রাঞ্জল ধারায় অন্য কোন সভ্যতায় পাওয়াই মুস্কিল।
📄 মুসলিম জীবনের পদে পদে আল্লাহর স্মরণ
আল্লাহর অস্তিত্বের দৃঢ়প্রত্যয়, সর্বদা অন্তরে তাঁর অনড়াবস্থান ও মুখে তাঁর সম্যক প্রকাশ এমন এক সার্বজনীন স্বকীয়তা, যা মুসলিম জাতির পুরো সংস্কৃতি ও পুরো জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মুসলিম সভ্যতা ও সামাজিক ব্যবস্থা নানা ফ্যাশনের পরিধেয় বস্ত্র স্বরূপ, যা নানা রুচিবোধ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও বাহ্যিক প্রভাবে প্রভাবিত। কিন্তু ঐসব পরিধেয় যেন এক বর্ণের পাত্রে রঞ্জিত তাই একটি সুতোর আঁশও এমন নেই, যেখানে সে রঙের ছোয়া লাগেনি। মুসলিম সংস্কৃতি ও সমাজের স্তরে স্তরে আল্লাহর নাম ও তাঁর ধ্যান শিরা-উপশিরার রুধির ধারার ন্যায় প্রবহমান। মুসলিম সন্তান ভূমিষ্ট হলে, সর্বপ্রথম তার কানে আযান দেয়া হয়। এভাবে সদ্যোজাত শিশু তার নামেরও আগে সর্বপ্রথম আল্লাহর নামের সান্নিধ্য ও পরিচিতি লাভে ধন্য হয়। সপ্তম দিনে মাসনূন তরিকায় তার আকিকা উদযাপিত হয়, তখন তার একটি ইসলামী নাম নির্ধারণ করা হয়। সে নামই নির্বাচিত হয় যার মাধ্যমে শিশুর গোলামীর স্বীকৃতি ও আল্লাহর একত্বের ঘোষণার হয় কিংবা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় তাওহিদবাদীদের (আম্বিয়ায়ে কেরাম ও তাঁদের অনুসারীগণের) নামই নির্ণিত হয়। শিশু শিক্ষার উপযোগী হয়, মক্তবে যায়, তখন আল্লাহর নাম ও কুরআন শরীফের আয়াত দ্বারা তার শিক্ষার সূচনা হয়। এখনও এ রীতি ভারতীয় মুসলিম সমাজে 'বিসমিল্লাহ পাঠ' বা 'বিসমিল্লাহ করা' নামে প্রচলিত রয়েছে। বিয়ের সময় আল্লাহ নামের মর্যাদা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, দুই কর্তব্যজ্ঞান সম্পন্ন মানব মানবী পরপস্পর মায়া মমতার বন্ধনে চির দিনের জন্য আবদ্ধ হয়। "আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট প্রার্থনা কর, আত্মীয়-জ্ঞাতীদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর।"¹ বিয়ের মাসনূন খুৎবায় আল্লাহ পাকের অনুগ্রহের আলোচনা করা হয়, যেমন আল্লাহ তা'য়ালা আদম (আ.) এর বংশধারায় নারী পুরুষ রূপে জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেন, আল্লাহ পাকের আনুগত্য সহকারে জীবন ও মরনের নির্দেশ দেয়া হয়। এভাবে ঈদোৎসব, পবিত্র আনন্দের মহান বার্তা নিয়ে যখন মুসলিম উম্মাহর দুয়ারে এসে উপস্থিত হয় প্রতি বছরে, তখন আবালবৃদ্ধবণিতা গোসলের মাধ্যমে পবিত্রতার্জন করে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন লেবাস পরিধান পূর্বক আল্লাহর মহত্ত্ব গীতি সরবে (তাকবীরাতে তাশরীক) পাঠ ও দু'রাআত শুকরানা নামায আদায়ের আদেশ প্রদান করা হয়। তারপর ঈদুল আযহাতেও আল্লাহর নামে কুরবানী করার উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। যখন জীবন সায়াহ্নে সে কঠিন মুহূর্তের আবির্ভাব ঘটে তখন আল্লাহর সে পবিত্র নাম উচ্চারণে উদ্বুদ্ধ করা হয়। সকল মুসলিম নর-নারীর সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা এটাই, তাঁর শেষ শব্দ বা বাক্যের যেন পরিসমাপ্তি ঘটে আল্লাহর পবিত্র নাম নিয়ে এবং সে নাম জপে জপে সে যেন ইহকাল ত্যাগ করে। মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সকল জ্ঞানী-গুনী মুসলমানের মুখে সহসা কুরআনের সে প্রসিদ্ধ বাক্যটি শুনা যায় "ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন” অর্থাৎ 'নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো'।¹ যখন শেষ বিদায়ের পালা (জানাযার নামায) আসে তখন শুরু হতে শেষ পর্যন্ত আল্লাহ নামেরই উচ্চারণ ঘটে এবং মৃতের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, নিজের জন্য আল্লাহর আনুগত্যের জীবন যাপন ও দুনিয়া হতে ঈমানের সাথে বিদায়ের প্রার্থনা জানানো হয়।
চিরনিদ্রায় লাশ সমাহিত করার সময় মুসলমানগণ একবাক্যে একথাই বলে, "আল্লাহর নাম এবং তাঁর পয়গাম্বর (সা.) এর আদর্শ ও নমুনায় কবরস্থ করা হচ্ছে।” লাশের চেহারাটা ইবাদত ও তাওহীদের আন্তর্জাতিক কেন্দ্রাভিমূখী করা হয়, যা বাইতুল্লাহ্ (কা'বা) বলে সকলের কাছে পরিচিত। মুসলমান দুনিয়ার যে প্রান্তে গোরস্থ হোক না কেন, চেহারাটা হবে ঐ কেন্দ্রাভিমূখী। সমাধিস্থ মুসলমানের পাশ দিয়ে যখন কোন মুসলমান হেঁটে যায়, তখন ফাতেহা পাঠের মাধ্যমে শাহী দরবারে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। সারকথা, এভাবে আল্লাহর নাম ও ধ্যান মুসলিম জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, নিশ্বাসে, বিশ্বাসে, কদমে কদমে ধ্বনিত হয়। উল্লিখিত সব বিষয়, আল্লাহর যিকির ও তার প্রতি মুসলিম সভ্যতার মোড় ফেরানোর প্রকৃতপক্ষে কতক বাহানা মাত্র। কোন সভ্যতার সামাজিক ব্যবস্থা, তার ভাষা, আচার-ব্যবহার ও তার দৈনন্দিন জীবন মুসলিম সভ্যতার ন্যায় আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর সম্যক উপস্থিতির বেশে কখনও ফুটে উঠেনি। ভারতীয় মুসলিম সভ্যতার প্রথম বিশ্বজনীন উপাদান আল্লাহর অস্তিত্বের বিশ্বাস ও অন্তরে তাঁর উপস্থিতি, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতীক ও নিদর্শন হিসেবে প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিভাত হয়।
টিকাঃ
১. সুরায়ে নিসা, আয়াত: ১
১. নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো
📄 সর্বজনীন নিদর্শন একত্ববাদের বিশ্বাস
মুসলিম সভ্যতার দ্বিতীয় বিশ্বজনীন নিদর্শন ও প্রতীক একত্ববাদের বিশ্বাস, যা তাদের আকায়েদ (ধর্মমত) থেকে আ'মাল (কর্মকান্ড) এবং ইবাদত-বন্দেগী থেকে উৎসব পালনাবধি স্তরে স্তরে পরিদৃষ্ট হয়। তাদের মসজিদের মিনার চূড়া হতে প্রত্যহ পাঁচবার এ মতাদর্শের ঘোষণা হয়, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ ইবাদত-বন্দেগীর উপযোগী নয়। তাদের ঘর-বাড়ি, মনোহর দৃশ্যভূমি সবই ইসলামী মূলনীতির ভিত্তিতে প্রতিমা পূজা ও বহু ইশ্বরবাদের নিদর্শন হতে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখা অত্যন্ত বাঞ্চনীয়। ছবি, ভাস্কর্য ও প্রতিমা তাদের জন্য একেবারেই নিষিদ্ধ। এমনকি মুসলিম শিশু কিশোরের খেলনাপাতিতেও তা কঠোরভাবে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ধর্মীয় উৎসবাদি হোক বা রাজকীয় আনন্দানুষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতা কিংবা ধর্ম গুরুর জন্ম দিনে পালন পতাকা উত্তোলন পর্ব, ছবি, প্রতিমূর্তি ও প্রতিমার সামনে মাথা ঝোঁকানো কিংবা তাদের পুষ্পমাল্যার্পণ মুসলিম জাতির জন্য সম্পূর্ণ হারাম ও তাদের সভ্যতার চেতনা পরিপন্থী। মুসলিম জাতি যেখানেই স্বীয় ইসলামী সভ্যতার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে উপর্যুক্ত কর্মাদি থেকে কঠোরভাবে দূরে থাকবে। উৎসব অনুষ্ঠানে শপথ ও অঙ্গিকার গ্রহণে, বয়জ্যেষ্ঠদের ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনে এবং বিনম্রতা প্রকাশে হিজাযী তাওহীদের সীমালঙ্ঘণ ও অন্য জাতির অনুকরণ ইসলামী চেতনা ও আদর্শ হতে বিচ্যুতির নামান্তর।
📄 তৃতীয় নিদর্শন, ভদ্রতা, মহত্ত্ব ও মানবজাতির সমতায় বিশ্বাস
ভারতীয় ইসলামী সভ্যতার তৃতীয় বিশ্বজনীন নিদর্শন হচ্ছে, মানুষের মর্যাদা, মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাস। সে বিশ্বাসের স্বাভাবিক ফলশ্রুতি হচ্ছে, মুসলমানগণ বর্ণ বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার অভ্যাস ও রীতি হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। মুসলমানগণ অন্যলোকের সাথে অবাধে খেতে প্রস্তুত, অপরকে নিজের খাদ্যে সঙ্গী করতে অভ্যস্ত। ভিন্ন মতের বহুলোক সংকোচহীনভাবে এক থালায় বসে আহার করে। একে অপরের উচ্ছিষ্ট খায় ও ঝুটা পানি পান করে। 'ধনী-গরীব কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে' এক সারিতে নামায আদায় করে। নিম্নবংশীয়, অথচ জ্ঞানে পারদর্শী ব্যক্তি ইমাম হতে পারবে আর উচ্চ বংশের ভদ্র-শিষ্ট ও উর্ধ্বতন আমীর-উমারাহগন তারই ইমামতিতে নামায পড়তে বাধ্য।