📄 দেশীয় পোষাকে বিদেশী শব্দভান্ডার
আমার ধারণা ছিল যে, উর্দু ভাষা আরবী, সংস্কৃতি, ফার্সী ও তুর্কী ভাষার সমন্বয়ে গঠিত এক মিশ্র ভাষা হলেও তার সিংহভাগ ব্যাপ্ত ছিল আরবী ভাষায়। এ ক্ষেত্রে আমি সে সব শব্দের সাথে পরিচিতি লাভ করি যা উর্দু ভাষার অন্তর্ভুক্ত হয়েও আসল আরবী রূপের পরিবর্তন ঘটেনি। উপরন্তু আমার ধারণা ছিল এ ধারাবাহিকতা উর্দুতে সীমাবদ্ধ ছিল যেহেতু উর্দুর সাথে আরবী ভাষা ও শব্দের সাজুয্য রয়েছে। অল ইন্ডিয়া রেডিও এর কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ, তাদের কারণে এ বিষয়ে আমার আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসার সৃষ্টি হয়। অনুসন্ধানের এই আবেগময় ও স্বতঃস্ফুর্ত যাত্রাপথে আমার প্রচুর অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। আবার এমন ব্যক্তিত্বের সাথেও আমার সাক্ষাৎ ঘটে যারা বাহ্যরূপ পরিবর্তন করে দেশীয় পোষাকে নিজেদের সুসজ্জিত করেছে। এ সংক্রান্ত আমার অনুসন্ধানলব্ধ অভিজ্ঞতার বিবরণী পাঠকদের উদ্দেশ্যে পেশ করছি।
মুদ্রা: আসুন, সর্বপ্রথম 'দাম' শব্দের দিকেই আমরা দৃষ্টি দিই। 'দাম' শব্দটি হিন্দী ও উর্দু উভয় ভাষায় ব্যয় ও ধন-দৌলতের অর্থে ব্যবহৃত হয়। মূলতঃ তা 'দিরহাম' আরবী শব্দ হতে চয়নকৃত। তবে আরবীতে তা কেবল ধন-দৌলতের অর্থেই ব্যবহৃত হয়। সচরাচর দিরহাম ও দীনার বলা হয়। এর সাথে 'কীরানত' শব্দটির ব্যাপারেও আমরা আলোচনা প্রবৃত্ত হতে পারি। অযোধ্যার প্রাচীন নথিপত্রে 'আনা' 'পাই' এর সাথে ছোট মুদ্রার বিনিময়ে এ শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এটা মূলতঃ আরবী 'কীরাত' হতে উদ্ভূত। 'আশরাফী' শব্দটিও আরবী হতে সংকলিত। সুবিখ্যাত আরব ক্যাপ্টেন ইবনে মাজেদ আসাদুল বাহার 'আল-ফাওয়ায়েদ ফি উসুলিল বাহার ওয়াল কাওয়ায়েদে' উল্লেখ করেন: এটা স্বর্ণ নির্মিত একটি মুদ্রার নাম। অতীতে যার ব্যাপক প্রচলন ছিল। এবং বর্তমানে তার প্রচলন অব্যাহত রয়েছে।
📄 বৈচিত্রপূর্ণ খাবার
শব্দের তত্ত্ব উদঘাটন করতে গিয়ে আমার অন্তর্দৃষ্টিতে ধরা পড়লো 'ফিরনী' শব্দটি; যা চিনি চাউলের আটা ও দুধের সাহায্যে প্রস্তুত করা হয়। পূর্বে তার নাম ছিল 'আল-মেহলবিয়্যাহ' যা বিখ্যাত আব্বাসীয় সেনাপতি মিহলব ইবনে আবি সফরাহ্ নামের সাথে সম্পৃক্ত। উপরন্তু মুহাম্মদ আল-খাওয়ারযমী বর্ণনা করেন যে, 'আল-ফারানী' রোগীদের সতর্কতামূলক খাবার হিসেবে ময়দার রুটি, দুগ্ধ, চিনির সংমিশ্রনে প্রস্তুত করা হয়। এসব খাবারের মধ্যে 'কলিয়া' এর প্রসঙ্গও উল্লেখ করা যেতে পারে। মাংস, ঝোল, ও সবজির সাহায্যে প্রস্তুত এক প্রকার উপাদেয় খাদ্য। যা মূলতঃ আরবী শব্দ 'কাল্লিয়া' থেকে নির্গত। কাবাব ও কালিয়া প্রায় এক। কেননা কাবাব শব্দটি মূলত 'আল-কাব্বু' থেকে নির্গত। যার অর্থ উল্টানো-পাল্টানো, তাই এই শব্দটি এমন খাদ্যের জন্য ব্যবহৃত হয় যা আগুনে উল্টিয়ে পাল্টিয়ে ভূনা হয়। আরবী ভাষায় 'কাবাবা' শব্দটি 'আমালুল কাবাব' অর্থে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ কাবাব বা ভূনা গোস্ত বানানো। এ প্রসঙ্গে 'শূরবা' শব্দটির কথা মনে পড়ে। মূলত তা ছিল 'শারবাহ্' যার অর্থ হচ্ছে পান করা ও এমন বস্তু যা একবারেই পান করা যায়।
📄 আরাম-আয়েশের আসবাব-পত্র
সালাফা ও হুক্কা শব্দদ্বয়ও খাঁটি আরবী। আরবরা সালাফা শব্দ দ্বারা আহারের পূর্বে নাস্তাকে বুঝিয়ে থাকে। ঘরের ফার্ণিচার এং অন্যান্য ভোগ-বিলাসিতার আসবাবাদিতেও আরবী শব্দের ছড়াছড়ি লক্ষ্য করার মত। 'কালীন' (কার্পেট) শব্দটিও 'আলকানী' থেকে উদ্ভূত। এটা 'কালীকালা' এর সাথে সম্পৃক্ত। 'কালীকালা' আর্মেনীয়ার একটি শহরের নাম। বিখ্যাত আরবী লেখক আবু আলী আল-কানী সে শহরে জন্ম লাভ করেন। 'মু'জামুল বুলদান' নামক গ্রন্থে ইয়াকুত আর রুমী লিখেন, 'কালী' নামের কার্পেটগুলো কালিকলা শহরেই তৈরী হতো। উচ্চারণ কঠিন হওয়াতে কেবল বলা হতো 'কালী'।
📄 নির্মাণ কুশলী
গৃহাভ্যন্তরীণ আসবাব পত্রে আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো গৃহ নির্মাতার প্রতি। কারণ গৃহ ও প্রাসাদ সুন্দর, দৃষ্টিনন্দন হওয়ার পেছনে তারই মেধা ও শ্রম বেশী। এক্ষেত্রে হিন্দি 'রাজ' শব্দটি আমাকে বিস্মিত করে দেয়। এটা মূলতঃ একটি মাত্র অক্ষরের পরিবর্তন সহকারে আরবী 'আর-রায' থেকে উদ্ভূত হয়েছে। আরবি ভাষায় তার অর্থ প্রধান মিস্ত্রী। তার মূলরূপ হল, 'আর-রায়েয'। এভাবে নিপুন কারিগরের ক্ষেত্রে ভারতবর্ষে মিস্ত্রী শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। যা মূলতঃ আরবী শব্দ 'মিসতিরীর' পরিবর্তিত রূপ। আরবী ভাষায় মিস্ত্রী বলা হয় ঐ কারিগরকে যে দেয়াল সমূহকে সোজা রাখার লক্ষ্যে সর্বদা নিজের মিসতার (রোলার) রাখে।