📄 চিন্তা, কল্পনা ও ভাবব্যঞ্জনায় পারস্পরিক বিনিময়
কোন সমৃদ্ধ, সুরুচিপূর্ণ ও মার্জিত ভাষার প্রভাব অন্যান্য ভাষা সমূহে বিস্তার লাভ করা সভ্যতা-সংস্কৃতির ইতিহাসে নতুন কোন ঘটনা নয়। মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে চিন্তা, কল্পনা, প্রকাশভঙ্গি ও লিখন পদ্ধতি পরস্পর বিনিময় হতে থাকে। জীবন ও উন্নতির প্রাকৃতিক নিয়মও তাই। যদি কোন ভাষা উৎকর্ষের স্বাভাবিক রীতি-নীতি উপেক্ষা করে অন্য ভাষা হতে লাভবান হওয়ার ধারাবাহিকতা বন্ধ করে দেয় এবং নিজেদের প্রাচীন ঐতিহ্যে আবদ্ধ থাকাকে গৌরব হিসেবে গ্রহণ করে নেয়; তাহলে সে যেন নিজেকে উৎকর্ষের পথ থেকে দূরে সরিয়ে সংস্কৃতির বন্ধনকে ছিন্ন করে ফেলল। এমন ভাষা জীবনের কাফেলা হতে অনেক দূরে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে সে ভাষা হয়ে যায় স্থির ও সীমিত। সাহিত্যিক, কবি ও শিল্পীদের পরিবর্তনশীল ও ক্রমবর্ধমান চিন্তাধারা এবং উন্নয়নের পথে ধাবমান জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার যোগ্যতা সে ভাষায় অবশিষ্ট থাকে না।
📄 দেশীয় পোষাকে বিদেশী শব্দভান্ডার
আমার ধারণা ছিল যে, উর্দু ভাষা আরবী, সংস্কৃতি, ফার্সী ও তুর্কী ভাষার সমন্বয়ে গঠিত এক মিশ্র ভাষা হলেও তার সিংহভাগ ব্যাপ্ত ছিল আরবী ভাষায়। এ ক্ষেত্রে আমি সে সব শব্দের সাথে পরিচিতি লাভ করি যা উর্দু ভাষার অন্তর্ভুক্ত হয়েও আসল আরবী রূপের পরিবর্তন ঘটেনি। উপরন্তু আমার ধারণা ছিল এ ধারাবাহিকতা উর্দুতে সীমাবদ্ধ ছিল যেহেতু উর্দুর সাথে আরবী ভাষা ও শব্দের সাজুয্য রয়েছে। অল ইন্ডিয়া রেডিও এর কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ, তাদের কারণে এ বিষয়ে আমার আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসার সৃষ্টি হয়। অনুসন্ধানের এই আবেগময় ও স্বতঃস্ফুর্ত যাত্রাপথে আমার প্রচুর অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। আবার এমন ব্যক্তিত্বের সাথেও আমার সাক্ষাৎ ঘটে যারা বাহ্যরূপ পরিবর্তন করে দেশীয় পোষাকে নিজেদের সুসজ্জিত করেছে। এ সংক্রান্ত আমার অনুসন্ধানলব্ধ অভিজ্ঞতার বিবরণী পাঠকদের উদ্দেশ্যে পেশ করছি।
মুদ্রা: আসুন, সর্বপ্রথম 'দাম' শব্দের দিকেই আমরা দৃষ্টি দিই। 'দাম' শব্দটি হিন্দী ও উর্দু উভয় ভাষায় ব্যয় ও ধন-দৌলতের অর্থে ব্যবহৃত হয়। মূলতঃ তা 'দিরহাম' আরবী শব্দ হতে চয়নকৃত। তবে আরবীতে তা কেবল ধন-দৌলতের অর্থেই ব্যবহৃত হয়। সচরাচর দিরহাম ও দীনার বলা হয়। এর সাথে 'কীরানত' শব্দটির ব্যাপারেও আমরা আলোচনা প্রবৃত্ত হতে পারি। অযোধ্যার প্রাচীন নথিপত্রে 'আনা' 'পাই' এর সাথে ছোট মুদ্রার বিনিময়ে এ শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এটা মূলতঃ আরবী 'কীরাত' হতে উদ্ভূত। 'আশরাফী' শব্দটিও আরবী হতে সংকলিত। সুবিখ্যাত আরব ক্যাপ্টেন ইবনে মাজেদ আসাদুল বাহার 'আল-ফাওয়ায়েদ ফি উসুলিল বাহার ওয়াল কাওয়ায়েদে' উল্লেখ করেন: এটা স্বর্ণ নির্মিত একটি মুদ্রার নাম। অতীতে যার ব্যাপক প্রচলন ছিল। এবং বর্তমানে তার প্রচলন অব্যাহত রয়েছে।
📄 বৈচিত্রপূর্ণ খাবার
শব্দের তত্ত্ব উদঘাটন করতে গিয়ে আমার অন্তর্দৃষ্টিতে ধরা পড়লো 'ফিরনী' শব্দটি; যা চিনি চাউলের আটা ও দুধের সাহায্যে প্রস্তুত করা হয়। পূর্বে তার নাম ছিল 'আল-মেহলবিয়্যাহ' যা বিখ্যাত আব্বাসীয় সেনাপতি মিহলব ইবনে আবি সফরাহ্ নামের সাথে সম্পৃক্ত। উপরন্তু মুহাম্মদ আল-খাওয়ারযমী বর্ণনা করেন যে, 'আল-ফারানী' রোগীদের সতর্কতামূলক খাবার হিসেবে ময়দার রুটি, দুগ্ধ, চিনির সংমিশ্রনে প্রস্তুত করা হয়। এসব খাবারের মধ্যে 'কলিয়া' এর প্রসঙ্গও উল্লেখ করা যেতে পারে। মাংস, ঝোল, ও সবজির সাহায্যে প্রস্তুত এক প্রকার উপাদেয় খাদ্য। যা মূলতঃ আরবী শব্দ 'কাল্লিয়া' থেকে নির্গত। কাবাব ও কালিয়া প্রায় এক। কেননা কাবাব শব্দটি মূলত 'আল-কাব্বু' থেকে নির্গত। যার অর্থ উল্টানো-পাল্টানো, তাই এই শব্দটি এমন খাদ্যের জন্য ব্যবহৃত হয় যা আগুনে উল্টিয়ে পাল্টিয়ে ভূনা হয়। আরবী ভাষায় 'কাবাবা' শব্দটি 'আমালুল কাবাব' অর্থে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ কাবাব বা ভূনা গোস্ত বানানো। এ প্রসঙ্গে 'শূরবা' শব্দটির কথা মনে পড়ে। মূলত তা ছিল 'শারবাহ্' যার অর্থ হচ্ছে পান করা ও এমন বস্তু যা একবারেই পান করা যায়।
📄 আরাম-আয়েশের আসবাব-পত্র
সালাফা ও হুক্কা শব্দদ্বয়ও খাঁটি আরবী। আরবরা সালাফা শব্দ দ্বারা আহারের পূর্বে নাস্তাকে বুঝিয়ে থাকে। ঘরের ফার্ণিচার এং অন্যান্য ভোগ-বিলাসিতার আসবাবাদিতেও আরবী শব্দের ছড়াছড়ি লক্ষ্য করার মত। 'কালীন' (কার্পেট) শব্দটিও 'আলকানী' থেকে উদ্ভূত। এটা 'কালীকালা' এর সাথে সম্পৃক্ত। 'কালীকালা' আর্মেনীয়ার একটি শহরের নাম। বিখ্যাত আরবী লেখক আবু আলী আল-কানী সে শহরে জন্ম লাভ করেন। 'মু'জামুল বুলদান' নামক গ্রন্থে ইয়াকুত আর রুমী লিখেন, 'কালী' নামের কার্পেটগুলো কালিকলা শহরেই তৈরী হতো। উচ্চারণ কঠিন হওয়াতে কেবল বলা হতো 'কালী'।