📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 পরোপকার

📄 পরোপকার


এ সব পীর-মাশায়েখ ও খানাকাহের মাধ্যমে অনেক আল্লাহর বান্দাদের অভাব বিমোচন হতো; অজস্র পরিবার ও ঘর-বাড়িতে জলে উঠতো প্রদীপ, গরম হতো চুলা ও উনুন। বিপুল সংখ্যক মানুষ খানকাতে খেয়ে উদরপূর্তি করতো, বিভিন্ন প্রকারের উপাদেয় খাবারের স্বাদ আস্বাদন করতো। সূফী সাধকদের খাবারের বিছানায় শত্রু-মিত্র, আত্মীয়-অনাত্মীয়, ধনী-দরিদ্র ও দেশী-বিদেশীর কোন ভেদাভেদ ছিল না। খাজা নিজামুদ্দীন আওলিয়া (রহ.) এর খাবারের আসরে মহার্ঘ ও বিপুল পরিমাণ খাদ্য আইটেমের কারণে প্রবাদতুল্য ছিল। সপ্তদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শেখ সাইফুদ্দীন সিরহিন্দী (রহ.) এর খানকায় প্রত্যেহ দু'বেলায় এক হাজারের বেশী লোক ইচ্ছা ও পছন্দ অনুযায়ী খাবার গ্রহণ করতো।¹ সাইয়েদ মুহাম্মদ সাঈদ আকন্দ প্রকাশ 'শাহ ভীক' নামক সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের চিশতী তরিকার এক সাধক সম্পর্কে তাঁর জীবনীকার বর্ণনা করেন যে, তাঁর যিক্র ও সাধনায় স্থায়ীভাবে প্রায় পাঁচশ'জনের ভক্তদল তথায় আসা-যাওয়ায় থাকত এভাবে প্রায় এক হাজার লোক তাঁর সাথে আহার গ্রহণ করতেন নিয়মিত। তিন হাজারী সৈন্যের মনসবদার ও দিল্লির সম্রাট ফররুখ শিয়রের অনুগ্রহভাজন জমিদার একদা খানকা সংস্কারের জন্যে সত্তর হাজার টাকা হাদিয়া পেশ করেন। তখন হুজুর ওগুলো আপাতত রেখে দিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার নির্দেশ দেন। বিকাল বেলা মিস্ত্রিদের নির্মাণ কাজ আরম্ভ করা হবে। রওশনদ্দৌলা যখন বিশ্রাম নিতে চলে গেলেন, শাহভীক তখন দরবেশদের ডেকে সমুদয় অর্থ আম্বালা, থানেশ্বর, সিরহিন্দ ও পানিপথ শহরের বিধবা নারী ও গরীব-দুঃখীর গৃহে পাঠিয়ে দেন।¹

এমনকি একটি টাকা অবশিষ্ট ছিল না। অতপর তাঁকে বলেন, আপনার প্রদত্ত টাকাগুলো নিঃস্ব ও সাধকদের দেয়াতে আপনিও মহাপুণ্যের অধিকারী হয়েছেন। খানকার নির্মাণকাজে আদৌ কি সে সওয়াব অর্জিত হতো? আমার মত সাধারণ মানুষের জন্য প্রাসাদুপম অট্টালিকার কী দরকার? একদা সম্রাট মুহাম্মদ ফররুখ শিয়র নওয়াব রাওশনদ্দৌলা ও নওয়াব আবদুল্লাহ্ খানের পক্ষ থেকে পত্রাবলী ও তিন লাখ টাকার চেক আসে। কিন্তু হুজুরের নির্দেশক্রমে সমুদয় অর্থ পার্শ্ববর্তী এলাকার গরীব-দুঃখীদের মাঝে বণ্টন করে দেয়া হয়। মাওলানা মানাযির হাসান গীলানী (রহ.) সঠিক বলেছেন: 'ইসলামের এসব সূফীদের খানকাহ সমূহ ধনী ও নিঃস্বদের মাঝে সেতু বন্ধনের কাজ দিতো। এসব বুযুর্গদের দরবার এমন ছিল যে, ক্ষমতাসীন রাজা-বাদশাহগণও কর প্রদান করতেন। সুলতানুল মাশায়েখের ঘটনা পর্যালোচনা করুন। যুবরাজ খিযির খান পর্যন্ত সে দরবারে সেবক হিসেবে নিয়োজিত থাকতেন। সুলতান আলাউদ্দীন সমগ্র ভারতবর্ষ থেকে কর আদায় করতেন। কিন্তু একটি কোষাগার এমনও ছিল যেখানে তাঁকেও রাজস্ব প্রদান করতে হত। এ খানকাহ হতে দেশের সাধারণ গরীব-মিসকীনদের নিকট তাদের ন্যায্য অংশ পাঠানো হতো।

এটাই নিম্নের প্রসিদ্ধ বাক্যের মর্মার্থ: 'মালে সুফী সাবিল আস্ত' 'অর্থাৎ সুফী দরবেশদের অর্থ সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফকৃত।' ধনী-গরীবের এ মোহনা অর্থাৎ নিঃস্বার্থ সূফী-দরবেশদের দরবারে ধনী-নির্ধন আমীর-ফকীর উভয়ই একই মর্যাদায় হাযির থাকতেন। তাতে গরীব ও দুঃস্থ মুসলমানদের বিপুল অভাব লাঘব হতো। ইসলামী যুগের কোন কাল এবং তখনকার ভারতবর্ষের এমন কোন এলাকা ও প্রদেশ ছিল না যেখানে সত্যবাদিতা ও আত্মশুদ্ধিতার এ দল নবীজির অপূর্ব বাণী 'যাকাতের মাল বিত্তবানদের কাছ থেকে নিয়ে ফকীর-মিসকীনদের নিকট পৌঁছিয়ে দাও।" সে মুতাবিক নিবেদিত প্রাণ ছিলেন না। বিশেষতঃ আমীর-ওমরাহ ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের যে সব বুযুর্গদের কোন না কোন কারণে প্রভাব ছিল সেখানে গরীব দুঃখীদের ভাগ্য পরিবর্তন না হয়ে পারেনি।

টিকাঃ
১. নুযহাতুল খাওয়াতির, ৫খন্ড।
১. মানযির আহসান গিলানী, নিযাম-ই-তা'লীম ওয়া তারবিয়াত, ২য় খন্ড, পৃ.২২১-২।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 মানবতার আশ্রয়স্থল

📄 মানবতার আশ্রয়স্থল


এ সব সুফীয়ায়ে কেরামের শিক্ষা ও সাহচর্যের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ ও জাতীয়তা নির্বিশেষে সব মানুষকে ভালবাসার, তাদের দুঃখে ব্যথিত হওয়ার উদ্দীপনা তৈরী হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিম্নোক্ত অমরবাণীর প্রতি তাঁদের আমল ছিল সুদৃঢ়ঃ "সৃষ্টিকুল আল্লাহর পরিবার-পরিজন সদৃশ। অতএব, তাদের মধ্যে সেই আল্লাহর নিকট অধিকতর প্রিয় যে আল্লাহর পরিবারের নিতান্ত হিতকারী।" এসব পীর-মাশায়েখ ছিলেন গোটা দুনিয়ার মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল। হযরত খাজা নিযামুদ্দীন আওলিয়া (রহ.) একদা নিজের অবস্থা বর্ণনা করে বলেন, 'কোন মানুষ যখন আমার কাছে এসে নিজের সমস্যাবলী ব্যক্ত করে তখন আমিও তাঁর মত ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। কেয়ামতের দিন পরের সন্তুষ্টি ও সেবার ইচ্ছার চাইতে অধিকতর মূল্যবান আর কোন আমল থাকবে না।' যার ফলে এ সব খানকায় ভগ্নহৃদয়ের অধিকারী মানুষের আশ্রয় মিলতো, মিলতো ব্যথার উপশমও। যারা সরকার, সমাজ, গোষ্ঠী কর্তৃক বিতাড়িত হতো, আত্মীয়-স্বজন এমন কি অনেক সময় নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের কাছেও হত উপেক্ষিত; তারা সে সব বুযর্গদের পায়ে লুটিয়ে পড়ত। ঘরের যাবতীয় আরাম-আয়েশ তথায় উপভোগ করত। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মনঃকষ্ট, উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতা সেখানে দূরীভূত হতো। আহার, ঔষধ, দয়া-যত্ন সবই ছিল সেখানে। হযরত নিযামুদ্দীন আওলিয়া (রহ.) কে তাঁর পীর-সাহেব দিল্লি অভিমূখে বিদায় দেয়ার সময় বলেন যে, তুমি হবে এক ছায়াময় বৃক্ষ; যার ছায়াতলে খোদার সৃষ্টিরাজি সুখ পাবে।¹ সত্যিই ইতিহাস সাক্ষী যে, সত্তর বছর অবধি দিল্লি ও দূর-দূরান্ত থেকে আগত লোকগণ সে বৃক্ষের ঘণ ছায়াতলে আরাম-আয়েশ উপভোগ করে। এ সব সূফী-দরবেশদের অবদানে ভারতবর্ষে শতাধিক স্থানে এমন ছায়াময় বৃক্ষ বিদ্যমান ছিল যার ছায়াতলে পরিশ্রান্ত মুসাফির ও পথভ্রষ্ট কাফেলা এক নব জীবনের সন্ধান পেতো।

টিকাঃ
১. মানযির আহমদ গিলানী, মুসলমানোকা নিযামে তা'লীম ওয়া তারবিয়াত, ২খন্ড, পৃ.২২০।

ফন্ট সাইজ
15px
17px