📄 জীবন ও সমাজের উপর প্রভাব
যারা পীর-মাশায়েখদের হাতে বায়'আত গ্রহণ করতো তাদেরকে তাঁরা যাবতীয় পাপ থেকে তাওবা করাতেন। আল্লাহর অনুকরণ ও রাসূলের অনুসরণের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিতেন। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, দুশ্চরিত্র, নির্যাতন, সীমালঙ্গন, জনগণের তথা বান্দার হক সমূহের বিনষ্টকরণ থেকে বিরত থাকার তাকিদ দিতেন। সচ্চরিত্র অবলম্বন, দুশ্চরিত্র (তথা-হিংসা বিদ্বেষ, অহঙ্কার, সম্পদের লোভ ও সম্মানপ্রীতি) বর্জন ও শান্তি স্থাপনের প্রতি হিতাকাঙ্ক্ষা, সমাজ হিতৈষণা, জনসেবা, পরোপকার, অন্যের অগ্রাধিকার ও অল্পেতুষ্টির শিক্ষা দিতেন। উপরন্তু এই বায়আত সাধারণতঃ স্বাভাবিক ভাবে এক বিশেষ ও গভীর সম্পর্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলো- তিনি সকল আগন্তুক ও যাত্রীর প্রতি উপদেশ দিতেন। তাদের অন্তরে আল্লাহর প্রেম-প্রীতি, তাঁর সন্তুষ্টির প্রতি উৎসাহ, উদ্দীপনা, অনুপ্রেরণা এবং অবস্থার সংশোধনের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির প্রয়াস চালাতেন। তাঁর একনিষ্ঠতা, অনুপম চরিত্র, শিক্ষা, তত্ত্বাবধান ও সান্নিধ্যের যে প্রভাব স্বাভাবিক জীবন ও সমাজে পড়েছিল তার এক বাস্তব চিত্র নিম্নে প্রদত্ত হল। ভারতের সুপ্রসিদ্ধ ইতিহাসবেত্তা কাজী যিয়াউদ্দীন বারনী আলাঈ যুগের আলোচনা করতে গিয়ে লিখেন :
"সুলতান আলাউদ্দীন আমলে মাশায়েখদের মধ্যে শায়খুল ইসলাম নিজামুদ্দীন, শায়খুল ইসলাম আলাউদ্দীন, শায়খুল ইসলাম রুকুন উদ্দীনের মাধ্যমে তাসাউফের সিংহাসন সজ্জিত ছিল। পৃথিবী তাঁদের বরকতময় শ্বাস-প্রশ্বাস দ্বারা আলোকিত ও প্রাণবন্ত হয়। সমগ্র বিশ্ব তাঁদের কাছে সানন্দে বায়'আত ও তাওবা গ্রহণ করে। বিপুল সংখ্যক পাপাচারী, বেনামাযী মন্দকাজ বর্জন এবং স্থায়ী মুসল্লির তালিকাভূক্ত হয়ে যায়। আন্তরিকভাবে তারা ধর্মীয় কাজ-কর্মে আগ্রহ প্রকাশ করে। যার ফলশ্রুতিতে তাদের তাওবা খাঁটি ও যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়। পার্থিব জগতের প্রলোভন ও আসক্তি (যা মূলতঃ মানুষের লাভ ও লোক পুজার উৎস) পীর- মাশায়েখদের সচ্চরিত্র ও দুনিয়া বিমূখতা দেখে তা তাদের অন্তর থেকে হ্রাস পেতে থাকে। বুযুর্গদের ইবাদত ও পারস্পরিক সম্পর্কের বরকতে লোকদের মানসপটে স্থান পেয়েছে সততা ও অকৃত্রিমতা। তাঁদের মহৎ চারিত্রিক গুণাবলী ও চেষ্টা, সাধনার প্রভাবে খোদাভীরুদের অন্তরে স্বভাব- চরিত্র পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে।"
তিনি আরো বলেন: "আলাঈ আমলের শেষ দিকে সুরা-মদ, প্রেম- প্রণয়, পাপ-অনাচার, জুয়া, বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার নামও অধিকাংশ মানুষের মুখে শোনা যায়নি। বড় বড় পাপ সমূহ মানুষের কাছে কুফর সদৃশ মনে হত। মুসলমানরা পরস্পর লজ্জার বশবর্তী হয়ে প্রকাশ্যে সুদের লেনদেন ও মালামাল মজুদ করতে সাহস করত না। দোকানদারের মিথ্যা কথন, মাপে ও ওজনে কম দেয়া ও ভেজাল মিশ্রণের অবসান ঘটলো।¹"
তরীকতের মাশায়েখ স্বীয় নব মুরিদগণের প্রতি লেন-দেনে স্বচ্ছতা, পাওনাদারদের প্রাপ্য পরিশোধ আর তার দায়িত্বে যদি অন্যের কিছু দাবি- আবদার অসম্পূর্ণ থাকে তা আদায় করার বিশেষ তাগিদ দিতেন। সুলতানুল মাশায়েখ খাজা নিজামুদ্দীনকেও (রহ.) স্বীয় শায়খ খাজা ফরীদুদ্দীন গঞ্জশকর (রহ.) এ মর্মে তাগিদ দেন যে, "প্রতিপক্ষকে খুশি করা ও পাওনাদারকে সন্তুষ্ট রাখতে যেন বিন্দুমাত্র অবহেলা না করো।" তিনি জনৈক ব্যক্তির কাছে বিশ জিতলের ঋণী ছিলেন। আরেকজন থেকে ধার নেয়া একটি কিতাব হারিয়ে ফেলেছিলেন। অতঃপর তিনি দিল্লি পদার্পন করে প্রথম ব্যক্তির নিকট ঋণ পরিশোধ করার জন্য গেলে সে বলল, মনে হয় আপনি মুসলমানের কাছ থেকে আসছেন। দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে গেলে তিনি সে বলল, হ্যাঁ আপনি যেখান থেকে আসছেন সেখানকার ফলাফল এরূপ হওয়াই বাঞ্চনীয়।¹"
এসব পীর-মাশায়েখদের সাহচর্য ও পরিচর্যার ফলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আত্মীয়-অনাত্মীয়ের পার্থক্য ব্যতিরেকে এক অপরের সেবা-শুশ্রুষা ও সহযোগিতা করার আগ্রহ ও মানসিকতা সৃষ্টি হয়। হযরত সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহ.) বিপুল সংখ্যক সফরসঙ্গী নিয়ে যখন হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতেন, দীর্ঘ ও কষ্টকর সফরে প্রয়োজন বশত কোন কাজ সম্পাদন করতে হলে তাতে তিনি লজ্জাবোধ করতেন না। তাঁর এই সফর ছিল গঙ্গা নদীর নৌপথে। মির্যাপুর ঘাটে ছিল তুলাভর্তি নৌকা। তুলার মালিক শ্রমিকদের অপেক্ষায় ছিল; যেন তুলাগুলি বোঝাই করে গুদামে নিয়ে যাওয়া হয়। সাইয়্যেদ সাহেব সাথীদের নিয়ে তুলার বস্তা নামিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলে শত শত মানুষ নৌকায় ঝাপিয়ে পড়ে এবং দু'ঘন্টার মধ্যে নৌকা খালি করে তুলা গুদামের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। জনসাধারণ এই দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে যায়। পরস্পর বলাবলি করতে লাগল "এরাতো আজব লোক! তুলার মালিকের সাথে কোন পূর্বপরিচিতি নেই; একমাত্র আল্লাহর খাতিরেই তারা অনেক কাজ বিনা পারিশ্রমিকে সম্পন্ন করে দিল। নিঃসন্দেহে আল্লাহ ওয়ালা বুযুর্গ হবে"।²
ধারাবাহিকভাবে এই পীর-মাশায়েখদের কৃতিত্ব ও অবদানের বর্ণনা দেওয়া অতি দুষ্কর। তজ্জন্যে প্রয়োজন বিশাল গ্রন্থের। ভারতবর্ষে সমৃদ্ধ ও সুশীল প্রাণবন্ত সমাজ গঠনে (যা ঐ রাষ্ট্রের প্রধান নৈতিক ও চারিত্রিক সম্বল; নিঃস্বার্থ মানবতার সেবক ও সৎ শাসকদের প্রাণকেন্দ্র; এবং যার দরুণ ভারত ভূ-খন্ড প্রতি সঙ্কটপূর্ণ মুহূর্তে সুযোগ্য মনীষীদের উপহার লাভ করে) সেই নিঃস্বার্থ সংস্কারকগণ ও চরিত্র বিনির্মাণকারীদের বিরাট অবদান রয়েছে। বর্তমান শতাব্দীর ঘটনাবলী বিশদ বিবরণ তরীকতের মাশায়েখ আলোচনায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর অন্যতম পথপ্রদর্শক হযরত সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহ.) এর ধর্মীয় ও চারিত্রিক প্রভাবের আলোচনা দৃষ্টান্ত স্বরূপ পেশ করছি। সাইয়্যেদ সাহেবের হজ্ব যাত্রার আলোচনা পর্বে জনৈক ইতিহাসবিদ বলেনঃ "একদা কলকাতায় এক মুহূর্তের মধ্যে মদ বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। দোকানদাররা ইংরেজ সরকারের কাছে অভিযোগ জানায়, আমরা বিনা দ্বিধায় সরকারের কর আদায় করে থাকি কিন্তু অধুনা আমাদের দোকান-পাট অচল। জনৈক বুযুর্গ সদলবলে এই নগরে পদার্পন করলে শহর গ্রামের সমুদয় মানুষ তাঁর হাতে মুরীদ হয়ে যায় এবং প্রত্যহ মুরীদ হতে চলেছে। তারা যাবতীয় নেশাদায়ক দ্রব্যাদি থেকে তাওবা করছে যার ফলশ্রুতিতে তারা এখন আমাদের মদ্য বিপনীর ধারে কাছেও যায় না।¹"
টিকাঃ
১. বামে সূফীয়া, পৃ. ১৯৮-২০২
১. ফাওয়াইদুল ফুয়াদু, পৃ.১৪
২. সীরাতে সাইয়েদ আহমদ শহীদ, পৃ. ২৪৯
১. ওকায়ে আহমদী
📄 নির্ভিকতা ও সত্য কথন
সেই আধ্যাত্মিক পথ প্রদর্শকদের এক অনন্য খিদমত ও কৃতিত্ব ছিল- তাঁরা স্বৈরাচারী সম্রাট জালিম শাসকদের ভুল-ত্রুটি, ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ ও সীমালঙ্ঘনকারী বিষয়াবলীর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাদের সম্মুখে হক কথা ব্যক্ত করেন এবং তাঁদের সাথে ভিন্ন মত পোষণ করে সরকার ও সমাজকে বিপজ্জনক পরিণতি ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন। তাঁদের নিকনির্দেশনা, প্রশিক্ষণ, অকৃত্রিম ও নিখুত গুণাবলীর দরুণ জনমনে সাহস, বিক্রম, নিরাপত্তাবোধ ও বীরত্ব সৃষ্টি হয়। ভারতবর্ষের ইসলামী যুগে এরূপ অজস্র দৃষ্টান্তও রয়েছে যে, পীর-মাশায়েখ ও তাঁদের খলিফাগণ মাথায় কাফন বেঁধে এবং নিজের জীবন বিপন্ন করে "জালিম সরকারের বিরুদ্ধে সত্য কথনই সর্বোত্তম জিহাদ” এ হাদীসটি মুতাবিক আমল করতে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। নিম্নে মুহাম্মদ তুঘলকের শাসনামলের মাত্র দু'টি ঘটনা উল্লেখ করা হলো:
মুহাম্মদ তুঘলকের শাসনামলে শেখ কুতুব উদ্দীন মুনাওয়ার ছিলেন এক নিভৃতচারী ও চিশতী তরিকার সাধক ও দরবেশ। একদা বাদশাহ্ তাঁর এলাকায় আসলে তিনি অভিবাদন জানানোর জন্যে উপস্থিত হননি। ফলে বাদশাহ তাঁকে দিল্লিতে তলব করেন। তিনি রাজপ্রাসাদের অলিন্দে পদার্পন করলেই সেনাপতি, অমাত্য ও প্রহরীগণ দু'প্রান্তে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো ছিল। তাঁর পুত্র নুরুদ্দীন ছিল অল্প বয়সের। শাহী দরবারের আড়ম্বরতা কখনো সে প্রত্যক্ষ করেনি বিধায় সে ভয় পেয়ে যায়। শেখ কুতুবউদ্দীন তাকে ডেকে বলেন, বাবা নুরুদ্দীন! 'আল আযমাতু লিল্লাহ্' অর্থাৎ মহত্ত্ব ও জাঁকজমক কেবল মাত্র মহান আল্লাহ তা'য়ালার জন্য সংরক্ষিত। সাহেবজাদা বর্ণনা দেন যে, এ বাক্য শ্রবণমাত্র আমার অন্তরে যেন এক বিশেষ শক্তি-প্রবাহ সৃষ্টি হয়। ভয়-ভীতি দূরীভূত হয়ে যায়। যে সব সেনাপতি ও শাসকবৃন্দ তথায় দাঁড়ানো ছিলেন তাদেরকে আমার মেষ সদৃশ মনে হল। বাদশাহ অভিযোগ করলেন, আমি আপনার কাছে গেলে আমার কোন খোঁজ-খবর নেননি; আমার প্রতি সাক্ষাতের মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন করেননি। উত্তরে শেখ বললেন, আমার মত একজন নগন্য দরবেশ আপনার সাক্ষাত করার অযোগ্য মনে করি, নির্জনে বসে বাদশাহ ও মুসলমানদের জন্য দোয়ায় মনোনিবেশ থাকি। অতএব, আমাকে অপারগ মনে করবেন। সাক্ষাৎ পর্ব শেষে সম্রাট এক আমীরকে বলেন, যেসব বুযুর্গের সাথে আমার সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছে এবং যাদের সাথে আমি করমর্দন করেছি তাঁদের হাতে ছিল এক ধরনের কম্পন ও শিহরণ (বিনয় ভাব)। কিন্তু শেখ মুনাওয়ার এত শক্ত ও স্বাভাবিকভাবে করমর্দন করেন যে, তাঁর হাতের শিহরণের রেশ ও চিহ্ন বলতে নেই। বাদশাহ তাঁর খিদমতে একলাখ টংকা (তৎকালীণ মুদ্রা) উপঢৌকন পেশ করেন। শেখ আশ্চর্য হয়ে বলেন, সুবহানাল্লাহ্! (আল্লাহ কত মহান/ কত পবিত্র!) দরবেশের জন্য দু' সের চাল, ডাল ও এক পয়সার ঘিই যথেষ্ট। সে এত সহস্র মুদ্রা দিয়ে কি করবে? অনেক প্রচেষ্টা ও কৌশল চালিয়ে এমনকি বাদশাহ মনক্ষুন্ন হবেন একথা বললে পরিশেষে তিনি দু'হাজার টংকা গ্রহণ করেন। তাও তিনি তরীকতের সাথীদের ও নিঃস্ব-অনাথদের মাঝে বণ্টন করে দেন।¹
দ্বিতীয় কাহিনী মাওলানা ফখরুদ্দীন রাযী (রহ.) এর। তিনি সম্রাটের সাহচর্য থেকে দূরে থাকা পছন্দ করতেন। তিনি বারংবার বলতেন যে, আমার শির ওই ব্যক্তির দরবারে কর্তিত ও পতিতাবস্থায় দেখতে পাচ্ছি। অর্থাৎ হক কথা বলা থেকে আদৌ পিছপা হবনা, আর তিনিও আমাকে রেহাই দেবেন না। পরবর্তীতে বাদশাহর দরবারে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাদশাহ কিছু নসীহত করতে বললে তিনি বলেন, রাগ দমন করুন। বাদশাহ জানতে চাইলেন, কোন ধরণের রাগ? তিনি বলেন, পশু সুলভ রাগ। তাতে বাদশাহর চেহারা মলিন হয়ে যায় তবে কিছু বলেননি। মাওলানা সাহেবকে বাদশাহ নিজ প্লেটে শরীক করেন এবং স্বহস্তে কিছু গ্রাসও তুলে দেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি আহার সম্পন্ন করেন। অতঃপর বাদশাহ তাঁকে বিদায় দেন।¹
এসব পীর-মাশায়েখ, স্বৈরাচারী রাজাদের শাসনামলে নিজেদের নিস্বার্থপরতা, নির্ভিকতা ও সত্য কথা বলার প্রথা চালু রাখেন। স্বাভাবিক অবস্থায় উলামা-মাশায়েখকে রেহাই না দিলেও তাঁদেরকে দেয়া হত এক বিশেষ সুযোগ। যাতে ফরয আদায় করতে পারে সে সুযোগ দেয়া হত। মুসলিম শাসনের পতনকালে দিল্লির পীর মাশায়েখগণ নিজের ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্যকে হাতছাড়া হতে দেননি। সম্রাট শাহ আলম একদা খাজা মীর দরদ (রহ.) এর যিক্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। ব্যথার কারনে পা দুটো লম্বা করে দেন। কিন্তু সে বেআদবী খাজা সাহেবের সহ্য হলোনা। অবশেষে তিনি বলেনঃ আপনার এই আচরণ ফকীরের অনুষ্ঠানের নিয়ম বহির্ভূত। বাদশাহ অপারগতা প্রকাশ করে ক্ষমা চান। প্রত্যুত্তরে খাজা সাহেব বললেন, আপনি যদি অসুস্থই হন তাহলে কষ্ট করে এখানে আসার প্রয়োজন কী?²
টিকাঃ
১. সীয়ারুল আউলিয়া, পৃ.২৫৩-৫
১. সীয়ারুল আউলিয়া, পৃ.২৭১-২
২. গুল-ই-রা'য়না, পৃ.১৭১।
📄 সাধনা ও স্বাবলম্বন
এসব সূফী দরবেশ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পদ, সরদার ও বিত্তবানদের মূল্যবান উপঢৌকন ও ভূসম্পত্তি গ্রহণ করা থেকে প্রায় বিরত থাকতেন। তাঁরা সাধনা, আত্মনির্ভরশীলতা, অল্পতুষ্টি ও আল্লাহ ভরসা, আত্মপ্রত্যয়, আত্মবিশ্বাস ও আত্মপরিচিতির এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন যা ভারতীয় সমাজে কর্মদক্ষতা, অপূর্ব সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার গুণাবলী ও উপাদান সমূহের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। তাঁরা মানবতার সুনাম ও সুখ্যাতিকে সতত সুদৃঢ় ও অক্ষুন্ন রাখেন লাভ-লোকসানের বিপনিতে, যেখানে মানুষের ক্রয়- বিক্রয়ও হয়ে থাকে। তাঁদের জীবনের নীতিমালা ও শ্লোগান ছিল নিম্নরূপ:
"আমি স্বীয় ফকিরী পোষাককে রাজা-বাদশাহদের মুকুটের বদলে প্রদান করতে প্রস্তুত নই। আমি আমার দরিদ্রতাকে সুলাইমানী রাজত্বের বিনিময়ে হস্তান্তর করতে রাজী নই। দারিদ্র্যের কষাঘাতে অন্তরে আমি যে তৃপ্তি পেয়েছি, তা রাজা-বাদশাহদের আরাম আয়েশের বিনিময়ে আদৌ অর্পন করব না।"
ভারতবর্ষে সূফীবাদ ও তাসাউফের ইতিহাস সাধনা, আত্মপ্রত্যয়, আত্মপরিচিতি, পরার্থ ও আত্মোৎসর্গের রোমাঞ্চকর ঘটনাবলী দ্বারা পরিপূর্ণ ও ব্যাপৃত। কোন তরীকতের সিলসিলা এবং তাসাউফের ইতিহাস সেসব আদর্শ থেকে শূন্য নয়। তবে এ ক্ষেত্রে মাত্র দু'শতাব্দীর (ত্রয়োদশ-চতুর্দশ) কতিপয় ঘটনাবলী প্রদত্ত হলো যা সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহের সাথে সম্পর্কিত। যেখানে বস্তুবাদ ও ভোগবাদ স্বীয় শিকড়কে মযবুত করার সুযোগ পেয়েছে। নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া সিলসিলায় হযরত মির্যা জানে জানাঁ দেহলভী (রহ.) নামক এক বুযুর্গ ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পূর্বে তদানীন্তন দিল্লির বাদশাহ সংবাদ পাঠান যে, মহান আল্লাহ তা'য়ালা আমাকে বিশাল রাজত্ব দান করেছেন; আপনি তাঁর কিছু অংশ গ্রহণ করুন। উত্তরে তিনি বললেন, মহান আল্লাহ সপ্ত পৃথিবীকে 'মাতা'উদ্দুনিয়া কুলীল' তথা পার্থিব সামগ্রী ক্ষুদ্র ও সীমিত বলে ঘোষণা করেন। অতএব, এক সপ্তমাংশের ন্যূনতম অংশ আপনার কর্তৃত্বে এলে আমি সেদিকে লোভের হস্ত সম্প্রসারণ করার প্রয়োজন কী? একদা নওয়াব আসিফ জাহ বিশ হাজার টাকা হাদিয়া দিলে তিনি তা প্রত্যখ্যান করেন। নওয়াব তা গরীবদের মাঝে বণ্টন করতে বললে তিনি বলেন, সে যোগ্যতা আমার নেই। এখান থেকে বেরিয়ে আপনি নিজেই বন্টন করতে থাকুন, ঘরে পৌঁছতে পৌঁছতে বিলি হয়ে যাবে অথবা ওখানে গিয়ে বন্টন সমাপ্ত করুন।
টুংকু রাজ্যের শাসক নওয়াব মীর খান একদা হযরত গোলাম আলী দেহলভী (রহ.) এর খানকাহ্ শরীফের বার্ষিক ব্যয় নির্বাহের জন্য একটি মোটা অংকের অনুদান দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করলে তিনি বলেন: 'দরিদ্রতা ও সন্তুষ্টির মুখোশ উন্মোচন করতে চাই না। নওয়াব মীর খানকে জানিয়ে দাও, রিস্ক একমাত্র আল্লাহর হাতে। একদা হযরত মাওলানা ফযলে রাহমান গঞ্জেমুরাবাদী (রহ.) (মৃত্যু: ১৩১৩ হি.) এর দরবারে এক গভর্ণরের আগমন ঘটে। তিনি হুজুরের মুখে চরিত্র সংক্রান্ত বয়ান শুনে মুগ্ধ হয়ে বল্লেন, হুজুর! আপনার সম্মতি পেলে সরকারী তহবিল থেকে আপনার খানকার নামে কিছু অনুদান বরাদ্দ করে দিব। উত্তরে তিনি বলেন, "আমি আপনাদের সরকারী অর্থ নিয়ে কী করব? আল্লাহ তা'য়ালার অনুকম্পায় আমার সম্বল হল- রশির তৈরী একটি খাঁটি, মৃত্তিকার দু'টি লোটা ও দু'টি কলসি। আমার শিষ্যদের মধ্যে কেউ কেউ ভুট্টা নিয়ে আসে; তা দিয়ে রুটি বানানো হয়। আমার পত্নী অল্প শাক-সবজী বা ডাল রান্না করে; তা দিয়ে খাবার সেরে নিই। হযরত মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ সাহেব বলেন, রামপুর প্রশাসক নওয়াব কলবে আলী খান একদা আগ্রহ ব্যক্ত করেন যেন রামপুরের মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা ফযলুর রহমান সাহেব তথায় তাশরীফ নেন। সে ক্ষেত্রে তিনি নওয়াব সাহেবকে বলেন, আপনি কী নযরানা পেশ করবেন? তিনি বললেন, একলাখ টাকা। তখন মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ্ সাহেব মুরাদাবাদ পৌঁছে আরয করেন, হুজুর! রামপুরে তাশরীফ নেন। সেখানকার প্রশাসক নওয়াব কলবে আলী খান আপনার অন্ধ ভক্ত। তদুপরি এক লাখ টাকা হাদিয়া দেবেন। হুজুর স্বাভাবিক নিয়মে সংলাপ করতে থাকেন। কিন্তু এ প্রসঙ্গে আলাপ হলে তা সাধারণ কথা রূপে উড়িয়ে দেন এবং বলেন, আরো মিঞা! লাখ টাকা ডাস্টবিনে নিক্ষেপ কর এবং জেনে রেখো: 'যে অন্তরে দয়ার্দ্রতার প্রকাশ পায়, সে অন্তর রাজকীয় অর্থভান্ডারের চাইতেও উত্তম।'"
টিকাঃ
১. নুযহাতুল খাওয়াতির, ৫খন্ড।
📄 লেখা-পড়ায় আত্মমগ্নতা
পঠন-পাঠনে প্রাচীন যুগের শিক্ষকদের মনোযোগ ও আত্মমগ্নতা এত গভীর ছিল যে, বাস্তব দৃষ্টান্ত ও ঘটনা বর্ণনা করা ছাড়া তা কল্পনাও করা যায় না। পঠন পাঠনই তাদের আত্মার খোরাক, ইবাদত ও জীবনের একমাত্র ব্রতে পরিণত হয়েছিল। জীবনের দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতম সময় রাত-দিন একাকার করে তারা লেখা-পড়ায় আত্ম নিমগ্ন থাকতেন। আলেমকুল শিরোমনি আল্লাম ওজীহুদ্দীন গুজরাটী ৬৫/৬৭ বছর পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছেন। মৌলানা আবদুস সালাম লাহোরী, মোল্লা আবদুল হাকীম শিয়ালকোটী, মৌলানা আলী আসগর কন্নোজী এদের প্রত্যেকের শিক্ষকতার সময় ছিল ৬০ বছর। মৌলানা আহমদ আমীটভী যিনি মোল্লা জিয়ূন নামে সমধিক পরিচিত জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দরস দিয়ে গেছেন।
শিক্ষকদের সবটুকু সময় (মানবিক প্রয়োজন ও অল্প বিশ্রাম ব্যতীত) দারস ও তাদরীসেই কাটতো। কোন কোন আলেমতো খাবার সময় এমনকি চলাফেরার সময়ও পড়াতেন। মোল্লা আবদুল কাদের বাদাউনী নিজেদের উস্তাদ আবদুল্লাহ বাদাউনী সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি যখন সওদা করতে বাজারে যেতেন তাঁর পেছনে পেছনে ছাত্রদের একটি বিশাল জামা'আত থাকতো। সেই অবস্থাও তিনি তাদের পড়াতেন। শেষযুগের এক প্রখ্যাত আলেম ও শিক্ষক মাওলানা আবদুল হাই ফিরিঙ্গী মহল্লী ফজরের নামাযের পূর্বে কিছু ছাত্রদের সময় দিতেন এবং একটি ক্লাস নিতেন।¹
টিকাঃ
১. মুন্তাখাবুত তাওয়ারীখ, পৃ.৫৬