📄 পরিচ্ছন্নতা ও উন্নত জীবনধারা
উপরন্তু মুসলমানগণ পরিচ্ছন্নতা ও উন্নত জীবনধারার সাথে ভারতের আদিবাসীদের পরিচয় করে দেন। ভারতীয়রা রুচিবোধ, সংস্কৃতিপ্রীতি, খাদ্য, পানীয়, স্বাস্থ্যবিধি, পানি নিষ্কাশন, বায়ু চলাচলের পথযুক্ত (Ventilation) গৃহ নির্মাণ কৌশল ও রকমারি আধুনিক তৈজষপত্রের ব্যবহার মুসলমানদের নিকট হতে শিক্ষা লাভ করেন। এর আগে ভারতীয়রা খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে এমনকি দাওয়াত ও ভোজ সভায় প্লেটের পরিবর্তে পাতা ব্যবহার করতেন, যা এখনো কোন কোন অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে। এক কথায় মুসলমানগণ ভারতের সামাজিক রীতি, জীবনাচার, গার্হস্থ্য সুখ ও গৃহসজ্জায় বড় ধরণের পরিবর্তন নিয়ে আসেন। পুরনো রীতির পরিবর্তে তাঁরা স্থাপত্য কৌশলে নতুন পরিকল্পনা, নতুন সৌষ্ঠব, নতুন প্রতিসাম্য, নতুন মর্যাদার স্বতন্ত্র রীতির সূচনা করেন। তাজমহলের অত্যুৎকৃষ্ট নির্মাণশৈলী সোনালী যুগের স্মৃতিকে জীবন্ত করে দেয়। পন্ডিত জওহর লাল নেহেরু Discovery of the India নামক ঐতিহাসিক গ্রন্থে ভারতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতার উপর মুসলমানদের অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন :
The coming of Islam and of a considerable number of people from outside with different ways of living and thought affected these beliefs and structure. A foreign conquest, with all its evils, has one advantage: it widens the mental horizon of the people and compels them to look out of there shells. They realise that the world is a much bigger and a more variegated place than they had imagined. So the Afghan conquest had affected India and many changes had taken place. Even more so the Moghals, who were far more cultured and advanced in the ways of living than the Afghans, brought changes to India. In particular, they introduced the refinements for which Iran was famous.¹
“ইসলাম এবং বিভিন্ন চিন্তা ও জীবনধারায় অভ্যস্ত বহিরাগতদের ভারতে আগমন এখানকার বিশ্বাস ও সামাজিক কাঠামোকে প্রভাবিত করেছে। বহিরাগত বিজয়ী যা কিছু দোষত্রুটি সাথে করে নিয়ে আসে তার একটি ইতিবাচকও থাকে। এটা জনগণের মানসিক দিগন্ত প্রসারিত করে এবং নিজেদের চিন্তার গন্ডি ছেড়ে বাইরে আসতে বাধ্য করে। তাদের ধারণার তুলনায় পৃথিবী আরো বড় এবং বর্ণিল স্থান। সুতরাং আফগানদের আগমন ভারতীয়দের চিন্তা ও জীবনধারাকে পাল্টে দিয়েছে। ভারতে তাঁরা পরিবর্তনের বৈপ্লবিক সূচনা করেন। এর চাইতে আরো বেশী পরিবর্তন সূচিত হয় মুঘলদের দ্বারা। কারণ আফগানদের তুলনায় মুঘলরা ছিল অধিকতর সংস্কৃতিবান ও উন্নত। তাঁরা ভারতে বিশেষভাবে উন্নত রুচিবোধের প্রবর্তন করেন যার জন্য ইরান ছিল সুখ্যাতি সম্পন্ন।”
১৯৪৮ সালের জয়পুরে অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল কংগ্রেসের ৫৫তম অধিবেশনে সভাপতির ভাষণ দিতে গিয়ে কংগ্রেসের তৎকালীণ চেয়ারম্যান ড. পাথবী সিতা রামাইয়া একই অভিমত ব্যক্ত করেন। নিম্নোক্ত ভাষায় :
The Muslims had “enriched our culture, strengthened our administration, and brought near distant parts of the country...............It (the Muslim Period) touched deeply the social life and the literature of the land.”²
“মুসলমানগণ আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন, প্রশাসনকে সুসংহত করেছেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল সমূহকে একে অপরের সাথে সংযোগ সাধনে সফলতা অর্জন করেছেন। ভারতের সাহিত্য ও সামাজিক জীবনে তাদের প্রভাব সুগভীর।”
টিকাঃ
১. Jawaharlal Nehru, The Discvery of India, p. 219
২. Presidential address of Dr. Pattabs.
📄 চিকিৎসা বিজ্ঞানে অবদান
মুসলমানগণ ভারতবর্ষে ইউনানী চিকিৎসা নামক নতুন এক চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আসেন। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি আবিস্কারের আগে রোগ নিরাময়ে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত, অতি উন্নত ও বিজ্ঞান নির্ভর ছিল এ পদ্ধতি। ইরাক, ইরান ও তুর্কিস্তান তাদের সমৃদ্ধির যুগে ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতির আর্ন্তজাতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এবং এখানেই মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠতম চিকিৎসক ও ভেষজ বিজ্ঞানী জন্ম নিয়েছিলেন। ভারতে মুসলিম রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর শাসক বর্গের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় অত্যাগ্রহ ও উদার পৃষ্ঠপোষকতার খবর দিকবিদিক ছড়িয়ে পড়লে ইউনানী চিকিৎসা শাস্ত্রে পারদর্শী বিজ্ঞানীগণ একের পর এক ভারতে আসতে থাকেন। আগমনের এ ধারাবাহিকতা হিজরী সপ্তম শতাব্দী হতে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ভারতের এসব অতিথি চিকিৎসক ও তাদের ছাত্রদের অভিজ্ঞতা, মেধা, একাগ্রতা ও মানবসেবার কারণে ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতি অগ্রগতির তুঙ্গশৃঙ্গে পৌঁছে। ইউনানী পদ্ধতির অগ্রগতির সামনে প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি সমূহ ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলে। ভারতবর্ষের কোন শহর ইউনানী পদ্ধতির চিকিৎসা ছাড়া ছিল না। এ পদ্ধতি ছিল উন্নত, অধিকতর সাশ্রয়ী, সহজলভ্য এবং ভারতীয়দের মন-মেজায, পরিবেশ ও আবহাওয়ার সাথে সংগতিপূর্ণ। ফলে অতিদ্রুত ভারতের সর্বত্র এ পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ে এবং ভারতীয় জনগণ বিশেষতঃ দরিদ্র শ্রেণীর চিকিৎসা সেবা প্রদানে বিস্ময়কর অবদান রাখে। ভারতীয় চিকিৎসকগণ তাদের অভিজ্ঞতা ও মেধা দিয়ে এ পদ্ধতিকে আরো গৌরবান্বিত করতে সমর্থ হয়েছেন। মুসলমানদের পতন যুগে দিল্লী ও লক্ষ্ণৌ ছিল ইউনানী চিকিৎসার বিখ্যাত কেন্দ্র এবং এখনো পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে এ পদ্ধতি বহুল প্রচলিত ও জনসমর্থিত।
📄 মুসলমানদের ১০টি অবদান
প্রথিতযশা ইতিহাসবিদ ড. স্যার যদুনাথ সরকার Islam in India শীর্ষক গ্রন্থে ভারতের জন্য মুসলমানদের প্রদত্ত ১০টি বড় অবদানের কথা উল্লেখ করেন যার মধ্যে ৬টি নিম্নে উল্লিখিত হল, বাকীগুলো আগেই বর্ণনা করা হয়েছে :
১. বহির্বিশ্বের সাথে ভারতীয়দের সংযোগ সাধন।
২. রাজনৈতিক ঐক্য, সংস্কৃতি ও পোষাকে সঙ্গতি বিশেষতঃ উচ্চতর শ্রেণীতে।
৩. একটি সাধারণ সরকারী ভাষা, গদ্যের সহজ ও সরল রীতি যার উন্নয়নে হিন্দু মুসলিম উভয়ে অংশ নেন।
৪. কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে আঞ্চলিক ভাষা সমূহের উৎকর্ষ সাধন যাতে শান্তি, সমৃদ্ধি ব্যাপকতর রূপ ধারণ করে এবং সাহিত্য সংস্কৃতি উন্নয়নের সুযোগ লাভ করা যায়।
৫. সামুদ্রিক বাণিজ্যের পুনরুজ্জীবন যা মূলতঃ দাক্ষিণাত্যের জনগণের হাতে ছিল; দীর্ঘদিন যাবত এ ব্যবসা বন্ধ ছিল।
৬. ভারতীয় নৌবহর গঠন।
📄 বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক অগ্রগতি
ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক অবদানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে গিয়ে প্রখ্যাত মুসলিম বিদ্বেষী লেখক ড. স্যার উইলিয়াম হান্টার বলেন :
The Musalmans led several of these great land reclamation colonies to the southward, and have left their names in Eastern Bengal as the first dividers of the water from the land. The sportsman comes across their dykes, and metalled roads and mosques, and tanks, and tombs in the loneliest recesses of the jungle; and wherever they went, they spread their faith, partly by the sword, but chiefly by a bold appeal to the two great instincts of the popular heart. The Hindus had never admitted the amphibious population of the Delta within the pale of their community. The Muhammadens offered the plenary privileges of Islam to Brahman and outcaste alike. 'Down on your knees, every one of you,' preached these fierce missionaries, 'before the Almighty in whose eyes all men are equal, all created beings as the dust of earth. There is no god but the one God, and His Messenger is Muhammad.' The battle cry of the warrior became, as soon as the conquest was over, the text of the Divine.¹
“মুসলমানগণ দক্ষিণ অভিমুখে প্রাপ্ত বহুভূমিতে নতুন আবাদী গড়ে তুলেন এবং পূর্ববঙ্গেও সমুদ্র থেকে শুকনো ভূমিকে পৃথক করে কৃতিত্ব দেখান। কোন পর্যটক যদি উল্লিখিত অঞ্চল সমূহ পরিভ্রমণ করেন তাহলে আজো প্রত্যন্ত বনজঙ্গলে জলাধার, মসজিদ, পাকা সড়ক, বেড়ি বাঁধ, লক্ষ্য করবেন। তাঁরা যেখানেই গেছেন ধর্ম প্রচার করেছেন আংশিক তরবারীর সাহায্যে এবং প্রধানত মানব প্রকৃতির দু'টি গুরুত্বপূর্ণ সহজাত প্রবৃত্তির সাহসী আন্দোলনের মাধ্যমে। হিন্দুরা গঙ্গা বদ্বীপের উভয় তীরে বসবাসরত জনগোষ্ঠীকে ভ্রাতৃত্ববোধে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেনি। মুসলমানগণ ব্রাহ্মণ-অচ্যুৎ নির্বিশেষে সব মানুষের সামনে ইসলামের সামাজিক সাম্য ভিত্তিক সুবিধে তুলে ধরেন। ধর্ম প্রচারকগণ সব জায়গায় এ বাণী প্রচার করেন যে, প্রতিটি মানুষকে আল্লাহর দরবারে মাথা নত করতে হবে। মহান আল্লাহর সামনে সব মানুষ সমান। ধূলিকণার ন্যায় সবাইকে আল্লাহ পয়দা করেছেন। "আল্লাহ ব্যতীত আর কোন মাবুদ নাই; হযরত মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রসূল।” ঐ কালিমাই বিজয়ের পর বিজয় সাধনে রণযোদ্ধার ঐশী ও মুবারক শ্লোগানে পরিণত হয়।"
টিকাঃ
১. W.W. Hunter, The Indian Musalmans, 1876. pp. 154-5