📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 জনকল্যাণমূলক কাজ

📄 জনকল্যাণমূলক কাজ


জীবন-জন্তুর প্রশিক্ষণ ও এদের বংশ বিস্তারে মুসলিম শাসকবর্গ বিরাট সফলতা অর্জন করেন। 'তুযুক-ই-জাহাঙ্গিরী', 'আইন-ই-আকবরী' ইত্যাদি ঐতিহাসিক গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে আমরা বিস্তারিত বিবরণ পেতে পারি। তাঁরা অসংখ্য হাসপাতাল, দূঃস্থ পূনর্বাসন কেন্দ্র, গণপার্ক, পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ এবং বড় খাল ও বিস্তৃত দীঘি খনন করে জনকল্যাণে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেন। মাওলানা সাইয়েদ আবদুল হাই হাসানী (রহ.) তাঁর 'জান্নাতুল মাশরিক' নামক তথ্য নির্ভর বিখ্যাত গ্রন্থে ভারতে মুসলিম যুগে স্থাপিত হাসপাতাল, পূনর্বাসন কেন্দ্র, সহ বিভিন্ন জনকল্যাণ মূলক প্রতিষ্ঠানের এক দীর্ঘ তালিকা প্রদান করেন। উক্ত গ্রন্থটি 'আল-হিন্দ ফিল আহাদিল ইসলামী' নামে হায়দ্রাবাদের উসমানীয়া দায়েরাতুল মা'আরিফ হতে আরবী ভাষায় এবং লক্ষ্ণৌস্থ একাডেমী অব ইসলামিক রিসার্চ এন্ড পাবলিকেশন্স হতে উর্দু ভাষায় যুগপৎ প্রকাশিত হয়।

ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের সাথে পূর্বাঞ্চলের সংযোগ রক্ষাকারী সব মহাসড়কই নির্মিত হয়েছে মুসলিম রাজা-বাদশাহদের শাসনামলেই। এর বিখ্যাত হচ্ছে শেরশাহ শুরী নির্মিত গ্র্যান্ড ট্র্যাংক রোড। এই মহাসড়কটি বাংলাদেশের সোনারগাঁ হতে পাকিস্তানের নিলাব পর্যন্ত ৩,০০০ মাইল (৪,৮৩২ কিলোমিটার)। প্রতি তিন কি দুই কিলোমিটার অন্তর একটি মুসাফির খানা, হিন্দু-মুসলমানদের জন্য পৃথক লঙ্গরখানা ও একটি করে মসজিদ থাকতো। রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োজিত একজন ইমাম ও একজন মুয়াজ্জিন মসজিদের তত্ত্বাবধান করতেন। এক জোড়া দ্রুতগামী ঘোড়া প্রতিটি মুসাফিরখানায় রাখা হত যার মাধ্যমে চিঠিপত্র ও রাষ্ট্রীয় বার্তা নিলাব হতে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানো হত। সড়কের উভয় পাশে ছায়াদার ফলবান বৃক্ষ রোপন করা হয়েছিল। এই সব বৃক্ষের ছায়া ও ফল পথচারী ও মুসাফিরদের জন্য ছিল অফুরন্ত নিয়ামত স্বরূপ।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 পরিচ্ছন্নতা ও উন্নত জীবনধারা

📄 পরিচ্ছন্নতা ও উন্নত জীবনধারা


উপরন্তু মুসলমানগণ পরিচ্ছন্নতা ও উন্নত জীবনধারার সাথে ভারতের আদিবাসীদের পরিচয় করে দেন। ভারতীয়রা রুচিবোধ, সংস্কৃতিপ্রীতি, খাদ্য, পানীয়, স্বাস্থ্যবিধি, পানি নিষ্কাশন, বায়ু চলাচলের পথযুক্ত (Ventilation) গৃহ নির্মাণ কৌশল ও রকমারি আধুনিক তৈজষপত্রের ব্যবহার মুসলমানদের নিকট হতে শিক্ষা লাভ করেন। এর আগে ভারতীয়রা খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে এমনকি দাওয়াত ও ভোজ সভায় প্লেটের পরিবর্তে পাতা ব্যবহার করতেন, যা এখনো কোন কোন অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে। এক কথায় মুসলমানগণ ভারতের সামাজিক রীতি, জীবনাচার, গার্হস্থ্য সুখ ও গৃহসজ্জায় বড় ধরণের পরিবর্তন নিয়ে আসেন। পুরনো রীতির পরিবর্তে তাঁরা স্থাপত্য কৌশলে নতুন পরিকল্পনা, নতুন সৌষ্ঠব, নতুন প্রতিসাম্য, নতুন মর্যাদার স্বতন্ত্র রীতির সূচনা করেন। তাজমহলের অত্যুৎকৃষ্ট নির্মাণশৈলী সোনালী যুগের স্মৃতিকে জীবন্ত করে দেয়। পন্ডিত জওহর লাল নেহেরু Discovery of the India নামক ঐতিহাসিক গ্রন্থে ভারতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতার উপর মুসলমানদের অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন :

The coming of Islam and of a considerable number of people from outside with different ways of living and thought affected these beliefs and structure. A foreign conquest, with all its evils, has one advantage: it widens the mental horizon of the people and compels them to look out of there shells. They realise that the world is a much bigger and a more variegated place than they had imagined. So the Afghan conquest had affected India and many changes had taken place. Even more so the Moghals, who were far more cultured and advanced in the ways of living than the Afghans, brought changes to India. In particular, they introduced the refinements for which Iran was famous.¹

“ইসলাম এবং বিভিন্ন চিন্তা ও জীবনধারায় অভ্যস্ত বহিরাগতদের ভারতে আগমন এখানকার বিশ্বাস ও সামাজিক কাঠামোকে প্রভাবিত করেছে। বহিরাগত বিজয়ী যা কিছু দোষত্রুটি সাথে করে নিয়ে আসে তার একটি ইতিবাচকও থাকে। এটা জনগণের মানসিক দিগন্ত প্রসারিত করে এবং নিজেদের চিন্তার গন্ডি ছেড়ে বাইরে আসতে বাধ্য করে। তাদের ধারণার তুলনায় পৃথিবী আরো বড় এবং বর্ণিল স্থান। সুতরাং আফগানদের আগমন ভারতীয়দের চিন্তা ও জীবনধারাকে পাল্টে দিয়েছে। ভারতে তাঁরা পরিবর্তনের বৈপ্লবিক সূচনা করেন। এর চাইতে আরো বেশী পরিবর্তন সূচিত হয় মুঘলদের দ্বারা। কারণ আফগানদের তুলনায় মুঘলরা ছিল অধিকতর সংস্কৃতিবান ও উন্নত। তাঁরা ভারতে বিশেষভাবে উন্নত রুচিবোধের প্রবর্তন করেন যার জন্য ইরান ছিল সুখ্যাতি সম্পন্ন।”

১৯৪৮ সালের জয়পুরে অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল কংগ্রেসের ৫৫তম অধিবেশনে সভাপতির ভাষণ দিতে গিয়ে কংগ্রেসের তৎকালীণ চেয়ারম্যান ড. পাথবী সিতা রামাইয়া একই অভিমত ব্যক্ত করেন। নিম্নোক্ত ভাষায় :

The Muslims had “enriched our culture, strengthened our administration, and brought near distant parts of the country...............It (the Muslim Period) touched deeply the social life and the literature of the land.”²

“মুসলমানগণ আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন, প্রশাসনকে সুসংহত করেছেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল সমূহকে একে অপরের সাথে সংযোগ সাধনে সফলতা অর্জন করেছেন। ভারতের সাহিত্য ও সামাজিক জীবনে তাদের প্রভাব সুগভীর।”

টিকাঃ
১. Jawaharlal Nehru, The Discvery of India, p. 219
২. Presidential address of Dr. Pattabs.

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 চিকিৎসা বিজ্ঞানে অবদান

📄 চিকিৎসা বিজ্ঞানে অবদান


মুসলমানগণ ভারতবর্ষে ইউনানী চিকিৎসা নামক নতুন এক চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আসেন। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি আবিস্কারের আগে রোগ নিরাময়ে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত, অতি উন্নত ও বিজ্ঞান নির্ভর ছিল এ পদ্ধতি। ইরাক, ইরান ও তুর্কিস্তান তাদের সমৃদ্ধির যুগে ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতির আর্ন্তজাতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এবং এখানেই মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠতম চিকিৎসক ও ভেষজ বিজ্ঞানী জন্ম নিয়েছিলেন। ভারতে মুসলিম রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর শাসক বর্গের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় অত্যাগ্রহ ও উদার পৃষ্ঠপোষকতার খবর দিকবিদিক ছড়িয়ে পড়লে ইউনানী চিকিৎসা শাস্ত্রে পারদর্শী বিজ্ঞানীগণ একের পর এক ভারতে আসতে থাকেন। আগমনের এ ধারাবাহিকতা হিজরী সপ্তম শতাব্দী হতে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ভারতের এসব অতিথি চিকিৎসক ও তাদের ছাত্রদের অভিজ্ঞতা, মেধা, একাগ্রতা ও মানবসেবার কারণে ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতি অগ্রগতির তুঙ্গশৃঙ্গে পৌঁছে। ইউনানী পদ্ধতির অগ্রগতির সামনে প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি সমূহ ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলে। ভারতবর্ষের কোন শহর ইউনানী পদ্ধতির চিকিৎসা ছাড়া ছিল না। এ পদ্ধতি ছিল উন্নত, অধিকতর সাশ্রয়ী, সহজলভ্য এবং ভারতীয়দের মন-মেজায, পরিবেশ ও আবহাওয়ার সাথে সংগতিপূর্ণ। ফলে অতিদ্রুত ভারতের সর্বত্র এ পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ে এবং ভারতীয় জনগণ বিশেষতঃ দরিদ্র শ্রেণীর চিকিৎসা সেবা প্রদানে বিস্ময়কর অবদান রাখে। ভারতীয় চিকিৎসকগণ তাদের অভিজ্ঞতা ও মেধা দিয়ে এ পদ্ধতিকে আরো গৌরবান্বিত করতে সমর্থ হয়েছেন। মুসলমানদের পতন যুগে দিল্লী ও লক্ষ্ণৌ ছিল ইউনানী চিকিৎসার বিখ্যাত কেন্দ্র এবং এখনো পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে এ পদ্ধতি বহুল প্রচলিত ও জনসমর্থিত।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 মুসলমানদের ১০টি অবদান

📄 মুসলমানদের ১০টি অবদান


প্রথিতযশা ইতিহাসবিদ ড. স্যার যদুনাথ সরকার Islam in India শীর্ষক গ্রন্থে ভারতের জন্য মুসলমানদের প্রদত্ত ১০টি বড় অবদানের কথা উল্লেখ করেন যার মধ্যে ৬টি নিম্নে উল্লিখিত হল, বাকীগুলো আগেই বর্ণনা করা হয়েছে :
১. বহির্বিশ্বের সাথে ভারতীয়দের সংযোগ সাধন।
২. রাজনৈতিক ঐক্য, সংস্কৃতি ও পোষাকে সঙ্গতি বিশেষতঃ উচ্চতর শ্রেণীতে।
৩. একটি সাধারণ সরকারী ভাষা, গদ্যের সহজ ও সরল রীতি যার উন্নয়নে হিন্দু মুসলিম উভয়ে অংশ নেন।
৪. কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে আঞ্চলিক ভাষা সমূহের উৎকর্ষ সাধন যাতে শান্তি, সমৃদ্ধি ব্যাপকতর রূপ ধারণ করে এবং সাহিত্য সংস্কৃতি উন্নয়নের সুযোগ লাভ করা যায়।
৫. সামুদ্রিক বাণিজ্যের পুনরুজ্জীবন যা মূলতঃ দাক্ষিণাত্যের জনগণের হাতে ছিল; দীর্ঘদিন যাবত এ ব্যবসা বন্ধ ছিল।
৬. ভারতীয় নৌবহর গঠন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px