📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 ফলমূলের উন্নয়ন

📄 ফলমূলের উন্নয়ন


মাটির উর্বরতা সত্ত্বেও ভারত বর্ষে ফলমূল পাওয়া যায় অত্যন্ত কম। যা কিছু পাওয়া যায় তাও নিম্ন মানের এবং অপরিকল্পিত ভাবে উৎপাদিত। উদ্যান উন্নয়নে জনগণ পর্যাপ্ত উৎসাহ দেখাইনি। অপর দিকে মুঘল বাদশাহগণের রুচি ছিল উন্নত এবং তাঁদের দেশে বিভিন্ন ধরণের ফলমূল ছিল পর্যাপ্ত। ভারত বর্ষে তাঁদের আগমনের ফলে ফল চাষ দ্রুত অগ্রগতি লাভ করে। বাবরের 'তুযুক-ই-বাবরী' ও জাহাঙ্গীরের 'তুযুক-ই-জাহাঙ্গীরী'-তে এতদসংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। এক গাছের সাথে অপর গাছে কলমের মাধ্যমে ব্যাপক পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা সুস্বাদু নতুন জাতের ফল উদ্ভাবন করেন। বর্তমানে আম ভারতের সুস্বাদু ও বিখ্যাত ফল। মুঘলদের পূর্বে ভারতে শুধু মাত্র 'তুখমী' নামক একটি জাতের আম ছিল। মুঘলরা বিভিন্ন প্রজাতির আমের পরাগায়ন (Pollination) ও কলমের (Graft) মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দর সুস্বাদু ও সুমিষ্ট আমের উদ্ভাবন করেন। এর ফলশ্রুতিতে ভারত বর্ষে এত জাতের আমের চাষ হতে লাগল যার সংখ্যা নিরূপন করা কঠিন।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্প

📄 কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্প


বস্ত্রের ব্যাপারেও একই কথা। ভারত বর্ষের পোষাক সাধারণত তৈরী হতো মোটা ও নিম্ন মানের কাপড় দিয়ে। মাহমূদ বাইগ্রাহ (মৃ.১৫১১) নামে সমধিক পরিচিত সুলতান মাহমূদ শাহ গুজরাটে বহু বস্ত্রের কারখানা স্থাপন করেন। এসব কারখানায় বুনন, রং করণ, ছাপা ও ডিজাইনের কাজ চলতো। এ ছাড়া তিনি কাগজ, রেশমী বস্ত্র, পাথর ও গজদন্ত দ্বারা বিভিন্ন দ্রব্য সামগ্রী তৈরীর উদ্দেশ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। অগ্রসর ও গঠনমূলক মেধার অধিকারী সুলতান মাহমূদ গুজরাটী শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষি সেক্টরে কর্মরত জনগণের মনে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির একটি দূর্লভ উদ্দীপনার জন্ম দেন। ভারতের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ মাওলানা সাইয়েদ আবদুল হাই (রহ.) 'নুযহাতুল খাওয়াতির' গ্রন্থে সুলতান মাহমূদ গুজরাটী প্রসঙ্গে বলেন :

"দেশের উন্নয়নে সুলতানের 'নজীর বিহীন অবদানের মধ্যে মসজিদ ও বিদ্যালয় নির্মাণ এবং কাগজ ও ঔষধি বৃক্ষের চাষ অন্তর্ভুক্ত। এসব কাজের জন্য তিনি জনগণের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টি করেন। সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য তিনি বিপূল কূপ ও খাল খনন করেন। ইরান ও তুর্কিস্থান হতে অনেক দক্ষ শিল্পী ও অভিজ্ঞ কারিগর এসে এখানে শিল্প কারখানা স্থাপন করেন। কূপ ও প্রস্রবন ধারার কল্যাণে গুজরাট ভরে উঠে সবুজের সমারোহে। বাড়ন্ত বাগান, নিবিড় বৃক্ষ এবং সুমিষ্ট ফল পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপন্ন হতে থাকে। এছাড়া গুজরাট গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা কেন্দ্র রূপে খ্যাতি লাভ করেন। সেখান থেকে বিদেশে বস্ত্র রপ্তানী করা হতো। এসব ছিল জনগণের কল্যাণ সাধনে সুলতান মাহমূদের নিরলস প্রয়াস ও ঐকান্তিক আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ।"¹

টিকাঃ
১. মাওলানা সাইয়েদ আবদুল হাই, নুযহাতুল খাওয়াতির, ৪র্থ খন্ড, পৃ.৩৪৬

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 আকবর ও শেরশাহের সংস্কার

📄 আকবর ও শেরশাহের সংস্কার


সম্রাট আকবরের সময়ে কাপড় তৈরীর কারখানা গড়ে উঠে ভারতের সর্বত্র। মুঘল সম্রাটগণ ভূমি জরিপ, রাজস্ব নির্ধারণ ও সংগ্রহের মাধ্যমে কৃষি সংস্কার সাধন করেন। শের শাহ ও আকবর তাঁদের রাজত্ব কালে নতুন মুদ্রা প্রবর্তনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি সাধন করেন ইতিপূর্বে ভারতের আর কেউ করেননি। প্রজা কল্যাণার্থে আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক সংস্কারের যে ধারা শের শাহ সূরী চালু করেন এটা তাঁর সৃষ্টিশীল মেধার পরিচায়ক। সম্রাট আকবর মূলতঃ শেরশাহের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেন।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 জনকল্যাণমূলক কাজ

📄 জনকল্যাণমূলক কাজ


জীবন-জন্তুর প্রশিক্ষণ ও এদের বংশ বিস্তারে মুসলিম শাসকবর্গ বিরাট সফলতা অর্জন করেন। 'তুযুক-ই-জাহাঙ্গিরী', 'আইন-ই-আকবরী' ইত্যাদি ঐতিহাসিক গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে আমরা বিস্তারিত বিবরণ পেতে পারি। তাঁরা অসংখ্য হাসপাতাল, দূঃস্থ পূনর্বাসন কেন্দ্র, গণপার্ক, পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ এবং বড় খাল ও বিস্তৃত দীঘি খনন করে জনকল্যাণে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেন। মাওলানা সাইয়েদ আবদুল হাই হাসানী (রহ.) তাঁর 'জান্নাতুল মাশরিক' নামক তথ্য নির্ভর বিখ্যাত গ্রন্থে ভারতে মুসলিম যুগে স্থাপিত হাসপাতাল, পূনর্বাসন কেন্দ্র, সহ বিভিন্ন জনকল্যাণ মূলক প্রতিষ্ঠানের এক দীর্ঘ তালিকা প্রদান করেন। উক্ত গ্রন্থটি 'আল-হিন্দ ফিল আহাদিল ইসলামী' নামে হায়দ্রাবাদের উসমানীয়া দায়েরাতুল মা'আরিফ হতে আরবী ভাষায় এবং লক্ষ্ণৌস্থ একাডেমী অব ইসলামিক রিসার্চ এন্ড পাবলিকেশন্স হতে উর্দু ভাষায় যুগপৎ প্রকাশিত হয়।

ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের সাথে পূর্বাঞ্চলের সংযোগ রক্ষাকারী সব মহাসড়কই নির্মিত হয়েছে মুসলিম রাজা-বাদশাহদের শাসনামলেই। এর বিখ্যাত হচ্ছে শেরশাহ শুরী নির্মিত গ্র্যান্ড ট্র্যাংক রোড। এই মহাসড়কটি বাংলাদেশের সোনারগাঁ হতে পাকিস্তানের নিলাব পর্যন্ত ৩,০০০ মাইল (৪,৮৩২ কিলোমিটার)। প্রতি তিন কি দুই কিলোমিটার অন্তর একটি মুসাফির খানা, হিন্দু-মুসলমানদের জন্য পৃথক লঙ্গরখানা ও একটি করে মসজিদ থাকতো। রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োজিত একজন ইমাম ও একজন মুয়াজ্জিন মসজিদের তত্ত্বাবধান করতেন। এক জোড়া দ্রুতগামী ঘোড়া প্রতিটি মুসাফিরখানায় রাখা হত যার মাধ্যমে চিঠিপত্র ও রাষ্ট্রীয় বার্তা নিলাব হতে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানো হত। সড়কের উভয় পাশে ছায়াদার ফলবান বৃক্ষ রোপন করা হয়েছিল। এই সব বৃক্ষের ছায়া ও ফল পথচারী ও মুসাফিরদের জন্য ছিল অফুরন্ত নিয়ামত স্বরূপ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px