📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 ইতিহাস চর্চা

📄 ইতিহাস চর্চা


মুসলমানগণ ভারতে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক শাখা প্রবর্তন করেন, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইতিহাস। তখনো পর্যন্ত ইতিহাস লিখন ও চর্চার সাথে ভারতবর্ষ অপরিচিত ছিল। সত্যিকার অর্থে ইতিহাস বলা যায় এমন কোন প্রামাণিক গ্রন্থ ভারতে পাওয়া যেত না; কেবল ধর্মীয় কাহিনী, যুদ্ধের ঘটনা নির্ভর স্তুতি, মহাকাব্য বিশেষত, রামায়ন ও মহাভারতের কপি সহজলভ্য ছিল। মুসলমানগণ ইতিহাস শাস্ত্রে বিপুল গ্রন্থ প্রণয়ন করে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার তৈরী করে দিয়েছেন যা নির্ভরযোগ্যতা ও ব্যাপকতার দিক দিয়ে এ বিষয়ে পৃথিবীর অন্য যে কোন আধুনিক দেশের গবেষণা কর্মের সাথে সন্তোষজনক ভাবে তুলনা করা যেতে পারে। মাওলানা সাইয়্যেদ আবদুল হাই হাসানী (রহ.) লিখিত 'আস-সাকাফাতুল ইসলামিয়া ফিল হিন্দ' (ভারতে ইসলামী সংস্কৃতি) নামক গ্রন্থে ভারতের ইতিহাসের রচনায় মুসলমানগণ যে বিস্ময়কর প্রয়াস চালিয়েছেন তার ব্যাপক চিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। Dr. Gustave le Bon 'ভারতীয় সভ্যতা' নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন যেঃ

There does not exist a history of ancient India. Their books contain no historical data whatever, except for a few religious books in which historical information is buried under a heap of parables and folk-lore, and their buildings and other monuments also do nothing to fill the void for the oldest among them do not go beyond the third century B.C. To discover facts about India of the ancient times is as difficult a task as the discovery of the island of Atlantis, which, according to Plato, was destroyed due to the changes of the earth.

"প্রাচীন ভারত বর্ষের কোন ইতিহাস নেই। যেসব গ্রন্থ পাওয়া যায় তাতে ইতিহাসের তথ্য-উপাত্ত নেই। কতিপয় ধর্মীয় গ্রন্থ দৃষ্টিগোচর হয় যেখানে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী রূপক ও কিচ্ছা-কাহিনীর স্তুপের নিচে চাপা পড়ে আছে। যে সব প্রাচীন প্রাসাদ ও স্মৃতিসৌধ রয়েছে যেগুলোও শূন্যতা পূরণে কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি, কারণ এ গুলো খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের পূর্বের নির্মিত। প্রাচীণ ভারত বর্ষের ঘটনাবলী ও ইতিহাস উদ্ধার করা কঠিন যেভাবে আটলান্টিক দ্বীপ উদ্ধার করা দুঃসাধ্য। প্লেটোর মতে উক্ত দ্বীপটি পৃথিবীর পরিবর্তনে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।”

মহাকাব্য রামায়ন ও মহাভারতকে স্বীকৃতি দিয়ে লেখক মন্তব্য করেন যেঃ

The historical phase of India began with the Muslim Invasion. Muslims were India's first historians.¹

"ভারত বর্ষের ঐতিহাসিক যুগ সূচিত হয় মূলত মুসলমানদের সেনা অভিযানের পরই এবং মুসলমানরাই ভারতের প্রথম ইতিহাসবিদ।”

জনগণ ভারতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতায় যোগ করেছেন নতুন মাত্রা। তাঁরা এদেশে একটি অত্যন্ত সুন্দর, জীবন্ত, বিস্তৃততর ভাষার জন্ম দিয়েছেন যা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণের চিন্তা-চেতনা ও ভাবের বিনিময়ে শক্তিশালী মাধ্যম এবং সাহিত্যের চমৎকার বাহন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমি এর দ্বারা উর্দুকে বুঝাতে চাচ্ছি যার ভাষাগত শক্তি, উৎকর্ষ ও চমৎকারিত্ব বলার অপেক্ষা রাখে না।

টিকাঃ
* দামেস্কের বিখ্যাত একাডেমী আল মাজমাউল ইলমী আল-আরবী' হতে গ্রন্থটির দু'টি সংস্করণ ইতমধ্যে বের হয়েছে। উত্তর প্রদেশের আজমগরের দারুল মুসান্নিফীন হতে 'ইসলামী উলূম ওয়াফুনূন হিন্দুস্তান মে' শীর্ষক উর্দু সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।
১. Gustave len Bon Civilizations de l' India, (সাইয়েদ আলী বিলগ্রামী কর্তৃক উর্দু অনুবাদ)

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 সাংস্কৃতিক বিপ্লব

📄 সাংস্কৃতিক বিপ্লব


ভারত বর্ষের সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতা, কারিগরি, তথা মানুষের জীবনধারায় মুসলমানদের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানগণ এ দেশের মানুষের জীবনে নতুন বিপ্লবের জন্ম দিয়েছেন যা উপমহাদেশের পূরনো পদ্ধতির চাইতে ভিন্নতর। যেমন আধুনিক ইউরোপের জীবনধারা তথাকার মধ্যযুগীয় জীবনধারা হতে সম্পূর্ণ বিপরীত ও আলাদা।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 সম্রাট বাবরের দৃষ্টিতে ভারত

📄 সম্রাট বাবরের দৃষ্টিতে ভারত


মুসলমানগণ ভারত বর্ষের সংস্কৃতির বহমান ধারায় কী অসামান্য বৈশিষ্ট্য ও ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন তার তাৎপর্য বুঝার জন্য ভারতের ঐ যুগের সমীক্ষা নেয়া প্রয়োজন, যখন মুসলমানদের এ দেশে আগমন ঘটেনি, আধুনিক ইসলামী ভারতের ভিত্তি স্থাপিত হয়নি। মুঘল সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা যহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর (১৪৮৩-১৫৩২ খ্রি.) এদেশে মুসলমানদের আগমন-পূর্ব অবস্থার ব্যাপক চিত্র তুলে ধরেন, যা অধ্যয়ন করলে সম্যকরূপে বুঝা যাবে মুসলমানগণ নিজেদের উন্নয়ন তৎপরতা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এ দেশকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেছে। মুঘলদের আগমনের অনেক পূর্বে ভারতে মুসলমানদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তখন থেকেই নির্মাণ ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের মহৎ প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। বাবর তাঁর আত্মজীবনী 'তুযুক-ই-বাবরী' তে লিখেন যে :

There are neither good horses in India, nor good flesh, nor grapes, nor ice, nor cold water, nor baths, nor candle, nor candlestick, nor torch. In the place of the candle, they use the divat.¹ It rests on three legs: a small iron piece resembling the snout of a lamp is fixed to the top end of one leg and a weak wick to that of another; the hollowed rind of a gourd is held in the right hand from which a thin stream of oil is poured through a narrow hole. Even in case of Rajas and Maharajas, the attendants stand holding the clumsy divat in their hands when they are in need of a light in the night.

There is no arrangement for running water in gardens and buildings. The buildings lack beauty, symmetry, ventilation and neatness. Commonly, the people walk barefooted with a narrow slip tied round the loins. Women wear a dress consisting of one piece of cloth, half of which is wrapped round the legs while the other half is thrown over the head."

"ভারতে উন্নত ঘোড়া নেই, ভাল গোশত নেই, আঙ্গুর নেই, তরমুজ নেই, বরফ নেই, শীতল পানি নেই, শৌচাগার নেই, মোমবাতি নেই, বাতি রাখার পাত্র নেই, মশাল নেই। মোমবাতির পরিবর্তে লোকেরা কাদা মাটি, কাঠ বা লোহার তৈরী পিদিম ব্যবহার করতো। সরিষার তৈল এর জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই পিদিমটি তিন পা বিশিষ্ট। এক পা'তে বাতি দানের মূখের আকৃতিতে একটি লোহা কাঠ স্থাপন করা থাকে। রাতের বেলা রাজা-মহারাজাদের যদি আলোর প্রয়োজন পড়তো তখন পরিচারিকাগণ এ স্থূল পিদিম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। বাগান ও প্রাসাদে পানি প্রবাহের কোন সুব্যবস্থা নেই। প্রাসাদগুলোতে সৌন্দর্য, সামঞ্জস্য, পরিচ্ছন্নতার অভাব রয়েছে এবং এতে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নেই। মহিলারা পড়তো ধৃতি আর এক অংশ দিয়ে পা পর্যন্ত ঢেকে রাখতো এবং অপর অংশ ছড়িয়ে দিতো মাথার উপরে।"

ভারতের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা ও পশ্চাদপদতা বিষয়ে বাবরের পর্যবেক্ষণের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে পন্ডিত জওহার লাল নেহেরু বলেন :

..... his account tells us of the cultural poverty that had descended on North India. Partly this was due to Timur's destruction, partly due to the exodus of many learned men and artists and noted craftsmen to the South. But this was due also to the drying of the creative genius of the Indian people. Babar says that there was no lack of skilled workers and artisans, but there was no ingenuity or skill in mechanical invention.¹

“বাবরের লিখিত ইতিহাস থেকে উত্তর ভারতের সাংস্কৃতিক দরিদ্রতার বিবরণ আমরা পাই। এর পেছনে কারণ ছিল অংশত তৈমুর লঙ্গের ধ্বংসাত্মক তৎপরতা এবং অংশত শিল্পী, কারিগর ও বিজ্ঞ ব্যক্তিদের দলবদ্ধভাবে দক্ষিণ ভারতে গমন। এ অধঃপতনের পেছনে আরেকটি কারণ হচ্ছে ভারতীয় জনগণের সৃষ্টিধর্মী প্রতিভা শুকিয়ে গিয়েছিল। বাবরের মতে এদেশে দক্ষ কারিগর ও শিল্পীর অভাব নেই কিন্তু তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও যান্ত্রিক আবিষ্কারের দক্ষতার অভাব রয়েছে।”

টিকাঃ
১. A crude sort of lamp made of clay, wood or, iron in which mustard oil is generally burnt.
১. Jawaharlal Neheru, The discovery of India, P. 218.

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 ফলমূলের উন্নয়ন

📄 ফলমূলের উন্নয়ন


মাটির উর্বরতা সত্ত্বেও ভারত বর্ষে ফলমূল পাওয়া যায় অত্যন্ত কম। যা কিছু পাওয়া যায় তাও নিম্ন মানের এবং অপরিকল্পিত ভাবে উৎপাদিত। উদ্যান উন্নয়নে জনগণ পর্যাপ্ত উৎসাহ দেখাইনি। অপর দিকে মুঘল বাদশাহগণের রুচি ছিল উন্নত এবং তাঁদের দেশে বিভিন্ন ধরণের ফলমূল ছিল পর্যাপ্ত। ভারত বর্ষে তাঁদের আগমনের ফলে ফল চাষ দ্রুত অগ্রগতি লাভ করে। বাবরের 'তুযুক-ই-বাবরী' ও জাহাঙ্গীরের 'তুযুক-ই-জাহাঙ্গীরী'-তে এতদসংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। এক গাছের সাথে অপর গাছে কলমের মাধ্যমে ব্যাপক পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা সুস্বাদু নতুন জাতের ফল উদ্ভাবন করেন। বর্তমানে আম ভারতের সুস্বাদু ও বিখ্যাত ফল। মুঘলদের পূর্বে ভারতে শুধু মাত্র 'তুখমী' নামক একটি জাতের আম ছিল। মুঘলরা বিভিন্ন প্রজাতির আমের পরাগায়ন (Pollination) ও কলমের (Graft) মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দর সুস্বাদু ও সুমিষ্ট আমের উদ্ভাবন করেন। এর ফলশ্রুতিতে ভারত বর্ষে এত জাতের আমের চাষ হতে লাগল যার সংখ্যা নিরূপন করা কঠিন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px