📄 বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক
এই অসহায় মুসলমানগণ (যারা সে সময় প্রাচ্যের সবচে উন্নত সমৃদ্ধ জাতি ছিল) ভারতে আগমন করেন। তাঁদের সাথে ছিল এক নতুন সংস্কৃতি, সুগভীর প্রজ্ঞা, বাস্তব ধর্ম ও পরিপক্ক জ্ঞান। তাঁরা সাথে আরো বহন করে আনেন সংস্কৃতিবান ও সমৃদ্ধ জাতির মূল্যবান অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর প্রখর মেধাবী ও মননশীল মানুষের চিন্তার ফসল।
এক কথায় মুসলমানগণ এই দেশে আরবদের সহজাত শিল্পিত রুচিবোধ, ইরানীদের মার্জিত সংস্কৃতি এবং তুর্কীদের রূঢ় সরলতার প্রতিনিধিত্ব করেন। এ ছাড়া মুসলমানরা ভারতীয়দের জন্য নিয়ে আসেন আরো বহু অমূল্য সম্পদ উপঢৌকন ও নৈতিক সদগুণাবলী।
📄 তাওহীদ ও আল্লাহর ইবাদতে ইসলামের অবদান
সবচেয়ে মূল্যবান ও দূর্লভ উপঢৌকন যা মুসলমানরা এইদেশে নিয়ে আসেন তা হল ইসলামের বিশুদ্ধ ও স্বচ্ছ তাওহীদের বিশ্বাস; যার অধীনে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে প্রার্থনা-বন্দনা ও ইবাদতে কোন মাধ্যমের প্রয়োজন নেই। এই বিশ্বাসে বহু ইশ্বরবাদের ও অবতারবাদের স্থান নেই। বরং এক আল্লাহ, যিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, যার সন্তান নেই, পিতা নেই। তাঁর কোন অংশীদার নেই। পৃথিবী ও সব মাখলুকের স্রষ্টা তিনি। জগতের নিয়ম কানুন, আকাশ ও ভূমন্ডলের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁর হাতে। সেই একক আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস ও স্বীকৃতির নামই তাওহীদ। তাওহীদের এই ধারণা ও বিশ্বাসের সাথে ভারতের জনগোষ্ঠীর পরিচিতি না থাকাটা ছিল স্বাভাবিক। ভারতীয় সভ্যতা ও ভারতীয় ধর্মের উপর ইসলামের অপ্রতিহত প্রভাবের উল্লেখ করতে গিয়ে বিশিষ্ট পন্ডিত ও ইতিহাসবিদ ড. কে, এম, পানিকর বলেন:
"one thing is clear; Islam had a profound effect on Hinduism during this period. Medieval theism is in some ways a reply to the attack of Islam; and the doctrines of medieval teachers by whatever names their gods are known are essentially theistic. It is the one supreme God that is the object of the devotee's adoration and it is to His grace that we are asked to look for redemption.¹
‘একথা স্পষ্ট যে, এই যুগে হিন্দু ধর্মের উপর ইসলামের সুগভীর প্রভাব পড়েছে। হিন্দুদের মধ্যে স্রষ্টার উপাসনার ধারণা ইসলামের বদৌলতে সৃষ্টি হয়েছে। এযুগের সব হিন্দু পুরোহিতগণ তাদের দেবতাদের নাম যাই রাখুন না কেন! অর্থাৎ স্রষ্টা এক, তিনিই উপাসনার একমাত্র উপযুক্ত এবং তাঁর মাধ্যমেই আমরা পারলৌকিক মুক্তি পেতে পারি।”
টিকাঃ
১. Dr. K.M. Panikkar, A Sarvey of Indian History,
📄 সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব
ইসলামে সাম্যের ধারণা ও ভ্রাতৃত্বের চেতনা ছিল ভারতের সমাজ জীবনে একেবারে নতুন ও মূল্যবান বস্তু। মুসলিম সমাজে কোন শ্রেণী বৈষম্য নেই। অস্পৃশ্য ও অচ্ছুৎ সম্প্রদায় নেই। তাঁদের প্রত্যয় ছিল কোন মানুষ জন্মগত ভাবে অপবিত্র ও স্থিরীকৃত গন্ডমূর্খ হতে পারে না, যার জ্ঞানার্জনের কোন অধিকার নেই। কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট কোন পেশা ও ব্যবসা সংরক্ষিত্ব রাখা হয় না। অপরদিকে তাঁরা এক সাথে থাকেন, খাওয়া-দাওয়া করেন, ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সর্বস্তরে জ্ঞানার্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালান এবং তাদের সমাজে রয়েছে পেশা বাচাইয়ের অবাধ স্বাধীনতা।
মানব ভ্রাতৃত্বের এই চেতনা ছিল ভারতীয় মানস ও ভারতীয় সমাজের এক মহৎ অভিজ্ঞতা, নতুন চিন্তার আহবান, যদ্বারা এই দেশের প্রভূত উপকার হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে তৎকালীন প্রচলিত বর্ণপ্রথাপীড়িত সমাজে বেশ শৈথিল্য পরিলক্ষিত হয়। বর্ণবৈষম্যের কঠোরতার বিরুদ্ধে রীতিমত ব্যাপক আন্দোলনের সূচনা ঘটে। ইসলামের আগমন সমাজ সংস্কারকদের জন্য ছিল বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ। পন্ডিত জওহর লাল নেহেরু ভারতের সমাজ কাঠামোতে ইসলাম ও মুসলমানদের অপ্রতিহত উন্নত প্রভাবের উল্লেখ করে যে মন্তব্য করেন এইখানে তা প্রণিধানযোগ্য :
"The impact of the invaders from the northwest and of Islam on India had been considerable. It had pointed out and shone up the abuses that had crept into Hindu society – the petrification of caste, untouchability, and exclusiveness carried to fantastic lengths. The idea of brotherhood of Islam and theoretical equality of its adherents made a powerful appeal especially to those in the Hindu fold who were denied any semblance of equal treatment."¹
“উত্তর-পশ্চিম দিক হতে আগত আক্রমণকারী ও ইসলামের আগমন ভারতের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বের দাবী রাখে। তাঁরা হিন্দু সমাজে সৃষ্ট কুসংস্কার সমূহ বিশেষত বর্ণপ্রথা, শ্রেণী বৈষম্য, অস্পৃশ্যতা এবং অন্তহীন একাকীত্বের স্বরূপ উন্মোচন করেন। ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধের আদর্শ ও মুসলমানদের বাস্তব সাম্য হিন্দু মানসিকতায় সুগভীর প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষত যে সব মানুষ হিন্দু সমাজে সর্বদা সমানাধিকার হতে বঞ্চিত, তাদেরকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করে।”
মুসলিম শাসকগণ ভারতীয় ধর্ম বিশ্বাস ও প্রচলিত সামাজিক রীতিকে বিবেচনায় রেখে ‘সতী’ এর ভয়ানক ও মর্মবিদারী প্রথার সংশোধনে যে প্রাণান্ত প্রয়াস চালিয়েছেন বিখ্যাত পর্যটক বার্নিয়ারের নিম্নোক্ত বক্তব্য তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ :
"........ The number of victims is less now than formerly; the Mahometans, by whom the country is governed, doing all in their power to suppress the barbarous custom. They do not, indeed, forbid it by a positive low, because it is a part of their policy to leave the idolatrous population which is so much more numerous than their own in the free exercise of its Religion; but the practice is checked by indirect means. No woman can sacrifice herself without permission from the governor of the province in which she resides, and he never grants it until he shall have ascertained that she is not to be turned aside from her purpose; to accomplish this desirable end the governor reasons with the widow and makes her enticing promises; after which, if these methods fail, he sometimes sends her among his women, that the effect of their remonstrances may be tried. Notwithstanding these obstacles, the number of self- immolations is still very consider-able particularly in the territories of the Rajas, where no Mahometan governors are appointed.¹
আগের তুলনায় বর্তমানে ‘সতী’ এর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। কারণ মুসলমানগণ যে সব অঞ্চলের শাসক হয়েছেন তাঁরা বর্বর এ প্রথার উচ্ছেদে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন; যদিও এ প্রথা হতে জনগণকে বিরত রাখার পর্যাপ্ত আইন বিধিবদ্ধ নেই। হিন্দুদের জীবনাচার ও উত্তরাধিকার ঐতিহ্যে হস্তক্ষেপ না করার করাই হচ্ছে মুসলিম শাসন পরিচালনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বরং ধর্মীয় রীতি ও প্রথা পালনে জনসাধারণকে তাঁরা স্বাধীনতা প্রদান করেন। এতদসত্ত্বেও ‘সতী’ এর প্রথা পরোক্ষ পদ্ধতিতে নির্মূলের জন্য তাঁদের প্রয়াস অব্যাহত থাকে। এমনকি কোন বিধবা মহিলা প্রাদেশিক গভর্ণরের পূর্বানুমতি ছাড়া ‘সতী’ হতে পারবেনা। মহিলা তার সিদ্ধান্ত হতে মোটেও সরে দাঁড়াবে না, একথায় যথার্থভাবে আস্থাশীল না হওয়া পর্যন্ত প্রাদেশিক গভর্ণর ‘সতী’ হওয়ার কোনক্রমেই অনুমতি প্রদান করেন না। প্রাদেশিক গভর্ণর বা সুবাদার যুক্তি তর্কের মাধ্যমে তাঁকে বুঝাতেন। ওয়াদা-অঙ্গীকার নিতেন। এ সব তদবীর ও প্রচেষ্টা যদি ফলপ্রসূ না হয় তাহলে আত্মাহুতি দানকারী মহিলাকে গভর্ণরের অন্দর মহলে পাঠিয়ে দেয়া হতো। যাতে গভর্ণরের সহধর্মিনী ও অপরাপর মহিলা আত্মীয় স্বজনরা তাকে ভালভাবে বুঝাতে পারেন। এত সব প্রয়াস সত্ত্বেও 'সতী' এর সংখ্যা এখনো প্রচুর রয়েছে; বিশেষত ঐ সব অঞ্চলে যেখানে মুসলমান গভর্ণর নিযুক্ত নেই।"
টিকাঃ
১. Jawaharlal Nehru, The Discovery of India, 1946 P. 225
১. François Burneir, Travels in the Moghal Empire, 1891, PP.306-7.
📄 ইতিহাস চর্চা
মুসলমানগণ ভারতে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক শাখা প্রবর্তন করেন, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইতিহাস। তখনো পর্যন্ত ইতিহাস লিখন ও চর্চার সাথে ভারতবর্ষ অপরিচিত ছিল। সত্যিকার অর্থে ইতিহাস বলা যায় এমন কোন প্রামাণিক গ্রন্থ ভারতে পাওয়া যেত না; কেবল ধর্মীয় কাহিনী, যুদ্ধের ঘটনা নির্ভর স্তুতি, মহাকাব্য বিশেষত, রামায়ন ও মহাভারতের কপি সহজলভ্য ছিল। মুসলমানগণ ইতিহাস শাস্ত্রে বিপুল গ্রন্থ প্রণয়ন করে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার তৈরী করে দিয়েছেন যা নির্ভরযোগ্যতা ও ব্যাপকতার দিক দিয়ে এ বিষয়ে পৃথিবীর অন্য যে কোন আধুনিক দেশের গবেষণা কর্মের সাথে সন্তোষজনক ভাবে তুলনা করা যেতে পারে। মাওলানা সাইয়্যেদ আবদুল হাই হাসানী (রহ.) লিখিত 'আস-সাকাফাতুল ইসলামিয়া ফিল হিন্দ' (ভারতে ইসলামী সংস্কৃতি) নামক গ্রন্থে ভারতের ইতিহাসের রচনায় মুসলমানগণ যে বিস্ময়কর প্রয়াস চালিয়েছেন তার ব্যাপক চিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। Dr. Gustave le Bon 'ভারতীয় সভ্যতা' নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন যেঃ
There does not exist a history of ancient India. Their books contain no historical data whatever, except for a few religious books in which historical information is buried under a heap of parables and folk-lore, and their buildings and other monuments also do nothing to fill the void for the oldest among them do not go beyond the third century B.C. To discover facts about India of the ancient times is as difficult a task as the discovery of the island of Atlantis, which, according to Plato, was destroyed due to the changes of the earth.
"প্রাচীন ভারত বর্ষের কোন ইতিহাস নেই। যেসব গ্রন্থ পাওয়া যায় তাতে ইতিহাসের তথ্য-উপাত্ত নেই। কতিপয় ধর্মীয় গ্রন্থ দৃষ্টিগোচর হয় যেখানে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী রূপক ও কিচ্ছা-কাহিনীর স্তুপের নিচে চাপা পড়ে আছে। যে সব প্রাচীন প্রাসাদ ও স্মৃতিসৌধ রয়েছে যেগুলোও শূন্যতা পূরণে কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি, কারণ এ গুলো খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের পূর্বের নির্মিত। প্রাচীণ ভারত বর্ষের ঘটনাবলী ও ইতিহাস উদ্ধার করা কঠিন যেভাবে আটলান্টিক দ্বীপ উদ্ধার করা দুঃসাধ্য। প্লেটোর মতে উক্ত দ্বীপটি পৃথিবীর পরিবর্তনে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।”
মহাকাব্য রামায়ন ও মহাভারতকে স্বীকৃতি দিয়ে লেখক মন্তব্য করেন যেঃ
The historical phase of India began with the Muslim Invasion. Muslims were India's first historians.¹
"ভারত বর্ষের ঐতিহাসিক যুগ সূচিত হয় মূলত মুসলমানদের সেনা অভিযানের পরই এবং মুসলমানরাই ভারতের প্রথম ইতিহাসবিদ।”
জনগণ ভারতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতায় যোগ করেছেন নতুন মাত্রা। তাঁরা এদেশে একটি অত্যন্ত সুন্দর, জীবন্ত, বিস্তৃততর ভাষার জন্ম দিয়েছেন যা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণের চিন্তা-চেতনা ও ভাবের বিনিময়ে শক্তিশালী মাধ্যম এবং সাহিত্যের চমৎকার বাহন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমি এর দ্বারা উর্দুকে বুঝাতে চাচ্ছি যার ভাষাগত শক্তি, উৎকর্ষ ও চমৎকারিত্ব বলার অপেক্ষা রাখে না।
টিকাঃ
* দামেস্কের বিখ্যাত একাডেমী আল মাজমাউল ইলমী আল-আরবী' হতে গ্রন্থটির দু'টি সংস্করণ ইতমধ্যে বের হয়েছে। উত্তর প্রদেশের আজমগরের দারুল মুসান্নিফীন হতে 'ইসলামী উলূম ওয়াফুনূন হিন্দুস্তান মে' শীর্ষক উর্দু সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।
১. Gustave len Bon Civilizations de l' India, (সাইয়েদ আলী বিলগ্রামী কর্তৃক উর্দু অনুবাদ)