📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 ভারতের সাথে স্থায়ী সম্পর্ক

📄 ভারতের সাথে স্থায়ী সম্পর্ক


মূলতঃ মুসলমানগণ যে উদ্দেশ্যেই ভারতে আগমন করুন না কেন। তারা এদেশকে নিজের মাতৃভূমি রূপে গ্রহণ করে নেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল পৃথিবী আল্লাহর, তিনিই যাকে চান স্বীয় পৃথিবীর উত্তরাধিকার ও পাহারাদার নিযুক্ত করেন। তাঁরা নিজেদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত এই ভূখন্ডের ব্যবস্থাপক ও এবং আল্লাহর বান্দাদের সেবক মনে করতেন। তাদের গভীর প্রতীতি ছিল:

"প্রতিটি ভূখন্ড আমার দেশ যেহেতু প্রতিটি ভূখন্ডের মালিক আমার আল্লাহ।"

এই কারণে মুসলমানগণ সব সময় ভারতকে নিজের দেশ, নিজের ঘর এবং নিজের স্থায়ী নিবাস মনে করেন। এই দেশ হতে তাঁরা কখনো মুখ ফেরাতে পারেননি। সুতরাং ভারতের সেবার জন্য তাঁরা নিজেদের উৎকৃষ্টতর যোগ্যতা, আল্লাহ প্রদত্ত দক্ষতা ও মেধাকে কাজে লাগিয়েছেন। তাঁদের ধারণা ছিল, এই দেশের সম্পদ বৃদ্ধি করা মানে নিজের সম্পদকে সমৃদ্ধ করা কারণ তাঁদের ভবিষ্যৎ এদেশের ভাগ্যের সাথে বিজড়িত। এই চেতনাবোধের ফলশ্রুতিতে দেখা গেল ভারতের মুসলমানরা যে দৃষ্টিতে এই দেশ প্রত্যক্ষ করেন ইংরেজ এবং অপরাপর সাম্রাজ্যবাদী অক্ষশক্তি এই দেশকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন। পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এখানকার সম্পদ লুণ্ঠন। তাদের জন্য এদেশটি ছিল, ক'দিনের জন্য পাওয়া দুধেল গাভীর মত। যে ক'দিন হাতের কাছে আছে ভাল করে দুধ দোহন করে নিতে হবে। এই দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য মুসলমানরা যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করেছেন তার নেপথ্যে ছিল এই দেশের প্রতি মুসলমানদের মমত্ববোধ ও আগ্রহ।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 ভারতের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা

📄 ভারতের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা


মুসলমানরা যখন ভারতে আসেন তখন এইখানে প্রাচীন বিদ্যা ও দর্শনের প্রচলন ছিল। খাদ্য, শষ্য, ফল, কাঁচামাল ব্যাপকভাবে উৎপন্ন হত কিন্তু সাংস্কৃতিক দিয়ে এদেশের জনগোষ্ঠী সভ্য ও উন্নত বিশ্ব হতে দীর্ঘ দিন যাবৎ ছিল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। একদিকে সুউচ্চ পর্বতমালা অপর দিকে তরঙ্গবিক্ষুদ্ধ সাগর এই দেশকে বাইরের জগতের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। আলেজান্ডারই হচ্ছেন সর্বশেষ সম্রাট যিনি বাইরের সভ্য জগত থেকে এখানে এসেছিলেন। মুসলমানদের আগমন পর্যন্ত বাইরের জগতের সাথে ভারতের কোন সম্পর্ক ছিল না। বহির্বিশ্বের চিন্তা-চেতনা, নিয়ম-কানুন, শিক্ষা-সংস্কৃতির নতুন পদ্ধতি যেমন এই দেশে আসেনি তেমনি এই দেশের প্রাচীন কলা ও জ্ঞান ভান্ডারও বাইরে যায়নি।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক

📄 বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক


এই অসহায় মুসলমানগণ (যারা সে সময় প্রাচ্যের সবচে উন্নত সমৃদ্ধ জাতি ছিল) ভারতে আগমন করেন। তাঁদের সাথে ছিল এক নতুন সংস্কৃতি, সুগভীর প্রজ্ঞা, বাস্তব ধর্ম ও পরিপক্ক জ্ঞান। তাঁরা সাথে আরো বহন করে আনেন সংস্কৃতিবান ও সমৃদ্ধ জাতির মূল্যবান অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর প্রখর মেধাবী ও মননশীল মানুষের চিন্তার ফসল।

এক কথায় মুসলমানগণ এই দেশে আরবদের সহজাত শিল্পিত রুচিবোধ, ইরানীদের মার্জিত সংস্কৃতি এবং তুর্কীদের রূঢ় সরলতার প্রতিনিধিত্ব করেন। এ ছাড়া মুসলমানরা ভারতীয়দের জন্য নিয়ে আসেন আরো বহু অমূল্য সম্পদ উপঢৌকন ও নৈতিক সদগুণাবলী।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 তাওহীদ ও আল্লাহর ইবাদতে ইসলামের অবদান

📄 তাওহীদ ও আল্লাহর ইবাদতে ইসলামের অবদান


সবচেয়ে মূল্যবান ও দূর্লভ উপঢৌকন যা মুসলমানরা এইদেশে নিয়ে আসেন তা হল ইসলামের বিশুদ্ধ ও স্বচ্ছ তাওহীদের বিশ্বাস; যার অধীনে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে প্রার্থনা-বন্দনা ও ইবাদতে কোন মাধ্যমের প্রয়োজন নেই। এই বিশ্বাসে বহু ইশ্বরবাদের ও অবতারবাদের স্থান নেই। বরং এক আল্লাহ, যিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, যার সন্তান নেই, পিতা নেই। তাঁর কোন অংশীদার নেই। পৃথিবী ও সব মাখলুকের স্রষ্টা তিনি। জগতের নিয়ম কানুন, আকাশ ও ভূমন্ডলের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁর হাতে। সেই একক আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস ও স্বীকৃতির নামই তাওহীদ। তাওহীদের এই ধারণা ও বিশ্বাসের সাথে ভারতের জনগোষ্ঠীর পরিচিতি না থাকাটা ছিল স্বাভাবিক। ভারতীয় সভ্যতা ও ভারতীয় ধর্মের উপর ইসলামের অপ্রতিহত প্রভাবের উল্লেখ করতে গিয়ে বিশিষ্ট পন্ডিত ও ইতিহাসবিদ ড. কে, এম, পানিকর বলেন:

"one thing is clear; Islam had a profound effect on Hinduism during this period. Medieval theism is in some ways a reply to the attack of Islam; and the doctrines of medieval teachers by whatever names their gods are known are essentially theistic. It is the one supreme God that is the object of the devotee's adoration and it is to His grace that we are asked to look for redemption.¹

‘একথা স্পষ্ট যে, এই যুগে হিন্দু ধর্মের উপর ইসলামের সুগভীর প্রভাব পড়েছে। হিন্দুদের মধ্যে স্রষ্টার উপাসনার ধারণা ইসলামের বদৌলতে সৃষ্টি হয়েছে। এযুগের সব হিন্দু পুরোহিতগণ তাদের দেবতাদের নাম যাই রাখুন না কেন! অর্থাৎ স্রষ্টা এক, তিনিই উপাসনার একমাত্র উপযুক্ত এবং তাঁর মাধ্যমেই আমরা পারলৌকিক মুক্তি পেতে পারি।”

টিকাঃ
১. Dr. K.M. Panikkar, A Sarvey of Indian History,

ফন্ট সাইজ
15px
17px