📄 মুসলমান ধর্ম প্রচারক ও দরবেশ
মুসলমানরা পার্থিব লাভ ও বস্তুগত সুবিধা অর্জনের উর্দ্ধে উঠে নির্ভেজাল ধর্মীয় উদ্দীপনা নিয়ে এই বিশাল ভারতে প্রবেশ করেন। তাঁরা এই দেশে ইসলামী ন্যায় বিচারের বাণী নিয়ে আসেন, যাতে সংকীর্ণ ও অন্ধকার পৃথিবীতে আলো ও বিস্তৃতির প্রত্যাশী মানব গোষ্ঠীকে মহান আল্লাহর বিস্তৃত জমিনে প্রকৃতির অমূল্য প্রাচুর্য্যে ভাগ্যবান হওয়ার পদ্ধতি শেখানো যায়; গোলামী ও অধীনতার লৌহ জিঞ্জিরে আবদ্ধ অসহায় মানুষকে বিশ্ব স্রষ্টা প্রদত্ত স্বাধীনতায় লাভবান করা যায়। ইসলামের নিঃস্বার্থ খাদিমগণ এবং মরুভূমিতে খেজুর পাতার চাটাইয়ে অবস্থানকারী বিশ্ববিজয়ীদের জীবনাদর্শ ওইসব মহৎপ্রাণ ব্যক্তিদের স্নেহছায়ায় ভারতীয় সমাজের হাজারো বিক্ষুদ্ধ ও মযলুম মানুষের কেবল আশ্রয় মেলেনি বরং এখানে তারা আপন পিতা-পুত্র এবং সহোদর ভাই-বোনের মত বসবাস করতে থাকেন। হযরত সাইয়্যেদ আলী হেজুয়রী (রহ.), খাজা মুঈন উদ্দীন চিশতী আজমিরী (রহ.) ওই সব বুযর্গদের অন্তর্ভুক্ত।
📄 ভারতের সাথে স্থায়ী সম্পর্ক
মূলতঃ মুসলমানগণ যে উদ্দেশ্যেই ভারতে আগমন করুন না কেন। তারা এদেশকে নিজের মাতৃভূমি রূপে গ্রহণ করে নেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল পৃথিবী আল্লাহর, তিনিই যাকে চান স্বীয় পৃথিবীর উত্তরাধিকার ও পাহারাদার নিযুক্ত করেন। তাঁরা নিজেদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত এই ভূখন্ডের ব্যবস্থাপক ও এবং আল্লাহর বান্দাদের সেবক মনে করতেন। তাদের গভীর প্রতীতি ছিল:
"প্রতিটি ভূখন্ড আমার দেশ যেহেতু প্রতিটি ভূখন্ডের মালিক আমার আল্লাহ।"
এই কারণে মুসলমানগণ সব সময় ভারতকে নিজের দেশ, নিজের ঘর এবং নিজের স্থায়ী নিবাস মনে করেন। এই দেশ হতে তাঁরা কখনো মুখ ফেরাতে পারেননি। সুতরাং ভারতের সেবার জন্য তাঁরা নিজেদের উৎকৃষ্টতর যোগ্যতা, আল্লাহ প্রদত্ত দক্ষতা ও মেধাকে কাজে লাগিয়েছেন। তাঁদের ধারণা ছিল, এই দেশের সম্পদ বৃদ্ধি করা মানে নিজের সম্পদকে সমৃদ্ধ করা কারণ তাঁদের ভবিষ্যৎ এদেশের ভাগ্যের সাথে বিজড়িত। এই চেতনাবোধের ফলশ্রুতিতে দেখা গেল ভারতের মুসলমানরা যে দৃষ্টিতে এই দেশ প্রত্যক্ষ করেন ইংরেজ এবং অপরাপর সাম্রাজ্যবাদী অক্ষশক্তি এই দেশকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন। পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এখানকার সম্পদ লুণ্ঠন। তাদের জন্য এদেশটি ছিল, ক'দিনের জন্য পাওয়া দুধেল গাভীর মত। যে ক'দিন হাতের কাছে আছে ভাল করে দুধ দোহন করে নিতে হবে। এই দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য মুসলমানরা যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করেছেন তার নেপথ্যে ছিল এই দেশের প্রতি মুসলমানদের মমত্ববোধ ও আগ্রহ।
📄 ভারতের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা
মুসলমানরা যখন ভারতে আসেন তখন এইখানে প্রাচীন বিদ্যা ও দর্শনের প্রচলন ছিল। খাদ্য, শষ্য, ফল, কাঁচামাল ব্যাপকভাবে উৎপন্ন হত কিন্তু সাংস্কৃতিক দিয়ে এদেশের জনগোষ্ঠী সভ্য ও উন্নত বিশ্ব হতে দীর্ঘ দিন যাবৎ ছিল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। একদিকে সুউচ্চ পর্বতমালা অপর দিকে তরঙ্গবিক্ষুদ্ধ সাগর এই দেশকে বাইরের জগতের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। আলেজান্ডারই হচ্ছেন সর্বশেষ সম্রাট যিনি বাইরের সভ্য জগত থেকে এখানে এসেছিলেন। মুসলমানদের আগমন পর্যন্ত বাইরের জগতের সাথে ভারতের কোন সম্পর্ক ছিল না। বহির্বিশ্বের চিন্তা-চেতনা, নিয়ম-কানুন, শিক্ষা-সংস্কৃতির নতুন পদ্ধতি যেমন এই দেশে আসেনি তেমনি এই দেশের প্রাচীন কলা ও জ্ঞান ভান্ডারও বাইরে যায়নি।
📄 বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক
এই অসহায় মুসলমানগণ (যারা সে সময় প্রাচ্যের সবচে উন্নত সমৃদ্ধ জাতি ছিল) ভারতে আগমন করেন। তাঁদের সাথে ছিল এক নতুন সংস্কৃতি, সুগভীর প্রজ্ঞা, বাস্তব ধর্ম ও পরিপক্ক জ্ঞান। তাঁরা সাথে আরো বহন করে আনেন সংস্কৃতিবান ও সমৃদ্ধ জাতির মূল্যবান অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর প্রখর মেধাবী ও মননশীল মানুষের চিন্তার ফসল।
এক কথায় মুসলমানগণ এই দেশে আরবদের সহজাত শিল্পিত রুচিবোধ, ইরানীদের মার্জিত সংস্কৃতি এবং তুর্কীদের রূঢ় সরলতার প্রতিনিধিত্ব করেন। এ ছাড়া মুসলমানরা ভারতীয়দের জন্য নিয়ে আসেন আরো বহু অমূল্য সম্পদ উপঢৌকন ও নৈতিক সদগুণাবলী।