📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 প্রারম্ভিক কথা

📄 প্রারম্ভিক কথা


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

প্রারম্ভিক কথা :
পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি-শ্রেণী যদি পারস্পরিক ঐক্য ও আস্থা, ভালবাসা ও মর্যাদা এবং সুখ-দুঃখে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশদারিত্বের ভিত্তিতে এক সাথে থাকতে (Co- Existence) চায় তাহলে অবশ্যই প্রত্যেক জাতিকে অন্য জাতির মানসিকতা ও রুচি সম্পর্কে অবহিত থাকতে হবে, জানতে হবে তার আক্বীদা-বিশ্বাস কী? তার সামাজিক আচার-আচরণ কি ধরণের, তার অতীত ও ইতিহাস কি রকম। জ্ঞান ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সে জাতির অবদানকে স্বীকার করতে হবে, তার নির্মাণ শৈলী ও সৃজনশীল যোগ্যতা সম্মন্ধে অবহিত থাকতে হবে। শুধু তাই নয়, অন্য জাতির এ সব বিষয়কে জানার পাশাপাশি সম্মান করতে হবে, মূল্যায়ন করতে হবে, ক্ষেত্র বিশেষে সহানুভূতি দেখাতে হবে এবং প্রয়োজনে এসব সামাজিক আচার-আচরণ ও জাতিগত প্রতিভা-যোগ্যতাকে সংরক্ষনযোগ্য সম্পদ মনে করতে হবে।

উপরিউক্ত ভিত্তিতে বর্তমান বিশ্বের প্রত্যেক জায়গায় ভিন্ন দেশের ভাষা সাহিত্য, স্বভাব ও সংস্কৃতি এবং সেদেশের অতীত ও প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে জানা জরুরী মনে করা হয়। এমনকি তাদের শিল্প সুষমা সম্পর্কে অবগতিকেও প্রয়োজনীয় বিবেচনা করা হয়। এক রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক দল (Cultural Mission) অন্য রাষ্ট্রে যায়, সেখানকার জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি অধ্যয়ন করে এবং নিজ দেশের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরে সেখানকার মানুষের সামনে। প্রতিটি রাষ্ট্র অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে আলাদা অফিস ও শাখা খুলে থাকে এবং সে খাতে উদারতার সাথে অর্থ ব্যয় করা হয়ে থাকে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ভারত সরকার Indian Council for Cultural Relations নামের বিরাট একটি প্রতিষ্ঠান কায়েম করেছে। কতিপয় আধা সরকারী প্রতিষ্ঠানও খুলেছে যেমন- Indo-Arab Society, Indo-Iranian Society ইত্যাদি। এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ হচ্ছে, বিভিন্ন দেশের সভ্যতা-সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়া এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক সৃষ্টির জন্যে নানা ধরনের পন্থা অবলম্বন করা।

এমতাবস্থায় যখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এবং স্বয়ং আমাদের দেশ ভারতেও অনেক দূরবর্তী দেশের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক সৃষ্টি এবং ব্যাপক কুশল বিনিময়ের আগ্রহ দেখা যায়; প্রত্যেক দেশে অন্যান্য দেশের ভাষা ও সাহিত্য, সেখানকার সভ্যতা ও সংস্কৃতি, কবিতা ও সুর এবং সেখানকার অধিবাসীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পর্যন্ত জানার ব্যাপক আকর্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে; আর যেখানে প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি প্রক্রিয়াও তাই দাবী করে। এটা কী উচিত নয় যে, একই দেশের অধিবাসী অন্যান্য অধিবাসীদের (যারা লাখ নয়; বরং কোটি কোটি সংখ্যায় রয়েছে এবং যুগ যুগ ধরে এ দেশে বাস করছে দেশের ইতিহাসে যাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে) ইতিহাস, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার ক্ষেত্রে তাদের অবদান এবং তাদের সৃজনশীল যোগ্যতা সম্পর্কে অবগত হোক? এটা এক বিস্ময়কর বৈপরিত্য এবং ভারতের জাতীয় জীবনের এক বিরাট শূন্যতা যে, এখানকার অধিবাসীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের ঐতিহ্য ও প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে একদম অজ্ঞ। তাঁরা এদেশ আবাদ করার ক্ষেত্রে, এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কতটুকু অংশ নিয়েছেন, এদেশের উন্নতি-অগ্রগতিতে কী ভূমিকা রেখেছেন? এবং এ ক্ষেত্রে তাদের অবদানই বা (Contribution) কতটুকু? এ জাতিটির আশা-আকাঙ্ক্ষা কী? তাদের জীবনের সমস্যা কী? বর্তমান যুগে তাঁরা কোন ধরণের জটিলতার শিকার? এ সম্পর্কে কিছুই জানে না। যুগ যুগ ধরে একই স্থানে পাশাপাশি জীবন যাপন করার পরেও একে অন্যের সাথে এমন অপরিচিত ভাব অবশ্যই এক বিরাট শূন্যতা যা খুব বেশী অনুভূত হওয়া দরকার। এ শূন্যতা পূর্ণ করার দ্রুত প্রয়াস চালানো উচিত। ভারতের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক ঐক্য, মৈত্রী, ও আস্থা যা দেশের উন্নতির জন্য অপরিহার্য তা তখন পর্যন্ত হতে পারে না যতক্ষণ না আমরা দেশের উন্নতি-অগ্রগতির ক্ষেত্রে একজন আরেকজনের প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা সম্পর্কে অবগত হবো না। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের আলোকে সেই সুবাদে অর্জিত উন্নয়নের সম্ভাবনাগুলোকে চিহ্নিত করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত সেই ঐক্য ও সদভাব সুদূর পরাহতই থেকে যাবে।

এটা শুধু অজানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আরো ভয়ঙ্কর ও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভারতের একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ জাতির সভ্যতা, ইতিহাস, দেশের স্বাধীনতায় তাঁরা যে কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন এবং আরো যেসব অমূল্য ত্যাগ ও কুরবানি দিয়েছিলেন এসব বিষয়কে ইদানিং উপেক্ষা করার বরং অস্বীকার করার মানসিকতা জন্ম নিচ্ছে। ভারতের ইতিহাসকে পরিকল্পিতভাবে এমনভাবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা চলছে, যেন মুসলমানদের যুগটা নিরেট এক প্রবাসী জাতির সাম্রাজ্যবাদীর যুগ বৈ কিছুই নয়। যার মধ্যে ভাল ও কল্যাণ বলতে কিছুই ছিল না। এ সময়ের মধ্যে উঁচু মানের কোন ব্যক্তিত্ব জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার দিক দিয়ে কোন কৃতিত্ব এবং দেশ গড়ার ও জাতীয় উন্নয়নে এমন কোন অনাবিল ও নির্দোষ কাজ হয়নি যা নিয়ে ভারত গর্ব করতে পারে। দীর্ঘ স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁদের ভূমিকা ছিল নীরব দর্শকের অথবা নির্লিপ্ত কোন জাতির। ঘটনাক্রমে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিলেও তা অনুল্লেখ্য। এভাবে আমরা ভারতের সবুজ শ্যামল, সদাবসন্ত মুখর বৃক্ষের এক ফলদায়ক শাখাকে আমরা নিজেরাই বর্শাবিদ্ধ করে চলেছি এবং এটাই প্রমাণ করছি যে, আটশ বছর পর্যন্ত এ বৃক্ষ নিষ্ফল ছিল। দেশ জুড়ে হেমন্তই শুধু বিরাজ করতো।

এ ঘটনা যেমন ঐতিহাসিক বাস্তবতা বিরোধী, তেমনি এর মাধ্যমে আমাদের দেশের উর্বরতা, যোগ্য মানুষ সৃষ্টি ও প্রাকৃতিক যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আর এভাবে আমরা কোটি কোটি অধিবাসীর সাথে অন্যায় আচরণ করছি, তাঁদের হৃদয়ে কষ্ট দিচ্ছি এবং তাঁদের আশা আকাঙ্ক্ষাকে আহত করছি। শুধু তাই নয়; বরং এ দেশ, দেশের ইতিহাস, বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের সাথেও অন্যায় করছি। অথচ তাদের জন্য এসব খুবই প্রয়োজন ছিল। এভাবে ভারতবর্ষের মুসলিম যুগের ব্যতিক্রধর্মী ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের নমুনা তাদের সামনে উপস্থাপন করা দরকার। পাশাপাশি এ যুগের অবদানগুলোকে প্রকাশ করে আমরা মুসলিম দেশগুলোর (যাদের সাথে আমরা বন্ধুত্ব গড়তে প্রত্যাশী) সামনে ভারতের বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিচয় তুলে ধরতে পারি। বিশ্বের বুদ্ধিজীবী মহলের সাথে ভারতীয় মুসলমান মনীষীদের সৃজনশীল মেধা ও মননের পরিচয় করিয়ে দিতে পারি। যেহেতু মুসলিম দেশ সমূহ আগে থেকেই এ ধরণের বহু নাম ও গবেষণা কর্মের সাথে পরিচিত। তাই এক্ষেত্রে আমাদের বিশেষ কোন প্রচেষ্টা বা মাথা ব্যথার প্রয়োজন হবে না।

এ প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতাই বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি রচনার মূল প্রেরণা বা কারণ। আমাদের দেশের অনেক মুসলমান এবং অমুসলিম বন্ধুদের পক্ষে বৃহৎ গ্রন্থ পড়ার সুযোগ হয় না। সনাতন পদ্ধতিতে ফার্সী ও উর্দু বইপুস্তকের মাধ্যমে মুসলমানদের অবদান এবং মুসলিম যুগের সাংস্কৃতিক, ইলমী ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত হওয়াও অনেক সময় সম্ভবপর হয়ে উঠে না। এ জন্যে এ ধরনের, অপেক্ষাকৃত ছোট গ্রন্থের প্রয়োজন যার মধ্যে থাকবে মুসলিম যুগের পরিচয় এবং ইতিহাসের কিছু ঝলক। আমি ১৯৫১ সালে যখন মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ সফর শেষে প্রত্যাবর্তন করি তখন 'অল ইন্ডিয়া রেডিও'-র অনুরোধে 'ভারতীয় মুসলমান' শীর্ষক বেশ কিছু আরবী বক্তৃতা দেই। বক্তৃতাগুলো মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত কোন কোন ভারতীয় দূতাবাসের খুবই ভাল লাগে এবং সেগুলো প্রকাশ করার জন্য প্রস্তাব করে। স্বয়ং 'অল ইন্ডিয়া রেডিও' বিভিন্ন ভাষায় বক্তৃতাগুলো সম্প্রচার করে। দামেস্ক থেকে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক মানের আরবী ম্যাগাজিন 'আল- মুসলিমুন' বক্তৃতাগুলো কয়েক কিস্তি করে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে। মনে করলাম, সেই বক্তৃতাগুলোকে যদি আরেকবার দেখে প্রয়োজনীয় কিছু বিষয় সংযোজন করা হয় তাহলে উপরোল্লিখিত লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে একটি মহৎ কাজ হতে পারে। সুতরাং প্রয়োজনীয় সব কিছুকে সমন্বয় করে একটি আরবী গ্রন্থের রূপ দেয়া হলো। পরবর্তীতে আমার অনুরোধে সুপ্রিয় বন্ধু, দারুল উলূম নদওয়াতুল উলামার সাবেক উস্তাদ মৌলভী মাহমুদুল হাসান নদভী গ্রন্থটিকে সাবলীল উর্দু ভাষায় তরজমা করেন। গ্রন্থটিকে আরেকবার দেখে প্রয়োজনীয়, উল্লেখযোগ্য পরিবর্ধন, পরিমার্জন করা হয়। পরে আমি এ সংকলনে বেশ কয়েকটি এমন বিষয় সংযোজন করি যা রেডিওতে প্রচারিত হয়নি।

এ গ্রন্থটি আরবী ভাষায় 'আল-মুসলিমূনা ফিল হিন্দ' নামে ভারত ও বিভিন্ন আরব দেশ হতে প্রকাশিত হয়। ইতোমধ্যে এর বেশ ক'টি আরবী সংস্করণ বেরিয়েছে। ইংরেজী ভাষায় Muslims In India নামে গ্রন্থটির অনুবাদ প্রকাশিত হয়। উর্দুতে 'হিন্দুস্তানী মুসলমান এক তারিখী জায়েযা' নাম দিয়ে 'মজলিসে তাহকীকাত ও নাশরিয়াতে ইসলাম'-এর পক্ষ থেকে গ্রন্থটির বেশ কয়েকটি সংস্করণ বের হয়। আমি দীর্ঘদিন পরে গ্রন্থটির উপর আরেকবার দৃষ্টি বুলিয়ে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি যা গ্রন্থটির প্রাথমিক সংস্করণগুলোতে চোখের সামনে থাকলেও তখনকার বাস্তবতার নিরিখে অধ্যায়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয়ার মত ঘটনা বা পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। বর্তমানে অধ্যায়গুলো সময়োচিত বলে সংযোজন করে দেয়া হয়েছে। এভাবে গ্রন্থটি এসব সংযোজনের মাধ্যমে একেবারে (Up to Date) হয়ে গেলো। আশা করি এ সংকলনটি সর্বস্তরে আগ্রহ ও গুরুত্ব সহকারে পঠিত হবে। হয়ত সেই অজ্ঞতা ও অহেতুক সাম্প্রদায়িকতা লাঘবে এবং বাস্তবতা নির্ভর এবং উদার দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টিতে এমন ফলদায়ক খিদমত আঞ্জাম দিতে সক্ষম হবে যার মুখাপেক্ষী আজ আমরা সবাই।

এ প্রত্যাশাও অমূলক নয় যে, শুধু অমুসলিম বন্ধুরাই নয়; বরং অনেক শিক্ষিত মুসলমান এ গ্রন্থ থেকে অনেক নতুন বিষয় জানতে পারবেন এবং এতে তাদের জ্ঞান ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে। আর সেই হীনম্মন্যতার (Inferiority Complex) কিছুটা চিকিৎসা হবে যা দুর্ভাগ্যবশতঃ এ যুগের মুসলমানদের মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। অথচ মুসলমানদের জন্য তার কোন অবকাশ নেই। কারণ তারা এদেশের শুধু স্বাধীন, মর্যাদাশীল নাগরিক ও আদিবাসী নন; বরং এ বিশাল দেশের স্থপতিও (Architect) বটে। তাঁরাই এদেশের খিদমত করেছেন, দেশের মর্যাদা বুলন্দ করেছেন, দেশের সভ্যতা ও মানসিকতায় নতুন জীবন সঞ্চার করেছেন, এদেশকে নতুন ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা অনেক উঁচু মাপের লোক। এখানকার প্রতিটি অণুতে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের চিহ্ন বিদ্যমান, দেশের প্রতিটি অংশে রয়েছে তাঁদের মেধা, তাঁদের একনিষ্ঠতা, তাঁদের স্থাপত্যরুচি ও জযবায়ে খিদমতের অসংখ্য স্মৃতি। এখানকার জীবন ও সভ্যতার প্রত্যেক দিক তাদের সুরুচির সাক্ষ্য দেয়। ভারতের মাটিতে যে ব্যক্তিই পা রাখবেন এবং এখানকার ইতিহাসের যে কেউই পাতা উল্টাবেন নিজের অজান্তে তিনি চিৎকার দিয়ে উঠবেন:

"এখনি এ পথ দিয়ে যেন কেউ গেলো পদচিহ্ন বলে দিচ্ছে সে যে গেলো।"

৩০ রজব ১৪২২হি. সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নাদভী
৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৯২ ইং
দারুল উলূম নদওয়াতুল উলামা লক্ষ্ণৌ, ভারত।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 পরিশিষ্ট

📄 পরিশিষ্ট


১৯৭১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা ৬১,৪১৭, ৯৩৪ অর্থাৎ পুরো জনসংখ্যার ১১.২১ শতাংশ মুসলমান। এর মধ্যে ৩১,৯৬১,৭৮৯ জন পুরুষ ও ২৯,৪৫৬, ১৪৫ জন মহিলা। মুসলমানদের জনসংখ্যার আনুপাতিক ১৯৬১ সালে ১০.৭০ হতে বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৭১ সালে ১১.২১ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ০.৫১ শতাংশ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। বিগত দশকে ১৯৫১-৬১ সালে বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ৯.৯১ হতে ১০.৭০ শতাংশ অর্থাৎ ০.৭৯ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।

১৯৬১-৭১ পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও জেলা ভিত্তিক মুসলিম জনসংখ্যার হ্রাস বৃদ্ধির খতিয়ান তিনটি সারণী প্রদর্শন করা হলো:

সারণী-১
১৯৭১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী রাজ্যভিত্তিক মুসলিম জনসংখ্যার বিবরণী-

রাজ্য | মোট জনসংখ্যা | মুসলমান জনসংখ্যা | পুরো জনসংখ্যার তুলনায় মুসলমানদের আনুপাতিক হার
ভারত | ৫৪৭,৯৪৯,৮০৯ | ৬১,৪১৭,৯৩৪ | ১১.২১
অন্ধ্রপ্রদেশ | ৪৩,৫০২,৭০৮ | ৩,৫২০,১৬৬ | ৮.০৯
আসাম | ১৪,৯৫৭,৫৪২ | ৩,৫৯৪,০০৬ | ২৪.০৩
বিহার | ৫৬,৩৫৩,৩৬৯ | ৭,৫৯৪,১৭১ | ১৩.৪৮
গুজরাট | ২৬,৬৯৭,৪৭৫ | ২,২৪৯,০৫৫ | ৮.৪২
হরিয়ানা | ১০,০৩৬,৮০৮ | ৪০৫,৭২৩ | ৪.০৪
হিমাচল প্রদেশ | ৩,৪৬০,৪৩৪ | ৫০,৩২৫ | ১.৪৫
জম্মু ও কাশ্মীর | ৪,৬১৬,৬৩২ | ৩,০৪০,১৮৯ | ৬৫.৮৫
কেরালা | ২১,৩৪৭,৩৭৫ | ৪,১৬২,৭১৮ | ১৯.৫০
মধ্যপ্রদেশ | ৪১,৬৫৪,১১৯ | ১,৮১৫,৬৮৫ | ৪.৩৬
মহারাষ্ট্র | ৫০,১১২,২৩৫ | ৪,২৩৩,০২৩ | ৮.৪০
মনিপুর | ১,০৭২,৭৫৩ | ৭০,৯৬৯ | ৬.৬১
মেঘালয় | ১,০১১,৬৯৯ | ২৬,৩৪৭ | ২.৬০
মহিশুর | ২৯,২৯৯,০১৪ | ৩,১১৩,২৯৮ | ১.৬৩
নাগাল্যান্ড | ৫১৬,৪৪৯ | ২,৯৬৬ | ০.৫৮
উরিষ্যা | ২১,৯৪৪,৬১৫ | ৩২৬,৫০৭ | ১.৪৯
পাঞ্জাব | ১৩,৫৫১,০৬০ | ১১৪,৪০৭ | ০.৮৪
রাজস্থান | ২৫,৭৬৫,৮০৪ | ১,৭৭৮,২৭৫ | ৬.৯০
তামিলনাডু | ৪১,১৯৯,১৬৮ | ২,১০৩,৮৯৯ | ৫.১১
ত্রিপুরা | ১,৫৫৬,৩৪২ | ১০৩,৯৬২ | ৬.৬৮
উত্তর প্রদেশ | ৮৮,১৪১,১৪৪ | ১৩,৬৭৬,৫৩৩ | ১৫.৪৮
পশ্চিম বঙ্গ | ৪৪,৩১২,০১১ | ৯,০৬৪,৩৩৮ | ২০.৪৫

ইউনিয়ন টেরিটরীজ :
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপ | ১১৫,১৩৩ | ১১,৬৫৫ | ১০.১২
অরুণাচল প্রদেশ | ৪৭৬,৫১১ | ৮৪২ | ০.১৮
চন্দিগড় | ২৫৭,২৫১ | ৩,৭২০ | ১.৫৪
দাদার ও নগর হাবেলী | ৭৪,১৪০ | ৭৪০ | ১.০০
দিল্লি | ৪,৬৫,৬৯৮ | ২৬৩,০১৯ | ৬.৪৭
গোয়া, দামান, দিউ | ৮৫৭,৭৭১ | ৩২,২৫০ | ৩.৭৬
লাক্ষাদ্বীপ, মিনিকয় ও আমিনিদিভি দ্বীপ | ৩১,৮১০ | ৩০,০১৯ | ৯৪.৩৭
পন্ডিচেরী | ৪৭১,৭০৭ | ২৯,১৪১ | ৬.১৮

সারণী-২
জেলা ভিত্তিক মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত

ক্যাটাগরী | জেলার সংখ্যা
২.৫ শতাংশের উর্দ্ধে | ৮১
২.৫১ হতে ৫.০০ শতাংশ | ৫১
৫.০১ হতে ১০ শতাংশ | ১০২
১০.০১ হতে ২০ শতাংশ | ৮৩
২০.০১ হতে ৫০ শতাংশ | ৩০
৫০.০১ হতে তদুর্দ্ধ | ০৯

সারণী-৩
এক দশকে বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধির খতিয়ান ১৯৬১-৭১

রাজ্য | আনুপাতিক হার (১৯৬১) | আনুপাতিক হার (১৯৭১) | পুরো জনসংখ্যার % বৃদ্ধি (+) অথবা হ্রাস (-)
১. কেরালা | ১৭.৯১ | ১৯.৫০ | +১.৫৯
২. গোয়া, দামান, দিউ | ২.৩৩ | ৩.৭৬ | +১.৪৩
৩. বিহার | ১২.৪৫ | ১৩.৪৮ | +১.০৩
৪. উত্তর প্রদেশ | ১৪.৬৩ | ১৫.৪৮ | +০.৮৫
৫. মহিশুর | ৯.৮৭ | ১০.৬৩ | +০.৭৬
৬. মহারাষ্ট্র | ৭.৬৭ | ৮.৪০ | +০.৭৩
৭. দিল্লি | ৫.৮৫ | ৬.৪৭ | +০.৬২
৮. অন্ধ্রপ্রদেশ | ৭.৫৫ | ৮.০৯ | +০.৫৪
৯. ত্রিপুরা | ২০.১৪ | ৬.৬৪ | - ১৩.৪৬
১০. লাক্ষাদ্বীপ, মিনিকয় ও আমিনিদিভী দ্বীপ | ৯৮.৬৮ | ৯৪.৩৭ | -৪.৩১
১১. জম্মু ও কাশ্মীর | ৬৮.৩০ | ৬৫.৮৫ | -২.৪৫
১২. আসাম | ২৪.৭০ | ২৪.০৩ | -০.৬৭
১৩. মেঘালয় | ২.৯৯ | ২.৬০ | -০.৩৯
১৪. পন্ডিচেরী | ৬.৩৬ | ৬.১৮ | -০.১৮
১৫. গুজরাট | ৮.৪৬ | ৮.৪২ | -০.০৪
১৬. আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপ | ১১.৬৪ | ১০.১২ | -১.৫২

সূত্র: Census of India, Series, paper 2 of 1972

ফন্ট সাইজ
15px
17px