📘 ভালোবাসা কারে কয় 📄 দ্বিতীয় অধ্যায়

📄 দ্বিতীয় অধ্যায়


অর্থনীতি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রেও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাহীন বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হয়। একদিকে রয়েছে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা। এতে হালাল-হারাম এবং অপরের সুখ-শান্তি ও দুঃখ-দুরবস্থা থেকে চোখ বন্ধ করে অধিক সম্পদ সঞ্চয় করাকেই সর্ববৃহৎ মানবিক সাফল্য গণ্য করা হয়। অপরদিকে রয়েছে সমাজতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থা। এতে ব্যক্তি মালিকানাকেই অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, উভয়বিধ অর্থব্যবস্থা হচ্ছে ধন-সম্পদের উপাসনা, ধন-ঐশ্বর্যকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান করা এবং এরই জন্য যাবতীয় চেষ্টা-সাধনা নিয়োজিত করা।

ইসলামী শরী'আত এক্ষেত্রে মধ্যপন্থী ও ন্যায়নিষ্ঠ অর্থব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। ইসলামী শরী'আতে একদিকে ধন-সম্পদকে জীবনের লক্ষ্য জ্ঞান করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং সম্মান, ইয্যত ও কোন পদমর্যাদা লাভকে এর উপর নির্ভরশীল করা হয়নি। অপরদিকে সম্পদ বণ্টনের নিষ্কলুষ নীতিমালা প্রণয়ন করে দিয়েছে যাতে কোন মানুষ জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ থেকে বঞ্চিত না থাকে এবং কেউ সমগ্র সম্পদ এককভাবে কুক্ষিগত করে না বসে। এছাড়া সম্মিলিত মালিকানাভুক্ত সম্পত্তি যৌথ ও সাধারণ ওয়াকফের আওতায় রেখেছে। ইসলামে ব্যক্তিমালিকানার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে। ইসলাম হালাল দ্রব্যের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেছে এবং তা রাখার ও ব্যবহার করার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছে।

দান-খয়রাত বা খরচের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কোন কোন মানুষ আছে যারা দান-ছাদাক্বা ও ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত মুক্তহস্ত। এমনকি কোন কোন সময় তারা ঋণ করেও খরচ করে। নিজের সামর্থ্যের প্রতি তাদের লক্ষ্য থাকে না। এসব কাজ থেকে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَىٰ عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ ٱلْبَسْطِ. 'তুমি একেবারে ব্যয়কুণ্ঠ হয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না। তাহ'লে তুমি তিরষ্কৃত হয়ে বসে থাকবে' (ইসরা ১৭/২৯)।

মুমিনের কাজ হবে কৃপণতা না করা এবং নিজের ও নিজ পরিবার-পরিজনের প্রয়োজন ও চাহিদার প্রতি যথাযথ খেয়াল রাখা। প্রতিবেশী, দুঃস্থ, অসহায়, অভাবগ্রস্তদের দান না করে কৃপণতাবশে সম্পদ কুক্ষিগত করা যেমন অপরাধ, তেমনি নিজের ও পরিবার-পরিজনের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য না রেখে সর্বস্ব দান করাও ঠিক নয়। বরং মুমিনের কাজ হবে এতদুভয়ের মধ্যবর্তী। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوْা لَمْ يُسْرِفُوْা وَلَمْ يَقْتَرُوا وَكَানَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا 'যারা যখন ব্যয় করে তখন অযথা ব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না এবং তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী' (ফুরক্বান ২৫/৬৮)।

অর্থাৎ নিষিদ্ধ অপচয়-অপব্যয় ও নিন্দিত ব্যয়কুণ্ঠতা-কৃপণতার মধ্যবর্তী মিতাচার-মিতব্যয়িতা এবং অর্থসম্পদ খরচের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। এটাই হচ্ছে অর্থসম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কুরআনী বিধান। যে ব্যক্তি তা অবলম্বন করবে সে সৌভাগ্যবান হবে, মুক্তি পাবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে দুর্ভাগা হবে এবং ধ্বংসে নিপতিত হবে। অবশেষে সে আফসোস করবে।

ওমর (রাঃ) স্বীয় পুত্র আছেমকে বলেন, 'হে বৎস! তুমি অর্ধ পেট খাও এবং কাপড় না ছেড়া পর্যন্ত তা ছুড়ে ফেলে দিও না। তুমি ঐ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা আল্লাহ প্রদত্ত সবই তাদের পেট ও পীঠে রাখে। অর্থাৎ খায় ও পরিধান করে'।

আবার আল্লাহ মানুষকে খেতে ও পান করতে বলেছেন, কিন্তু অপচয় করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, وَكُلُوْا وَاشْرَبُوْা وَلَا تُসْرِفُوْا 'তোমরা খাও ও পান করো, অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীকে ভালবাসেন না' (আ'রাফ ৭/৩১)। তিনি আরো বলেন, وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا 'অপচয় কর না, নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই' (বনু ইসরাঈল ১৭/২৬-২৭)। নবী করীম (ছাঃ)ও বলেন, 'তোমরা খাও, দান কর, পরিধান কর অপব্যয় ও অহংকার ব্যতিরেকে'। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অপব্যয়ের মাধ্যমে সম্পদ বিনষ্ট করাকে আল্লাহর অসন্তোষের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন।

পার্থিব জীবনে বিলাসিতাও গ্রহণযোগ্য নয়, বরং সহজ-সরল জীবন যাপনই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। এসম্পর্কে হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মু'আয ইবনু জাবাল (রাঃ)-কে বলেন, 'তুমি সম্পদের প্রাচুর্য ও বিলাসিতা থেকে বেঁচে থাক। কেননা আল্লাহর বান্দারা বিলাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয় না'।

অতএব অপচয়-অপব্যয় ও বিলাসী জীবন পরিহার করে কেবল মধ্যপন্থী জীবন যাপন করাই মুমিনের কর্তব্য। আল্লাহ আমাদেরকে মধ্যপন্থী জীবন যাপন করার তাওফীকু দান করুন।

টিকাঃ
৪৯. কুরতুবী ২০/৩৬৫ পৃঃ।
৫০. কুরতুবী ২০/৩৬৫; ফাতহুল ক্বাদীর ৫/৩৮৫।
৫১. আবু দাউদ হা/৪৬১২, সনদ ছহীহ।
৫২. নাসাঈ হা/২৫১২; ইবনু মাজাহ হা/৩৬৯৫।
৫৩. মুসলিম হা/১৭১৫।
৫৪. আহমাদ, মিশকাত হা/৫২৬২, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৭৯৪।

📘 ভালোবাসা কারে কয় 📄 তৃতীয় অধ্যায়

📄 তৃতীয় অধ্যায়


আবেগ, অনুভূতি, ভালবাসা-ঘৃণা, বন্ধুত্ব-শত্রুতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে মধ্যপন্থী হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভালবাসায় সীমাতিক্রম করা বা শত্রুতার ক্ষেত্রে সীমালংঘন করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে ঝগড়া বিবাদের ক্ষেত্রে পাপাচারে লিপ্ত হওয়াও নিষিদ্ধ, বরং এ ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনই ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানের ব্যপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ কর না, সুবিচার কর। এটাই আল্লাহভীতির নিকটবর্তী' (মায়েদাহ ৫/৮)।

হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, আলী (রাঃ) বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, 'বন্ধুর সাথে স্বাভাবিক বন্ধুত্ব বজায় রাখ (বাড়াবাড়ি কর না), হ'তে পারে সে একদিন তোমার শত্রু হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে শত্রুর সাথে স্বাভাবিক শত্রুতা বজায় রাখ (আধিক্য দেখিও না), হ'তে পারে সে একদিন তোমার বন্ধু হয়ে যাবে'।

কোন কোন সময় মানুষ স্বীয় বন্ধুর ভালবাসায় বিলীন হয়ে যায়, বন্ধুর ভালবাসায় মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে। আবার কোন সময় তার সাথে ক্রোধের আগুনে জ্বলে পুড়ে মরে। ফলে তার সাথে হিংসা, হানাহানি ও শত্রুতায় লিপ্ত হয়। এমনকি ক্রোধের কারণে ক্ষমার ফযীলত গ্রহণ করা থেকেও সে বিরত থাকে। তাই মুমিনের জন্য আবেগ, অনুভূতি ও ভালবাসার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন আবশ্যক, যাতে সে আবেগতাড়িত হয়ে আশোভন আচরণে লিপ্ত না হয়। সুতরাং ভালবাসা, শত্রুতা, ঘৃণা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে।

টিকাঃ
৫৯. তিরমিযী, হা/২০৬৫, 'সৎকাজ ও সদাচরণ' অধ্যায়; ছহীহ আদাবুল মুফরাদ, হা/১৩২১।

📘 ভালোবাসা কারে কয় 📄 চতুর্থ অধ্যায়

📄 চতুর্থ অধ্যায়


সামাজের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, সেখানে পেশী শক্তির প্রাবল্য বিদ্যমান। পূর্ববর্তী সম্প্রদায়গুলো একদিকে মানবাধিকারের প্রতি কোন ভ্রূক্ষেপ করেনি; ন্যায়-অন্যায়ের তো বালাই ছিল না। নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাউকে যেতে দেখলে তাকে নিপীড়ন ও হত্যা করে তার সর্বস্ব লুটে নেয়াকেই বড় কৃতিত্ব মনে করা হ'ত। অপরদিকে এরূপ নির্বোধ দয়ার্দ্রতারও প্রচলন ছিল যে, পোকা-মাকড় হত্যা করাকেও অবৈধ জ্ঞান করা হতো।

কিন্তু মুসলিম উম্মাহ ও তাদের শরী'আতে এসব বাড়াবাড়ির অবসান ঘটানো হয়েছে। তারা মানুষের সামনে মানবাধিকারকে তুলে ধরেছে। কেবল শান্তি ও সন্ধির সময়ই নয়; বরং যুদ্ধক্ষেত্রে, জিহাদের ময়দানেও প্রাণবিনাশী শত্রুর অধিকার সংরক্ষণে সচেতনতা শিক্ষা দিয়েছে। অপরদিকে প্রত্যেক কাজের জন্য নির্ধারিত সীমা লংঘন করাকে অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়েছে।

সুতরাং মুমিনের সকল কাজ হবে মধ্যপন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে। এতে যেমন কোন বাড়াবাড়ি থাকবে না, তেমনি থাকবে না সীমালংঘনও। মুমিনের সকল কাজ নম্রতা, ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রাখার মাধ্যমে সম্পন্ন হ'তে হবে, যার উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ও মানবকল্যাণ। যার মাধ্যমে ইসলামের আদর্শ হবে সমুন্নত, যে আদর্শ দেখে অমুসলিমরা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হবে। আর এটাই মুমিনের একমাত্র ব্রত হওয়া উচিত। আল্লাহ আমাদেরকে সকল কাজে মধ্যপন্থা অবলম্বনের তাওফীকু দিন- আমীন!

ফন্ট সাইজ
15px
17px