📄 বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইসলাম প্রসারের অভিযোগ
'ইসলাম বিস্তার লাভ করেছে তলোয়ারের জোরে' এই বলে বেশ জোরালো আপত্তি উত্থাপন করে একদল স্বার্থান্বেষী। তারা দাবি করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন কঠিন প্রকৃতির লোক। তিনি রক্তপাত পছন্দ করতেন। ইসলাম তাঁর সেই তরবারির জোরেই বিস্তার লাভ করেছে। যারা ইসলামগ্রহণ করেছে, তারা সাগ্রহে ইসলামধর্মে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, বরং জোরপূর্বক, বাধ্য করে ইসলামে দীক্ষিত করা হয়েছে...।
বাস্তবতা হলো, ইসলামের মৌলিকতা এবং ইতিহাসের তাবৎ সংবাদ এই অপবাদকে মিথ্যা ও অসার প্রতিপন্ন করে এবং এর ভিত্তিকে সমূলে উৎপাটন করে।
কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল যুদ্ধ করেছেন এবং ২০ বছরাধিক সময় ইসলাম বিমুখ থাকার পর ঈমান এনেছেন, সেই আবু সুফিয়ান রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন, 'আপনার সঙ্গে লড়াই করেছিলাম, আপনি কতই-না উত্তম লড়াকু ছিলেন। আপনার সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেছি, আপনি কতই-না উত্তম সন্ধিকারী ছিলেন!'
অন্যদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতার ব্যাপারে সুস্পষ্ট এক মূলনীতি হিসেবে আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّين
দ্বীনের বিষয়ে কোনো জবরদস্তি নেই। [সুরা বাকারা : ২৫৬]
এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং পরবর্তীতে মুসলমানরা কাউকে জোরপূর্বক ইসলামগ্রহণের নির্দেশ দেননি। এমনকি তারা অন্য মানুষদের মৃত্যু থেকে কিংবা শান্তি থেকে পরিত্রাণের জন্য শুধু মৌখিকভাবে ইসলামের স্বীকারোক্তি দিতেও বাধ্য করেননি। আর মুসলিমজাতির জন্য কীভাবেই-বা এটা করা সম্ভব হতে পারে! তাদের পূর্ণ বিশ্বাস হলো, যে ব্যক্তি বাধ্য হয়ে ইসলামগ্রহণ করে, আখিরাতে তার কোনো মূল্য নেই। আর বস্তুত সকল মুসলমান আখিরাত প্রাপ্তিরই চেষ্টা করে।
পূর্বোক্ত আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট হিসেবে বর্ণিত আছে, মদিনায় বনু সালেম ইবনে আউফ গোত্রে এক ব্যক্তির দুটি পুত্রসন্তান ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমনের পূর্বেই তারা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে মদিনার বাইরে গিয়ে বসবাস করত। একবার কিছু খ্রিষ্টানের সাথে তারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে মদিনায় তেল নিয়ে এলো। তখন পিতা তাদেরকে আটক করে বললেন, 'ইসলামগ্রহণ করা ব্যতীত তোমাদেরকে ছাড়ব না। তারা ইসলামগ্রহণ করতে অস্বীকার করল।' সকলেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অভিযোগ নিয়ে এলো। আনসারি সাহাবি বললেন, 'হে আল্লাহর নবী, আমার চোখের সামনে আমারই এক অংশ (সন্তান পিতার অংশবিশেষ) জাহান্নামে যাবে, এটা আমি কী করে সহ্য করব!' এই সময় আল্লাহ তাআলা নাজিল করেন,
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ
দ্বীনের বিষয়ে কোনো জবরদস্তি নেই। [সুরা বাকারা: ২৫৬]
তাই তিনি পুত্রদ্বয়কে ছেড়ে দিলেন।
ভালো করে বোঝার কথা হলো, ইসলামধর্ম ঈমান গ্রহণ করা না-করাকে ব্যক্তির আন্তরিক ইচ্ছা এবং অভ্যন্তরীণ আস্থার বিষয় বলে গণ্য করে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ
যার ইচ্ছা ঈমান আনুক এবং যার ইচ্ছা কুফর অবলম্বন করুক। [সুরা কাহাফ: ২৯]
আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে বারবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টিকে এই বাস্তবতার দিকে ফিরিয়েছেন এবং তাঁকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তাঁর দায়িত্ব শুধু দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া। মানুষকে জোর করে ইসলামধর্মে দীক্ষিত করার কোনো ক্ষমতা বা প্রয়োজন তাঁর নেই। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
( أَفَأَنْتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّى يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ)
তবে কি আপনি মানুষের ওপর চাপ প্রয়োগ করবেন, যাতে তারা সকলে মুমিন হয়ে যায়? [সুরা ইউনুস: ৯৯]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ( لَسْتَ عَلَيْهِمْ بِمُصَيْطِرٍ)
আপনাকে তাদের ওপর জবরদস্তি করার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। [সুরা গাশিয়া: ২২]
আল্লাহ তাআলা বলেন, (فَإِنْ أَعْرَضُوا فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا إِنْ عَلَيْكَ إِلَّا الْبَلَاغُ)
(হে রাসুল!) তথাপি যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আমি আপনাকে তো তাদের তত্ত্বাবধায়ক করে পাঠাইনি। (বাণী) পৌঁছানো ছাড়া আপনার কোনো দায়িত্ব নেই। [সুরা শুরা : ৪৮]
এর দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায়, কাউকে জোরপূর্বক ইসলামগ্রহণ করানোকে মুসলমানদের সংবিধান চরমভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
এর বাস্তব প্রয়োগ হলো: এক যুদ্ধে মুসলমানগণ বনু হানিফার নেতা ছুমামা বিন উছাল আল হানাফিকে আটক করেন। তারা তাকে চিনতেন না। বন্দি করে আনলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তিনদিন পর্যন্ত নিজের কাছে রাখেন। প্রতিদিন তার সামনে সম্মানের সাথে ইসলামগ্রহণের প্রস্তাব পেশ করেন। তিনিও প্রতিদিনই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, 'যদি আপনি সম্পদ চান, তাহলে আপনাকে তা দেওয়া হবে। যদি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে আপনি একজন খুনিকেই হত্যা করবেন। আর যদি অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপরই আপনি অনুগ্রহ করবেন।'
একপর্যায়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মুক্ত করে দিলেন। ছাড়া পেয়ে ছুমামা প্রথমে মসজিদের নিকটস্থ একটি খেজুরবাগানে গিয়ে গোসল করলেন, এরপর মসজিদে প্রবেশ করে উচ্চৈঃস্বরে নিজের ইসলামগ্রহণের ঘোষণা দেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা এবং তাঁর প্রেরিত রাসুল।'
এরপর তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্য করে বললেন, 'হে মুহাম্মাদ, আল্লাহর কসম! ইতিপূর্বে আমার নিকট জমিনের ওপর আপনার চেহারা থেকে অধিক অপছন্দনীয় আর কোনো চেহারা ছিল না। কিন্তু এখন আপনার চেহারাই আমার নিকট পৃথিবীর সকল চেহারা অপেক্ষা অধিক প্রিয়। আল্লাহর কসম! আমার কাছে আপনার ধর্ম থেকে অধিক ঘৃণিত আর কোনো ধর্ম ছিল না। কিন্তু এখন আপনার ধর্মই আমার নিকট পৃথিবীর সকল ধর্ম থেকে অধিক প্রিয়। আল্লাহর কসম! আমার নিকট আপনার শহর থেকে অধিক খারাপ শহর আর কোনোটি ছিল না। কিন্তু এখন আপনার শহরই আমার নিকট সকল শহরের থেকে অধিক প্রিয়। আমি ওমরা করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম, সে সময় আপনার অশ্বারোহী বাহিনী আমাকে আটক করেছে! আপনি এখন আমাকে কী নির্দেশ দেন?'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে কিছু সুসংবাদ প্রদান করেন এবং ওমরা করার নির্দেশ দেন। এরপর তিনি ওমরা করার জন্য যখন মক্কায় গেলে এক ব্যক্তি তাকে (তাচ্ছিল্যে করে) বলল 'তুমি কি ধর্মত্যাগী হয়ে গেছ?'
ছুমামা রা. বললেন, 'না, আমি বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ইসলামগ্রহণ করেছি। আর আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতি দেওয়া ব্যতীত ইয়ামামা থেকে গমের একটি দানাও তোমাদের কাছে রফতানি হবে না।'
কোনোপ্রকার জবরদস্তি ও বাধ্যবাধকতা ছাড়াই ছুমামা রা. ইসলামগ্রহণ করেন। বরং তার ইসলামগ্রহণ এতটাই শক্তিমত্তার সাথে হয়েছিল যে, তিনি কুরাইশদের সাথে সকলপ্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করেন, তাদের ওপর খাদ্য-অবরোধ আরোপ করেন। কারণ, কুরাইশরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধিতা করত, তাঁকে কষ্ট দিত। অবশ্য এজন্য ছুমামাকে বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদ কুরবানি দিতে হয়, যা আসত কুরাইশদের সাথে ব্যবসাবাণিজ্যের মাধ্যমে। অনুরূপ তিনি কুরাইশ নেতাদের সাথে সামাজিক ও কূটনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে ত্যাগ স্বীকার করেন।
(ঘটনাটিতে দেখা যায়, ছুমামাকে ইসলামগ্রহণে বাধ্য করা হয়নি। তিনি বরং মুক্তি পাওয়ার পর স্বেচ্ছায় ইসলামগ্রহণ করেছেন।) সাধারণ যুক্তির কথা হলো, যাকে জোর করে কিছু করানো হয়, সুযোগ পাওয়ামাত্রই, কালবিলম্ব না করে সেখান থেকে সে বেরিয়ে আসে, বরং যে কাজে তাকে বাধ্য করা হয়েছিল, পরে সে সেই কাজের চরম বিরোধী ও শত্রু হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের জ্ঞাত ইতিহাস ইসলামের ক্ষেত্রে এমনটা প্রমাণ করে না, বরং ইতিহাসে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে, যিনি ইসলামগ্রহণ করতেন, তিনি এই নবদীক্ষিত ধর্মের পক্ষে তার যথাসাধ্য সক্ষমতা দিয়ে কাজ করতে মুহূর্তের জন্যও পিছপা হতেন না। আরও সহজ কথা হলো, আনুষ্ঠানিক বিভিন্ন জরিপও অকাট্যভাবে প্রমাণ করছে যে, مسلمانوں সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে, যদিও ইসলামগ্রহণের কারণে তাদেরকে নানাধরনের জুলুম, নির্যাতন ও প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়।
আমরা যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে যারা মারা গিয়েছেন, মুসলমান শহিদ হোক অথবা শত্রুপক্ষের নিহত ব্যক্তি, তাদের সম্মিলিত সংখ্যা একত্র করি এবং এরপর সেই সংখ্যাকে যদি বর্তমান পৃথিবীর বিভিন্ন যুদ্ধ-সংঘর্ষে নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যার সঙ্গে তুলনা করে দেখি, তাহলে আমরা খুব আশ্চর্যজনক একটা পার্থক্য দেখতে পাই।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় পূর্ণ ১০ বছরে যত যুদ্ধ হয়েছিল, সে সকল যুদ্ধে মুসলমান শহিদদের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৬২ জন বা এর কাছাকাছি। আর শত্রুপক্ষের নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা ছিল ১০২২ জনের মতো। অর্থাৎ উভয়পক্ষের নিহতদের সর্বমোট সংখ্যা ছিল মাত্র ১২৮৪।
অবশ্য, কারও জন্য এই আপত্তি করার সুযোগ নেই যে, সেই সময় যোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল কম, এ কারণে নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যাও এমন স্বল্প হয়েছে! কারণ, আমি বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারী সৈন্যসংখ্যা হিসাব করেছি। এরপর সৈন্য সংখ্যার সাথে নিহতদের সংখ্যার তুলনা করে দেখেছি। এর ফলাফল আমাকে হতবাক করে দিয়েছে। যেমন, مسلمانوں সৈন্যসংখ্যার তুলনায় তাদের মধ্যে শহিদ হয়েছেন মাত্র ১%। আর শত্রুপক্ষের যোদ্ধাদের তুলনায় তাদের নিহত ব্যক্তির সংখ্যা হলো ২%। অতএব, উভয় পক্ষ মিলে নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা দাঁড়ায় গড়ে মাত্র ১.৫%।
আমরা জানি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় ২৫ থেকে ২৭টি গজওয়া (ব্যাপক লড়াই) এবং ৩৮টি ছারিয়া (খণ্ড লড়াই) সংঘটিত হয়েছিল। অর্থাৎ মুসলিম ও মুশরিকদের মধ্যকার লড়াইয়ের মোট সংখ্যা ছিল ৬৩টিরও বেশি। এতগুলো লড়াইয়ে নিহতদের সংখ্যার স্বল্পতা অকাট্য প্রমাণ যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের যুদ্ধগুলো নিছক কোনো হিংস্র-রক্তপাতের যুদ্ধ ছিল না।
বিষয়টি আরও ভালোভাবে অনুধাবন ও সুস্পষ্টভাবে বোঝার জন্য আমি আধুনিক সভ্যতার যুদ্ধের নমুনা হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা হিসাব করেছি। আধুনিক সভ্যতার এই যুদ্ধে নিহতের পার্সেন্ট পেয়েছি ৩৫১%। এই সংখ্যাটি অকাট্য এবং অনস্বীকার্য। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল ১৫,৬০০,০০০ (এক কোটি ছাপ্পান্ন লাখ) সৈনিক। এ সত্ত্বেও এই যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৪৫,৮০০,০০০ (চার কোটি আটান্ন লাখ)। অর্থাৎ নিহতদের সংখ্যা অংশগ্রহণ করা সৈনিকদের চেয়ে তিনগুণেরও বেশি! এত ব্যাপক নিহতের কারণ হলো, উভয় পক্ষের (মিত্রপক্ষ) সৈনিকরাই ব্যাপকহারে সাধারণ নাগরিক হত্যা করেছে। বহু নিরাপদ শহর ও গ্রামের ওপর হাজার হাজার টন বিধ্বংসী বোমা নিক্ষেপ করেছে। ব্যাপকহারে মানুষ হত্যা করেছে। যেন পুরো মানব সম্প্রদায়কে তারা ধ্বংস করতে চেয়েছে। আর অসংখ্য ঘরবাড়ি, ভবন, অর্থনীতি এবং বিভিন্ন সম্প্রদায় ধ্বংস করা তো আছেই। সকল দিক দিয়ে এটা ছিল মানব সম্প্রদায়ের জন্য একটি ভয়াবহ দুর্যোগ।
অবশ্য, বাস্তবতা বোঝার জন্য ইসলামের প্রাথমিক যুগে সংঘটিত যুদ্ধ ও তার কারণসমূহ বিশ্লেষণের চেয়ে আরেকটি সহজ উপায় রয়েছে, সেটা হলো, বর্তমান পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে দৃষ্টি প্রদান করা। মানচিত্রের দিকে অতি সাধারণভাবে দৃষ্টি দিলেই বুঝে আসে, ইসলামধর্মের প্রচার-প্রসারে প্রধানত তলোয়ারের ভূমিকা নেই। কারণ, যে-সকল দেশে ইসলামের যুদ্ধ-জিহাদ সবচেয়ে কম সংঘটিত হয়েছে, সে সকল দেশেই বর্তমান পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের বসবাস। যেমন ইন্দোনেশিয়া, ভারত, চীন, আফ্রিকা মহাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল এবং এর আশপাশের বিশাল বিস্তৃত মরুভূমির এলাকাগুলো। এ সকল দেশে مسلمانوں সংখ্যা প্রায় ৩০০ মিলিয়ন, অথচ মুসলমান এবং এ অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে খুব অল্প কিছু যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, যা কোনোভাবেই লাখো ব্যক্তিকে নিজ ধর্ম পরিবর্তন করে ভিন্ন ধর্মগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে না।
এবং আমরা যখন এই দেশগুলোর সাথে ইসলামি জাগরণের প্রাথমিক অবস্থায় مسلمانوں সাথে ব্যাপকভাবে যুদ্ধ-জিহাদ সংঘটিত দেশগুলোর তুলনা করি, যেমন ইরাক, সিরিয়া এবং এর আশপাশের অঞ্চল, তখন আমরা দেখতে পাই, বর্তমানে সে সকল অঞ্চলে مسلمانوں সংখ্যা ১০ মিলিয়ন থেকে খুব বেশি নয়। এ সকল مسلمانوں মাঝে নিঃসংকোচে সেইসব অমুসলিম ব্যক্তিরাও বসবাস করছে, যারা নিজেদের পূর্ব-ধর্মের ওপর বিদ্যমান থাকাকেই প্রাধান্য দিয়েছে। যেমন খ্রিষ্টান, ইহুদি, মূর্তিপূজক এবং আরও অনেকেই।
ফ্রান্সের ইতিহাসবিদ গুস্তাভ লি বোন তার আরব সভ্যতা গ্রন্থে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এবং তাঁর পরে বিভিন্ন বিজয়-অভিযানকালে ইসলামের বিস্তার লাভের মূল রহস্য সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, ইতিহাস প্রমাণ করে কখনো কোনো ধর্মকে মানুষের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। অতএব, ইসলামধর্মও কখনো তরবারির জোরে প্রসার লাভ করেনি, বরং ইসলাম শুধু তার দাওয়াতের মাধ্যমেই প্রসারতা লাভ করেছে এবং যেসব জাতি একসময় আরবদেরকে পদানত করেছিল, এই দাওয়াতের মাধ্যমেই অবশেষে তারাও ইসলামকে গ্রহণ করে নিয়েছে। যেমন তুর্কি ও মঙ্গোলিয়া জাতি। একসময় যে ভারতে আরবগণ শুধু মুসাফির হিসেবে এসেছিলেন, সেই ভারতেও কুরআনের প্রসারতা এই পরিমাণ হয়েছে যে, সেখানে مسلمانوں সংখ্যা ৫০ মিলিয়নকেও ছাড়িয়ে গেছে। তা ছাড়া চীনদেশেও ইসলামের প্রসারতা কম হয়নি। অথচ আরবরা কখনো চীনের কোনো অঞ্চল বিজয় করেনি।
অতএব অবধারিতভাবেই বলা যায়, ইসলাম যুদ্ধ করেছে মানবের অন্তর্জগতে, জয় করে নিয়েছে তার হৃদয়রাজ্য। কারণ, তরবারির জোরে যদি ও ভূখণ্ড জয় করা যায়, কিন্তু তাতে কি কখনো মানবের হৃদয়রাজ্য জয় করা সম্ভব!
টিকাঃ
৭০২. সফাদি: আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত: ১/২২৪০।
৭০৩. ওয়াহেদি: আসবাবু নুজুলিল কুরআন: ৫২-৫৩, সুযুতি: লুবানুন নুজুল: ৩৭।
৭০৪. মাহমুদ হামদি যাকযুক: হাকায়িক ইসলামিয়া ফি মুয়াজাহাতি হামালাতিত-তাশকিক: ৩৩।
৭০৫. সহিহ বুখারি: ৪৩৭২, সহিহ মুসলিম: ১৭৬৪।
৭০৬. ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৪/৪৩২, ইবনুল কাইয়িম: জাদুল মাআদ : ১/১২৫, ইবনে হাজম: জাওয়ামিউস সিরাহ: ১/১৬।
৭০৭. মুহাম্মাদ ফারাজ: আল-আবকারিয়্যাতুল আসকারিয়্যাহ ফি গাজওয়াতির রাসুল: ১৬৯-১৭০।
৭০৮. গুস্তাভ লি বোন: হাজারাতুল আরব: ১৬৭-১৬৯।
📄 দাসপ্রথা বহাল রাখার অভিযোগ
কেউ কেউ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে এই আপত্তি উত্থাপন করে যে, তিনি মানুষকে দাস বানানোর ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনীকে যুদ্ধবন্দি ব্যক্তিদেরকে দাস হিসেবে গ্রহণ করার অনুমতি দেওয়ার মাধ্যমে এই প্রথাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
অথচ বাস্তবতা ও ইনসাফের কথা হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাসপ্রথায় উদ্বুদ্ধকারীর পরিবর্তে দাসমুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা! তবে দাসমুক্তির ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেষ্টা-প্রচেষ্টা সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে আমাদের জানতে হবে, তাঁর আগমনের পূর্বে তৎকালীন জাজিরাতুল আরব এবং সমগ্র বিশ্বে এর শিকড় কতটুকু গভীরে প্রোথিত ছিল। তখন আমরা সহজেই বুঝতে পারব, বৈশ্বিকভাবে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এমন ব্যাপক একটি প্রথার বিরুদ্ধে হঠাৎ করেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নিষেধবাণী ঘোষণা করা সম্ভব ছিল কি না।
আরব অঞ্চলের অবস্থা ছিল এরকম যে, সময়ে-অসময়ে গোত্রীয় সাম্প্রদায়িকতার ইন্ধনে যুদ্ধের আগুন লেগেই থাকত। স্বাভাবিকভাবেই এ সকল যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়ত পরাজিত পক্ষের ওপর। তাদের মহিলা এবং ছোট বাচ্চাদেরকে বন্দি করা হতো, সম্ভব হলে পুরুষদেরকেও বন্দি বানিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। এরপর হয়তো তাদেরকে হত্যা করা হতো অথবা দাস-দাসী বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হতো। বন্দিদের প্রতি দয়া প্রদর্শন কিংবা বিনিময় ছাড়া মুক্ত করার মতো কোনো সৎকর্ম তাদের স্বভাবে ছিল না। আরবদের নিকট এ সকল যুদ্ধবিগ্রহ দাসব্যবসার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। আর এই দাসব্যবসা আরব অঞ্চলের অর্থনীতির প্রধান একটি উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো।
এদিকে রোমান সাম্রাজ্যের দাস-দাসীরাও এর থেকে ভালো অবস্থায় ছিল না। এমনকি উন্নত নগরায়ণের প্রবর্তক গ্রিক দার্শনিক প্লেটো মনে করতেন, দাস-দাসীদের কখনোই নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত নয়।
আর পারস্যসাম্রাজ্যে নাগরিকরা সাতটি স্তরে বিভক্ত ছিল। সবচেয়ে নিম্নস্তরে ছিল সাধারণ জনগণ। অথচ তাদের সংখ্যার হার ছিল মোট অধিবাসীদের ৯০% থেকেও বেশি! এই শ্রেণিতে ছিল শ্রমিক, কৃষক, সৈনিক এবং দাস-দাসী। সমাজে তাদের কোনো অধিকার ছিল না। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে তাদেরকে শেকলে আবদ্ধ করে হলেও যুদ্ধে লিপ্ত রাখা হতো। উবুল্লা যুদ্ধে যেমনটি দেখা গিয়েছিল। হজরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর নেতৃত্বে এটাই ছিল পারস্যের বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রথম লড়াই।
ইসলাম আগমনের পূর্বে এমনই এক জটিল অবস্থায় ছিল দাসপ্রথা। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ রিসালাত নিয়ে আগমন করলেন, তখন তিনি দাসপ্রথাকে অকার্যকর (অর্থাৎ সীমিত) করার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যথা :
এক. দাসত্বের উৎসধারাকে সীমিত করা, যা একে ব্যাপকতা দান করত এবং এর স্থায়ী হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতো।
দুই. দাস-দাসী মুক্তির পথগুলোকে আরও প্রশস্ত করা।
এই দুটি নীতির সর্বোত্তম প্রয়োগ দেখা যায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাচারে। সদ্য মুকুল ফোটা মুসলিম সমাজকে তিনি দাসমুক্তির ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। এর বিনিময়ে কিয়ামত দিবসে বড় ধরনের প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ أَعْتَقَ رَقَبَةً أَعْتَقَ اللهُ بِكُلِّ عُضو مِنْهَا عُضْوًا مِنْ أَعْضَائِهِ مِنَ النَّارِ حَتَّى فَرْجَهُ بِفَرْجِهِ»
যে ব্যক্তি কোনো দাস আজাদ করবে, আল্লাহ তাআলা সেই দাসের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিনিময়ে আজাদকারীর একেকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। এমনকি তার লজ্জাস্থানের বিনিময়ে তার লজ্জাস্থানকেও।
তদ্রূপ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে তার পাপের কারণে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দাসমুক্তির ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছেন, যার মাধ্যমে সম্ভাব্য সর্বোচ্চসংখ্যক দাসমুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, পাপ ও গুনাহ এমন একটি বিষয়, যা কখনো বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। প্রতিটি আদম সন্তানই তো গুনাহগার। দাসমুক্তির এ পদ্ধতি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'কোনো মুসলমান পুরুষ অপর কোনো মুসলমান দাসকে আজাদ করলে আজাদকৃত দাস তার জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাধ্যম হবে। আজাদকৃত ব্যক্তির প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আজাদকারীর একেকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মুক্তির জন্য যথেষ্ট হবে। তদ্রূপ কোনো মুসলমান পুরুষ দুজন মুসলিম দাসীকে আজাদ করলে তারা তার জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাধ্যম হবে। তাদের প্রতিটি অঙ্গ আজাদকারীর একেকটি অঙ্গের মুক্তির জন্য যথেষ্ট হবে। এভাবে কোনো মুসলিম নারী অপর কোনো মুসলিম দাসীকে আজাদ করলে সেই আজাদকৃত দাসী তার জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাধ্যম হবে। আজাদকৃত দাসীর প্রতিটি অঙ্গ তার প্রতিটি অঙ্গের মুক্তির জন্য যথেষ্ট হবে।
আর এ বাণীর বাস্তবায়নে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই ছিলেন অন্য সকলের জন্য আদর্শ ও বাস্তব দৃষ্টান্ত। কারণ, তিনি নিজেও তাঁর দাস-দাসীদের আজাদ করেছিলেন।
তাঁর নির্দেশনাগুলো শুধু দাসমুক্তির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মানুষকে তিনি দাস-দাসীদের প্রতি এমন সব মানবিক আচরণ প্রদর্শনের প্রতিও উদ্বুদ্ধ করেছেন, যেগুলোর মাধ্যমে সমাজের মানুষ দাসমুক্তির জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারে। যেমন, প্রথমে তিনি মানুষকে তাদের দাস-দাসীদের সাথে সদাচারের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। এমনকি তাদের সাথে শব্দ ও বাক্য প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সদাচারের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন, তোমাদের কেউ যেন (তার দাস-দাসীকে) 'হে আমার বান্দা/বান্দি' বলে না ডাকে। কারণ, তোমরা সকল নারী-পুরুষই আল্লাহর বান্দা ও বান্দি। সুতরাং বলবে, 'হে আমার সেবক/সেবিকা'।
শুধু এতটুকুই নয়, বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরও নির্দেশ হলো, পরিবারের লোকেরা যে খাবার ও পোশাক ব্যবহার করে, তাদের দাস-দাসীকেও সে ধরনের খাবার ও পোশাক প্রদান করা এবং তাদের সাধ্যের বাইরে কোনো কাজে তাদের বাধ্য না করা। এ সম্পর্কে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাস-দাসীদের ব্যাপারে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিতেন। তিনি বলতেন, ...তোমরা যা খাও, তাদেরকেও সেই খাবার খাওয়াও। তোমরা যে পোশাক পরিধান করো, তাদেরকেও সেই পোশাক পরিধান করাও। আর তোমরা আল্লাহর বান্দাদেরকে শান্তি দিয়ো না...।
এ ছাড়াও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য আরও অনেক অধিকার নিশ্চিত করেছেন, যা একজন দাসকে মানবমর্যাদা প্রদান করে, তার যে সম্মান ও মর্যাদা তা অক্ষুণ্ণ রাখে।
এরকম নীতিগত শিক্ষার পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমাজকে প্রয়োগিক অর্থেই দাসমুক্তির স্তরে উন্নীত করার জন্য নির্দেশনা বলবৎ রেখেছেন। যেমন, তিনি দাস-দাসীকে শাস্তি দেওয়া কিংবা প্রহার করার ক্ষতিপূরণ সাব্যস্ত করেছেন তাদের মুক্তি প্রদানের মধ্যে। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, তিনি একবার তার এক গোলামকে প্রহার করেছিলেন। এরপর তিনি তাকে কাছে ডেকে দেখলেন তার পিঠে দাগ বসে গেছে। তিনি গোলামকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমি কি তোমাকে ব্যথা দিয়েছি?'
সে বলল, 'না।' তবুও আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. তাকে বললেন, 'আজ থেকে তুমি স্বাধীন।'
বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. জমিন থেকে কিছু একটা তুলে নিয়ে বললেন, তাকে স্বাধীন করার কারণে আমি এই বস্তু সমপরিমাণ প্রতিদানও পাব না। কারণ, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
مَنْ ضَرَبَ غُلاَمًا لَهُ حَدًّا لَمْ يَأْتِهِ أَوْ لَطَمَهُ فَإِنَّ كَفَّارَتَهُ أَنْ يُعْتِقَهُ
যে ব্যক্তি বিনা অপরাধে তার গোলামকে প্রহার করল অথবা তাকে চড়-থাপ্পড় দিলো, তাহলে তার সেই গুনাহ মোচনের পন্থা হলো, সেই গোলামকে আজাদ করে দেওয়া।
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাস-দাসী আজাদসংক্রান্ত বাক্যকে এমন এক বাক্য হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন, বলার সাথে সাথে যা বাস্তবায়িত হয়ে যায়। তিনি বলেছেন, তিনটি বিষয়ে রসিকতা প্রযোজ্য নয়-তালাক, বিয়ে ও দাসমুক্তি। এগুলো বলামাত্রই কার্যকর হয়ে যায়।
এমনইভাবে ইসলামি শরিয়ত বিভিন্ন গুনাহ ও অপরাধের একপ্রকার কাফফারা (ক্ষতিপূরণ) নির্ধারণ করেছে দাস মুক্ত করাকে। যেমন, কাউকে ভুলক্রমে হত্যা করা, কসম ভঙ্গ করা, জিহার করা (অর্থাৎ, স্ত্রীকে চিরস্থায়ী মাহরাম কোনো মহিলার সাথে তুলনা করা), রমজান মাসে ইচ্ছাকৃত রোজা ভঙ্গ করা ইত্যাদি। আর নবীজীবনে আমরা এই বিধি প্রয়োগের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। যেমন আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমি তো ধ্বংস হয়ে গেছি!'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কীভাবে তুমি ধ্বংস হলে?!'
সে বলল, 'রমজানের দিন আমি স্ত্রীসহবাস করে ফেলেছি!' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'তুমি কি একটি গোলাম আজাদ করতে পারবে?' সে বলল, 'জি না।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাহলে কি একাধারে দুই মাস রোজা রাখতে পারবে?'
সে বলল, 'তাতে আমি সক্ষম নই।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাহলে তুমি ষাটজন মিসকিনকে আহার করাতে পারবে?'
সে বলল, 'এই সামর্থ্যও আমার নেই।' বর্ণনাকারী বলেন, লোকটি তখন বসে রইল। এর কিছুক্ষণ পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট খেজুরভরতি একটি ঝুড়ি এলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন লোকটিকে ডেকে বললেন, 'নাও, তোমার পক্ষ থেকে এই খেজুরগুলো সদকা করে দাও।'
সে বলল, 'আমার চেয়েও অভাবগ্রস্ত কাউকে?! কিন্তু মদিনার দুই প্রান্তের মাঝে আমার পরিবার থেকে তো অধিক অভাবগ্রস্ত আর কেউ নেই!' লোকটির কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন। এমনকি হাসিতে তাঁর মাড়ির দাঁত দেখা গেল। এরপর তিনি লোকটিকে বললেন, 'যাও, এগুলো তোমার পরিবারকেই আহার করাও।'
এরচেয়েও বড় ব্যাপার হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার নির্দেশনা অনুযায়ী জাকাত প্রদানের একটি খাত নির্ধারণ করেছেন দাসমুক্তির জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّمَا الصَّدَقْتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسْكِينِ وَالْعَمِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَرِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ
জাকাত হলো কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত উসুলকারী ও যাদের চিত্তাকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে জিহাদকারী ও মুসাফিরদের জন্য। (ইত্যাদি খাতে ব্যবহারযোগ্য)। [সুরা তাওবা: ৬০]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান ফারসি রা.-এর সাথে যে আচরণ করেছেন, তার দিকে লক্ষ করলে আমরা ইসলামের এই নীতি বাস্তবায়নে তাঁর গুরুত্ব অনুধাবন করতে সক্ষম হই।
সালমান ফারসি রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে ইসলামগ্রহণের ঘোষণা দিলেন।
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'যাও, তোমার মনিবের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নাও!'
সালমান ফারসি রা. বলেন, তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী আমি আমার মনিবের নিকট গিয়ে বললাম, 'আপনি আমাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিন।' মনিব বলল, 'ঠিক আছে, মুক্ত করে দেবো। তবে বিনিময়ে তুমি আমার জন্য একশ খেজুর গাছ রোপণ করবে। এরপর সেই গাছগুলো যখন (শক্তপোক্তভাবে ভালো করে) গজিয়ে উঠবে, তখন তুমি আমার নিকট একটি খেজুরের বিচি পরিমাণ স্বর্ণ নিয়ে আসবে (তখন আমি তোমাকে মুক্ত করে দেবো)।'
আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে এসে ব্যাপারটি তাঁকে জানালাম। তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, তার দাবি অনুযায়ী তুমি রাজি হয়ে যাও। আর যে কুয়া থেকে তুমি সেই খেজুর গাছগুলোতে পানি সিঞ্চন করবে, সেখান থেকে এক বালতি পানি আমার কাছে নিয়ে এসো।'
সালমান ফারসি রা. বলেন, আমি পানি নিয়ে এলাম। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে বরকতের দোয়া করে দিলেন। এরপর আমি সেই পানি দিয়ে খেজুরগাছে পানি সিঞ্চন করলাম। আল্লাহর কসম! আমি ঠিক একশ খেজুরগাছই রোপণ করলাম আর প্রতিটি গাছই গজিয়ে উঠল!
তখন আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে সংবাদ জানালাম। এবার তিনি আমাকে এক টুকরো স্বর্ণ দিলেন। আমি স্বর্ণের টুকরা নিয়ে মনিবের কাছে চলে গেলাম। এক পাল্লায় রাখলাম স্বর্ণের টুকরা আর অন্য পাল্লায় রাখা হলো খেজুরের বিচি। আল্লাহর কসম! স্বর্ণের টুকরার পাল্লাটিই ভারী হয়ে রইল। (এভাবে মনিবের পাওনা পরিশোধ হয়ে গেলে) আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট চলে এলাম। তখন তিনি আমাকে আজাদ বলে ঘোষণা দিলেন।
এ ছাড়াও ইসলাম গোলামকে মুকাতাবা চুক্তির মাধ্যমে নিজের স্বাধীনতা ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। মুকাতাবা চুক্তি হলো, মালিক ও গোলামের বোঝাপড়ার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে গোলামকে স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া।
অন্যদিকে ইসলাম মুসলমানদেরকে চুক্তিবদ্ধ গোলামদের অর্থ জোগানোর জন্য সহযোগিতার নির্দেশ দেয়। কারণ, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষের প্রকৃত অবস্থা হলো স্বাধীনতা, দাসত্ব আসে অবস্থার প্রেক্ষিতে। (সুতরাং যথাসম্ভব মানুষের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো উচিত।)
মুকাতাবা চুক্তির অর্থ সহযোগিতার ক্ষেত্রেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন উত্তম আদর্শ। তিনি জুওয়াইরিয়া বিনতে হারেস রা.-এর পক্ষ থেকে তার মুকাতাবা চুক্তির অর্থ পরিশোধ করে দেন এবং তাকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করে নেন। মুসলমানরা যখন জুওয়াইরিয়া রা.-এর সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিবাহের কথা শুনলেন, তখন তারা এই বলে তাদের হাতে থাকা বনু মুস্তালিক গোত্রের সকল গোলামকে আজাদ করে দিলেন যে, তারা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আত্মীয়! এভাবে এই বিবাহের মাধ্যমে বনু মুস্তালিকের একশ পরিবারের লোক আজাদ হয়ে যায়।
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাসীকে স্বাধীন করে বিবাহের মাধ্যমে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ সম্পর্কে হজরত আবু মুসা আশআরি রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«أَيُّمَا رَجُلٍ كَانَتْ عِنْدَهُ وَلِيدَةً فَعَلَّمَهَا فَأَحْسَنَ تَعْلِيمَهَا وَأَدَّبَهَا فَأَحْسَنَ تَأْدِيبَهَا ثُمَّ أَعْتَقَهَا وَتَزَوَّجَهَا فَلَهُ أَجْرَانِ....»
যে আপন ক্রীতদাসীকে উত্তমরূপে ইলম শিক্ষা দেয় এবং উত্তমভাবে শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়, এরপর তাকে মুক্ত করে বিয়ে করে নেয়, তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব।
এ কারণে আমরা দেখি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফিয়্যা বিনতে হুয়াই রা.-কে স্বাধীন করে বিবাহ করে নেন। আর এই বিয়েতে সফিয়্যা রা.-এর স্বাধীনতাকেই তার মহর ধার্য করা হয়েছিল।
যুদ্ধবন্দিদের দাস-দাসী বানানোর যে নীতিটি নিয়ে ইসলামবিদ্বেষীরা আপত্তি-অভিযোগ উত্থাপন করে থাকে, সেই পথটিকেও মূলত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত সংকোচন করে দিয়েছেন। তিনি যুদ্ধবন্দিদের জন্য এমন কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন, যা ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো মতাদর্শে ছিল না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শর্ত করেছেন, যুদ্ধবন্দিদের দাস-দাসী হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেবে কেবল রাষ্ট্রপ্রধান। আর রাষ্ট্রপ্রধান তাদের ব্যাপারে দাসত্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে নিম্নবর্ণিত পদক্ষেপগুলোও গ্রহণ করতে পারবে। যথা:
এক. বন্দিবিনিময়। অর্থাৎ মুসলমান যুদ্ধবন্দিদের বিনিময়ে শত্রুপক্ষের যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেওয়া।
দুই. মুক্তিপণ গ্রহণ করা। তা হতে পারে অর্থের বিনিময়ে কিংবা শিক্ষা-প্রশিক্ষণসংক্রান্ত কোনো বিষয়ের বিনিময়ে। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের যুদ্ধবন্দিদের কাউকে অর্থের বিনিময়ে মুক্ত করেন আর কারও ক্ষেত্রে মুক্তিপণ নির্ধারণ করেন কতক মুসলমানকে লেখাপড়া শেখানো।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধবন্দিদের দাস-দাসী বানানো তৎকালে যুদ্ধের সাধারণ রীতি ছিল এবং শত্রুরাও মুসলিম যুদ্ধবন্দিদের সাথে এ আচরণ করত। যেমন যায়েদ বিন দাছিন্না রা. ও খুবাইব বিন আদি রা.-এর ক্ষেত্রে করা হয়েছিল। সুতরাং প্রতিব্যবস্থা হিসেবে মুসলমানরাও যদি শত্রুদের সাথে তেমন আচরণ না করত, তাহলে তারা আরও বেশি দুঃসাহসী হয়ে উঠত। এরপরও ইসলামে শত্রুদলের সাথে এই সন্ধিচুক্তির সুযোগ রয়েছে যে, তারা কেউ কাউকে দাস বানাবে না। তারা যদি প্রতিজ্ঞা করে তবে আপনিও তাদের প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন। দাস-দাসীদের স্বাধীন করার বিষয়ে ইসলাম এমনই বিজ্ঞ ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করেছে। যেভাবে দাসত্বের পথকে যেভাবে সংকোচন করে এনেছে, ঠিক সেভাবে স্বাধীনতা ও মুক্তির পথকে করেছে সম্প্রসারিত, যা ছিল পর্যায়ক্রমিক উন্নতির পন্থায় এবং তৎকালীন পরিবেশের সাথে সংগতিপূর্ণ।
টিকাঃ
৭০৯. একটি সতর্কতা: এখানে লেখকের উদ্দেশ্য এটি নয় যে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো একটি সত্য বিধান উচ্চারণ করতে গিয়ে সমাজের ভয়ে পিছিয়ে থেকেছেন। বরং মানুষের বদ্ধমূল মানসিকতাকে গুরুত্ব দিয়ে উপযুক্ত বিধানের জন্য প্রস্তুত করে তোলার জন্য প্রজ্ঞার সাথে বিধান প্রদান করার যে পন্থা তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তা উদ্দেশ্য। দাসপ্রথা প্রসঙ্গে এই কথাটিও পাঠকের জানা প্রয়োজন, মৌলিকভাবে দাসপ্রথা উচ্ছেদ করা বা তৎকালে দাসপ্রথার সঙ্গে চর্চিত জুলুম, নির্যাতনকে লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেওয়া, কোনোটিই আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তাঁর ইনতেকালের সময় প্রসঙ্গটি যেভাবে বিধিবদ্ধরূপে ছিল, সেটাই এখন ইসলামি শরিয়তের চিরন্তন বিধান।-সম্পাদক
৭১০. বসরার দজলা নদীর তীরে অবস্থিত একটি শহরের নাম। পারস্যবাহিনীর বিরুদ্ধে এখানে হজরত খালেদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর নেতৃত্বে লড়াই হয়। এই যুদ্ধকে 'জাতুস সালাসিল' (শেকলের যুদ্ধ) বলা হয়। এই যুদ্ধে মুসলিম মুজাহিদদের সংখ্যা ছিল আঠারো হাজার আর পারস্যবাহিনীর সংখ্যা ছিল ঘাট হাজার। এই যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয়লাভ করে। সূত্র: ইয়াকুত হামাবি : মুজামুল বুলদান: ১/৪৩।
৭১১. সহিহ বুখারি: ২৫১৭, সহিহ মুসলিম: ১৫০৯।
৭১২. সহিহ মুসলিম: ১৫০৯, সুনানে তিরমিজি: ১৫৪৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৫২২।
৭১৩. সহিহ বুখারি: ২৫৫২, সহিহ মুসলিম: ২২৪৯।
৭১৪. সহিহ মুসলিম: ১৬৬১, মুসনাদে আহমাদ: ২১৫২১, আল-আদাবুল মুফরাদ: ১/৭৬।
৭১৫. সহিহ মুসলিম: ১৬৫৭, সুনানে আবু দাউদ: ৫১৬০।
৭১৬. সুনানে তিরমিজি: ১১৮৪।
৭১৭. সহিহ বুখারি: ৬৭০৯, সহিহ মুসলিম: ১১১১।
৭১৮. মুসতাদরাকে হাকেম: ৬৫৪৪, মুজামুল কাবির লিত-তাবারানি: ৬০৭৩।
৭১৯. সালেহি শামি : সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ: ১১/২১০, সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ: ৪/১৮, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/৩০৩।
৭২০. সহিহ বুখারি: ৫০৮৩।
৭২১. সহিh বুখারি: ২৮৮৯, সহিh মুসলিম: ১৩৬৫।
৭২২. ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা: ২/২৬৩।
৭২৩. প্রিয় পাঠক, আমরা আল্লাহর সৃষ্ট অতি দুর্বল বান্দা মাত্র। বাহ্যিক থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক, সকল ক্ষেত্রেই আমাদের সীমাবদ্ধতার পরিমাণ বেশি। আর প্রভু হিসেবে এই জগৎসংসারের জন্য প্রযোজ্য অনিবার্য নিয়মনীতি ও বিধিবিধানের ব্যাপারে তিনিই সর্বজ্ঞাত। এটি একজন মুসলিমের অন্যতম প্রধান বিশ্বাস। সুতরাং দাসপ্রথা হোক বা অন্যকিছু, আল্লাহ তাআলা যে-সমস্ত বিষয়ের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছেন, সেসব ক্ষেত্রে আমাদের 'আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য করলাম'-এর পন্থা অবলম্বন করা আবশ্যক। বিশেষত বুদ্ধিবৃত্তিক পাশ্চাত্য আগ্রাসনের এ যুগে 'আনুগত্য করলাম'-এর নীতি পালন আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। আমাদের মনে গেঁথে নিতে হবে, আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা, প্রভু, প্রতি মুহূর্তের রিজিকদাতা। আমাদের প্রত্যাবর্তনও তাঁর দিকে। সর্বদিক দিয়ে আমরা তাঁর বন্ধনে আবদ্ধ। শুধু তাই নয়, মহাবিশ্বের পুরোটুকুতেই তাঁর একচ্ছত্র অধিকার এবং তাঁর বিজ্ঞতাও অপরিসীম। সুতরাং তিনি আমাদেরকে যেসব নীতি ও বিধান পালনের নির্দেশ দিয়েছেন, সেসবের সুষ্ঠুতা ও নৈতিকতার বিশ্বাস এবং তা পালনের ক্ষেত্রে মনোবল ও সাহসিকতা রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর রিজিক ও অবদান অস্বীকারকারী অকৃতজ্ঞ কতক দুর্বল সৃষ্টি ও ইসলামবিদ্বেষীর আপত্তির মুখে আল্লাহর মতো মহান সত্তার বিধানের ক্ষেত্রে কোনোরূপ কোণঠাসা মনোভাব পোষণ করা শক্তিশালী ঈমানের পরিচয় নয়। বরং আমরা তাদের সৃষ্ট নৈতিকতার মানদণ্ড ছুড়ে ফেলে উচ্চৈঃস্বরে বলে যাব, 'আমাদের আল্লাহর বাণীই চিরসত্য, তার মানদণ্ডই সর্বোপযোগী।' -সম্পাদক
📄 ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের সূত্রে কুরআন রচনার অভিযোগ
কেউ কেউ অভিযোগ উত্থাপন করে বলে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসমান থেকে মূলত কোনো ওহি আসেনি, বরং তিনি এই কুরআন সৃষ্টি করেছেন ইহুদি-খ্রিষ্টানদের গ্রন্থাবলি (তাওরাত-ইনজিল) থেকে। তারা তাদের এই দাবির পক্ষে যেগুলো দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে, সেগুলো নিছক তাদের অনুমান ও ধারণা, যা প্রমাণ হিসেবে গণ্য করার মতো নয়।
তাদের এসব অমূলক ধারণার মধ্যে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ একটি হলো, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বালক অবস্থায় সারজিয়াস, গারজিস অথবা বাহিরা (বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন নাম পাওয়া যায়) নামক পাদরির সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
দ্বিতীয় একটি ধারণা হলো, সম্ভাবনা আছে যে তিনি এই কুরআনের ধারণা লাভ করেছেন (খ্রিষ্টান পাদরি) ওরাকা বিন নাওফলের কাছ থেকে।
এর পাশাপাশি আরও নানা ধরনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়, যেগুলো এর থেকে আরও দুর্বল। যেমন, আরব অঞ্চলের কিছু কিছু জায়গায় ইহুদিরা বসবাস করত এবং পুরো আরবজুড়ে ছিল অনেক হাবশি গোলামের বসবাস, যাদের শেকড় ছিল খ্রিষ্টান অঞ্চল হাবশা। তা ছাড়া মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবক বয়সে খাদিজার ব্যবসার মালামাল নিয়ে খ্রিষ্টান অঞ্চল শাম সফর করেছিলেন।
প্রাচ্যবিদ এমিল ডারমেনহেম (Emile Dermenghem) তার লেখা হায়াতু মুহাম্মাদ (মুহাম্মাদের জীবন) নামক গ্রন্থে এ ধরনের সকল সম্ভাবনা এবং মক্কাতে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের অবস্থানের প্রতি নির্দেশ করে, এমন সকল বিবরণ একত্র করার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়েছে। এমনকি কুরআন তৈরির জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবশ্যই তাদের নিকট গমনাগমন ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত হতে হবে বলে হইচই করেছে। এমিল ডারমেনহেমের মতো উইলিয়াম মন্টগোমারি ওয়াটও একই কাজ করেছে তার মুহাম্মাদ ফি মাক্কা (মক্কায় মুহাম্মাদ) নামক গ্রন্থে।
তবে বাস্তব কথা হলো, তাদের এসব অভিযোগ নানা ধরনের ফাঁকফোকরে ভরপুর। আমার মনে হয়, কোনো বুদ্ধিমান মানুষ এ ধরনের কথাবার্তার ওপর ভিত্তি করে কখনোই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না। নিম্নে এ সকল কথাবার্তা অগ্রহণযোগ্য হওয়ার কিছু কারণ তুলে ধরছি। যথা :
এক.
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন-ইতিহাস অতীতের যেকোনো ব্যক্তির তুলনায় অধিক জ্ঞাত ও পরিচিত। তাঁর জীবনের সকল তথ্য ও ঘটনা বহু বিশ্লেষণ ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে গৃহীত হয়েছে। ফলে (তালাশে আগ্রহী) যেকোনো মানুষের জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিষয়ে উত্থাপিত কোনো কথা ও বর্ণনার শুদ্ধ্যশুদ্ধি সম্পর্কে অবগত হওয়া খুবই সহজ। সুতরাং বিশুদ্ধ বর্ণনা, এমনকি দুর্বল বর্ণনাও ছেড়ে দিয়ে শুধু অনুমান ও কল্পনার পেছনে দৌড়ানোর কোনো অর্থ হয় না। এসব অনুমাননির্ভর কথার কী মানে যে, আরব অঞ্চলে বেশ কিছু ইহুদি-খ্রিষ্টানের বসবাস অথবা শাম দেশে ব্যবসার জন্য যাতায়াতের সময় আহলে কিতাবদের সাথে তাঁর দেখা হওয়ার মধ্য দিয়েই তিনি ইহুদি-খ্রিষ্টানদের শিক্ষা থেকে কুরআন তৈরিতে মূল শক্তি পান?!
দুই.
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, জন্ম থেকে আমরণ তিনি কিছু লিখতে-পড়তে জানতেন না। অথচ কারও থেকে জ্ঞানার্জনের জন্য লেখাপড়া জানা এক অপরিহার্য বিষয়, বিশেষ করে সেটা যদি হয় ধর্মীয় বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট। তা ছাড়া জ্ঞানার্জনের জন্য অপরিহার্য হলো শিক্ষকের নিকট ছাত্রের অব্যাহত যাতায়াত এবং তার নিকট অবস্থান। অথচ আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইতিহাসে এমন কোনো বিশুদ্ধ বর্ণনা, এমনকি দুর্বল বর্ণনাও পাই না, যেখানে তাঁর কোনো স্থানে কিংবা কোনো বিশেষ ব্যক্তির নিকট নিয়মতান্ত্রিক যাতায়াতের সংবাদ রয়েছে। বিশেষত তাঁর প্রথম ব্যবসায়িক ভ্রমণে তিনি কখনো তাঁর চাচার থেকে আলাদা হননি। তদ্রূপ বুসরা গমনকালে হজরত খাদিজা রা.-এর গোলাম মায়সারা থেকেও তিনি কখনো পৃথক হননি। কারণ, উক্ত সফরে মায়সারা স্বীয় মালিক খাদিজা রা.-এর মালামাল হেফাজতের জন্য তাঁকে গভীর পর্যবেক্ষণে রেখেছিল। তা ছাড়া এই ধরনের ভ্রমণগুলোতে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ততটুকুই জ্ঞানার্জন করতে পারে, যেমনটি বলেছে কারেন আর্মস্ট্রং, 'খুবই সামান্য কিছু জ্ঞান।
তিন.
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিতান্ত বালক বয়সে তাঁর চাচার সাথে বৈদেশিক ভ্রমণ করেছিলেন। সেই ভ্রমণে এক নাসতুরি পাদরির সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স তখনও ১২ পেরোয়নি। তাহলে বলুন, কীভাবে এত অল্প বয়সের এক বালকের পক্ষে মাত্র একবারের সাক্ষাতে সেই পাদরির কাছ থেকে কিছু আত্মস্থ করে নেওয়া সম্ভব?! এ ছাড়া তাদের উভয়ের ভাষাও ছিল ভিন্ন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরবি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা জানতেন না, আবার পাদরি ছিল সুরয়ানি ভাষার লোক। উপরন্তু এর কি কোনো সদুত্তর আছে যে, তিনি এই ঘটনার পর মক্কায় ফিরে এতগুলো বছর অবস্থান করলেন, এ সময়ে তার মধ্যে কোনো ধরনের পরিবর্তন দেখা গেল না, বরং সুদীর্ঘ আটাশ বছর পর তিনি সেটা প্রকাশ করলেন আর তার প্রচার-প্রসারে অবর্ণনীয় জুলুম-নির্যাতন ভোগ করে গেলেন?!
প্রখ্যাত ইংরেজ চিন্তাবিদ থমাস কার্লাইল বলেন, আমি বুঝি না, যে সারজিয়াস (বাহিরা) পাদরি আবু তালিব ও মুহাম্মাদ তার ঘরে মেহমান হওয়ার কথা জানিয়েছে তার ব্যাপারেই কী বলব, আবার এত অল্প বয়সের একজন বালক কোনো ধর্মপণ্ডিতের কাছে কী শিখবে বলে বাহিরা আশা করেছিলেন সে ব্যাপারেই কী বলব! কারণ, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স তখনও ১৪ পেরোয়নি, আবার তিনি তাঁর ভাষা আরবি ছাড়া অন্য কোনো ভাষাও জানতেন না। এ ছাড়াও নিঃসন্দেহে বলা যায়, তৎকালীন শামদেশের পরিবেশ ও বহু পরিস্থিতি তাঁর দৃষ্টিতে ছিল গোলমেলে, না সেগুলো তাঁর পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব ছিল আর না সেগুলো বোধগম্য করা।
চার.
এর কি সদুত্তর হবে যে, আল-কুরআনের বাণীগুলো এত বেশি ভাষাগত বিশুদ্ধতা ও আলংকারিক বৈশিষ্ট্যসংবলিত যে, তার মাধ্যমে পুরো আরবজাতির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়েছে, অথচ আরবরা হলো আরবি ভাষা-সাহিত্যের সর্বোচ্চ পণ্ডিত ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। অন্যদিকে আরবি ভাষা সম্পর্কে সেই পাদরির কোনো জ্ঞানই ছিল না।
তা ছাড়া কুরআনের আলংকারিক বৈশিষ্ট্যের কথা তো এমন ব্যক্তিরাও স্বীকার করেছে, যারা আরবি ভাষাও ভালো করে জানে না আবার ইসলাম ও মুসলমানদেরকেও পছন্দ করে না। যেমন থমাস আর্নল্ড লিখেছেন, খ্রিষ্টানদের মধ্যে অনেককেই আমরা দেখি, যেমন আলভার (যার ইসলামবিদ্বেষ সর্বজন-পরিচিত) স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, অতি চমৎকার ও আলংকারিক বাক্যরীতিতে কুরআনের রচনা সম্পন্ন হয়েছে। তার আকর্ষণ এতটাই তীব্র যে, খ্রিষ্টানরা পর্যন্ত বাধ্য হয় তা পাঠ করতে এবং মুগ্ধ হতে!
আলোচিত বিষয়টির খণ্ডনেই কুরআনুল কারিমের এই আয়াতটি নাজিল হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَتَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ لِسَانُ الَّذِى يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَبِي وَهُذَا لِسَانٌ عَرَبِي مُّبِينٌ)
(হে নবী,) আমার জানা আছে যে, তারা আপনার সম্পর্কে) বলে, তাকে তো একজন মানুষ শিক্ষা দেয়। (অথচ) তারা যার প্রতি এটা আরোপ করে, তার ভাষা আরবি নয় আর এটা (অর্থাৎ কুরআনের ভাষা) স্পষ্ট আরবি ভাষা! [সুরা নাহল : ১০৩]
পাঁচ.
মক্কার মুশরিকদের কেউ কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মোকাবিলায় এ ধরনের কথা বলেনি। বস্তুত তাদের নিকট এই অপবাদের যদি কোনো মূল্য থাকত কিংবা আহলে কিতাব কোনো আলেমের সাথে তাঁর দেখাসাক্ষাতের ব্যাপারে সম্ভাবনা থাকত বা এ ধরনের কোনো ব্যাপারের ক্ষীণতর চিহ্নও দেখা দিত, তাহলে অবশ্যই তারা তা নিয়ে হইচই করত এবং তাঁর ওপর অপবাদের বর্শা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত! কিন্তু না, তারা এমন কিছুই করেনি। তবে হ্যাঁ, মাত্র একবার তারা এ চেষ্টা করেছিল। তারা তখন সম্ভব-অসম্ভব যেকোনো উপায়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর আঘাত ও অপবাদ আরোপের চেষ্টায় ছিল। কিন্তু তাদের সেই অপলাপটিও সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়। তখনও তারা তাঁর শিক্ষকের ভূমিকায় নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম বলতে ব্যর্থ হয়। এ ছাড়া তাদের মূল অপবাদটি ছিল এই যে, এগুলো (কুরআনুল কারিমের বাণী) ছিল বানোয়াট কথাবার্তা এবং প্রাচীন কালের অলিক কল্পকাহিনি। সুতরাং তাদের নিকট সামান্যতম সম্ভাবনাও ছিল না যে, কুরআন আহলে কিতাব কোনো শিক্ষক থেকে গৃহীত কিংবা তা মূলত আহলে কিতাবদের নিকট সংরক্ষিত জ্ঞানের উচ্চারণ। কাফেরদের বিবরণ উপস্থাপন করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَالَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا إِنْ هَذَا إِلَّا إِفْكٌ افْتَرَاهُ وَأَعَانَهُ عَلَيْهِ قَوْمٌ أَخَرُونَ فَقَدْ جَاءُوا ظُلْمًا وَزُورًا وَقَالُوا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ اكْتَتَبَهَا فَهِيَ تُمْلَى عَلَيْهِ بُكْرَةً وَأَصِيلًا)
যারা কুফরি করেছে তারা বলে, এটি (অর্থাৎ কুরআন) এক মনগড়া জিনিস ছাড়া কিছুই নয়, যা সে নিজে রচনা করেছে এবং অপর এক গোষ্ঠী তাঁকে এ কাজে সাহায্য করেছে। এভাবে (এ মন্তব্য করে) তারা ঘোর জুলুম ও প্রকাশ্য মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়েছে। তারা (আরও) বলে, এটা তো পূর্ববর্তী লোকদের লেখা আখ্যান, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে। সকাল-সন্ধ্যায় সেটাই তাঁর সামনে পড়ে শোনানো হয়।' [সুরা ফুরকান: ৪-৫]
বরং মক্কার মূর্খ কাফেররাই বারবার আহলে কিতাবদের নিকট ছুটে গিয়েছে, যেন তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত বক্তব্য সম্পর্কে মূল্যায়ন ব্যক্ত করে, তাঁর সত্য-মিথ্যা নিয়ে কোনো মন্তব্য প্রদান করে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামসময়িক কেউ কখনো এমন দাবি করেনি যে, তার থেকে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু শিখেছে। বাহিরা পাদরিও না, আবার আরব অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোনো আহলে কিতাবও না। বরং আহলে কিতাবরা সর্বদা তাঁর সামনে জটিলতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে তাঁর মুশরিক সম্প্রদায়কে সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। এমনকি তাদের কাছে আসমানি গ্রন্থের জ্ঞান থাকার যে কথা প্রসিদ্ধ ছিল, সেটাকে পুঁজি করে তারা বলে বেড়াত,
وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هَؤُلَاءِ أَهْدَى مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا سَبِيلًا
তারা কাফেরদের সম্বন্ধে বলে, মুমিনদের চেয়ে তারাই বেশি সরল পথে আছে। [সুরা নিসা : ৫১]
কখনো কখনো মুশরিকরা আহলে কিতাবদের শরণাপন্ন হতো, তখন তারা মুশরিকদের এমন কিছু প্রশ্ন শিখিয়ে দিত, যেগুলোর উত্তর কেবল একজন নবীই বলতে পারেন। যেমন, একবার নজর ইবনে হারেস এবং উকবা বিন আবি মুয়িত মদিনার ইহুদিদের কাছে গেল এবং তাদেরকে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খবর শোনালো। ইহুদি পণ্ডিতরা তাদেরকে বলল, তোমরা গিয়ে তাকে তিনটি বিষয়ে প্রশ্ন করবে, যদি সে প্রশ্ন তিনটির যথাযথ উত্তর দিতে পারে তাহলে বুঝবে, সে আসলেই একজন নবী, আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত রাসুল। আর যদি উত্তর দিতে না পারে, তাহলে বুঝবে সে নবুয়তের মিথ্যা দাবিদার। প্রশ্ন তিনটি হলো :
১. তোমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করবে, পূর্বযুগের সেই যুবকদের (অর্থাৎ আসহাবে কাহফ) ঘটনা কী ছিল? তাদের সাথে বেশ আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছিল।
২. এরপর জিজ্ঞেস করবে, সেই পরিভ্রমণকারী ব্যক্তির (অর্থাৎ বাদশাহ জুলকারনাইন) ঘটনা কী, যিনি পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম ভ্রমণ করেছিলেন?
৩. এরপর জিজ্ঞেস করবে রুহ সম্পর্কে, রুহ কী? মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, অর্থাৎ প্রথম দুই প্রশ্নের প্রকৃত ঘটনা আর তৃতীয়টির বৈশিষ্ট্য (অর্থাৎ, রুহ আল্লাহ তাআলার বিশেষ আদেশ হওয়ার কথা), তাহলে বুঝবে তিনি আল্লাহর নবী, তার আনুগত্য মেনে নিয়ো।
আহলে কিতাবদের সাথে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পর্ক না থাকার আরও বড় প্রমাণ হচ্ছে, স্বয়ং মদিনার ইহুদিরাই এই প্রত্যয়ে ছিল যে, তিনি তাদের কিতাবের ইলম রাখেন না। এ কারণে তিনি মদিনাতে থাকাকালীন একবার তারা তাঁর ব্যাপারে এই আপত্তি উত্থাপন করল যে, মুহাম্মাদ কীভাবে ইবরাহিমের ধর্ম অনুসরণের দাবি করে, আবার সে উটের গোশত ও দুধও খায়, অথচ তা ইবরাহিমের ধর্মে নিষিদ্ধ?! তখন তাদের কথার খণ্ডনে আল্লাহ তাআলা এই আয়াতটি নাজিল করেন,
كُلُّ الطَّعَامِ كَانَ حِلًّا لِبَنِي إِسْرَائِيلَ إِلَّا مَا حَرَّمَ إِسْرَائِيلُ عَلَى نَفْسِهِ مِنْ قَبْلِ أَنْ تُنَزَّلَ التَّوْرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِالتَّوْرَاهِ فَاتْلُوهَا إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ
তাওরাত নাজিল হওয়ার আগে বনি ইসরাইলের জন্য সমস্ত খাদ্যদ্রব্যই হালাল ছিল (যা বর্তমান মুসলিমদের জন্য হালাল), কেবল সেই বস্তু ছাড়া যা ইসরাইল (অর্থাৎ ইয়াকুব আলাইহিস সালাম) নিজের জন্য হারাম করেছিল। (হে নবী, ইহুদিদেরকে) বলে দিন, তোমরা যদি সত্যবাদী হও তাহলে তাওরাত নিয়ে এসে তা পাঠ করো। [সুরা আলে ইমরান : ৯৩]
আরেকবার ইহুদিরা তাদের দুই ব্যভিচারীকে রজমের শাস্তি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। তারা ব্যভিচারীদের বিচার নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আগমন করে। তখন তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তাওরাতে (ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে) রজমের ব্যাপারে কী বলা আছে?'
তারা বলল, 'ব্যভিচারীদেরকে অপদস্থ করা হবে এবং বেত্রাঘাতের সম্মুখীন করা হবে।' মজলিসে আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা. উপস্থিত ছিলেন। এ কথা শুনে তিনি বললেন, 'তোমরা মিথ্যা বলছ, তাওরাতে রজমের বিধান রয়েছে!' তখন তারা তাওরাত নিয়ে এসে খুলে বসল এবং তাদেরই একজন রজমের আয়াতের ওপর হাত রেখে আগে-পরের আয়াতগুলো পড়ে শোনালো।
তখন আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা. তাকে বললেন, 'হাত ওঠাও!' বাধ্য হয়ে সে হাত ওঠালো। হাত ওঠালে দেখা গেল সেই স্থানেই রজমের আয়াতটি রয়েছে। তখন ইহুদিরা স্বীকার করল, 'হ্যাঁ, মুহাম্মাদ, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম সত্য বলেছে। এখানে রজমের আয়াত রয়েছে।'
মূলকথা, স্বয়ং আহলে কিতাবরাও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে এই ধরনের আজগুবি সম্ভাবনার কথা বলেনি। তারা এই অনুমানও করেনি যে, তিনি তাদের গ্রন্থের বিষয়াদি সম্পর্কে অবগত আছেন।
সাত.
এমন একটা দাবি কি পুরোপুরি হাস্যকর ও বোকামি নয় যে, তখন এমন একজন গভীর জ্ঞানসম্পন্ন পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন, যিনি এতটা উন্নত, যুগশ্রেষ্ঠ মতবাদ ও জ্ঞানের উদ্ভব ঘটিয়েছিলেন?! উপরন্তু নিজের বিদ্যাবুদ্ধি ও জ্ঞানগরিমা মানুষের নিকট পৌঁছানোর প্রবল আগ্রহ সত্ত্বেও তিনি ছিলেন এতটা নিভৃতচারী এবং দুনিয়াবিমুখ?! তবুও যদি তাঁর অস্তিত্ব মেনে নেওয়া হয় এবং তাঁকে একজন আরব হিসেবেই গণ্য করা হয়, তবুও তাঁর থেকে সেই জ্ঞান অর্জনের জন্য অব্যাহত সাক্ষাৎ ও অবিরাম সাহচর্যের মাধ্যমে সেই শিক্ষা আত্মস্থ করার আবশ্যকতা রয়েছে। কারণ, নিছক দু-একবারের সাক্ষাতে কুরআন-হাদিসের মতো এই বিশাল অলৌকিক জ্ঞানভান্ডার অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই অনিবার্যভাবেই তাদের বহু সাক্ষাতের প্রয়োজন হয়েছে। এবার আপনারাই বলুন, এই অবস্থায় তাদের জন্য সর্বোচ্চ গোপনীয়তার ইচ্ছা সত্ত্বেও তারা কি তাতে সফল হতে পারবে?!
এটাও কি চরম পর্যায়ের আশ্চর্যজনক বিষয় নয় যে, এমন একজন ব্যক্তি যিনি বহু যোগ্যতা, প্রশাসন পরিচালনা ও নেতৃত্বের মতো মহৎ গুণে গুণান্বিত, একইসাথে যিনি নিজের অভিজাত বংশ, মানুষের ভালোবাসা ও মূল্যায়ন লাভের মাধ্যমে সম্মানের সর্বোচ্চ শিখরে উপবিষ্ট। এরপর তিনি নবুয়তের দাবি করলেন। তারপর থেকে তাঁর সকল কথাবার্তা, কাজকর্ম, ওঠাবসা লক্ষ করা শুরু হলো, সকলেই তাঁর গোমর ফাঁস হওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে রইল। অথচ মানুষের এই সজাগ-সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি তাঁর সেই গোপন শিক্ষকের সাথে বারবার সাক্ষাৎ ও শিক্ষাগ্রহণের কাজ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়ে গেলেন! তা ছাড়া (এমন মহৎ চরিত্রের ব্যক্তি হয়েও) তিনি জীবনে একটিবারের জন্যও সেই শিক্ষকের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করলেন না, যে কারণে এই জ্ঞান-প্রজ্ঞার কোনোকিছুই প্রকৃত দাতার দিকে সম্বন্ধিত হলো না!!
আট.
কুরআনুল কারিম অবতীর্ণ হতো অল্প অল্প করে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে। এভাবে দীর্ঘ তেইশ বছরে কুরআনের অবতরণ সম্পন্ন হয়। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতেকালের পর সেই ছড়িয়ে থাকা কুরআনকে একত্র করে একটি গ্রন্থের রূপ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, কুরআন এমন কোনো গ্রন্থ ছিল না, যা পূর্ণাঙ্গরূপে রচনার পর একবারে মানুষের সামনে প্রকাশ করা হয়েছে। বরং তা ছিল যুগের এক গতিশীল অধ্যায়, যা প্রতিনিয়ত কিছু কিছু করে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আর এই একটি ব্যাপারই 'কুরআন কারও কাছ থেকে প্রাপ্ত হওয়া'-সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণার মূলোৎপাটনের জন্য যথেষ্ট।
নয়.
এমন বহু বিশুদ্ধ বর্ণনা রয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কখনো ওহি আসত ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দ করে, ওহি নাজিলের ক্ষেত্রে যা ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে কষ্টকর। সেই অবস্থা শেষ হতেই তিনি দেখতেন, (জিবরাইল আলাইহিস সালাম) যা বলেছেন, সেটা তাঁর আত্মস্থ ও মুখস্থ হয়ে গেছে। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. প্রচণ্ড শীতের দিনেও ওহি নাজিল হওয়ার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ললাট দিয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরে পড়তে দেখেছেন।
বস্তুত এগুলো এমন কিছু অবস্থা, যে ক্ষেত্রে অভিনয় করা সম্ভব নয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই অস্বাভাবিক অবস্থাগুলোর কারণে কিছু সমালোচকের মন্তব্য ছিল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃগী কিংবা এ জাতীয় কোনো রোগে আক্রান্ত। এ ব্যাপারে রোনাল্ড বডলির কথা উল্লেখ করে দেওয়াই তাদের জবাবের জন্য যথেষ্ট হবে আশা করি। তিনি লিখেছেন, মৃগী, ম্যালেরিয়া কিংবা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোমায় আক্রান্ত ছিলেন, তাঁর ক্ষেত্রে এ জাতীয় যা কিছুই বলা হোক না কেন, এর কোনোটিই (তাদের স্বার্থ উদ্ধারে) কোনো উপকারে আসবে না। কারণ, মৃগীরোগ কখনো কাউকে নবী বা জীবনবিধান প্রবর্তকের আসনে উন্নীত করতে পারে না। কখনো কাউকে সম্মান ও নেতৃত্বের আসনেও বসাতে পারে না। বরং কারও মধ্যে এই ধরনের সমস্যা দেখা দিলে আগেকার মানুষেরা তাকে মনে করত পাগল কিংবা জিনের আছরগ্রস্ত। তবে এই অবস্থা সত্ত্বেও যাকে বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার গুণে গুণান্বিত করা যায়, তিনিই হলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
দশ.
কুরআনুল কারিম অতি স্পষ্টভাষায় আহলে কিতাবদের বিভিন্ন বিষয়ের নিন্দা জানিয়েছে। যেমন, তাদের অন্তরের রুক্ষতা, আসমানি গ্রন্থের বিকৃতি সাধন, স্বয়ং তাওরাত ও ইনজিলে যে নবীর অনুসরণের কথা বলা হয়েছে, তাকে অস্বীকার। কুরআন ইহুদি-খ্রিষ্টানদের অনেক মৌলিক আকিদা-বিশ্বাসকেও প্রত্যাখ্যান করেছে, যেমন হজরত উজাইর ও ঈসা আলাইহিমাস সালামকে আল্লাহর পুত্র মনে করা, খ্রিষ্টানদের নিকট ঈসা আলাইহিস সালামকে শূলে চড়ানোর বিশ্বাস, সমগ্র মানবজাতির ওপর ইহুদিদের শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাস। এমন আরও বহু মৌলিক বিষয়ের পার্থক্যও তুলে ধরেছে কুরআনুল কারিম। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, আহলে কিতাবদের সীমালঙ্ঘনপূর্ণ আকিদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনার ব্যাপারে ইসলাম কী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে, যার মাধ্যমে ইসলামধর্মের সাথে ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্মের পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে যায়।
এ ছাড়া পবিত্র কুরআন আহলে কিতাবদের কাছের মনে করার এবং কাফের, মুশরিকদের তুলনায় তাদেরকেই مسلمانوں অধিকতর নিকটবর্তী ভাবার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের নারীদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং তাদের জবাইকৃত প্রাণী খাওয়ার বৈধতা দিয়েছে। তাদের নবী হজরত ইবরাহিম, ইসহাক, ইয়াকুব, দাউদ, সুলাইমান, ইয়াসা, মুসা এবং ঈসা আলাইহিমুস সালামের নবুয়তের স্বীকৃতি প্রদান করেছে। পূর্ণ সম্মান বজায় রেখে তাদের আলোচনা বিবৃত করেছে। হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের মুজিজার কথা, তার পবিত্র কুমারী মায়ের দোষমুক্তির ঘোষণা করেছে। এভাবে উভয় জাতির মাঝে বিশাল মিল ও সাদৃশ্য বর্ণিত হয়েছে এবং এর মাধ্যমে একে অপরের কাছাকাছি হওয়ারও আহ্বান করা হয়েছে। নিশ্চয় এগুলো অন্য কিছু থেকে নকলকারী ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যও নয়, আবার পূর্ব থেকে অস্তিত্বশীল কোনো বিষয় বা নবদীক্ষালাভকৃত বিষয়ের অনুসরণও নয়। বরং তাঁর এ সমস্ত অবস্থান ও সিদ্ধান্ত ছিল অতি সচেতনতাপূর্ণ, স্পষ্ট, সুদৃঢ় এবং স্থানকালের প্রভাবমুক্ত। এই ক্ষেত্রে আমরা ইংরেজ চিন্তাবিদ লেটনারের একটি বক্তব্য উল্লেখ করতে পারি। তিনি বলেন, ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে আমার যতটুকু জানাশোনা আছে সে অনুযায়ী বলতে পারি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে জ্ঞান লাভ করেছেন সেটা (মানুষ) কারও থেকে গৃহীত নয়, বরং তাঁর নিকট প্রত্যাদেশের মাধ্যমেই তা প্রদান করা হয়েছে।
এগারো.
ড. মরিস বুকাইলির গবেষণা। তিনি ছিলেন অনারব, ফ্রান্সের অধিবাসী। তিনি কোনো মুসলমান ছিলেন না এবং মুসলমান হওয়ার কোনো ইচ্ছাও তার ছিল না। তিনি তাওরাত, ইনজিল ও কুরআন এই তিন গ্রন্থের তথ্যের আলোকে আধুনিক বিজ্ঞানের তথ্যগুলোর তুলনামূলক পাঠ-পর্যালোচনা করেন। তিনি তখন বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করেন, একমাত্র কুরআনের বর্ণনাগুলোই এমন, যার সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের (প্রমাণিত) কোনো তথ্যই সাংঘর্ষিক নয়। কুরআন অবতরণের চৌদ্দশ বছর পরও কোনো বিষয়ে বৈজ্ঞানিক সত্যের সঙ্গে সংঘর্ষ না থাকা প্রমাণ করে, এটা কোনো মানব হাতে রচিত নয়।
আর যদি মেনে নেওয়া হয়, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলো থেকে জ্ঞানার্জন করেছিলেন, তখন কি এ কথা বলার কোনো সুযোগ আছে যে, তিনি সেগুলোর বৈজ্ঞানিক বিষয়াবলি সেই বিজ্ঞানহীন যুগে পরীক্ষানিরীক্ষাপূর্বক সেগুলোর সঠিক তথ্যগুলো রেখে দিতে আর তার ভুলগুলো চিহ্নিত করে নিজের গ্রন্থ থেকে বাদ দিতে সক্ষম হয়েছেন?!
টিকাঃ
৭২৪. শাম: বর্তমানে যদিও আধুনিক সিরিয়াও শাম নামে পরিচিত; কিন্তু প্রাচীন শাম একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলের নাম, যার বিস্তৃতি ছিল ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীর হতে মেসোপটেমিয়া অঞ্চল পর্যন্ত। বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, জর্দান, ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন (ইসরাইল অধিকৃত অঞ্চলসহ পশ্চিম তীর ও গাজা) এবং আধুনিক সউদি আরবের আল-জাওফ প্রদেশ ও উত্তর সীমান্ত অঞ্চল শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়াও ১৯২১ সালে ফ্রান্স ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত আঙ্কারা চুক্তি অনুযায়ী বর্তমান দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের যেসব এলাকা তুরস্কের অন্তর্ভুক্ত হয়, সেগুলোও ঐতিহাসিক শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তুরস্কের সানজাকে ইসকানদার (The Sanjak of Alexandretta) অঞ্চলও শামের অন্তর্ভক্ত ছিল। এ ছাড়াও বর্তমান মিশরের সিনাই উপদ্বীপ ও বর্তমান ইরাকের মসুল অঞ্চলের কিছু অংশ শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। একদল ঐতিহাসিকের মতে পুরো সিনাই উপদ্বীপ ও সাইপ্রাসও ঐতিহাসিক শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল।-সম্পাদক
৭২৫. একজন ব্রিটিশ নাগরিক। প্রসিদ্ধ একজন তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব গবেষক। (১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ নভেম্বর মারা যান।)
৭২৬. কারেন আর্মস্ট্রং: সিরাতুন নাবি মুহাম্মাদ: ১৫১।
৭২৭. একটি খ্রিষ্টান উপদল।-সম্পাদক
৭২৮. থমাস কার্লাইল: আবতাল : ৬১, ৬২।
৭২৯. থমাস আর্নল্ড : আদ-দাওয়াতু ইলাল-ইসলাম : ১৬২।
৭৩০. মক্কায় একজন কামার ছিল, যে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনত। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও মাঝে মাঝে তার কাছে যেতেন এবং তাকে দ্বীন ও ঈমানের কথাবার্তা শোনাতেন। এ সময় সেই কামারও তাঁকে ইনজিলের দু-একটি কথা শোনাতো। আর এরই ভিত্তিতে মক্কার কোনো কোনো কাফের বলতে শুরু করল যে, তাঁকে সেই কামারই কুরআন শেখাচ্ছে। সেই কথার খণ্ডনেই এই আয়াত নাজিল হয়। (তাওযীহুল কুরআন, আয়াতসংশ্লিষ্ট টীকা)-সম্পাদক
৭৩১. আস-সিরাতুল হালাবিয়্যা : ১/৪৯৯, ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/১৩৯, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৪৮৩, ৪৮৪।
৭৩২. রজম: বিবাহিত ব্যভিচারীদের পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে হত্যা।-সম্পাদক
৭৩৩. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূলত এই প্রশ্ন করেছেন তাদেরকে তাদেরই কিতাবের বিধান দেখিয়ে লা জবাব করার জন্য, তবে ইহুদিরা তাঁর জ্ঞানের ব্যাপারে অবগত ছিল না। দ্বিতীয় প্রসঙ্গটিই আমাদের আলোচনার প্রামাণ্য বিষয়।-সম্পাদক
৭৩৪. সহিহ বুখারি: ৬৮৪১, সহিহ মুসলিম: ১৬৯৯।
৭৩৫. সহিহ বুখারি: ২, সহিহ মুসলিম: ২৩৩৩।
৭৩৬. সহিহ বুখারি: ২, সুনানে তিরমিজি: ৩৬৩৪, সুনানে নাসায়ি: ৯৩৪, মুসনাদে আহমাদ: ২৬২৪১।
৭৩৭. রোনাল্ড ভিক্টর বডলি। ব্রিটিশ আর্মি অফিসার (১৯০৮ খ্রি.)। ইরাক এবং জর্দানে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর মুসকাত অঞ্চলে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান। তিনিই প্রথম 'রুবউল খালি' (Empty Quarter) মরুভূমি পাড়ি দেন। এরপর সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর আরবের মরু অঞ্চলে বসবাসের জন্য আরবে চলে আসেন। তিনি মরুভূমি এবং প্রাচ্য নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছেন। তার একটি প্রসিদ্ধ রচনা হলো, আর-রাসুল: হায়াতু মুহাম্মাদ (The Messenger: The Life of Mohammed)।
৭৩৮. রোনাল্ড ভিক্টর বডলি : আর-রাসুল: হায়াতু মুহাম্মাদ : ৫৮, ৫৯।
৭৩৯. লেটনার। একজন ইংরেজ গবেষক। আইন, দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের মতো একাধিক বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে (কাজাখস্তানের রাজধানী) আসতানা ভ্রমণ করেন। এ ছাড়াও আরও অনেক ইসলামি দেশ ভ্রমণ করেন এবং সেখানকার বিখ্যাত ব্যক্তি ও আলিমদের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
৭৪০. লেটনার : দ্বীনুল ইসলাম : ৪, ৫।
৭৪১. দ্রষ্টব্য: ডক্টর মরিস বুকাইলি রচিত আল-কুরআন ওয়াত-তাওরাত ওয়াল-ইনজিল ওয়াল-ইলম (কুরআন, তাওরাত, ইনজিল ও বিজ্ঞান)।
📄 বদর যুদ্ধের সময় কুরাইশদের ব্যবসায়ী কাফেলায় আক্রমণের অভিযোগ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে যে-সকল অভিযোগ উত্থাপন করা হয় তার একটি হলো, তিনি বিভিন্ন সময় কুরাইশ ব্যবসায়ী কাফেলার ওপর আক্রমণ করতেন। আর এটা তো চোর-ডাকাতদের কাজ থেকে ভিন্ন কিছু নয়। (তাদের এসব অভিযোগ-আপত্তি থেকে আমাদের প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন কতই-না পবিত্র!) তারা উদাহরণ হিসেবে বলে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের ব্যবসায়ী কাফেলার পিছু ধাওয়া করেছিলেন। পরে এর সূত্র ধরেই বদরযুদ্ধ সংঘটিত হয়।
তবে বাস্তবতা হলো, এই কথা যারা বলে, তারা জানে না যে মক্কা ও মদিনার মাঝে ইতিমধ্যেই পূর্ণরূপে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। মদিনাতে ইসলামি রাষ্ট্রের সূচনা থেকেই এই দ্বন্দ্বের শুরু। তা ছাড়া এটা খুবই যৌক্তিক এবং প্রাসঙ্গিক ছিল যে, কুরাইশরা মদিনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কোনোভাবেই চুপ করে বসে থাকবে না। তারা তো সেই লোক, যারা নিজেদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মদিনায় পৌঁছতে না দেওয়ার জন্য। এমনকি শেষ মুহূর্তে তিনি যখন মক্কা ছেড়ে মদিনার পথ ধরেন, তখনও তারা পথিমধ্যে বাধা দেওয়ার লক্ষ্যে তাঁর হত্যাকারীর জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে।
মক্কা ও মদিনার মাঝে যে শত্রুতার সূচনা হয়েছিল, তার ঘোষণা পাওয়া যায় আবু জাহেলের বক্তব্যে। সাদ ইবনে মুয়াজ রা. ও উমাইয়া ইবনে খালফের মাঝে পুরাতন বন্ধুত্ব ছিল। এ কারণে সাদ রা. মক্কায় এলে উমাইয়ার বাড়িতে উঠতেন। একইভাবে উমাইয়া মদিনায় আগমন করলে সাদ রা.-এর মেহমান হতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরতের পর সাদ রা. একবার মক্কায় এলেন ওমরা করতে। মক্কায় এসে তিনি যথারীতি উমাইয়ার বাড়িতে উঠলেন। তাকে বললেন, 'আমাকে একটু নিরিবিলি সময়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করার ব্যবস্থা করে দিয়ো।' কথা অনুযায়ী উমাইয়া দুপুরের দিকে সাদ রা.-কে নিয়ে বাইতুল্লাহর দিকে রওয়ানা হলো।
ঘটনাক্রমে সেখানে আবু জাহেলের সাথে তাদের দেখা হয়ে যায়। তখন সে উমাইয়াকে জিজ্ঞাসা করে, 'তোমার সাথে এ লোক কে?' উমাইয়া বলল, 'এ হচ্ছে সাদ।' তখন আবু জাহেল সাদ রা.-কে লক্ষ্য করে বলল, 'তোমরা ধর্মত্যাগীদের আশ্রয় দিয়ে তাদেরকে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করছ, এরপর আবার তুমি খুব নিরাপদে তওয়াফ করতে যাচ্ছ! আল্লাহর কসম! তুমি যদি আজ আবু সফওয়ানের (উমাইয়ার উপনাম) অতিথি না হতে, তাহলে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারতে না!'
আবু জাহেলের কথা শুনে সাদ রা. উঁচু স্বরে বলে উঠলেন, 'আল্লাহর কসম! তুমি যদি আমাকে এটা (তাওয়াফ) থেকে বাধা দাও, তবে আমি তোমাকে এর চেয়েও বড় বিষয়ে বাধা দেবো! মদিনার পাশ দিয়ে যাতায়াতের রাস্তা আর পাবে না!'
বস্তুত উভয় শহরের মাঝে যুদ্ধ-পরিস্থিতি বিরাজের ব্যাপারে এটি ছিল আবু জাহেলের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা। সাদ রা. সেদিন রক্ষা পেয়েছেন মূলত এক কুরাইশ নেতার নিরাপত্তাবলয়ে থাকার কারণে।
কিন্তু আমরা যদি ধরেও নিই, এই ঘটনাটি ঘটেনি, তবুও নিঃসন্দেহে বলা যায়, যখন আরব অঞ্চলগুলোর প্রাণকেন্দ্র ও সবচেয়ে প্রভাবশালী নগরী মক্কার প্রতিপক্ষ হয়ে আরেকটি শক্তি ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল প্রতিবেশী অঞ্চল মদিনাতে, যার ওপর দিয়েই মক্কার ব্যবসায়ী কাফেলাগুলো শামে যাতায়াত করে, তখন আবশ্যকভাবেই একপক্ষ অপরপক্ষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। অতএব, মক্কার জন্য আবশ্যক ছিল নিজ মর্যাদা টিকিয়ে রাখা, তার যাতায়াতের পথটি সুরক্ষিত করা এবং এই ইসলামি জাগরণের বিস্তার রোধ করা, যা মক্কাভূমিতে জন্মলাভের পর থেকেই তার সাথে ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। এরপর সেটি ধীরে ধীরে মক্কার নিয়ন্ত্রণের বাইরে এসে একটি নতুন দেশে শিকড় গাড়া শুরু করে, যা মক্কাবাসীর জন্য কিছুতেই বরদাশত করার উপযোগী ছিল না। অপরদিকে মদিনা রাষ্ট্রের জন্যও আবশ্যক ছিল নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থে তার সূচনাকালের এইসব সম্ভাব্য আক্রমণ শক্ত হাতে প্রতিহত করা।
বস্তুত সাদ রা.-এর সাথে সংঘটিত ঘটনাটি আমাদের আলোচ্য বিষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। মদিনার ইসলামি রাষ্ট্র তখনও পর্যন্ত মক্কার ব্যবসায়ী কাফেলাগুলোর ওপর চড়াও হয়নি, যদিও সেটার পূর্ণ সক্ষমতা তাদের ছিল। এ কারণেই সাদ রা. আবু জাহেলকে শামে গিয়ে ব্যবসা করার পথ রুদ্ধ করার হুমকি দিয়েছেন। সারকথা হলো, এই যুদ্ধপরিস্থিতি ঘোষিত হয়েছিল কুরাইশদের পক্ষ থেকে মক্কা নগরীতে।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। সেখানেও কুরাইশদের পক্ষ থেকে যুদ্ধের সুস্পষ্ট ঘোষণা ছিল। এই ঘটনা মদিনাকে অভ্যন্তরীণ প্রথম ফেতনা ও বিশৃঙ্খলার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় বসবাস শুরু করার পর কুরাইশরা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং আউস-খাজরাজের মূর্তিপূজারি মুশরিকদের নিকট একটি চিঠি প্রেরণ করে। কুরাইশদের চিঠির ভাষ্য ছিল-
তোমরা আমাদের এক লোককে আশ্রয় দিয়েছ। আমরা আল্লাহর শপথ করে বলছি, হয় তোমরা তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবে অথবা তোমাদের দেশ থেকে বের করে দেবে, নতুবা আমরা সম্মিলিতভাবে তোমাদের ওপর আক্রমণ করব এবং তোমাদের যোদ্ধাদেরকে হত্যা করব ও তোমাদের মহিলাদেরকে বন্দি করে দাসী বানাব!
চিঠিটি যখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তার মূর্তিপূজক সঙ্গীদের নিকট পৌঁছল, তখন তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য একত্রিত হলো। খবর পেয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে গেলেন এবং তাদেরকে বললেন, 'কুরাইশদের ভীতিপ্রদর্শন তোমাদেরকে অমূলক ভীত করে তুলেছে। আসলে তারা তোমাদের ততটা ক্ষতি করতে পারবে না, যতটা ক্ষতি তোমরা তোমাদের নিজেদের জন্যে ডেকে আনবে। কারণ, তোমরা নিজেদের ভাই-বন্ধু ও সন্তানসন্ততিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাইছ!'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে এসব শুনে তাদের লড়াইয়ের ইচ্ছা চলে গেল এবং যে যার মতো পৃথক হয়ে গেল। এরপর কুরাইশরা একই কাজ করল ইহুদিদের সাথে।
এ ব্যাপারে কারেন আর্মস্ট্রং যথাযথ বলেছেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় পৌঁছেছেন এমন এক শরণার্থীর মতো যিনি বিস্ময়করভাবে মৃত্যু থেকে রক্ষা পেয়েছেন। (সেখানে পৌঁছার পরও) তাঁর জীবনের ঝুঁকি অব্যাহত ছিল পাঁচ বছর। এই সময়ের মাঝে গোটা মুসলিমজাতি বিভিন্নবার একেবারে নির্মূল হয়ে যাওয়ার মুখোমুখিও হয়েছিল। অথচ পশ্চিমাবিশ্বের আমরা ধারণা করি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অতীতের এমন এক যুদ্ধবাজ নেতা, যে তাঁর ধর্মের প্রতি অনীহ এক সমাজের ওপর অস্ত্রের শক্তিতে ইসলাম চাপিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং প্রথম যুগের মুসলমানগণ নিজেদের জীবন রক্ষার তাগিদেই লড়াই-সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন।
অতএব, স্বাভাবিকভাবেই এসব হুমকির মুখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন না। সুতরাং তিনি মদিনার আশপাশের এলাকাগুলোতে বিভিন্ন অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করেন এবং ছোট ছোট কিছু যোদ্ধাবাহিনীও পাঠান। অবশ্য এগুলোর অল্প কয়েকটিই প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে জড়িত হয়। আশপাশের অনেক গোত্রের সাথেই তাঁর সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত হয়ে যায়। তিনি ছোট ছোট যেসব যোদ্ধাবাহিনী প্রেরণ করেন, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু হচ্ছে:
১. আবওয়া অভিযান। এটাতে অবশ্য সরাসরি লড়াই সংঘটিত হয়নি, বরং বনু যমরা গোত্রের সাথে সন্ধি স্থাপিত হয়ে যায়।
২. উবাইদা ইবনুল হারেসের অভিযান। এটাতে কুরাইশদের সাথে ছোট আকারে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই লড়াইয়ে কুরাইশদের সেনাপতি ছিল আবু সুফিয়ান।
৩. হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের অভিযান। এই বাহিনী আবু জাহেলের বাহিনীর সাথে প্রায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল, তবে নিরপেক্ষ নেতা মাজদি বিন আমর জুহানির হস্তক্ষেপে তা পিছিয়ে যায়।
এসবের সম্মুখীন হওয়ার পর কুরাইশরা সচেতনতার সাথে ভাবতে থাকে যে, বিষয়টা এখন আর সহজ নেই। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরবর্তী সময়ে শুধু হুমকির ওপরই বসে থাকবেন না (বরং কার্যতই তিনি আক্রমণ-হামলার পথে অগ্রসর হবেন)। বস্তুত তখনই তাঁর ইচ্ছার পূর্ণতা ঘটবে। এ কারনেই আমরা আবু জাহেলকে বলতে দেখি, হে কুরাইশ সম্প্রদায়, মুহাম্মাদ ইয়াছরিবে (মদিনায়) অবস্থান গ্রহণ করেছে। এবার সে তাঁর অগ্রবর্তী বাহিনী পাঠাতে শুরু করেছে। সে তোমাদের (ধনসম্পদ) ছিনিয়ে নিতে চায়। সুতরাং তোমরা তাঁর নিকটবর্তী পথ ব্যবহারে সতর্ক হও। নিশ্চয় সে এখন ওত পেতে থাকা সিংহের ন্যায়। তোমাদের ওপর তাঁর ক্রোধ এখন চরমে।
এবার বলুন, এটা কি অতি আশ্চর্যজনক ব্যাপার নয় যে, কুরাইশদের পক্ষ থেকে সৃষ্ট শত্রুতা, শামের পথে চলার ক্ষেত্রে স্বয়ং কুরাইশদের সতর্কতা ইত্যাদির মতো কেন্দ্রীয় বিষয় এড়িয়ে গিয়ে কেবল ইতিহাসের মধ্যখানের এক টুকরো চিত্র তুলে ধরে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হবে?! যেমন কিছু মানুষের আলোচনা শুনে মনে হয়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের ব্যবসায়ী কাফেলাকে আক্রমণের জন্য বের হওয়ার মাধ্যমেই এই যুদ্ধের সূচনা ঘটেছে! এভাবে ইসলাম ও কুরাইশদের ইতিহাসের ব্যাপারে পাঠকের অজ্ঞতার সুযোগে এমন কৌশলে অপবাদ ছড়ানো হয় যে, মনে হয় পুরো আরব উপদ্বীপ ছিল নিশ্চিন্ত-নিরাপদ-নিরুপদ্রপ। আর ঠিক তখনই কুরাইশদের ব্যবসায়ী কাফেলা আকস্মিকভাবে এমন এক বিপদের মুখোমুখি হয়েছে!
মোটকথা, হিজরত-পরবর্তী ঘটনাবলি ও পারিপার্শ্বিকতা সাক্ষ্য দেয়, উভয় দলের মাঝেই তখন যুদ্ধপরিস্থিতি বিরাজ করছিল এবং যুদ্ধের জন্য দুই পক্ষেরই প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল। বস্তুত এই পরিস্থিতি সামনে থাকার কারনেই (ব্যবসায়ী কাফেলার সর্দার) আবু সুফিয়ান مسلمانوں গতিবিধি পর্যবেক্ষণে রাখে আর এর মাধ্যমে তাদের গতিবিধি সম্পর্কে জানতে পারে। ফলে (কাফেলা مسلمانوں আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে) তৎক্ষণাৎ সে কুরাইশদের নিকট সংবাদবাহক প্রেরণ করে এবং নিজেও ভিন্ন নিরাপদ রাস্তা অবলম্বন করে। আর কুরাইশরাও (পূর্ব থেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার কারণে) সংবাদ পাওয়ামাত্রই দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করে বদরপ্রান্তরে উপস্থিত হয়। এ সবকিছুই ঘটে যায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে। ফলে মুসলমানগণ আর মদিনায় ফিরে আসার অবকাশ পায়নি কিংবা ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণেরও সুযোগ হয়নি। বরং তারা ব্যবসায়ী কাফেলাকে আক্রমণের জন্য বের হয়ে কুরাইশ সৈন্যবাহিনীর মুখোমুখি হয়ে যায়। আলোচিত সবকিছুই প্রমাণ করে, মূলত কুরাইশরা আগে থেকেই মদিনাবাসীর সাথে চলমান যুদ্ধপরিস্থিতির ব্যাপারে সতর্ক ছিল এবং আবু সুফিয়ান যখন তাদের নিকট সতর্ককারী সংবাদবাহক প্রেরণ করে, তখন তারা সেটাকে আকস্মিক কোনো বিষয় হিসেবে গণ্য করেনি।
এসব বিষয়ের সাথে সাথে পাঠককে এ কথাও স্মরণ রাখতে হবে যে, মুহাজির মুসলমানরা মক্কা থেকে বের হয়ে এসেছিলেন চুপিসারে কপর্দকশূন্য অবস্থায়। তারা নিজেদের বাড়িঘর, ধনসম্পদ সাথে নিয়ে আসতে পারেননি, আবার সেগুলো বিক্রি করারও সুযোগ পাননি। বরং তাদের সবকিছুই দুর্বৃত্ত কুরাইশদের হাতে লুণ্ঠিত অবস্থায় রয়ে যায় এবং তারাই সেগুলোর ভোগদখলে লিপ্ত থাকে। আর বদরযুদ্ধ তাদের সে সকল লুণ্ঠিত সম্পদ পুনরুদ্ধারের প্রথম চেষ্টা ও পদক্ষেপ হিসেবেও কাজ করেছিল।
কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ইবনে হারব (মুসলমানগণ যে ব্যবসায়ী কাফেলাকে ধরার জন্য বের হয়েছিলেন, সেই কাফেলার সর্দারও সে-ই ছিল) মুসলমান মুহাজিরদের ঘরবাড়ি দখল করে এবং সেগুলো বিক্রি করে দেয়। চোখে পড়ার মতো তার জবরদখলের চিত্র ছিল বনু জাহাশ গোত্রীয় লোকদের বাড়িঘর দখলের ক্ষেত্রে। তাদের হিজরতের পর সে সব বাড়িঘর দখল করে নেয়। সে নিজেকে তাদের ওপর সবচেয়ে বেশি অধিকারী জ্ঞান করে। কারণ, জাহাশ গোত্রীয় জনৈক আবু আহমাদের সাথে তার মেয়ে ফারিয়ার বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। সুতরাং আবু সুফিয়ান তাদের সকলের ঘরবাড়ি নিজের দখলে নিয়ে নেয় এবং সেগুলো বিক্রি করে দেয়। আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা. এ ঘটনা জানতে পেরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ব্যথিতচিত্তে অভিযোগ জানান। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, 'আবদুল্লাহ, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে জান্নাতে তোমাকে এর চেয়েও উত্তম গৃহ দান করবেন?!' আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা. বলেন, 'অবশ্যই আমি সন্তুষ্ট।' নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তাহলে তোমার জন্য সেটাই পাওনা রইল।'
এভাবেই মক্কার নেতৃবর্গ মুসলমানদের সকল সম্পদ জবরদখল করে নিয়েছিল। এমনকি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেদিন বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন উসামা বিন যায়েদ রা. তাঁকে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি মক্কায় আপনার গৃহে অবস্থান করবেন?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আকিল কি আর আমাদের জন্য কোনো ঘরবাড়ি অবশিষ্ট রেখেছে?!
এই আকিল হলো আবু তালিবের এক সন্তান এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাতো ভাই। সে এবং তার ভাই তালিব তাদের পিতা আবু তালিবের সকল সম্পত্তি আত্মসাৎ করে নিয়েছিল। ইসলামগ্রহণ করার কারণে আবু তালিবের অন্য দুই ছেলে জাফর রা. ও আলি রা.-কে কিছুই দেয়নি। এরপর আকিল সেগুলো অন্যের নিকট বিক্রি করে দেয়। তো কুরাইশরা মুসলমানদের কাফের আত্মীয়স্বজন কর্তৃক তাদের ধনসম্পদ আত্মসাৎ করার এই হলো সামান্য কিছু নমুনা।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হলো, মক্কা বিজয়ের পর পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব সম্পদে মুশরিকদের হস্তক্ষেপের কার্যকারিতা বাতিল করেননি। তাদের মন জয় করা এবং সদ্য পরাজয়ের পর তাদের ওপর নতুন করে আঘাত ও বিদ্বেষ সৃষ্টির পথ বন্ধ করার জন্য তিনি এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। পাশাপাশি মুহাজিরদের তিনি এ কথার ওপর মানিয়ে নেন যে, তাদের থেকে যা-কিছু ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো তারা আল্লাহর ওয়ান্তে ছেড়ে দিক।
এ ছাড়া এই আত্মসাৎ-এর ওপরই মুশরিকদের ঔদ্ধত্য সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তারা সম্পদশালী মুসলিমদের সেখান থেকে নিঃস্ব অবস্থায় বিতাড়িত করেও ছেড়েছে। যেমনটি আমরা সুহাইব রা.-এর ঘটনায় দেখতে পাই।
আবু উসমান নাহদি রা. বর্ণনা করেন, সুহাইব রা. যখন মদিনায় হিজরত করার ইচ্ছা করলেন, তখন কুরাইশ কাফেররা তাকে (বাধা দিয়ে) বলল, 'তুমি আমাদের নিকট এসেছিলে নিঃস্ব অবস্থায়। আমাদের মধ্য থেকেই তোমার সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তুমি অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছ, কিন্তু আজ তুমি চাচ্ছ নিজের সম্পদসহ প্রস্থান করবে?! আল্লাহর কসম! এটা কিছুতেই হতে পারে না!'
তখন সুহাইব রা. বলেন, 'আচ্ছা, আমি আমার সকল সম্পদ তোমাদের দিয়ে দিলে তোমরা আমার পথ ছেড়ে দেবে?' কাফেররা বলল, 'হ্যাঁ, আমরা এই প্রস্তাবে রাজি।'
সুহাইব রা. তখন বললেন, 'আমি তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আমার সমস্ত সম্পদ (যারা আমার সাথে জটিলতা সৃষ্টি করছে) তাদের দিয়ে দিলাম।' পরে যখন এই সংবাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পারলেন, তিনি বললেন, «رَبِحَ صُهَيْبٌ رَبِحَ صُهَيْبٌ»
সুহাইবই লাভবান হয়েছে, সুহাইবই লাভবান হয়েছে।
মোটকথা, কুরাইশদের হাতে থাকা এসব ধনসম্পদ ছিল মুসলিম মুহাজিরদের থেকে জোরজুলুম করে আত্মসাৎ করা। অথচ তখন মুসলমানদের এ সকল সম্পদের খুব বেশি প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে হিজরতের সময় এবং তাদের নতুন ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের সূচনাকালে। অতএব, নিজেদের সেসব সম্পদ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার প্রতি নিন্দাবাদ করা কিংবা সেই প্রচেষ্টাকে (এক পক্ষের সীমালঙ্ঘনমূলক) নবহামলা বলা প্রকৃতপক্ষে খুবই অন্যায়ের বিষয়! এসব কথাবার্তার প্রেক্ষিতে মনে হয়, মুসলমানদের এই আক্রমণ যেন ছিল কোনো শান্তিকামী নিরাপদ দলের ওপর। যারা ছিল নিতান্ত নিষ্পাপ, জোরজুলুমের কোনো ইতিহাসই তাদের ঝুলিতে ছিল না। অথচ কুরাইশরা যে অপকর্ম ঘটিয়েছে, তার রেশ তখনও কাটেনি। (তাহলে পরিণামপ্রাপ্তির দিনে কেন এমন অস্বাভাবিক কথা?!)
এই অভিযোগ খণ্ডনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে যে কথাটি বলা যায় তা হলো, স্বয়ং মক্কাবাসীও এই কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্ব ও চরিত্রে কোনো অপবাদ আরোপ করেনি। মুসলমানগণ তাদের সাথে যে আচরণ করেছে, এটাকে তারা কোনো ধরনের ধোঁকা, প্রতারণা হিসেবে গণ্য করেনি। কারণ তখনকার পরিস্থিতি ও চিত্র তৎকালীন সকলের নিকটই ছিল পরিষ্কার। আমরা যেরকম আলোচনা করে এসেছি, বস্তুত তারাও এটাকে সেরকম যুদ্ধপরিস্থিতি বলেই গণ্য করছিল। এ ছাড়া তারা এ কথাও খুব ভালোভাবেই জানত যে, তারাই প্রথমে জুলুম শুরু করেছে এবং ধনসম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছে। শত্রুতা প্রদর্শন এবং যুদ্ধের ঘোষণাও তাদের পক্ষ থেকেই প্রথমে হয়েছে।
এবার তাহলে বলতে চাই, এ ক্ষেত্রে বর্তমানে যারা ইসলামের দিকে শত্রুতার সূচনার কথা সম্পৃক্ত করতে চায়, তারা কি কুরাইশদের ব্যাপারে নিজেদেরকে স্বয়ং কুরাইশদের চেয়েও বেশি ন্যায়বান দাবি করতে চায়?! তৎকালীন পরিবেশ-পরিস্থিতির ক্ষেত্রে তাদের থেকেও বেশি জ্ঞানবান হওয়ার দাবি জানাচ্ছে?!
টিকাঃ
৭৪২. সহিহ বুখারি: ৩৯৫০, মুসনাদে আহমাদ: ৩৭৯৪
৭৪৩. সুনানে আবু দাউদ: ৩০০৪।
৭৪৪. কারেন আর্মস্ট্রং: সিরাতুন নাবি মুহাম্মাদ: ২৫২।
৭৪৫. তাবারানি: মুজামুল কাবির: ১৫৩৩।
৭৪৬. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ৩/২৮, ফাকেহি : আখবারু মাক্কাহ : ৩/২৯২ (২১২১), ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ১/২২৮, সালেহি শামি : সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ: ৩/২২৫।
৭৪৭. সহিহ বুখারি: ১৫৮৮, সহিহ মুসলিম: ১৩৫১।
৭৪৮. ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ১/২২৮।
৭৪৯. সহিহ ইবনে হিব্বان: ৭০৮২।