📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 যুদ্ধবন্দিদের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ

📄 যুদ্ধবন্দিদের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ


যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে আচারব্যবহারের নীতিমালা একেক ধর্মে, একেক সমাজে একেক রকম। তবে ইসলাম আগমনের পূর্বে সকল নীতিমালাতেই প্রাধান্য বিস্তার করেছিল কঠোর আচরণ, অত্যাচার ও নির্যাতন। আর যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে আচারব্যবহারের এই নীতিগুলোই মানুষদের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে আচারব্যবহারে তাঁর স্বভাবজাত দয়ার্দ্র মনোভাব থেকে একচুলও সরে আসেননি। তিনি তাদেরকে কখনো এই দৃষ্টি দিয়ে দেখেননি যে, তারা সর্বদা সর্বদিক থেকে ইসলামি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে, তাঁকে হত্যা করে পৃথিবী থেকে মুসলমানদের নামনিশানা মুছে ফেলতে চায়।

যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে আচারব্যবহারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্রের উচ্চতা ও মহত্ত্ব অনুধাবন করতে আমরা তাঁর জীবনের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি। তাঁর জীবনের চিরন্তন ও অমর কীর্তিসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো, বদরের যুদ্ধবন্দিদের সাথে তাঁর আচার-ব্যবহার। সকলেই জানি, বদরযুদ্ধ ছিল মুসলমান ও মুশরিকদের মাঝে সংঘটিত প্রথম সর্বাত্মক যুদ্ধ। উক্ত যুদ্ধে সৈন্য ও অস্ত্রের স্বল্পতা সত্ত্বেও মুসলমানরাই বিজয় অর্জন করেন। (সত্তরজন মুশরিককে হত্যা করেন) সেইসাথে তারা সত্তরজন মুশরিককে বন্দি করেন। এইসব যুদ্ধবন্দির ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করেন, যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে? এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন হজরত উমর রা.। তিনি বলেন, (বদরযুদ্ধের যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারে) আবু বকর রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, এরা তো আমাদেরই আত্মীয়, কেউ হয়তো চাচাতো ভাই, কেউ আপন ভাই, কেউ-বা পরিবারের অন্য সদস্য। এতএব, আমার মত হলো তাদের থেকে ফিদয়া নেওয়া হোক। তাহলে সেই সম্পদগুলো পরে কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের শক্তি জোগাবে। সেইসাথে সম্ভাবনা আছে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে হেদায়েত দিয়ে দেবেন, তখন তারাও আমাদের সহযোগী হয়ে যাবে।'

এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে খাত্তাবের পুত্র, তোমার কী মত?'

উমর রা. বলেন, আমি তখন বললাম, 'আল্লাহর কসম! আমার মতটা আবু বকরের মতের মতো নয়। বরং আমার মত হলো, আপনি অমুককে (তার নিজের এক আত্মীয়ের কথা উল্লেখ করলেন) আমার হাতে ছেড়ে দেবেন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেবো। আলির হাতে ছেড়ে দেবেন আকিলকে, সে তার গর্দান উড়িয়ে দেবে। আর হামজার হাতে দেবেন তার অমুক ভাইকে, সেও তার গর্দান উড়িয়ে দেবে (এভাবে প্রত্যেকে তার নিজ নিজ মুশরিক বন্দি আত্মীয়কে হত্যা করবে)। যাতে আল্লাহ তাআলা দেখে নেন যে, আমাদের অন্তরে মুশরিকদের প্রতি কোনো নমনীয়তা নেই। আর তারাই হলো মুশরিকদের নেতৃস্থানীয় লোক, তাদের নেতা ও প্রধান ব্যক্তিবর্গ...।'

(হজরত উমর রা. বলেন,) তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার মত গ্রহণ করলেন না, বরং তিনি হজরত আবু বকরের মত গ্রহণ করলেন এবং তাদের (যুদ্ধবন্দিদের) থেকে ফিদয়া গ্রহণ করে তাদেরকে মুক্ত করে দিলেন।

যদিও এই ঘটনার পর এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি আয়াত নাজিল হয়েছে, যেখানে এইসব যুদ্ধবন্দিদের সাথে নরম ও কোমল আচরণের কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিরস্কার করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَوْلَا كِتَابٌ مِنَ اللَّهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে লিখিত এক বিধান পূর্বে না থাকত, তবে তোমরা যে পথ অবলম্বন করেছ, সে কারণে তোমাদের ওপর বড় কোনো শান্তি আপতিত হতো। [সুরা আনফাল: ৬৮]

কিন্তু তা সত্ত্বেও, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল যুদ্ধবন্দির সাথে কঠোর আচরণ করেননি, অথবা তাদেরকে হত্যা থেকে রেহাই দেওয়া এবং সক্ষম ব্যক্তিদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণের যে প্রতিশ্রুতি তাদের দিয়েছিলেন, সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেননি। তা ছাড়া, মুক্তিপণের পরিমাণেও তিনি সহানুভূতি প্রদর্শন করেন। প্রতিটি বন্দির সামর্থ্য অনুপাতে মুক্তিপণের পরিমাণ ও প্রকার ভিন্ন-ভিন্নভাবে ধার্য করা হয়েছিল।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু যুদ্ধবন্দিকে, যেমন আমর ইবনে আবি সুফিয়ানকে মুক্ত করে দেন এই শর্তে যে, মুশরিকরা তার বিনিময়ে সাদ ইবনে নুমান ইবনে আক্কালকে মুক্ত করে দেবে, যাকে আবু সুফিয়ান ওমরা করা অবস্থায় আটক করেছিল।

যুদ্ধবন্দিদের অনেকেই মুক্তিপণ দিয়ে নিজেকে মুক্ত করে নেয়। এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক বন্দির আর্থিক অবস্থার প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ রাখেন এবং সে অনুযায়ী তাদের মুক্তিপণ নির্ধারণ করেন। এ কারণে কোনো কোনো বন্দি মুক্তিপণ হিসেবে চার হাজার দিরহাম প্রদান করে। যেমন আবু ওদাআতা ও আবু আজিজ। তার আসল নাম হলো যুরারা ইবনে উমায়ের। সে ছিল প্রখ্যাত সাহাবি মুসআব ইবনে উমায়েরের ভাই। তার মা তার মুক্তিপণ পরিশোধ করে। তার মা বেশ সম্পদশালী মহিলা ছিলেন।

আবার বন্দিদের মধ্যে কেউ প্রদান করে একশ উকিয়া। যেমন রাসুলের চাচা হজরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.। কেউ প্রদান করে আশি উকিয়া। যেমন রাসুলের চাচাতো ভাই আকিল ইবনে আবি তালিব। অবশ্য আব্বাস রা. তার মুক্তিপণ তাকে প্রদান করেন। আবার কেউ কেউ মাত্র চল্লিশ উকিয়া প্রদান করেই মুক্তি পেয়ে যায়।
আর যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে যাদের কোনো সম্পদ ছিল না, তবে লেখাপড়া জানত, কয়েকজন আনসারি মুসলিম সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়ে দেওয়াই ছিল তাদের মুক্তিপণ। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করে বলেন, বদরযুদ্ধের সময় কিছু মুশরিক বন্দির মুক্তিপণ দেওয়ার মতো কোনো অর্থসম্পদ ছিল না। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মুক্তিপণ নির্ধারণ করেন, তারা আনসারি সাহাবিদের সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে দেবে।

তা ছাড়া এই যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে অনেকে এমনও ছিল, যাদের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ অনুগ্রহ করে কোনো ধরনের মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত করে দিয়েছেন। যেমন মুত্তালেব বিন হানতাব, কবি আবু ইজ্জা ও ছয়ফি বিন আবি রিফাআ।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের মহান নেতা ও বিশেষ সম্মানের অধিকারী সুহাইল ইবনে আমরের সাথেও অতি উত্তম আচরণ করেছিলেন। তিনি তাকে অপদস্থ করতে কিংবা তার চেহারা বিকৃতি ঘটাতে রাজি হননি, যদিও সেটা করার পূর্ণ সক্ষমতা তাঁর ছিল। কিন্তু হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. সুহাইল ইবনে আমরের সামনের দুই দাঁত ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন। যাতে সে আর কখনোই কোনো স্থানে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারে। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বারণ করে বলেছিলেন, 'আমি কিছুতেই তার চেহারা বিকৃত করতে পারি না। তাহলে আশঙ্কা হয় আল্লাহ তাআলা আমার চেহারা বিকৃত করে দেবেন, যদিও আমি নবী।

যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামাতা আবুল আস বিন রবি'-ও ছিল। সে ছিল রাসুলের মেয়ে হজরত জয়নাবের স্বামী। স্বামীকে মুক্ত করার জন্য হজরত জয়নাব তার একটি হার পাঠিয়েছিলেন। স্বামী আবুল আস তাকে বিবাহ করে উঠিয়ে নেওয়ার সময় এই হারটি দিয়েই মাতা হজরত খাদিজা তাকে স্বামীর বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন। এই হারটি দেখে (হজরত খাদিজার রা.-এর কথা মনে পড়ায়) নবীজির হৃদয় বিগলিত হয়। তিনি সাহাবিদের লক্ষ করে বললেন, 'তোমরা যদি ভালো মনে করো, তাহলে জয়নাবের বন্দি আবুল আসকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত করে দাও এবং তার হার তাকে ফেরত দিয়ে দাও!' সাহাবিগণ বললেন, 'হে আল্লাহর নবী, আমরা সন্তুষ্ট।' পরে তারা আবুল আসকে মুক্ত করে দেন এবং সাথে জয়নাবের হারও ফেরত দিয়ে দেন। অতএব, অনেকের মতো আবুল আসকেও কোনো ধরনের মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত করে দেওয়া হয়।

এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল যুদ্ধবন্দিকেই মুক্তিপণ ছাড়া মুক্ত করে দেওয়ার জন্য পরিপূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন, যদি তাদের ব্যাপারে কুরাইশদের বিখ্যাত নেতা মুতইম ইবনে আদি সুপারিশ করতেন। কিন্তু তিনি এর আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে একটি ইঙ্গিতও করেছেন। যেমন সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে হজরত জুবায়ের ইবনে মুতইম থেকে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারে বলেছিলেন, যদি মুতইম বিন আদি বেঁচে থাকতেন আর আমার নিকট এই (কুফরির) দুর্গন্ধযুক্ত লোকদের ব্যাপারে সুপারিশ করতেন, তাহলে আমি তার সুপারিশে এদেরকে ছেড়ে দিতাম।

মুতইম বিন আদির প্রতি এমন সম্মান প্রদর্শনের কারণ হলো, কুরাইশরা বনু হাশেমের সাথে বয়কট করে যে অঙ্গীকারনামা লিপিবদ্ধ করে, তিনি সেই অঙ্গীকারনামা ভঙ্গের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তা ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তায়েফ থেকে ফিরে আসেন, তখন মুতইম তাকে আশ্রয় প্রদান করেছিলেন।

আর এটা সুস্পষ্ট যে, বদরযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার এক বছরেরও কম সময়ে অবশিষ্ট সকল যুদ্ধবন্দির মুক্তকরণ সম্পন্ন হয়ে যায়। এর দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয়, ওহুদ যুদ্ধে মুশরিকরা তাদের কোনো বন্দিকে মুক্ত করার জন্য লড়াইয়ে লিপ্ত হয়নি।
যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম আচার-আচরণের ক্ষেত্রে চির ভাস্বর হয়ে আছে হজরত ছুমামা বিন উছালের সাথে সংঘটিত সেই অনন্যসাধারণ ঘটনা। হজরত ছুমামা ছিলেন বনু হানিফার এক প্রসিদ্ধ নেতা। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মদিনায় এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করবেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে রাসুলের সাহাবিগণ তাকে আটক করে ফেলেন। তাকে বন্দি করে মসজিদে নববিতে নিয়ে আসেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের বললেন, 'তোমরা তার বন্দিত্বের সময় তার সঙ্গে উত্তম আচরণ করো।

নবীজি আরও বলেন, 'তোমাদের নিকট বিদ্যমান খাদ্য-খাবার একত্রিত করে তার কাছে পাঠাও।' একটি বর্ণনায় আছে, সাহাবিগণ রাসুলের দুগ্ধবতী উটনীর দুধও বন্দি ছুমামাকে খেতে দিতেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বন্দির সঙ্গে সর্বোচ্চ সম্মান, ভদ্রতা ও ক্ষমার আচরণ করেছেন। তিনি একবার তাকে এসে বললেন, 'ছুমামা! তোমার ব্যাপারে আমি কী সিদ্ধান্ত নেব বলে তোমার মনে হয়?' উত্তরে ছুমামা বলেন, 'মুহাম্মাদ, আপনি আমার ব্যাপারে ভালো কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন বলেই মনে করি। আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে আপনি একজন খুনিকেই হত্যা করবেন। আর যদি অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপরই আপনি অনুগ্রহ করবেন। আর আপনি যদি সম্পদ চান, তাহলে বলুন, আপনি যা চাইবেন তাই আপনাকে দেওয়া হবে।'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু না বলে ছুমামাকে রেখে চলে গেলেন। দিন পার হলো। পরের দিন নবীজি আবার এসে তাকে একই প্রশ্ন করে বললেন, 'ছুমামা, তোমার ব্যাপারে আমি কী সিদ্ধান্ত নেব বলে তোমার মনে হয়?'

ছুমামা বললেন, 'আমার কাছে তেমনই মনে হচ্ছে যেটা আমি আপনাকে আগে বলেছিলাম। আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে আপনি একজন খুনিকেই হত্যা করবেন। আর যদি অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপরই আপনি অনুগ্রহ করবেন। আর আপনি যদি সম্পদ চান, তাহলে বলুন, আপনি যা চাইবেন তাই আপনাকে দেওয়া হবে।'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু না বলে এ দিনও তাকে রেখে চলে গেলেন। পরদিন নবীজি আবার এসে তাকে একই প্রশ্ন করে বললেন, 'ছুমামা, তোমার ব্যাপারে আমি কী সিদ্ধান্ত নেব বলে তোমার মনে হয়?'

ছুমামা বললেন, 'আগের মতোই। আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে আপনি একজন খুনিকেই হত্যা করবেন। আর যদি অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপরই আপনি অনুগ্রহ করবেন। আর আপনি যদি সম্পদ চান, তাহলে বলুন, আপনি যা চাইবেন তাই আপনাকে দেওয়া হবে।'

এবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের ডেকে বললেন, 'তোমরা ছুমামাকে ছেড়ে দাও।'

ছাড়া পেয়ে ছুমামা প্রথমে মসজিদে নববির নিকটস্থ একটি খেজুরবাগানে গিয়ে গোসল করলেন। এরপর মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং উচ্চৈঃস্বরে নিজের ইসলামগ্রহণের ঘোষণা করে বললেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা এবং তাঁর প্রেরিত রাসুল।'

এরপর তিনি রাসুলকে লক্ষ্য করে বললেন, 'মুহাম্মাদ! আল্লাহর কসম! ইতিপূর্বে আমার নিকট পৃথিবীতে আপনার চেহারা থেকে অধিক অপছন্দনীয় আর কোনো চেহারা ছিল না। কিন্তু এখন আপনার চেহারাই আমার নিকট পৃথিবীর সকল চেহারা থেকে অধিক প্রিয়। আল্লাহর কসম! আগে আমার কাছে আপনার ধর্ম থেকে অধিক ঘৃণিত আর কোনো ধর্ম ছিল না। কিন্তু এখন আপনার ধর্মই আমার নিকট পৃথিবীর সকল ধর্ম থেকে অধিক প্রিয়। আল্লাহর কসম! আগে আমার নিকট আপনার শহর থেকে অধিক ঘৃণিত শহর আর কোনোটি ছিল না। কিন্তু এখন আপনার শহরটিই আমার নিকট সকল শহর থেকে অধিক প্রিয়।'
ছুমামা আরও বলেন, 'আমি ওমরা করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম, সে সময় আপনার অশ্বারোহী বাহিনী আমাকে আটক করে! আপনি এখন আমাকে কী নির্দেশ দেন?'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ছুমামাকে কিছু সুসংবাদবাণী শোনান এবং ওমরা করার নির্দেশ দেন। এরপর নির্দেশ অনুযায়ী ছুমামা যখন ওমরা করার জন্য মক্কায় গেলেন, তখন এক ব্যক্তি তাকে (তাচ্ছিল্য করে) বলল, 'তুমি কি ধর্মত্যাগী হয়ে গেছ?'

ছুমামা রা. বললেন, 'না, আমি বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ইসলামগ্রহণ করেছি। আর আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসুল অনুমতি দেওয়া ব্যতীত ইয়ামামা থেকে গমের একটি দানাও তোমাদের কাছে পৌঁছবে না।'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই মহৎ আচরণ ছুমামার অন্তরে এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, তিনি নিজের ধর্ম পরিবর্তন করেন এবং কোনোপ্রকার জবরদস্তি ও বাধ্যবাধকতা ছাড়াই বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য 'ইসলামধর্ম' গ্রহণ করেন। বরং তার ইসলামগ্রহণ এতটাই শক্তিশালী ও জোরদার ছিল যে, তিনি কুরাইশদের সাথে সকলপ্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করেন, তাদের ওপর খাদ্য-অবরোধ আরোপ করেন। কারণ, কুরাইশরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধিতা করত এবং তাঁকে কষ্ট দিত। অবশ্য এজন্য ছুমামাকে বিপুল পরিমাণ অর্থও লোকসান দিতে হয়, যে অর্থ আসত কুরাইশদের সাথে ব্যবসাবাণিজ্য করার মাধ্যমে, তাদের নিকট গম রপ্তানি করার মাধ্যমে। এবং রাসুলের ভালোবাসায় তিনি কুরাইশ নেতাদের সাথে সামাজিক ও কূটনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সকল ও সম্পর্ক ছিন্ন করে দেন।

এদিকে, মুসলিম ও মুশরিকদের মাঝে সংঘটিত প্রথম যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে অনেক মুশরিক বন্দি হয়। সেইসব যুদ্ধবন্দির সাথে আচরণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদেরকে একটি ব্যাপক নীতির প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি বলেন, «اسْتَوْصُوا بِالْأَسَارَى خَيْرًا»
তোমরা যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে সদাচারের উপদেশ গ্রহণ করো।

এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধবন্দিদের সাথে মুসলমানদের উত্তম আচরণের যে নির্দেশ দিয়েছেন, সেটা নিছক এমন কোনো তাত্ত্বিক নীতি বা দর্শন ছিল না, বাস্তবজীবনে যার কোনো প্রয়োগ নেই। বরং মুসলমানদের জীবনের বহু ক্ষেত্রে এগুলোর বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে। এগুলো প্রমাণ করে, তাদের অন্তর ছিল দয়া ও অনুগ্রহে ভরপুর। এ কারণে আমরা দেখি, বদরযুদ্ধের সময় নবীজি সাহাবা কর্তৃক কুরাইশদের দুই গোলামকে প্রহার করাকে নিন্দা করেছেন। নবীজি সাহাবিদের তিরস্কার করে বলেন, 'তারা দুজন যখন তোমাদের সত্য বলে, তখন তোমরা তাদেরকে প্রহার করো, আর যখন তারা তোমাদের কাছে মিথ্যা বলে, তখন তোমরা তাদেরকে ছেড়ে দাও। তারা সত্য বলেছে। আল্লাহর কসম! তারা কুরাইশদের গোলাম...।'

যদিও এই যুবকদ্বয় ছিল শত্রুসেনাদের লোক এবং তাদেরকে প্রহার করার মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য শত্রুবাহিনীর গোপন দুর্বলতার বিষয়ে জানার সম্ভাবনা ছিল, এরপরও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে প্রহার করা এবং কষ্ট দেওয়াকে অপছন্দ করেছেন। ঠিক এই বিষয়ে ইমাম মালেক রহ. তার মত ব্যক্ত করেছেন। তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, 'কোনো বন্দির ব্যাপারে যদি আশা করা যায়, তাকে শাস্তি দেওয়া হলে সে শত্রুপক্ষের গোপন তথ্যাবলি অবহিত করবে, তাহলে কি এজন্য তাকে শাস্তি দেওয়া যাবে?'

ইমাম মালেক বলেন, 'এমন কথা আমি আগে কখনো শুনিনি (অর্থাৎ এমন কর্ম আমাদের পূর্বসূরিদের থেকে কখনো পাওয়া যায়নি)।

আর শুধু এতটুকুই নয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন বন্দির শারীরিক স্বস্তি ও সুস্থতার প্রতিও বিশেষ খেয়াল রাখতেন। নিঃসন্দেহে বলা যায়, তার এসব কর্মপন্থা ছিল সম্পূর্ণভাবে খোদাপ্রদত্ত, এটা মানুষের উদ্ভাবিত নয়। কারণ আল্লাহ তাআলা ব্যতীত মানুষের প্রতি অধিক অনুগ্রহশীল ও দয়াশীল আর কেউ নেই। তাঁর সেই দয়া ও অনুগ্রহের একটি বহিঃপ্রকাশ হলো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিনি বন্দিদের প্রতি খেয়াল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, এমনকি এই বন্দি যদি তাঁর প্রতি অবিশ্বাসীও হয়ে থাকে।

আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খোদাপ্রদত্ত এই সহানুভূতিশীল নীতি তার বাস্তবজীবনে প্রয়োগ করতে সর্বোচ্চ সচেষ্ট ছিলেন। এ কারণে, আমরা ইতিহাসে দয়া ও সহানুভূতির এমন বহু ঘটনা উদ্ধৃত হতে দেখি। এগুলোর ভিত্তিতে দৃঢ়তার সাথে বলা যায়, মুসলিমজাতি ব্যতীত অন্য কোনো জাতির মধ্যে দয়া ও সহানুভূতির এত দৃষ্টান্ত নেই।

যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে উত্তম আচরণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল, তাদের খাদ্য-খাবারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান। হজরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, বদরযুদ্ধের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে যুদ্ধবন্দিদের যথাযথ সম্মান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এ কারণে সাহাবিগণ খাবারের সময় নিজেদের ওপর তাদেরকে প্রাধান্য দিতেন। এই কথাটি আরও অনেকেই বর্ণনা করেছেন। যেমন হজরত সাঈদ বিন জুবায়ের, আতা, হাসান এবং কাতাদা রহ.।

নিজেদের পানাহারের পর অবশিষ্ট যে খানা থাকত, সাহাবিগণ বন্দিদেরকে সেই খানা প্রদান করতেন, বিষয়টা এমন নয়। বরং তারা তাদের নবীর উপদেশ যথাযথভাবে পালনার্থে নিজেদের কাছে থাকা সবচেয়ে উত্তম খাবার নির্বাচন করতেন এবং বন্দিদেরকে সেই খাবার খাওয়াতেন। এই যেমন বন্দি আবু আজিজ। তিনি ছিলেন মুসআব বিন উমায়েরের সহোদর। তিনি তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, তারা যখন আমাকে বদরের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বন্দি করে নিয়ে আসেন, তখন আমি (বন্দি হিসেবে) আনসারি সাহাবিদের একটি দলের সাথে অবস্থান করতাম। তারা আমাকে এমন সম্মান দেখতেন যে, সকালের কিংবা রাতের খাবারের সময় হলে তারা নিজেরা শুধু খেজুর খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতেন আর আমাকে রুটি দিতেন। এমনকি খাবার খেতে তাদের কারও ভাগে যদি রুটির কোনো টুকরা এসে পড়ত, তবুও তিনি নিজে না খেয়ে সেটা আমাকে দিয়ে দিতেন। আমার লজ্জা লাগত, আমি ফিরিয়ে দিতাম। কিন্তু কিছুতেই তিনি তা গ্রহণ করতেন না, আমাকেই আবার ফিরিয়ে দিতেন।

ইবনে হিশাম বলেন, বদরযুদ্ধের দিন নজর বিন হারেসের পর এই আবু আজিজই মুশরিকদের ঝান্ডা বহন করেছিল। অতএব স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, লোকটা শত্রুপক্ষের সাধারণ কোনো ব্যক্তি ছিল না সে ছিল মুসলমানদের প্রতি সবচেয়ে কঠোর মনো ভাবাপন্ন মুশরিকদের একজন। কারণ, যুদ্ধের সময় তারাই ঝান্ডা বহন করে, যারা দলের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী ও নেতৃস্থানীয় হয়। কিন্তু এটা মুসলমানদের কর্মনীতিকে পরিবর্তন করতে পারেনি। কারণ, 'যুদ্ধবন্দিদের প্রতি দয়া দেখানো' এমন একটি আচরণনীতি, যা কোনো কাল, স্থান বা ব্যক্তির ক্ষেত্রে বর্জন করা বৈধ নয়।

তা ছাড়া মুসলমানগণ যুদ্ধবন্দিদের শুধু খাদ্য-খাবার দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং তারা তাদের পোশাক-পরিচ্ছদেরও ব্যবস্থা করতেন। বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত আছে, ইমাম বুখারি রহ. তার সহিহ নামক গ্রন্থে একটি অধ্যায় এনেছেন। অধ্যায়টির শিরোনাম দিয়েছেন, 'যুদ্ধবন্দিদের পোশাক- পরিচ্ছদ প্রদান' সেখানে তিনি হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, বদরযুদ্ধ শেষ হলে বন্দিদেরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত করা হয়। বন্দিদের মধ্যে হজরত আব্বাসও ছিলেন। তার গায়ে ভালো কোনো পোশাক ছিল না। নবীজি তার জন্য পোশাক খুঁজতে শুরু করলেন। সাহাবিগণ খোঁজ নিয়ে দেখলেন আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের পোশাকটি আব্বাস রা. এর শরীরের সঙ্গে খাপ খায়। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আব্বাসকে সেই পোশাক পরিয়ে দিলেন।

আরও বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাওয়াজিন গোত্রের বন্দিদেরকে পোশাক প্রদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি এক ব্যক্তিকে মক্কায় গিয়ে বন্দিদের জন্য 'মুআক্কাদ' নামক পোশাক ক্রয় করে আনার আদেশ করেন। ফলে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে যারা বন্দিমুক্ত বের হতো, তারা পোশাক পরিহিত অবস্থায় বের হতো।

যুদ্ধবন্দিদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যতম ওসিয়ত ছিল তাদের সঙ্গে নরম ও কোমল আচরণ করার, যাতে তারা স্বস্তি ও নিরাপত্তা অনুভব করতে পারে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি বন্দিদের প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতেন। বন্দিদের প্রশ্নের কারণে তিনি বিরক্ত হতেন না এবং উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রেও কোনো ক্লান্তিবোধ করতেন না। এটা প্রমাণ করে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনই সুপ্রশস্ত হৃদয় এবং গভীর ভালোবাসার অধিকারী ছিলেন, যা সমগ্র মানবজাতিকে অন্তর্ভুক্ত করে।

সহিহ মুসলিমে ইমরান বিন হুসাইনের বর্ণনা রয়েছে, তিনি বলেন, ছাকিফ গোত্র ছিল বনু উকাইলের মিত্র। ছাকিফ গোত্রের লোকেরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুজন সাহাবিকে বন্দি করে নিয়ে আসে। এদিকে সাহাবিরা বন্দি করেন বনু উকাইল গোত্রের এক ব্যক্তিকে। তার সাথে তার আযবা নামক উটকেও আটক করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বন্দি লোকটির দিকে এগিয়ে এলেন। বন্দি তখন শেকলে আবদ্ধ ছিল। লোকটি বলল, 'হে মুহাম্মাদ!'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বন্দি লোকটির নিকট এসে বললেন, 'বলো, তোমার কী খবর?'

সে বলল, 'তুমি কেন আমাকে ধরে এনেছ? আর কেনই-বা আমার ছাবিকাতুল হাজকে আটক করেছ?'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'বড় কোনো কারণেই আটক করা হয়েছে, তোমার মিত্র ছাকিফ গোত্রের অপরাধে আমি তোমাকে ধরেছি।'

এরপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছ থেকে চলে গেলেন। সে আবার ডাক দিয়ে বলল, 'হে মুহাম্মাদ! হে মুহাম্মাদ!'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অত্যন্ত দয়াশীল ও নম্র স্বভাবের। তাই তিনি আবার বন্দি লোকটির কাছে গেলেন এবং বললেন, 'বলো, কী বলবে?'

সে বলল, 'আমি একজন মুসলমান।'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি যদি এই কথাটি তখন বলতে, যখন তোমার ব্যাপারে তোমার অধিকার ছিল, (যদি বন্দি হওয়ার পূর্বে ইসলামগ্রহণ করতে) তাহলে তুমি পূর্ণ সফলকাম হয়ে যেতে।'

এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে চলে গেলেন। লোকটি পুনরায় ডাক দিলো, 'হে মুহাম্মাদ! হে মুহাম্মাদ!'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার তার কাছে এলেন এবং বললেন, 'বলো, তুমি কী বলতে চাও?'

সে বলল, 'আমি ক্ষুধার্ত, আমাকে খাবার দাও! আমি পিপাসার্ত, আমাকে পানি পান করাও!'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ... ঠিক আছে, এটা তোমার প্রয়োজন।'

একজন বন্দির পক্ষে এভাবে বারবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করার সুযোগ পাওয়া, যিনি ছিলেন পুরো ইসলামি সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ নেতা এবং শুধু তাঁর নাম ধরে ডাকতে পারা (যার কারণে তিনি একটুও বিরক্তবোধ করেননি)-র দ্বারাও বোঝা যায়, প্রতিটি মানুষের জন্য তিনি তাঁর হৃদয়ে কী পরিমাণ দয়া ও মানবতাবোধ পোষণ করতেন!

হয়তো এরচেয়ে আরও বড় ব্যাপার এই যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বন্দিদের অন্তরের আকুতি-আবেদনের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দিতেন এবং সেগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করতেন। এই বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয় মানুষের সংকটময় কঠিন মুহূর্তগুলোতে, বিশেষ করে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্মানিত সাহাবিদেরকে যুদ্ধবন্দি মহিলা ও শিশুদের সাথে আচার-আচরণে উন্নত মানবিকতা প্রদর্শনের নির্দেশনা দিতেন। তিনি শিশুকে তার মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে নিষেধ করতেন।

আবু আইয়ুব আনসারি রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি মা ও তার শিশুর মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে, আল্লাহ তাআলা তার ও তার প্রিয়জনদের মাঝে কিয়ামাতদিবসে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে দেবেন।

আশা করি আমাদের এই আলোচনার সমাপ্তির জন্য সামনের ঘটনাটি খুবই চমৎকার একটি বিষয় হতে পারে! কারণ, উক্ত ঘটনাতে যুদ্ধবন্দিদের সাথে আচার-আচরণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উন্নত চরিত্রের সুন্দর প্রকাশ ঘটেছে। ঘটনাটি হলো এই :

আবু উসাইদ আনসারি রা. বাহরাইন অঞ্চলের কিছু যুদ্ধবন্দিকে ধরে নিয়ে আসেন। এরপর তাদেরকে এক জায়গায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জায়গা থেকে উঠে এসে বন্দিদের প্রতি দৃষ্টি দিলেন। দেখলেন, তাদের মধ্যে একজন মহিলা বন্দিনি কান্না করছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কাঁদছ কেন?' উত্তরে মহিলা বলল, 'আমার সন্তানকে বনু আবসে বিক্রয় করে দেওয়া হয়েছে।'

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু উসাইদকে বললেন, 'তুমি এখনই দ্রুত বাহনে উঠে সেখানে যাও এবং তার সন্তানকে ফিরিয়ে নিয়ে এসো।'

নির্দেশ মোতাবেক আবু উসাইদ দ্রুত বাহনে উঠে রওয়ানা দিলেন এবং মহিলার সন্তানকে নিয়ে ফিরে এলেন।

কী আশ্চর্য! একজন বন্দি মহিলার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তর বিগলিত হয়েছে। তিনি তাঁর এক সৈনিককে সেই সুদূর অঞ্চলে পাঠিয়ে দিলেন তার সন্তানকে ফিরিয়ে আনার জন্য। যাতে মহিলার অন্তর প্রশান্ত হয় এবং তার চোখের অশ্রু বন্ধ হয়।

এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাঁর সেসব আচার-আচরণ একত্র করা সম্ভব নয়, যেগুলো তাঁর অন্তরের প্রকৃত অবস্থা এবং যুদ্ধ ও শান্তির সময়ে তাঁর অনন্যসাধারণ চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। তবে আমরা এখানে অল্প যে কয়েকটি উল্লেখ করেছি, সেগুলোও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে তাঁর সেই চারিত্রিক পূর্ণতা এবং রিসালাতের মহত্ত্ব, যা আল্লাহ তাআলা তাঁকে ওহীর মাধ্যমে দান করেছেন।

টিকাঃ
৬৭১. ইবনে কাছির: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ২/৪৫৭।
৬৭২. বস্তুত এখানে সিদ্ধান্ত বহাল রাখার অনুমতি ছিল, তাই বহাল রেখেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বিধান অমান্য করেননি।-সম্পাদক
৬৭৩. ইবনে কাছির: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৩/৩১১।
৬৭৪. এক উকিয়া = ৪০ দিরহাম। আর এক দিরহাম = ৩.০৬১৮ গ্রাম। সুতরাং এক উকিয়া ৪০×৩.০৬১৮ = ১২২.৪৭২ গ্রাম।
৬৭৫. ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা: ৪/১৪।
৬৭৬. মুসনাদে আহমাদ: ২২১৬, মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৪/১৭২।
৬৭৭. ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ১/৩৫২।
৬৭৮. মুসতাদরাকে হাকেম: ৩/৩১৮, ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/২০০।
৬৭৯. ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়নুল আছার: ১/৩৫১-৩৫২।
৬৮০. সহিহ বুখারি: ৩১৩৯, সুনানে আবু দাউদ: ২৬৮৯, মুজামুল কাবির: ১৫০৪ মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ৯৪০০, আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি ১২৬১৬
৬৮১. বাইহাকি: আস-সুনানুল কুবরা: ১৭৮১০, ইবনে হাজার: আল-ইসাবা: ১/৩০২, ইবনুল আছির: উসদুল গাবাহ: ১/৩৩৭।
৬৮২. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৬/৫১।
৬৮৩. ইবনে হাজার: ফাতহুল বারি: ৮/৮৮।
৬৮৪. সহিহ বুখারি: ৪৩৭২, সহিহ মুসলিম: ১৭৬৪।
৬৮৫. আল্লামা তাবারানি: মুজামুল কাবির ৯৭৭, মুজামুস সগির ৪০৯, মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৬/১১৫
৬৮৬. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৬১৬, ৬১৭; সালেহি শামি: সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ: ৪/২৭, আর-রউজুল উনুফ: ৩/৫৮।
৬৮৮. ইবনে কাছির: তাফসিরুল কুরআনিল আজিম: ৪/৫৮৪।
৬৮৯. ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা : ২/১৫, ইবনে কাছির : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/৪৭৫।
৬৯০. সহিহ বুখারি: ২৮৪৬, বাইহাকি আস-সুনানুল কুবরা: ১৮৫৭০।
৬৯১. বাইহাকি: দালায়িলুন নুবুওয়া: ৫/২৬৪।
৬৯২. এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য ছিল তার আসবা নামক উটটি।
৬৯৩. সহিহ মুসলিম: ১৬৪১, সুনানে আবু দাউদ: ৩৩১৬, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৮৫৯।
৬৯৪. সুনানে তিরমিজি: ১৫৬৬, মুসতাদরাকে হাকেম: ২৩৩৪।
৬৯৫. আবদুল্লাহ বিন সাবেত আনসারি। উপনাম: আবু উসাইদ। ইনি আবু উসাইদ আস্ সাইদি নন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম ছিলেন। সূত্র: ইবনুল আসির: উসদুল গাবাহ: ৫/১৩।
৬৯৬. মুসতাদরাকে হাকেম: ৬১৯৩, সুনানে সাইদ ইবনে মানসুর: ২৬৫৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00