📄 যুদ্ধাবস্থায় ও যুদ্ধের পরে নবীজি ﷺ-এর আচরণ
ইসলামে যুদ্ধ-জিহাদের শরয়ি বিধান অন্য সকল মতবাদ ও মতাদর্শ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে ব্যক্তি ইসলামে যুদ্ধ-জিহাদের বৈশিষ্ট্যাবলি সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক, তাকে প্রথমে ইসলামের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যাবলি সম্পর্কে জানতে হবে। যাতে সে ইসলামের এই যুদ্ধ-জিহাদকে অন্যদের শিথিলতামূলক কিংবা সীমালঙ্ঘনমূলক যুদ্ধবিগ্রহের মানদণ্ড দিয়ে পরিমাপ না করে।
যেসব কারণে যুদ্ধ হওয়া উচিত, সেসব কারণ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ সুস্পষ্ট। আর সেগুলো ছিল এমন কারণ, যা কোনো বিবেকবান ব্যক্তি অস্বীকার করতে পারে না এবং কোনো নিরপেক্ষ ব্যক্তি সে সম্পর্কে কোনো আপত্তিও তুলতে পারে না। এই কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, অন্যের আক্রমণ প্রতিহত করা। নিজের জীবন ধনসম্পদ, পরিবার-পরিজন, দেশ ও ধর্মকে রক্ষা করা। একইভাবে সেইসব মুমিনের ধর্ম ও বিশ্বাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কাফেররা যাদেরকে তাদের ধর্মের কারণে কষ্ট দেয় এবং ধর্ম পালনে বাধা প্রদান করে। যুদ্ধের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো, দাওয়াতের পথকে সুগম করা, যাতে সকল মানুষের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। আর সর্বশেষ, যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তাদেরকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়া।
যদিও ইসলামে জিহাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ মহৎ ও কল্যাণকর, তারপরও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বাভাবিকভাবে মানুষের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী ছিলেন না, যদিও তারা (অমুসলিম মানুষেরা) সব সময় আগে বেড়ে শত্রুতা করত আর মুসলমানদের সাথে তাদের শত্রুতা ছিল প্রকাশ্যে। এ কারণে আমরা দেখি, হজরত ইবনুল কাইয়িম রহ. তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'জাদুল মাআদ'-এ 'লড়াইয়ের পূর্বে দাওয়াত প্রদান' শিরোনামে লিখেছেন-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের উদ্দেশ্যে প্রেরিত সৈন্যদের প্রধানকে নির্দেশ প্রদান করতেন, সে যেন লড়াইয়ের পূর্বে শত্রুকে এই প্রস্তাব করে, হয় তারা ইসলামগ্রহণ করবে এবং হিজরত করে মদিনায় চলে আসবে অথবা হিজরত ব্যতীত শুধু ইসলামগ্রহণ করবে আর তখন তারা মুসলিম বেদুইনদের মতো নিরাপদে অবস্থান করবে। তখন বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ এবং কর হিসেবে আদায় করা সম্পদে তাদের কোনো অংশ থাকবে না। তারা যদি উক্ত প্রস্তাবে সাড়া দেয় তাহলে সে তা গ্রহণ করবে আর যদি তা অস্বীকার করে, তাহলে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে দেবে।
শত্রুদের বিরুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেকগুলো যুদ্ধ-জিহাদ পরিচালনা করেছেন। কখনো শত্রু ছিল মুশরিক, কখনো ইহুদি, কখনো খ্রিষ্টান। তবে কেউ যদি তাঁর এসব যুদ্ধ-জিহাদকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তাহলে সে দেখতে পাবে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত অমায়িক আচরণ করেছেন সেসব লোকের সাথেও, যারা তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দিয়েছে। তাঁর ওপর জুলুম ও নির্যাতন করেছে। যারা তাঁর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে, তিনি তাদের সঙ্গে তার বিপরীতে উত্তম আচরণ করেছেন।
শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে অগ্রগামী মুজাহিদ সাহাবিদের উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রদত্ত ওসিয়ত নিয়ে ও যুদ্ধক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্মপন্থা নিয়ে আমরা যখন চিন্তা করি, তখন আমরা তার সেই ওসিয়তের মধ্যে উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা এবং লক্ষ্যের মহত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আবদুর রহমান বিন আউফ রা.-কে ওসিয়ত করেন। ষষ্ঠ হিজরির শাবান মাসে 'দোমাতুল জান্দাল'-এ বসবাসরত খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী 'কালব' গোত্রের উদ্দেশ্যে তাকে প্রেরণ করেছিলেন। রওয়ানার মুহূর্তে হজরত আবদুর রহমান বিন আউফকে নবীজি বলেন,
তোমরা সকলে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করো। যারা আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার করে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো। তবে তোমরা খেয়ানত করবে না, ধোঁকা দেবে না, কারও চেহারা বিকৃত করবে না, কোনো শিশুকে হত্যা করবে না। তোমাদের জন্য এটাই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং তোমাদের নবী মুহাম্মাদের আদর্শ।
একইভাবে 'মুতা'-র যুদ্ধে প্রেরিত সৈন্যবাহিনীর উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওসিয়ত করেন। তিনি তাদেরকে উপদেশ দিয়ে বলেন,
তোমরা আল্লাহর নামে তাঁর রাস্তায় জিহাদ করো। যারা আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার করে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো। তবে খেয়ানত করবে না, ধোঁকা দেবে না, কারও চেহারা বিকৃত করবে না, শিশু, মহিলা, অতিশয় বৃদ্ধ এবং ইবাদতখানায় ইবাদতে মগ্ন ব্যক্তিকে হত্যা করবে না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতেও ন্যায়পরতার আচরণ করেছেন। তিনি প্রতিপক্ষ যোদ্ধাকে অথবা তাঁর সঙ্গে খেয়ানত করতে উদ্যত ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে কখনো সীমালঙ্ঘন করতেন না। তার জীবনের বহু ঘটনাতেই আমরা এ বিষয়টি দেখতে পাই। সেগুলোর মধ্যে একটি আশ্চর্য ঘটনা হলো, খায়বার বিজয়ের পর যে-সকল ইহুদি তাঁকে হত্যার জন্য গোপনে তাঁর খাবারে বিষ মিশিয়েছিল, তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা। হজরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করে বলেন, খায়বার বিজয়ের পর ইহুদিদের পক্ষ থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি ভুনা ছাগল হাদিয়া দেওয়া হয়। উক্ত ছাগলের গোশতে বিষ মিশ্রিত ছিল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এখানে যত ইহুদি আছে তাদের সবাইকে আমার কাছে একত্রিত করো। নির্দেশ অনুযায়ী তারা সকলে তাঁর কাছে একত্রিত হলো। তিনি তাদেরকে বললেন, 'আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে চাই, তোমরা কি সে ব্যাপারে আমাকে সঠিক তথ্য দেবে?'
ইহুদিরা বলল, 'জি, অবশ্যই।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাদের পিতা কে?' তারা বলল, 'অমুক।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা মিথ্যা বলেছ। বরং তোমাদের পিতা অমুক!'
তারা বলল, 'আপনি সত্য বলেছেন।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে আবার বললেন, 'আমি যদি তোমাদেরকে আরেকটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করি, তবে কি তোমরা আমাকে সঠিক তথ্য দেবে?'
তারা বলল, 'জি, অবশ্যই। আমরা যদি মিথ্যা বলি, তাহলে আপনি আমাদের মিথ্যাকে ধরতে পারবেন, যেমনটি ধরেছেন আমাদের পিতার ব্যাপারে।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কারা জাহান্নামি হবে?'
তারা বলল, 'আমরা সেখানে অল্প কিছুদিন অবস্থান করব, এরপর তোমরা সেখানে যাবে।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরাই সেখানে অপদস্থ হয়ে পড়ে থাকো। আল্লাহর কসম! তোমাদের পরে আমরা সেখানে যাব না।' এরপর নবীজি তাদের আবার বললেন, 'আমি যদি তোমাদেরকে আরেকটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করি, তোমরা কি আমাকে সঠিক তথ্য দেবে?'
তারা বলল, 'অবশ্যই, হে আবুল কাসেম!'
নবীজি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা কি এই ছাগলের গোশতে বিষ মিশিয়েছ?'
তারা বলল, 'জি, মিশিয়েছি।'
নবীজি বললেন, 'তোমরা কেন এই কাজ করেছ?'
তারা বলল, 'আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, আপনি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকেন, তাহলে আমরা এর মাধ্যমে আপনার অনিষ্ট থেকে নিষ্কৃতি পাব আর যদি আপনি সত্য নবী হয়ে থাকেন, তাহলে এই বিষ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।'
এখানে আমরা দেখতে পাই, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামান্যতম উত্তেজিত না হয়ে ধীরস্থিরতার সাথে ইহুদিদের বিষয়টি যাচাই করে দেখেছেন। তিনি তাদের বিরুদ্ধে এমন কিছু প্রমাণ উপস্থাপন করেন, যার কারণে তারা নিজেরাই স্বীকার করতে বাধ্য হয়, তারা গোপনে তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। তিনি জানতে পারেন, এই ইহুদিরা তাদের এক মহিলাকে নির্দেশ দিয়েছিল, সে যেন ছাগলের গোশতে বিষ মিশ্রিত করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে পেশ করে। অতএব দেখা যায়, মূলত ইহুদি পুরুষগণ এই ষড়যন্ত্রের নির্দেশ দিয়েছিল আর প্রকাশ্যভাবে কাজটি সম্পাদন করেছিল এবং কাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল ইহুদি মহিলা।
এই ঘটনার পর সাহাবিরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আপনি কি এই বিষ প্রয়োগকারী মহিলাকে হত্যা করবেন না?
নবীজি তখন তাদের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে বললেন, এটা তো হত্যা নয়, হত্যার চেষ্টা মাত্র। সুতরাং তাকে হত্যা করা বৈধ হবে না। অবশ্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওই মহিলাকে অন্য কোনো শাস্তিও প্রদান করেননি। এমনকি যে-সকল ইহুদি মহিলাটিকে বিষ মেশানোর নির্দেশ দিয়েছিল, তাদেরকেও তিনি কোনো শাস্তির মুখোমুখি করেননি। কারণ, তিনি তাদের কথা যৌক্তিক মনে কারছিলেন যে, তিনি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকেন, তাহলে তারা তাঁর অনিষ্ট থেকে নিষ্কৃতি পাবে আর যদি তিনি সত্য নবী হয়ে থাকেন, তাহলে এই বিষ তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। যদিও তিনি তাদের এই যুক্তিকে গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তাদের কেউ তখনও তাঁর প্রতি ঈমান আনেনি।
উক্ত ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, তারা সত্য উদ্ঘাটনের জন্য কাজটি করেনি। বরং রাসুলের প্রতি তাদের সীমাহীন হিংসা-বিদ্বেষের কারণেই এমনটি করেছে। আশ্চর্য জনক হলো, এরপরও নবীজি তাদেরকে কোনো ধরনের শাস্তি প্রদান করেননি।
তবে বিশর বিন বারা বিন মারুর নামে একজন সাহাবি নবীজির সাথে বসে বিষমিশ্রিত এক টুকরা গোশত খেয়ে ফেলেন এবং বিষক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। এই হত্যা সংঘটিত হওয়ার কারণে পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই মহিলাকে কিসাস হিসেবে হত্যার নির্দেশ দেন। তবে তার সঙ্গে খায়বারের অন্য কোনো ইহুদিকে হত্যা করা হয়নি।
কাজি ইয়াজ রহ. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন গোশতে মহিলার বিষ মিশ্রণ সম্পর্কে অবগত হন, তখনই তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ দেননি। বরং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন বলা হলো, আপনি কি তাকে হত্যা করবেন না? তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন, না। কিন্তু পরে যখন সেই বিষক্রিয়ায় সাহাবি বিশর বিন বারা নিহত হলেন, তখনই কেবল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই মহিলাকে নিহত সাহাবির পরিবারের নিকট অর্পণ করলেন। তারপর তার পরিবারের লোকেরা সেই মহিলাকে কিসাস হিসেবে হত্যা করে।
যুদ্ধক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল অন্যের প্রতি সদয় আচরণ। তাই যুদ্ধক্ষেত্রেও তিনি শত্রুপক্ষের শিশু-কিশোর, অতিশয় বৃদ্ধ, মহিলা, অসুস্থ এবং অক্ষম ব্যক্তিদের প্রতি দয়ার্দ্র আচরণ করেছেন। তিনি সর্বদা যুদ্ধের সেনাপতিদের উপদেশ দিতেন, তারা যেন তাকওয়া অবলম্বন করে এবং আল্লাহ তাআলার পর্যবেক্ষণের কথা স্মরণ রাখে। তাহলে এটা যুদ্ধনীতি মেনে চলতে এবং যুদ্ধের সকল কার্যক্রমে দয়ার্দ্র আচরণ করতে সাহায্য করবে; যদিও তা মানুষের দৃষ্টির আড়ালেই হোক না কেন এবং নবীজি শুধু এতটুকু আদেশ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং স্পষ্টভাবে কোনো বাচ্চাকে হত্যা করতে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন।
হজরত বুরাইদা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাউকে সৈন্যবাহিনীর আমির নিযুক্ত করতেন; বাহিনী ছোট হোক কিংবা বড়, তখন তিনি সেই আমিরকে বিশেষভাবে বলতেন, সে যেন নিজের ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বন করে এবং তার সঙ্গে বিদ্যমান مسلمانوں সাথে ভালো আচরণ করে। তাকে আরও বলে দিতেন, তোমরা ছোট বাচ্চাকে হত্যা করবে না...।
শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে মুসলমানরা যদি কোনো ভুল করে ফেলতেন এবং কোনো ছোট বাচ্চাকে হত্যা করে ফেলতেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে চরম রাগান্বিত হতেন। আমরা এর উদাহরণ পাই হজরত আসওয়াদ ইবনে সারি রা.-এর বর্ণনায়। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনাইনযুদ্ধের দিন একটি ছোট দলকে একদিকে প্রেরণ করেন। তারা মুশরিকদের সঙ্গে লড়াই করে। লড়াইয়ের একপর্যায়ে তারা কিছু বালককেও হত্যা করে ফেলে। এরপর তারা যখন রাসুলের নিকট ফিরে এলো, তিনি তাদেরকে বললেন, 'তোমরা ছোট বালককে হত্যা করেছ কেন?'
তারা বলল, 'হে আল্লাহর নবী, তারা তো মুশরিকদের সন্তান!' নবীজি বললেন, 'তোমাদের মধ্যে আজ যারা শ্রেষ্ঠ, তারাও কি একদিন মুশরিকদের সন্তান ছিল না! ওই সত্তার কসম, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! প্রতিটি নবজাতক সন্তান ইসলামগ্রহণের যোগ্যতা নিয়েই জন্মগ্রহণ করে, যতক্ষণ না সে তার জিহ্বা দিয়ে তার সম্পর্কে ভিন্ন কিছু প্রকাশ করে।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধক্ষেত্রে মহিলাদেরও হত্যা করতে নিষেধ করতেন। হজরত রবাহ ইবনে রবি রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে একটি যুদ্ধে ছিলাম। তিনি দেখলেন, লোকেরা একটি বিষয় নিয়ে জটলা পাকিয়েছে। তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য নবীজি এক ব্যক্তিকে পাঠিয়ে বললেন, দেখে এসো তো লোকেরা কেন জটলা পাকিয়েছে!
লোকটি ফিরে এসে বলল, নিহত এক মহিলাকে ঘিরে তারা জটলা পাকিয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহিলা তো লড়াই করার মতো ছিল না।
(বর্ণনাকারী বলেন,) অগ্রগামী বাহিনীর প্রধান ছিলেন হজরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.। নবীজি এক ব্যক্তিকে তার নিকট পাঠিয়ে বলে দিলেন, তুমি তাকে গিয়ে বলে দাও, সে যেন কোনো মহিলাকে এবং কোনো শ্রমিককে হত্যা না করে।
যুদ্ধক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি সেসব ব্যক্তির অপারগতা বিবেচনায় রাখতেন, যাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরযুদ্ধ শুরু হওয়ার সামান্য পূর্বে সাহাবিদেরকে বলেছিলেন, আমি জানি, বনু হাশেম এবং অন্যগোত্রের কয়েকজন ব্যক্তিকে জোরপূর্বক যুদ্ধে আনা হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার তাদের কোনো প্রয়োজন বা ইচ্ছা নেই। অতএব, তোমাদের মধ্যে কেউ যদি বনু হাশেমের কাউকে সামনে পায়, সে যেন তাকে হত্যা না করে। যে ব্যক্তি আবুল বুখতুরি বিন হিশাম বিন হারেস বিন আসাদকে সামনে পাবে, সে যেন তাকেও হত্যা না করে। একইভাবে আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে যে ব্যক্তি সামনে পাবে, সে যেন তাকেও হত্যা না করে। কারণ, তাকেও বের হতে বাধ্য করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের ময়দানেও সাহাবিগণের অন্তরে প্রতিশ্রুতি পালনের গুরুত্ব জাগিয়ে তুলতে আগ্রহী ছিলেন। তিনি সৈন্যদলকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে ওসিয়ত করে বলতেন,
«ولا تغدروا» তোমরা ধোঁকা দেবে না।
নবীজির নিকট বিষয়টির গুরুত্ব এতটাই বেশি ছিল যে, তিনি ধোঁকা দানকারীদের থেকে নিজের সম্পর্কহীনতার ঘোষণা দিতেন, যদিও ধোঁকা দানকারী হতো মুসলমান আর ধোঁকাগ্রস্ত ব্যক্তি হতো কাফের। তিনি ইরশাদ করেছেন,
যে ব্যক্তি কাউকে জানের নিরাপত্তা দেবে, এরপর তাকে হত্যা করে ফেলবে, তাহলে সেই হত্যাকারীর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, নিহত ব্যক্তি যদি কাফেরও হয়।
একইভাবে মানুষের জানের নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন পূর্ণ আগ্রহী। এ কারণে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেকোনো ব্যক্তির ইসলামগ্রহণ মেনে নিতেন, যদিও তার অতীত কার্যাবলী শত্রুতায় ভরপুর থাকত। এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো, হজরত উসামা বিন জায়েদ রা.-এর কাজটিকে নবীজির নিন্দা করা। তিনি এক মুশরিক যোদ্ধাকে তার সামনে ইসলামের কালেমা উচ্চারণ করার পরও হত্যা করেছিলেন, যদিও পারিপার্শ্বিক সকল অবস্থা নির্দেশ করছিল তার ইসলামগ্রহণের স্বীকারোক্তি ছিল নিছক প্রাণ রক্ষার্থে। ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন ইমাম মুসলিম রহ.। তিনি বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মুসলমানদের একটি বাহিনীকে প্রেরণ করলেন। একসময় উভয় দল পরস্পরের মুখোমুখি হলো। মুশরিক বাহিনীর মধ্যে একজন চতুর ব্যক্তি ছিল, যখনই সে কোনো মুসলমানকে লক্ষ্যবস্তু বানাতো, আচমকা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে শহিদ করে দিত। এটা টের পেয়ে একজন মুসলিম লোকটির অসতর্ক মুহূর্তের অপেক্ষা করতে লাগলেন...(বর্ণনাকারী বলেন, আমাদেরকে বলা হতো, তিনি ছিলেন হজরত উসামা বিন জায়েদ)। সুযোগ পেয়ে উক্ত মুসলিম যখন হত্যার উদ্দেশ্যে সেই মুশরিকের ওপর তরবারি উত্তোলন করলেন, অমনি সেই কাফের বলে উঠল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ...। তবুও সেই মুসলিম ব্যক্তি উক্ত মুশরিককে হত্যা করে ফেললেন।
যুদ্ধ শেষে, মুসলমানদের বিজয়ের সংবাদ নিয়ে একজন সংবাদবাহক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পৌঁছলেন। নবীজি তাকে যুদ্ধের সকল পরিস্থিতি জিজ্ঞাসা করলেন। সংবাদবাহক নবীজিকে পরিস্থিতির পূর্ণ বিবরণ দিলেন। এমনকি সেই মুসলিমের উল্লিখিত ঘটনার কথাও নবীজিকে জানালেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎক্ষণাৎ সেই মুসলিমকে ডাকলেন এবং বললেন, 'তুমি কেন তাকে হত্যা করলে?'
সাহাবি বললেন, 'হে আল্লাহর নবী, সে অনেক মুসলমানকে আহত করেছে এবং অমুক অমুককে হত্যা করেছে (এ কথা বলে তিনি কয়েকজন শহিদ সাহাবির নাম উল্লেখ করলেন)। এরপর আমি তার ওপর হামলা করি, সে আমার উদ্যত তরবারি দেখে ভয়ে বলে ওঠে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ...।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এরপরও তুমি তাকে হত্যা করেছ?'
সাহাবি বললেন, 'জি... হে আল্লাহর নবী!'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'কিয়ামত দিবসে যখন "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” তার পক্ষে বাদী হয়ে আসবে, তখন তুমি কী করবে?'
সাহাবি বললেন, 'হে আল্লাহর নবী, আপনি আমার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন!'
বর্ণনাকারী বলেন, কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার একই কথা বলতে ছিলেন...। এর অতিরিক্ত আর কিছুই তিনি তখন বলেননি।
এটি ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে তাঁর সকল উম্মতের জন্য একটি অনিবার্য শিক্ষা এবং অসমর্থিত হত্যার ব্যাপারে একটি কঠিন সতর্কবার্তা। বরং অন্যভাবে বলা যায়, যেখানে হত্যা না করার সামান্যতম সুযোগ রয়েছে, সেখানে হত্যা না করার ব্যাপারে এটা ছিল রাসুলের প্রচণ্ড আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, ইসলামের যুদ্ধ-জিহাদ এমন একটি বিষয়, যা কেবল প্রয়োজনের কারণেই হয়ে থাকে। আর যখন এবং যেখানেই লড়াই ও রক্তপাত এড়িয়ে যাওয়ার সামান্যতম সুযোগ থাকে, তখন এবং সেখানে তা এড়িয়ে যাওয়াই ইসলাম ও তার রাসুলের কর্মনীতি।
অতএব, নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুতেই অনর্থক যুদ্ধের প্রতি আগ্রহী ছিলেন না। বরং তিনি যথাসম্ভব যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতেন। এ কারণেই তিনি প্রথমে শত্রুদের সামনে ইসলামগ্রহণ বা কর প্রদানের প্রস্তাব পেশ করতেন। কিন্তু শত্রুপক্ষ যদি লড়াই করার ব্যাপারে অটল থাকত, তাহলেই কেবল তিনি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতেন। কিন্তু এরপরও তিনি তাদের জন্য সন্ধিচুক্তির দরজা খুলে রাখতেন।
শত্রুরা সন্ধির প্রস্তাব করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই প্রস্তাব গ্রহণ করতেন এবং সন্ধি করে নিতেন, এমনকি প্রস্তাবটা যদি মুসলমানদের বিজয়ের আলামতসমূহ স্পষ্ট হওয়ার পরও করা হতো। এর একটি উজ্জ্বল নমুনা হলো খায়বার যুদ্ধের ঘটনা। আল্লামা ইবনে কাছির রহ. বলেন,
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের ইহুদিদেরকে ১৪ দিন অবরোধ করে রাখার পর তারা যখন তাদের পরাজয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেল, তখন তাদের পক্ষ থেকে ইবনু আবিল হুকাইক রাসুলের নিকট সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে এলো। সে রাসুলের সাথে এই শর্তে সন্ধি করে যে, নবীজি তাদের প্রাণ রক্ষা করবেন এবং তাদেরকে খায়বার থেকে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দেবেন। আর তারা রাসুলের কাছে তাদের মালিকানাধীন সকল জমি, সম্পদ, সোনা-রুপা, ঘোড়া, যাবতীয় অস্ত্র ও গচ্ছিত পোশাক রেখে যাবে। তবে নিজেদের শরীরে পরিহিত পোশাক ও অলংকার তারা নিয়ে যেতে পারবে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে আরেকটি শর্ত যুক্ত করে বললেন, 'কিন্তু তোমরা যদি কোনো কিছু গোপন করো, তাহলে তোমাদের থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা উঠে যাবে।' ইহুদিরা রাসুলের এই শর্তটি মান্য করেই সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি মহৎ গুণ ছিলো, তিনি তাঁর পুরো জীবনে একটিবারের জন্যও কাউকে ইসলামগ্রহণে বাধ্য করার চিন্তা করেননি। অবশ্য এ গুণটি রাসুলের জীবনের অন্য প্রতিটা ক্ষেত্রেও সুস্পষ্টভাবে পরিদৃষ্ট হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে সেই বেদুইনের ঘটনা, যে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল। হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ ঘটনাটি বর্ণনা করে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাখল এলাকায় অবস্থিত খাসফা গোত্রের শাখাগোত্র মুহারেবের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। লড়াইয়ের দিনগুলোতে একসময় অমুসলিমরা মুসলমানদের অসতর্ক অবস্থায় (নবী ও সাহাবিগণ দুপুরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন) দেখতে পায়। তখন তাদের একজন কিছুটা দূরে বিশ্রামরত রাসুলের দিকে এগিয়ে এলো, তার নাম গাওরাছ ইবনে হারেস। লোকটি এসে রাসুলের মাথার নিকট একটি তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। এরপর রাসুলকে লক্ষ্য করে বলল, 'এখন কে তোমাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে?'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আল্লাহ।' কথাটি শোনামাত্র লোকটির হাত থেকে তরবারি পড়ে গেল। এরপর নবীজি তরবারিটা নিজের হাতে উঠিয়ে নিয়ে বললেন, 'এখন তুমি বলো, কে তোমাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে?'
লোকটি বলল, 'আপনি তরবারিটির উত্তম ধারক হোন।'
নবীজি বললেন, 'তুমি কি সাক্ষ্য দেবে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই?' লোকটি বলল, 'না, তবে আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমি কখনো আপনার বিরুদ্ধে লড়াই করব না। এমন কোনো সম্প্রদায়েরও পক্ষ নেব না, যারা আপনার বিরুদ্ধে লড়াই করে।'
নবীজি লোকটিকে ছেড়ে দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর লোকটি তার সঙ্গীদের নিকট গিয়ে বলল, 'আমি তোমাদের কাছে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তির নিকট থেকে ফিরে এলাম।
আমরা দেখতে পাই, এই কাফের ব্যক্তি তরবারি হাতে রাসুলের শিয়রে দাঁড়িয়েছে এবং তাঁকে হত্যা করার ভয়ও দেখিয়েছে। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে বিপদমুক্ত করলেন আর ঘটনার প্রেক্ষাপট পালটে গেল। তরবারি বেদুইনের হাত থেকে রাসুলের হাতে চলে এলো। কিন্তু কী আশ্চর্য! এরপরও রাসুলের অন্তরে হিংসা বা প্রতিশোধপরায়ণতা স্থান পায়নি! তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে তার কাছে ইসলামগ্রহণের প্রস্তাব পেশ করেন। লোকটি তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তবে নবীজির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হবে না বলে প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। নবীজি প্রশস্ত হৃদয়ে তার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। তাকে ক্ষমা করে দেন এবং নিরাপদে নিজ গোত্রের লোকদের নিকট ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেন, তাকে ইসলামগ্রহণেও বাধ্য করেননি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুসলমানগণ যেসব যুদ্ধ করেছেন, সেখানে কোনো প্রতিশোধের উদ্দেশ্য ছিল না। এ কারণে পরাজিতদের সঙ্গে রাসুলের আচরণ ছিল অমায়িক, ক্ষমা ও মুক্তির মহৎ গুণে গুণান্বিত। কেউ বিরূপ আচরণ করলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা ঘৃণা করতেন। নবীজির এই ক্ষমার নমুনা পাওয়া যায় হুদাইবিয়ার ঘটনাতে। ইমাম মুসলিম রহ. তার 'সহিহ' গ্রন্থে হজরত সালামা বিন আকওয়া থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হুদাইবিয়ায় গিয়েছিলাম, তখন আমরা ছিলাম চৌদ্দশ জন। আমরা একটি কূপের নিকট অবস্থান গ্রহণ করি। সেখানে মাত্র পঞ্চাশটি ছাগল পানি পান করার মতো পানি ছিল। আমরা খুব অল্প পানিই সেখান থেকে নিতে পারছিলাম, অল্প সময়ের মধ্যেই কূপের সব পানি শেষ হয়ে গেল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কূপের কিনারে এসে তাতে থুথু নিক্ষেপ করলেন, সঙ্গে সঙ্গে কূপের পানি ফুলে-ফেঁপে উঠল। আমরা নিজেরাও পানি পান করলাম এবং আমাদের পশুগুলোকেও পানি পান করালাম। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে একটি গাছের নিচে বাইআত করার জন্য ডাকলেন। আমি ছিলাম অগ্রগামী লোকদের একজন। আমি তাঁর হাতে বাইআত করলাম। এরপর আরও কিছু লোক বাইআত করল। একসময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, 'সালামা, বাইআত করো।' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর নবী, আমি তো প্রথম দলেই বাইআত করেছি!' তিনি বললেন, 'করো, আবারও করো।' আমি আবার বাইআত করলাম।
সালামা রা. বলেন, এরপর তিনি আমাকে বললেন, 'সালামা, তোমার ঢাল কোথায়?' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর নবী, আমার চাচা আমের আমার ঢালটি আমাকে দিয়েছেন।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আবারও বাইআত করো।' আমি তৃতীয়বারও বাইআত করলাম। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, 'হে সালামা, তোমার ঢাল কোথায়?' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর নবী, আমার চাচা আমের আমাকে ঢালটি দিয়েছেন। তিনি আবার বললেন, 'আবারও বাইআত করো।' আমি চতুর্থবার বাইআত করলাম। এরপর তিনি আমাকে বললেন, 'হে সালামা, তোমার ঢাল কোথায়?' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর নবী, আমার চাচা আমের আমাকে ঢালটি দিয়েছেন।' তিনি আবার বললেন, 'আবারও বাইআত করো।' আমি পঞ্চমবার বাইআত করলাম। এবার তিনি বললেন, 'সালামা, তোমার ঢাল কোথায়?' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর নবী, আমার চাচা আমের আমার ঢালটি আমাকে দিয়েছেন।' এবার তিনি হেসে বললেন, 'হে সালামা! তোমার ঢাল কোথায়, যা আমি তোমাকে দিয়েছিলাম?!' এবার আমি বললাম, সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সম্মানিত করেছেন, আমি তা আমেরকে দিয়ে দিয়েছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে বললেন, 'করো, আবারও করো!' আমি ষষ্ঠবার বাইআত করলাম। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের বাইআত সম্পন্ন করে আমার কাছে এলেন। তখন তিনি দেখলেন আমার হাতে কোনো অস্ত্র নেই। তখন তিনি আমাকে চামড়ার একটি ঢাল প্রদান করলেন। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদাইবিয়া থেকে ফিরে আসতে লাগলেন।
তিনি বলেন, এরপর আমি তাদেরকে বন্দি করে রাসুলের নিকট নিয়ে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি, আমার চাচা আমেরও 'আবালত' গোত্রের এক ব্যক্তিকে ধরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে আসছে। তার নাম মিকরাজ। মিকরাজ সে সময় বর্ম পরিহিত ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করেছিল এবং মিকরাজের সঙ্গে আমার চাচা আরও ৭০ জন মুশরিককে ধরে নিয়ে এসেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তাদেরকে ছেড়ে দাও। বিশ্বাসঘাতকতার সূচনা হোক তাদের থেকেই এবং শেষটাও!'
তিনি তাদের সবাইকে মাফ করে দিলেন। এ প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল করেন, وَهُوَ الَّذِي كَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ عَنْهُمْ بِبَطْنٍ مَكَّةَ مِنْ بَعْدِ أَنْ أَظْفَرَكُمْ عَلَيْهِمْ
আল্লাহই মক্কা উপত্যকায় তাদের হাতকে তোমাদের পর্যন্ত পৌঁছা হতে এবং তোমাদের হাতকে তাদের পর্যন্ত পৌঁছা হতে নিবৃত্ত রেখেছেন। তাদের ওপর তোমাদেরকে ক্ষমতা দান করার পর। [সুরা ফাতহ: ২৪]
সালামা রা. বলেন, এরপর আমরা মদিনার উদ্দেশে বের হয়ে পড়ি। এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি বিষয় প্রশস্ত হৃদয় ও সহজতার সাথে গ্রহণ করেছেন। কখনো কারও থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তিনি কখনো কোনো প্রতিশোধ গ্রহণ করতে রক্তপাত ঘটাননি। কারও ধনসম্পদ নষ্ট করেননি। বাড়িঘর লুটপাট করেননি। বরং সবসময় সবধরনের শত্রুর ক্ষেত্রে ক্ষমাই ছিল তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আর তাঁর ক্ষমা শুধু সেসব একক ব্যক্তির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, যারা কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না। বরং তিনি সম্প্রদায়ের সবাইকে ক্ষমা করে দিতেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ঘটনা হলো মক্কাবাসীকে তাঁর ক্ষমা করে দেওয়া। তিনি তাদেরকে বলেছিলেন, 'হে কুরাইশ সম্প্রদায়, আল্লাহ তাআলা তোমাদের থেকে জাহেলি যুগের অহমিকা এবং বংশগৌরবের অবসান ঘটিয়েছেন। মানুষমাত্রই আদম থেকে সৃষ্ট আর আদমের সৃষ্টি মাটি থেকে।' অতঃপর নবীজি این آیت تিলাওয়াত করেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অন্যকে চিনতে পারো। প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা বেশি মর্যাদাবান সেই, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি মুত্তাকি। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছু সম্পর্কে অবহিত। [সুরা হুজুরাত: ১৩]
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে কুরাইশ সম্প্রদায়, আমি তোমাদের সাথে কেমন আচরণ করব বলে তোমরা আশা করো?'
তারা (কুরাইশরা) বলল, 'আমরা উত্তম আচরণের আশা করি। তুমি আমাদের সম্মানিত ভাই এবং সম্মানিত ভাইয়ের সন্তান।'
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'ঠিক আছে, যাও, তোমরা সকলেই মুক্ত-স্বাধীন।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়া ও ক্ষমা এতটাই ব্যাপক ও বিস্তৃত ছিল যে, যেসব গোত্র তাঁর আহ্বানের বিরোধিতা করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছে, পরে যখন তিনি তাদের ওপর বিজয়ী হয়েছেন, তখন ক্ষমার পাশাপাশি তিনি তাদেরকে তাদের পূর্ব-পদমর্যাদাও ফিরিয়ে দিয়েছেন। যেমন বনু ফাযারার নেতা উয়াইনা ইবনে হিসনকে তার পূর্ব নেতৃত্ব ফিরিয়ে দিয়েছেন, অথচ নবীজি খুব ভালোভাবে জানতেন যে, 'আহজাব' যুদ্ধের দিনগুলোতে মদিনা মুনাওয়ারাকে অবরোধকারী বাহিনীর মাঝে সেও ছিল। সে তখন গাতফান গোত্রের পতাকাতলে অবস্থান করছিল। আব্বাস বিন মিরদাসকে বনু সুলাইমের নেতৃত্ব ফিরিয়ে দিয়েছেন। একইভাবে আকরা ইবনে হাবেসকে তামিম গোত্রের নেতৃত্ব ফিরিয়ে দিয়েছেন। জাইফার ও আব্বাদকে ওমানের নেতৃত্ব ফিরিয়ে দিয়েছেন। ইয়ামেনের নেতৃত্ব ফিরিয়ে দিয়েছেন বাযানকে। আর মুনযির ইবনে সাবাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন বাহরাইনের নেতৃত্ব...। আরও অনেকের ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটেছিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে এ ধরনের ঘটনা বহুবার ঘটার কারণে সবগুলো দৃষ্টান্ত এখানে উপস্থাপন করা কষ্টকর। এগুলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুউচ্চ ব্যক্তিত্ব, তাঁর অনন্যসুন্দর মহত্ত্ব ও ক্ষমার ব্যাপকতার প্রমাণ বহন করে।
এমনটাই ছিল যুদ্ধের ময়দান ও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ। কতই-না চমৎকার ছিল তাঁর এই চারিত্রিক গুণাবলি! যেগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে প্রতিপালকের সঙ্গে তাঁর গভীরতম সম্পর্ক, যিনি তাঁকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছেন এবং অতি উত্তমভাবেই তিনি সেই শিক্ষাদান পূর্ণ করেছেন।
টিকাঃ
৬৪৩. ড. আবদুল লতিফ আমের : আহকামুল আসরা ওয়াস-সাবায়া ফিল-হরুবিল ইসলামিয়্যা: ৪৫-৪৬।
৬৪৪. আনোয়ার জুনদি বিমাযা ইনতাসারাল মুসলিমুন: ৫৭-৬২ (ইষৎ পরিমার্জিত)।
৬৪৫. ইবনুল কাইয়িম: জাদুল মাআদ: ৩/৯০।
৬৪৬. মুসতাদরাকে হাকেম: ৮৬২৩, তাবারানি: মুজামুল আওসাত: ৪৬৭১, মাজমাউজ জাওয়ায়েদ : ৫/১৪৪।
৬৪৭. সহিহ মুসলিম: ১৭৩১, সুনানে আবু দাউদ: ২৬১৩, সুনানে তিরমিজি: ১৪০৮।
৬৪৯. বিশর বিন বারা বিন মারুর: তিনি ২য় বায়আতে আকাবাতে অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। খায়বার বিজয়ের পর সেখানেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিষযুক্ত গোশত খেয়ে মারা যান। এক বর্ণনায় বলা হয় গোশত যেখানে খেয়েছিলেন সেখানেই মারা গিয়েছিলেন। সূত্র: উসদুল গাবাহ: ১/১১৫-১১৬, আল-ইসতিআব: ১/৫১, আল-ইসাবা: ৬৫৪।
৬৫০. ইমাম নববি: আল-মিনহাজ: ১৪/১৭৯।
৬৫১. ইবনে কাছির : আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ১/৩৩৭, ইবনে হিব্বান: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৩৪৬, ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৫/১২৭, আর-রওজুল উনুফ : ১/৩৯৫।
৬৫২. সহিহ মুসলিম: ১৭৩১।
৬৫৩. মুসনাদে আহমাদ: ১৫৬২৬, মুসতাদরাকে হাকেম: ২৫৬৬, মুসান্নাকে আবদুর রাজ্জাক: ২০০৯১, আস-সুনানুল কুবরা লিল-বাইহাকি: ১৮১১৪।
৬৫৪. সুনানে আবু দাউদ: ২৬৬৯, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৮৪২, মুসনাদে আহমাদ: ১৭৬৪৭, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৭৮৯, মুসতাদরাকে হাকেম: ২৫৬৫।
৬৫৫. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৬২৮, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৪৩৬।
৬৫৬. সহিহ মুসলিম : ১৭৩১, মুয়াত্তা মালেক : ৯৬৬, সুনানে আবু দাউদ: ২৬১৩, সুনানে তিরমিজি: ১৪০৮, সুনানে ইবনে মাজা: ২৮৫৭।
৬৫৭. ইমাম বুখারি: আত-তারিখল কাবির: ৩/৩২২, ইবনে হিব্বান: ৫৯৮২, মুসনাদুল বাযযার: ২৩0৮, মুজামুল কাবির: ৬৪, মুজামুস সগির : ৩৮, মুসনাদুত তয়ালিসি: ১২৮৫, হিলয়াতুল আউলিয়া: ৯/২৪।
৬৫৮. বিভিন্ন বর্ণনা এ কথা উল্লেখ করে যে, ঘটনাটি ঘটেছিল ৭ম হিজরির রমজান মাসে 'মায়ফায়া' গ্রামে অবস্থিত বনু উয়াল ও বনু আবদ বিন ছালাবার উদ্দেশ্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রেরিত গালেব বিন আব্দুল্লাহ আল-লাইসির বাহিনীতে। এক বর্ণনায় বলা হয়, বাহিনীটি পাঠানো হয়েছিল জুহায়না গোত্রের শাখাগোত্র হুরাকাতের উদ্দেশ্যে, যার সদস্য সংখ্যা ছিল ১৩০ জন। সূত্র: উয়ুনুল আছার: ২/১৫৬
৬৫৯. বলা হয় যে, সে হলো নাহিক বিন মিরদাস।
৬৬০. সহিহ মুসলিম: ৯৭।
৬৬১. ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/৩৭৬।
৬৬২. সহিহ বুখারি: ৪১২৭, সহিহ মুসলিম: ৮৪৩।
৬৬৪. আমের বিন সিনান আল-আনসারি: তিনি সালামা বিন আমর বিন আকওয়া রা.-এর চাচা ছিলেন। খায়বারযুদ্ধে শহিদ হন। খায়বারযুদ্ধে বের হওয়ার মুহূর্তে এই কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন: فَقُلْنَا يَا رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا بِاللهِ لَوْلَا اللهُ مَا اهْتَدَيْنَا، وَلَا تَصَدَّقْنَا وَلَا صَلَّيْنَا —আল্লাহর কসম! আল্লাহর অনুগ্রহ না হলে আমরা হেদায়েত পেতাম না, দান-সদকা করতে পারতাম না এবং নামাজও আদায় করতে পারতাম না। সূত্র: উসদুল গাবাহ: ২/১৯, আল-ইসাবা: ৪০৯১।
৬৬৫. সহিহ মুসলিম: ১৮০৭, মুসনাদে আহমাদ: ১৬৫৬৬।
৬৬৬. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৪১১, ইবনুল কাইয়িম : জাদুল মাআদ : ৩/৩৫৬, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/৫৭০, ফাতহুল বারি: ৮/১৮।
৬৬৭. ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা: ২/১৫৩।
৬৬৮. ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা: ১/২৬৩।
৬৬৯. ইবনে কাছির: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৪/২৭০।
৬৭০. ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা: ১/২৬৩।
📄 যুদ্ধবন্দিদের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ
যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে আচারব্যবহারের নীতিমালা একেক ধর্মে, একেক সমাজে একেক রকম। তবে ইসলাম আগমনের পূর্বে সকল নীতিমালাতেই প্রাধান্য বিস্তার করেছিল কঠোর আচরণ, অত্যাচার ও নির্যাতন। আর যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে আচারব্যবহারের এই নীতিগুলোই মানুষদের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে আচারব্যবহারে তাঁর স্বভাবজাত দয়ার্দ্র মনোভাব থেকে একচুলও সরে আসেননি। তিনি তাদেরকে কখনো এই দৃষ্টি দিয়ে দেখেননি যে, তারা সর্বদা সর্বদিক থেকে ইসলামি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে, তাঁকে হত্যা করে পৃথিবী থেকে মুসলমানদের নামনিশানা মুছে ফেলতে চায়।
যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে আচারব্যবহারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্রের উচ্চতা ও মহত্ত্ব অনুধাবন করতে আমরা তাঁর জীবনের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি। তাঁর জীবনের চিরন্তন ও অমর কীর্তিসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো, বদরের যুদ্ধবন্দিদের সাথে তাঁর আচার-ব্যবহার। সকলেই জানি, বদরযুদ্ধ ছিল মুসলমান ও মুশরিকদের মাঝে সংঘটিত প্রথম সর্বাত্মক যুদ্ধ। উক্ত যুদ্ধে সৈন্য ও অস্ত্রের স্বল্পতা সত্ত্বেও মুসলমানরাই বিজয় অর্জন করেন। (সত্তরজন মুশরিককে হত্যা করেন) সেইসাথে তারা সত্তরজন মুশরিককে বন্দি করেন। এইসব যুদ্ধবন্দির ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করেন, যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে? এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন হজরত উমর রা.। তিনি বলেন, (বদরযুদ্ধের যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারে) আবু বকর রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, এরা তো আমাদেরই আত্মীয়, কেউ হয়তো চাচাতো ভাই, কেউ আপন ভাই, কেউ-বা পরিবারের অন্য সদস্য। এতএব, আমার মত হলো তাদের থেকে ফিদয়া নেওয়া হোক। তাহলে সেই সম্পদগুলো পরে কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের শক্তি জোগাবে। সেইসাথে সম্ভাবনা আছে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে হেদায়েত দিয়ে দেবেন, তখন তারাও আমাদের সহযোগী হয়ে যাবে।'
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে খাত্তাবের পুত্র, তোমার কী মত?'
উমর রা. বলেন, আমি তখন বললাম, 'আল্লাহর কসম! আমার মতটা আবু বকরের মতের মতো নয়। বরং আমার মত হলো, আপনি অমুককে (তার নিজের এক আত্মীয়ের কথা উল্লেখ করলেন) আমার হাতে ছেড়ে দেবেন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেবো। আলির হাতে ছেড়ে দেবেন আকিলকে, সে তার গর্দান উড়িয়ে দেবে। আর হামজার হাতে দেবেন তার অমুক ভাইকে, সেও তার গর্দান উড়িয়ে দেবে (এভাবে প্রত্যেকে তার নিজ নিজ মুশরিক বন্দি আত্মীয়কে হত্যা করবে)। যাতে আল্লাহ তাআলা দেখে নেন যে, আমাদের অন্তরে মুশরিকদের প্রতি কোনো নমনীয়তা নেই। আর তারাই হলো মুশরিকদের নেতৃস্থানীয় লোক, তাদের নেতা ও প্রধান ব্যক্তিবর্গ...।'
(হজরত উমর রা. বলেন,) তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার মত গ্রহণ করলেন না, বরং তিনি হজরত আবু বকরের মত গ্রহণ করলেন এবং তাদের (যুদ্ধবন্দিদের) থেকে ফিদয়া গ্রহণ করে তাদেরকে মুক্ত করে দিলেন।
যদিও এই ঘটনার পর এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি আয়াত নাজিল হয়েছে, যেখানে এইসব যুদ্ধবন্দিদের সাথে নরম ও কোমল আচরণের কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিরস্কার করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَوْلَا كِتَابٌ مِنَ اللَّهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে লিখিত এক বিধান পূর্বে না থাকত, তবে তোমরা যে পথ অবলম্বন করেছ, সে কারণে তোমাদের ওপর বড় কোনো শান্তি আপতিত হতো। [সুরা আনফাল: ৬৮]
কিন্তু তা সত্ত্বেও, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল যুদ্ধবন্দির সাথে কঠোর আচরণ করেননি, অথবা তাদেরকে হত্যা থেকে রেহাই দেওয়া এবং সক্ষম ব্যক্তিদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণের যে প্রতিশ্রুতি তাদের দিয়েছিলেন, সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেননি। তা ছাড়া, মুক্তিপণের পরিমাণেও তিনি সহানুভূতি প্রদর্শন করেন। প্রতিটি বন্দির সামর্থ্য অনুপাতে মুক্তিপণের পরিমাণ ও প্রকার ভিন্ন-ভিন্নভাবে ধার্য করা হয়েছিল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু যুদ্ধবন্দিকে, যেমন আমর ইবনে আবি সুফিয়ানকে মুক্ত করে দেন এই শর্তে যে, মুশরিকরা তার বিনিময়ে সাদ ইবনে নুমান ইবনে আক্কালকে মুক্ত করে দেবে, যাকে আবু সুফিয়ান ওমরা করা অবস্থায় আটক করেছিল।
যুদ্ধবন্দিদের অনেকেই মুক্তিপণ দিয়ে নিজেকে মুক্ত করে নেয়। এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক বন্দির আর্থিক অবস্থার প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ রাখেন এবং সে অনুযায়ী তাদের মুক্তিপণ নির্ধারণ করেন। এ কারণে কোনো কোনো বন্দি মুক্তিপণ হিসেবে চার হাজার দিরহাম প্রদান করে। যেমন আবু ওদাআতা ও আবু আজিজ। তার আসল নাম হলো যুরারা ইবনে উমায়ের। সে ছিল প্রখ্যাত সাহাবি মুসআব ইবনে উমায়েরের ভাই। তার মা তার মুক্তিপণ পরিশোধ করে। তার মা বেশ সম্পদশালী মহিলা ছিলেন।
আবার বন্দিদের মধ্যে কেউ প্রদান করে একশ উকিয়া। যেমন রাসুলের চাচা হজরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.। কেউ প্রদান করে আশি উকিয়া। যেমন রাসুলের চাচাতো ভাই আকিল ইবনে আবি তালিব। অবশ্য আব্বাস রা. তার মুক্তিপণ তাকে প্রদান করেন। আবার কেউ কেউ মাত্র চল্লিশ উকিয়া প্রদান করেই মুক্তি পেয়ে যায়।
আর যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে যাদের কোনো সম্পদ ছিল না, তবে লেখাপড়া জানত, কয়েকজন আনসারি মুসলিম সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়ে দেওয়াই ছিল তাদের মুক্তিপণ। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করে বলেন, বদরযুদ্ধের সময় কিছু মুশরিক বন্দির মুক্তিপণ দেওয়ার মতো কোনো অর্থসম্পদ ছিল না। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মুক্তিপণ নির্ধারণ করেন, তারা আনসারি সাহাবিদের সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে দেবে।
তা ছাড়া এই যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে অনেকে এমনও ছিল, যাদের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ অনুগ্রহ করে কোনো ধরনের মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত করে দিয়েছেন। যেমন মুত্তালেব বিন হানতাব, কবি আবু ইজ্জা ও ছয়ফি বিন আবি রিফাআ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের মহান নেতা ও বিশেষ সম্মানের অধিকারী সুহাইল ইবনে আমরের সাথেও অতি উত্তম আচরণ করেছিলেন। তিনি তাকে অপদস্থ করতে কিংবা তার চেহারা বিকৃতি ঘটাতে রাজি হননি, যদিও সেটা করার পূর্ণ সক্ষমতা তাঁর ছিল। কিন্তু হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. সুহাইল ইবনে আমরের সামনের দুই দাঁত ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন। যাতে সে আর কখনোই কোনো স্থানে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারে। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বারণ করে বলেছিলেন, 'আমি কিছুতেই তার চেহারা বিকৃত করতে পারি না। তাহলে আশঙ্কা হয় আল্লাহ তাআলা আমার চেহারা বিকৃত করে দেবেন, যদিও আমি নবী।
যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামাতা আবুল আস বিন রবি'-ও ছিল। সে ছিল রাসুলের মেয়ে হজরত জয়নাবের স্বামী। স্বামীকে মুক্ত করার জন্য হজরত জয়নাব তার একটি হার পাঠিয়েছিলেন। স্বামী আবুল আস তাকে বিবাহ করে উঠিয়ে নেওয়ার সময় এই হারটি দিয়েই মাতা হজরত খাদিজা তাকে স্বামীর বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন। এই হারটি দেখে (হজরত খাদিজার রা.-এর কথা মনে পড়ায়) নবীজির হৃদয় বিগলিত হয়। তিনি সাহাবিদের লক্ষ করে বললেন, 'তোমরা যদি ভালো মনে করো, তাহলে জয়নাবের বন্দি আবুল আসকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত করে দাও এবং তার হার তাকে ফেরত দিয়ে দাও!' সাহাবিগণ বললেন, 'হে আল্লাহর নবী, আমরা সন্তুষ্ট।' পরে তারা আবুল আসকে মুক্ত করে দেন এবং সাথে জয়নাবের হারও ফেরত দিয়ে দেন। অতএব, অনেকের মতো আবুল আসকেও কোনো ধরনের মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত করে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল যুদ্ধবন্দিকেই মুক্তিপণ ছাড়া মুক্ত করে দেওয়ার জন্য পরিপূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন, যদি তাদের ব্যাপারে কুরাইশদের বিখ্যাত নেতা মুতইম ইবনে আদি সুপারিশ করতেন। কিন্তু তিনি এর আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে একটি ইঙ্গিতও করেছেন। যেমন সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে হজরত জুবায়ের ইবনে মুতইম থেকে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারে বলেছিলেন, যদি মুতইম বিন আদি বেঁচে থাকতেন আর আমার নিকট এই (কুফরির) দুর্গন্ধযুক্ত লোকদের ব্যাপারে সুপারিশ করতেন, তাহলে আমি তার সুপারিশে এদেরকে ছেড়ে দিতাম।
মুতইম বিন আদির প্রতি এমন সম্মান প্রদর্শনের কারণ হলো, কুরাইশরা বনু হাশেমের সাথে বয়কট করে যে অঙ্গীকারনামা লিপিবদ্ধ করে, তিনি সেই অঙ্গীকারনামা ভঙ্গের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তা ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তায়েফ থেকে ফিরে আসেন, তখন মুতইম তাকে আশ্রয় প্রদান করেছিলেন।
আর এটা সুস্পষ্ট যে, বদরযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার এক বছরেরও কম সময়ে অবশিষ্ট সকল যুদ্ধবন্দির মুক্তকরণ সম্পন্ন হয়ে যায়। এর দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয়, ওহুদ যুদ্ধে মুশরিকরা তাদের কোনো বন্দিকে মুক্ত করার জন্য লড়াইয়ে লিপ্ত হয়নি।
যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম আচার-আচরণের ক্ষেত্রে চির ভাস্বর হয়ে আছে হজরত ছুমামা বিন উছালের সাথে সংঘটিত সেই অনন্যসাধারণ ঘটনা। হজরত ছুমামা ছিলেন বনু হানিফার এক প্রসিদ্ধ নেতা। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মদিনায় এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করবেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে রাসুলের সাহাবিগণ তাকে আটক করে ফেলেন। তাকে বন্দি করে মসজিদে নববিতে নিয়ে আসেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের বললেন, 'তোমরা তার বন্দিত্বের সময় তার সঙ্গে উত্তম আচরণ করো।
নবীজি আরও বলেন, 'তোমাদের নিকট বিদ্যমান খাদ্য-খাবার একত্রিত করে তার কাছে পাঠাও।' একটি বর্ণনায় আছে, সাহাবিগণ রাসুলের দুগ্ধবতী উটনীর দুধও বন্দি ছুমামাকে খেতে দিতেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বন্দির সঙ্গে সর্বোচ্চ সম্মান, ভদ্রতা ও ক্ষমার আচরণ করেছেন। তিনি একবার তাকে এসে বললেন, 'ছুমামা! তোমার ব্যাপারে আমি কী সিদ্ধান্ত নেব বলে তোমার মনে হয়?' উত্তরে ছুমামা বলেন, 'মুহাম্মাদ, আপনি আমার ব্যাপারে ভালো কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন বলেই মনে করি। আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে আপনি একজন খুনিকেই হত্যা করবেন। আর যদি অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপরই আপনি অনুগ্রহ করবেন। আর আপনি যদি সম্পদ চান, তাহলে বলুন, আপনি যা চাইবেন তাই আপনাকে দেওয়া হবে।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু না বলে ছুমামাকে রেখে চলে গেলেন। দিন পার হলো। পরের দিন নবীজি আবার এসে তাকে একই প্রশ্ন করে বললেন, 'ছুমামা, তোমার ব্যাপারে আমি কী সিদ্ধান্ত নেব বলে তোমার মনে হয়?'
ছুমামা বললেন, 'আমার কাছে তেমনই মনে হচ্ছে যেটা আমি আপনাকে আগে বলেছিলাম। আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে আপনি একজন খুনিকেই হত্যা করবেন। আর যদি অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপরই আপনি অনুগ্রহ করবেন। আর আপনি যদি সম্পদ চান, তাহলে বলুন, আপনি যা চাইবেন তাই আপনাকে দেওয়া হবে।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু না বলে এ দিনও তাকে রেখে চলে গেলেন। পরদিন নবীজি আবার এসে তাকে একই প্রশ্ন করে বললেন, 'ছুমামা, তোমার ব্যাপারে আমি কী সিদ্ধান্ত নেব বলে তোমার মনে হয়?'
ছুমামা বললেন, 'আগের মতোই। আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে আপনি একজন খুনিকেই হত্যা করবেন। আর যদি অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপরই আপনি অনুগ্রহ করবেন। আর আপনি যদি সম্পদ চান, তাহলে বলুন, আপনি যা চাইবেন তাই আপনাকে দেওয়া হবে।'
এবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের ডেকে বললেন, 'তোমরা ছুমামাকে ছেড়ে দাও।'
ছাড়া পেয়ে ছুমামা প্রথমে মসজিদে নববির নিকটস্থ একটি খেজুরবাগানে গিয়ে গোসল করলেন। এরপর মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং উচ্চৈঃস্বরে নিজের ইসলামগ্রহণের ঘোষণা করে বললেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা এবং তাঁর প্রেরিত রাসুল।'
এরপর তিনি রাসুলকে লক্ষ্য করে বললেন, 'মুহাম্মাদ! আল্লাহর কসম! ইতিপূর্বে আমার নিকট পৃথিবীতে আপনার চেহারা থেকে অধিক অপছন্দনীয় আর কোনো চেহারা ছিল না। কিন্তু এখন আপনার চেহারাই আমার নিকট পৃথিবীর সকল চেহারা থেকে অধিক প্রিয়। আল্লাহর কসম! আগে আমার কাছে আপনার ধর্ম থেকে অধিক ঘৃণিত আর কোনো ধর্ম ছিল না। কিন্তু এখন আপনার ধর্মই আমার নিকট পৃথিবীর সকল ধর্ম থেকে অধিক প্রিয়। আল্লাহর কসম! আগে আমার নিকট আপনার শহর থেকে অধিক ঘৃণিত শহর আর কোনোটি ছিল না। কিন্তু এখন আপনার শহরটিই আমার নিকট সকল শহর থেকে অধিক প্রিয়।'
ছুমামা আরও বলেন, 'আমি ওমরা করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম, সে সময় আপনার অশ্বারোহী বাহিনী আমাকে আটক করে! আপনি এখন আমাকে কী নির্দেশ দেন?'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ছুমামাকে কিছু সুসংবাদবাণী শোনান এবং ওমরা করার নির্দেশ দেন। এরপর নির্দেশ অনুযায়ী ছুমামা যখন ওমরা করার জন্য মক্কায় গেলেন, তখন এক ব্যক্তি তাকে (তাচ্ছিল্য করে) বলল, 'তুমি কি ধর্মত্যাগী হয়ে গেছ?'
ছুমামা রা. বললেন, 'না, আমি বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ইসলামগ্রহণ করেছি। আর আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসুল অনুমতি দেওয়া ব্যতীত ইয়ামামা থেকে গমের একটি দানাও তোমাদের কাছে পৌঁছবে না।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই মহৎ আচরণ ছুমামার অন্তরে এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, তিনি নিজের ধর্ম পরিবর্তন করেন এবং কোনোপ্রকার জবরদস্তি ও বাধ্যবাধকতা ছাড়াই বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য 'ইসলামধর্ম' গ্রহণ করেন। বরং তার ইসলামগ্রহণ এতটাই শক্তিশালী ও জোরদার ছিল যে, তিনি কুরাইশদের সাথে সকলপ্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করেন, তাদের ওপর খাদ্য-অবরোধ আরোপ করেন। কারণ, কুরাইশরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধিতা করত এবং তাঁকে কষ্ট দিত। অবশ্য এজন্য ছুমামাকে বিপুল পরিমাণ অর্থও লোকসান দিতে হয়, যে অর্থ আসত কুরাইশদের সাথে ব্যবসাবাণিজ্য করার মাধ্যমে, তাদের নিকট গম রপ্তানি করার মাধ্যমে। এবং রাসুলের ভালোবাসায় তিনি কুরাইশ নেতাদের সাথে সামাজিক ও কূটনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সকল ও সম্পর্ক ছিন্ন করে দেন।
এদিকে, মুসলিম ও মুশরিকদের মাঝে সংঘটিত প্রথম যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে অনেক মুশরিক বন্দি হয়। সেইসব যুদ্ধবন্দির সাথে আচরণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদেরকে একটি ব্যাপক নীতির প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি বলেন, «اسْتَوْصُوا بِالْأَسَارَى خَيْرًا»
তোমরা যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে সদাচারের উপদেশ গ্রহণ করো।
এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধবন্দিদের সাথে মুসলমানদের উত্তম আচরণের যে নির্দেশ দিয়েছেন, সেটা নিছক এমন কোনো তাত্ত্বিক নীতি বা দর্শন ছিল না, বাস্তবজীবনে যার কোনো প্রয়োগ নেই। বরং মুসলমানদের জীবনের বহু ক্ষেত্রে এগুলোর বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে। এগুলো প্রমাণ করে, তাদের অন্তর ছিল দয়া ও অনুগ্রহে ভরপুর। এ কারণে আমরা দেখি, বদরযুদ্ধের সময় নবীজি সাহাবা কর্তৃক কুরাইশদের দুই গোলামকে প্রহার করাকে নিন্দা করেছেন। নবীজি সাহাবিদের তিরস্কার করে বলেন, 'তারা দুজন যখন তোমাদের সত্য বলে, তখন তোমরা তাদেরকে প্রহার করো, আর যখন তারা তোমাদের কাছে মিথ্যা বলে, তখন তোমরা তাদেরকে ছেড়ে দাও। তারা সত্য বলেছে। আল্লাহর কসম! তারা কুরাইশদের গোলাম...।'
যদিও এই যুবকদ্বয় ছিল শত্রুসেনাদের লোক এবং তাদেরকে প্রহার করার মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য শত্রুবাহিনীর গোপন দুর্বলতার বিষয়ে জানার সম্ভাবনা ছিল, এরপরও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে প্রহার করা এবং কষ্ট দেওয়াকে অপছন্দ করেছেন। ঠিক এই বিষয়ে ইমাম মালেক রহ. তার মত ব্যক্ত করেছেন। তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, 'কোনো বন্দির ব্যাপারে যদি আশা করা যায়, তাকে শাস্তি দেওয়া হলে সে শত্রুপক্ষের গোপন তথ্যাবলি অবহিত করবে, তাহলে কি এজন্য তাকে শাস্তি দেওয়া যাবে?'
ইমাম মালেক বলেন, 'এমন কথা আমি আগে কখনো শুনিনি (অর্থাৎ এমন কর্ম আমাদের পূর্বসূরিদের থেকে কখনো পাওয়া যায়নি)।
আর শুধু এতটুকুই নয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন বন্দির শারীরিক স্বস্তি ও সুস্থতার প্রতিও বিশেষ খেয়াল রাখতেন। নিঃসন্দেহে বলা যায়, তার এসব কর্মপন্থা ছিল সম্পূর্ণভাবে খোদাপ্রদত্ত, এটা মানুষের উদ্ভাবিত নয়। কারণ আল্লাহ তাআলা ব্যতীত মানুষের প্রতি অধিক অনুগ্রহশীল ও দয়াশীল আর কেউ নেই। তাঁর সেই দয়া ও অনুগ্রহের একটি বহিঃপ্রকাশ হলো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিনি বন্দিদের প্রতি খেয়াল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, এমনকি এই বন্দি যদি তাঁর প্রতি অবিশ্বাসীও হয়ে থাকে।
আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খোদাপ্রদত্ত এই সহানুভূতিশীল নীতি তার বাস্তবজীবনে প্রয়োগ করতে সর্বোচ্চ সচেষ্ট ছিলেন। এ কারণে, আমরা ইতিহাসে দয়া ও সহানুভূতির এমন বহু ঘটনা উদ্ধৃত হতে দেখি। এগুলোর ভিত্তিতে দৃঢ়তার সাথে বলা যায়, মুসলিমজাতি ব্যতীত অন্য কোনো জাতির মধ্যে দয়া ও সহানুভূতির এত দৃষ্টান্ত নেই।
যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে উত্তম আচরণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল, তাদের খাদ্য-খাবারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান। হজরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, বদরযুদ্ধের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে যুদ্ধবন্দিদের যথাযথ সম্মান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এ কারণে সাহাবিগণ খাবারের সময় নিজেদের ওপর তাদেরকে প্রাধান্য দিতেন। এই কথাটি আরও অনেকেই বর্ণনা করেছেন। যেমন হজরত সাঈদ বিন জুবায়ের, আতা, হাসান এবং কাতাদা রহ.।
নিজেদের পানাহারের পর অবশিষ্ট যে খানা থাকত, সাহাবিগণ বন্দিদেরকে সেই খানা প্রদান করতেন, বিষয়টা এমন নয়। বরং তারা তাদের নবীর উপদেশ যথাযথভাবে পালনার্থে নিজেদের কাছে থাকা সবচেয়ে উত্তম খাবার নির্বাচন করতেন এবং বন্দিদেরকে সেই খাবার খাওয়াতেন। এই যেমন বন্দি আবু আজিজ। তিনি ছিলেন মুসআব বিন উমায়েরের সহোদর। তিনি তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, তারা যখন আমাকে বদরের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বন্দি করে নিয়ে আসেন, তখন আমি (বন্দি হিসেবে) আনসারি সাহাবিদের একটি দলের সাথে অবস্থান করতাম। তারা আমাকে এমন সম্মান দেখতেন যে, সকালের কিংবা রাতের খাবারের সময় হলে তারা নিজেরা শুধু খেজুর খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতেন আর আমাকে রুটি দিতেন। এমনকি খাবার খেতে তাদের কারও ভাগে যদি রুটির কোনো টুকরা এসে পড়ত, তবুও তিনি নিজে না খেয়ে সেটা আমাকে দিয়ে দিতেন। আমার লজ্জা লাগত, আমি ফিরিয়ে দিতাম। কিন্তু কিছুতেই তিনি তা গ্রহণ করতেন না, আমাকেই আবার ফিরিয়ে দিতেন।
ইবনে হিশাম বলেন, বদরযুদ্ধের দিন নজর বিন হারেসের পর এই আবু আজিজই মুশরিকদের ঝান্ডা বহন করেছিল। অতএব স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, লোকটা শত্রুপক্ষের সাধারণ কোনো ব্যক্তি ছিল না সে ছিল মুসলমানদের প্রতি সবচেয়ে কঠোর মনো ভাবাপন্ন মুশরিকদের একজন। কারণ, যুদ্ধের সময় তারাই ঝান্ডা বহন করে, যারা দলের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী ও নেতৃস্থানীয় হয়। কিন্তু এটা মুসলমানদের কর্মনীতিকে পরিবর্তন করতে পারেনি। কারণ, 'যুদ্ধবন্দিদের প্রতি দয়া দেখানো' এমন একটি আচরণনীতি, যা কোনো কাল, স্থান বা ব্যক্তির ক্ষেত্রে বর্জন করা বৈধ নয়।
তা ছাড়া মুসলমানগণ যুদ্ধবন্দিদের শুধু খাদ্য-খাবার দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং তারা তাদের পোশাক-পরিচ্ছদেরও ব্যবস্থা করতেন। বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত আছে, ইমাম বুখারি রহ. তার সহিহ নামক গ্রন্থে একটি অধ্যায় এনেছেন। অধ্যায়টির শিরোনাম দিয়েছেন, 'যুদ্ধবন্দিদের পোশাক- পরিচ্ছদ প্রদান' সেখানে তিনি হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, বদরযুদ্ধ শেষ হলে বন্দিদেরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত করা হয়। বন্দিদের মধ্যে হজরত আব্বাসও ছিলেন। তার গায়ে ভালো কোনো পোশাক ছিল না। নবীজি তার জন্য পোশাক খুঁজতে শুরু করলেন। সাহাবিগণ খোঁজ নিয়ে দেখলেন আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের পোশাকটি আব্বাস রা. এর শরীরের সঙ্গে খাপ খায়। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আব্বাসকে সেই পোশাক পরিয়ে দিলেন।
আরও বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাওয়াজিন গোত্রের বন্দিদেরকে পোশাক প্রদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি এক ব্যক্তিকে মক্কায় গিয়ে বন্দিদের জন্য 'মুআক্কাদ' নামক পোশাক ক্রয় করে আনার আদেশ করেন। ফলে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে যারা বন্দিমুক্ত বের হতো, তারা পোশাক পরিহিত অবস্থায় বের হতো।
যুদ্ধবন্দিদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যতম ওসিয়ত ছিল তাদের সঙ্গে নরম ও কোমল আচরণ করার, যাতে তারা স্বস্তি ও নিরাপত্তা অনুভব করতে পারে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি বন্দিদের প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতেন। বন্দিদের প্রশ্নের কারণে তিনি বিরক্ত হতেন না এবং উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রেও কোনো ক্লান্তিবোধ করতেন না। এটা প্রমাণ করে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনই সুপ্রশস্ত হৃদয় এবং গভীর ভালোবাসার অধিকারী ছিলেন, যা সমগ্র মানবজাতিকে অন্তর্ভুক্ত করে।
সহিহ মুসলিমে ইমরান বিন হুসাইনের বর্ণনা রয়েছে, তিনি বলেন, ছাকিফ গোত্র ছিল বনু উকাইলের মিত্র। ছাকিফ গোত্রের লোকেরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুজন সাহাবিকে বন্দি করে নিয়ে আসে। এদিকে সাহাবিরা বন্দি করেন বনু উকাইল গোত্রের এক ব্যক্তিকে। তার সাথে তার আযবা নামক উটকেও আটক করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বন্দি লোকটির দিকে এগিয়ে এলেন। বন্দি তখন শেকলে আবদ্ধ ছিল। লোকটি বলল, 'হে মুহাম্মাদ!'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বন্দি লোকটির নিকট এসে বললেন, 'বলো, তোমার কী খবর?'
সে বলল, 'তুমি কেন আমাকে ধরে এনেছ? আর কেনই-বা আমার ছাবিকাতুল হাজকে আটক করেছ?'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'বড় কোনো কারণেই আটক করা হয়েছে, তোমার মিত্র ছাকিফ গোত্রের অপরাধে আমি তোমাকে ধরেছি।'
এরপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছ থেকে চলে গেলেন। সে আবার ডাক দিয়ে বলল, 'হে মুহাম্মাদ! হে মুহাম্মাদ!'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অত্যন্ত দয়াশীল ও নম্র স্বভাবের। তাই তিনি আবার বন্দি লোকটির কাছে গেলেন এবং বললেন, 'বলো, কী বলবে?'
সে বলল, 'আমি একজন মুসলমান।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি যদি এই কথাটি তখন বলতে, যখন তোমার ব্যাপারে তোমার অধিকার ছিল, (যদি বন্দি হওয়ার পূর্বে ইসলামগ্রহণ করতে) তাহলে তুমি পূর্ণ সফলকাম হয়ে যেতে।'
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে চলে গেলেন। লোকটি পুনরায় ডাক দিলো, 'হে মুহাম্মাদ! হে মুহাম্মাদ!'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার তার কাছে এলেন এবং বললেন, 'বলো, তুমি কী বলতে চাও?'
সে বলল, 'আমি ক্ষুধার্ত, আমাকে খাবার দাও! আমি পিপাসার্ত, আমাকে পানি পান করাও!'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ... ঠিক আছে, এটা তোমার প্রয়োজন।'
একজন বন্দির পক্ষে এভাবে বারবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করার সুযোগ পাওয়া, যিনি ছিলেন পুরো ইসলামি সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ নেতা এবং শুধু তাঁর নাম ধরে ডাকতে পারা (যার কারণে তিনি একটুও বিরক্তবোধ করেননি)-র দ্বারাও বোঝা যায়, প্রতিটি মানুষের জন্য তিনি তাঁর হৃদয়ে কী পরিমাণ দয়া ও মানবতাবোধ পোষণ করতেন!
হয়তো এরচেয়ে আরও বড় ব্যাপার এই যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বন্দিদের অন্তরের আকুতি-আবেদনের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দিতেন এবং সেগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করতেন। এই বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয় মানুষের সংকটময় কঠিন মুহূর্তগুলোতে, বিশেষ করে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্মানিত সাহাবিদেরকে যুদ্ধবন্দি মহিলা ও শিশুদের সাথে আচার-আচরণে উন্নত মানবিকতা প্রদর্শনের নির্দেশনা দিতেন। তিনি শিশুকে তার মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে নিষেধ করতেন।
আবু আইয়ুব আনসারি রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি মা ও তার শিশুর মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে, আল্লাহ তাআলা তার ও তার প্রিয়জনদের মাঝে কিয়ামাতদিবসে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে দেবেন।
আশা করি আমাদের এই আলোচনার সমাপ্তির জন্য সামনের ঘটনাটি খুবই চমৎকার একটি বিষয় হতে পারে! কারণ, উক্ত ঘটনাতে যুদ্ধবন্দিদের সাথে আচার-আচরণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উন্নত চরিত্রের সুন্দর প্রকাশ ঘটেছে। ঘটনাটি হলো এই :
আবু উসাইদ আনসারি রা. বাহরাইন অঞ্চলের কিছু যুদ্ধবন্দিকে ধরে নিয়ে আসেন। এরপর তাদেরকে এক জায়গায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জায়গা থেকে উঠে এসে বন্দিদের প্রতি দৃষ্টি দিলেন। দেখলেন, তাদের মধ্যে একজন মহিলা বন্দিনি কান্না করছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কাঁদছ কেন?' উত্তরে মহিলা বলল, 'আমার সন্তানকে বনু আবসে বিক্রয় করে দেওয়া হয়েছে।'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু উসাইদকে বললেন, 'তুমি এখনই দ্রুত বাহনে উঠে সেখানে যাও এবং তার সন্তানকে ফিরিয়ে নিয়ে এসো।'
নির্দেশ মোতাবেক আবু উসাইদ দ্রুত বাহনে উঠে রওয়ানা দিলেন এবং মহিলার সন্তানকে নিয়ে ফিরে এলেন।
কী আশ্চর্য! একজন বন্দি মহিলার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তর বিগলিত হয়েছে। তিনি তাঁর এক সৈনিককে সেই সুদূর অঞ্চলে পাঠিয়ে দিলেন তার সন্তানকে ফিরিয়ে আনার জন্য। যাতে মহিলার অন্তর প্রশান্ত হয় এবং তার চোখের অশ্রু বন্ধ হয়।
এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাঁর সেসব আচার-আচরণ একত্র করা সম্ভব নয়, যেগুলো তাঁর অন্তরের প্রকৃত অবস্থা এবং যুদ্ধ ও শান্তির সময়ে তাঁর অনন্যসাধারণ চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। তবে আমরা এখানে অল্প যে কয়েকটি উল্লেখ করেছি, সেগুলোও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে তাঁর সেই চারিত্রিক পূর্ণতা এবং রিসালাতের মহত্ত্ব, যা আল্লাহ তাআলা তাঁকে ওহীর মাধ্যমে দান করেছেন।
টিকাঃ
৬৭১. ইবনে কাছির: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ২/৪৫৭।
৬৭২. বস্তুত এখানে সিদ্ধান্ত বহাল রাখার অনুমতি ছিল, তাই বহাল রেখেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বিধান অমান্য করেননি।-সম্পাদক
৬৭৩. ইবনে কাছির: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৩/৩১১।
৬৭৪. এক উকিয়া = ৪০ দিরহাম। আর এক দিরহাম = ৩.০৬১৮ গ্রাম। সুতরাং এক উকিয়া ৪০×৩.০৬১৮ = ১২২.৪৭২ গ্রাম।
৬৭৫. ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা: ৪/১৪।
৬৭৬. মুসনাদে আহমাদ: ২২১৬, মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৪/১৭২।
৬৭৭. ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ১/৩৫২।
৬৭৮. মুসতাদরাকে হাকেম: ৩/৩১৮, ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/২০০।
৬৭৯. ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়নুল আছার: ১/৩৫১-৩৫২।
৬৮০. সহিহ বুখারি: ৩১৩৯, সুনানে আবু দাউদ: ২৬৮৯, মুজামুল কাবির: ১৫০৪ মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ৯৪০০, আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি ১২৬১৬
৬৮১. বাইহাকি: আস-সুনানুল কুবরা: ১৭৮১০, ইবনে হাজার: আল-ইসাবা: ১/৩০২, ইবনুল আছির: উসদুল গাবাহ: ১/৩৩৭।
৬৮২. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৬/৫১।
৬৮৩. ইবনে হাজার: ফাতহুল বারি: ৮/৮৮।
৬৮৪. সহিহ বুখারি: ৪৩৭২, সহিহ মুসলিম: ১৭৬৪।
৬৮৫. আল্লামা তাবারানি: মুজামুল কাবির ৯৭৭, মুজামুস সগির ৪০৯, মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৬/১১৫
৬৮৬. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৬১৬, ৬১৭; সালেহি শামি: সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ: ৪/২৭, আর-রউজুল উনুফ: ৩/৫৮।
৬৮৮. ইবনে কাছির: তাফসিরুল কুরআনিল আজিম: ৪/৫৮৪।
৬৮৯. ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা : ২/১৫, ইবনে কাছির : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/৪৭৫।
৬৯০. সহিহ বুখারি: ২৮৪৬, বাইহাকি আস-সুনানুল কুবরা: ১৮৫৭০।
৬৯১. বাইহাকি: দালায়িলুন নুবুওয়া: ৫/২৬৪।
৬৯২. এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য ছিল তার আসবা নামক উটটি।
৬৯৩. সহিহ মুসলিম: ১৬৪১, সুনানে আবু দাউদ: ৩৩১৬, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৮৫৯।
৬৯৪. সুনানে তিরমিজি: ১৫৬৬, মুসতাদরাকে হাকেম: ২৩৩৪।
৬৯৫. আবদুল্লাহ বিন সাবেত আনসারি। উপনাম: আবু উসাইদ। ইনি আবু উসাইদ আস্ সাইদি নন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম ছিলেন। সূত্র: ইবনুল আসির: উসদুল গাবাহ: ৫/১৩।
৬৯৬. মুসতাদরাকে হাকেম: ৬১৯৩, সুনানে সাইদ ইবনে মানসুর: ২৬৫৪।