📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 অমুসলিম এলাকা ও রাষ্ট্রের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ

📄 অমুসলিম এলাকা ও রাষ্ট্রের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ


আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমগ্র বিশ্ববাসীর নিকট একজন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছেন। তাঁকে বানিয়েছেন সর্বশেষ নবী ও রাসুল। সেইসাথে তাঁকে সুদৃঢ় করেছেন মহাগ্রন্থ আল-কুরআন দ্বারা। এটি এমন এক উৎস, যার থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহরণ করেছেন অমুসলিমদের সাথে আচারব্যবহারের নীতিমালা, সেটা একক ব্যক্তি হিসেবে হোক বা রাষ্ট্র হিসেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
এবং (হে নবী,) আপনাকে সকল মানুষের জন্য একজন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপেই পাঠিয়েছি, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ বোঝে না। [সুরা সাবা: ২৮]
এ কারণে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াত শুধু আরবভূখণ্ড বা তার আশপাশেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সমগ্র বিশ্বে তা ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে আমরা দেখি, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সময় বিভিন্ন রাজা-বাদশার কাছে অনেক চিঠি প্রেরণ করেছেন। সেইসব চিঠিতে তিনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। (পত্রাবলির চিত্রসমূহ ও মানচিত্র নং-৪) লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রতিটি চিঠিতে তিনি সেই রাজা বা বাদশাহকে সম্মানের সাথে 'মালিক' বা 'আজিম' বলে সম্বোধন করেছেন। সেই অমুসলিম বাদশাকে এইসব গুণে সম্বোধন করতে তিনি সামান্যতমও কুণ্ঠাবোধ করেননি। যেমন রোমের সম্রাটের নিকট নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত চিঠির ভাষ্য ছিল এমন :
مِنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ اللهِ إِلَى هِرَقْلَ عَظِيمِ الرُّوْمِ ... আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে রোমের ক্ষমতাসীন সম্রাট হিরাক্লিয়াসের উদ্দেশে প্রেরিত...। (৫৭১)
পারস্যের সম্রাটের নিকট প্রেরিত চিঠির ভাষ্য ছিল এমন :
مِنْ مُحَمَّدٍ رَّسُولِ اللَّهِ إِلَى كِسْرَى عَظِيمٍ فَارِسٍ.... আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে পারস্যের ক্ষমতাসীন সম্রাট কিসরার উদ্দেশে প্রেরিত...। (৫৭২)
মিশরের সম্রাটের নিকট প্রেরিত চিঠির ভাষ্য ছিল এমন :
مِنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ اللهِ إِلَى الْمُقَوْقِسِ عَظِيمِ الْقِبْطِ ... আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে মিশরের ক্ষমতাসীন সম্রাট মুকাওকিসের উদ্দেশে প্রেরিত...। (৫৭৩)
এভাবে হাবশার বাদশাহ নাজাশির কাছে লিখেছিলেন :
هذَا كِتَابُ مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ إِلَى النَّجَاشِيِّ الْأَصْحَمِ عَظِيمِ الْحَبْشَةِ এটা নবী মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে হাবশার ক্ষমতাসীন বাদশাহ আসহাম নাজাশির উদ্দেশে প্রেরিত চিঠি...। (৫৭৪)
আমরা আরও দেখি, তিনি পারস্যের সম্রাট কিসরার প্রেরিত দূতদ্বয়কেও সম্মান দেখিয়েছেন, অথচ তারা কিসরার পক্ষ থেকে এনেছিল এক অবাঞ্ছিত বার্তা। তারা এসেছিল নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর স্থান মদিনা থেকে ধরে নিয়ে সম্রাট কিসরার সামনে হাজির করার জন্য। এরপরও তিনি তাদের সাথে আচরণে নিজের শান্ত-সৌম্য শিষ্টাচার ও স্বভাবের কোমলতা থেকে বিচ্যুত হননি। বরং তিনি মদিনায় আগত সকল প্রতিনিধিদলকেই সম্মান দেখাতেন। তারা কোন রাষ্ট্রের বা কোন ধর্মের এগুলো তার কাছে মুখ্য ছিল না। সকল প্রতিনিধিদলকেই স্বাগত জানানো, মেহমানদারি করা, সুন্দর আচরণ করা এবং উপঢৌকন প্রেরণে তিনি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতেন। তাই পারস্যের দূতদ্বয়কেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্দরভাবে স্বাগত জানান, চমৎকার মেহমানদারি করেন, বারবার মেহমানদের নিকট গিয়ে খোঁজখবর নেন এবং তাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য নিজের সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরিধান করেন। (৫৭৫)
প্রতিনিধিদলের যথাযথ মেহমানদারির জন্য তিনি আলাদা একটি কামরার ব্যবস্থা রেখেছিলেন। যেমনটি সালামান গোত্রের প্রতিনিধিদলের অভ্যর্থনা করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের খাদেম সাওবানকে বললেন, 'তাদেরকে সেই কামরায় নিয়ে যাও, যেখানে প্রতিনিধিদল অবস্থান করে।' (৫৭৬)
এই বর্ণনার মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যায়, এইসব প্রতিনিধিদলের জন্য আলাদা কামরার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিলাব, মুহারিব, উজরা, আবদে কায়েস, তাগলিব, গাস্সান প্রভৃতি গোত্রের প্রতিনিধিদলের সাথেও এমনটি করা হয়েছিল। (৫৭৭)
তা ছাড়া, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি অভ্যাস ছিল, এইসব প্রতিনিধিদলকে বিদায়ের সময় হাদিয়া-তোহফা প্রদান করতেন। হাদিয়াগুলোর অধিকাংশ হতো রুপার তৈরি। (৫৭৮)
অপরদিকে তিনি নিজেও পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের উন্নতির জন্য অমুসলিম রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রেরিত হাদিয়া গ্রহণ করতেন। বিশেষ করে, যদি সেই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো প্রতারণা বা লড়াইয়ের ঘটনা না ঘটত। যেমন মিশরের কিবতিদের রাষ্ট্রপ্রধান মুকাওকিস হাদিয়া প্রেরণ করলে তিনি তা সাদরে গ্রহণ করেন। (৫৭৯)
[রাজা-বাদশাদের নিকট রাসুল সা.-এর প্রেরিত পত্রাবলি]
[মানচিত্র নং-৪ বিশ্বের রাজা-বাদশাদের প্রতি রাসুল সা.-এর পত্রসমূহ]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে অমুসলিমদের সাথে কূটনৈতিক আচরণের মধ্যে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে হাবশার (বর্তমান নাম ইথিওপিয়া) বাদশাহ নাজাশির সাথে তাঁর ব্যবহার ও সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি। শুরুতেই তিনি সাহাবিদের মজলিসে নাজাশির প্রশংসা করে বলেন, হাবশার মাটিতে এমন একজন বাদশাহ আছেন, যার রাজত্বে কারও ওপর জুলুম করা হয় না। (৫৮০)
এরপর (যতটুকু তথ্য পাওয়া যায়) (৫৮১) নাজাশির পূর্বধর্মের ওপর থাকা অবস্থাতেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উম্মুল মুমিনিন উম্মে হাবিবা রা.-এর সাথে নিজের বিবাহের জন্য উকিল মনোনীত করেছিলেন। কারণ, হাবশায় হিজরতের পর উম্মে হাবিবা রা.-এর স্বামী আবদুল্লাহ বিন জাহাশ খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে। (৫৮২) তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে হাবিবাকে নিজের জীবনসঙ্গিনী বানিয়ে তার কষ্টের উপশম করার ইচ্ছা করেন। ফলে বাদশাহ নাজাশি নিজের ওকালতিতে উম্মে হাবিবাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিবাহ দিয়ে দেন। মহর নির্ধারণ করা হয় চারহাজার দিরহাম। এরপর উপঢৌকন হিসেবে প্রয়োজনীয় আরও বহু আসবাবসহ শুরাহবিল ইবনে হাসানার সাথে উম্মে হাবিবাকে মদিনায় রাসুলের কাছে পাঠিয়ে দেন। এসব আসবাব নাজাশি নিজের পক্ষ থেকেই প্রদান করেছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের থেকে কিছুই পাঠানোর প্রয়োজন পড়েনি। (৫৮৩)
এ সকল বর্ণনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, মদিনায় অবস্থিত নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সুদূর ইথিওপিয়ায় অবস্থিত নাজাশির মাঝে অকৃত্রিম সম্পর্কের ভিত্তি ছিল কতটা গভীর, কতটা সুদৃঢ় এবং কতটা নৈকট্যের! বরং উল্লিখিত ঘটনা প্রমাণ করে, উভয়ের সম্পর্ক নিছক কোনো রাজনৈতিক কিংবা লোক দেখানো কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। বরং সম্পর্কটা ছিল এর থেকে আরও অনেক গভীরে। চিঠির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নাজাশির পাঠানো উত্তরই এ কথা প্রমাণ করে। বাদশাহ নাজাশি লিখেছিলেন, আমি আমার ওকালতিতে আপনার সাথে আপনার গোত্রের, আপনার ধর্মের এক নারীকে আপনার সাথে বিবাহ প্রদান করেছি। মেয়েটি আবু সুফিয়ানের কন্যা। নাম, উম্মে হাবিবা। আর আপনার জন্য এক সেট পোশাক-জুব্বা, পায়জামা ও কালো রঙের একজোড়া মোজা হাদিয়া পাঠিয়েছি। (৫৮৪)
এরপর হিজরি ষষ্ঠ সালের শেষ দিকে এবং সপ্তম সালের শুরুর দিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাদশাহ নাজাশির নিকট সর্বশেষ চিঠি প্রেরণ করেন। এই চিঠিতে তিনি তাকে ইসলামগ্রহণের দাওয়াত দেন এবং আল্লাহর সাথে শিরক করা ও শিরকের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কেও তাকে সতর্ক করেন। (৫৮৫)
অমুসলিম রাষ্ট্রের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণের এটা ছিল সংক্ষিপ্ত কিছু দিক। এগুলো বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বভাবপ্রকৃতি অনুধাবনে এবং সকল মানুষকে তাদের অবস্থা অনুপাতে যথাযথ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনন্যসাধারণ কূটনৈতিক দূরদর্শিতা প্রকাশ করে।

টিকাঃ
৫৭১. সহিহ বুখারি: ৭, সহিহ মুসলিম: ১৭৭৩।
৫৭২. খতিব বাগদাদি: তারিখে বাগদাদ ১/১৩২, কানজুল উম্মাল : ১১৩০২।
৫৭৩. যাইলায়ি: নাসবুর রায়া: ৪/৪২১, ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ২/৩৩১, ইবনুল কাইয়িম: জাদুল মাআদ: ৩/৬৯১।
৫৭৪. ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৪১, সালেহি শামি: সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ: ১১/৩৬৬।
***. ফারুক হাম্মাদা: আল-আলাকাতুল ইসলামিয়াতুন নাসরানিয়্যা ফিল-আহদিন নাবাবি: ৯৫।
**৬. ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা: ১/৩৩২।
**". ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা: ১/৩০০-৩৪৮।
*. প্রাগুক্ত।
***. ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ২/৩৯৪।
৫৮০. মুসনাদে আহমাদ: ১৮৩০৪, ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/১৬৪।
৫৮১. ফারুক হাম্মাদা: আল-আলাকাতুল ইসলামিয়াতুন নাসরানিয়্যা ফিল-আহদিন নাবাবি: ৬৯।
৫৮৯. সুনানে আবু দাউদ: ২১০৭, সুনানে দারাকুতনি: ৩৬৫২。
৫৯০. বাইহাকি: আস-সুনানুল কুবরা: ৭/২৩২。
৫৯১. হুসাইন ইবনে মাসউদ বাগাবি: আল-আনওয়ার ফি শামায়িলিন নাবিয়্যিল মুখতার: ২৮০।
***. এ ক্ষেত্রে হাদিসে বর্ণনা এসেছে এভাবে: بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ، هَذَا كِتَابُ مُحَمَّدٍ رَّسُولِ اللهِ إِلَى النَّجَاشِي الْأَصْحَمِ عَظِيمِ الْحَبَشَةِ، سَلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى، وَآمَنَ بِاللهِ وَرَسُولِهِ، وَشَهِدَ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ মুসতাদরাকে হাকেম: ২/৬৩৩, বাইহাকি: দালায়েলুন নবুওয়া: ২/৩০৮。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00