📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 মুশরিকদের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ

📄 মুশরিকদের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ


মক্কার মুশরিকদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচার-ব্যবহার ছিল এক অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত। একদিকে তিনি তাঁর সকল শক্তিসামর্থ্য, ধনসম্পদ ব্যয় করেছেন মানুষদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করার জন্যে, অপরদিকে মুশরিকরা শুধু তাঁর বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তাঁর সাথে এবং তাঁর সাহাবিদের সাথে সকল ধরনের কঠোর ও রূঢ় আচরণ এবং অত্যাচারের সর্বোচ্চটা দেখিয়ে ছেড়েছে। কিন্ত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনোই তাদের ইসলামের প্রতি আহ্বান করা পরিত্যাগ করেননি, যা ছিল তাদের ইহকালীন ও পরকালীন সফলতার একমাত্র পথ।
মক্কার মুশরিকদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচারব্যবহারে মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। যথা:
১. কাফেরদের হেদায়েতের জন্যে দোয়া করা। এভাবে তিনি সকল মুশরিকের হেদায়েতের জন্যই দোয়া করতেন। এমনকি যারা তাঁর সাথে বিশেষ শত্রুতা পোষণ করত, যেমন আবু জাহেল ও উমর ইবনুল খাত্তাব (ইসলাম গ্রহণের আগে)-এর জন্য আল্লাহর নিকট বিশেষভাবে দোয়া করেছিলেন। নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে এই দুজন তাঁর বিরোধিতা ও শত্রুতায় ছিল বেশি প্রসিদ্ধ, তীব্র ঝগড়াটে ও প্রচণ্ড শক্তিশালী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দোয়ার মধ্যে বলতেন, «اللَّهُمَّ أَعِزَّ الْإِسْلَامَ بِأَحَبِّ هَذَيْنِ الرَّجُلَيْنِ إِلَيْكَ بِأَبِي جَهْلٍ أَوْ بِعُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ وَكَانَ أَحَبَّهُمَا إِلَيْهِ عُمَرُ»
হে আল্লাহ, আবু জাহেল ও উমর ইবনুল খাত্তাব, এ দুজনের মধ্যে যে আপনার নিকট বেশি পছন্দনীয়, তাঁর মাধ্যমে আপনি ইসলামকে শক্তিশালী করুন। বর্ণনাকারী সাহাবি বলেন, তবে এ দুজনের মধ্যে আল্লাহ তাআলার নিকট উমর ইবনুল খাত্তাবই বেশি পছন্দনীয় ছিলেন। (৫৪৯)
২. নবীজি বেশি বেশি সুসংবাদ দিতেন। তাঁর জীবনের সকল কথা ও কাজের মধ্যে এই সুসংবাদ প্রদানের প্রতিচ্ছবিই সবচেয়ে বেশি ভেসে ওঠে। মুশরিকদের শত বিরোধিতা ও কঠোরতার পরও তিনি তাঁর এ স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য থেকে বিন্দুপরিমাণও সরে আসেননি। রবিআ ইবনে ইবাদ দাইলি রা. থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়। ঘটনাটি ঘটার সময় তিনি অমুসলিম ছিলেন, পরে মুসলমান হন। তিনি বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রথম স্বচক্ষে দেখি 'জুল মাজাজ' বাজারে। তিনি বলছিলেন, «يَا أَيُّهَا النَّاسُ قُولُوا لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ تُفْلِحُوا» 'হে মানব সকল, তোমরা ঘোষণা করো এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, তাহলে তোমরা সফলকাম হয়ে যাবে...।' তিনি একটি প্রশস্ত পথ দিয়ে হাঁটছিলেন আর মানুষেরা তাঁর চতুর্দিকে ভিড় করছিল। তিনি অব্যাহতভাবে এই একই কথা বলে যাচ্ছিলেন, «يَا أَيُّهَا النَّاسُ قُولُوا لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ تُفْلِحُوا» কিন্তু আমি কাউকে কোনো কথা বলতে শুনলাম না। তবে তার পেছনে পেছনে এক ব্যক্তি, যার চেহারা উজ্জ্বল তবে চোখ দুটো টেরা আর চুলে দুটি বেণি করা। এই লোকটি নবীজিকে লক্ষ করে একাধারে বলে যাচ্ছে, 'এ ধর্মত্যাগী! এ মিথ্যুক! তোমরা এর কথা শোনো না।'
আমি মানুষদের জিজ্ঞাসা করলাম, 'তিনি কে?' লোকেরা বলল, 'তিনি আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ। তিনি নবুয়তের কথা বলছেন।'
পুনরায় আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'আর এই লোকটা কে, যে তাঁকে মিথ্যুক বলছে?'
লোকেরা জানাল, 'সে তাঁরই চাচা আবু লাহাব।' (৫৫০)
আবু লাহাবের এমন প্রকাশ্য বিরোধিতা, হঠকারিতা ও নির্বুদ্ধিতা সত্ত্বেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের আচারব্যবহারের স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন। তিনি মানুষদের সুসংবাদ শোনানোর পদ্ধতিতে অটল থেকে তাদের মুক্তি ও সফলতার দিকে আহ্বান করে গেছেন। বরং তিনি সুসংবাদ প্রদানের কর্মপন্থায় আখিরাতের অজস্র নেয়ামতপ্রাপ্তির আগে দুনিয়ার রাজত্বেরও সুসংবাদ শুনিয়েছেন। তবে শর্ত হলো, আল্লাহর ওপর ঈমান রাখা এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করা।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসুলের চাচা আবু তালিব অসুস্থ হয়ে পড়েন। কুরাইশের লোকেরা তাকে দেখতে এলো। নবীজিও তাকে দেখতে এলেন। আবু তালিবের শিয়রে মাত্র একজনের বসার মতো জায়গা ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে আবু জাহেল সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেল, যাতে তাকে আবু তালিবের সাথে একাকী আলাপে বাধা দিতে পারে। সে সময় কুরাইশদের আগত লোকেরা রাসুলের ব্যাপারে আবু তালিবের কাছে অনেকরকম অভিযোগ করল। ফলে আবু তালিব বললেন, 'হে ভাতিজা, তুমি তোমার সম্প্রদায়ের লোকদের থেকে আসলে কী চাও?'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন, 'আমি তাদের থেকে একটিমাত্র কালেমার ঘোষণা চাই, যে কালেমার মাধ্যমে আরবজাতির সকলেই তাদের অনুগামী হয়ে যাবে এবং অনারবগণও তাদের কর দিয়ে তাদের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হবে।'
আবু তালিব বললেন, 'মাত্র একটি কালেমা?!'
নবীজি বললেন, 'জি, মাত্র একটি কালেমা। হে চাচা! আপনারা শুধু ঘোষণা করুন, এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।'
কথাটি শোনামাত্র কুরাইশের লোকেরা বিস্ময়ে বলে উঠল, 'একজনমাত্র উপাস্য? এমন কথা তো পূর্বের কোনো ধর্মে আমরা শুনিনি। নিঃসন্দেহে এটা একটা বানোয়াট কথা।'
বর্ণনাকারী বলেন, তাদের এই কথার প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে নাজিল করেন,
مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي الْمِلَّةِ الْآخِرَةِ إِنْ هَذَا إِلَّا اخْتِلَاقٌ (ص وَالْقُرْآنِ ذِي الذِّكْرِ)-পর্যন্ত মোট সাতটি আয়াত。(৫৫১)
এখানে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে কোনো ধরনের কঠোরতা অবলম্বন করেননি। তাদের সঙ্গে ওঠাবসাও ত্যাগ করেননি। তাদের দিকে তিনি অহংকার ও উপেক্ষার দৃষ্টিতেও তাকাননি। বরং তিনি তাদের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করেছেন। সম্প্রীতিপূর্ণ আচরণ করেছেন এবং ঈমানগ্রহণের শর্তে তাদের দুনিয়ার রাজত্ব এবং আখিরাতের অফুরন্ত নেয়ামতের সুসংবাদ শুনিয়েছেন।
৩. মুশরিকদের সাথে আলোচনা অব্যাহত রাখা। আলাপ করা। এটা ছিল মূলত কুরআনুল কারিমের বিশেষ বাক্-রীতি বা আলাপচারিতার অনুসরণ। এ বিষয়ে কুরআনুল কারিমে অনেক আয়াত নাজিল হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ مَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ قُلِ اللَّهُ وَإِنَّا أَوْ إِيَّاكُمْ لَعَلَى هُدًى أَوْ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ ۞ قُلْ لَا تُسْأَلُونَ عَمَّا أَجْرَمْنَا وَلَا نُسْأَلُ عَمَّا تَعْمَلُونَ ۞ قُلْ يَجْمَعُ بَيْنَنَا رَبُّنَا ثُمَّ يَفْتَحُ بَيْنَنَا بِالْحَقِّ وَهُوَ الْفَتَّاحُ الْعَلِيمُ
বলো, কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে তোমাদের রিজিক দান করেন? বলো, তিনি আল্লাহ! এবং আমরা অথবা তোমরা হয়তো হেদায়েতের ওপর আছি অথবা স্পষ্ট গোমরাহিতে। বলো, আমরা যে অপরাধ করেছি সে সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে না এবং তোমরা যা করছ সে সম্পর্কেও আমাদের জিজ্ঞেস করা হবে না। বলো, আমাদের প্রতিপালক আমাদের সকলকে একত্র করবেন তারপর আমাদের মধ্যে ন্যায্য ফয়সালা করবেন। তিনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী। [সুরা সাবা : ২৪-২৬](৫৫২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব ভালো করেই জানতেন যে, তিনি সত্য ও হেদায়েতের ওপর আছেন। তারপরও আল্লাহ তাআলা তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি যেন মুশরিকদের সাথে সংলাপে বসেন এবং আলোচনার সূচনা হবে এ কথা বলে,
وَإِنَّا أَوْ إِيَّاكُمْ لَعَلَى هُدًى أَوْ فِي ضَلَالٍ مُّبِيْنٍ নিশ্চয় আমরা অথবা তোমরা (যেকোনো একটা দল) হেদায়েতের ওপর আছি কিংবা সুস্পষ্ট গোমরাহির মধ্যে আছি। [সুরা সাবা: ২৪]
অর্থাৎ আমরা এবং তোমরা এ ব্যাপারে একমত যে, আমাদের মধ্যকার যেকোনো একটা দল সত্যের ওপর আছে আর আরেকটি দল আছে গোমরাহির মধ্যে। এখন আমাদের করণীয় হলো, পরস্পর সংলাপে বসা এবং তথ্য ও তত্ত্বের আলোকে আলোচনা করা, যাতে আমরা সকলেই সেই অজানা বাস্তবতা পর্যন্ত পৌছতে পারি। নিঃসন্দেহে এটিই হলো একটি আদর্শিক সংলাপের সর্বোত্তম পন্থা। উন্নত চরিত্র ও শিষ্টাচারের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ।
এরপর আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শিখিয়েছেন, কীভাবে তিনি তাদের সম্বোধন করার ক্ষেত্রে ভব্যতা বজায় রাখবেন! আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, আপনি এভাবে বলবেন,
قُلْ لَا تُسْأَلُونَ عَمَّا أَجْرَمْنَا وَلَا نُسْأَلُ عَمَّا تَعْمَلُونَ ﴾ আমরা যে অপরাধ করেছি সে সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে না এবং তোমরা যা করছ সে সম্পর্কেও আমাদের জিজ্ঞেস করা হবে না।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাসুলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে 'জুরম' বা অপরাধকে নিজেদের দিকে সম্পৃক্ত করতে। আর আরবিতে 'জুরম' শব্দটি সাধারণত ভুল-ভ্রান্তি ও পদস্খলনের অর্থে ব্যবহৃত হয়। অপরদিকে তাদের দিকে সম্পৃক্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে 'আমাল' শব্দকে, যা ভালো-মন্দ উভয়টির সম্ভাবনা রাখে। এরপর সকল বিষয় আল্লাহ তাআলার ওপর ন্যস্ত করতে বলেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে কিয়ামত দিবসে একত্রিত করবেন। আমাদের মাঝে সঠিক ফয়সালা করে দেবেন। সেদিন আমরা জানতে পারব, কারা সঠিক পথের ওপর ছিল আর কারা ছিল গোমরাহির মধ্যে।
সন্দেহ নেই, পারস্পরিক সংলাপের সম্ভাব্য সকল পদ্ধতির মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি। এখানে অন্ধ দলপ্রীতি নেই। কঠোরতা নেই। বরং আছে সভ্যতা ও শিষ্টাচারের পূর্ণ প্রকাশ। রয়েছে প্রতিপক্ষের প্রতি পূর্ণ সম্মানপ্রদর্শন এবং তাদের যথাযথ মূল্যায়ন।
কুরআনুল কারিমে এমন আরও অনেক আয়াত রয়েছে। সেগুলোর সব এখানে একত্র করা অনেক কষ্টকর এবং তাতে পরিসরও দীর্ঘ হয়ে পড়বে। তবে এখানে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এইসব আয়াতের পূর্ণ অনুসরণ করেছেন এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সকল নির্দেশনাকে দাওয়াতের অঙ্গনে পরিপূর্ণ কাজে লাগিয়েছেন। তাই এ সকল আয়াত আমাদের সামনে মক্কার মুশরিকদের সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহানুভূতিপূর্ণ আচারব্যবহারের ক্ষেত্রে উন্নত ও মহান পন্থা-পদ্ধতির বহিঃপ্রকাশ।
৪. মক্কার মুশরিকদের অত্যাচার ও শত্রুতার ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীমাহীন ধৈর্যধারণ। উরওয়া ইবনে যুবাইর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার জানামতে নবীজির সাথে মুশরিকদের সবচেয়ে কঠোর আচরণ কী ছিল?
আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বললেন, একদিন আমি দেখি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ পড়ছেন। এ সময় উকবা ইবনে আবি মুয়িত তার কাছে এলো। নিজের গায়ের চাদর খুলল। এরপর চাদরটা দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গলা পেঁচিয়ে খুব জোরে কষে টানতে লাগল। ঘটনাক্রমে সে সময় হজরত আবু বকর রা. সেখানে চলে এলেন। তিনি এসে উকবাকে রাসুল থেকে সরিয়ে দিলেন এবং বললেন,
أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ وَقَدْ جَاءَكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ رَّبِّكُمْ
তোমরা কি এমন লোককে মেরে ফেলতে চাও, যিনি বলেন, একমাত্র আল্লাহই আমার রব? তিনি তাঁর দাবির পক্ষে তোমাদের রবের কাছ হতে সুস্পষ্ট প্রমাণও এনেছেন। [সুরা গাফির : ২৮](৫৫৩)
এ ছাড়াও মক্কার কাফেররা তাঁর ব্যাপারে পাগল, জাদুকর ইত্যাদি মন্দ উপাধি লাগানোর চেষ্টা করেছে। অথচ তিনি ছিলেন এগুলো থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এগুলো বলার ক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্য ছিল, এর মাধ্যমে তাঁর আনীত বাণীসমূহকে পাগলের প্রলাপ বলে চালিয়ে দেওয়া। অথচ তা ছিল সত্য ও সঠিক, সকল জাহানের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রদত্ত বার্তা।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করে বলেন, একবার যিমাদ আযদি মক্কায় আগমন করেন। তিনি ছিলেন আযদে শানুআ গোত্রের লোক। তিনি পাগলামির চিকিৎসা করতে পারতেন। তিনি মক্কায় এসে কিছু নির্বোধ লোককে বলে বেড়াতে শুনলেন, 'মুহাম্মাদ পাগল।' এ কথা শুনে তিনি মনে মনে ভাবলেন, আহা! এই লোকটার যদি দেখা পেতাম, তাহলে হয়তো আমার হাতে আল্লাহ তাআলা তার পাগলামির সুস্থতা দান করতেন!
বর্ণনাকারী বলেন, শেষমেশ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তার দেখা হয়ে গেল। তিনি তখন রাসুলকে সম্বোধন করে বললেন, 'হে মুহাম্মাদ, আমি এই পাগলামির চিকিৎসা করতে পারি। আমার হাতে আল্লাহ অনেক পাগলের সুস্থতা দান করেছেন। আপনি চাইলে আমি আপনার চিকিৎসা করতে পারি!'
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লক্ষ করে বললেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার। আমি তাঁর প্রশংসা করি এবং তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। আল্লাহ তাআলা যাকে হেদায়েত দেন, কেউ তাকে গোমরা করতে পারে না। আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করবেন, কেউ তাকে পথ দেখাতে পারবে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসুল।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই কথাগুলো বলে কিছুটা থামতেই যিমাদ বললেন, 'অনুগ্রহ করে আপনার কথাগুলো আমাকে আবার একটু শোনান।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই কথাগুলো আবার তাকে শোনালেন। এভাবে মোট তিনবার তিনি কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করলেন। এরপর যিমাদ বললেন, 'আমি জ্যোতিষীদের কথা শুনেছি। জাদুকরদের কথা শুনেছি। শুনেছি বহু কবিদের কবিতামালা। কিন্তু আপনার এই কথার মতো কোনো কথা আমি জীবনে শুনিনি। কথাগুলো পৌঁছেছে সীমাহীন গভীরতায়...। আপনি আপনার হাতখানা আমার দিকে বাড়িয়ে দিন, আমি এখনই ইসলামের ওপর বাইআত (অঙ্গীকার) গ্রহণ করি।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং যিমাদ তাঁর হাতে বাইআত গ্রহণ করে নিলেন...। (৫৫৪)
চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর কুরাইশদের জুলুম-অত্যাচার অত্যধিক বেড়ে গেল। বিখ্যাত সিরাতগ্রন্থকার ইবনে হিশাম বলেন, 'চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর মুশরিকরা এমন অত্যাচার শুরু করেছিল, তাঁর জীবদ্দশায় যে অত্যাচারের কথা কল্পনাও করা যায়নি। একবার তো কুরাইশের এক নির্বোধ তাঁর মাথায় মাটি ছুড়ে মারল। নবীজি মাটি মাথায় বাড়িতে ফিরে এলেন। তখন নবীজির এক মেয়ে এগিয়ে এসে তাঁর মাথা থেকে মাটি ধুতে লাগলেন আর কাঁদতে লাগলেন। তিনি মেয়েকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, 'হে আমার মেয়ে, কেঁদো না। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমার পিতাকে রক্ষা করবেন।' (৫৫৫)
আমরা বর্ণনা করেছি, মুশরিকদের এত জুলুম-নির্যাতনের পরও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে আচার-আচরণ বাদ দেননি। ওঠাবসা পরিত্যাগ করেননি। বরং এরপরও তাদের সাথে সুন্দরভাবে ক্রয়-বিক্রয়সহ সকল লেনদেন চালিয়ে গেছেন। এর একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ হলো নবুয়তের সপ্তম বছরের ঘটনাবলি। (৫৫৬) এ সময় মুসলমানদের সাথে কুরাইশরা খুবই অমানবিক আচরণ করে। কুরাইশের সকল গোত্র মিলে বনু হাশেমসহ মুসলমানদের সাথে অন্যায়ভাবে অর্থনৈতিক বয়কট আরোপ করে।
এরচেয়েও বড় কথা হলো, কুরাইশরা নবীজির নিকট যে আমানতগুলো রেখেছিল, তিনি সেগুলো যথাযথ পাওনাদারদের নিকট পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। অথচ হিজরতের সেই ভয়াবহ রাতে কুরাইশের এইসব লোকই তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তবুও তিনি তাদের আমানতগুলো যথাযথভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য নিজের বিছানায় রেখে যান হজরত আলি ইবনে আবি তালিবকে। (৫৫৭)
কাফেরদের সীমাহীন অনাচার-অত্যাচার সত্ত্বেও তিনি নিজের দয়া ও অনুগ্রহের কারণে আল্লাহর নিকট তাদের ধ্বংস কামনা করেননি। তাই যখন পাহাড়ের দায়িত্বে নিযুক্ত আল্লাহ তাআলার বিশেষ ফিরেশতা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রস্তাব দিয়ে বলেছিলেন, 'আপনি চাইলে আমি তাদেরকে জাবালে আবি কুবাইস ও জাবালে কুআইকিআনের নিচে পিষ্ট করে মেরে ফেলতে পারি!' উত্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
بَلْ أَرْجُو أَنْ يُخْرِجَ اللَّهُ مِنْ أَصْلَابِهِمْ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ وَحْدَهُ وَلَا يُشْرِكْ بِهِ شَيْئًا»
আমি তো আশা করি, আল্লাহ তাআলা তাদের পরবর্তীদের থেকে এমন প্রজন্ম সৃষ্টি করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না। (৫৫৮)
কুরাইশের মুশরিকদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচার-ব্যবহার ছিল এমনই দয়া ও সহানুভূতিপূর্ণ। এটাও তাঁর নবুয়তের সত্যতার স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। কারণ, কুরাইশের সাথে তিনি যে ধরনের আচরণ-পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ খোদাপ্রদত্ত ঐশী নীতিমালা, যার মূল উৎস ছিল কুরআনুল কারিম।

টিকাঃ
৫৪৯. সুনানে তিরমিজি: ৩৮৬৩, মুসনাদে আহমাদ: ৫৬৯৬, মুসতাদরাকে হাকেম : ৪৪৮৫, মিশকাতুল মাসাবিহ: ৬০৩৬。
৫৫০. মুসনাদে আহমাদ: ১৯০২৬, মুসতাদরাকে হাকেম: ৩৯।
৫৫১. সুনানে তিরমিজি: ৩২৩২, মুসনাদে আহমাদ: ২০০৮, ইবনে হিব্বান: ৬৬৮৬।
৫৫২. সকলেই বলেন, সুরাটি মক্কায় নাজিল হয়েছে। তবে একটি আয়াত নিয়ে কিছুটা ইখতেলাফ রয়েছে। দেখুন, ইমাম কুরতুবি: আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন: ১৪/২৫৮।
**০. সহিহ বুখারি: ৩৪৭৫, মুসনাদে আহমাদ: ৬৯০৮।
৫৫৪. সহিহ মুসলিম: ৮৬৮, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৬৫৬৮。
৫৫৫. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৪১৬।
৫৫৬. ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৪৩-৭১, ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৩৫০।
৫৫৭. ইবনে কাছির : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/২৩৪, ২৭০, ২৯০; ইবনে হিশাম : আস- সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৪৮৫।
৫৮. সহিহ বুখারি : ৩২৩১, সহিহ মুসলিম : ১৭৯৫।

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 মদিনার সংখ্যালঘু অমুসলিমদের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ

📄 মদিনার সংখ্যালঘু অমুসলিমদের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ


হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। সেখানকার সংখ্যালঘু অমুসলিম ইহুদি ও মুশরিকরা তাঁর নেতৃত্বে মদিনার অভ্যন্তরে বসবাস করতে থাকে। ধীরে ধীরে ইসলামি রাষ্ট্রের পরিধি বাড়তে থাকে। তখন সংখ্যালঘু খ্রিষ্টানরাও মদিনা-রাষ্ট্রের আওতায় চলে আসে। এভাবে সকল সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিজেদের ধর্মীয় স্বাধীনতার সাথে মদিনায় বসবাস করত। সকল সংখ্যালঘুরাই স্বাধীনভাবে নিজেদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে পারত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ওহি নাজিলের শুরু থেকেই ইসলাম মানুষের এই ধর্মীয় স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যাতে এ স্বাধীনতার মাধ্যমে মানবতার বিকাশ ঘটে এবং মনুষ্যত্ব সৌভাগ্য অর্জন করে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিত ছিল অমুসলিম সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করার শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ। অথচ তিনি নিজে এবং প্রথম সারির সাহাবিগণ মক্কার মুশরিকদের থেকে হাজার রকমের জুলুম ও নির্যাতন ভোগ করেছেন। কিন্তু তিনি কখনোই কাফের ও মুশরিকদের ক্ষেত্রে তেমন আচরণ করেননি। এমনকি আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও সাহায্যে তিনি যখন কাফের-মুশরিকদের ওপর বিজয় অর্জন করেছেন, তখনও তিনি তাদের থেকে আগের সেই আচরণের কোনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তিনি কখনোই পছন্দ করেননি যে, অন্যের ওপর এমন বিশ্বাস চাপিয়ে দেবেন, যা সে মন থেকে মেনে নিতে পারবে না। এটাই মূলত পবিত্র কুরআনের নির্দেশের বাস্তবায়ন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَا مَنَ مَنْ فِي الْأَرْضِ كُلُّهُمْ جَمِيعًا أَفَأَنْتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّى يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ)
আপনার প্রভু ইচ্ছা করলেই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন, আনত তবে কি আপনি মনুষ্যের মন জয় করতে সক্ষম হবেন, যাতে তারা সকলে মুমিন হয়ে যায়? সূরা ইউনুস: ৯৯।
রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনের এই নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করে দেখিয়েছেন। সকল মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠার জন্য এটাকে তিনি মুসলমানদের পালনীয় বিধান করেছেন। নিচের আয়াতটি নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপট এই বাস্তবতাকে আরও জোরালো করে তুলেছে, আল্লাহ তাআলা বলেন,
لا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ ۚ দ্বীনের বিষয়ে কোনো জবরদস্তি নেই। হেদায়েতের পথ গোমরাহি থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। (সূরা বাকারা: ২৫৬)।
বর্ণিত আছে, মদিনার বন্ধু সালেম ইবনে আউফ গোত্রে এক ব্যক্তি ছিলেন, তার ছিল দুটি পুত্রসন্তান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমনের আগেই তারা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে এবং মদিনার বাইরে গিয়ে বসবাস শুরু করে। তবে ব্যবসার উদ্দেশ্যে একবার কিছু তেল নিয়ে তার এক খ্রিষ্টান দলের সাথে মদিনায় আগমন করে। তখন পিতা তাদের বন্দি করে রাখলেন এবং বললেন, ইসলামগ্রহণ না করা পর্যন্ত তোমাদের ছাড়ব না কিন্তু তারা ইসলামগ্রহণ করতে অস্বীকার করল। তখন আনসারি সাহাবি রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অভিযোগ নিয়ে এলেন। আনসারি সাহাবি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমার চোখের সামনে আমার মারই একটি অংশ (সন্তান পিতার অংশবিশেষ) জাহান্নামে যাবে। তখন আল্লাহ তাআলা নাজিল করলেন,
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ۖ ধর্ম গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।
তখন তিনি ছেলেষয়কে মুক্ত করে দিলেন। (৫৫৯) এমনই ছিল পিতার প্রতি রাসুলের নির্দেশ। পিতা মুসলমান, সন্তানরা খ্রিষ্টান। অতএব বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তারা শুধু তাদের পিতারই বিরোধী নয়, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরও বিরোধী। এরপরও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিতাকে নির্দেশ দিয়েছেন, তুমি সন্তানদের নিজেদের বিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দাও। তাদের ধর্মকর্ম পালনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িও না। অথচ ইসলামে সন্তানের ওপর পিতার আনুগত্য করা একটি আবশ্যক কর্ম।
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার প্রথম সংবিধানেও ধর্মীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। কেননা তিনি ইহুদিদের ব্যাপারে এই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন যে, তারা মদিনাতে مسلمانوں সাথেই এক জনগোষ্ঠী হয়ে বসবাস করবে। (৫৬০)
এভাবে সকল বিষয়েই অমুসলিমদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ ছিল ন্যায়পূর্ণ। এ সম্পর্কে আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রা. বর্ণনা করেন, একবার আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে একটি সফরে ছিলাম। একশ ত্রিশজনের এক বিশাল কাফেলা। দীর্ঘ সফরে একসময় আমাদের খাদ্য ফুরিয়ে যেতে লাগল। এ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমাদের কারও কাছে কি খাবার আছে?' তখন খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, একজনের কাছে এক সা' বা এর কাছাকাছি পরিমাণ খাবার আছে। সেটাকেই খামির বানানো হলো। এ সময় সেখানে এক মুশরিকের আগমন ঘটল। চুল এলোমেলো। দেখতে কিছুটা লম্বাটে। সে তার ছাগলপাল চরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সম্বোধন করে বললেন, '(আমাদের গোশতের প্রয়োজন। এখন তোমার ছাগল) বিক্রয় হিসেবে বা হাদিয়া হিসেবে দিতে পারো?'(৫৬১) লোকটি বলল, 'বিক্রয় হিসেবে দেবো।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে একটি ছাগল কিনে নিলেন। জবাই করে গোশত প্রস্তুত করা হলো। কলিজা ভুনা করার নির্দেশ দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর কসম! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওই একটি কলিজাকে কেটে কেটে আমাদের একশ ত্রিশজনকেই এক টুকরা করে দিলেন। যে উপস্থিত ছিল তাকে তৎক্ষণাৎ দিলেন আর যে অনুপস্থিত ছিল তার জন্য রেখে দিলেন। আর গোশত- রুটিকে দুটি পাত্রে ভাগ করা হলো। আমরা সকলেই সেখান থেকে তৃপ্তিভরে খেলাম। এমনকি দুইপাত্র খাবার অতিরিক্ত রয়ে গেল। সেগুলো আমরা আবার উটের পিঠে বহন করে নিলাম। (৫৬২)
এই ঘটনায় আমরা দেখতে পাই, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একশ ত্রিশজনের একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে সফর করছিলেন। এ সময় তাদের পাশ দিয়ে একজন মুশরিক নিজের ছাগলপাল নিয়ে যাচ্ছিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটির থেকে যথাযথ মূল্য দিয়ে একটি ছাগল ক্রয় করলেন। তার ওপর কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি করেননি। বিনামূল্যে ছাগল দিতে বাধ্যও করেননি। অথচ তাদের খাদ্যের ভীষণ প্রয়োজন ছিল, কেড়ে নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতাও ছিল। আর লোকটিও ছিল মন্দ আকিদার, মুশরিক। তাই এতে রয়েছে ন্যায় ও ইনসাফের সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আশপাশের অমুসলিমদের সাথে তেমন আচরণই করেছেন, যেমনটা কোনো ব্যক্তি তার পরিবারের সাথে করে। এ সম্পর্কে আনাস রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশ্চর্য এক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এক ইহুদি বালক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেবা করত। একবার সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বালকটিকে দেখতে তার বাড়িতে গেলেন। তার শিয়রে গিয়ে বসলেন। তাকে সম্বোধন করে বললেন, 'তুমি ইসলামগ্রহণ করে নাও।' বালকটি তখন তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পিতার দিকে তাকালো। পিতা তাকে বলল, 'তুমি আবুল কাসেম (রাসুলের উপনাম)-এর কথা মেনে নাও।'
বালকটি ইসলামগ্রহণ করে নিলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে এসে বললেন, সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ তাআলার, যিনি বালকটিকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিলেন। (৫৬৩)
এ ছাড়া তিনি আসমা বিনতে আবু বকর রা.-কে(৫৬৪) তার মায়ের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আসমা রা. নিজেই ঘটনাটি বর্ণনা করে বলেন, মক্কার কুরাইশদের সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্ধির সময় আমার আম্মা(৫৬৫) আমার নিকট এলেন। তখন তিনি ছিলেন মুশরিক। আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে বললাম, 'হে আল্লাহর নবী, আমার আম্মা আমার কাছে এসেছেন। আর তিনি আমার নিকট ভালো আচরণের আশা করেন। আমি কি তার সাথে ভালো আচরণ করব?' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ, তুমি তার সাথে ভালো আচরণ করো।'(৫৬৬)
ভাবতে অবাক লাগে, চারিত্রিক উৎকর্ষের কতটা উচ্চতর শিক্ষা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিয়েছেন, যখন তিনি পাশ দিয়ে অতিক্রম করা একজন ইহুদির লাশের প্রতি সম্মানজনক আচরণ দেখিয়েছেন! ইবনে আবি লায়লা বলেন, কায়েস ইবনে সাদ(৫৬৭) এবং সাহল ইবনে হুনাইফ(৫৬৮) কাদেসিয়ার একটি স্থানে বসা ছিলেন। তখন পাশ দিয়ে একটি জানাজা যেতে দেখে তারা দুজন দাঁড়িয়ে গেলেন। অন্যরা বলতে লাগল, 'এটা এক জিম্মির (অমুসলিমের) জানাজা!' তখন তারা বললেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশ দিয়ে একটি জানাজা অতিক্রম করছিল। তিনি সেটা দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সাহাবিগণ বললেন, এটা তো একজন ইহুদির জানাজা! তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাতে কী হয়েছে! أَلَيْسَتْ نَفْسًا সে কি একজন মানুষ নয়?!' (৫৬৯)
তিনিই হলেন আমাদের আদর্শ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! নিজের উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন অমুসলিমদের সম্মান করতে, এমনকি তাদের মৃতদেরকেও।
খুব চমৎকার হয়, আমরা যদি খায়বারের ইহুদিদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণের ঘটনার মাধ্যমে এভাবে আলোচনার সমাপ্তি টানি:
ইহুদিরা পরাজিত হয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। স্বাভাবিকভাবেই তখন ইহুদিদের অবস্থান ছিল দুর্বল। আর মুসলমানরা ছিল শক্তিশালী। মুসলমানগণ যদি সে সময় জোর করে নিজেদের সিদ্ধান্ত তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইত, তাহলে তাদের বাধা দেওয়ার কোনো ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু এই স্থানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। সাহল ইবনে আবি হাসমা রা. বলেন, একবার তার গোত্রের কিছু লোক খায়বার এলাকায় গমন করে। এরপর সেখানে তারা কাজের জন্য বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তারা তাদের এক সঙ্গীকে মৃত অবস্থায় পায়। যে স্থানে লাশ পাওয়া যায়, সেখানকার লোকদেরকেই তারা হত্যাকারী মনে করে এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলে, 'তোমরাই আমাদের সঙ্গীকে হত্যা করেছ!' কিন্তু ইহুদিরা তা অস্বীকার করে এবং বলে, 'আমরা তাকে হত্যা করিনি। আর কে হত্যা করেছে তাও আমরা জানি না।'
তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমরা খায়বারে গিয়েছিলাম। এরপর আমরা আমাদের এক সাথিকে মৃত অবস্থায় পেয়েছি। (ঘটনাক্রমে কথাগুলো বলছিল দলের মধ্যে ছোট একজন, সে কারণে) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'বড়কে আগে কথা বলতে দাও।' এভাবে কয়েকবার বললেন। তারপর বললেন, 'তোমরা কি সাক্ষী পেশ করতে পারবে, কে তাকে হত্যা করেছে?' তারা বললেন, 'আমাদের কাছে তো কোনো সাক্ষী নেই।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাহলে ইহুদিরা কসম করে মামলার নিষ্পত্তি করবে।'
'মুসলমান বাদীগণ' বললেন, 'আমরা ইহুদিদের কসমের প্রতি সন্তুষ্ট নই। (কারণ, মিথ্যা বলা তাদের চির অভ্যাস)।' কিন্তু সিদ্ধান্ত এটাই থাকল। তবে নিহত ব্যক্তির রক্ত বৃথা যাবে ভেবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বাইতুল মাল অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বাদীদেরকে (নিহত ব্যক্তির পরিবারকে) একশ উট দিয়াত (রক্তমূল্য) হিসাবে দিয়ে দিলেন। (৫৭০)
লক্ষ করুন, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে ইহুদিদের এলাকায়। সমূহ সম্ভাবনা আছে, এটা তাদেরই কারও কাজ। কিন্তু এই ব্যাপারে সাহাবিদের নিকট অকাট্য কোনো প্রমাণ নেই। ব্যাপারটি রয়ে গেছে সন্দেহ-সংশয়ের মধ্যে। আর কিসাসের দাবি আদায়ের জন্য প্রমাণ হিসাবে এতটুকু যথেষ্ট নয়। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদিদেরকে কোনো ধরনের শাস্তির মুখোমুখি করেননি। বরং তাদেরকে শুধু কসম করতে বলেছেন যে, তারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়নি (পরে ইহুদিরা কসম করে মামলা থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে যায়)। ঘটনা এখানেই শেষ হয়নি। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বাইতুল মাল থেকে নিহত ব্যক্তির দিয়াত (রক্তমূল্য) আদায় করে দিয়েছেন। যাতে আনসারি ওই সাহাবিদের অন্তর শান্ত হয়ে যায়। ইহুদিদের ব্যাপারে তাদের অন্তরে কোনো ক্ষোভ না থাকে। আর এভাবেই তিনি একটি ফেতনার নিরসন করেন, ইহুদিদের কোনো ক্ষতি না করে।
এই ছিল মদিনার সংখ্যালঘু অমুসলিমদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচার-ব্যবহার, যার ভিত্তি ছিল ন্যায়পরতা, দয়া-অনুগ্রহ এবং উদারতা।

টিকাঃ
*ওয়াহিদি নিশাপুরি আসবাবুন নুজুল: ৫০, ইমাম সুয়ূতি লুবাবুন নুজুল: ৩৭।
*৫৬০. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৫০১, ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ১/২৬০, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৩২১。
**৫৬১. এই ঘটনার দ্বারা বোঝা যায় কাফেরদের সাথে কেনাবেচা করা বৈধ। তাদের থেকে হাদিয়া গ্রহণও বৈধ। সূত্র: ইবনে হাজার আসকালানি: ফাতহুল বারি: ৪/৪১০।
৫৬২. সহিহ বুখারি: ২৬১৮, ৫৩৮২; সহিহ মুসলিম: ২০৫২।
৫৬৩. সহিহ বুখারি: ১৩৫৬, সুনানে তিরমিজি: ২২৪৭, সুনানে নাসায়ি: ৭৫০০।
৫৬৪. আসমা বিনতে আবু বকর সিদ্দিক রা.। তিনি ছিলেন যুবায়ের ইবনুল আওয়ামের স্ত্রী। তিনি মক্কায় থাকাকালে ইসলামগ্রহণ করেন। অতঃপর যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন তার গর্ভে ছিল আবদুল্লাহ বিন যুবায়ের রা.। কোবায় তাকে প্রসব করেন। তিনি ৭৩ হিজরি সনে ইনতেকাল করেন। সূত্র: ইবনুল আছির: উসদুল গাবাহ: ৬/১২, ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা: ১০৭৯১।
৫৬৫. তিনি কুতাইলা বিনতে সাদ। তিনি ছিলেন বনু আমের বিন লুআই গোত্রের। আবু বকর রা.- এর স্ত্রী। তিনি আবদুল্লাহ এবং আসমার রা.-এর মা। ইবনুল আছির তাকে মহিলা সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত ধরেছেন। তিনি ইসলামগ্রহণ করেছেন কিছুটা বিলম্বে। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর তিনি যখন মদিনায় আসেন, তখনও তিনি মুশরিকা ছিলেন। সূত্র: ইবনুল আছির: উসদুল গাবাহ: ৬/২৪২।
৫৬৭. সহিহ বুখারি: ২৬২০, সহিহ মুসলিম: ১০০৩।
৫৬৮. কায়েস ইবনে সাদ ইবনে উবাদা রা.। একজন বিচক্ষণ আরব। চৌকস এবং যুদ্ধের বিষয়ে খুবই কৌশলী। তিনি ছিলেন তার গোত্রের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে পাহারাদারির আমির ছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাতেই পতাকা তুলে দিয়েছিলেন। তিনি মক্কায় ৫৯ বা ৬০ হিজরি সনে ইনতেকাল করেন। দেখুন, ইবনে আবদুল বার আল-ইসতিআব: ৩/৩৫০, ইবনুল আছির: উসদুল গাবাহ: ৪/২৭২, ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা: ৭১৭৬।
৫৬৯. সাহল বিন হুনাইফ ইবনে ওয়াহেব রা.। বদরসহ সকল যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে উপস্থিত ছিলেন। উহুদযুদ্ধের সময়ও তিনি যুদ্ধের ময়দানে অটল অনড় ছিলেন। আলি রা. যখন বসরা গমন করেন, তখন তিনি তাকে মদিনায় প্রতিনিধি হিসেবে রেখে যান এবং সাহল রা. সিফফিনের যুদ্ধের সময় আলি রা.-এর সাথে অবস্থান করেন। আলি রা. পরে তাকে পারস্যের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি ৮৮ হিজরি সনে কুফায় ইনতেকাল করেন। দেখুন, ইবনুল আছির: উসদুল গাবাহ: ২/৩৩৫, ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা: ৫৩২৩, ইবনে আবদুল বার: আল-ইসতিআব: ২/২২৩。
৫৬৯. সহিহ বুখারি: ১৩১৩, সহিহ মুসলিম: ৯৬১।
৫৭০. সহিহ বুখারি: ৩১৭১, সহিহ মুসলিম: ১৬৬৯।

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 অমুসলিম এলাকা ও রাষ্ট্রের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ

📄 অমুসলিম এলাকা ও রাষ্ট্রের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ


আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমগ্র বিশ্ববাসীর নিকট একজন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছেন। তাঁকে বানিয়েছেন সর্বশেষ নবী ও রাসুল। সেইসাথে তাঁকে সুদৃঢ় করেছেন মহাগ্রন্থ আল-কুরআন দ্বারা। এটি এমন এক উৎস, যার থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহরণ করেছেন অমুসলিমদের সাথে আচারব্যবহারের নীতিমালা, সেটা একক ব্যক্তি হিসেবে হোক বা রাষ্ট্র হিসেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
এবং (হে নবী,) আপনাকে সকল মানুষের জন্য একজন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপেই পাঠিয়েছি, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ বোঝে না। [সুরা সাবা: ২৮]
এ কারণে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াত শুধু আরবভূখণ্ড বা তার আশপাশেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সমগ্র বিশ্বে তা ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে আমরা দেখি, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সময় বিভিন্ন রাজা-বাদশার কাছে অনেক চিঠি প্রেরণ করেছেন। সেইসব চিঠিতে তিনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। (পত্রাবলির চিত্রসমূহ ও মানচিত্র নং-৪) লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রতিটি চিঠিতে তিনি সেই রাজা বা বাদশাহকে সম্মানের সাথে 'মালিক' বা 'আজিম' বলে সম্বোধন করেছেন। সেই অমুসলিম বাদশাকে এইসব গুণে সম্বোধন করতে তিনি সামান্যতমও কুণ্ঠাবোধ করেননি। যেমন রোমের সম্রাটের নিকট নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত চিঠির ভাষ্য ছিল এমন :
مِنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ اللهِ إِلَى هِرَقْلَ عَظِيمِ الرُّوْمِ ... আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে রোমের ক্ষমতাসীন সম্রাট হিরাক্লিয়াসের উদ্দেশে প্রেরিত...। (৫৭১)
পারস্যের সম্রাটের নিকট প্রেরিত চিঠির ভাষ্য ছিল এমন :
مِنْ مُحَمَّدٍ رَّسُولِ اللَّهِ إِلَى كِسْرَى عَظِيمٍ فَارِسٍ.... আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে পারস্যের ক্ষমতাসীন সম্রাট কিসরার উদ্দেশে প্রেরিত...। (৫৭২)
মিশরের সম্রাটের নিকট প্রেরিত চিঠির ভাষ্য ছিল এমন :
مِنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ اللهِ إِلَى الْمُقَوْقِسِ عَظِيمِ الْقِبْطِ ... আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে মিশরের ক্ষমতাসীন সম্রাট মুকাওকিসের উদ্দেশে প্রেরিত...। (৫৭৩)
এভাবে হাবশার বাদশাহ নাজাশির কাছে লিখেছিলেন :
هذَا كِتَابُ مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ إِلَى النَّجَاشِيِّ الْأَصْحَمِ عَظِيمِ الْحَبْشَةِ এটা নবী মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে হাবশার ক্ষমতাসীন বাদশাহ আসহাম নাজাশির উদ্দেশে প্রেরিত চিঠি...। (৫৭৪)
আমরা আরও দেখি, তিনি পারস্যের সম্রাট কিসরার প্রেরিত দূতদ্বয়কেও সম্মান দেখিয়েছেন, অথচ তারা কিসরার পক্ষ থেকে এনেছিল এক অবাঞ্ছিত বার্তা। তারা এসেছিল নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর স্থান মদিনা থেকে ধরে নিয়ে সম্রাট কিসরার সামনে হাজির করার জন্য। এরপরও তিনি তাদের সাথে আচরণে নিজের শান্ত-সৌম্য শিষ্টাচার ও স্বভাবের কোমলতা থেকে বিচ্যুত হননি। বরং তিনি মদিনায় আগত সকল প্রতিনিধিদলকেই সম্মান দেখাতেন। তারা কোন রাষ্ট্রের বা কোন ধর্মের এগুলো তার কাছে মুখ্য ছিল না। সকল প্রতিনিধিদলকেই স্বাগত জানানো, মেহমানদারি করা, সুন্দর আচরণ করা এবং উপঢৌকন প্রেরণে তিনি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতেন। তাই পারস্যের দূতদ্বয়কেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্দরভাবে স্বাগত জানান, চমৎকার মেহমানদারি করেন, বারবার মেহমানদের নিকট গিয়ে খোঁজখবর নেন এবং তাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য নিজের সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরিধান করেন। (৫৭৫)
প্রতিনিধিদলের যথাযথ মেহমানদারির জন্য তিনি আলাদা একটি কামরার ব্যবস্থা রেখেছিলেন। যেমনটি সালামান গোত্রের প্রতিনিধিদলের অভ্যর্থনা করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের খাদেম সাওবানকে বললেন, 'তাদেরকে সেই কামরায় নিয়ে যাও, যেখানে প্রতিনিধিদল অবস্থান করে।' (৫৭৬)
এই বর্ণনার মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যায়, এইসব প্রতিনিধিদলের জন্য আলাদা কামরার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিলাব, মুহারিব, উজরা, আবদে কায়েস, তাগলিব, গাস্সান প্রভৃতি গোত্রের প্রতিনিধিদলের সাথেও এমনটি করা হয়েছিল। (৫৭৭)
তা ছাড়া, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি অভ্যাস ছিল, এইসব প্রতিনিধিদলকে বিদায়ের সময় হাদিয়া-তোহফা প্রদান করতেন। হাদিয়াগুলোর অধিকাংশ হতো রুপার তৈরি। (৫৭৮)
অপরদিকে তিনি নিজেও পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের উন্নতির জন্য অমুসলিম রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রেরিত হাদিয়া গ্রহণ করতেন। বিশেষ করে, যদি সেই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো প্রতারণা বা লড়াইয়ের ঘটনা না ঘটত। যেমন মিশরের কিবতিদের রাষ্ট্রপ্রধান মুকাওকিস হাদিয়া প্রেরণ করলে তিনি তা সাদরে গ্রহণ করেন। (৫৭৯)
[রাজা-বাদশাদের নিকট রাসুল সা.-এর প্রেরিত পত্রাবলি]
[মানচিত্র নং-৪ বিশ্বের রাজা-বাদশাদের প্রতি রাসুল সা.-এর পত্রসমূহ]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে অমুসলিমদের সাথে কূটনৈতিক আচরণের মধ্যে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে হাবশার (বর্তমান নাম ইথিওপিয়া) বাদশাহ নাজাশির সাথে তাঁর ব্যবহার ও সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি। শুরুতেই তিনি সাহাবিদের মজলিসে নাজাশির প্রশংসা করে বলেন, হাবশার মাটিতে এমন একজন বাদশাহ আছেন, যার রাজত্বে কারও ওপর জুলুম করা হয় না। (৫৮০)
এরপর (যতটুকু তথ্য পাওয়া যায়) (৫৮১) নাজাশির পূর্বধর্মের ওপর থাকা অবস্থাতেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উম্মুল মুমিনিন উম্মে হাবিবা রা.-এর সাথে নিজের বিবাহের জন্য উকিল মনোনীত করেছিলেন। কারণ, হাবশায় হিজরতের পর উম্মে হাবিবা রা.-এর স্বামী আবদুল্লাহ বিন জাহাশ খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে। (৫৮২) তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে হাবিবাকে নিজের জীবনসঙ্গিনী বানিয়ে তার কষ্টের উপশম করার ইচ্ছা করেন। ফলে বাদশাহ নাজাশি নিজের ওকালতিতে উম্মে হাবিবাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিবাহ দিয়ে দেন। মহর নির্ধারণ করা হয় চারহাজার দিরহাম। এরপর উপঢৌকন হিসেবে প্রয়োজনীয় আরও বহু আসবাবসহ শুরাহবিল ইবনে হাসানার সাথে উম্মে হাবিবাকে মদিনায় রাসুলের কাছে পাঠিয়ে দেন। এসব আসবাব নাজাশি নিজের পক্ষ থেকেই প্রদান করেছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের থেকে কিছুই পাঠানোর প্রয়োজন পড়েনি। (৫৮৩)
এ সকল বর্ণনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, মদিনায় অবস্থিত নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সুদূর ইথিওপিয়ায় অবস্থিত নাজাশির মাঝে অকৃত্রিম সম্পর্কের ভিত্তি ছিল কতটা গভীর, কতটা সুদৃঢ় এবং কতটা নৈকট্যের! বরং উল্লিখিত ঘটনা প্রমাণ করে, উভয়ের সম্পর্ক নিছক কোনো রাজনৈতিক কিংবা লোক দেখানো কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। বরং সম্পর্কটা ছিল এর থেকে আরও অনেক গভীরে। চিঠির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নাজাশির পাঠানো উত্তরই এ কথা প্রমাণ করে। বাদশাহ নাজাশি লিখেছিলেন, আমি আমার ওকালতিতে আপনার সাথে আপনার গোত্রের, আপনার ধর্মের এক নারীকে আপনার সাথে বিবাহ প্রদান করেছি। মেয়েটি আবু সুফিয়ানের কন্যা। নাম, উম্মে হাবিবা। আর আপনার জন্য এক সেট পোশাক-জুব্বা, পায়জামা ও কালো রঙের একজোড়া মোজা হাদিয়া পাঠিয়েছি। (৫৮৪)
এরপর হিজরি ষষ্ঠ সালের শেষ দিকে এবং সপ্তম সালের শুরুর দিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাদশাহ নাজাশির নিকট সর্বশেষ চিঠি প্রেরণ করেন। এই চিঠিতে তিনি তাকে ইসলামগ্রহণের দাওয়াত দেন এবং আল্লাহর সাথে শিরক করা ও শিরকের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কেও তাকে সতর্ক করেন। (৫৮৫)
অমুসলিম রাষ্ট্রের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণের এটা ছিল সংক্ষিপ্ত কিছু দিক। এগুলো বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বভাবপ্রকৃতি অনুধাবনে এবং সকল মানুষকে তাদের অবস্থা অনুপাতে যথাযথ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনন্যসাধারণ কূটনৈতিক দূরদর্শিতা প্রকাশ করে।

টিকাঃ
৫৭১. সহিহ বুখারি: ৭, সহিহ মুসলিম: ১৭৭৩।
৫৭২. খতিব বাগদাদি: তারিখে বাগদাদ ১/১৩২, কানজুল উম্মাল : ১১৩০২।
৫৭৩. যাইলায়ি: নাসবুর রায়া: ৪/৪২১, ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ২/৩৩১, ইবনুল কাইয়িম: জাদুল মাআদ: ৩/৬৯১।
৫৭৪. ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৪১, সালেহি শামি: সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ: ১১/৩৬৬।
***. ফারুক হাম্মাদা: আল-আলাকাতুল ইসলামিয়াতুন নাসরানিয়্যা ফিল-আহদিন নাবাবি: ৯৫।
**৬. ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা: ১/৩৩২।
**". ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা: ১/৩০০-৩৪৮।
*. প্রাগুক্ত।
***. ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ২/৩৯৪।
৫৮০. মুসনাদে আহমাদ: ১৮৩০৪, ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/১৬৪।
৫৮১. ফারুক হাম্মাদা: আল-আলাকাতুল ইসলামিয়াতুন নাসরানিয়্যা ফিল-আহদিন নাবাবি: ৬৯।
৫৮৯. সুনানে আবু দাউদ: ২১০৭, সুনানে দারাকুতনি: ৩৬৫২。
৫৯০. বাইহাকি: আস-সুনানুল কুবরা: ৭/২৩২。
৫৯১. হুসাইন ইবনে মাসউদ বাগাবি: আল-আনওয়ার ফি শামায়িলিন নাবিয়্যিল মুখতার: ২৮০।
***. এ ক্ষেত্রে হাদিসে বর্ণনা এসেছে এভাবে: بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ، هَذَا كِتَابُ مُحَمَّدٍ رَّسُولِ اللهِ إِلَى النَّجَاشِي الْأَصْحَمِ عَظِيمِ الْحَبَشَةِ، سَلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى، وَآمَنَ بِاللهِ وَرَسُولِهِ، وَشَهِدَ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ মুসতাদরাকে হাকেম: ২/৬৩৩, বাইহাকি: দালায়েলুন নবুওয়া: ২/৩০৮。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00