📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 সুবিবেচক পশ্চিমাদের সাক্ষ্য

📄 সুবিবেচক পশ্চিমাদের সাক্ষ্য


পশ্চিমাবিশ্বের অনেকেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে সঠিক মন্তব্য করেছেন। তাদের এই সঠিকতার মূল উৎস হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিত নিয়ে তাদের গবেষণাধর্মী ব্যাপক অনুসন্ধান ও বিস্তৃত অধ্যয়ন। আর এই অধ্যয়ন ও অনুসন্ধান পূর্ণতা পেয়েছে আধুনিক কিছু বৈজ্ঞানিক রীতিনীতি, সূত্র ও পদ্ধতির মাধ্যমে, যেগুলোতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ, বাস্তব পরীক্ষানিরীক্ষা এবং অনুসন্ধানের যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। অবশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তাদের এই গবেষণাগুলোতে ইতিবাচক ফলই প্রকাশ পেয়েছে এবং তারা তাঁর সততা, সঠিকতা ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। আর তাদের এই স্বীকারোক্তি ও সাক্ষ্যসমূহ জ্ঞানজগতে স্বতন্ত্র প্রদীপ হয়ে আলো বিকিরণ করছে, যার মাধ্যমে পশ্চিমের অনেক সত্যানুসন্ধানী মানুষ সঠিক পথের দিশা পাচ্ছে।
যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে ন্যায়পূর্ণ সঠিক মন্তব্য করেছেন, তাদের মধ্যে একজন হলেন ফ্রান্সের কবি ল্যামার্টিন (Alphonse de Lamartine)। (৫০২) তিনি বলেছেন, তোমরা কি মনে করো মুহাম্মাদ ধোঁকাবাজ, প্রতারক, ভণ্ড বা মিথ্যুক? কিছুতেই না। আমরা তাঁর ইতিহাস পড়েছি। তাঁর জীবনচরিত নিয়ে দীর্ঘ অধ্যয়ন করেছি, সেগুলো কখনো তাঁর এমন পরিচয় প্রদান করে না। বরং ধোঁকা, প্রতারণা, ভণ্ডামি ও মিথ্যাচারিতার দোষে সে ব্যক্তিই দোষী হবে, যে এগুলো মুহাম্মাদের ওপর চাপাতে চায়। (৫০৩)
থমাস কার্লাইল (৫০৪) বলেছেন, আমরা কখনোই মুহাম্মাদকে মিথ্যুক বা প্রতারক মনে করি না। কারণ, তিনি কখনো তাঁর নানাবিধ কলাকৌশল ও উপায়-উপকরণ ব্যবহার করে বিশেষ কোনো স্বার্থ হাসিল করতে চাননি। অথবা এগুলোর মাধ্যমে তিনি কোনো রাজত্ব বা বাদশাহি করার আকাঙ্ক্ষা করেননি কিংবা তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট দুনিয়ার কোনো বিষয়-আশয় অর্জন করতে ইচ্ছা করেননি। তিনি বরং যে বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তা ছিল দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট ও সঠিক। তাঁর আহ্বান ছিল একজন সত্যবাদীর আহ্বান, যা এসেছিল অজানা এক জগৎ থেকে। মুহাম্মাদ কখনোই মিথ্যুক ও প্রতারক ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক টুকরো প্রাণসদৃশ, তা থেকে বিদীর্ণ হয়ে বেরিয়ে এসেছে প্রকৃতির প্রাণ। এরপর হঠাৎ তা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে সমগ্র বিশ্বকে করে তুলেছে আলোকিত, উদ্ভাসিত। (৫০৫)
সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ লি বোন (৫০৬) বলেছেন, আমি তোমাদের নতুন কোনো মন্দ বিষয়ের দিকে আহ্বান করছি না, কিংবা আহ্বান করছি না নিন্দনীয় কোনো ভ্রষ্টতার দিকে। আমি বরং আহ্বান করছি এক আরবীয় ধর্মের প্রতি, যা আল্লাহ তাঁর রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ওহি হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। এরপর তিনি পূর্ণ বিশ্বস্ততার সাথে সেই ঐশী ধর্মের আহ্বান ছড়িয়ে দিলেন এমন সম্প্রদায়ের মাঝে, যারা মূর্তি ও পাথরের উপাসনায় লিপ্ত ছিল। মূর্খতার যুগের বিভিন্ন তুচ্ছ ও মন্দ কাজের মধ্যেই যারা তৃপ্তি অনুভব করত। তারা ছিল বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত, তিনি এসে তাদের এক ও ঐক্যবদ্ধ করেছেন। তাদের বিশ্বাস ও মতাদর্শ ছিল বিভ্রান্ত ও বিক্ষিপ্ত, তিনি এসে সেগুলোকে সংশোধন ও সুসংহত করেছেন। সৃষ্টির পূজা থেকে তিনি তাদের দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তার ইবাদতের দিকে। এ কারণে গভীরতম ভালোবাসা, বংশের আভিজাত্য, নেতৃত্বের সফলতা এবং খোদাপ্রদত্ত নবুয়তের দিক থেকে তিনিই ছিলেন জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। দেখো, এই হলেন মুহাম্মাদ, যার ধর্মকে আজ ৪০০ মিলিয়ন (চল্লিশ কোটি...) (৫০৭) মুসলমান সাদরে বরণ করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তারা বসবাস করছে। অথচ তারা সকলেই (যে ভাষারই হোক) আরবি ভাষার আসমানি গ্রন্থ 'কুরআন' পাঠ করছে। (৫০৮)
গুস্তাভ লি বোন অন্যত্র বলেছেন, অতএব, যে রাসুল এমন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, সকলের জন্য উচিত হবে তাঁর রিসালাতের অনুসরণ করা এবং অতি দ্রুত তাঁর আহ্বানে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া প্রদান করা। কারণ, এটা এক মহান আহ্বান। এর মূলকথা হলো স্রষ্টার পরিচয় অর্জন করা। ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করা। মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। বরং এ ধর্মের সকল কিছুই কল্যাণ ও পরিশুদ্ধির দিকে ধাবিত করে। সকল বিশ্বাসীর কাঙ্ক্ষিত পথই হলো কল্যাণকামিতা। আর আমি সমগ্র খ্রিষ্টজগৎকে এ দিকেই আহ্বান করছি। (৫০৯)
ব্রিটিশ চিন্তাবিদ, লেনপুলও (৫১০) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি নিজের মুগ্ধতা গোপন রাখতে পারেননি। তাই তিনি কোনো রাখঢাক ছাড়াই বলেছেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহু চারিত্রিক মাধুর্যের অধিকারী ছিলেন। যেমন, কোমলতা, সাহসিকতা, উদার চরিত্র...। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্যকারী ও এ সকল চারিত্রিক মাধুর্যে মুগ্ধ হবে এবং তাঁর ব্যাপারে সব ধরনের বিরূপ মন্তব্য প্রবৃত্তি ও পক্ষপাতদুষ্ট হবে। আর এটা হবেই-না বা কেন! তিনি অনেকগুলো বছর নিজ গোত্র ও নিকটাত্মীয়দের শত্রুতা সহ্য করেছেন। হাজার নির্যাতনেও অঢেলধৈর্য ও বিরাট সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁর মহানুভবতা এমন পর্যায়ের ছিল যে, কেউ তাঁর সাথে মুসাফাহা করলে সে ব্যক্তি নিজে হাত টেনে না নেওয়া পর্যন্ত তিনি নিজের হাত টেনে নিতেন না, মুসাফাহাকারী কোনো শিশু হলেও। একদিনের জন্যও কখনো এমন হয়নি যে, তিনি কোনো দলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছেন আর তাদের সালাম প্রদান করেননি, চাই সেটা বড়দের দল হোক অথবা ছোটদের। তাঁর দুটি ঠোঁটে সর্বদা মিষ্টি-মুচকি হাসি লেগে থাকত। শুধু তাঁর মুখের মধুর আওয়াজই যথেষ্ট ছিল শ্রোতাদের বিমোহিত করতে এবং তাদের অন্তরাত্মাকে আকৃষ্ট করতে। (৫১১)
ইংরেজ সাহিত্যিক জর্জ বার্নার্ড শ (৫১২) বলেন, আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অধ্যয়ন করেছি এক অতি আশ্চর্য মানুষ হিসেবে। আমার মতে তিনি অ্যান্টি-ক্রাইস্ট বা ঈসা আলাইহিস সালামের বিরোধী তো ননই; বরং তাকে মানবতার ত্রাণকর্তা বলাই কর্তব্য। (৫১৩) বর্তমান ইউরোপের লোকেরা একত্ববাদের প্রতি বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়ছে। কখনো এর থেকে আরেকটু অগ্রসর হয়ে তাদের এমন বিশ্বাসও জন্মাচ্ছে যে, এই বিশ্বাসই পারে ইউরোপীয় সকল সমস্যার সমাধান করতে। তোমাদের কর্তব্য হবে, এই মানসিকতা নিয়েই আমার ভাবনা-উপলব্ধিগুলো বুঝতে চেষ্টা করা। (৫১৪)
বিখ্যাত ইংরেজ প্রাচ্যবিদ উইলিয়াম ম্যুর (৫১৫) বলেছেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ কিছু মহান বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল দ্ব্যর্থহীন, স্পষ্ট। তাঁর প্রচারিত ধর্মও ছিল সহজ ও সাবলীল। তিনি এমন কিছু কাজ সম্পন্ন করে দেখিয়েছেন, যা জ্ঞানীদেরকেও বিস্মিত করে। পৃথিবীর ইতিহাস তাঁর মতো এমন কোনো সমাজসংস্কারক দেখেনি, এত অল্প সময়ের মধ্যে যিনি মানুষের অন্তরকে এভাবে জাগিয়ে তুলেছেন, উত্তম গুণাবলির মাধ্যমে তাদের মাঝে প্রাণসঞ্চার করেছেন এবং চারিত্রিক উৎকর্ষে সমুন্নত করেছেন। (৫১৬)
এভাবে তাঁর প্রশংসাযোগ্য যে গুণের কথাই বলি না কেন এবং প্রশংসাকারী সে ব্যাপারে যতটুকু তাঁর প্রশংসা করতে সক্ষম, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন তারও অনেক ঊর্ধ্বে। যে ব্যক্তিই গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাঁর মহান জীবনাচার অধ্যয়ন করেছেন, তিনি এ সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত হয়েছেন। তাঁর এ মহান জীবনাচার তাঁর স্থানকে বিশ্বের অন্যান্য রাসুল, চিন্তাবিদ, দার্শনিকদের মধ্যে সর্বাগ্রে এনে দিয়েছে। (৫১৭)
বিখ্যাত আমেরিকান প্রাচ্যবিদ ওয়াশিংটন আরভিং (৫১৮) বলেন, রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের পরবর্তী দিনগুলোতেও মানুষের প্রতি যে সদাচার দেখিয়েছেন, তা সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, তিনি ছিলেন আল্লাহপ্রেরিত একজন নবী ও রাসুল, নিছক কোনো নেতা ও বিজয়ী নন। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেও মক্কাবাসীর প্রতি তিনি দয়া, অনুগ্রহ ও সহানুভূতিই প্রদর্শন করেছেন। নিজের সফলতা ও বিজয়কে তিনি ক্ষমা ও দয়ার স্বর্ণমুকুট পরিয়েছেন। (৫১৯)
স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু (৫২০) বলেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য ধর্মপ্রবর্তকের মতো বহু কুপ্রথা ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করেছিলেন, যেগুলো তাঁর যুগে প্রচলিত ছিল। তিনি যে ধর্মের প্রতি আহ্বান করতেন, তা পালন করা ছিল অতি সহজ। নীতিমালা ছিল সুস্পষ্ট। এটি আদেশ করত পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও উঁচু-নিচুর ভেদাভেদহীনতার। এ কারণে এই ধর্ম আশপাশের অঞ্চলগুলোতে ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে তারা বিভিন্ন স্বৈরাচারী নিষ্ঠুর শাসকদের হাতে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল। পুরাতন প্রথার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল তাই নতুন ও জুলুমহীন বিধানের প্রতি তারা আগ্রহী হয়ে ওঠেছিল। ঠিক এই সময়ে ইসলামের আগমন ছিল তাদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। কারণ, ইসলামই তাদের বহু দুরবস্থা দূর করে এবং জুলুম অত্যাচারের ভয়ংকর পরিস্থিতি থেকে তাদেরকে উদ্ধার করে। (৫২১)
বেলজিয়ামের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক জর্জ সার্টন (৫২২) বলেন, মোটকথা... তাঁর আগের কিংবা পরের কোনো নবীকে এ পরিমাণ বিজয় ও সফলতা প্রদান করা হয়নি, যে পরিমাণ দেওয়া হয়েছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। (৫২৩)
উল্লিখিত এই সাক্ষ্যগুলোতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের কিছু দিক প্রকাশিত হয়েছে, যে মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা স্বীকার করেছেন তাঁর সঙ্গে চলাফেরা করা সকলেই। এমনকি যারা (সত্যান্বেষী হয়ে) তাঁর জীবনচরিত অধ্যয়ন করেছেন, তারাও। আর এই মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বই প্রমাণ করে, তিনি ছিলেন আসমানি রিসালাতের বার্তাবাহী সর্বশেষ নবী ও রাসুল, যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল পুরো মানবজাতির যাপিতজীবনের সংস্কার ও সংশোধন।

টিকাঃ
৫০২. আলফনস ডি ল্যামার্টিন: Alphonse de Lamartine (১৭৯০-১৮৬৯ খ্রি.)। একজন ফরাসি লেখক, কবি এবং রাজনীতিবিদ। অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। জীবনের একটি বড় অংশ অতিবাহিত করেছেন তুরস্কের ইজমির শহরে। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রচনা হলো, তাআম্মুলাতুন শিরিয়‍্যাহ, রিহলাতুন ইলাশ শারক。
৫০৩. আলফনস ডি ল্যামার্টিন: ইবনে হিশাম: আস-সাফারু ইলাশ শারক : ৮৪।
৫০৪. থমাস কার্লাইল-Thomas Carlyle (১৭৯৫-১৮৮১ খ্রি.) : স্কটিশ লেখক। তীক্ষ্ণ সমালোচক। ঐতিহাসিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রচনা হলো, আবতাল (এর মধ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে একটি অসাধারণ অধ্যায় রয়েছে। এটার আরবি অনুবাদ করেছেন উসতাজ আলি আদহাম), আস-সাওরাতুল ফারানসিয়্যা। দেখুন, নাজিব আকিকি: আল-মুসতাশরিকুন: ২/৫৩।
৫০৫. থমাস কার্লাইল-Thomas Carlyle: আবতাল: ৫৮-৬০।
৫০৬. গুস্তাভ লি বোন-Gustave Le Bon (১৮৪১-১৯৩১ খ্রি.): একজন ফরাসি প্রাচ্যবিদ। তিনি সমাজ ও মনোবিদ্যা সম্পর্কে প্রচুর গবেষণা করেছেন। তার বিখ্যাত রচনা হলো, হাজারাতুল আরাব সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে ইসলামি আরব সভ্যতার ন্যায়-নীতি বিষয়ক আলোচনাধর্মী মৌলিক গ্রন্থগুলোর একটি। দেখুন, আহমাদ হামেদ: আল-ইসলাম ওয়ার-রাসুল ফি ফিকরি হা-উলা: ৫৯-৬১।
৫০৭. এখন ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, বর্তমানে পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় ৭৫৫ কোটি, যার মধ্যে مسلمانوں সংখ্যা প্রায় ১৯০ কোটি।-অনুবাদক
৫০৮. প্রাগুক্ত।
৫০৯. গুস্তাভ লি বোন : হাজারাতুল আরব: ৬৭।
৫১০. লেনপুল-Lane Poole (১৮৫৩-১৯১৭ খ্রি.): একজন ইংরেজ দার্শনিক। তিনি ১৮৯৭ সালে প্রাচীন মুদ্রাগুলোর তালিকা প্রস্তুত করেন। সেটা মিশরের দারুল কুতুবিল মিসরিয়‍্যাতে এখনো সংরক্ষিত আছে। তার উল্লেখযোগ্য রচনা হলো, রিসালাতুন ফি তারিখিল আরাব।
৫১১. লেনপুল: রিসালাতুন ফি তারিখিল আরাব। তথ্যসূত্র: আফিফ আবদুল ফাত্তাহ তাব্বারা: রুহুদ্দিনিলি ইসলামি: ৪৩৮。
৫১২. জর্জ বার্নার্ড শ-George Bernard Show (১৮৫৬-১৯৫০ খ্রি.): একজন বিখ্যাত ইংরেজ লেখক ও ঔপন্যাসিক। ১৯২৫ সালে সাহিত্যে অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী নিয়ে তাকে একটি নাটক লেখার প্রস্তাব করা হয়েছিল, কিন্তু রাসুলের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। (যারা মানুষের সামনে ইসলামকে বিকৃত ও খারাপভাবে উপস্থাপন করতে চায়, তাদের জন্য এর মাঝে রয়েছে উত্তম এক দৃষ্টান্ত।) অধিক তথ্যের জন্য দেখুন, আহমাদ হামেদ: আল-ইসলাম ওয়ার-রাসুল ফি ফিকরি হা-উলা: ১৩-১৫।
৫১৩. ড. মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহর লিখিত 'কিতাবে ও পরধর্ম গ্রন্থে নবী করীম (সঃ)' তে আছে, আমি বিশ্বাস করি যদি তাঁর মতো কোনো ব্যক্তি আধুনিক জগতের একনায়কত্ব আচরণ করতেন তবে তিনি এর সমস্যাগুলো এরূপভাবে সমাধান করতে পারতেন যাতে বহু আকাঙ্ক্ষিত শান্তি ও সুখ আনতে সমর্থ হতেন। আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি মুহাম্মাদের ধর্ম আগামী দিনে পূর্ণ স্বীকৃতি লাভ করবে যেমন আজকের ইউরোপ তাকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে...।)
৫১৪. আল-হুসাইনি মাআদি: আর-রাসুল ফি উয়ুনি গারবিয়্যাতিন মুনসিফাহ: ৭০।
৫১৫. ইউলিয়াম ম্যুর-William Muir (১৮১৯-১৯০৫ খ্রি.): একজন বিখ্যাত ইংরেজ ঐতিহাসিক এবং প্রাচ্যবিদ (পূর্বে তার পরিচয় প্রদান করা হয়েছে)।
৫১৬. ইউলিয়াম ম্যুর: হায়াতু মুহাম্মাদ: ৩১।
৫১৭. ইউলিয়াম ম্যুর: হায়াতু মুহাম্মাদ: ২০।
৫১৮. ওয়াশিংটন আরভিং-Washington Irving (১৭৮৩-১৮৫৯ খ্রি.): একজন আমেরিকান প্রাচ্যবিদ ও ঐতিহাসিক। অনেক গুরুত্বের সাথে ইসলাম বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তার কয়েকটি বিখ্যাত রচনা হলো, ফাতহু গারনাতাহ, হায়াতু মুহাম্মাদ। সূত্র: নাজিব আকিকি: আল-মুসতাশরিকুন: ৩/১৩১।
৫১৯. ওয়াশিংটন আরভিং: হায়াতু মুহাম্মাদ: ৭২।
৫২০. জওহরলাল নেহেরু-Jawaharlal Nehru (১৮৮৯-১৯৬৪ খ্রি.): ভারতের স্বাধীনতা-আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট নেতা। বিভক্ত ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। সমাজতন্ত্র এবং সাম্যতার পক্ষে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অন্য অনেক নেতার মতো হিন্দুত্ববাদের প্রতি কঠোর অনুরাগী বা উগ্রবাদী ছিলেন না।
৫২১. জওহরলাল নেহেরু লামাহাত মিন তারিখিল আলাম: ২৯। (জওহরলাল নেহেরু এটা ইংরেজিতে লিখেছিলেন, যার নাম, Glimpses of world history। এটার বাংলাও করা হয়েছে, যার নাম: বিশ্ব ইতিহাস প্রসঙ্গ।-অনুবাদক
৫২২. জর্জ সার্টন-George Sarton (১৮৮৪-১৯৫৬ খ্রি.): মূল নিবাস বেলজিয়াম। প্রকৃতিবিদ্যা এবং অঙ্কশাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ১৯৩১-১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে আরবিভাষা শিক্ষাগ্রহণ করেন। মনুষ্যচেতনায় আরবের শ্রেষ্ঠত্ববিষয়ক অনেক ভাষণ ও বক্তৃতা দিয়েছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মাদখাল ইলা তারিখিল ইলমি। সূত্র: নাজিব আকিকি: আল-মুসতাশরিকুন: ৩/১৪৭, ১৪৮।
৫২৩. জর্জ সার্টন: আস-সাকাফাতুল গারবিয়্যা ফি রিআয়াতিশ শারকিল আওসাত: ২৮-৩০।

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 বাস্তবতার সাক্ষ্য

📄 বাস্তবতার সাক্ষ্য


অতীত বা বর্তমান সকল যুগের বাস্তবতা এটাই যে, অন্য ধর্মগুলোর চেয়ে ইসলামধর্মই পৃথিবীতে সবচেয়ে দ্রুত প্রসার লাভ করছে। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেছিলেন। সে সময় খুব অল্পসংখ্যক মানুষই ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর বহু দিন, বহু বছর কেটে গেছে, আজ সেই স্বল্প সংখ্যক মানুষের ইসলাম এখন পৌঁছে গেছে পৃথিবীর সকল প্রান্তে।
ইতিহাস তার অকাট্য সততা নিয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছে, ক্রমান্বয়ে এই ধর্ম অতি দ্রুত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে এবং পৃথিবীর বহু জাতি-গোষ্ঠী এর প্রতি ঈমান আনছে, চাই সে জাতি বাহ্যিক কোনো যুদ্ধে বিজয়ী হোক অথবা পরাজিত। এটা এমন এক বিস্ময়কর বিষয়, যা পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবীদের বিচলিত করে ছাড়ে। অর্থাৎ মুসলিমরা কোথাও বাহ্যিকভাবে পরাজিত হলেও ইসলাম সকল স্থানেই বিজয়ী হচ্ছে। এই যে তাতারদের ইসলামগ্রহণ, এটা তো খুব দূরের কোনো ঘটনা নয়। তারা মুসলমান-অধ্যুষিত এলাকায় প্রবেশ করেছিল মুসলমানদের চিরতরে নির্মূল ও নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ৬৮৫ হিজরিতে (১২৬০ খ্রিষ্টাব্দে) 'আইনে জালুত'-এর ময়দানে যখন তাদের পরাজয় ঘটল, তখন তারা বাধ্য হলো এ ধর্মের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যাবলি নিয়ে ভাবতে। খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতে এ কারণে তাদের অধিকাংশই ইসলামগ্রহণে ধন্য হয়েছে। ফলে, একসময় যারা ছিল ইসলাম ধ্বংসের মূল কারিগর, তারাই আবার ইসলামের সৈনিকে পরিণত হলো। তারাই তখন ইসলামের বাগানকে অত্যাচারীদের কবল থেকে রক্ষা করতে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করল।
অতএব, নির্দ্বিধায় বলা যায়, ইসলামের প্রতি সবচেয়ে বড় আহ্বানকারী ইসলাম নিজেই। কারণ, ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস এবং তার বিধিবিধান এতটাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার যে, সুচিন্তক প্রতিটি মানুষকেই তা আকর্ষণ করে এবং তার ছায়াতলে আশ্রয় নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
তা ছাড়া ইসলাম গ্রহণকারী প্রতিটি ব্যক্তিকেই ইসলাম তার অধিকার প্রদান করে। তার কোনো অধিকার হরণ করে না। কারণ, একজন ব্যক্তি ইসলামের মাধ্যমে তার প্রতিপালকের সাথে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। তাকে পাওয়ার পথ পেয়ে যায়। দিনে অন্তত পাঁচবার তাঁর সামনে দণ্ডায়মান হতে পারে। কোনোরকম অন্তরায় ছাড়া সরাসরি নির্বিঘ্নে তাকে হৃদয়খুলে ডাকতে পারে। এমনইভাবে, ইসলামি বিধান মেনে এই পার্থিব জীবনেও সে সবচেয়ে সুখী, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন একটি জীবনযাপনের আশা করতে পারে। মৃত্যুপরবর্তী জীবনে স্থায়ী শান্তির জায়গা জান্নাত কামনা করতে পারে। আর এ মহান প্রাপ্তির জন্য ইসলাম শুধু তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ব্যাপারে সাক্ষ্যপ্রদান এবং শরিয়তের বিধান অনুসরণের কথা বলে। এ ছাড়া তার সক্ষমতার বাইরে তার ওপর অন্য কিছু চাপিয়ে দেয় না।
আপনি যদি পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে একটু দৃষ্টি দেন এবং ইসলামের সম্প্রসারণ নিয়ে একটু চিন্তাভাবনা করেন, নিঃসন্দেহে আপনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবেন। (মানচিত্র নং-৩)
আপনার এই বিস্ময়-বিমুগ্ধতা বাড়তেই থাকবে, যখন আপনার সামনে স্পষ্ট হবে যে, ইসলাম তার প্রতিটি অনুসারীর অন্তরে পরিপূর্ণভাবে স্থান করে নিয়েছে। অথচ এগুলোর জন্য নেই নিয়মতান্ত্রিক কোনো সৈন্যবাহিনী অথবা প্রচলিত নিয়মের কোনো রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা। এসব ব্যবস্থাপনা ছাড়াই ক্রমে তার অনুসারীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
আল্লাহ তাআলা ইসলামকে মেনে নেওয়া মানবমনের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। ফলে ইসলামের সত্যবাণী কারও কর্ণপাত হলে ঈমান ও ইসলাম তার হৃদয়কে আন্দোলিত করে। আর এভাবে সত্যের प्रति যখন একবার বিশ্বাস জন্মে যায়, তখন তা হৃদয় থেকে বের করার সকল পথই ব্যর্থ প্রমাণিত হয়। (৫২৪)
[মানচিত্র নং-৩ বিশ্বে मुसलमानों হার]
ইসলামকে মেনে নেওয়া মানবমনের জন্য সহজতর হওয়ার কারণ হয়তো তার স্পষ্টতা ও সততা। এ কারণে পশ্চিমা বিশ্বের বহু পণ্ডিত ব্যক্তি ইসলামের স্বভাবজাত এইসব বৈশিষ্ট্যে প্রচণ্ড মুগ্ধ হয়েছেন। এমনকি ফ্রান্সের প্রসিদ্ধ ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ লি বোন ইসলামের সহজতা সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন,
ইসলামের নীতিমালার মতো এত সুস্পষ্ট ও জটিলতাহীন কোনো মতবাদ বা মতাদর্শ পৃথিবীতে নেই। এই নীতিমালাতে একজন উপাস্যের কথা বলা হয়েছে। সেই উপাস্যের সামনে সকল মানুষ সমান। সাথে এমন কিছু অত্যাবশ্যক কাজের কথা বলা হয়েছে, যারা তা পালন করে চলবে, তারা জান্নাতে যাবে। আর যারা সেগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। আপনার যদি একজন অতি সাধারণ মুসলমানের সাথেও দেখা হয়, তবুও দেখবেন, নিজের আবশ্যক বিশ্বাসের বিষয়াবলি সম্পর্কে সে সম্পূর্ণ অবগত। সে আপনার নিকট ইসলামের মৌলিক নীতিমালাগুলো অল্প কথায় খুব সহজে ব্যক্ত করতে সক্ষম। অথচ এ ব্যাপারটাতে খ্রিষ্টানরা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। কারণ, সাধারণ একজন খ্রিষ্টান ত্রিত্ববাদ, রূপান্তর, দেহান্তর ও অন্যান্য দুর্বোধ্য বিষয়াবলি সম্পর্কে কিছুই বলতে সক্ষম হবে না, যদি না সে খ্রিষ্টধর্মের এমন বড় কোনো ধর্মীয় জ্ঞাণী হয়, যার তর্কশাস্ত্র সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি রয়েছে।
এ ছাড়া, মানুষের প্রতি ইসলামের ন্যায়পরতা ও কল্যাণের সুস্পষ্ট নির্দেশনাও বিশ্বব্যাপী তার প্রচার-প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। (৫২৫)
আজকের এই জনবহুল বিশ্বের দিকে দৃষ্টি প্রদান করলে আমরা দেখতে পাব, পুরো পৃথিবীতে (৪২০০) চার হাজার দুইশরও অধিক ধর্ম প্রচলিত রয়েছে। (৫২৬) কিন্তু বিভিন্ন জরিপ এ তথ্য দিচ্ছে যে, এসব ধর্মের মধ্যে ইসলামধর্মই সবচেয়ে বেশি প্রসারতা লাভ করছে। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের জরিপে দেখা গেছে, পৃথিবীতে তখন مسلمانوں সংখ্যা ছিল ১২.৪% আর খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ছিল ২৬.৯%। এরপর ১৯৮০ সালে পৃথিবীতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ১৬.৫% আর খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ছিল ৩০%। ২০০০ সালে এসে মুসলমানদের সংখ্যা বেড়ে হয়ে গেল ১৯.২% আর খ্রিষ্টানদের সংখ্যা নেমে এলো ২৯.৯%-এ। (৫২৭)
স্বয়ং খ্রিষ্টীয় বিশ্বকোষের (World Christian Encyclopedia) সর্বশেষ নতুন সংস্করণেও সংখ্যানুপাতের এই তারতম্য স্বীকার করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সারা পৃথিবীতে বসবাসকারীদের সামষ্টিক হিসেবে গত শতাব্দীতে মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধির হার ৭%, যেখানে খ্রিষ্টানদের জনসংখ্যার হার ধীরে ধীরে স্বল্পতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
এ ছাড়াও বলা হয়েছে, সারা পৃথিবীতে বসবাসকারীদের সামষ্টিক সংখ্যা হিসেবে মুসলমানগণের সংখ্যা বেড়ে ১৯.৬%-এ উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ मुसलमानों সংখ্যা দাঁড়িয়েছে (১.৩ বিলিয়ন) ১.৩ শ কোটির কাছাকাছি। (৫২৮)
তা ছাড়া পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষকগণ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, ২০২৫ সালে বিশ্বের মুসলমানদের সংখ্যা বেড়ে মোট জনসংখ্যার ৩০%-এ উন্নীত হবে। আর খ্রিষ্টানদের সংখ্যা নেমে ২৫%-এ চলে আসবে। এ সকল পরিসংখ্যানের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, প্রতি বছর গড়ে مسلمانوں সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ২.৯% হারে আর পৃথিবীতে এটাই সবচেয়ে উঁচু হার। (৫২৯)
আমরা যদি পশ্চিমাবিশ্বের কিছু দেশ, যেমন ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন আমেরিকাসহ অনন্য দেশগুলোর দিকে দৃষ্টি দিই, তাহলে সব জায়গাতে একই চিত্র দেখতে পাব। সারা বিশ্বে ইসলামের প্রতি মানুষের এই অগ্রসরতা ও मुसलमानों ক্রমবৃদ্ধির হার প্রমাণ করে, ইসলাম হলো মানুষের স্বভাবজাত ও প্রাকৃতিক ধর্ম। মন ও মানসিকতার সাথে ইসলাম এতটাই সামঞ্জস্যশীল যে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের যে-কেউ ইসলামের প্রকৃত রূপরেখা সম্পর্কে অবগত হবে, শ্রদ্ধা ও ভক্তির সাথে সে কেবল ইসলামধর্মকেই গ্রহণ করে নেবে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি জরিপে উঠে এসেছে, ফ্রান্সে প্রতি বছর গড়ে ৩৬০০ জন ব্যক্তি ইসলামগ্রহণ করে থাকে। (৫৩০)
এদিকে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাকুলিন স্মিথ বলেন, যুক্তরাজ্যে বর্তমানে (২০০৭ সাল) مسلمانوں সংখ্যা পৌঁছেছে ২ মিলিয়নে (বিশ লক্ষ)। অথচ ২০০১ সালে তাদের সংখ্যা ছিল ১.৬ মিলিয়ন (ষোলো লক্ষ)। সাত বছরেরও কম সময়ে مسلمانوں সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৪০ লক্ষ।
দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা বলছে, مسلمانوں এই নতুন পরিসংখ্যান ইসলামের মর্যাদা ও মহত্ত্বকেই প্রমাণ করে। পৃথিবীতে (জনসংখ্যার হিসাবে) খ্রিষ্টধর্মের পরে এটাকেই সবচেয়ে বৃহৎ ধর্ম হিসেবে দেখা হয়। কারণ, বর্তমান ব্রিটেনের সামষ্টিক জনসংখ্যা অনুপাতে মুসলমান হলো ৩.৩%। তবে এটা স্পষ্ট যে, বর্তমানে ব্রিটেনে যে ধর্মটি সবচেয়ে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে, সেটা হলো ইসলাম। (৫৩১)
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ইউনিভার্সিটির সমাজ গবেষণাকেন্দ্র থেকে প্রকাশিত নতুন জরিপ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য ধর্মের চেয়ে ইসলামধর্মই সবচেয়ে দ্রুত মানুষের মাঝে প্রসার লাভ করছে। আমেরিকাতে মসজিদের সংখ্যা ১২০৯ ছাড়িয়ে গেছে, যার অর্ধেকেরও বেশি স্থাপিত হয়েছে গত দশ বছরের মধ্যে। এভাবে গত দশ বছরের মধ্যে যারা নিজ ধর্ম ছেড়ে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছেন, তাদের হারও ১৭% থেকে ৩০%-এর মাঝে ওঠানামা করছে। (৫৩২)
আর জার্মানিতে ৩.৩ মিলিয়ন (তেত্রিশ লক্ষ)-এরও অধিক মুসলমান বসবাস করে। জার্মানির অধিবাসীদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪% হলো মুসলমান। সেখানে মসজিদ বা নামাজের স্থানের সংখ্যা ৩০০০-এর কাছাকাছি। (৫৩৩)
এভাবে বেলজিয়ামের লিবার বেলজিক পত্রিকা একটি ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বলেছে, আগামী বিশ বছর পর ব্রাসেলস (যাকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অফিসিয়াল রাজধানী হিসেবে গণ্য করা হয়)-এর অধিবাসীদের মধ্যে মুসলমানরা হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর এই অনুমান সঠিক হওয়ার একটা স্পষ্ট দলিলও আছে, তা হলো ২০০১ সালের পর থেকে ব্রাসেলসে নতুন প্রজন্মের মধ্যে 'মুহাম্মাদ' নামের প্রচলনটা তুলনামূলক সবচেয়ে বেশি।
একইভাবে রাশিয়ান সংবাদপত্র Rossiyskaya Gazeta উল্লেখ করেছে, ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দশ বছরে বেলজিয়ামে مسلمانوں সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে ২০০৫ সালে এসে সেখানে مسلمانوں সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লক্ষ ৫০ হাজার। উক্ত সালে এই দেশের মোট জনসংখ্যাই যেখানে ১০ মিলিয়ন বা ১ কোটি। (৫৩৪)
এই হলো মহান ইসলাম। এভাবেই ইসলাম তার গতিময়তা ও নিজের শক্তিতে যুগে যুগে মানুষের মাঝে প্রসার লাভ করেছে। এর কারণ একটাই, ইসলাম স্বভাবজাত নিরঙ্কুশ ধর্ম। অতএব, আমাদের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতা প্রমাণে এই স্বভাবজাত ধর্ম কতই-না চমৎকার একটি প্রমাণ! ইতিপূর্বে আমরা তাঁর নবুয়তের সত্যতা ও রিসালাতের পূর্ণতার ওপর যেসব স্পষ্ট প্রমাণ উল্লেখ করেছি, এ সকল আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা এখন পরিতৃপ্তির সাথেই বলতে পারি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্ববাসীর জন্য এমন এক পূর্ণাঙ্গ ঐশী বার্তা এনেছেন, যা পূর্ণ হয়ে আছে পারস্পরিক ভালোবাসা, সাহায্য, সহযোগিতা এবং সমূহ কল্যাণে।
সুন্দর হয়, আমরা যদি আমাদের এই আলোচনা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই হাদিসের মাধ্যমে সমাপ্ত করি, যাতে তিনি পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ইসলাম প্রবেশের সুসংবাদ প্রদান করেছেন। তিনি বলেন,
«لَيَبْلُغَنَّ هَذَا الْأَمْرُ مَا بَلَغَ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ وَلَا يَتْرُكُ اللَّهُ بَيْتَ مَدَرٍ وَلَا وَمَرٍ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللَّهُ هَذَا الدِّينَ بِعِزَّ عَزِيزٍ أَوْ بِذُلُّ ذَلِيلٍ عِزًّا يُعِزُّ اللَّهُ بِهِ الْإِسْلَامَ وَذُلَّا يُذِلُّ اللَّهُ بِهِ الْكُفْرَ»
এই ধর্ম একসময় সেইসব স্থান পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, যেখানে রাত হয় কিংবা দিনের আগমন ঘটে। কাঁচা ইট বা পশমের কোনো ঘর (শহর ও গ্রাম), কোনোটিই বাকি থাকবে না, যেখানে আল্লাহ তাআলা এই ধর্মকে পৌঁছে দেবেন না। আর তাতে সম্মানিতরা সম্মানিত হবে ও অসম্মানিতরা অসম্মানিত হবে। সম্মানিতকে আল্লাহ তাআলা ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করবেন আর অসম্মানিতকে আল্লাহ তাআলা কুফরির মাধ্যমে লাঞ্ছিত করবেন। (৫৩৫)
***

টিকাঃ
*২৪. হুসাইন মুনিস: আল-ইসলামুল ফাজਿਹ: ২০-২৪।
৫২৫. গুস্তাভ লি বোন: হাজারাতুল আরব : ১২৫。
৫২৬. ওয়েবসাইট: www.adherents.com
৫২৭. Sato Tsugitaka, Muslim Societies, Routledge, UK, 2004.
৫২৮. ভিজিট করুন ইসলামিক সংবাদ সংস্থার ওয়েবসাইট: www.islmicnews.net এবং আরবি সংবাদপত্র 'আশ-শারকুল আওসাত'-এর ওয়েবসাইট: www.asharqalawsat.com
৫২৯. Sato Tsugitaka, Muslim Societies, Routledge, UK, 2004.
*৫৩০. ইসলাম টাইম-এর ওয়েবসাইট : www.islamtime.net
*৫৩১. ইসলাম টাইম-এর ওয়েবসাইট : www.islamtime.net
*৫৩২. লিওয়াউশ শরিয়া-এর ওয়েবসাইট : www.shareah.com
*৫৩৩. জার্মান সাময়িকীর ওয়েবসাইট : www.magazine-deutschland.de
** রাশিয়ান সংবাদ সংস্থা নভোস্টি-এর ওয়েবসাইট: http://ar.rian.ru/analytics
***. মুসনাদে আহমাদ: ১৬৯৯৮, মুসতাদরাকে হাকেম: ৮৩২৬。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00