📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 পূণ্যবতী স্ত্রীদের সাক্ষ্য

📄 পূণ্যবতী স্ত্রীদের সাক্ষ্য


জানা কথা, একজন স্ত্রীই তার স্বামীর সবচেয়ে নিকটতম। স্বামীর গোপন বিষয় প্রকাশ হওয়ার আগেই স্ত্রী তা জেনে থাকে। প্রকৃত স্বভাবচরিত্র থাকে তার নখদর্পণে। তার সামনে কৃত্রিমতার আবরণ থাকে না। এগুলো অবগতির জন্য যেখানে একজন স্ত্রীই যথেষ্ট, সেখানে যদি স্ত্রীর সংখ্যা একাধারে নয়জন হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে তাদের ব্যাপারে আমাদের ধারণা কেমন হতে পারে? এটা কি ভাবা যায় যে, নয় নয়জন সতিন থাকবে আর তারা সৌন্দর্য নিয়ে একে অন্যের প্রতি ঈর্ষা ও আত্মমর্যাদাবোধে আক্রান্ত হবে না! স্বামীর জীবদ্দশায় কিংবা তার মৃত্যুর পরে?
সাধারণ বিবেচনা থেকেই বলা যায়, এটা হতেই পারে না। কারণ, স্বাভাবিকভাবেই এতজনের মধ্যে কেউ তাদের স্বামীকে ভালোবাসবে, আর কেউ অপছন্দ করবে, তাদের সাথে তার আচার-ব্যবহার খারাপ হওয়ার কারণে। অথবা তাঁদের কাউকে কাছে টানা আর অন্যদের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করার কারণে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষেত্রেও কি এমন ঘটেছিল?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পুণ্যবতী স্ত্রীগণের মাঝে এ ব্যাপারটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। বরং স্ত্রীদের সকলেই নবীজির নৈকট্য অর্জনে প্রতিযোগিতা করতেন। সকল স্ত্রীই তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন, জীবদ্দশায় এবং তাঁর ইনতেকালের পরেও। তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে কেউ ছিলেন বৃদ্ধা, বয়স্কা। কেউ ছিলেন বয়সে ছোট, কিছুটা জেদি। কেউ ছিলেন অতি আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারিণী। আবার কেউ কেউ অতি দ্রুত রেগে যেতেন। কিন্তু তারা সকলেই একটি ব্যাপারে ছিলেন এক এবং অভিন্ন। আর সেটা হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তাঁদের গভীর ভালোবাসা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম স্ত্রী ছিলেন সাইয়েদা খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ রা.। নবীজির সাথে তিনি দীর্ঘ পঁচিশ বছর সংসার করেছেন। এই সময়ে তাঁর মাঝে ভালো ছাড়া মন্দ কোনো বিষয় ঘটেনি। দেখতে পাননি। নবীজির ওপর প্রথমবার ওহি নাজিল হলে তিনি যখন ভীত ও শঙ্কিত হয়ে পড়েন, তখন হজরত খাদিজা রা. নবীজির অস্থিরতা কাটানোর জন্যে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, 'আল্লাহর কসম, তিনি কখনোই আপনাকে লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়তা রক্ষা করেন। অন্যের বোঝা বহন করেন। নিঃস্বকে উপার্জন করে দেন। মেহমানকে যথাযথ আপ্যায়ন করেন। সত্যপথের বিপর্যস্ত মানুষকে সাহায্য করেন...।' (৪৯১)
সাইয়েদা খাদিজা রা.-এর এই সান্ত্বনা নিছক মুখের কথা ছিল না। বরং এটা ছিল প্রকৃত বাস্তবতা। এ গুণাবলি ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাবজাত। হজরত খাদিজা রা. দীর্ঘদিন যেগুলো তার মধ্যে দেখে এসেছেন। এর মাধ্যমেই প্রকাশ পায়, বাড়িতে খাদিজা রা.-এর সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ যেমন সুন্দর ও অমায়িক ছিল, বাইরেও ঠিক তেমনই ছিল। এটাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার প্রমাণ। তাঁর এই সুন্দর আচরণই সাইয়েদা খাদিজা রা.-কে নবীজির সুন্দর ব্যবহার ও উত্তম চরিত্রের সাক্ষ্য দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বকনিষ্ঠা স্ত্রী ছিলেন হজরত আয়েশা রা.। তিনিও নবীজির উত্তম আখলাক-চরিত্র এবং সত্যবাদিতার সাক্ষ্য দিয়েছেন। অন্যদের চেয়ে তিনিই ছিলেন তাঁর ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি জ্ঞাত ও অবগত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তার অনেক মূল্যায়নও করতেন। এমনকি নবীজি ইনতেকাল করেছেন তার ঘরে, তার কোলে মাথা রেখে। সেই আয়েশা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আখলাক-চরিত্রের ক্ষেত্রে বলেছেন,
فَإِنَّ خُلُقَ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ الْقُرْآنَ»
কুরআনই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আখলাক-চরিত্র। (৪৯২)
এ বিষয়ে সিরাত গ্রন্থাবলিতে অনেক ঘটনা রয়েছে। সেগুলোর মাধ্যমে উম্মাহাতুল মুমিনিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কী পরিমাণ সম্মান ও শ্রদ্ধা করতেন তার নমুনা পাওয়া যায়। তেমনই একটি ঘটনা হলো উম্মুল মুমিনিন হজরত উম্মে হাবিবা বিনতে আবি সুফিয়ান রা.-এর। ঘটনাটি ঘটেছিল তার পিতা আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের সাথে। আবু সুফিয়ান ছিলেন কুরাইশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং তাদের বড় নেতা। তখনও তিনি কাফের ছিলেন, ইসলামগ্রহণ করেননি।
কুরাইশরা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হুদাইবিয়ায় কৃত চুক্তি ভেঙে ফেলল এবং বনু খুজাআর ওপর আক্রমণ করে তাদের অনেককে হত্যা করল, কাউকে বন্দি করে দাস বানালো, তখন তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে এর প্রতিশোধের আশঙ্কা করল। তাই তারা দ্রুত আবু সুফিয়ানকে মদিনায় পাঠালো, যাতে তিনি উভয় দলের মাঝে চুক্তি নবায়ন করেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুক্তি নবায়নের আবেদন নাকচ করে দিলেন এবং মক্কা বিজয়ের দৃঢ় সংকল্প করলেন। অবশ্য এখানে আমাদের মূল আলোচ্য বিষয় হলো ওই আলাপচারিতা, যা পিতা ও কন্যার মাঝে সংঘটিত হয়েছিল। আবু সুফিয়ান যখন চুক্তি নবায়নের উদ্দেশ্যে মদিনায় এলেন, তখন তিনি দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আপন কন্যার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। বিচ্ছেদের পর কেটে গিয়েছিল অনেকগুলো বছর। নিজের দ্বীন সংরক্ষণের জন্য উম্মে হাবিবা রা.-এর হাবশায় হিজরত করা থেকে নিয়ে মদিনায় ফিরে আসা পর্যন্ত ছিল এ দীর্ঘ সময়। আবু সুফিয়ান আপন কন্যা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী উম্মে হাবিবা রা.-এর কামরায় প্রবেশ করলেন। তিনি যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিছানায় বসতে গেলেন, সাথে সাথে উম্মে হাবিবা রা. সেটা গুটিয়ে নিলেন। এটা দেখে আবু সুফিয়ান বললেন, হে আমার প্রিয় মেয়ে! আমি বুঝতে পারছি না, (তুমি যে চাদরটি গুটিয়ে নিলে,) তুমি কি চাদরকে আমার অযোগ্য মনে করো, নাকি আমাকে চাদরের অনুপযুক্ত?
উম্মে হাবিবা রা. বললেন, এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাদর। আর আপনি এখনো একজন মুশরিক... (এ কারণে আমি চাদর গুটিয়ে নিয়েছি)।
আবু সুফিয়ান তখন বললেন, আল্লাহর কসম! আমার কাছ থেকে চলে আসার পর তোমার আচার-ব্যবহার মন্দ হয়ে গেছে! (৪৯৩)
পুণ্যবতী স্ত্রী উম্মুল মুমিনিন হজরত উম্মে হাবিবা রা. ইসলামের স্বাভাবিক আচরণরীতির বাইরে ভিন্ন একটি অবস্থান গ্রহণ করেছেন। কারণ, তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন সত্যনবী। আর তার পিতা একজন মুশরিক। তিনি এমন কিছুর উপাসনা করেন, যা তার কোনো উপকার করতে পারে না, কোনো ক্ষতিও করতে পারে না। তাই তিনি তার এই আচরণের মাধ্যমে তার পিতাকে সে ভ্রান্তির ঘুম থেকে জাগাতে চেয়েছিলেন, যে ভ্রান্তির মধ্যে তিনি অনেকগুলো বছর অতিবাহিত করেছেন। এ উদ্দেশ্যেই তিনি চাদর উঠিয়ে নিয়েছেন। সেইসাথে এটি মূলত তার হৃদয়ে তার সৎ ও সত্যবাদী স্বামীর প্রতি গভীর ভালোবাসারও বহিঃপ্রকাশ ছিল। অন্যদিকে তার পিতা ছিলেন মুশরিক। দীর্ঘদিন যিনি তার স্বামী নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিদের প্রতি চরম শত্রুতা পোষণ করে আসছেন। এ কারণে নবীর স্পর্শধন্য বিছানায় বসার ক্ষেত্রে নিজের পিতার জন্যও তার অন্তরে কোনো কোমল অনুভূতি জাগ্রত হয়নি, হওয়া সম্ভবও ছিল না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যতার সাক্ষ্যসমূহের মাঝে আরেকটি উজ্জ্বলতম সাক্ষ্য হলো উম্মুল মুমিনিন হজরত সাফিয়া বিনতে হুয়াই বিন আখতাবের সাক্ষ্য। হুয়াই বিন আখতাব ছিল ইহুদি গোত্র বনু কুরায়জার প্রসিদ্ধ নেতা। তার খেয়ানত, প্রতারণা ও মুসলমানদের সাথে কৃত চুক্তি ভঙ্গের কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারই কন্যা হজরত সাফিয়া রা.-ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আখলাক-চরিত্র সম্পর্কে বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমি আমার জীবনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে উত্তম চরিত্রবান কাউকে দেখিনি। খায়বারের দিন তিনি আমাকে তাঁর বাহনে করে নিয়ে আসেন। আমি ছিলাম তাঁর উটের পেছনে। তখন রাতের বেলা। আমি ঘুমের আধিক্যে ঢলে ঢলে পড়ছিলাম। বারবার আমার মাথা হাওদার লাঠির সাথে গিয়ে লাগছিল। এ সময় তিনি আমার গায়ে মৃদু স্পর্শ করে বলছিলেন, ‘এই মেয়ে! একটু ধৈর্য ধরো。(৪৯৪)
এরপর একদিন এই নারীই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের বদলে নিজের জীবন উৎসর্গ করা এবং তাঁর সকল কষ্টকে নিজের ওপর চাপিয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। হজরত যায়েদ বিন আসলাম রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তিম রোগের সময়, তাঁর স্ত্রীগণ তাঁর নিকট সমবেত হলেন। তখন সাফিয়া রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ করে বলেন, 'হে আল্লাহর নবী, আল্লাহর কসম! আমার মন চায়, আপনি যে কষ্ট পাচ্ছেন, তা আপনার না হয়ে আমার হোক।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ কথা সম্পর্কে মন্তব্য করেন, 'আল্লাহর শপথ! অবশ্যই সে সত্য বলেছে।'(৪৯৫)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে হজরত সাফিয়া বিনতে হুয়াই এমন আবেগঘন কথা বলেছিলেন। কথাটি তিনি এমন একসময় বলেছেন, যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার কোনো তোষামোদ করার প্রয়োজন ছিল না কিংবা তার কোনো রাগ বা ক্রোধ থেকে বাঁচারও বিষয় ছিল না। বরং এটা ছিল, একজন স্ত্রীর হৃদয়ের আকুতি, যিনি বিশ্বাস করতেন তার স্বামী আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত নবী। এ কারণেই তিনি তখনো তাঁকে সম্বোধন করেছেন 'ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ বা হে আল্লাহর নবী' বলে। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্ব হলো, তিনি হৃদয়ের এ অনুভূতিকে সত্যায়ন করেছেন। যদিও তখন কোনো কোনো স্ত্রী চোখের ইশারায় তাকে কটাক্ষ করেছিলেন।
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল স্ত্রী তার সংসারে অবস্থান করেছেন। তারা ছিলেন মুমিনা নারী। অল্পে তুষ্টির অধিকারিনী। সকল জাহানের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার ইবাদতে নিবেদিতা। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার পূর্বে তারা তার থেকে যেভাবে ঈমান ও ইসলাম শিখেছিলেন, তার ঘরে এসেও তারা ঠিক তেমনই জীবনযাপন করেছেন।

টিকাঃ
৪৯১. সহিহ বুখারি: ৪, ৪৯৫৪, সহিহ মুসলিম: ১৬০।
৪৯২. সহিহ মুসলিম: ৭৪৬, সুনানে আবু দাউদ: ১৩৪২, সুনানে নাসায়ি: ১৬০১, মুসনাদে আহমাদ: ২৪৩১৪।
*৪৯৩. ইবনুল কাইয়িম: জাদুল মাআদ: ৩/৩৫০。
*৪৯৪. মুসনাদে আবু ইয়ালা: ১৩/২৯-৩১। ইমাম তবারানি: মুজামুল আওসাত: ৬/৩৪৪, ৩৪৫।
৪৯৫. মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ১১/৪৩১。

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 সমসাময়িক অমুসলিমদের সাক্ষ্য

📄 সমসাময়িক অমুসলিমদের সাক্ষ্য


মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার ব্যাপারে শুধু তার প্রিয়জন বা মুমিনরা সাক্ষ্য দিয়েছেন এমন নয়; বরং যারা তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন লড়াই করেছে, যারা ছিল তার ঘোর বিরোধী, তারাও তার সত্যতার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছে।
মক্কার এইসব কাফের নেতা এবং আশপাশের আরবদের অন্তর তো বিশ্বাস করত, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সত্যবাদী-কিছুতেই মিথ্যাবাদী নয়। নবুয়তপ্রাপ্তির আগে দীর্ঘ চল্লিশ বছর তারা নবীজির সঙ্গে বসবাস করেছে। এই সুদীর্ঘ সময়ে তারা তাকে কখনো মিথ্যা বলতে দেখেনি। কখনো আমানতের খেয়ানত করতে দেখেনি। আচার-আচারণ বা লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো অসাধুতা বা অসচ্ছতা পায়নি। তবুও তারা তাদের জাগতিক বিশেষ কিছু স্বার্থের কারণে তার প্রতি ঈমান আনেনি।
আল্লাহ তাআলা যখন তাঁর রাসুলের ওপর অনুগ্রহ করলেন এবং মানুষদেরকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়ার জন্য তাঁকে নবী হিসেবে মনোনীত করলেন, আর তিনি সেই দায়িত্ব পালনের জন্য মানুষদের ডাকতে শুরু করলেন- গোপনে এবং প্রকাশ্যে, তখন তাঁর প্রতি মানুষদের আচরণ একেবারে উল্টে গেল। তাঁরা তার রিসালাতের দাবিকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করল। তাঁর সাথি-সঙ্গীদের নির্যাতন করতে লাগল। এমনকি তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে তাঁকে মক্কা ছাড়তে বাধ্য করল।
তবে এইসব হঠকারিতা, জুলুম-নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের পরও তার শত্রুরাও বিভিন্ন সময়ে তাঁর দাওয়াতের সত্যতার সাক্ষ্য প্রদান করেছে। এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো রোমের সম্রাটের সাথে আবু সুফিয়ান ইবনে হারব রা.-এর কথোপকথন। ঘটনাটি সংঘটিত হয়, যখন আবু সুফিয়ান রা. ছিলেন নবীজির শত্রু। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আবু সুফিয়ান রা. তাকে জানিয়েছেন, তিনি কুরাইশের একটি ব্যবসায়ী দলের সাথে তখন শামে অবস্থান করছিলেন। এ সময় সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাকে ডেকে পাঠাল। এটা সে সময়ের ঘটনা, যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু সুফিয়ান ও কুরাইশের লোকদের সাথে সন্ধিচুক্তিতে (হুদায়বিয়ার সন্ধি) আবদ্ধ হয়েছেন। আবু সুফিয়ান রা. তার সঙ্গীদের নিয়ে ইলইয়াতে (জেরুজালেম) সম্রাটের কাছে উপস্থিত হলেন। হিরাক্লিয়াসের পাশে তখন রোমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপবিষ্ট ছিল। একজন দোভাষীকে ডাকা হলো। সম্রাট জিজ্ঞাসা করল, যে ব্যক্তি নবুয়তের দাবি করছে, এখানে রক্তসম্পর্কে তোমাদের মধ্যে তার সবচেয়ে কাছের মানুষ কে?
আবু সুফিয়ান বলেন, আমি তখন বললাম, এখানে বংশগতভাবে আমি তার সবচেয়ে কাছের মানুষ।
তখন হিরাক্লিয়াস বলল, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আর তার সাথি-সঙ্গীদেরকে তার পেছনে এনে বসাও। এরপর সম্রাট দোভাষীকে বলল, তুমি তাদেরকে বলে দাও, আমি তাকে এই ব্যক্তি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করব, যদি সে মিথ্যা বলে, তাহলে তারা যেন তার মিথ্যা ধরিয়ে দেয়।
আবু সুফিয়ান বলেন, আল্লাহর কসম! যদি লজ্জার আশঙ্কা না থাকত যে, মক্কায় গিয়ে তারা আমার ব্যাপারে মিথ্যা বলার দোষ ছড়াবে, তাহলে আমি তাঁর (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ব্যাপারে কিছু মিথ্যা বলতাম।
এরপর হিরাক্লিয়াস আমাকে প্রশ্ন করল- তোমাদের মধ্যে তাঁর বংশ কেমন?
আমি বললাম, সে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজাত বংশের মানুষ।
সম্রাট বলল, তোমাদের মধ্যে তাঁর পূর্বে কেউ কি এধরনের দাবি করেছিল?
আমি বললাম, না।
সম্রাট বলল, তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে কেউ কি বাদশাহ ছিল?
আমি বললাম, না।
সম্রাট বলল, সমাজের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা তাঁর অনুসরণ করে নাকি দুর্বল ব্যক্তিরা?
অমি বললাম, বরং দুর্বল ব্যক্তিরা তাঁর অনুসরণ করে।
সম্রাট বলল, তাঁর অনুসারীদের সংখ্যা বাড়ছে নাকি কমছে?
আমি বললাম, বরং দিনদিন তাদের সংখ্যা বাড়ছে।
সম্রাট বলল, কেউ কি তাঁর ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর সেই ধর্মের প্রতি বিরক্ত হয়ে ধর্ম ত্যাগ করেছে?
আমি বললাম, না।
সম্রাট বলল, সে এই দাবি করার আগে তোমরা কি কখনো তাকে মিথ্যা বলতে দেখেছ?
আমি বললাম, না।
সম্রাট বলল, সে কি কখনো প্রতারণা করেছে?
আমি বললাম, না। তবে বর্তমানে আমরা তার সাথে একটা চুক্তিতে আবদ্ধ আছি। এই চুক্তিতে সে কী করবে বলা যায় না। (পরে আবু সুফিয়ান রা. বলেন, আমাদের কথোপকথনের মধ্যে তাঁর ব্যাপারে এই কথাটা ছাড়া আমি অন্য কোনো কথা ঢোকানোর সুযোগ পাইনি।)
সম্রাট বলল, তোমরা কি তাঁর সাথে কোনো লড়াই করেছ?
আমি বললাম, হ্যাঁ।
সম্রাট বলল, তোমাদের লড়াইয়ের কী অবস্থা ছিল?
আমি বললাম, যুদ্ধের ব্যাপারাটা আমাদের মাঝে কূপের বালতির মতো অদলবদল হয়ে থাকে। কখনো আমরা বিজয়ী হই আর কখনো তারা বিজয়ী হয়।
সম্রাট বলল, সে তোমাদেরকে কীসের নির্দেশ দিয়ে থাকে?
আমি বললাম, সে বলে, তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত করো। তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না। তোমাদের পূর্বপুরুষেরা যা বলত, সেগুলো বর্জন করো। সে আমাদেরকে নামাজ, সদকা, চারিত্রিক পরিশুদ্ধতা এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার নির্দেশ দেয়।
এরপর বাদশা দোভাষীকে বলল, 'তুমি তাকে বলে দাও, আমি তাকে তাঁর বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তুমি বলেছ, সে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজাত বংশের লোক। নবীগণ এমনই হন। তাদের নিজ সম্প্রদায়ের অভিজাত বংশেই প্রেরণ করা হয়ে থাকে। এরপর জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁর পূর্বে এমন কথা কেউ দাবি করেছে কি না। তুমি বলেছ, না। এ ক্ষেত্রে আমি বলি, যদি তাঁর পূর্বে কেউ এমন কথা বলে থাকত, তাহলে বলতাম, সে এমন ব্যক্তি, যে তাঁর পূর্বের লোকের অনুসরণে এমন দাবি করে বসেছে। এরপর আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ বাদশাহ ছিল কি না। তুমি বলেছ, না। আমি বলি, যদি তাঁর পূর্বপুরুষদের কেউ বাদশাহ থাকত, তাহলে বলতাম, সে এমন ব্যক্তি, যে হারানো বাদশাহি পুনরুদ্ধার করতে চায়। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তোমরা তাঁর এই দাবির পূর্বে তাঁকে কোনো মিথ্যা বলতে দেখেছ কি না। তুমি বলেছ, না। আমি জানি, যে মানুষদের ব্যাপারে মিথ্যা বলে না, সে কখনো আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা বলতে পারে না। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সমাজের সম্ভ্রান্ত লোকেরা তাঁর অনুসরণ করে নাকি দুর্বল ব্যক্তিরা। তুমি বলেছ, দুর্বল ব্যক্তিরা। নবীদের অনুসারীরা এমনই হয়। আমি আরও জিজ্ঞাসা করেছিলাম, অনুসারীদের সংখ্যা বাড়ছে নাকি কমছে। তুমি বলেছ, বাড়ছে। ঈমানের ব্যাপারটা এমনই হয়, তা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তা পূর্ণতায় পৌঁছে যায়। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁর ধর্ম গ্রহণ করার পর কেউ সেই ধর্মের প্রতি বিরক্ত হয়ে ধর্ম ত্যাগ করে কি না। তুমি বলেছ, না। হ্যাঁ, ঈমানের অবস্থা এমনই হয়ে থাকে। যখন ঈমানের স্বাদ অন্তরে পৌঁছে যায় (কেউ সেটা ছেড়ে আসতে পারে না)। আমি আরও জিজ্ঞাসা করেছি, সে কখনো গাদ্দারি বা প্রতারণা করে কি না। তুমি বলেছ, না। রাসুলগণ এমনই হয়, তারা গাদ্দারি বা প্রতারণা করে না। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, সে তোমাদের কীসের নির্দেশ দেয়। তুমি বলেছ, সে তোমাদের নির্দেশ দেয় এক আল্লাহর ইবাদত করার। তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করার। সে তোমাদের নিষেধ করে মূর্তির ইবাদত করতে। তোমাদের নির্দেশ দেয় নামাজ, সদকাহ, চারিত্রিক পরিশুদ্ধতার...। তুমি যা বলেছ, তা যদি আসলেই সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সে অচিরেই আমার এই দু-পায়ের স্থানটুকুও অধিকার করে নেবে। আমি আগে থেকেই জানতাম তাঁর আগমন ঘটবে, তবে ধারণা করিনি যে সে তোমাদের মধ্য থেকে হবে। যদি আমার বিশ্বাস থাকত, আমি তাঁর নিকট পৌঁছতে পারব, তাহলে আমি সকল কষ্ট উপেক্ষা করে তাঁর কাছে গিয়ে উপস্থিত হতাম! আমি যদি তাঁর কাছে থাকতাম, তাহলে আমি তাঁর পদযুগল ধুয়ে দিতাম!...। (৪৯৬)
এই দীর্ঘ বর্ণনাতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ, আবু সুফিয়ান এখানে যা-কিছু বলেছেন, তা সবই বাস্তব ও সত্য ছিল। আবু সুফিয়ান দীর্ঘদিন ধরে এগুলো নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁর সাথে ওঠাবসা করেছেন। কোনো মাধ্যম ছাড়া নিজের বিবেকবুদ্ধি ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে সবকিছু অনুভব করেছেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামসময়িক শত্রুদের মধ্যে আবু সুফিয়ান বিন হারব অথবা বিশাল রাজত্বের অধিকারী হিরাক্লিয়াস, যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল যুদ্ধ করেছে, শুধু এরা দুজনই যে তাঁর নবুয়তের সত্যতার ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করেছে এমন নয়; বরং অন্য আরও অনেক শত্রুই সাক্ষ্য প্রদান করেছে, শত্রুতা পোষণে যারা এই দুজন থেকে কোনো অংশেই কম ছিল না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অপছন্দ করা, তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, তাঁকে হত্যা করতে চাওয়া, এমনকি মানুষের মাঝ থেকে তাঁর নামনিশানা মুছে দিতে চাওয়া ইত্যাদি শত্রুতামূলক কাজে যাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রবর্তী মনে করা হতো, সে হলো আবু জাহেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তাঁর বিরোধিতা ও শত্রুতা ছিল সর্বোচ্চ। বদর যুদ্ধের সময় সেই মূলত মুসলমান ও কাফেরদের মাঝে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তার অহংকার- অহমিকাই তাকে টেনে এনেছিল ধ্বংস ও মরণের মুখে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই কঠিনতম শত্রুও তাঁর সত্যতা ও নবুয়তের সাক্ষ্য দিয়েছে। আবু জাহেল ছিল হজরত মিসওয়ার ইবনে মাখরমা রা.-এর মামা। তিনি একদিন তার মামা আবু জাহেলকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে বললেন, মামা! মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে দাবি করছেন, এই দাবির আগে তোমরা কি তাঁকে মিথ্যুক বলতে?'
উত্তরে আবু জাহেল বলল, 'ভাগনে! আল্লাহর কসম! যৌবনে আমাদের মাঝে মুহাম্মাদের অবস্থা এমন ছিল যে, তাঁর সততার কারণে তাঁকে 'আল- আমিন' বলে ডাকা হতো। আমরা কখনোই তাঁকে মিথ্যা বলতে দেখিনি।' তখন মিসওয়ার ইবনে মাখরমা জিজ্ঞাসা করলেন, 'তাহলে আপনারা কেন তাঁকে অনুসরণ করেন না?'
আবু জাহেল তখন তাকে বলল, 'ভাগনে! আমরা আর বনু হাশেমের লোকেরা পরস্পর বিভিন্ন সম্মানজনক কাজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতাম। তারা অভাবীদের খাবার খাইয়েছে, আমরাও খাইয়েছি। তারা হাজিদের পানি পান করিয়েছে, আমরাও করিয়েছি। তারা অসহায়-দুস্থকে আশ্রয় দিয়েছে, আমরাও দিয়েছি...। এমনকি আমরা কোনো জনসমাগমে উপস্থিত হলে আমাদের উভয় পক্ষকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হতো। এরপর তারা যখন বলল, আমাদের মাঝে একজন নবী আছে! এখন আমরা কীভাবে এই শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করব?'
এ ছাড়া আবু জাহেলের আরও একটি ঘটনা রয়েছে। বদরযুদ্ধের দিন আখনাস ইবনে শুরাইক আবু জাহেলকে জিজ্ঞাসা করে বলেছিল, হে আবুল হাকাম! মুহাম্মাদ সম্পর্কে আমাকে বলো, সে সত্যবাদী নাকি মিথ্যাবাদী? (ভয় নেই) এখানে আমি আর তুমি ছাড়া অন্য কোনো কুরাইশি নেই যে আমাদের কথা শুনে ফেলবে!'
তখন আবু জাহেল বলল, 'ধ্বংস তোমার। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ অবশ্যই সত্যবাদী, মুহাম্মাদ কখনো মিথ্যা কথা বলেনি। কিন্তু বনু কুসাই একাই যদি হজের পতাকা, কাবার রক্ষণাবেক্ষণ, হাজিদের পানি পান করানো, আবার শেষমেশ নবুয়তের শ্রেষ্ঠত্বও নিয়ে যায়, তাহলে কুরাইশের অন্য গোত্রগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার আর থাকে কী?'(৪৯৭)
ইসলামি দাওয়াতের সবচেয়ে প্রধান ও প্রথম শত্রু আবু জাহেলের উপর্যুক্ত সাক্ষ্য দুটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। অর্থাৎ আবু জাহেল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এ কারণে শত্রুতা করেনি যে, তার দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন মিথ্যাবাদী কিংবা ভণ্ড; বরং তার শত্রুতার কারণ ছিল তার তুচ্ছ গোত্রপ্রীতি। এটাই নবীজির নবুয়তের স্বীকৃতি প্রদানকে আবু জাহেলের নিকট খুব কঠিন ও জটিল করে তুলেছিল। কারণ, তাঁকে নবী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করাটা বনু হাশেমের মর্যাদার পাল্লাকে কুরাইশের অন্য সকলের জন্য ভারী করে দিচ্ছিল। আর এ ব্যাপারটাই আবু জাহেল মেনে নিতে পারেনি। তাই সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহ্বানকে সত্য জেনেও সেটাকে অস্বীকার করেছে।
এভাবে শুধু আবু জাহেল নয়; বরং কুরাইশের সকল গোত্রই স্বীকার করেছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন সত্যবাদী এবং বিশ্বস্ত। এটা এমন এক বৈশিষ্ট্য যা সাধারণত অন্য কারও ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। বড় একটি সম্প্রদায়, যার অধিবাসীদের মধ্যে সামাজিক ও ব্যক্তিগত বিষয়াবলি নিয়ে বহু মতবিরোধ, মতানৈক্য ও বিভেদ রয়েছে, তারা সকলেই সমাজের একজন ব্যক্তির আমানতদারি ও বিশ্বস্ততার ওপর একমত হয়ে যাবে, এটা কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু এমন কল্পনাই বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষেত্রে।
নবুয়তের প্রথম দিকে, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকালয় থেকে বের হয়ে সাফা পাহাড়ের কাছে এলেন। পাহাড়ে উঠলেন এবং یا صباحاه বা 'সকালবেলার বিপদ থেকে সাবধান' বলে চারদিকে আওয়াজ দিলেন। আহ্বান শুনে সকল মানুষ যখন তাঁর কাছে একত্রিত হলো, তিনি তাদের বললেন, 'আমি যদি বলি, একটি ঘোড়সওয়ার বাহিনী এই পাহাড়ের পাদদেশ থেকে তোমাদের ওপর আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে, তাহলে তোমরা কি আমার কথা সত্য মনে করবে?' তারা সকলেই তখন উত্তরে বলল, 'হ্যাঁ...। আমরা তোমাকে কখনো মিথ্যা বলতে দেখিনি।'
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমি তোমাদের সতর্ক করছি ভবিষ্যতের কঠিনতম শাস্তির (পরকালের শাস্তির)।'
তখন আবু লাহাব বলে উঠল, 'তোমার জন্য ধ্বংস, তুমি কি আমাদের এজন্যই এখানে একত্রিত করেছ?' (৪৯৮)
অর্থাৎ কুরাইশের সকলেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যবাদিতার স্বীকৃতি প্রদান করল। কিন্তু যখনই তিনি তাদের সামনে আল্লাহপ্রদত্ত তাঁর প্রকৃত দাওয়াত ও আহ্বান পেশ করলেন, তখনই তারা তাদের পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে চলে গেল, নবীজির কথা অমান্য করল, পূর্বপুরুষের অন্ধ অনুকরণে এবং নিজেদের গোত্রমর্যাদা, ব্যবসাবাণিজ্য ও সম্পদ খোয়ানোর আশঙ্কা করে।
এই ঘটনা ছাড়াও, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কুরাইশের আরও বহু ঘটনা রয়েছে, যেগুলো নবীজির সত্যবাদিতার পক্ষে কুরাইশদের স্বীকৃতির প্রমাণ বহন করে। সেইসাথে এগুলো তাঁর দাওয়াত ও নবুয়তের স্বীকৃতিরও প্রমাণ বহন করে।
এভাবে, অনেক ইহুদি নেতাও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতাকে স্বীকার করত। যেমন বর্ণনা করেছেন উম্মুল মুমিনিন হজরত সাফিয়া রা.। তিনি ছিলেন বনু কুরাইজার ইহুদিদের নেতা হুওয়াই বিন আখতাবের কন্যা। তিনি বলেন, আমি ছিলাম আমার পিতা ও চাচা আবু ইয়াসিরের কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আমি যদি কখনো তাদের কোনো সন্তানের সাথে একত্রে থাকতাম আর তারা আমাদের কাছে আসতেন, তাহলে তারা সবার আগে আমাকেই কোলে তুলে নিতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করলেন এবং ‘কুবা’-তে বনু আমর বিন আউফের নিকট অবস্থান গ্রহণ করলেন, তখন আমার পিতা হুওয়াই বিন আখতাব ও আমার চাচা আবু ইয়াসির খুব সকালে রাতের অন্ধকার বাকি থাকতেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে চলে গেলেন। সারাদিন তারা তাঁর কাছে অবস্থান করে, একদম সূর্যাস্তের আগ মুহূর্তে, সন্ধ্যায় ফিরে এলেন। সাফিয়া রা. বলেন, তারা ফিরে এলেন খুবই ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে। চিন্তার ভারে যেন নুইয়ে পড়ছেন। তাদের হাঁটার গতি ছিল খুবই মন্থর।
সাফিয়া রা. বলেন, আমি বরাবরের মতো খুব উৎফুল্লতার সাথে তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু তারা দুজনের একজনও আমার দিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না। তারা ছিলেন গভীর চিন্তায় মগ্ন। এ সময় চাচা আমার পিতাকে বললেন, আচ্ছা, ‘ইনিই কি তিনি?’ (অর্থাৎ সেই নবী।)
পিতা বললেন, ‘আল্লাহর কসম! ইনিই তিনি।’
চাচা আবার বললেন, ‘তুমি কি তাঁকে চিনতে পারছ? তাঁর ব্যাপারটা নিশ্চিত হতে পারছ?’
আমার পিতা বললেন, ‘হ্যাঁ।’
চাচা বললেন, ‘তাহলে এখন তাঁর ব্যাপারে তোমার কী সিদ্ধান্ত?’
পিতা বললেন, 'আল্লাহর কসম! তবুও আজীবন আমি তাঁর শত্রুতা করে যাব!' (৪৯৯)
চমৎকার হয়, আমরা যদি আমাদের এই আলোচনার পরিসমাপ্তি টানি নাজরানের খ্রিষ্টান কর্তৃক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে নবুয়তের স্বীকৃতি প্রদানের মুবাহালা(৫০০) সংক্রান্ত ঘটনার মাধ্যমে। সেই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে কুরআনুল কারিমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে,
فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ
তোমার কাছে (ঈসা আলাইহিস সালামের ঘটনা সম্পর্কে) যে প্রকৃত জ্ঞান এসেছে, তারপরও যারা এ বিষয়ে তোমার সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হয়, (তাদেরকে) বলে দাও, এসো, ডাকি আমরা আমাদের সন্তানদেরকে এবং তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে, আমরা আমাদের নারীদেরকে এবং তোমরা তোমাদের নারীদেরকে, আর আমাদের নিজ লোকদেরকে, এবং তোমাদের নিজ লোকদেরকে তারপর আমরা সকলে মিলে (আল্লাহর সামনে) কাকুতিমিনতি করি এবং যারা মিথ্যাবাদী, তাদের প্রতি আল্লাহর লানত পাঠাই। [সুরা আলে ইমরান: ৬১]
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এই নির্দেশ পেয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের (নাজরানের খ্রিষ্টানদের) মুবাহালার প্রতি আহ্বান জানান। এজন্য তিনি হজরত আলি, হাসান, হুসাইন এবং ফাতেমা রা.-কে সঙ্গে নিয়ে নাজরানের খ্রিষ্টানদের নিকট গমন করেন এবং তাদের মুবাহালার প্রতি আহ্বান করেন। তখন প্রতি-উত্তরে তারা বলল, 'হে আবুল কাসেম, আমাদের একটু সময় দাও। আমরা আমাদের ব্যাপারটা নিয়ে একটু শলা-পরামর্শ করি। এরপর তুমি আমাদের যে বিষয়ে আহ্বান করছ, সে বিষয়ে কী করব সেটা ঠিক করে তোমার সামনে উপস্থিত হবো।'
এ বলে তারা চলে গেল। এরপর তারা 'আকেব' নামের এক ব্যক্তির সাথে একান্তে মিলিত হলো। সে ছিল তাদের মূল সিদ্ধান্ত প্রদানকারী। তারা বলল, 'হে মাসিহের গোলাম, এ বিষয়ে তুমি কী মনে করো?'
আকেব তাদেরকে বলল, 'হে খ্রিষ্টধর্মের অনুসারীরা, তোমরা জানো যে, মুহাম্মাদ একজন সত্যনবী। তিনি তোমাদের কাছে তোমাদের নবীর বিষয়ে চূড়ান্ত ও সঠিক সিদ্ধান্তই এনেছেন। আর তোমরা এ কথাও জানো, কোনো সম্প্রদায় যদি নবীর সাথে মুবাহালায় লিপ্ত হয়, তাহলে তাদের বড়দের কেউ জীবিত থাকে না। আর ছোটদেরও কেউ বড় হয়ে ওঠে না।
অতএব, তোমরা যদি এই মুবাহালা করতে যাও, তাহলে তা হবে তোমাদের সমূলে ধ্বংস হওয়ার কারণ। সুতরাং তোমরা যদি তোমাদের ধর্মের ওপরই অটল থাকতে চাও এবং তোমাদের নবীর ব্যাপারে তোমাদের যে চিন্তা-চেতনা, সেটাই লালন করতে চাও, তাহলে মুহাম্মাদকে বিদায় জানিয়ে তোমরা তোমাদের এলাকায় ফিরে যাও। (৫০১)

টিকাঃ
৪৯৬. সহিহ বুখারি: ৭, সহিহ মুসলিম: ১৭৭৩।
৪৯৭. ইবনুল কাইয়িম : হিদায়াতুল হায়ারা : ৫০, ৫১।
৪৯৮. সহিহ বুখারি: ৪৭৭০, ৪৮০১; সহিহ মুসলিম: ২০৮।
৪৯৯. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৫১৭।
৫০০. মুবাহালা (المباهلة): শব্দটির অর্থ একে অপরকে অভিশাপ দেওয়া। পরিভাষায় মুবাহালা হলো, দুটি পক্ষ যদি পরস্পরবিরোধী দাবি করে এবং নিজেদের বক্তব্যকেই সঠিক বলে মনে করে এবং অপর পক্ষের বক্তব্যকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে, তখন তারা প্রকাশ্যে সবার সামনে এসে এই বলে গজব কামনা করবে যে, হে আল্লাহ, আপনি আমাদের মাঝে মিথ্যাবাদীর ওপর অভিশাপ আরোপ করুন। তখন দু-পক্ষই আমিন আমিন বলবে। ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, মিথ্যাবাদীদের সাথে মুবাহালা করা একটি সুন্নত পদ্ধতি।-অনুবাদক
৫০১. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৫৮৪।

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 সুবিবেচক পশ্চিমাদের সাক্ষ্য

📄 সুবিবেচক পশ্চিমাদের সাক্ষ্য


পশ্চিমাবিশ্বের অনেকেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে সঠিক মন্তব্য করেছেন। তাদের এই সঠিকতার মূল উৎস হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিত নিয়ে তাদের গবেষণাধর্মী ব্যাপক অনুসন্ধান ও বিস্তৃত অধ্যয়ন। আর এই অধ্যয়ন ও অনুসন্ধান পূর্ণতা পেয়েছে আধুনিক কিছু বৈজ্ঞানিক রীতিনীতি, সূত্র ও পদ্ধতির মাধ্যমে, যেগুলোতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ, বাস্তব পরীক্ষানিরীক্ষা এবং অনুসন্ধানের যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। অবশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তাদের এই গবেষণাগুলোতে ইতিবাচক ফলই প্রকাশ পেয়েছে এবং তারা তাঁর সততা, সঠিকতা ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। আর তাদের এই স্বীকারোক্তি ও সাক্ষ্যসমূহ জ্ঞানজগতে স্বতন্ত্র প্রদীপ হয়ে আলো বিকিরণ করছে, যার মাধ্যমে পশ্চিমের অনেক সত্যানুসন্ধানী মানুষ সঠিক পথের দিশা পাচ্ছে।
যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে ন্যায়পূর্ণ সঠিক মন্তব্য করেছেন, তাদের মধ্যে একজন হলেন ফ্রান্সের কবি ল্যামার্টিন (Alphonse de Lamartine)। (৫০২) তিনি বলেছেন, তোমরা কি মনে করো মুহাম্মাদ ধোঁকাবাজ, প্রতারক, ভণ্ড বা মিথ্যুক? কিছুতেই না। আমরা তাঁর ইতিহাস পড়েছি। তাঁর জীবনচরিত নিয়ে দীর্ঘ অধ্যয়ন করেছি, সেগুলো কখনো তাঁর এমন পরিচয় প্রদান করে না। বরং ধোঁকা, প্রতারণা, ভণ্ডামি ও মিথ্যাচারিতার দোষে সে ব্যক্তিই দোষী হবে, যে এগুলো মুহাম্মাদের ওপর চাপাতে চায়। (৫০৩)
থমাস কার্লাইল (৫০৪) বলেছেন, আমরা কখনোই মুহাম্মাদকে মিথ্যুক বা প্রতারক মনে করি না। কারণ, তিনি কখনো তাঁর নানাবিধ কলাকৌশল ও উপায়-উপকরণ ব্যবহার করে বিশেষ কোনো স্বার্থ হাসিল করতে চাননি। অথবা এগুলোর মাধ্যমে তিনি কোনো রাজত্ব বা বাদশাহি করার আকাঙ্ক্ষা করেননি কিংবা তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট দুনিয়ার কোনো বিষয়-আশয় অর্জন করতে ইচ্ছা করেননি। তিনি বরং যে বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তা ছিল দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট ও সঠিক। তাঁর আহ্বান ছিল একজন সত্যবাদীর আহ্বান, যা এসেছিল অজানা এক জগৎ থেকে। মুহাম্মাদ কখনোই মিথ্যুক ও প্রতারক ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক টুকরো প্রাণসদৃশ, তা থেকে বিদীর্ণ হয়ে বেরিয়ে এসেছে প্রকৃতির প্রাণ। এরপর হঠাৎ তা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে সমগ্র বিশ্বকে করে তুলেছে আলোকিত, উদ্ভাসিত। (৫০৫)
সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ লি বোন (৫০৬) বলেছেন, আমি তোমাদের নতুন কোনো মন্দ বিষয়ের দিকে আহ্বান করছি না, কিংবা আহ্বান করছি না নিন্দনীয় কোনো ভ্রষ্টতার দিকে। আমি বরং আহ্বান করছি এক আরবীয় ধর্মের প্রতি, যা আল্লাহ তাঁর রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ওহি হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। এরপর তিনি পূর্ণ বিশ্বস্ততার সাথে সেই ঐশী ধর্মের আহ্বান ছড়িয়ে দিলেন এমন সম্প্রদায়ের মাঝে, যারা মূর্তি ও পাথরের উপাসনায় লিপ্ত ছিল। মূর্খতার যুগের বিভিন্ন তুচ্ছ ও মন্দ কাজের মধ্যেই যারা তৃপ্তি অনুভব করত। তারা ছিল বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত, তিনি এসে তাদের এক ও ঐক্যবদ্ধ করেছেন। তাদের বিশ্বাস ও মতাদর্শ ছিল বিভ্রান্ত ও বিক্ষিপ্ত, তিনি এসে সেগুলোকে সংশোধন ও সুসংহত করেছেন। সৃষ্টির পূজা থেকে তিনি তাদের দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তার ইবাদতের দিকে। এ কারণে গভীরতম ভালোবাসা, বংশের আভিজাত্য, নেতৃত্বের সফলতা এবং খোদাপ্রদত্ত নবুয়তের দিক থেকে তিনিই ছিলেন জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। দেখো, এই হলেন মুহাম্মাদ, যার ধর্মকে আজ ৪০০ মিলিয়ন (চল্লিশ কোটি...) (৫০৭) মুসলমান সাদরে বরণ করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তারা বসবাস করছে। অথচ তারা সকলেই (যে ভাষারই হোক) আরবি ভাষার আসমানি গ্রন্থ 'কুরআন' পাঠ করছে। (৫০৮)
গুস্তাভ লি বোন অন্যত্র বলেছেন, অতএব, যে রাসুল এমন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, সকলের জন্য উচিত হবে তাঁর রিসালাতের অনুসরণ করা এবং অতি দ্রুত তাঁর আহ্বানে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া প্রদান করা। কারণ, এটা এক মহান আহ্বান। এর মূলকথা হলো স্রষ্টার পরিচয় অর্জন করা। ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করা। মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। বরং এ ধর্মের সকল কিছুই কল্যাণ ও পরিশুদ্ধির দিকে ধাবিত করে। সকল বিশ্বাসীর কাঙ্ক্ষিত পথই হলো কল্যাণকামিতা। আর আমি সমগ্র খ্রিষ্টজগৎকে এ দিকেই আহ্বান করছি। (৫০৯)
ব্রিটিশ চিন্তাবিদ, লেনপুলও (৫১০) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি নিজের মুগ্ধতা গোপন রাখতে পারেননি। তাই তিনি কোনো রাখঢাক ছাড়াই বলেছেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহু চারিত্রিক মাধুর্যের অধিকারী ছিলেন। যেমন, কোমলতা, সাহসিকতা, উদার চরিত্র...। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্যকারী ও এ সকল চারিত্রিক মাধুর্যে মুগ্ধ হবে এবং তাঁর ব্যাপারে সব ধরনের বিরূপ মন্তব্য প্রবৃত্তি ও পক্ষপাতদুষ্ট হবে। আর এটা হবেই-না বা কেন! তিনি অনেকগুলো বছর নিজ গোত্র ও নিকটাত্মীয়দের শত্রুতা সহ্য করেছেন। হাজার নির্যাতনেও অঢেলধৈর্য ও বিরাট সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁর মহানুভবতা এমন পর্যায়ের ছিল যে, কেউ তাঁর সাথে মুসাফাহা করলে সে ব্যক্তি নিজে হাত টেনে না নেওয়া পর্যন্ত তিনি নিজের হাত টেনে নিতেন না, মুসাফাহাকারী কোনো শিশু হলেও। একদিনের জন্যও কখনো এমন হয়নি যে, তিনি কোনো দলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছেন আর তাদের সালাম প্রদান করেননি, চাই সেটা বড়দের দল হোক অথবা ছোটদের। তাঁর দুটি ঠোঁটে সর্বদা মিষ্টি-মুচকি হাসি লেগে থাকত। শুধু তাঁর মুখের মধুর আওয়াজই যথেষ্ট ছিল শ্রোতাদের বিমোহিত করতে এবং তাদের অন্তরাত্মাকে আকৃষ্ট করতে। (৫১১)
ইংরেজ সাহিত্যিক জর্জ বার্নার্ড শ (৫১২) বলেন, আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অধ্যয়ন করেছি এক অতি আশ্চর্য মানুষ হিসেবে। আমার মতে তিনি অ্যান্টি-ক্রাইস্ট বা ঈসা আলাইহিস সালামের বিরোধী তো ননই; বরং তাকে মানবতার ত্রাণকর্তা বলাই কর্তব্য। (৫১৩) বর্তমান ইউরোপের লোকেরা একত্ববাদের প্রতি বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়ছে। কখনো এর থেকে আরেকটু অগ্রসর হয়ে তাদের এমন বিশ্বাসও জন্মাচ্ছে যে, এই বিশ্বাসই পারে ইউরোপীয় সকল সমস্যার সমাধান করতে। তোমাদের কর্তব্য হবে, এই মানসিকতা নিয়েই আমার ভাবনা-উপলব্ধিগুলো বুঝতে চেষ্টা করা। (৫১৪)
বিখ্যাত ইংরেজ প্রাচ্যবিদ উইলিয়াম ম্যুর (৫১৫) বলেছেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ কিছু মহান বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল দ্ব্যর্থহীন, স্পষ্ট। তাঁর প্রচারিত ধর্মও ছিল সহজ ও সাবলীল। তিনি এমন কিছু কাজ সম্পন্ন করে দেখিয়েছেন, যা জ্ঞানীদেরকেও বিস্মিত করে। পৃথিবীর ইতিহাস তাঁর মতো এমন কোনো সমাজসংস্কারক দেখেনি, এত অল্প সময়ের মধ্যে যিনি মানুষের অন্তরকে এভাবে জাগিয়ে তুলেছেন, উত্তম গুণাবলির মাধ্যমে তাদের মাঝে প্রাণসঞ্চার করেছেন এবং চারিত্রিক উৎকর্ষে সমুন্নত করেছেন। (৫১৬)
এভাবে তাঁর প্রশংসাযোগ্য যে গুণের কথাই বলি না কেন এবং প্রশংসাকারী সে ব্যাপারে যতটুকু তাঁর প্রশংসা করতে সক্ষম, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন তারও অনেক ঊর্ধ্বে। যে ব্যক্তিই গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাঁর মহান জীবনাচার অধ্যয়ন করেছেন, তিনি এ সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত হয়েছেন। তাঁর এ মহান জীবনাচার তাঁর স্থানকে বিশ্বের অন্যান্য রাসুল, চিন্তাবিদ, দার্শনিকদের মধ্যে সর্বাগ্রে এনে দিয়েছে। (৫১৭)
বিখ্যাত আমেরিকান প্রাচ্যবিদ ওয়াশিংটন আরভিং (৫১৮) বলেন, রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের পরবর্তী দিনগুলোতেও মানুষের প্রতি যে সদাচার দেখিয়েছেন, তা সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, তিনি ছিলেন আল্লাহপ্রেরিত একজন নবী ও রাসুল, নিছক কোনো নেতা ও বিজয়ী নন। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেও মক্কাবাসীর প্রতি তিনি দয়া, অনুগ্রহ ও সহানুভূতিই প্রদর্শন করেছেন। নিজের সফলতা ও বিজয়কে তিনি ক্ষমা ও দয়ার স্বর্ণমুকুট পরিয়েছেন। (৫১৯)
স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু (৫২০) বলেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য ধর্মপ্রবর্তকের মতো বহু কুপ্রথা ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করেছিলেন, যেগুলো তাঁর যুগে প্রচলিত ছিল। তিনি যে ধর্মের প্রতি আহ্বান করতেন, তা পালন করা ছিল অতি সহজ। নীতিমালা ছিল সুস্পষ্ট। এটি আদেশ করত পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও উঁচু-নিচুর ভেদাভেদহীনতার। এ কারণে এই ধর্ম আশপাশের অঞ্চলগুলোতে ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে তারা বিভিন্ন স্বৈরাচারী নিষ্ঠুর শাসকদের হাতে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল। পুরাতন প্রথার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল তাই নতুন ও জুলুমহীন বিধানের প্রতি তারা আগ্রহী হয়ে ওঠেছিল। ঠিক এই সময়ে ইসলামের আগমন ছিল তাদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। কারণ, ইসলামই তাদের বহু দুরবস্থা দূর করে এবং জুলুম অত্যাচারের ভয়ংকর পরিস্থিতি থেকে তাদেরকে উদ্ধার করে। (৫২১)
বেলজিয়ামের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক জর্জ সার্টন (৫২২) বলেন, মোটকথা... তাঁর আগের কিংবা পরের কোনো নবীকে এ পরিমাণ বিজয় ও সফলতা প্রদান করা হয়নি, যে পরিমাণ দেওয়া হয়েছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। (৫২৩)
উল্লিখিত এই সাক্ষ্যগুলোতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের কিছু দিক প্রকাশিত হয়েছে, যে মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা স্বীকার করেছেন তাঁর সঙ্গে চলাফেরা করা সকলেই। এমনকি যারা (সত্যান্বেষী হয়ে) তাঁর জীবনচরিত অধ্যয়ন করেছেন, তারাও। আর এই মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বই প্রমাণ করে, তিনি ছিলেন আসমানি রিসালাতের বার্তাবাহী সর্বশেষ নবী ও রাসুল, যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল পুরো মানবজাতির যাপিতজীবনের সংস্কার ও সংশোধন।

টিকাঃ
৫০২. আলফনস ডি ল্যামার্টিন: Alphonse de Lamartine (১৭৯০-১৮৬৯ খ্রি.)। একজন ফরাসি লেখক, কবি এবং রাজনীতিবিদ। অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। জীবনের একটি বড় অংশ অতিবাহিত করেছেন তুরস্কের ইজমির শহরে। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রচনা হলো, তাআম্মুলাতুন শিরিয়‍্যাহ, রিহলাতুন ইলাশ শারক。
৫০৩. আলফনস ডি ল্যামার্টিন: ইবনে হিশাম: আস-সাফারু ইলাশ শারক : ৮৪।
৫০৪. থমাস কার্লাইল-Thomas Carlyle (১৭৯৫-১৮৮১ খ্রি.) : স্কটিশ লেখক। তীক্ষ্ণ সমালোচক। ঐতিহাসিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রচনা হলো, আবতাল (এর মধ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে একটি অসাধারণ অধ্যায় রয়েছে। এটার আরবি অনুবাদ করেছেন উসতাজ আলি আদহাম), আস-সাওরাতুল ফারানসিয়্যা। দেখুন, নাজিব আকিকি: আল-মুসতাশরিকুন: ২/৫৩।
৫০৫. থমাস কার্লাইল-Thomas Carlyle: আবতাল: ৫৮-৬০।
৫০৬. গুস্তাভ লি বোন-Gustave Le Bon (১৮৪১-১৯৩১ খ্রি.): একজন ফরাসি প্রাচ্যবিদ। তিনি সমাজ ও মনোবিদ্যা সম্পর্কে প্রচুর গবেষণা করেছেন। তার বিখ্যাত রচনা হলো, হাজারাতুল আরাব সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে ইসলামি আরব সভ্যতার ন্যায়-নীতি বিষয়ক আলোচনাধর্মী মৌলিক গ্রন্থগুলোর একটি। দেখুন, আহমাদ হামেদ: আল-ইসলাম ওয়ার-রাসুল ফি ফিকরি হা-উলা: ৫৯-৬১।
৫০৭. এখন ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, বর্তমানে পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় ৭৫৫ কোটি, যার মধ্যে مسلمانوں সংখ্যা প্রায় ১৯০ কোটি।-অনুবাদক
৫০৮. প্রাগুক্ত।
৫০৯. গুস্তাভ লি বোন : হাজারাতুল আরব: ৬৭।
৫১০. লেনপুল-Lane Poole (১৮৫৩-১৯১৭ খ্রি.): একজন ইংরেজ দার্শনিক। তিনি ১৮৯৭ সালে প্রাচীন মুদ্রাগুলোর তালিকা প্রস্তুত করেন। সেটা মিশরের দারুল কুতুবিল মিসরিয়‍্যাতে এখনো সংরক্ষিত আছে। তার উল্লেখযোগ্য রচনা হলো, রিসালাতুন ফি তারিখিল আরাব।
৫১১. লেনপুল: রিসালাতুন ফি তারিখিল আরাব। তথ্যসূত্র: আফিফ আবদুল ফাত্তাহ তাব্বারা: রুহুদ্দিনিলি ইসলামি: ৪৩৮。
৫১২. জর্জ বার্নার্ড শ-George Bernard Show (১৮৫৬-১৯৫০ খ্রি.): একজন বিখ্যাত ইংরেজ লেখক ও ঔপন্যাসিক। ১৯২৫ সালে সাহিত্যে অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী নিয়ে তাকে একটি নাটক লেখার প্রস্তাব করা হয়েছিল, কিন্তু রাসুলের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। (যারা মানুষের সামনে ইসলামকে বিকৃত ও খারাপভাবে উপস্থাপন করতে চায়, তাদের জন্য এর মাঝে রয়েছে উত্তম এক দৃষ্টান্ত।) অধিক তথ্যের জন্য দেখুন, আহমাদ হামেদ: আল-ইসলাম ওয়ার-রাসুল ফি ফিকরি হা-উলা: ১৩-১৫।
৫১৩. ড. মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহর লিখিত 'কিতাবে ও পরধর্ম গ্রন্থে নবী করীম (সঃ)' তে আছে, আমি বিশ্বাস করি যদি তাঁর মতো কোনো ব্যক্তি আধুনিক জগতের একনায়কত্ব আচরণ করতেন তবে তিনি এর সমস্যাগুলো এরূপভাবে সমাধান করতে পারতেন যাতে বহু আকাঙ্ক্ষিত শান্তি ও সুখ আনতে সমর্থ হতেন। আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি মুহাম্মাদের ধর্ম আগামী দিনে পূর্ণ স্বীকৃতি লাভ করবে যেমন আজকের ইউরোপ তাকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে...।)
৫১৪. আল-হুসাইনি মাআদি: আর-রাসুল ফি উয়ুনি গারবিয়্যাতিন মুনসিফাহ: ৭০।
৫১৫. ইউলিয়াম ম্যুর-William Muir (১৮১৯-১৯০৫ খ্রি.): একজন বিখ্যাত ইংরেজ ঐতিহাসিক এবং প্রাচ্যবিদ (পূর্বে তার পরিচয় প্রদান করা হয়েছে)।
৫১৬. ইউলিয়াম ম্যুর: হায়াতু মুহাম্মাদ: ৩১।
৫১৭. ইউলিয়াম ম্যুর: হায়াতু মুহাম্মাদ: ২০।
৫১৮. ওয়াশিংটন আরভিং-Washington Irving (১৭৮৩-১৮৫৯ খ্রি.): একজন আমেরিকান প্রাচ্যবিদ ও ঐতিহাসিক। অনেক গুরুত্বের সাথে ইসলাম বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তার কয়েকটি বিখ্যাত রচনা হলো, ফাতহু গারনাতাহ, হায়াতু মুহাম্মাদ। সূত্র: নাজিব আকিকি: আল-মুসতাশরিকুন: ৩/১৩১।
৫১৯. ওয়াশিংটন আরভিং: হায়াতু মুহাম্মাদ: ৭২।
৫২০. জওহরলাল নেহেরু-Jawaharlal Nehru (১৮৮৯-১৯৬৪ খ্রি.): ভারতের স্বাধীনতা-আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট নেতা। বিভক্ত ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। সমাজতন্ত্র এবং সাম্যতার পক্ষে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অন্য অনেক নেতার মতো হিন্দুত্ববাদের প্রতি কঠোর অনুরাগী বা উগ্রবাদী ছিলেন না।
৫২১. জওহরলাল নেহেরু লামাহাত মিন তারিখিল আলাম: ২৯। (জওহরলাল নেহেরু এটা ইংরেজিতে লিখেছিলেন, যার নাম, Glimpses of world history। এটার বাংলাও করা হয়েছে, যার নাম: বিশ্ব ইতিহাস প্রসঙ্গ।-অনুবাদক
৫২২. জর্জ সার্টন-George Sarton (১৮৮৪-১৯৫৬ খ্রি.): মূল নিবাস বেলজিয়াম। প্রকৃতিবিদ্যা এবং অঙ্কশাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ১৯৩১-১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে আরবিভাষা শিক্ষাগ্রহণ করেন। মনুষ্যচেতনায় আরবের শ্রেষ্ঠত্ববিষয়ক অনেক ভাষণ ও বক্তৃতা দিয়েছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মাদখাল ইলা তারিখিল ইলমি। সূত্র: নাজিব আকিকি: আল-মুসতাশরিকুন: ৩/১৪৭, ১৪৮।
৫২৩. জর্জ সার্টন: আস-সাকাফাতুল গারবিয়্যা ফি রিআয়াতিশ শারকিল আওসাত: ২৮-৩০।

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 বাস্তবতার সাক্ষ্য

📄 বাস্তবতার সাক্ষ্য


অতীত বা বর্তমান সকল যুগের বাস্তবতা এটাই যে, অন্য ধর্মগুলোর চেয়ে ইসলামধর্মই পৃথিবীতে সবচেয়ে দ্রুত প্রসার লাভ করছে। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেছিলেন। সে সময় খুব অল্পসংখ্যক মানুষই ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর বহু দিন, বহু বছর কেটে গেছে, আজ সেই স্বল্প সংখ্যক মানুষের ইসলাম এখন পৌঁছে গেছে পৃথিবীর সকল প্রান্তে।
ইতিহাস তার অকাট্য সততা নিয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছে, ক্রমান্বয়ে এই ধর্ম অতি দ্রুত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে এবং পৃথিবীর বহু জাতি-গোষ্ঠী এর প্রতি ঈমান আনছে, চাই সে জাতি বাহ্যিক কোনো যুদ্ধে বিজয়ী হোক অথবা পরাজিত। এটা এমন এক বিস্ময়কর বিষয়, যা পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবীদের বিচলিত করে ছাড়ে। অর্থাৎ মুসলিমরা কোথাও বাহ্যিকভাবে পরাজিত হলেও ইসলাম সকল স্থানেই বিজয়ী হচ্ছে। এই যে তাতারদের ইসলামগ্রহণ, এটা তো খুব দূরের কোনো ঘটনা নয়। তারা মুসলমান-অধ্যুষিত এলাকায় প্রবেশ করেছিল মুসলমানদের চিরতরে নির্মূল ও নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ৬৮৫ হিজরিতে (১২৬০ খ্রিষ্টাব্দে) 'আইনে জালুত'-এর ময়দানে যখন তাদের পরাজয় ঘটল, তখন তারা বাধ্য হলো এ ধর্মের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যাবলি নিয়ে ভাবতে। খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতে এ কারণে তাদের অধিকাংশই ইসলামগ্রহণে ধন্য হয়েছে। ফলে, একসময় যারা ছিল ইসলাম ধ্বংসের মূল কারিগর, তারাই আবার ইসলামের সৈনিকে পরিণত হলো। তারাই তখন ইসলামের বাগানকে অত্যাচারীদের কবল থেকে রক্ষা করতে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করল।
অতএব, নির্দ্বিধায় বলা যায়, ইসলামের প্রতি সবচেয়ে বড় আহ্বানকারী ইসলাম নিজেই। কারণ, ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস এবং তার বিধিবিধান এতটাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার যে, সুচিন্তক প্রতিটি মানুষকেই তা আকর্ষণ করে এবং তার ছায়াতলে আশ্রয় নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
তা ছাড়া ইসলাম গ্রহণকারী প্রতিটি ব্যক্তিকেই ইসলাম তার অধিকার প্রদান করে। তার কোনো অধিকার হরণ করে না। কারণ, একজন ব্যক্তি ইসলামের মাধ্যমে তার প্রতিপালকের সাথে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। তাকে পাওয়ার পথ পেয়ে যায়। দিনে অন্তত পাঁচবার তাঁর সামনে দণ্ডায়মান হতে পারে। কোনোরকম অন্তরায় ছাড়া সরাসরি নির্বিঘ্নে তাকে হৃদয়খুলে ডাকতে পারে। এমনইভাবে, ইসলামি বিধান মেনে এই পার্থিব জীবনেও সে সবচেয়ে সুখী, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন একটি জীবনযাপনের আশা করতে পারে। মৃত্যুপরবর্তী জীবনে স্থায়ী শান্তির জায়গা জান্নাত কামনা করতে পারে। আর এ মহান প্রাপ্তির জন্য ইসলাম শুধু তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ব্যাপারে সাক্ষ্যপ্রদান এবং শরিয়তের বিধান অনুসরণের কথা বলে। এ ছাড়া তার সক্ষমতার বাইরে তার ওপর অন্য কিছু চাপিয়ে দেয় না।
আপনি যদি পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে একটু দৃষ্টি দেন এবং ইসলামের সম্প্রসারণ নিয়ে একটু চিন্তাভাবনা করেন, নিঃসন্দেহে আপনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবেন। (মানচিত্র নং-৩)
আপনার এই বিস্ময়-বিমুগ্ধতা বাড়তেই থাকবে, যখন আপনার সামনে স্পষ্ট হবে যে, ইসলাম তার প্রতিটি অনুসারীর অন্তরে পরিপূর্ণভাবে স্থান করে নিয়েছে। অথচ এগুলোর জন্য নেই নিয়মতান্ত্রিক কোনো সৈন্যবাহিনী অথবা প্রচলিত নিয়মের কোনো রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা। এসব ব্যবস্থাপনা ছাড়াই ক্রমে তার অনুসারীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
আল্লাহ তাআলা ইসলামকে মেনে নেওয়া মানবমনের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। ফলে ইসলামের সত্যবাণী কারও কর্ণপাত হলে ঈমান ও ইসলাম তার হৃদয়কে আন্দোলিত করে। আর এভাবে সত্যের प्रति যখন একবার বিশ্বাস জন্মে যায়, তখন তা হৃদয় থেকে বের করার সকল পথই ব্যর্থ প্রমাণিত হয়। (৫২৪)
[মানচিত্র নং-৩ বিশ্বে मुसलमानों হার]
ইসলামকে মেনে নেওয়া মানবমনের জন্য সহজতর হওয়ার কারণ হয়তো তার স্পষ্টতা ও সততা। এ কারণে পশ্চিমা বিশ্বের বহু পণ্ডিত ব্যক্তি ইসলামের স্বভাবজাত এইসব বৈশিষ্ট্যে প্রচণ্ড মুগ্ধ হয়েছেন। এমনকি ফ্রান্সের প্রসিদ্ধ ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ লি বোন ইসলামের সহজতা সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন,
ইসলামের নীতিমালার মতো এত সুস্পষ্ট ও জটিলতাহীন কোনো মতবাদ বা মতাদর্শ পৃথিবীতে নেই। এই নীতিমালাতে একজন উপাস্যের কথা বলা হয়েছে। সেই উপাস্যের সামনে সকল মানুষ সমান। সাথে এমন কিছু অত্যাবশ্যক কাজের কথা বলা হয়েছে, যারা তা পালন করে চলবে, তারা জান্নাতে যাবে। আর যারা সেগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। আপনার যদি একজন অতি সাধারণ মুসলমানের সাথেও দেখা হয়, তবুও দেখবেন, নিজের আবশ্যক বিশ্বাসের বিষয়াবলি সম্পর্কে সে সম্পূর্ণ অবগত। সে আপনার নিকট ইসলামের মৌলিক নীতিমালাগুলো অল্প কথায় খুব সহজে ব্যক্ত করতে সক্ষম। অথচ এ ব্যাপারটাতে খ্রিষ্টানরা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। কারণ, সাধারণ একজন খ্রিষ্টান ত্রিত্ববাদ, রূপান্তর, দেহান্তর ও অন্যান্য দুর্বোধ্য বিষয়াবলি সম্পর্কে কিছুই বলতে সক্ষম হবে না, যদি না সে খ্রিষ্টধর্মের এমন বড় কোনো ধর্মীয় জ্ঞাণী হয়, যার তর্কশাস্ত্র সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি রয়েছে।
এ ছাড়া, মানুষের প্রতি ইসলামের ন্যায়পরতা ও কল্যাণের সুস্পষ্ট নির্দেশনাও বিশ্বব্যাপী তার প্রচার-প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। (৫২৫)
আজকের এই জনবহুল বিশ্বের দিকে দৃষ্টি প্রদান করলে আমরা দেখতে পাব, পুরো পৃথিবীতে (৪২০০) চার হাজার দুইশরও অধিক ধর্ম প্রচলিত রয়েছে। (৫২৬) কিন্তু বিভিন্ন জরিপ এ তথ্য দিচ্ছে যে, এসব ধর্মের মধ্যে ইসলামধর্মই সবচেয়ে বেশি প্রসারতা লাভ করছে। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের জরিপে দেখা গেছে, পৃথিবীতে তখন مسلمانوں সংখ্যা ছিল ১২.৪% আর খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ছিল ২৬.৯%। এরপর ১৯৮০ সালে পৃথিবীতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ১৬.৫% আর খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ছিল ৩০%। ২০০০ সালে এসে মুসলমানদের সংখ্যা বেড়ে হয়ে গেল ১৯.২% আর খ্রিষ্টানদের সংখ্যা নেমে এলো ২৯.৯%-এ। (৫২৭)
স্বয়ং খ্রিষ্টীয় বিশ্বকোষের (World Christian Encyclopedia) সর্বশেষ নতুন সংস্করণেও সংখ্যানুপাতের এই তারতম্য স্বীকার করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সারা পৃথিবীতে বসবাসকারীদের সামষ্টিক হিসেবে গত শতাব্দীতে মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধির হার ৭%, যেখানে খ্রিষ্টানদের জনসংখ্যার হার ধীরে ধীরে স্বল্পতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
এ ছাড়াও বলা হয়েছে, সারা পৃথিবীতে বসবাসকারীদের সামষ্টিক সংখ্যা হিসেবে মুসলমানগণের সংখ্যা বেড়ে ১৯.৬%-এ উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ मुसलमानों সংখ্যা দাঁড়িয়েছে (১.৩ বিলিয়ন) ১.৩ শ কোটির কাছাকাছি। (৫২৮)
তা ছাড়া পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষকগণ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, ২০২৫ সালে বিশ্বের মুসলমানদের সংখ্যা বেড়ে মোট জনসংখ্যার ৩০%-এ উন্নীত হবে। আর খ্রিষ্টানদের সংখ্যা নেমে ২৫%-এ চলে আসবে। এ সকল পরিসংখ্যানের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, প্রতি বছর গড়ে مسلمانوں সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ২.৯% হারে আর পৃথিবীতে এটাই সবচেয়ে উঁচু হার। (৫২৯)
আমরা যদি পশ্চিমাবিশ্বের কিছু দেশ, যেমন ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন আমেরিকাসহ অনন্য দেশগুলোর দিকে দৃষ্টি দিই, তাহলে সব জায়গাতে একই চিত্র দেখতে পাব। সারা বিশ্বে ইসলামের প্রতি মানুষের এই অগ্রসরতা ও मुसलमानों ক্রমবৃদ্ধির হার প্রমাণ করে, ইসলাম হলো মানুষের স্বভাবজাত ও প্রাকৃতিক ধর্ম। মন ও মানসিকতার সাথে ইসলাম এতটাই সামঞ্জস্যশীল যে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের যে-কেউ ইসলামের প্রকৃত রূপরেখা সম্পর্কে অবগত হবে, শ্রদ্ধা ও ভক্তির সাথে সে কেবল ইসলামধর্মকেই গ্রহণ করে নেবে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি জরিপে উঠে এসেছে, ফ্রান্সে প্রতি বছর গড়ে ৩৬০০ জন ব্যক্তি ইসলামগ্রহণ করে থাকে। (৫৩০)
এদিকে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাকুলিন স্মিথ বলেন, যুক্তরাজ্যে বর্তমানে (২০০৭ সাল) مسلمانوں সংখ্যা পৌঁছেছে ২ মিলিয়নে (বিশ লক্ষ)। অথচ ২০০১ সালে তাদের সংখ্যা ছিল ১.৬ মিলিয়ন (ষোলো লক্ষ)। সাত বছরেরও কম সময়ে مسلمانوں সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৪০ লক্ষ।
দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা বলছে, مسلمانوں এই নতুন পরিসংখ্যান ইসলামের মর্যাদা ও মহত্ত্বকেই প্রমাণ করে। পৃথিবীতে (জনসংখ্যার হিসাবে) খ্রিষ্টধর্মের পরে এটাকেই সবচেয়ে বৃহৎ ধর্ম হিসেবে দেখা হয়। কারণ, বর্তমান ব্রিটেনের সামষ্টিক জনসংখ্যা অনুপাতে মুসলমান হলো ৩.৩%। তবে এটা স্পষ্ট যে, বর্তমানে ব্রিটেনে যে ধর্মটি সবচেয়ে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে, সেটা হলো ইসলাম। (৫৩১)
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ইউনিভার্সিটির সমাজ গবেষণাকেন্দ্র থেকে প্রকাশিত নতুন জরিপ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য ধর্মের চেয়ে ইসলামধর্মই সবচেয়ে দ্রুত মানুষের মাঝে প্রসার লাভ করছে। আমেরিকাতে মসজিদের সংখ্যা ১২০৯ ছাড়িয়ে গেছে, যার অর্ধেকেরও বেশি স্থাপিত হয়েছে গত দশ বছরের মধ্যে। এভাবে গত দশ বছরের মধ্যে যারা নিজ ধর্ম ছেড়ে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছেন, তাদের হারও ১৭% থেকে ৩০%-এর মাঝে ওঠানামা করছে। (৫৩২)
আর জার্মানিতে ৩.৩ মিলিয়ন (তেত্রিশ লক্ষ)-এরও অধিক মুসলমান বসবাস করে। জার্মানির অধিবাসীদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪% হলো মুসলমান। সেখানে মসজিদ বা নামাজের স্থানের সংখ্যা ৩০০০-এর কাছাকাছি। (৫৩৩)
এভাবে বেলজিয়ামের লিবার বেলজিক পত্রিকা একটি ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বলেছে, আগামী বিশ বছর পর ব্রাসেলস (যাকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অফিসিয়াল রাজধানী হিসেবে গণ্য করা হয়)-এর অধিবাসীদের মধ্যে মুসলমানরা হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর এই অনুমান সঠিক হওয়ার একটা স্পষ্ট দলিলও আছে, তা হলো ২০০১ সালের পর থেকে ব্রাসেলসে নতুন প্রজন্মের মধ্যে 'মুহাম্মাদ' নামের প্রচলনটা তুলনামূলক সবচেয়ে বেশি।
একইভাবে রাশিয়ান সংবাদপত্র Rossiyskaya Gazeta উল্লেখ করেছে, ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দশ বছরে বেলজিয়ামে مسلمانوں সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে ২০০৫ সালে এসে সেখানে مسلمانوں সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লক্ষ ৫০ হাজার। উক্ত সালে এই দেশের মোট জনসংখ্যাই যেখানে ১০ মিলিয়ন বা ১ কোটি। (৫৩৪)
এই হলো মহান ইসলাম। এভাবেই ইসলাম তার গতিময়তা ও নিজের শক্তিতে যুগে যুগে মানুষের মাঝে প্রসার লাভ করেছে। এর কারণ একটাই, ইসলাম স্বভাবজাত নিরঙ্কুশ ধর্ম। অতএব, আমাদের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতা প্রমাণে এই স্বভাবজাত ধর্ম কতই-না চমৎকার একটি প্রমাণ! ইতিপূর্বে আমরা তাঁর নবুয়তের সত্যতা ও রিসালাতের পূর্ণতার ওপর যেসব স্পষ্ট প্রমাণ উল্লেখ করেছি, এ সকল আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা এখন পরিতৃপ্তির সাথেই বলতে পারি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্ববাসীর জন্য এমন এক পূর্ণাঙ্গ ঐশী বার্তা এনেছেন, যা পূর্ণ হয়ে আছে পারস্পরিক ভালোবাসা, সাহায্য, সহযোগিতা এবং সমূহ কল্যাণে।
সুন্দর হয়, আমরা যদি আমাদের এই আলোচনা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই হাদিসের মাধ্যমে সমাপ্ত করি, যাতে তিনি পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ইসলাম প্রবেশের সুসংবাদ প্রদান করেছেন। তিনি বলেন,
«لَيَبْلُغَنَّ هَذَا الْأَمْرُ مَا بَلَغَ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ وَلَا يَتْرُكُ اللَّهُ بَيْتَ مَدَرٍ وَلَا وَمَرٍ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللَّهُ هَذَا الدِّينَ بِعِزَّ عَزِيزٍ أَوْ بِذُلُّ ذَلِيلٍ عِزًّا يُعِزُّ اللَّهُ بِهِ الْإِسْلَامَ وَذُلَّا يُذِلُّ اللَّهُ بِهِ الْكُفْرَ»
এই ধর্ম একসময় সেইসব স্থান পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, যেখানে রাত হয় কিংবা দিনের আগমন ঘটে। কাঁচা ইট বা পশমের কোনো ঘর (শহর ও গ্রাম), কোনোটিই বাকি থাকবে না, যেখানে আল্লাহ তাআলা এই ধর্মকে পৌঁছে দেবেন না। আর তাতে সম্মানিতরা সম্মানিত হবে ও অসম্মানিতরা অসম্মানিত হবে। সম্মানিতকে আল্লাহ তাআলা ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করবেন আর অসম্মানিতকে আল্লাহ তাআলা কুফরির মাধ্যমে লাঞ্ছিত করবেন। (৫৩৫)
***

টিকাঃ
*২৪. হুসাইন মুনিস: আল-ইসলামুল ফাজਿਹ: ২০-২৪।
৫২৫. গুস্তাভ লি বোন: হাজারাতুল আরব : ১২৫。
৫২৬. ওয়েবসাইট: www.adherents.com
৫২৭. Sato Tsugitaka, Muslim Societies, Routledge, UK, 2004.
৫২৮. ভিজিট করুন ইসলামিক সংবাদ সংস্থার ওয়েবসাইট: www.islmicnews.net এবং আরবি সংবাদপত্র 'আশ-শারকুল আওসাত'-এর ওয়েবসাইট: www.asharqalawsat.com
৫২৯. Sato Tsugitaka, Muslim Societies, Routledge, UK, 2004.
*৫৩০. ইসলাম টাইম-এর ওয়েবসাইট : www.islamtime.net
*৫৩১. ইসলাম টাইম-এর ওয়েবসাইট : www.islamtime.net
*৫৩২. লিওয়াউশ শরিয়া-এর ওয়েবসাইট : www.shareah.com
*৫৩৩. জার্মান সাময়িকীর ওয়েবসাইট : www.magazine-deutschland.de
** রাশিয়ান সংবাদ সংস্থা নভোস্টি-এর ওয়েবসাইট: http://ar.rian.ru/analytics
***. মুসনাদে আহমাদ: ১৬৯৯৮, মুসতাদরাকে হাকেম: ৮৩২৬。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00