📄 প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে নবীজি ﷺ-এর ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী
কুরআনুল কারিম জানিয়েছে আল্লাহ তাআলা প্রতিটি জাতির জন্য একজন নবী বা বার্তাবাহক পাঠিয়েছেন। যিনি নিজের সম্প্রদায়কে আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের দিকে আহ্বান করেছেন। সৎকাজের সুসংবাদ শুনিয়েছেন, অসৎ কাজের জন্য ভীতি প্রদর্শন করেছেন, যাতে কিয়ামতের দিন তাদের বিরুদ্ধে কোনো অজুহাত দাঁড় করানো না যায়। সেইসাথে এসব জাতি ও সম্প্রদায় তাদের নবীদের মাধ্যমে সর্বশেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন সম্পর্কে যেন অবগত ও নিশ্চিত হতে পারে। এ বিষয়টি কুরআনুল কারিম আমাদের জানিয়েছে এইভাবে, আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِنَّهُ لَفِي زُبُرِ الْأَوَّلِينَ
পূর্ববর্তী (আসমানি) কিতাবসমূহেও এর (অর্থাৎ এই কুরআনের ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) উল্লেখ রয়েছে। [সুরা শুআরা: ১৯৬]
ইমাম কুরতুবি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, অর্থাৎ নিশ্চয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোচনা পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। (৪৪০)
এটা ঠিক যে, প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থাবলির খুব কম বিবরণই অবিকৃতভাবে আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। তবুও যতটুকু এসেছে, তাতেও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর রিসালাতের অনেক সংবাদ পাওয়া যায়। যেমন ব্রাহ্মণদের নিকট পবিত্র গ্রন্থসমূহের অন্যতম গ্রন্থ 'সামবেদ'-এ আমরা পাই,
আহমাদ তাঁর রবের পক্ষ থেকে জীবনবিধান প্রাপ্ত হবেন। তা থাকবে প্রজ্ঞায় ভরপুর। সেই জীবনবিধান তেমনই আলো থেকে গৃহীত হবে, যেমন আলো গৃহীত হয় সূর্য থেকে। (৪৪১)
হিন্দুদের আরেকটি ধর্মীয় গ্রন্থ হলো 'অথর্ববেদ'। সেখানে মানবজাতিকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে,
হে মানবজাতি, মনোযোগ দিয়ে শোনো ও মনে রাখো! মুহাম্মাদকে পাঠানো হবে মানবজাতির কাছে। তাঁর মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের স্তুতি গাওয়া হবে সবখানে, এমনকি স্বর্গেও। স্বর্গও তাঁর অনুগত হবে। আর তাঁর নাম হবে মাহামেদ। (অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।) (৪৪২)
হিন্দুধর্মের তৃতীয় আরেকটি গ্রন্থ হলো 'ভবিষ্য পুরাণ'। সেখানে লিখিত আছে,
ওই সময় এক ভিনদেশিকে নিজের সাথি-সঙ্গীসহ প্রেরণ করা হবে। তাঁর নাম হবে 'মাহামেদ', আর উপাধি হবে 'বিশ্বগুরু বা জগতের শিক্ষক'。(৪৩) সৃষ্টিকর্তা তাঁকে পাঁচটি পবিত্রকারী বিষয় (আমল) দিয়ে পবিত্র করবেন। (৪৪৪)
নিঃসন্দেহে বলা যায়, সেই পবিত্রকারী পাঁচটি আমল হলো, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। এর মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা বান্দার গুনাহ মোচন করে তাকে পবিত্র করেন।
'ভবিষ্য পুরাণ'-এ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিদের গুণাবলিও বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে,
তারা খাতনা করবে। তারা মাথার পেছনে টিকি রেখে লম্বা করবে না বরং তারা লম্বা করবে মুখের দাড়ি। উঁচু আওয়াজে মানুষদের প্রার্থনার (নামাজের) দিকে আহ্বান করবে। তারা শূকর ছাড়া অধিকাংশ প্রাণী আহার করবে। পবিত্রতার জন্য ‘দারবা’ (৪৪৫) ব্যবহার করবে না। তাদের শহিদগণ হবেন পবিত্র। তাদের বলা হবে ‘মুসলি’ (অর্থাৎ মুসলমান)। কারণ, তারা সেইসব লোকের বিরুদ্ধে লড়াই করবে, যারা সত্যকে মিথ্যার সাথে গুলিয়ে দিতে চায়। তাদের এই ধর্ম আসবে আমার থেকে। আর আমিই সৃষ্টিকর্তা। (৪৪৬)
একদল হিন্দু গবেষক এসব ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে গবেষণা করেছেন। বিভিন্ন বেদ ও ধর্মীয় গ্রন্থের এইসব শ্লোক নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। অবশেষে তারা দেখেছেন, এগুলোতে মূলত নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথাই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এমনকি তাঁর দাওয়াত ও রিসালাতের বহু বিবরণও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে অনেক হিন্দু পণ্ডিত ও বিজ্ঞজন নিজেদের ধর্মগ্রন্থে উক্ত এই অসাধারণ ব্যক্তি সম্পর্কে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থগুলোতে নবীজির যেসব গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর আলোকে তারা তাঁকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন।
যেমন হিন্দুধর্মীয় প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে তাঁকে বলা হয়েছে ‘নরাশংস’। ‘নরাশংস’ একটি সংস্কৃত শব্দ। শব্দটি মূলত দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। প্রথমটি হলো। ‘নর’ অর্থ মানুষ। যে বেদগুলোতে সাধারণত কখনো ‘মানুষ’ শব্দকে প্রশংসার স্থানে ব্যবহার করা হয় না, সেখানে এই ব্যবহারটি খুবই বিস্ময়কর।
আর শব্দটির দ্বিতীয় অংশ হলো ‘আশংস’। এর অর্থ হলো, অধিক প্রশংসিত ব্যক্তি। অতএব ‘নরাশংস’ শব্দটি আরবি ‘মুহাম্মাদ’ শব্দের হুবহু প্রতিশব্দ। কারণ, ‘মুহাম্মাদ’ অর্থ অধিক প্রশংসিত।
তা ছাড়া বেদগুলোতে শুধু যে নবীজির নাম এসেছে এমন নয়, বরং তাঁর সাথে তাঁর বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির এমন বিস্তারিত বিবরণও এসেছে, যা সব ধরনের মতপার্থক্যের অবসান ঘটাতে সক্ষম। এমন সুস্পষ্ট সুসংবাদও এসেছে, যেখানে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভিন্ন অন্য কেউ উদ্দিষ্ট হওয়ার সামান্যতম সম্ভাবনাও নেই।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ও বিস্তারিত বিবরণ এসেছে ‘অথর্ববেদ’-এ। অথর্ববেদের বিশতম অধ্যায়ের একশ সাতাশতম পরিচ্ছেদে। এ ছাড়াও হিন্দুদের ধর্মীয়গ্রন্থের বহু বেদ ও পুরাণে এই বিবরণগুলোর বহু মন্ত্র ও শ্লোক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। (৪৪৭) নিচে সেইসব শ্লোক ও মন্ত্রের কিছু অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো :
১. হে মানবজাতি, সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে শোনো! ‘নরাশংসের’ প্রশংসা করা হবে। তার স্তুতি গাওয়া হবে। আর আমরা ওই দেশত্যাগকারীকে (অথবা শান্তির মশালবাহীকে) রক্ষা করব ষাট হাজার নব্বইজন শত্রুর কবল থেকে।
এই শ্লোকের কয়েকটি বিষয় পর্যালোচনা করা যেতে পারে। যথা: এক. এখানে বলা হয়েছে, উক্ত মহামানব মানুষের প্রশংসার পাত্র হবেন। মানুষেরা তাঁর গুণগ্রাহী হবে। এ ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে তিনি বিশেষভাবে এগিয়ে থাকবেন। আর আমরা জানি, জগতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যত প্রশংসা করা হয়েছে এবং হয়, মানব-ইতিহাসের অন্য কারও ক্ষেত্রে তার এক-দশমাংশও করা হয়নি বা হয় না। এ কারণে নবীজির নামই হয়েছে ‘মুহাম্মাদ’ (অধিক প্রশংসিত)। এতএব, নবীগণসহ অন্য সকলের চেয়ে তিনিই প্রশংসাপ্রাপ্তির এই বৈশিষ্ট্যে এগিয়ে রয়েছেন।
দুই. শ্লোকটিতে বলা হচ্ছে, তিনি হবেন স্বদেশত্যাগী বা হিজরতকারী। সকলেরই জানা, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন হিজরতকারী। তিনি মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এসেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, হিজরত ছিল সকল নবীর জীবনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য একটি বড় ঘটনা。
তিন. (যা এই শ্লোকের একটি ব্যতিক্রমধর্মী কথা) এখানে উল্লেখিত মহান ব্যক্তির শত্রুসংখ্যার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে তারা হবে ষাট হাজার নব্বই জন। অনেকেই এ বিষয়টি জরিপ করে দেখেছেন যে, কারা কারা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় তাঁর সাথে শত্রুতা করেছে। তাদের সেই জরিপে এর (শ্লোকে উল্লেখিত ষাট হাজার নব্বই) কাছাকাছি সংখ্যাই উঠে এসেছে। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। (৪৪৮)
২. তিনি উটে আরোহণ করবেন। তাঁর স্ত্রী হবে বারোজন। তিনি সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবেন এবং বাহনের দ্রুততায় আসমান স্পর্শ করবেন। অতঃপর আবার মর্ত্যে নেমে আসবেন।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়ত ও তাঁর আবির্ভাবের সুসংবাদের ক্ষেত্রে এই শ্লোকটি খুবই স্পষ্ট অর্থ বহন করে। কারণ, শ্লোকে উল্লেখিত সকল বৈশিষ্ট্যই নবীজির মধ্যে বিদ্যমান ছিল। যেমন, 'নরাশংস' বা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো সফর বা যুদ্ধযাত্রায় সর্বদা উটে আরোহণ করতেন। সিরাতগ্রন্থগুলোতে এর বহু বিবরণ রয়েছে।
তা ছাড়া এই শ্লোকের দ্বারা এ কথাও বোঝা যায় যে, এই অবতার বা নবীর জন্মস্থল হবে মরু অঞ্চলে। কারণ, উট মরু অঞ্চল ছাড়া অন্য কোথাও সাধারণত পাওয়া যায় না। আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মস্থল মক্কা মরুভূমির দেশ। যা দিগন্তবিস্তৃত বালুকাময় প্রান্তরবেষ্টিত।
এরপর শ্লোকটিতে বলা হয়েছে, 'এই অবতার অবিবাহিত হবেন না। তিনি বিবাহ করবেন। তাঁর বারোজন স্ত্রী হবে।' মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরও স্ত্রীর সংখ্যা ছিল বারো। (যারা রায়হানা বিনতে যায়েদ রা.-কে তাঁর স্ত্রী বলে গণ্য করেছেন, তাদের মতানুসারে।) এই বৈশিষ্ট্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্য কোনো নবী বা অবতারের মধ্যে পাওয়া যায় না। (৪৪৯)
ভারত উপমহাদেশের সংস্কৃত ভাষার একজন বড় পণ্ডিত হলেন বেদ প্রকাশ উপাধ্যায়। তিনি তার রচিত নরাশংস ও অন্তিম ঋষি নামক গ্রন্থের ১৪ নং পৃষ্ঠায় উক্ত শ্লোকের দ্বিতীয় অংশের অর্থ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি এর অর্থ করেছেন, 'তাঁর স্ত্রী হবে বারোজন'। এই অর্থ ছাড়া ভিন্ন কোনো অর্থ হওয়ার সম্ভাবনার কথা তিনি বলেননি。(৪৫০)
উক্ত শ্লোকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইসরা ও মেরাজের দিকেও ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি সেই সফর করেছিলেন 'বোরাক' নামক একটি দ্রুতগামী বাহনে আরোহণ করে। উক্ত বাহন এত দ্রুতগামী ছিল যে, সে তার একেক কদম ফেলত তার দৃষ্টির শেষ সীমায়। উক্ত বাহনে চড়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসমানসমূহ ভ্রমণ করেছেন। তারপর আবার পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন。(৪৫১)
এই শ্লোক দুটিসহ 'নরাশংস' সংশ্লিষ্ট অন্য সকল শ্লোকের বিবরণের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এগুলো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণাবলির সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ! অতএব, হিন্দুধর্মের গ্রন্থগুলোর এসব বর্ণনা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়ত ও রিসালাতের ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রমাণবাক্য। অনেক হিন্দু পণ্ডিতই স্পষ্ট ভাষায় এগুলো বলে গেছেন। এতে তারা বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি।
হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থগুলোতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হওয়া এবং সেগুলোতে তাঁর আগমনের সুসংবাদ থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমাদের বিশ্বাস, মানুষের হাতে রচিত এ গ্রন্থগুলোর উৎসমূল ছিল বিশুদ্ধ, যদিও মানুষের হাতে এসে তা বহু বিকৃতির শিকার হয়েছে। কারণ, এটা বোধগম্য নয় যে, শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নবুয়ত ও রিসালাত অবতীর্ণ হবে আর অন্য সকল জনপদ ও তার অধিবাসীদের ওহি ও রিসালাত থেকে দূরে রাখা হবে! এ ধরনের কাজ থেকে আল্লাহ তাআলা বহু ঊর্ধ্বে। এটা আল্লাহ তাআলার দয়া ও ন্যায়পরতার সাথে সাংঘর্ষিক। কুরআনুল কারিম আমাদের জানিয়েছে যে মানবজাতির প্রতিটি সম্প্রদায়ের মধ্যেই একজন পথপ্রদর্শক এসেছেন। তিনি তাদেরকে সুসংবাদ ও সতর্ক বাণী শোনাতেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِنْ مِنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ
প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই একজন সতর্ককারী গত হয়েছেন। [সুরা ফাতির: ২৪]
অতএব, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার প্রমাণ ও তাঁর আগমনের সুসংবাদের ক্ষেত্রে হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থের এসব শ্লোকগুলো — হিন্দু পণ্ডিতদের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে — উপস্থাপন করা যেতে পারে।
টিকাঃ
৪৪০. ইমাম কুরতুবি: আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন: ১৩/১৩৮।
৪৪১. 'সামবেদ' দ্বিতীয় খণ্ড অনুচ্ছেদ: ৬-৮। তথ্যসূত্র: সফিউর রহমান মুবারকপুরি : وإنك لعلى خلق عظیم : ১/৩৫১
৪৪২. 'অথর্ববেদ' বিশতম খণ্ড। অধ্যায়: ১২৭, অনুচ্ছেদ: ৭০। তথ্যসূত্র: সফিউর রহমান মুবারকপুরি : وإنك لعلى خلق عظیم : ১/৩৫২।
৪৪o. এভাবে ইউহান্নার ইনজিলের মধ্যেও আছে, ইসা মাসিহ এই গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা প্রদান করে গেছেন। তিনি বলেছেন, إن أركون العالم سيأتي -এখানে "أركون বলতে নেতা ও মহান ব্যক্তি। অর্থাৎ সারা বিশ্বের নেতা অচিরেই আসবেন। দেখুন, ইবনে তাইমিয়া: আল-জাওয়াবুস সহিহ: ৫/৩০৪-৩০৫।
৪৪৪. খণ্ড: ২, অধ্যায়: ৩। তৃতীয় শ্লোক এবং তার পরের শ্লোকসমূহ। তথ্যসূত্র : সফিউর রহমান মুবারকপুরি : وإنك لعلى خلق عظیم : ১/৩৫২।
৪৪৫. দারবা (الدرباء) : এক প্রকার উদ্ভিদ। হিন্দুধর্ম মতে পাপমুক্ত হওয়ার জন্য এর দ্বারা মানবদেহের (দূষিত) রক্ত বের করা হয়।-সম্পাদক
৪৪৬. তৃতীয় খণ্ড, তৃতীয় অধ্যায়। শ্লোক: ২৭-২৮। তথ্যসূত্র: সফিউর রহমান মুবারকপুরি: وانك 2/002 : لعلى خلق عظيم
৪৪৮. সফিউর রহমান মুবারকপুরি : وإنك لعلى خلق عظيم : ১/৩৭১।
৪৪৯. সফিউর রহমান মুবারকপুরি: وإنك لعلى خلق عظيم: ১/৩৭১, ৩৭২; ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৪/৬০৫, ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ২/৩৮৮।
৪৫০. তথ্যসূত্র: সফিউর রহমান মুবারকপুরি : وإنك لعلى خلق عظيم : ১/৩৭৪।
৪৫১. সফিউর রহমান মুবারকপুরি : وإنك لعلى خلق عظيم : ১/৩৭৫ ।
📄 তাওরাতে নবীজি ﷺ-এর আগমনের সুসংবাদ
বর্তমান পৃথিবীতে তাওরাতের অনুসারীদের (ইহুদিদের) কাছে 'তাওরাত' নামে যে গ্রন্থগুলো রয়েছে, তাতে এমন বহু দলিল-প্রমাণ ও ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, যেগুলো সুস্পষ্টভাবে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়ত ও রিসালাতের দাবিকে সত্য প্রমাণ করে। তিনিই হলেন সর্বশেষ নবী ও রাসুল এবং তাঁকে জগদ্বাসীর জন্য 'রহমত' হিসেবে পাঠানো হয়েছে। সেইসাথে এইসব বর্ণনা এই কিতাবের ধারক তথা ইহুদিদের কুফরির ওপর স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে, আর মুমিনদের ঈমানকে করে প্রমাণিত।
ইহুদিজাতি তাদের পূর্ণ শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে তাদের কাছে বিদ্যমান আলোকে নির্বাপিত করতে চেয়েছিল। সেই লক্ষ্যে তারা আল্লাহর কিতাব 'তাওরাত'-এর মধ্যে নানাধরনের পরিবর্তন ও বিকৃতিসাধন করেছে। 'তাওরাত' থেকে তারা যে প্রকৃত সত্য মুছে দিয়েছে এবং মূল রূপ বিকৃত করে ফেলেছে, তা হলো, শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবসংক্রান্ত খোদাপ্রদত্ত ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ। কারণ, তারা অন্ধভাবে বিশ্বাস করত তারা ব্যতীত আর কোনো জাতি আল্লাহর সঠিক পথে জগদ্ব্যাপী কাঙ্ক্ষিত বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম নয়। কিন্তু যখন দেখা গেল শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন ঘটেছে হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালামের বংশে, ইসহাক আলাইহিস সালামের বংশ বনি ইসরাইলে নয়, পূর্ব থেকে যেমনটি হয়ে আসছিল, তখন বনি ইসরাইল তথা ইহুদিদের বুকে হিংসার আগুন জ্বলে ওঠে। তারা পূর্ণ শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃত পরিচয় এবং সত্যধর্ম ইসলামকে বিকৃত করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যায়।
তাওরাতের প্রথম পুস্তকের নবম পরিচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে, হাজেরা যখন সারাকে ছেড়ে দূরে চলে এলো, ফিরেশতা তাকে সম্বোধন করে বলল, হে হাজেরা! তুমি কোথা থেকে এসেছ আর কোথায় যাচ্ছ? হাজেরা তখন ফিরেশতাকে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ দিলো। ফিরেশতা তাকে বলল, তুমি ফিরে যাও, আমি তোমাকে অগণন সন্তান ও শস্যাদি প্রদান করব। আর হ্যাঁ... তুমি গর্ভবতী হবে এবং একজন সন্তান জন্ম দেবে, যার নাম হবে ইসমাইল। আল্লাহ তাআলা তোমার কষ্ট-অপমান এবং বিনয়-নম্রতা দেখেছেন। তোমার সন্তান নির্ভীক ও সাহসী হবে। সবার ওপর তার কর্তৃত্ব থাকবে; আর তার প্রতি থাকবে সবার সমর্থন। তার আবাসস্থল হবে অন্য ভাইদের মাঝেই। (৪৫২)
ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, ‘...সকলেরই জানা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে বনু ইসহাকের ওপর বনু ইসমাইলের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। বরং বনু ইসহাকের হাতেই নবুয়ত ও আসমানি গ্রন্থের গুরুদায়িত্ব অর্পিত ছিল। হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের জামানায় তারা ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সাথে মিশরে এসেছিল। সে সময়ও তাদের ওপর বনু ইসমাইলের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। মুসা আলাইহিস সালামকে যখন নবী হিসেবে প্রেরণ করা হয়, তখন তারা তার সঙ্গে মিশর থেকে চলে আসে। তার সাথে থাকাকালীন তারা ছিল দুনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাতি। তাদের ওপর কারোই কোনো ধরনের কর্তৃত্ব ছিল না। এরপর তারা হজরত ইউশা আলাইহিস সালামের সাথে ছিল, হজরত দাউদ আলাইহিস সালামের যুগ ও সুলাইমান আ.-এর রাজত্ব পর্যন্ত। সুলায়মান আলাইহিস সালামকে তো এমন রাজত্ব প্রদান করা হয়েছিল, যা অন্য কাউকে দেওয়া হয়নি। সুতরাং এই সময় পর্যন্তও তাদের ওপর বনু ইসমাইলের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। এরপর আল্লাহ তাআলা প্রেরণ করলেন হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে। কিন্তু বনি ইসহাক বা বনি ইসরাইল তার নবুয়তকে অস্বীকার করে বসল। তাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করল। তাদের এই কুফরি ও মিথ্যাচার তাদের জন্য ধ্বংস ডেকে আনল। তাদের রাজত্ব হাতছাড়া হয়ে গেল। এরপর তারা আর কখনো রাজত্ব ও কর্তৃত্বও প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে তাদের বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত করে দিলেন। তারা রোম, পারস্য ও অন্যান্য জাতির অধীন হয়ে পড়ল। তবুও এই সময় পর্যন্ত তাদের ওপর বনু ইসমাইলের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। এমনকি অন্য কোনো জাতির ওপরও তাদের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। একপর্যায়ে আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসেবে প্রেরণ করলেন। নবুয়তের মহান দায়িত্ব দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করলেন। তাঁর আবির্ভাবের মাধ্যমেই সকল জাতির ওপর বনু ইসমাইলের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো! সারা দুনিয়ার সকল রাজা-বাদশার চেয়ে তারাই প্রতাপশালী হয়ে উঠল। তারা পরাভূত করল রোম, পারস্য, তুর্কি, দায়লামসহ (৪৫৩) বহু রাজ্য ও সম্প্রদায়কে। ইহুদি, খ্রিষ্টান, অগ্নিপূজক ও মূর্তিপূজকদের পরাভূত করল। আর এভাবেই তাওরাতের বক্তব্য, 'সবার ওপর তার কর্তৃত্ব থাকবে'-এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটল। আর এটা এমন এক কর্তৃত্ব, যা চিরকাল স্থায়ী থাকবে।
ইহুদিরা বলে, এটা আমরা অস্বীকার করি না। তবে এটা ছিল তাঁর রাজত্ব ও কর্তৃত্বের সুসংবাদ, তাঁর নবুয়ত ও রিসালাতের সংবাদ নয়।
মুসলমানগণ এর উত্তরে বলেছেন, রাজত্ব দুই ধরনের। ১. এমন রাজত্ব, যার সাথে নবুয়তের কোনো সম্পর্ক থাকে না, বরং অনেক সময় সেটা হয়ে থাকে কর্তৃত্ববাদী ও জালেমের রাজত্ব। ২. এমন রাজত্ব, যা নবুয়তের মাধ্যমে প্রাপ্ত। প্রথম প্রকার রাজত্বের ব্যাপারে কখনোই 'সুসংবাদ' আসতে পারে না। বিশেষ করে রাজ্যের অধিকারী যদি নবুয়ত ও রিসালাতের দাবি করে আর এ দাবিতে সে মিথ্যাবাদী ও ভণ্ড হয়ে থাকে, তাহলে তো সে হবে সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট, মহা পাপাচারী ও কট্টর কাফের। এ ধরনের লোকের রাজ্যপ্রাপ্তির সুসংবাদ আসমানি গ্রন্থে আসতে পারে না। বরং তার অনিষ্টতা থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে সতর্কবার্তা আসবে, যেমনটি এসেছে দাজ্জালের ব্যাপারে। এ ধরনের লোক সানহারেব, (৪৫৪) বুখতেনসর (৪৫৫) এবং আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে মিথ্যারোপকারী অন্যান্য জালেম ও পাপাচারী রাজা-বাদশাদের থেকেও নিকৃষ্ট ও ভয়ংকর। এমন মানুষের খবর কখনো সুসংবাদ হতে পারে না! আর এ ধরনের কারও আগমনে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এবং হাজেরা আলইহাস সালাম আনন্দিতও হতে পারেন না এবং কেউ কখনো এমন লোকের আগমনের সুসংবাদ প্রদান করে না। আর হাজেরা আলাইহাস সালামের বিনয়-নম্রতা ও কষ্ট-অপমানের জন্য এটা কোনো পুরস্কার হতে পারে না! এ ছাড়া, উপরোল্লেখিত বাণীতে দেখা যায়, আল্লাহ তাআলা নিজে বিষয়টা দেখেছেন। এই নবজাতক শিশুকে সম্মানিত ও এক বিশাল জাতির জন্য নির্বাচন করেছেন। কিন্তু অবিশ্বাসীদের কথানুসারে (ইহুদিদের কথা যদি সত্য হয়) পুরস্কারস্বরূপ হাজেরা আলাইহাস সালামকে যেন কটাক্ষ করে বলা হচ্ছে, তোমার পেট থেকে জন্ম নেবে এক জালেম খোদাদ্রোহী বাদশা, যে মানুষের ওপর অন্যায় কর্তৃত্ব খাটাবে। আল্লাহর প্রেমিকদের হত্যা করবে। তাদের স্ত্রী ও সন্তানসন্ততিকে দাস-দাসীতে পরিণত করবে। তাদের সমুদয় সম্পদ আত্মসাৎ করে নেবে। নবীদের ধর্মকে পরিবর্তন করে অধর্মের রাজত্ব কায়েম করবে এবং আল্লাহর ওপর মিথ্যারোপ করবে ইত্যাদি।
সুতরাং যারা এই সুসংবাদকে এ ধরনের মন্দ অর্থে প্রয়োগ করবে, তাদের সে কাজকে আল্লাহর ওপর মিথ্যা অপবাদ ছাড়া আর কীই-বা বলা যেতে পারে! তবে যারা আল্লাহর ক্রোধে দগ্ধ, নবীদের খুনে যাদের হাত রঞ্জিত, মিথ্যাচারিতা যাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য, তাদের থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বহিঃপ্রকাশ আশ্চর্যের কিছু নয়। (৪৫৬)
সময়ের বিবর্তনে তাওরাতের মধ্যে বিভিন্ন বিকৃতিমূলক হস্তক্ষেপ চলা সত্ত্বেও এখনো তাতে এমন কিছু বর্ণনা রয়ে গেছে, যা সুস্পষ্টভাবে শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমনকে প্রমাণ করে, যার সম্পর্কে হজরত মুসা আলাইহিস সালাম সুসংবাদ প্রদান করেছেন। এমনকি তিনি নিজেও তাঁর উম্মত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন!
ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, আমি জাবুরের একটি নুসখায় দেখেছি, যাতে স্পষ্টভাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামসহ তাঁর নবুয়তপ্রাপ্তির কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু আরেকটি নুসখায় দেখেছি, যেখানে ওই কথাগুলো নেই। অতএব, (তারা যেহেতু বিকৃত করেছে) তাই এটা এখন অসম্ভব নয় যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণাবলির কথা হয়তো এক নুসখায় পাওয়া যাবে, অন্য নুসখায় তা পাওয়া যাবে না। (৪৫৭)
আমরা যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের এসব সুস্পষ্ট বিবরণ ও সুসংবাদ নিয়ে আলোচনা করতে চাই তাহলে দেখতে পাব, খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৮ সনে পারস্যের বাদশাহ (সাইরাস)-এর হাতে ব্যাবিলনের পতন হলে বুখতেনসর (নেবুচাদনেজার দ্বিতীয়) খ্যাত ক্যালডিয়ান নেতা কর্তৃক নির্যাতিত ও বন্দী হওয়ার পর ইহুদিরা ফিলিস্তিনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়। তারা পুনরায় বাইতুল মুকাদ্দাস ও মন্দির নির্মাণ করে। নতুন ইবাদতখানার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময় আনন্দের আতিশয্যে তারা চিৎকার করতে থাকে। এই সময়টাতে আল্লাহ তাআলা তাদের মাঝে নবী হিসেবে প্রেরণ করেন হজরত হাজ্জাই (বা হগয়) আলাইহিস সালামকে। (৪৫৮) তিনি তাদের সামনে তখন পাঠ করে শোনান,
আমি অতি সত্বর জাতিসমূহের মধ্যে কম্পন সৃষ্টি করব। অচিরেই সকল জাতির পথপ্রদর্শকরূপে আগমন করবে 'হিমদাহ'। এই ঘরকে আমি সম্মান ও মর্যাদায় ভরে তুলব। এমনটাই ঘোষণা করেছেন ধর্মসেনাদের প্রতিপালক। আমার হাতে রয়েছে সোনা ও রুপার ভান্ডার। এভাবেই বলেছেন ধর্মসেনাদের প্রতিপালক। এ ঘরের শেষ অবস্থার মর্যাদা হবে প্রথম অবস্থার মর্যাদা থেকেও বেশি গৌরবময়। এমনটাই বলেছেন ধর্মসেনাদের প্রতিপালক। এখানে প্রদান করা হবে 'শালম'। এমনটাই ঘোষণা দিয়েছেন ধর্মসেনাদের প্রতিপালক। (৪৫৯)
ইহুদি ও খ্রিষ্টান ভাষ্যকারগণ উল্লিখিত ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যকার 'হিমদাহ' ও 'শালম'-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি দুটিকে খুব গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা মনে করেন 'হিমদাহ' শব্দটি ইহুদিবাদ কিংবা খ্রিষ্টবাদসংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী। সে হিসাবে এখন যদি উক্ত ভবিষ্যদ্বাণীর 'হিমদাহ' ও 'শালম' শব্দদ্বয়কে সাধারণ অর্থ আশা ও শান্তি দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যদ্বাণীটা নিরর্থক হয়ে পড়ে। তাৎপর্যহীন নিছক অস্পষ্ট কিছু আশার বাণী বলে গণ্য হয়। কিন্তু আমরা যদি 'হিমদাহ' দ্বারা একজন মহান মনীষীকে উদ্দেশ্য করি আর 'শালম'-কে ধরি আসমানি ধর্ম ও কার্যকরী শক্তি অর্থে, তাহলে এই ভবিষ্যদ্বাণী অর্থপূর্ণ ও কার্যকর হয়ে ওঠে এবং তখন তা সাব্যস্ত হবে ব্যক্তি 'আহমদ' ও শান্তির ধর্ম 'ইসলাম'-এর ক্ষেত্রে। কারণ, 'হিমদাহ' ও 'শালম' শব্দদুটি সূক্ষ্মভাবে আহমাদ ও ইসলামকেই বোঝায়। (৪৬০)
পাদরি আবদুল আহাদ দাউদ (৪৬১) দৃঢ়তার সাথে বলেন, 'হিমদাহ' ও 'শালম' শব্দদুটির উৎসমূল প্রমাণ করে, তাওরাতের সুসংবাদ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ইসলামধর্মের ব্যাপারেই এসেছে। কারণ, তাওরাতে হিমদাহ-এর যে মূলপাঠ রয়েছে তার শাব্দিক অর্থ হলো, 'অতি সত্বর সকল জাতির জন্য (পথপ্রদর্শক হিসেবে) 'হিমদাহ'-এর আগমন ঘটবে। 'হিমদাহ' শব্দটি প্রাচীন হিব্রু অথবা আর্মেনীয় ভাষা থেকে গৃহীত। এর মূল উচ্চারণ হলো, 'হিমদ' (হিম)। হিমিদও (হিম) পড়া যায়। হিব্রুভাষায় এর অর্থ হলো 'বড় আশা' বা 'কাঙ্ক্ষিত' অথবা এমন ব্যক্তি বা বস্তু যার প্রতি মানুষ আগ্রহবোধ করে। আর আমরা দেখি, আরবি ভাষার حمـد ফেয়েল বা ক্রিয়াবাচক শব্দটিও ওই 'হা-মিম-দাল' (ح م د) মূলধাতু থেকেই গৃহীত। যার অর্থ হলো, অধিক প্রশংসা করা। এভাবেই শব্দটি 'মুহাম্মাদ' সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষেত্রে সত্যায়িত হয়।
তাওরাতে বর্ণিত আরেকটি সুসংবাদ হলো, যা 'যিশাইয়' পুস্তকের বিয়াল্লিশতম পদে এসেছে। বর্ণনাটি হলো,
মরু অঞ্চল ও এর জনপদগুলো আনন্দে উচ্চকিত হয়ে উঠবে, যে অঞ্চলসমূহে বাস করেছে কায়দার। (৪৬২) আর 'সালে' (سلع)-এর অধিবাসীরা পাহাড়ের চূড়া থেকে গীত গাইবে। যাতে জোরে আওয়াজ হয়। প্রতিপালক তাদের সম্মান প্রদান করবেন। এবং উপদ্বীপে তাদেরকে তার (প্রতিপালকের) পবিত্রতা সম্পর্কে অবগত করা হবে। (৪৬৩)
এটা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট বর্ণনা। কারণ, এখানে আরবদেশের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আরবই হলো কায়দার ইবনে ইসমাইলের আবাসভূমি। আর কায়দার ইবনে ইসমাইল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঊর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ। (৪৬৪) এ ছাড়াও এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের দেশ মদিনারও উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়েছে, 'সালে-এর অধিবাসীরা গীত গাইবে।' 'সালে' হলো মদিনার প্রবেশদ্বারে অবস্থিত 'সাল' (سلع) নামক একটি পাহাড়, যা এখন পর্যন্ত এ নামেই পরিচিত। হিব্রু ভাষায় এটাকে 'সালে' বলে। (৪৬৫)
উল্লেখিত বক্তব্যটি আমাদের সামনে অনুসন্ধান ও ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়, কেন ইহুদিরা মদিনা মুনাওয়ারা ও এর আশপাশে এসে বসতি গড়েছিল! কারণ, তাদের এ ব্যাপারে পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে, সর্বশেষ নবী মদিনাতেই বসবাস করবেন। তাওরাতের ভবিষ্যদ্বাণীর আলোকে 'সালে' পাহাড় ছিল এর নিদর্শন। তাদের আশা ছিল, শেষ নবী তাদের মধ্য থেকেই কেউ হবেন। আর তাঁকে তাদের মধ্যেই প্রেরণ করা হবে। ইতিহাসের পাঠকমাত্রই জানেন, তারা অনেক সময় আউস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয়কে শেষ নবীর বিষয়ে ভয় দেখাত, যিনি অচিরেই তাদের মধ্যে আবির্ভূত হবেন এবং তাঁর মাধ্যমে তারা আউস, খাজরাজসহ অন্যদের থেকে নিষ্কৃতি পাবে।
মদিনা ও মদিনার আশপাশে অবস্থানরত ইহুদিরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণাবলি সম্পর্কে জানত। তারা এটাও জানত যে, তাঁর আবির্ভাবের সময় অত্যাসন্ন। ইবনে সাদ রহ. এ বিষয়টি ধারাবাহিক সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। তার বক্তব্য হলো, বনু কুরাইজা, বনু নাজির, ফাদাক ও খায়বারের ইহুদিরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বেই তাঁর বৈশিষ্ট্যাবলি সম্পর্কে অবহিত ছিল। তারা জানত তাঁর হিজরতের স্থান হবে মদিনা। (৪৬৬)
তাওরাত ও বাস্তব ইতিহাসের এইসব বর্ণনা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেষ নবী ও রাসুল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
এই হলো কয়েকটি সুসংবাদের বিবরণ, যেগুলো নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তাওরাতে এসেছে। এখানে এর চেয়ে বেশি আলোচনার সুযোগ নেই। এসব বর্ণনা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার বাণী পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ছিলেন সত্যবাদী।
টিকাঃ
৪৫২. আদিপুস্তক: পদ: ১৬। সূত্র: ইবনুল কাইয়িম: হিদায়াতুল হায়ারা: ১৪৭।
৪৫৩. দায়লাম, তুর্কি কুর্দিদের একটি জনগোষ্ঠী。
৪৫৪. সানহারেব (سنحاريب أو ستحريب) : খ্রিষ্টপূর্ব ৭০৫-৬৮১ সময়কালের আসিরিয়ান সাম্রাজ্যের অত্যাচারী বাদশা। তার সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল পুরো ইরাক, বর্তমান ইসরাইল। বাবেল শহরও তার শাসনাধীন ছিল। তার পিতা সারগোন দ্বিতীয়।-অনুবাদক
৪৫৫. বুখতেনসর: সে বাইতুল মুকাদ্দাস ধ্বংস করেছিল। বুখতেনসর নামের অর্থ প্রতিমার পুত্র। শৈশবে তাকে মূর্তির নিকট কুড়িয়ে পাওয়া যায় এবং তার বাবার পরিচয় জানা যায়নি। এ কারণে তাকে 'বুখতেনসর' বা 'প্রতিমার পুত্র' বলা হতো। সূত্র: লিসানুল আরব: ৫/ ২১০। (আরবি উচ্চারণটি মূলত বুখতেনসসর, তবে প্রচলিত উচ্চারণ বুখতেনসর। তাই সেভাবে রাখা হলো।-সম্পাদক)
৪৫৬. ইবনুল কাইয়িম: হিদায়াতুল হায়ারা ১৪৮-১৪৯।
৪৫৭. ইবনে তাইমিয়া: আল-জাওয়াবুস সহিহ: ৩/৫০, ৫১।
৪৫৮. হজরত হাজ্জাই আলাইহিস সালাম ছিলেন হজরত জাকারিয়া আলাইহিস সালামের সামসময়িক।
৪৫৯. বাইবেল: নবী হগয়ের পুস্তক: ৯/৭-৯।
৪৬০. আবদুল আহাদ দাউদ: মুহাম্মাদুন কামা ওয়ারাদা ফি কিতাবিল ইয়াহুদি ওয়ান-নাসারা: ৩৬-৩৭।
৪৬১. আবদুল আহাদ দাউদ। তিনি খ্রিষ্টান পাদরি ছিলেন। নাম ছিল ডেভিড বেঞ্জামিন ক্যালদানি (David Benjamin Keldani)। ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ক্যালদিয়ার (ইরাকের অন্তর্গত একটি প্রাচীন অঞ্চল) পক্ষ থেকে রোমের একজন পাদরি ছিলেন। ইসলামগ্রহণের পর তার নাম রাখা হয় আবদুল আহাদ দাউদ। তিনি ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে কয়েকটি কিতাব লিখেছেন। যেমন, الانجيل والصليب، محمد في الكتاب المقدس। তার সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার জন্য তারই লেখা محمد كما ورد في كتاب اليهود والنصارى গ্রন্থের ভূমিকা পড়া যেতে পারে।
৪৬২. কায়দার ছিলেন ইসমাইল আলাইহিস সালামের পুত্র।
৪৬৩. যিশাইয়: ৪২/১১।
৪৬৪. ইবনুল কাইয়িম: হিদায়াতুল হায়ারা: ১৫৮।
৪৬৫. ফাজেল সালেহ সামাররায়ি: নুবুওয়াতু মুহাম্মাদ মিনাশ শাক্কি ইলাল ইয়াকিন: ২৫৩।
৪৬৬. মুহাম্মদ ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা : ১/১০৪।
📄 ইনজিলে নবীজি ﷺ-এর আগমনের সুসংবাদ
ইনজিলে সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন সম্পর্কে বহু ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। সেখানে কখনো নবীজির পরিচয়ে বলা হয়েছে 'জগতের শিক্ষক'। কখনো বলা হয়েছে 'ফারাকলিত'। এমনকি ঈসা আলাইহিস সালাম তার রিসালাতের বড় একটা সময় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমনের ভবিষ্যদ্বাণী প্রচারের ক্ষেত্রে ব্যয় করেছেন। কিন্তু ইহুদিদের সাধারণ থেকে শুরু করে বিশেষ ব্যক্তিবর্গ, এমনকি গির্জার ধর্মগুরু ও পাদরিরা পর্যন্ত সকলেই এই বিষয়ে নিজেদের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে খোদাদ্রোহিতায় লিপ্ত হয়েছে। এমনকি তারা হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের রিসালাতেরও বিরোধিতা করেছে। হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামসহ তাদের হেদায়েতের জন্য প্রেরিত অন্য অনেক নবীকে তারা হত্যা করেছে।
এতকিছু সত্ত্বেও ইনজিলের বহু স্থানে সেই মহাসত্যের সাক্ষ্য রয়ে গেছে, যে সত্যের আগমন ঘটবে হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের পরে। সেই মহাসত্যের বাস্তবায়ন হয়েছে হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন ও তাঁর চিরন্তন রিসালাতের মাধ্যমে।
একটি সীমিত সময়ের রিসালাত দিয়ে পাঠানো হয়েছিল হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে। মূলত তার রিসালাত ছিল শুধু ইহুদি বা বনি ইসরাইলের জন্য। তাদেরকে তাদের ভ্রষ্টতা ও বিচ্যুতি থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য। দাউদ আলাইহিস সালামের বংশে আগত 'মাসিহ'-এর ব্যাপারে তাদের ভ্রান্ত ধারণা নিরসনের জন্য। তাদেরকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করার জন্য যে, জমিনের ওপর রাজত্ব আল্লাহর, তারা যার বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে, সেটা দাউদ আলাইহিস সালামের বংশের কোনো ত্রাণকর্তার দ্বারা হবে না, বরং হবে হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালামের বংশ থেকে, নাম হবে 'আহমাদ'। প্রাচীন গ্রিক ভাষার ইনজিলসমূহে বর্ণিত নাম PERIQLYTOS (পেরিক্লিটোস) অনুসারে এটাই সঠিক নাম; PARACLETE (৪৬৭) (প্যারাক্লিট) অনুসারে নয়। পাদরিরা যেমনটা বিকৃতিসাধন করেছে। (৪৬৮)
এই বাস্তবতাকেই কুরআনুল কারিম নিশ্চিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَابِيلَ إِنَّ رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ
ওই সময়ের ঘটনাকে স্মরণ করুন যখন ঈসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, হে ইসরাইলের বংশধর, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট প্রেরিত একজন রাসুল। আমার আগমনের পূর্বে অবতীর্ণ 'তাওরাত'-কে আমি সত্যায়ন করছি এবং আমার পরে আগমনকারী একজন রাসুলের সুসংবাদ দিয়ে যাচ্ছি, যার নাম হবে আহমাদ। [সুরা সফ, ৬]
ইনজিলের বহু স্থানে শেষ নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের সুসংবাদ এসেছে। যেমন ইউহান্নার ইনজিলে (জোহনের বাইবেলে) বর্ণিত হয়েছে,
আমার বিদায়ের আগে 'ফারাকলিত' আসবেন না। তিনি এসে পাপাচারের কারণে জগদ্বাসীকে তিরস্কার করবেন। তিনি নিজের পক্ষ থেকে কিছুই বলবেন না। (রবের পক্ষ থেকে) যা শুনবেন, তা-ই বলবেন। তিনি তোমাদের সাথে কথা বলবেন। ন্যায়পরতার সাথে তোমাদের পরিচালনা করবেন এবং অদৃষ্টের ঘটনাবলি সম্পর্কে সংবাদ দেবেন। (৪৬৯)
গ্রিক শব্দ PERIQLYTOS-এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা এসেছে। কেউ বলেছেন, এর অর্থ সান্ত্বনাদানকারী। কেউ বলেছেন, সাহায্যকারী ও অধিক প্রশংসাকারী। আবার কেউ বলেছেন, শব্দটি আরামাইক (আর্মেনীয়) ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো, অভিশাপ থেকে মুক্তিদাতা। শব্দটি সেই সময় বিশ্বাসীর মাঝে প্রচলিত ছিল। (তারা জানত) শব্দটি শেষ নবী সম্পর্কিত। আবার কারও অভিমত হলো, এটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ। আরবিতে যার অর্থ হয়, আহমাদ বা মুহাম্মাদ। প্রাচীন আরামাইক ভাষার ইনজিলসমূহের মূলপাঠের শব্দ হলো ( খন্দেহ ) 'মাহমাদাহ' এবং (হামিদাহ)। এ দুটি শব্দ আরবি ভাষার 'আহমাদ' ও 'মুহাম্মাদ' শব্দদুটির সাথে হুবহু মিল রাখে। এ কারণে গ্রিক ভাষার 'ফারাকলিত' শব্দের ব্যাখ্যাসমূহের মধ্যে শেষ ব্যাখ্যাকেই শুদ্ধতার অধিক নিকটবর্তী গণ্য করা যেতে পারে। কারণ, আল্লাহ তাআলা ঈসা আলাইহিস সালামের ভাষায় বলেন,
وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ আমার পরে এমন একজন রাসুল আগমনের সুসংবাদ দিচ্ছি, যার নাম হবে আহমাদ। [সুরা সফ: ৬]
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের ব্যাপারে এটি একটি স্পষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ। এর মাধ্যমে এটাও প্রমাণিত হয় যে, কুরআনুল কারিম একটি ঐশী কিতাব। কারণ, PERIQLYTOS-এর অর্থ যে 'আহমাদ', আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওহিপ্রাপ্তি ছাড়া মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষে কিছুতেই সেটা জানা সম্ভব ছিল না। এটা একটি অকাট্য ও চূড়ান্ত দলিল। কারণ, এ গ্রিক শব্দের শাব্দিক অর্থ আরবি 'আহমাদ' ও 'মুহাম্মাদ' শব্দদ্বয়ের সমার্থক। আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, কুরআনুল কারিম ( ইসমে তাফজিল )-এর শব্দ আমদ-কে থেকে পৃথক করে উল্লেখ করেছে। আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই অভিনব 'আহমাদ' নামটি ইতিপূর্বে অন্য কাউকে দেওয়া হয়নি। কোনো গ্রিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে কখনো PERIQLYTOS নাম ব্যবহৃত হয়নি। আবার আরবেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগে কারও নাম 'আহমাদ' ছিল না। এমনই বিস্ময়করভাবে নামটাকে সর্বশেষ নবী ও রাসুলের (যিনি ছিলেন প্রশংসার সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত) জন্যই সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।
অবশ্য এ কথা সত্য যে, গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের একজন প্রসিদ্ধ গ্রিক ব্যক্তি ছিলেন PERIQLYS (পেরিক্লিস) নামে। তবে এর অর্থ 'প্রসিদ্ধ'। 'অধিক প্রসিদ্ধ' নয়। (৪৭০)
ড. আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার (৪৭২) বলেন, আমি একবার ইতালীয় প্রাচ্যবিদ ড. কার্লো নালিনো (Carlo Nallino)-কে(৪৭২) PERIQLYTOS-এর অর্থ জিজ্ঞাসা করলাম।
তিনি বললেন, পাদরিরা বলে এর অর্থ সান্ত্বনাদানকারী।
তখন আমি তাকে বললাম, আমি প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রিধারী ড. কার্লো নালিনোকে প্রশ্ন করেছি, কোনো পাদরিকে জিজ্ঞাসা করিনি!
তখন তিনি বললেন, এর অর্থ হলো, অনেক প্রশংসার অধিকারী।
আমি বললাম, শব্দটা কি আরবি মূলধাতু থেকে 'ইসমে তাফজিল' (أحمد-আহমাদ)-এর সমার্থক?
তিনি বললেন, হ্যাঁ।
তখন আমি বললাম, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি নাম হলো 'আহমাদ'।
তিনি তখন বললেন, ভাই! আপনি তো অনেক জানেন!
ড. আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার বলেন, এরপর আমরা দুজন পৃথক হয়ে যাই এবং আমি আমার মনের মাঝে আল্লাহ তাআলার এই বাণী-
وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ
এর অর্থের ব্যাপারে আরও বেশি দৃঢ়তা অর্জন করি। (৪৭৩)
ইনজিলের উল্লেখিত বাণীর মধ্যে আরেকটি কথা ছিল, 'তিনি তোমাদের ন্যায়পরতার সাথে পরিচালনা করবেন।'
এ কথার মাঝেও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার প্রমাণ রয়েছে। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাঁকে শাসনকার্য পরিচালনার দায়িত্বও দিয়েছিলেন। তিনি আল্লাহর কিতাব কুরআন অনুযায়ী সেই শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। আর কুরআনুল কারিম হলো মহা সত্যবাণী। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ)
আপনি তাদের মধ্যে বিচার করবেন আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী। আপনার কাছে আগত সত্যকে উপেক্ষা করে তাদের মনোবৃত্তির অনুসরণ করবেন না। [সুরা মায়িদা: ৪৮]
মৃত সাগর অঞ্চলে ইনজিলের কিছু পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়। এই পাণ্ডুলিপিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বলে গণ্য হয়। 'ফারাকলিত'-এর ব্যাপারে বহু তথ্য-প্রমাণ সেখানে রয়েছে। যা ইনজিলের বহু গতানুগতিক ধারণাকে আমূল পালটে দেয়। একজন শীর্ষস্থানীয় পাদরি এমনটি বলেছেন। তিনি হলেন পল ডিভাইন (Paul Devine)। তিনি ওয়াশিংটনের বড় গির্জাসমূহের অন্যতম প্রধান। তিনি বলেন, মৃত সাগরের পাণ্ডুলিপিগুলো কয়েক শতাব্দীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এটি ইনজিলের গতানুগতিক অনেক ধারণাকে পালটে দিয়েছে।
এই পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে একটি বর্ণনা এমন এসেছে, নিঃসন্দেহে ঈসা ছিলেন খ্রিষ্টধর্মের অনুসারীদের জন্য একজন মেসিয়া। তারপর আরেকজন মেসিয়া আছেন।
আরামাইক ভাষায় মেসিয়া অর্থ 'রাসুল বা বার্তাবাহক'। এ কারণে হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম তার অনুসারীদের বলেছিলেন, মানবপুত্র প্রস্থান করবেন। তারপর আসবেন 'ফারাকলিত'। তিনি তোমাদের নিকট অনেক গোপন রহস্য নিয়ে আসবেন। তিনি তোমাদের নিকট সবকিছুর ব্যাখ্যা দেবেন। তিনি আমার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবেন, যেমন আমি তাঁর ব্যাপারে দিয়েছি। আমি তোমাদের কাছে উপমাসমূহ নিয়ে এসেছি। আর তিনি ব্যাখ্যা নিয়ে আসবেন。(৪৭৪)
অতএব, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বশেষ নবী ও রাসুল। তিনি মানবজাতিকে দেখিয়েছেন সত্যের সকল পথ। ইনজিলে এ কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, 'স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত আত্মা যখন তোমাদের কাছে আসবেন, তখন তিনি তোমাদের সত্যের সকল পথ দেখাবেন। কারণ, তিনি নিজের কথা শোনাবেন না। বরং তিনি যে কথাগুলো (স্রষ্টা থেকে) শুনবেন, শুধু সেগুলোই বলবেন এবং তিনি ভবিষ্যতের অনেক বিষয় তোমাদের জানাবেন。(৪৭৫)
সাহাবিদের একটি বর্ণনা ইনজিলের এ কথাকে সত্য প্রমাণিত করে। তারা বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাদের নিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করলেন। এরপর মেম্বারে উঠে ভাষণ দিলেন। একপর্যায়ে জোহরের ওয়াক্ত হয়ে গেল। মেম্বার থেকে নেমে জোহর নামাজ আদায় করলেন। অতঃপর আবার মেম্বারে উঠে ভাষণ দিলেন। একপর্যায়ে আসরের ওয়াক্ত হয়ে গেল। মেম্বার থেকে নেমে আসরের নামাজ আদায় করে নিলেন। অতঃপর আবার মেম্বারে উঠে ভাষণ দিলেন। একপর্যায়ে সূর্য ডুবে গেল। উক্ত ভাষণে তিনি আমাদেরকে অতীত ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেককিছু অবহিত করেন। আমাদের মধ্যকার অধিক জ্ঞানী ব্যক্তিরাই সেই ভাষণ সবচেয়ে বেশি মনে রাখতে পেরেছে。(৪৭৬)
হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছেন, তিনি জগদ্বাসীকে ভ্রষ্টতা ও পাপাচার থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদের বিশ্বাসের বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করবেন।
একইভাবে হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম অথবা (খ্রিষ্টানদের ভাষ্যমতে) যাজক জোহন পরিবর্তনের আভাস দিয়ে গেছেন। অর্থাৎ ইহুদিদেরকে পরিবর্তন করে এমন এক জাতিকে আনা হবে, যারা আল্লাহর পতাকা সমুন্নত করবে এবং তাঁর কালেমাকে উঁচু করবে। আরও আভাস দিয়েছেন যে, শেষ নবী হিসেবে এমন একজন রাসুলের আগমন ঘটবে, যিনি হবেন রাসুলগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। সুসংবাদের মূল পাঠটি এমন, সেই সময় যাজক জোহন (ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম) আসবেন। তিনি ইহুদি সমাজে প্রচার করবেন যে, তোমরা তাওবা করো। কারণ, আসমানি রাজত্বের (KINGDOM OF HEAVEN) দিন ঘনিয়ে এসেছে। তিনি সেই ব্যক্তি, যার সম্পর্কে যিশাইয় নবী দ্বারা কথিত আছে, প্রান্তরে একজন উঁচু আওয়াজের অধিকারী ঘোষণা করবেন, তোমরা প্রতিপালকের পথে ফিরে এসো। তোমরা তাঁর পথগুলোকে সরল বানাও...। এরপর যখন তিনি দেখবেন দলে দলে ফারিসি ও সাদুকিরা খ্রিষ্টবাদের দীক্ষার জন্য আসছে, তখন তিনি তাদের বলবেন, হে সাপের বংশধর! তোমাদের কে বলল যে এর মাধ্যমে তোমরা আসন্ন ক্রোধ থেকে পালাতে পারবে! তোমরা বরং তাওবার উপযোগী কিছু ফল তৈরি করো।
আর নিজেদের অন্তরের মধ্যে এ কথা বলতে সামান্যতম চিন্তা বা দ্বিধা করো না যে, আমাদের পিতা হলেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। কারণ, আমি তোমাদের বলছি, আল্লাহ তাআলা এই পাথর থেকেও ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্য সন্তান সৃষ্টি করতে সক্ষম। এখন গাছের গোড়ায় কুড়াল স্থাপন করা হয়েছে। অতএব, যে গাছ ভালো ফল দেবে না, তা কেটে ফেলা হবে ও আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। আমি তোমাদের তাওবার জন্য পবিত্র পানি দ্বারা শুদ্ধি করছি। তবে আমার পরে যিনি আসবেন, তিনি আমার থেকেও শক্তিমান। আমি তার জুতা বহনেরও উপযুক্ত নই। তিনি তোমাদের শুদ্ধি করবেন পবিত্র আত্মা ও আলো দিয়ে। (৪৭৭)
হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম (খ্রিষ্টানদের মতে যাজক জোহন) চেষ্টা করেছিলেন ইহুদিদেরকে তাওবাকারী বানাতে। তাই তিনি স্পষ্ট ভাষায় তাওবা করার এবং আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যেহেতু তাদের অবাধ্যতার কথা জানতেন এবং তাদের থেকে নিরাশ হয়ে পড়েছিলেন, তাই তিনি তাদেরকে এ কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের পরিবর্তে অন্য এক জাতিকে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে গেছে এবং ফল দিতে অস্বীকারকারী গাছের গোড়ায় কুড়াল স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। এখন তা কেটে ফেলার অপেক্ষামাত্র। তিনি তাদের স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, অতি সত্বর তাদের ওপর আল্লাহর অবধারিত গজব ও ক্রোধ অবতীর্ণ হবে। এরপর তিনি তার ইনতেকালের পর বিকল্প গাছে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বংশে আসন্ন নবীর আবির্ভাব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন যে, তিনি হবেন তার থেকেও শক্তিমান। নিছক পানি দিয়ে শুদ্ধিকরণকে তিনি পরিহার করবেন। তিনি শুদ্ধির কাজ করবেন আত্মা এবং আলো দিয়ে। আমরা জানি, ‘রুহ’ (আত্মা) এবং ‘নুর’ (আলো) দুটোই পবিত্র কুরআনের দুটি গুণ। অর্থাৎ এর মাধ্যমে কুরআনুল কারিমকেই বোঝানো হয়েছে।
বিকল্প জাতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সম্ভবত নবুয়ত এখানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ, নবুয়ত ও রাজত্ব ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বংশধরদের মধ্যে বহাল থাকার ভাবনাকে হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম অস্বীকার করেননি। তিনি তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, তারা (ইহুদিরা) ছাড়াও ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আরও বংশধর রয়েছে। অতএব, আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নবুয়ত তাঁর বংশধরদের মধ্যেই বিদ্যমান থাকবে, এর দ্বারা তারা যেন ধোঁকায় পতিত না হয়। এর মাধ্যমে আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি, বিকল্প জাতি হবে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বংশের ভিন্ন শাখা। কারণ, হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামের কথা প্রমাণ করে, অচিরেই আল্লাহ তাআলা ইহুদিরা ছাড়া ইবরাহিম আলাইহিস সালামের অন্য সন্তানদের (নবুয়তের জন্য) বের করবেন। এই বাণীর বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে ইসমাইল আলাইহিস সালামের বংশধরদের দ্বারা। অতঃপর, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁরই বংশে আগমন করেন। (৪৭৮)
এমন আরও বহু ভবিষ্যদ্বাণীতে ভরে আছে ইনজিল, যেগুলো অকাট্যভাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের প্রমাণ বহন করে। আমাদের এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে ইনজিলে বর্ণিত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়ত ও তাঁর সত্যতা সম্পর্কিত সকল ভবিষ্যদ্বাণীর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে, হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম ও হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামের যে বক্তব্যগুলো এখানে উপস্থাপিত হয়েছে, আমাদের জন্য সেগুলোই যথেষ্ট।
এই অনুচ্ছেদে আমরা পূর্ববর্তী ধর্মীয় গ্রন্থসমূহ তথা তাওরাত, ইনজিল ইত্যাদিতে বর্ণিত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার ব্যাপারে কিছু প্রমাণ ও ভবিষ্যদ্বাণী উল্লেখ করেছি। অনুচ্ছেদের শেষ পর্যায়ে এসে আমরা এমন একটা বাস্তব ঘটনা উল্লেখ করতে চাই, যা এইসব ভবিষ্যদ্বাণীর শুদ্ধতাকে আরও জোরদার করবে ইনশাআল্লাহ।
ফ্রা মেরিনো (Fra Marino) নামে জনৈক লাতিন যাজক ইতালীয় ভাষায় লিখিত ইনজিলের একটি কপি আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি ইরেনিয়াসের কিছু পুস্তিকা অধ্যয়ন করতে গিয়ে দেখলেন, একটি পুস্তিকায় সাধু 'বার্নবা'-র ইনজিলের ওপর ভিত্তি করে সাধু পলের নিন্দা করা হয়েছে। এ থেকে যাজক ফ্রা মেরিনো সাধু বার্নবার এই ইনজিল সম্পর্কে অনুসন্ধানে মনোযোগী হন। এ ব্যাপারে পোপদের সদর দফতরে তার কাজের অবস্থান তাকে সহায়তা করে। ফলে এর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পোপ সিক্সটাস পঞ্চম (১৫৮৫-১৫৯০ খ্রি.)-এর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। এই সুযোগে তিনি পোপদের গ্রন্থাগারে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। সেখানে অনুসন্ধানের পর তার সেই কাঙ্ক্ষিত বার্নবার ইনজিল (৪৭৯) বা 'গস্পেল অব বারনাবাস'-এর কপি খুঁজে পান। এ সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার ওপর তার সুদৃঢ় বিশ্বাস তৈরি হয়। অবশেষে তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। (৪৮০)
টিকাঃ
৪৬৭. PARACLETE : 'الفارقليط'। অর্থাৎ যিনি সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্য করেন। তিনি হবেন স্রষ্টার পক্ষ হতে প্রেরিত আত্মা। অর্থাৎ তিনি তোমাদের সকল-কিছু শেখাবেন। তাদের নিকট এই শব্দের অর্থ (3) অধিক প্রশংসাকারী। কেউ বলেন, (حامد) প্রশংসাকারী। তবে তাদের অধিকাংশ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য () ত্রাণকর্তা, মুক্তিদাতা। দেখুন, জুবাইদি: তাজুল আরুস: ২৬/৩০০; ইবনে তাইমিয়া: আল-জাওয়াবুস সহিহ: ৫/২৮৭-২৮৮
৪৬৮. আবদুল আহাদ দাউদ: মুহাম্মাদুন কামা ওয়ারাদা ফি কিতাবিল ইয়াহুদি ওয়ান নাসারা: ১৪২।
৪৬৯. বাইবেল: জোহন: ১৬-২৫।
৪৭০. আবদুল আহাদ দাউদ: মুহাম্মাদুন কামা ওয়ারাদা ফি কিতাবিল ইয়াহুদি ওয়ান-নাসারা: ১৯২-১৯৮।
৪৭২. আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার (১২৭৮-১৩৬০ হি./ ১৮৬২-১৯৪১ খ্রি.)। তিনি একজন সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক এবং ফিকহবিদ। এ ছাড়াও তিনি পদার্থ, রসায়ন ইত্যাদি বিষয়ে পারদর্শিতার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি সেমিটিক ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। সাহিত্য এবং দ্বীনিয়াতের শিক্ষক ছিলেন। তিনি বহু ইসলামি ইউনিভার্সিটিতে বিভিন্ন কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেছেন। তার রচনাবলি- তারিখুল ইসলাম, তারিখুল খুলাফায়ির রাশিদিন। বিস্তারিত তথ্যের জন্য দেখুন, মুহাম্মাদ রজব বাইয়োমি (محمد رجب البيومي): আন নাহজাতুল ইসলামিয়া ফি সিয়ারি আলামিহাল মুআসিরিন: ১/৩১৭-৩৩৮।
৪৭২. Carlo Alfonso Nallino (১৮৭২-১৯৩৮ খ্রি.) তিনি একজন ইতালীয় প্রাচ্যবিদ। ইহুদি সংস্কৃতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। রোম ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস ও ইসলামি শিক্ষার অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। তিনি ইতালীয় বিজ্ঞান একাডেমি ও মিশরের ভাষা একাডেমির সদস্য ছিলেন। তার অন্যতম রচনা হলো, ইলমুল ফালাক: তারিখুহু ইনদাল আরাবি ফিল কুরুনিল উসতা। দেখুন, আবদুর রহমান বাদাবি: মাওসুআতুল মুসতাশরিকিন : ৫৮৩ এবং নাজিব আকিকি: আল-মুসতাশরিকুন: ১/৪৩২-৪৩৪।
৪৭৩. ফাজেল সালেহ সামাররায়ি: নুবুওয়াতু মুহাম্মাদ মিনাশ শাক্কি ইলাল ইয়াকিন: ২৮২-২৮৩।
৪۷۴. বাইবেল : জোহন : ১৪:১৬। সফিউর রহমান মুবারকপুরি : নাবাউন আজিম ইলা জামিয়িল বাশার: ১/৩২৭-৩২৯।
৪৭৫. বাইবেল : জোহন : ১৬:১৩।
৪৭৬. সহিহ মুসলিম: ২৮৯২।
৪৭৭. মথি: ৩: ১-৩, ৭-১১।
*৭৮. নাসরুল্লাহ আবদুর রহমান আবু তালিব : তাবাশিরুল ইনজিলি ওয়াত-তাওরাতি বিল ইসলামي ওয়া-রাসুলিহি মুহাম্মাদ: ৩২৭।
৪৭৯. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী ও সুসংবাদ সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন, ইনজিলু বারনাবা দিরাসাতুন হাওলা ওয়াহদাতিদ-দ্বীন ইনদা মুসা ওয়া-ঈসা ওয়- মুহাম্মাদ। নিরীক্ষণ: সাইফুল্লাহ আহমদ ফাযেল।
৪৮০. মুহাম্মাদ আবু যাহরা : মুহাজারাতুন ফিন-নাসরানিয়া : ৫৬।