📄 নবীজি ﷺ-এর নিরক্ষরতা
আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশ্ববাসীর নিকট পাঠিয়েছেন সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী হিসেবে। তাঁকে এমন সব মুজিজা দ্বারা দৃঢ় ও শক্তিশালী করেছেন, যেগুলো তাঁর সত্যতার ওপর প্রমাণ বহন করে। এসব মুজিজার মধ্যে সবচেয়ে প্রকাশ্য ও উজ্জ্বল মুজিজা হলো তাঁর 'উম্মি' বা নিরক্ষর হওয়া। ঐতিহাসিকভাবেই এটা প্রমাণিত, নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মি হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং আল্লাহ তাআলা তাঁকে যখন সকল জাহানের নবী হিসেবে প্রেরণ করেন, তখনও তিনি উম্মিই ছিলেন। এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য একটি বড় পূর্ণতা। তাঁর মর্যাদাপূর্ণ মুজিজাগুলোর মধ্যে এটিও একটি বড় মুজিজা। ইবনে তাইমিয়া রহ. এ সম্পর্কে বলেন,
আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থা এমন স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, সাধারণ এবং বিশেষ সকলেই তাঁর সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। তাঁর সম্প্রদায় যারা তাঁকে প্রত্যক্ষ করেছে তিনি তাদের সকলের নিকট জ্ঞাত ও পরিচিত। আর যারা তাঁকে দেখেনি, তাদের নিকটও বংশ পরম্পরায় ধারাবাহিকভাবে তাঁর পরিচয় পৌঁছে গেছে যে, তিনি ছিলেন একজন উম্মি বা নিরক্ষর ব্যক্তি। লিখিত কোনো জিনিস তিনি পড়তে পারতেন না। কোনো কিতাবের কোনো বিষয়ও তিনি মুখস্থ করেননি, সেটা কোনো ঐশী কিতাব হোক কিংবা অন্যকিছু। তিনি নিজ হাতে কোনোদিন কিছু লেখেননি। মানুষদের কোনো কিতাব থেকে কোনোদিন কিছু প্রতিলিপি করেননি, সেটা ঐশী হোক কিংবা ভিন্ন কিছু। (৪৩১)
কুরআনুল কারিমের অনেক আয়াত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের 'উম্মি' বা নিরক্ষতা সাব্যস্ত করেছে। যারা দাবি করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ববর্তীদের কিতাব পাঠ করে এই কুরআন শিখেছেন, তাদের কথাকেও প্রত্যাখ্যান করেছে। সেসব আয়াতের মধ্যে নিচে কয়েকটি আয়াত উপস্থাপন করা হলো। আল্লাহ তাআলা বলেন,
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ)
তিনিই হলেন সেই সত্তা, যিনি উম্মিদের মাঝে তাদের মধ্য থেকে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন। যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। যদিও তারা ইতিপূর্বে স্পষ্ট পথভ্রষ্টতার মধ্যে লিপ্ত ছিল। [সুরা জুমআ : ২]
অন্য আয়াতে বলেন,
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِي وَيُمِيتُ فَأُمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ)
আপনি বলেন, হে মানুষ সকল! আমি তোমাদের সকলের নিকট আল্লাহ তাআলার রাসুল, যে আল্লাহর জন্যই আসমান ও জমিনের কর্তৃত্ব। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনিই জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যু দান করেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর প্রতি এবং বার্তাবাহক নিরক্ষর নবীর প্রতি ঈমান আনো, যিনি নিজেও আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর কালিমার প্রতি ঈমান রাখেন। এবং তোমরা তাঁর অনুসরণ করো, আশা করা যায় তোমরা সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে। [সুরা আরাফ: ১৫৮]
হজরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
كَانَ نَبِيُّكُمْ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُمِّيًّا لَا يَكْتُبُ وَلَا يَقْرَأُ وَلَا يَحْسُبُ
তোমাদের নবী ছিলেন উম্মি বা নিরক্ষর, তিনি লিখতে ও পড়তে পারতেন না। হিসাব করতে পারতেন না।… (৪৩২) যেমনটা আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَمَا كُنْتَ تَتْلُو مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لَّارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ
আর আপনি ইতিপূর্বে না কোনো কিতাব পাঠ করেছেন আর না নিজ হাতে কোনোকিছু লিখেছেন। যার কারণে মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষণ করবে। [সুরা আনকাবুত: ৪৮]
আল্লামা যামাখশারি রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, অর্থাৎ আপনি একজন নিরক্ষর। আপনাকে কেউ কখনো কোনো কিতাব পাঠ এবং লেখা শেখায়নি। (কারণ) এটা যদি আগে থেকে আপনার অর্জিত থাকত অর্থাৎ আপনি যদি আগে থেকে পড়া ও লেখার গুণ অর্জন করতেন, তাহলে আহলে কিতাবদের মধ্যে ভ্রান্তরা সন্দেহ প্রকাশ করে বলত, আমরা আমাদের কিতাবের মধ্যে যে নবীর কথা পেয়েছি তিনি হবেন উম্মি, তিনি লিখতে ও পড়তে জানেন না। আর এদিকে মক্কার মুশরিকরাও সন্দেহ পোষণ করে বলত, সম্ভবত এটা সে কারও থেকে শিখেছে কিংবা সে নিজ হাতেই রচনা করেছে। (৪৩৩)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার ওপর তাঁর উম্মি হওয়াকে একটি বাস্তব ও যৌক্তিক প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয়। কেননা 'উম্মি' এমন একটি গুণ, আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলদের মধ্যে শুধু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই এ গুণে গুণান্বিত করেছেন। যাতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক যেসব মুজিজা দ্বারা সুদৃঢ়তা দান করবেন, সেই মুজিজা যেন পূর্ণতা লাভ করে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা উম্মি হওয়াকে তাঁর একান্ত একটি গুণ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। যাতে এটা প্রকাশ পায় যে, তাঁর সকল পূর্ণতা ও পারঙ্গমতা মূলত স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রদত্ত। নতুবা জগতে যোগ্যতা অর্জনের যত পরিচিত মাধ্যম ও উপকরণ, তাঁর জন্য সেগুলোর কোনোটিই ব্যবহৃত ও চর্চিত হয়নি। এ কারণে অন্যদের জন্য 'নিরক্ষর' হওয়া তাঁর কমতি বা অপূর্ণতা হলেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য উম্মি বা নিরক্ষর হওয়া তাঁর নবুয়তি পূর্ণতার জন্য একটি বড় গুণ। কারণ, এভাবে যে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা তাঁর অর্জিত হয়েছে, সেসব জ্ঞানের সকল বিষয়ের ক্ষেত্রেও তাঁর কোনো ভুলের সম্ভাবনা নেই। তিনি ছিলেন তাঁর জ্ঞানের ক্ষেত্রে নিশ্চিত। তিনি ছিলেন তাঁর জ্ঞাত বিষয়ে সঠিক প্রমাণের ওপর। জগতের অন্য শিক্ষার্থীরা যেগুলো শিখে অর্জন করে, তাদের চেয়েও তাঁর জ্ঞান ছিল অতি মহান, নিশ্চিত ও অকাট্য। এ কারণে তাঁর উম্মি হওয়াটাই একটি বড় প্রমাণ যে, তিনি যা অর্জন করেছেন তার সকল-কিছুই ঐশী দানের অন্তর্ভুক্ত। (৪৩৪)
নববি এই মুজিজার আরেকটি বড় মহত্ত্ব এই যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর কুরআন নাজিল হয়েছে। যে কিতাব আরবের সকল মুশরিক এবং তাদের পরবর্তীদের জন্যও কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষমকারী চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য হয়েছে। অথচ আরবের মুশরিকরা ভাষা ও সাহিত্যে ছিল শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। কিন্তু তাদেরকেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চ্যালেঞ্জ করেছেন এমন একটি গ্রন্থ নিয়ে আসতে, কমপক্ষে এর মতো একটি সুরা কিংবা একটি আয়াত রচনা করতে। এই অতি উজ্জ্বল বিস্ময় ও মুজিজা সম্পর্কে বুদ্ধিমান যে কেউ চিন্তা করে দেখুক, কত বিস্ময়কর আর অলৌকিক এই কুরআন! যেমন আত-তাহরির ওয়াত-তানবির গ্রন্থের লেখক বলেন, আপনারা কি কখনো এই অবস্থাটা চিন্তা করে দেখেছেন, নিতান্তই একজন উম্মি, অথচ তিনিই আনয়ন করছেন এমন সুউচ্চ সাহিত্য ও মর্মসমৃদ্ধ এমন অনন্য, অসাধারণ চমৎকার এক গ্রন্থ! আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রিসালাতের সৌভাগ্য ব্যতীত এটি তাঁর জন্য কিছুতেই সম্ভব হতো না। কারণ, স্বাভাবিক নিয়মে কোনো নিরক্ষর মানুষ নিজের থেকে এমন একটি গ্রন্থ রচনা করতে সক্ষম নয়। (৪৩৫)
প্রাচীন যুগের কুরাইশ সম্প্রদায়ের মুশরিকরাও স্বীকার করেছে, এই বিস্ময়কর কুরআন এমন কোনো উম্মি ব্যক্তির জন্য নিয়ে আসা সম্ভব নয়, যে পড়তে ও লিখতে জানে না। এ কারণে তারা কখনো দাবি করত এটা হয়তো কোনো জাদু যা মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। এই যেমন উতবা ইবনে রবিআর বক্তব্য। (তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বলে ফিরে এসে নিজের মুশরিক সঙ্গীদের বললেন,) 'আল্লাহর কসম! আমি আজ এমন কথা শুনেছি, যা আগে কখনো শুনিনি। এটা কোনো কবিতা নয়, নয় কোনো জ্যোতিষবাণী। হে কুরাইশ সম্প্রদায়, তোমরা আমার কথা শোনো এবং বিষয়টা আমার দায়িত্বে অর্পণ করো। তোমরা এই ব্যক্তিকে তাঁর কাজ করতে দাও। তাঁকে তাঁর মতো চলতে দাও। আল্লাহর শপথ! আমি তাঁর থেকে যে কথা শুনেছি, তা এক নতুন বার্তা। আরবরা যদি তাঁকে আক্রমণ করে, তবে তো তাঁর ক্ষেত্রে তোমাদের মোকাবিলায় অনারবরা যথেষ্ট হয়ে গেল। আর যদি সে আরবদের ওপর বিজয়ী হয়, তাহলে তো তাঁর রাজত্বই তোমাদের রাজত্ব। তাঁর সম্মানই তোমাদের সম্মান। তাঁর মাধ্যমে তোমরাই মর্যাদাপূর্ণ মানুষ হিসেবে গণ্য হবে।'
উতবার এই কথা শুনে তার সঙ্গীরা বলল, 'আল্লাহর শপথ! হে আবুল ওয়ালিদ, তোমাকে সে তাঁর কথার মাধ্যমে জাদু করেছে!' (৪৩৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মি হওয়ার মুজিজা বুঝেছিল 'আদ্দাস'। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তায়েফ থেকে দুঃখিত, ক্লান্ত, আহত ও বিপদ্গ্রস্ত হয়ে ফিরে এলেন। কারণ, তায়েফবাসী ঈমান গ্রহণ করেনি। তখন তিনি আহত ও ক্লান্ত হয়ে রবিআর দুই ছেলের বাগানে এসে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। এটা দেখে তারা দুইজন তাদের গোলাম আদ্দাসকে একটি আঙুরের থোকা দিয়ে নবীজির নিকট পাঠালেন। এই আদ্দাস ছিল একজন খ্রিষ্টান যুবক। সে আঙুরের থোকা নিয়ে এগিয়ে এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখল। তখন নবীজি সে আঙুর হাতে নিয়ে 'বিসমিল্লাহ' বলে মুখে দিলেন। এটা দেখে আদ্দাস কিছুক্ষণ বিস্ময়ের সাথে নবীজির মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, 'আল্লাহর শপথ! এই অঞ্চলের লোকেরা খাওয়ার সময় এই কথা বলে না।' তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'তোমার দেশ কোথায় আর তোমার ধর্ম কী?'
আদ্দাস বলল, ‘আমি একজন খ্রিস্টান। আমি নিনাওয়া (৪৩৭) এলাকার অধিবাসী।’
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, ‘তুমি তো সৎ ব্যক্তি ইউনুস ইবনে মাত্তার জনপদের মানুষ।’
আদ্দাস বলল, ‘আপনি কীভাবে ইউনুস ইবনে মাত্তার কথা জানলেন? আল্লাহর শপথ! আমি নিনায়ার এমন অবস্থা দেখে এসেছি যে সেখানে দশজন ব্যক্তিও মাত্তাকে চেনে না। তাহলে আপনি কীভাবে জানলেন মাত্তার কথা, অথচ আপনি নিজে একজন উম্মি (নিরক্ষর) এবং আপনার সম্প্রদায়ও উম্মি!’
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘ইউনুস ইবনে মাত্তা হলেন আমার ভাই, তিনি একজন নবী ছিলেন, আমিও একজন নবী।’
এ কথা শুনে আদ্দাস ঝুঁকে পড়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথা, দুই হাত ও পায়ে চুমু খেল। এরপর আদ্দাস যখন ফিরে গেল, তখন তার মালিক রবিআর দুই পুত্র তাকে বলল, ‘হে আদ্দাস, তোমার হুঁশ আছে! কীজন্য তুমি এই ব্যক্তির মাথা, দুই হাত ও পায়ে চুমু খেতে গেলে?’
আদ্দাস বলল, ‘হে আমার সর্দার, এই পৃথিবীতে তাঁর চেয়ে উত্তম কোনো মানুষ নেই। তিনি আমাকে এমন একটি বিষয়ে সংবাদ প্রদান করেছেন, যা শুধু একজন নবীর পক্ষেই জানা সম্ভব।’ (৪৩৮)
অন্যদিকে, সংশয়ী কিছু মানুষ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মি বা নিরক্ষরতার গুণ অস্বীকার করতে চেয়েছে। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওরাত ও ইনজিলের অনেক গোপন বিষয় উন্মোচন করে দিয়েছেন, ভবিষ্যতের বহু ঘটনা বিষয়ে সম্পর্কে অবহিত করেছেন, যেমন পারস্যের পরাজয়। যার কথা আমরা আগেই বর্ণনা করেছি। ইত্যাদি আরও অনেক বিষয়, যা শিক্ষণীয় হওয়া ছাড়া সম্ভব নয়।
কিন্তু বাস্তবে তাঁর 'নিরক্ষতা' এমন এক যৌক্তিক, স্পষ্ট ও উজ্জ্বল মুজিজা, জেদি ও একগুঁয়ে ব্যক্তিরা ছাড়া এটা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। যদিও এই একগুঁয়ে ব্যক্তিরা খুব ভালোভাবে জানে, এই নবীর উম্মি হওয়ার বিষয়টি তাওরাত ও ইনজিলে উল্লেখ রয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ
যারা অনুসরণ করে সেই উম্মি রাসুল ও নবীকে যার কথা তারা তাওরাত ও ইনজিলের মধ্যে লিখিত পেয়েছে। [সুরা আরাফ: ১৫৭] আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেছেন,
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَأَنْتُمْ تَشْهَدُونَ﴾
হে আহলে কিতাব! তোমরা কেন জেনেবুঝে আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহ অস্বীকার করো? [সুরা আলে ইমরান : ৭০] তোমরা সাক্ষ্য দাও যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণাবলি ও পরিচয় তোমাদের কিতাবের মধ্যে রয়েছে, এরপরও তোমরা তাঁকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করো। তাঁর প্রতি ঈমান আনো না। অথচ তোমরা তোমাদের নিকট অবস্থিত তাওরাত ও ইনজিলের মধ্যে তাঁর কথা লিখিত পেয়েছ, 'তিনি হবেন এমন উম্মি নবী, যিনি নিজে আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহের প্রতি বিশ্বাস রাখবেন।' (৪৩৯) এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিরক্ষরতা তাঁর সত্যতা ও নবুয়তের অন্যতম প্রমাণ।
টিকাঃ
৪৩১. ইবনে তাইমিয়া: আল-জাওয়াবুস সহিহ: ৫/৩৩৮।
৪৩২. ইমাম কুরতুবি: আল-জামি লি আহকামিল কুরআন: ৭/২৯৮।
৪৩৩. আল্লামা যামাখশারি: আল-কাশশাফ আন হাকায়িকিত তানযিল ওয়া উয়ুনিল আকাবিল ফি উজুহিত তাবিল: ৩/৪৬২।
৪৩৪. ইবনে আশুর: আত-তাহরির ওয়াত-তানবির: ৯/১০০।
৪৩৫. ইবনে আশুর: প্রাগুক্ত ১১/১২৩।
৪৩৬. বাইহাকি: দালায়িলুন নুবুওয়া: ২/২০৪-২০৫, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৫০৪-৫০৫।
৪৩৭. নিনাওয়া : বর্তমান ইরাকের উত্তর দিকে অবস্থিত একটি জেলা, যা বাগদাদ থেকে ৪০০ কি.মি. দূরে অবস্থিত। -সম্পাদক
৪৩৮. ইবনে তাইমিয়া : আল-জাওয়াবুস সহীহ : ১/৩৭১-৩৭২।
৪৩৯. ইমাম তাবারি: জামিউল বায়ান ফি তাবিলিল কুরআন: ৬/৫০৩।