📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 নবীজি ﷺ-এর দুনিয়াবিমুখতা

📄 নবীজি ﷺ-এর দুনিয়াবিমুখতা


জীবন সম্পর্কে ইসলামের রয়েছে একটি অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের জীবনকে একটি ভারসাম্য দান করে। তখন সে অনুধাবন করে, পার্থিব এ জীবন দেখতে যত বড়ই মনে হোক, বাস্তবে তা খুবই ছোট ও সংক্ষিপ্ত। বরং আখিরাতই হলো উত্তম ও স্থায়ী। এ কারণে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়া সম্পর্কে বলেন, وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ আর (জান্নাতের বিপরীতে) পার্থিব জীবন তো প্রতারণার উপকরণ ছাড়া কিছুই নয়। [সুরা আলে ইমরান : ১৮৫]
আল কুরআনুল কারিম মানুষের সামনে তার দুনিয়াপ্রত্যাশা প্রসঙ্গে একটি বাস্তবসম্মত মানদণ্ড স্থাপন করেছে এভাবে, وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهُوَ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ এই পার্থিব জীবন খেলাধুলা ছাড়া কিছুই নয়। বস্তুত আখিরাতের জীবনই প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত! [সুরা আনকাবুত : ৬৪]
অতএব, ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে এই পার্থিব জীবন আখিরাতের শস্যক্ষেত্র ছাড়া আর কিছু নয়। মানুষের মূল ও কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছানোর জন্য এটা নিছক একটা পথ বা রাস্তা। আর দুনিয়া সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠিক এই কথাটিই বলেছেন। তিনি বলেন, كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيْلِ» তুমি দুনিয়ার মধ্যে এমনভাবে বসবাস করো, যেন তুমি একজন আগন্তুক অথবা নিছক একজন রাস্তা অতিক্রমকারী। (৩৯৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যকার সম্পর্কের বাস্তবতা এবং আল্লাহর কাছে আখিরাতের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা শিখিয়েছেন। এ কারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
وَاللَّهِ مَا الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا مِثْلُ مَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ إِصْبَعَهُ فِي الْيَمِّ فَلْيَنْظُرْ بِمَ تَرْجِعُ
আল্লাহর শপথ! দুনিয়া আখিরাতের তুলনায় এতটুকু, যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রের পানিতে তার একটি আঙুল ডুবিয়ে তুলে আনল। সে দেখুক তার আঙুল কতটুকু পানি নিয়ে ফিরেছে। (৩৯৫)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্ব হলো, তাঁর পুরো জীবন ছিল দুনিয়ার বিষয়ে এই ঐশী দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব ও আদর্শ নমুনা। যেমন হজরত উমর রা. একবার নবীজির কামরা ও তাঁর জীবনযাপনের চিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আমি তাঁর (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) কামরায় প্রবেশ করে দেখি, তিনি খেজুরের আঁশভরতি একটি চামড়ার বালিশে হেলান দিয়ে খেজুরপাতার খালি চাটাইয়ের ওপর কাত হয়ে শুয়ে আছেন। তাঁর শরীর ও চাটাইয়ের মাঝখানে কোনো বিছানা ছিল না। ফলে তাঁর শরীরের পার্শ্বদেশে চাটাইয়ের দাগ পড়ে গেছে।... তারপর আমি নবীজির ঘরের ভেতর এদিক-সেদিক দৃষ্টি দিলাম। কিন্তু তাঁর ঘরে তিনটি কাঁচা চামড়া ব্যতীত দেখার মতো আর কিছুই পেলাম না, তখন আমি আবেদন করলাম, 'আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করুন, তিনি যেন আপনার উম্মতকে সচ্ছলতা দান করেন। কেননা পারস্য ও রোমের অধিবাসীদের অনেক সচ্ছলতা দান করা হয়েছে এবং তাদের পার্থিব প্রাচুর্য দেওয়া হয়েছে, অথচ তারা আল্লাহর ইবাদত করে না।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সময় হেলান দিয়ে ছিলেন। তিনি বললেন, 'হে ইবনে খাত্তাব, তুমি কি কোনো সন্দেহের মধ্যে রয়েছ? তারা তো এমন এক জাতি, যাদেরকে তাদের ভালো কাজের প্রতিদান দুনিয়ার জীবনেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে।' (৩৯৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্য সাহাবিরাও অনেকবার নবীজির শরীরে চাটাইয়ের দাগ দেখে তাঁর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। যেমন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বর্ণনা করে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুরপাতার খালি চাটাইয়ের ওপর শুয়ে ছিলেন। এ কারণে তাঁর শরীরে দাগ পড়ে গিয়েছিল। তখন আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনার ওপর আমার পিতামাতা কোরবান হোক। আপনি যদি অনুমতি দেন তবে আমরা আপনার চাটাইয়ের ওপর একটি বিছানা বিছিয়ে দিই, যেন সেটা আপনাকে এই কষ্ট থেকে রক্ষা করে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
«مَا أَنَا وَالدُّنْيَا، إِنَّمَا أَنَا وَالدُّنْيَا كَرَاكِبِ اسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا»
দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক? দুনিয়াতে আমি এমন একজন পথচারী মুসাফির ছাড়া তো আর কিছুই নই, যে একটি গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিলো, তারপর তা ছেড়ে দিয়ে গন্তব্যের দিকে চলে গেল। (৩৯৭)
আমরা আরও দেখি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আরব উপদ্বীপে মুসলমানদের একচ্ছত্র নেতা। আল্লাহ তাআলা তাঁর হাতে অনেকগুলো বিজয় দান করেছেন। ইচ্ছা করলেই তিনি আরাম-আয়েশের সাথে জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু এসব ত্যাগ করে তিনি দুনিয়াবিমুখ জীবনই গ্রহণ করেছেন। লোক দেখানো নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব থেকে বহুদূরে অবস্থান করেছেন। পানাহারেও থেকেছেন মিতব্যয়ী এবং অতি সাধারণ। সেই অতি সাধারণ খাদ্যও অনেক সময় তাঁর দস্তরখানে থাকত না। হজরত নুমান ইবনে বশির রা. একবার নিজের খুতবা প্রদানকালে বলেন, হজরত উমর রা. বলেছেন, মানুষ আজ কী বিপুল পরিমাণ দুনিয়া অর্জন করেছে! অথচ,
لَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَظَلُّ الْيَوْمَ يَلْتَوِي مَا يَجِدُ دَقَلًا يَمْلَأُ بِهِ بَطْنَهُ»
আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, তিনি ক্ষুধার তাড়নায় সারাদিন অস্থির থেকেছেন। (কখনো কখনো) ক্ষুধা নিবারণের জন্য এমন কিছু নিম্নমানের খেজুরও তিনি পেতেন না, যার মাধ্যমে নিজের পেটপূর্ণ করবেন। (৩৯৮)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দীর্ঘ জীবনে বহুবার এমন ক্ষুধার যন্ত্রণায় ছটফট করেছেন! তেমনই একবারের কথা হজরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করে বলেন, একদিন দিবসে অথবা রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে বের হয়ে হজরত আবু বকর এবং হজরত উমর রা.-কেও বাইরে দেখতে পেলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, 'এই অসময়ে কোন কারণে তোমারা ঘর থেকে বের হয়েছ?' তারা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, ক্ষুধার যন্ত্রণার কারণে।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে মহান আল্লাহর হাতে আমার জীবন, তাঁর কসম! তোমরা যে কারণে বের হয়েছ, আমিও সে কারণে বের হয়েছি, চলো আমার সাথে।'
নির্দেশমতো তারা (হজরত আবু বকর ও হজরত উমর রা.) উভয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে চলতে লাগলেন। চলতে চলতে তারা এক আনসারি সাহাবির বাড়িতে এলেন। তখন সেই সাহাবি বাড়িতে ছিলেন না। কিন্তু তার স্ত্রী নবীজিকে দেখে বলল, 'মারহাবান ওয়া আহলান-আপনাদের স্বাগতম।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'অমুক কোথায়?' সাহাবির স্ত্রী বলল, 'তিনি আমাদের জন্য মিষ্টিপানি আনতে গেছেন।'
ইতিমধ্যে সেই আনসারি সাহাবি সেখানে উপস্থিত হলেন। নিজের বাড়ির সামনে নবীজি ও তার দুই সাথিকে দেখতে পেয়ে বলে উঠলেন, 'আল্লাহর প্রশংসা, আজ মেহমানের দিক দিয়ে আমার মতো সৌভাগ্যবান আর কেউই নেই।' তারপর তিনি গিয়ে একটি খেজুরের কাঁদি নিয়ে এলেন। তাতে কাঁচাপাকা ও শুকনা খেজুর ছিল। তিনি বললেন, 'আপনারা এ ছড়া থেকে খান।' এরপর তিনি একটি ছুরি নিলেন (ছাগল জবাই করার জন্য)।' নবীজি তাকে বললেন, 'সাবধান! দুধওয়ালা বকরি জবাই করবে না।'
অতঃপর সেই সাহাবি মেহমানদের জন্য বকরি জবাই করলেন। মেহমানরা বকরির গোশত ও কাঁদির খেজুর খেলেন। মিষ্টিপানি পান করলেন। এভাবে যখন তাঁরা সকলে ক্ষুধা নিবারণ করলেন এবং পরিতৃপ্ত হলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন হজরত আবু বকর ও উমর রা.-কে লক্ষ করে বললেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتُسْأَلُنَّ عَنْ هَذَا النَّعِيمِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُيُوتِكُمُ الْجُوعُ ثُمَّ لَمْ تَرْجِعُوا حَتَّى أَصَابَكُمْ هَذَا النَّعِيمُ
যে সত্তার হাতে আমার জীবন, তাঁর কসম! কিয়ামতের দিন এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। ক্ষুধা তোমাদের বাড়ি থেকে বের করে এনেছে এরপর তোমরা এ নিয়ামত লাভ করেই বাড়িতে ফিরছ। (৩৯৯)
প্রকৃত অর্থেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুনিয়াবিমুখতা ছিল তাঁর নবুয়তের সত্যতার অন্যতম একটি প্রমাণ। তাঁর রাসুল হওয়ার ওপর একটি শক্তিশালী দলিল। আমাদের তো দুনিয়া প্রভাবিত করে এবং ধীরে ধীরে পরিবর্তন করে ফেলে। অবশেষে আমরা সকলেই দুনিয়ার ভোগবিলাসের নিকট অনুগত হয়ে পড়ি। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন তাঁর জীবন শুরু করেছেন দুনিয়াবিমুখতার মাধ্যমে, তেমনই দুনিয়াবিমুখতা নিয়েই দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেছেন। আমাদের এই কথাকে সত্যায়ন করে হজরত আয়েশা রা.-এর নিচের এই বক্তব্যটি। তিনি বলেন,
مَا شَبِعَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ تِبَاعًا مِنْ خُبْزِ بُرٌ حَتَّى مَضَى لِسَبِيلِهِ»
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধারে তিনদিন গমের রুটি পেট ভরে খাননি, এ অবস্থার মধ্য দিয়েই তিনি পরপারে চলে যান। (৪০০)
যখন দুনিয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রবৃত্তির সকল কাঙ্ক্ষিত বিষয় নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, তখনও তিনি সর্বোচ্চ দুনিয়াবিমুখতা প্রদর্শন করেছেন। এই তো হুনাইনের দিনের ঘটনা। সেদিন দুনিয়ার যাবতীয় প্রাচুর্য তাঁর হস্তগত হয়েছিল। কিন্তু কত উদার অকুণ্ঠ চিত্তেই-না তিনি সকল-কিছু তাঁর সাহাবি এবং নবমুসলিমদের মনস্তুষ্টির জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর নিকট একটি মাছির ডানার পরিমাণ মূল্যও ছিল না এ বিশাল সম্পদের। এ কারণে নিজের জন্য তিনি সেখান থেকে এমন কিছুই অবশিষ্ট রাখেননি, যাতে তাঁর এত বছরের দারিদ্র্যের একটু উপশম হবে কিংবা এই ষাট বছর-উত্তীর্ণ জীবনের বাকি সময়গুলো বিলাসে অতিবাহিত করার অবলম্বন হবে। বরং সম্পদ চাওয়ার জন্য যখন বেদুইনদের একজন তাঁর চাদর আঁকড়ে ধরেছিল, তখন তিনি বলেছিলেন,
رُدُّوا عَلَيَّ رِدَائِي أَتَخَافُوْنَ أَنْ لَا أَقْسِمَ بَيْنَكُمْ مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ أَفَاءَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ مِثْلَ سَمُرٍ تِهَامَةَ نَعَمًا لَقَسَمْتُهُ بَيْنَكُمْ ثُمَّ لَا تَجِدُونِي بَخِيلًا وَلَا جَبَانًا وَلَا كَذَّابًا»
আমার চাদর আমাকে ফিরিয়ে দাও। তোমরা কি আশঙ্কা করো, যে জিনিস আল্লাহ তোমাদের দিয়েছেন তা তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দেবো না? যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম, তিহামা(৪০১) অঞ্চলের বাবলা গাছের মতো এত অধিক পশুও যদি আল্লাহ তাআলা তোমাদের দান করতেন, তাও আমি তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দিতাম। এ ব্যাপারে তোমরা আমাকে কৃপণ, ভীরু ও মিথ্যাবাদী হিসেবে দেখতে পাবে না। (৪০২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়াবিমুখ ছিলেন, এটা ঠিক। তবে এই দুনিয়াবিমুখতার ক্ষেত্রে তাঁর একটি অতি উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর উম্মতকে শিখিয়েছে, দুনিয়াবিমুখ হওয়ার অর্থ দুনিয়ায় বসবাস বর্জন করা নয়। দুনিয়ার সাথে সম্পর্কহীনতা মানে দুনিয়া ধ্বংস করা নয়। বরং মুসলমান দুনিয়া নির্মাণ করবে, আবাদ করবে এবং প্রতিনিধিত্ব করবে, তবে ভোগবিলাসে নিজেকে জড়িয়ে রাখবে না। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنْ قَامَتِ السَّاعَةُ وَبِيَدِ أَحَدِكُمْ فَسِيلَةٌ فَإِنِ اسْتَطَاعَ أَنْ لَا يَقُومَ حَتَّى يَغْرِسَهَا فَلْيَفْعَلْ
যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়া শুরু হয় আর তোমাদের কারও হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তাহলে সে যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আগেই সেই চারাটি রোপণ করতে সক্ষম হয়, সে যেন তাই করে। (৪০৩)
দুনিয়া সম্পর্কে এই হলো ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। এটা এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, যা আখিরাতের হিসাবনিকাশের কারণে দুনিয়া সম্পর্কে গাফেল করে দেয় না। আবার দুনিয়ার হিসাবনিকাশের কারণে আখিরাত সম্পর্কে উদাসীন করে না। এই হলো ইসলামের মহত্ত্ব ও অনন্যতা। এই হলো ইসলামের নবীর মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব, যেগুলো সন্দেহাতীতভাবে তাঁর নবুয়তের সত্যতা প্রমাণিত করে এবং প্রমাণিত করে আল্লাহপ্রদত্ত তাঁর আহ্বানকে।

টিকাঃ
৩৯৪. সহিহ বুখারি: ৬৪১৬, সুনানে তিরমিজি: ২৩৩৩, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১১৪।
৩৯৫. সহিহ মুসলিম: ২৮৫৮, সুনানে তিরমিজি: ২৩২৩, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১০৮, মুসনাদে আহমাদ: ১৭৭৫৬
৩৯৬. সহিহ বুখারি: ৪৯১৩, সহিহ মুসলিম: ১৪৭৯।
৩৯৭. সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১০৯, সুনানে তিরমিজি: ২৩৭৭।
৩৯৮. সহিহ মুসলিম : ২৯৭৮, সুনানে তিরমিজি: ২৩৭২, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১৪৬।
৩৯৯. সহিহ মুসলিম: ২০৩৮।
৪০০. সহিহ বুখারি: ৬৪৫৪, সহিহ মুসলিম: ২৯৮০।
৪০১. তিহামা: আরব উপদ্বীপের পশ্চিম অংশে লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত সমতল ভূমি।-সম্পাদক
৪০২. সহিহ বুখারি: ৩১৪৮, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৮২০, মুআত্তা মালেক : ৯৭৭।
৪০৩. মুসনাদে আহমাদ: ১২৪৯২, ইমাম বুখারি: আল-আদাবুল মুফরাদ: ৪৭৯, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৬৮১。

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 নবীজি ﷺ-এর ইবাদত-বন্দেগি

📄 নবীজি ﷺ-এর ইবাদত-বন্দেগি


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অধিক শুকরিয়া আদায়কারী। সর্বক্ষণ আল্লাহ তাআলার মহান নিয়ামতগুলোর শোকর আদায় করতেন, যেগুলো আল্লাহ তাআলা তাঁকে প্রদান করেছেন এবং যে-সকল নিয়ামতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ঘিরে রেখেছেন। আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামতগুলোর ক্ষেত্রে তাঁর কর্ম ছিল খুবই সংগতিপূর্ণ। এ কারণে তাঁর শোকর আদায় শুধু মৌখিক শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তাঁর শোকর ছিল বাস্তব, জীবন্ত এবং জীবনযাপনের সাথে জড়িত। এ কারণে আমরা তাঁর জীবনে দেখি, তিনি একাধারে সেজদাকারী, রুকুকারী, আল্লাহ তাআলার ইবাদতকারী। কল্যাণকর কর্ম সম্পাদনকারী। আল্লাহ তাআলার প্রশংসাজ্ঞাপনকারী। কুরআনুল কারিমে যে-সকল আয়াতে ইবাদতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে, সে সকল আয়াতের একনিষ্ঠ অনুসরণকারী। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ وَافْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে মুমিনগণ, রুকু করো, সেজদা করো, তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করো এবং সৎকর্ম করো, যাতে তোমরা সফলতা অর্জন করতে পারো। [সুরা হজ্জ: ৭৭]
এমন অনেক হাদিস ও ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে, যেগুলো আমাদের সামনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইবাদতের প্রকৃত অবস্থা ফুটিয়ে তোলে। যেমন হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এত অধিক নামাজ আদায় করতেন যে, তাঁর দুটি পা ফুলে যেত। একদিন আয়েশা রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কেন এমনটা করেন! অথচ আল্লাহ তাআলা আপনার পূর্বের ও পরের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন!' তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
أَفَلَا أُحِبُّ أَنْ أَكُونَ عَبْدًا شَكُورًا
আমি কি একজন শোকর আদায়কারী বান্দা হতে চাইব না ! (৪০৪)
তাঁর এই সুন্দর অভিব্যক্তিই প্রকাশ করে আল্লাহ তাআলার ইবাদতের বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি কখনোই ইবাদতকে রবের পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেওয়া নিছক কর্তব্য বলে মনে করতেন না। বরং তিনি নামাজে দাঁড়াতেন ভালোবাসা নিয়ে। নিজের উৎফুল্লতা ও আগ্রহ নিয়ে। এটাই ছিল তাঁর মহান রবের জন্য একপ্রকার গভীর ও মমতাপূর্ণ কৃতার্থের স্বীকৃতি, যিনি তাঁকে সক্ষমতা দিয়েছেন। এর দ্বারা আমরা এটাও বুঝতে পারি, তিনি কেন এভাবে দীর্ঘ ইবাদত করতেন এবং ইবাদতের জন্য নিজেকে সীমাহীন কষ্টকর অবস্থায় ফেলতেন।
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা. আরেকটি হাদিসে নবীজির রাতের নামাজের চিত্র ও ধরন বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগারো রাকাত নামাজ আদায় করতেন। এ ছিল তার রাত্রিকালীন নামাজ। এতে তিনি এত দীর্ঘ সেজদা করতেন যে, তাঁর মাথা ওঠানোর পূর্বে তোমাদের কেউ পঞ্চাশ আয়াত পড়তে পারে এবং ফজরের নামাজের পূর্বে তিনি আরও দু-রাকাত পড়তেন। অতঃপর তিনি ডান কাতে শুয়ে বিশ্রাম করতেন, নামাজের জন্য মুআজ্জিন মসজিদে আসা পর্যন্ত। (৪০৫)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক নামাজ ও অধিক কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে প্রশান্তি পেতেন। যেমন হজরত হুজাইফা রা. বর্ণনা করেন, এক রাতে আমি নবীজির সাথে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করলাম। তিনি সুরা 'বাকারা' পড়তে শুরু করলেন। আমি ভাবলাম তিনি হয়তো একশ আয়াত পড়ে রুকু করবেন। কিন্তু এর পরেও তিনি পড়তে থাকলেন। তখন আমি ভাবলাম তিনি এর (সুরা বাকারা) দ্বারা পুরো দু-রাকাত পড়ে সালাম ফেরাবেন। কিন্তু তিনি এরপরও পড়তে থাকলেন। এবার আমি ভাবলাম সুরাটি শেষ করে তিনি হয়তো রুকু করবেন। কিন্তু এরপর তিনি সুরা 'নিসা'-ও পড়তে শুরু করলেন এবং তা শেষ করলেন। অতঃপর তিনি 'সুরা আলে ইমরান' শুরু করলেন এবং তা শেষ করলেন। তিনি থেমে থেমে ধীরে ধীরে পড়ছিলেন এবং কোনো তাসবিহের আয়াত এলে তাসবিহ পড়ছিলেন, কিছু চাওয়ার আয়াত এলে কিছু চাইছিলেন। যখন আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করার কোনো আয়াত পড়ছিলেন, তখন আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছিলেন। অতঃপর তিনি রুকু করলেন। রুকুতে তিনি পড়তে থাকলেন 'সুব্‌হানা রাব্বিয়াল আজিম'। তাঁর রুকু কিয়ামের মতোই দীর্ঘ হলো। এরপর 'সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ' বললেন। এরপর যতক্ষণ সময় রুকু করেছিলেন, প্রায় ততক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকলেন। এরপর সেজদা করলেন। সেজদায় তিনি পড়লেন, 'সুব্‌হানা রাব্বিয়াল আলা'। তাঁর এই সেজদাও প্রায় কিয়ামের সময়ের মতো দীর্ঘায়ত হলো। (৪০৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে অধিক নামাজ আদায় করতেন। কেননা এই সময়টি ছিল তাঁর ও তাঁর প্রতিপালকের একান্ত মুহূর্ত, এ কারণে তিনি রাতের নামাজ সম্পর্কে বলেন,
আফদ্বালুস সালাতি বাদাল মাফরুযাতি সালাতুল মিনাল লাইল।
ফরজ নামাজগুলোর পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের নামাজ। (৪০৭)
রাতের নামাজের সীমাহীন পছন্দের কারণে তাঁর যদি কোনো কারণে কোনো নামাজ কাজা হয়ে যেত, তাহলে তিনি সেটা প্রভাতে আদায় করে নিতেন। যেমন হজরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন,
ওয়াকানা নাবিয়্যু আল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইজা সাল্লা সালাতান আহাব্বা আইঁ ইউদাওয়িমা আলাইহা ওয়াকানা ইজা গালাবাহু নাউমুন আও ওয়াজিউন আন কিয়ামিল্লাইলি সাল্লা মিনান্নাহারি ছিনতাই আশরাতা রাকাআহ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো নফল নামাজ আদায় করলে, তা নিয়মিত আদায় করা পছন্দ করতেন। তবে যদি কোনোদিন ঘুম বেশি হয়ে যেত অথবা তীব্র ব্যথা দেখা দিত, যাতে তাঁর জন্যে রাতে দাঁড়ানো সম্ভব হতো না, তাহলে তিনি দিনে বারো রাকাত নামাজ আদায় করে নিতেন। (৪০৮)
আল্লাহ তাআলার ইবাদতের প্রতি নবীজির এই যে গভীর ভালোবাসা; বিশেষ করে নামাজের প্রতি, এটা আরও ভালোভাবে বোঝা যায় বিলাল রা.-কে তাঁর এ কথা বলার মাধ্যমে, তিনি বিলাল রা.-কে বলতেন, بِلَالُ فَأَرِحْنَا بِالصَّلَاةِ -হে বেলাল, তুমি দাঁড়াও, (আজান ও ইকামত দাও) এবং নামাজের মাধ্যমে আমাদের হৃদয়কে শান্ত করো। (৪০৯)
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, وَجُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلَاةِ -আমার চোখের শীতলতা বা প্রশান্তি রাখা হয়েছে নামাজের মধ্যে। (৪১০)
এতএব, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, আল্লাহ তাআলার অব্যাহত নিয়ামত, অনুগ্রহ ও বিভিন্ন দান রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শোকর ও প্রশংসার আমলকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিত। এ কারণে সর্বদা তাঁর জিহ্বা আল্লাহ তাআলার জিকিরে এবং (তাঁর প্রতি আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহের) প্রশংসায় সিক্ত থাকত। যেমন হজরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَذْكُرُ اللَّهَ عَلَى كُلِّ أَحْيَانِهِ»
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল সময় আল্লাহ তাআলার জিকির করতেন। (৪১১)
এ ছাড়া আমরা নবীজিকে দেখি, তিনি রমজানের সময় বেশি বেশি দান- সদকা করতেন এবং বেশি বেশি ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। বিশেষ করে রমজান মাসের শেষ দশকে আগের চেয়েও বহুগুণ বেশি ইবাদতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিতেন। হজরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন,
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ شَدَّ مِثْزَرَهُ وَأَحْيَا لَيْلَهُ وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ»
যখন রমজানের শেষ দশক আসত, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবাদতের জন্য পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত হতেন এবং নিজেও রাত্রিজাগরণ করতেন ও পরিবার-পরিজনকেও জাগিয়ে দিতেন। (৪১২)
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজা রাখতেন। তিনি এর কারণ হিসেবে বলেছেন, সোমবার ও বৃহস্পতিবার মানুষের আমলসমূহ (আল্লাহ তাআলার নিকট) উপস্থাপন করা হয়, সুতরাং আমি পছন্দ করি আমার আমলসমূহ রোজা অবস্থায় উপস্থাপন করা হোক। (৪১৩)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রচণ্ড রোদ্র-তাপের দিনে রোজা রাখতে ভালোবাসতেন। যেমন হজরত আবু দারদা রা. বলেন, রমজান মাসে প্রচণ্ড গরমের দিনে আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যাত্রা করলাম। গরম এত তীব্র ছিল যে, আমাদের সকলেই গরমের তীব্রতা থেকে বাঁচার জন্য মাথার ওপর হাত রেখে নিজেকে আড়াল করছিল। এ সময় নবীজি ও ইবনে রাওয়াহা ব্যতীত আমাদের কেউই রোজা অবস্থায় ছিলেন না। (৪১৪)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার শোকর আদায়ের বোধ ও চেতনা নিয়ে ইবাদত করেছেন, নিছক দায়িত্ব আদায়ের জন্য নয়। তিনি ইবাদত করেছেন নিজের স্বতঃস্ফূর্ততা, আত্মত্যাগ এবং প্রতিদান বৃদ্ধির মানসিকতা নিয়ে, আবশ্যক কর্তব্য সম্পাদনের জন্য নয়। এ কারণে তাঁর ইবাদতের রং, রূপ ও চিত্র ছিল খুবই মনকাড়া ও অনন্য।

টিকাঃ
৪০৪. সহিহ বুখারি: ৪৮৩৭, সহিহ মুসলিম: ২৮২০।
৪০৫. সহিহ বুখারি: ৯৯৪, সুনানে আবু দাউদ: ১৩৩৬।
৪০৬. সহিহ মুসলিম: ৭৭২, সুনানে নাসায়ি: ১১৩৩, মুসনাদে আহমাদ: ২৩৪১৫।
৪০৭. সুনানে আবু দাউদ: ২৪২৯, মুসনাদে আহমাদ: ৮৪৮৮।
৪০৮. সহিহ মুসলিম: ৭৪৬, মুসনাদে আহমাদ: ২৪৩১৪, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৫৫২।
৪০৯. সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৮৫, মুসনাদে আহমাদ: ২৩১৩৭, আল মুজামুল কাবির: ৬২১৫।
৪১০. মুসনাদে আহমাদ: ১৩৫২৬, সুনানে নাসায়ি: ৩৯৩৯, আল মুজামুল কাবির: ১৭৩৮৮।
৪১১. সহিহ মুসলিম: ৩৭৩, সুনানে তিরমিজি: ৩৩৮৪, সুনানে আবু দাউদ: ১৮।
৪১২. সহিহ বুখারি: ১৯২০, মুসনাদে আহমাদ: ২৪৪২২, সহিহ ইবনে খুজাইমা: ২০২৯।
৪১৩. সুনানে তিরিমিজি: ৭৪৭, মুসনাদে আহমাদ: ২১৮০১, সুনানে নাসায়ি: ২৩৫৮।
৪১৪. সহিহ বুখারি: ১৯৪৫, সহিহ মুসলিম: ১১২২।

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 উম্মতের প্রতি নবীজি ﷺ-এর দরদ

📄 উম্মতের প্রতি নবীজি ﷺ-এর দরদ


আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে পাঠিয়েছেন মানবজাতির জন্য ভ্রষ্টতা ও বিচ্যুতি থেকে রক্ষার মাধ্যমরূপে, এ কারনেই তিনি মানবজাতির মুক্তির দূত হওয়ার অধিকার ও সক্ষমতা অর্জন করেছেন। তাঁর হৃদয়জুড়ে ছিল উম্মতের জন্য সীমাহীন দরদ ও ভালোবাসা। যে ব্যক্তি মানবজাতিকে প্রীতি ও ভালোবাসার মূল্যবোধে দীক্ষিত করতে চায়, হেদায়েতের পথ দেখাতে চায়, তার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাচার হলো এক বিরাট উৎস। উম্মতের প্রতি এই দরদ তাঁর ভালোবাসা ও স্নেহের কারনেই ছিল, এটা তাঁর নবুয়তের সত্যতার ওপর একটি স্পষ্ট প্রমান। এ কারণে উম্মতের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়া, দরদ ও সহানুভূতির কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
(হে মানুষ,) তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে এক রাসুল এসেছে। তোমাদের যেকোনো কষ্ট তাঁর জন্য অতি পীড়াদায়ক। সে সতত তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত সদয়, পরম দয়ালু। [সুরা তাওবা : ১২৮]
উম্মতের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরদ ও সহানুভূতি এতটা উচ্চতায় পৌঁছেছিল যে, কোনো মানুষের দ্বারা তা কল্পনা করাও সম্ভব নয়। যেমন ইসলামের দাওয়াতের প্রাথমিক যুগে মক্কার দুর্বল স্বল্প মুসলমানদের ওপর কাফেরদের অত্যাচার চরমে উপনীত হয়েছিল। مسلمانوں জন্য নিজেদের দ্বীন পালন করাও কষ্টকর হয়ে উঠছিল। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের প্রতি সহমর্মী হয়ে তাদের হাবশায় হিজরত করার নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি তাদেরকে বলেন, 'তোমরা হাবশায় হিজরত করলে, ভালো হয়। সেখানে এমন এক বাদশা আছেন, যার নিকট কারও ওপর অত্যাচার করা হয় না। তা হলো ন্যায়ের ভূমি। তাহলে হয়তো আজ তোমরা যে কষ্টের মধ্যে আছ, আল্লাহ তাআলা তোমাদের তা থেকে মুক্তি প্রদান করবেন।'(৪১৫)
এ ছাড়া আমরা আরও দেখি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন অনেক আমল থেকে বিরত থেকেছেন, যেটা ছিল তাঁর নিকট অতি প্রিয় ও পছন্দনীয়। সেই আমল থেকে বিরত থাকার একটাই উদ্দেশ্য ছিল, এটা যেন তাঁর উম্মতের ওপর ফরজ না হয়ে যায়, তখন এটা তাদেরকে কষ্ট দেবে, তাদের ওপর কঠিন হয়ে যাবে। এ বিষয়ে হজরত আয়েশা রা. বলেছেন,
«إِنْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيَدَعُ الْعَمَلَ وَهُوَ يُحِبُّ أَنْ يَعْمَلَ بِهِ خَشْيَةَ أَنْ يَعْمَلَ بِهِ النَّاسُ فَيُفْرَضَ عَلَيْهِمْ»
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আমল করা পছন্দ করতেন, সে আমল কোনো কোনো সময় এ আশঙ্কায় ছেড়েও দিতেন যে, সে আমল লোকেরা করতে থাকবে, ফলে তাদের ওপর তা ফরজ হয়ে যাবে। (৪১৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে বিভিন্ন গুনাহ থেকে সতর্ক করতেন এবং গুনাহগুলো সাধারণ মনে হলেও সেগুলোর ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিতেন। যেমন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা ছোট গুনাহগুলো থেকেও বেঁচে থাকো। কেননা এগুলো একজন মানুষের ওপর জমা হতে হতে এত বেশি হয়ে যায় যে, সেগুলো লোকটিকে ধ্বংস করে ফেলে।
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব গুনাহের একটি দৃষ্টান্তও প্রদান করেছেন। নবীজি বলেন, যেমন কোনো সম্প্রদায় একটি নির্জন ভূমিতে অবতরণ করল। এরপর যখন তাদের খাবার তৈরির সময় হলো তখন একজন গিয়ে একটি কাঠ নিয়ে এলো। অন্যজন আরেকটি নিয়ে এলো। এভাবে তারা একে একে অনেক কাঠ জমা করল। এরপর তারা আগুন প্রজ্বলিত করল। সেই আগুনে নিজেদের খাবার রান্না করে নিলো। ছোট ছোট গুনাহের অবস্থাও এমন। অল্প অল্প অনেক হয়ে একসময় সবকিছু জ্বালিয়ে দিতে সক্ষম হয়ে ওঠে। (৪১৭)
উম্মত যেন বিভ্রান্ত ও বিপথগামী না হয়, এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের এমন পথভ্রষ্ট নেতা ও ইমামদের বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যারা উম্মতকে ধ্বংস করবে ও অনিষ্টের দিকে নিয়ে যাবে। এ কারণে তিনি উম্মতকে সম্বোধন ও সতর্ক করে বলেছেন,
«أَنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الْأَئِمَّةُ الْمُضِلُّوْنَ»
আমি তোমাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভয় করি পথভ্রষ্ট নেতা ও ইমামদের নিয়ে। (৪১৮)
মুমিনদের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরদ ও সহানুভূতি দ্বীনের অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও সমানভাবে বিদ্যমান ছিল। বিশেষ করে ইবাদতের ক্ষেত্রে। যদিও আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা এবং তাঁর প্রতি অনুরক্ত হওয়া সব সময়ই একটি প্রশংসা ও উৎসাহের বিষয়, বরং এ ব্যাপারে মানুষকে আদেশও প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের ওপর দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ির ভয় করেছেন, যার ফলে তারা তাদের জীবনের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে। এ কারণে তিনি বলেছেন,
لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي لَأَخَّرْتُ صَلَاةَ الْعِشَاءِ إِلَى ثُلُثِ اللَّيْلِ أَوْ نِصْفِ اللَّيْلِ»
আমি যদি আমার উম্মতের ওপর কষ্টের ভয় না করতাম, তবে এশার নামাজকে রাত্রের এক-তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক পর্যন্ত বিলম্বের আদেশ দিতাম। (৪১৯)
এ হাদিসসহ আরও অনেক হাদিস উম্মতের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসার পরিধি ও পরিব্যাপ্তি প্রকাশ করে। প্রকাশ করে উম্মতের প্রতি তাঁর সীমাহীন সহানুভূতি ও সহমর্মিতা। এটাও বোঝা যায়, উম্মতের দ্বীনি বিষয়ে তিনি তাদের কল্যাণের ক্ষেত্রে কতটা দয়ার্দ্র ও আগ্রহী ছিলেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় মানুষের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ ও দয়া প্রকাশের সুযোগের অপেক্ষায় থাকতেন। যেকোনো বৈধ বিষয়েই অনুগ্রহ প্রদর্শনের কোনো সুযোগ তিনি হাতছাড়া করতেন না। যেমন তিনি একবার শুনলেন তাঁর তিনজন সাহাবি নিজেদের ওপর অস্বাভাবিক কষ্ট চাপিয়ে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা বা ইচ্ছা করেছে, তাদের ধারণায় এটা ছিল আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের বড় মাধ্যম। হজরত আনাস রা. ঘটনাটি বর্ণনা করে বলেন, তিনজনের একটি দল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার জন্য তাঁর স্ত্রীদের ঘরে এলো। অতঃপর তাদের যখন নবীজির ইবাদত সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা নিজেদের ইবাদতের পরিমাণকে অতি সামান্য মনে করল এবং বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। (তবুও তিনি এত ইবাদত করেন! তাহলে আমাদের কত ইবাদত করা উচিত! এই ভাবনা থেকে) তাদের একজন বলল, আমি সারাজীবন রাতভর নামাজ আদায় করব। আরেকজন বলল, আমি অব্যাহতভাবে আজীবন রোজা রেখে যাব কখনো বাদ দেবো না। অন্যজন বলল, আমি নারীসঙ্গ ত্যাগ করব, কখনো বিয়ে করব না।
(এই কথা রাসুলের কানে গেলে। তখন) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এসে বললেন, 'তোমরা কি এমন এমন কথা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি। অথচ আমি রোজা পালন করি, আবার তা থেকে বিরত থাকি। নামাজ আদায় করি এবং নিদ্রাও যাই এবং নারীদের বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। (৪২০)
সুন্দর হয়, যদি আমরা এই আলোচনা এমন একটি বিষয়ের মাধ্যমে শেষ করি, যা প্রতিফলিত করবে উম্মতের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীমাহীন দয়া, দরদ, সহানুভূতি এবং তাদের জন্য তাঁর ব্যস্ততা ও উদ্বিগ্নতা। সেই সাথে প্রকাশ করবে তাঁর এই দরদের প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের গুরুত্ব প্রদানের বিষয়কে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বিষয়ে আল্লাহ তাআলার এই বাণী তিলাওয়াত করলেন,
رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
হে আমার প্রতিপালক! ওইসব প্রতিমা বিপুল সংখ্যক মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে। সুতরাং যে-কেউ আমার অনুসরণ করবে, সে আমার দলভুক্ত আর কেউ আমাকে অমান্য করলে (তার বিষয়টা আমি আপনার ওপর ছেড়ে দিচ্ছি), আপনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সুরা ইবরাহিম: ৩৬] এরপর হজরত ইসা আলাইহিস সালামের বিষয়ে এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন,
إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা তো আপনারই বান্দা। আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তবে নিশ্চয় আপনিই মহাপরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়। [সুরা মায়িদা: ১১৮] এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাশের দিকে নিজের দুহাত তুলে বলতে থাকলেন, اللَّهُمَّ أُمَّتِي أُمَّتِي হে আল্লাহ, আমার উম্মত... আমার উম্মত (আমার উম্মতকে রক্ষা করো)। এটা বলে কাঁদতে লাগলেন। তখন মহান আল্লাহ তাআলা বললেন, হে জিবরাইল! তুমি নবী মুহাম্মাদের নিকট যাও, তোমার রব তো সবই জানেন, তবু তাঁকে জিজ্ঞেস করো, আপনি কাঁদছেন কেন?
জিবরাইল আলাইহিস সালাম দুনিয়ায় এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ক্রন্দনের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বে যা বলেছিলেন, তা জিবরাইলকে অবহিত করলেন। আর আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ।
(জিবরাইল আল্লাহ তাআলাকে জানানো শেষে) আল্লাহ তাআলা বললেন, হে জিবরাইল, তুমি আবার মুহাম্মাদের কাছে যাও এবং তাঁকে বলো, নিশ্চয় আমি আপনার উম্মতের ব্যাপারে আপনাকে সন্তুষ্ট করে দেবো, আপনাকে অসন্তুষ্ট করব না। (৪২১)

টিকাঃ
৪১৫. বাইহাকি: ১৮১৯০, ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৩২২, ৩২৩।
৪১৬. সহিহ বুখারি: ১১২৮, ১১৭; সহিহ মুসলিম: ৭১৮।
৪১৭. মুসনাদে আহমাদ: ৩৮১৮, তাবারানি: মুজামুল কাবির: ৫/৪৪৯, শুআবুল ঈমান: ৭০১৭।
৪১৮. সুনানে আবু দাউদ: ৪২৫২, মুসনাদে আহমাদ: ২৭৫২৫, সুনানে দারেমি: ২১১, সুনানে তিরমিজি: ২২২৯।
৪১৯. সুনানে তিরমিজি: ২৩, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৬৯১।
৪২০. সহিহ বুখারি: ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম: ১৪০১।
৪২১. সহিহ মুসলিম: ২০২, সুনানে নাসায়ি : ১১২৬৯, মুজামুল কাবির : ১৫১৫ শুআবুল ঈমান : ৩০৮, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৭৩৫৭

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 নবীজি ﷺ-এর স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন জীবন

📄 নবীজি ﷺ-এর স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন জীবন


নবুয়তপ্রাপ্তির আগে ও পরে সব সময়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন ছিল পরিপূর্ণ স্বচ্ছ, নৈতিকতাপূর্ণ এবং মহান চারিত্রিক গুণাবলিতে ভরপুর। সেই জাহেলি পরিবেশে এতগুলো মহৎ গুণ কারও মধ্যে থাকা ছিল একটি অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু নবীজির মধ্যে সব ধরনের মহৎ গুণ একত্রিত হয়েছিল। তিনি সত্যবাদিতা ও আমানতদারির জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। বিষয় টা এতই বিস্ময়কর ছিল যে, যারা ছিল তাঁর প্রাণের শত্রু, যারা কিছুতেই তাঁর আহ্বানের প্রতি ঈমান আনেনি, সেই ঘোর বিরোধী শত্রুরাও তার নিকট নিজেদের সম্পদ আমানত রাখত। এদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারিত্রিক গুণাবলি এতটাই উচ্চ ও মহান ছিল যে, সম্প্রদায়ের ভীষণ শত্রুতাও তাঁর আমানতদারিকে ভুলিয়ে দেয়নি। এ কারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হিজরতের রাতে কাফেরদের এসব আমানত ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য হজরত আলি রা.-কে প্রতিনিধি হিসেবে রেখে গিয়েছিলেন, অথচ এসব আমানতদাতারা সে রাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছিল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুরভিত জীবনের দিকে লক্ষ করলে, আমরা তাঁর জীবনের স্বচ্ছতা অনুধাবন করতে পারব এবং দেখতে পাব, কীভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁকে সকল মলিনতা থেকে পবিত্র রেখেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনকে গড়ে তোলা হয়েছে আল্লাহ তাআলার বিশেষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। যোগ্য করে তোলা হয়েছে সর্বশেষ নবী ও রাসুল হওয়ার জন্য। এ কারণে নবুয়তের পূর্ব থেকেই জাহেলি যুগের সকল চারিত্রিক কলুষতা থেকে আল্লাহ তাআলা তাঁর যৌবনের স্বভাবকে পবিত্র রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে গুনাহের সকল পঙ্কিলতা ও কলুষতা থেকে মুক্ত রেখেছেন। যেমন ইবনে ইসহাক ও অন্যরা বলেছেন, জাহেলিয়াতের সকল খারাবি ও ত্রুটি থেকে মুক্ত রেখেছিলেন। (৪২২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পবিত্র রাখা এবং তাঁকে জাহেলি যুগের সকল খারাবি থেকে মুক্ত রাখার একটি প্রমাণ হলো নাবালেগ অবস্থায়ও তাঁর বস্ত্রহীন না হওয়া। এ ব্যাপারে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বর্ণনা করে বলেন, আমার স্মরণ হয়, আমি তখন কুরাইশ বাচ্চাদের মাঝে অবস্থান করছিলাম। বাচ্চাদের কিছু খেলার জন্য আমরা পাথর বয়ে আনছিলাম। বাচ্চাদের সকলেই ছিল বিবস্ত্র। কারণ, সকলেই তার লুঙ্গি খুলে কাঁধে নিয়েছিল। আর তার ওপর পাথর নিয়ে বয়ে আনছিল। আমি যখন তাদের সাথে অগ্রসর হচ্ছিলাম এবং পেছনে তাকালাম, হঠাৎ একজন মুষ্টিপাকানো ব্যক্তি আমাকে ভীষণ জোরে একটি ঘুষি দিলো এবং বলল, 'তুমি তোমার লুঙ্গি ভালো করে পরিধান করে নাও।' ফলে আমি আমার লুঙ্গি নিয়ে ভালো করে সতর ঢেকে বেঁধে নিলাম। এরপর আমি আমার সাথিদের মাঝে একাই লুঙ্গি পরিধান করে শূন্য কাঁধে পাথর টানতে লাগলাম। (৪২৩)
জাহেলি যুগে কুরাইশদের কাবাঘর পুনর্নির্মাণের সময়ও এ রকম একটি ঘটনা ঘটেছিল। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেন, আমার পিতা আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব বর্ণনা করে বলেন, কুরাইশরা কাবাঘর নির্মাণের সময় দুইজন দুইজন করে দল বানিয়ে পাথর বহন করছিল। তখন আমি এবং আমার ভাতিজা (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের লুঙ্গি কাঁধে দিয়ে তার ওপর পাথর রেখে বহন করছিলাম। তবে যখন মানুষের ভিড় হয়ে যেত, তখন আমরা লুঙ্গি পরে নিতাম। একবার মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার আগে ছিলেন। হঠাৎ তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। আমি তাঁকে খোঁজ করতে এসে দেখি তিনি আকাশের দিকে অনিমিষ নেত্রে তাকিয়ে আছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে ভাতিজা, 'তোমার কী হলো?' তিনি বললেন, 'আমাকে বিবস্ত্র চলাফেরা করতে নিষেধ করা হয়েছে।'
আব্বাস রা. বলেন, আমি এই ঘটনা গোপন করে রেখেছিলাম। এভাবেই একদিন আল্লাহ তাআলা তাঁকে নবুয়ত প্রদান করলেন। (৪২৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সবরকম ত্রুটি ও খারাবি থেকে মুক্ত রাখার আরেকটি উদাহরণ হলো, তিনি কখনো অনর্থক খেলা ও গান শোনার দিকে ধাবিত হননি। এ বিষয়ে হজরত আলি রা. বর্ণনা করে বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, মূর্খতার যুগে মানুষেরা যে গানের দিকে ধাবিত হতো, দুটি রাত ছাড়া আমি কখনো তার ইচ্ছাও করিনি। তবে সেই দুটি রাতেও আল্লাহ তাআলা জাহেলিয়াতের এই কর্ম থেকে আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
একরাতের ঘটনা এই যে, মক্কার কিছু বালকসহ আমরা পরিবারের ছাগল চরাচ্ছিলাম। আমি আমার সঙ্গীকে বললাম, 'তুমি আমার ছাগলগুলো দেখে রেখো। আমি মক্কা যাব এবং যুবকরা যেমন কিচ্ছা-কাহিনি শোনে, আমিও শুনব।'
সঙ্গী বলল, 'ঠিক আছে, যাও।'
আমি মক্কা এলাম এবং সেখানকার গৃহসমূহের মধ্যে প্রথম গৃহের নিকট উপস্থিত হলাম। আমি সেখানে ক্রীড়া, কৌতুক ও ঢোলবাজনার শব্দ শুনতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, 'এখানে কী হচ্ছে?' আমাকে বলা হলো, 'অমুক ব্যক্তি অমুক মহিলাকে বিয়ে করছে।' আমি সেখানে দৃশ্যাবলি দেখার উদ্দেশ্যে বসে পড়লাম। তখনই আল্লাহ তাআলা আমার চোখে নিদ্রা চাপিয়ে দিলেন। আল্লাহর কসম, আমি পরদিন রোদ্রের খরতাপে জাগ্রত হলাম। এরপর আমি আমার সঙ্গীর কাছে ফিরে গেলাম। সে জিজ্ঞাসা করল, 'গতরাতে কী করেছ?' আমি বললাম, 'কিছুই না।' এরপর যে পরিস্থিতি দেখেছিলাম, তা তার নিকট বর্ণনা করলাম।
অতঃপর অপর এক রাতেও আমি আমার সঙ্গীকে বললাম, 'আমার ছাগলগুলো দেখে রেখো। আমি কিচ্ছা-কাহিনি শোনার জন্য মক্কা যাচ্ছি।' আমি মক্কা এলাম এবং প্রথম রাতের মতো কথাবার্তা শুনলাম। আমিও সেগুলো দেখার জন্য বসে গেলাম। তখনই আল্লাহ তাআলা আবার আমাকে ঘুমে অচেতন করে দিলেন। আল্লাহর শপথ! পরদিন রোদের খরতাপে আমার ঘুম ভাঙল। আমি আমার সঙ্গীর কাছে ফিরে এলাম। সে জিজ্ঞাসা করল, 'কী করলে?' আমি বললাম, 'কিছুই না।' এরপর তাকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করলাম।
আল্লাহর কসম! এই দুইরাতের পরে আমি আর কখনো কোনো খেলতামাশায় যোগ দেওয়ার ইচ্ছাও করিনি এবং শেষপর্যন্ত আল্লাহ তাআলা আমাকে নবুয়ত প্রদান করলেন। (৪২৫)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনে কখনো মদ পান করেননি। কোনোদিন কোনো মূর্তিকে সেজদা করেননি। যেমন আলি রা. বর্ণনা করেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনি কি কখনো মূর্তিদের ইবাদত করেছেন?' নবীজি বললেন, 'না।'
সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'আপনি কি কখনো মদ পান করেছেন?' নবীজি বললেন, 'না। এসব কাজ যে খারাপ ও গর্হিত, তা আমি জানতাম। অথচ আমি তখন পর্যন্ত কিতাব ও ঈমান সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলাম না।' (৪২৬)
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোনো মূর্তিকে সেজদা করেননি। শিশুকালে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের লালনকারী উম্মে আইমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বুয়ালা নামক এক মূর্তির কাছে কুরাইশরা বছরে একবার একত্র হতো। আবু তালিবও নিজের গোত্রসহ এই মূর্তির কাছে একত্র হতেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও সেখানে সকলের সাথে একত্র হতে নির্দেশ প্রদান করতেন। কিন্তু তিনি সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জানাতেন। এ কারণে একবার আবু তালিব নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি খুব রাগ হলেন। তাঁর ফুফুরাও সেদিন তাঁর প্রতি খুব অসন্তুষ্ট হলেন। তারা বললেন, হে মুহাম্মাদ, তুমি কি তোমার জাতির উৎসবে উপস্থিত হয়ে তাদের সমাবেশের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে চাও না? এভাবে তারা নবীজিকে পীড়াপীড়ি করতে থাকলে তিনি সেখান থেকে চলে গেলেন এবং বেশ কিছুদিন একেবারে নিখোঁজ হয়ে রইলেন, মাশাআল্লাহ।
অতঃপর ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তিনি একসময় ফিরে এলেন। ফুফুরা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমায় কে কষ্ট দিয়েছে? তিনি বললেন, আমি নিজের ব্যাপারে উন্মাদনার ভয় করি। তাঁর ফুফুরা বললেন, 'আল্লাহ শয়তান দ্বারা তোমাকে পরীক্ষা করবেন না। কারণ, তোমার মধ্যে এমন ভালো গুণাবলি রয়েছে, যার যোগ্য শুধু তুমিই। তুমি কী দেখে ভয় পেয়েছ?'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমি যখনই মূর্তির নিকটবর্তী হলাম, তখন সাদা পোশাক পরিহিত দীর্ঘদেহী এক ব্যক্তি আমার সামনে আবির্ভূত হলো। সে আমাকে সজোরে আওয়াজ দিলো, মুহাম্মাদ! এর কাছ থেকে দূরে থাকো এবং একে স্পর্শ করো না।' উম্মে আয়মান বলেন, এরপর তিনি আর কখনো কুরাইশদের ধর্মীয় উৎসবগুলোর ধারেকাছেও যাননি। (৪২৭)
এমনইভাবে নবুয়তপ্রাপ্তির পরও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে যাননি। কখনো তিনি ভোগবিলাস ও আনন্দ-ফুর্তি অন্বেষণ করেননি। যেমন ধরুন, কুরাইশদের নেতাবর্গ যখন তাঁর নিকট ইসলামের আহ্বান থেকে বিরত থাকার বিনিময়ে দুনিয়ার সকল ভোগ্য জিনিস প্রদানের প্রস্তাব করল, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, 'আমি তোমাদের নিকট যে বার্তা নিয়ে এসেছি, তার দ্বারা আমি তোমাদের কোনো সম্পদ অন্বেষণ করি না। তার দ্বারা তোমাদের মাঝে সম্মানও চাই না। তোমাদের ওপর কর্তৃত্বও দেখাতে চাই না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাকে তোমাদের নিকট একজন রাসুল (বা বার্তাবাহক) হিসেবে পাঠিয়েছেন। তিনি আমার ওপর কিতাব নাজিল করেছেন। তিনি আমাকে তোমাদের জন্য একজন সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী হওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছেন। সুতরাং আমার প্রতিপালকের দেওয়া দায়িত্ব আমি তোমাদের নিকট পৌঁছে দিয়েছি। তোমাদের কল্যাণ কামনা করেছি। এখন আমি তোমাদের নিকট যে বার্তা নিয়ে এসেছি, তোমরা যদি তা আমার থেকে গ্রহণ করো, তাহলে সেটা তোমাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণকর হবে। আর যদি তা আমার সামনে প্রত্যাখ্যান করো, তবে আমি আল্লাহ তাআলার ফয়সালার জন্য ধৈর্যধারণ করব, এ সময় তিনিই আমার মাঝে এবং তোমাদের মাঝে ফয়সালা করে দেবেন। (৪২৮)
কাফেররা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যতই মিথ্যারোপ এবং তাঁর অবাধ্যতা করুক, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিজের লক্ষ্যটি ছিল একেবারে স্পষ্ট এবং আল্লাহ তাআলার সাহায্যের ব্যাপারে তাঁর আস্থা ও বিশ্বাস ছিল পরিপূর্ণ। তিনি তাঁর লক্ষ্য থেকে সামান্যতমও বিচ্যুত হননি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের পূর্ণতা ও স্বচ্ছতার আরেকটি দিক হলো, তিনি কখনো তাঁর সম্প্রদায় ও অনুসারীদের ওপর নিজের বড়ত্ব ও মহত্ত্ব প্রকাশের কোনো সুযোগ খোঁজেননি, এ ব্যাপারে অনেক সাক্ষ্য ও প্রমাণ রয়েছে। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র ইবরাহিম মারা যাওয়ার সময়ে সূর্যগ্রহণ হয়। ঘটনাটি হজরত মুগিরা ইবনে শুবা রা. বর্ণনা করে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে তাঁর পুত্র ইবরাহিমের মৃত্যুর দিন সূর্যগ্রহণ হয়। লোকজন বলতে লাগল-ইবরাহিমের মৃত্যুর কারণে সূর্যগ্রহণ হয়েছে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কথাকে প্রত্যাখ্যান করে বললেন,
إِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ آيَةٌ مِنْ آيَاتِ اللهِ لَا يَكْسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلَا لِحَيَاتِهِ فَإِذَا رَأَيْتُمْ ذَلِكَ فَصَلُّوْا وَادْعُوا اللَّهَ
নিশ্চয় সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহ তাআলার নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম নিদর্শন। কারও মৃত্যু ও জন্মের কারণে এগুলোতে গ্রহণ লাগে না। বরং তোমরা যখন এটা দেখবে, তখন সালাত আদায় করবে এবং আল্লাহকে স্মরণ করবে। (৪২৯)
এমতাবস্থায় কোনো মিথ্যাবাদী অথবা প্রতারক থেকে কখনো এ ধরনের সত্যকথন প্রকাশ পেত না। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি নবী না হয়ে মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার হতেন, তাহলে তিনি কিছুতেই এ ধরনের মহা সুযোগ হাতছাড়া করতেন না বরং বলতেন, দেখো... দেখো, সূর্যও আমার দুঃখে দুঃখিত হয়েছে। তাতে গ্রহণ লেগেছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কিছু করেননি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতার আরেকটি দিক হলো, সর্বক্ষেত্রে নিজের মানবীয় পরিচয় প্রকাশের আগ্রহ। তিনি বলতেন যে, মুহাম্মাদ বনি আদমের মধ্য থেকে একজন মানুষ, তিনি পিতামাতার মাধ্যমে জন্ম নিয়েছেন। পানাহার করেন। বিবাহ করেন। ক্ষুধার্ত হন এবং অসুস্থ হন। আনন্দিত হন এবং দুঃখিতও হন। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এই কথাটির ওপর তিনি অত্যধিক জোর দিতেন এবং মানুষের সামনে এগুলো বারবার বলতেন। এখানে আমরা উদাহরণ হিসেবে জারির ইবনে আবদুল্লাহ রা.-এর অবস্থানটি উপস্থাপন করতে পারি। তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে একজন লোককে আনা হলো। ভয়ে লোকটির বুক ও ঘাড়ের শিরা কাঁপছিল। এটা দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'তুমি স্বাভাবিক হও, সহজ হও। আমি কুরাইশের এমন এক সাধারণ নারীর পুত্র, যিনি এই উপত্যকায় শুষ্ক লবণাক্ত গোশত খেয়ে জীবন ধারণ করেছেন।' এরপর জারির ইবনে আবদুল্লাহ আল বাজালি রহ. এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন,
وَمَا أَنْتَ عَلَيْهِمْ بِجَبَّارٍ فَذَكِّرْ بِالْقُرْآنِ مَنْ يَخَافُ وَعِيْدِ
তুমি তাদের ওপর জবরদস্তিকারী নও। আমার সতর্কবাণীকে ভয় করে এমন প্রত্যেককে তুমি কুরআনের সাহায্যে উপদেশ দিতে থাকো। [সুরা কাফ: ৪৫] (৪৩০)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতার আরেকটি মহান দৃষ্টান্ত হলো, আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিরস্কার করেছেন এবং সেই তিরস্কারের কথা কুরআনুল কারিমে অন্তর্গত হওয়া। যাতে এটা চিরদিন মানুষদের মাঝে সংরক্ষিত হয়ে থাকে। এই তিরস্কারই আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের স্বচ্ছ-সুস্পষ্ট, সকলেই তাঁর গোপন বা প্রকাশ্য বিষয় জানে। এটা কি কোনো ভণ্ড, প্রতারক ও মিথ্যাবাদীর জীবনের ক্ষেত্রে সম্ভব হতো? কিছুতেই না। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ ধরনের তিরস্কারের একটি উদাহরণ হলো এই, আল্লাহ তাআলা বলেন,
عَبَسَ وَتَوَلَّى أَنْ جَاءَهُ الْأَعْمَى
(রাসুল) মুখ বিকৃত করলেন ও চেহারা ফিরিয়ে নিলেন। কারণ তাঁর কাছে অন্ধ লোকটি এসে পড়েছিল। [সুরা আবাসা: ১-২]
এই ঘটনাটি ঘটে, যখন অন্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসেন। তখন নবীজি কুরাইশদের বড় বড় নেতাকে দাওয়াত প্রদানে ব্যস্ত ছিলেন। এ কারণে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রা.-এর দিকে তেমন দৃষ্টি প্রদান করেননি। তখনই আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিরস্কার করে এই আয়াত নাজিল করেন। এর মাধ্যমে এটি এমন এক কুরআনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল যা কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত ও পঠিত হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুরো জীবনে এমন আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তিরস্কার এসেছে।
এমন ছিল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন, সবচেয়ে স্বচ্ছ, সবচেয়ে সুন্দর, স্পষ্ট ও নির্মল, যাতে কোনো কলুষতা রাখা হয়নি। অতএব, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নবীজির বার্তাটিই সর্বশেষ বার্তা।

টিকাঃ
৪২২. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/১৮৩, ইবনে কাছির : আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ২/২৮৬।
৪২৩. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়‍্যা: ১/১৮৩, সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ: ১/৩১২, সালেহি শামি: সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ: ২/১৪৭
৪২৪. মুসনাদুল বাজজার: ১২৯৫, ইবনে আসেম শাইবানি: আল-আহাদ ওয়াল-মাছানি: ১/২৭১, সালেহি শামি: সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ: ২/১৪৭, ইবনে কাছির আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/২৫১।
৪২৫. সহিহ ইবনে হিব্বান: ৬২৭২, মুসতাদরাকে হাকেম: ৭৬১৯।
৪২৬. সালেহি শামি : সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ: ২/১৪৯, আল-মুত্তাকি আল-হিন্দি : কানজুল উম্মাল : ৩৫৪৩৯, আশ-শাওকানি: ফাতহুল কাদির: ৪/৫৪৬।
৪২৭. ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা ১/১৫৮, সালেহি শামি: সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ: ২/১৪৯, ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ১/৬৬।
৪২৮. খলকু আফআলিল ইবাদ, পৃষ্ঠা: ১৮৬ (৪০৮), ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৪৭৯।
৪২৯. সহিহ বুখারি: কিতাবুল কুসুফ; বাবুস সালাত ফি কুসুফিস শামস : ১০৪৪, সহিহ মুসলিম: কিতাবুল কুসুফ: বাবু সালাতিল কুসুফ: ৯০১।
৪৩০. মুসতাদরাকে হাকেম: ৩৭৩৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00