📄 দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনে নবীজি ﷺ
দারিদ্র্য ও বেকারত্ব-ইসলাম এ দুটি সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে খুব গুরুত্ব প্রদান করেছে। এর উদ্ভব ও উৎপত্তির পূর্বেই বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগে এর শিকড় কেটে ফেলার ব্যাপারে উৎসাহ দেখিয়েছে। যাতে মুসলিমসমাজকে নৈতিক, চারিত্রিক ও বিশ্বাসগত দিকের সমূহ অনিষ্ট থেকে রক্ষা করা যায়। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যান আমাদের জানিয়েছে, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে সেইসব ব্যক্তির ওপর যারা ধর্মের দৃঢ় বিশ্বাস ও শরিয়তের অনুশাসনের বাইরে অবস্থান করে। যেমন তারা বিভিন্ন নেশা, মাদকদ্রব্য গ্রহণে জড়িয়ে পড়ে। তদ্রূপ হত্যা, ছিনতাই, ইত্যাদিতেও এই বেকারদের উপস্থিতি বাড়ছে। এ কারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও আল্লাহ তাআলার নিকট দারিদ্র্য থেকে মুক্ত থাকার জন্য বেশি বেশি দোয়া করতেন। এমনকি তিনি যে দোয়ায় কুফর থেকে আশ্রয় চাইতেন, সেই একই দোয়ায় দারিদ্র্যের ব্যাপারেও আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। যেমন তিনি বলতেন,
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْكُفْرِ وَالْفَقْرِ»
হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট কুফরি এবং দারিদ্র্য থেকে পানাহ চাই। (৩৬৫)
আজকের আধুনিক বিশ্বে যেমন দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সমস্যা রয়েছে, অতীতেও এই সমস্যা ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমাধানে ইসলামের শিক্ষা ও বিধানাবলির আলোকে ক্রমান্বয় পদ্ধতির কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমে তিনি মানুষদের উৎসাহিত করেছিলেন যেকোনো ধরনের কাজ ও পেশায় নিয়োজিত থাকতে। বস্তুত নবীরাও বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তারা মানুষদের সামনে কর্মের এবং হালাল উপার্জনের উচ্চমানের আদর্শ ও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত দাউদ আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে বলেন,
مَا أَكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ أَنْ يَأْكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ وَإِنَّ نَبِيَّ اللَّهِ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلَامِ كَانَ يَأْكُلُ مِنْ عَمَلٍ يَدِهِ
নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ আলাইহিস সালাম নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন। (৩৬৬)
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ্য ও অনুসরণীয়, সেটা হলো তিনি নিজেও ছাগল চরিয়েছেন এবং নবুয়তপ্রাপ্তির আগে হজরত খাদিজা রা.-এর সম্পদের মাধ্যমে ব্যবসার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। যেমন হজরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَا بَعَثَ اللَّهُ نَبِيًّا إِلَّا رَعَى الْغَنَمَ، فَقَالَ أَصْحَابُهُ وَأَنْتَ؟ فَقَالَ نَعَمْ، كُنْتُ أَرْعَاهَا عَلَى قَرَارِيطَ لِأَهْلِ مَكَّةَ
আল্লাহ তাআলা এমন কোনো নবী প্রেরণ করেননি, যিনি ছাগল চরাননি। তখন তাঁর সাহাবিগণ বললেন, আপনিও কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমিও কয়েক কিরাতের (মুদ্রা) বিনিময়ে মক্কাবাসীদের ছাগল চরাতাম। (৩৬৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল (বৈধ) কর্মকেই সম্মান, মর্যাদা ও গুরুত্বের চোখে দেখতেন, কাজটি যা-ই হোক না কেন। কেননা, মানুষের নিকট হাত পাতা এবং তাদের সামনে লাঞ্ছিত হওয়ার চেয়ে নিজে কাজ করে খাওয়াই উত্তম। এ বিষয়টি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাদিসে ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবে,
لَأَنْ يَأْخُذَ أَحَدُكُمْ حَبْلَهُ فَيَأْتِيَ بِحُرْمَةِ الْحَطَبِ عَلَى ظَهْرِهِ فَيَبِيعَهَا فَيَكُفَّ اللَّهُ بِهَا وَجْهَهُ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَسْأَلَ النَّاسَ أَعْطَوْهُ أَوْ مَنْعُوهُ
তোমাদের কেউ রশি নিয়ে গিয়ে পিঠে করে কাঠের বোঝা বয়ে আনে এবং তা বিক্রি করে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তার চেহারাকে (ভিক্ষা করার লাঞ্ছনা থেকে) রক্ষা করেন, তার জন্য এটাই উত্তম মানুষের কাছে হাত পেতে বেড়ানোর চেয়ে, যে হাত পাতার ফলে মানুষ তাকে কিছু দিতেও পারে, আবার নাও দিতে পারে। (৩৬৮)
এ ছাড়া আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টিতে কাজকর্ম ও পেশা সওয়াব লাভের মাধ্যম বলেও পরিগণিত ছিল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রকল্প তৈরির ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাদেরকে বর্গাচাষের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। যেমন দরিদ্র ও নিঃস্ব অবস্থায় মদিনায় আগত মুহাজির মুসলমানদের সাথে আনসার সাহাবিগণ করেছিলেন। এ বিষয়ে হজরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন, আনসার সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন, 'আমাদের এবং আমাদের ভাইদের (মুহাজিরদের) মধ্যে খেজুরের বাগান ভাগ করে দিন।'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'না।'
তখন তারা মুহাজিরদের বললেন, 'আপনারা আমাদের বাগানে কাজ করুন, আমরা আপনাদের বাগানের ফলের মধ্যে অংশীদার করে নেব।' তখন মুহাজিরগণ বললেন, 'আমরা শুনলাম এবং মানলাম (অর্থাৎ তারা এই প্রস্তাবে রাজি হলেন)। (৩৬৯)
অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদকে হারাম করেছেন। কেননা সমাজের দরিদ্রদের জন্য এর মাঝে রয়েছে অনেক রকমের ক্ষতিকর বিষয়। এটা সমাজের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে, তার পিছিয়ে পড়ার কারণ ঘটায় এবং দরিদ্রদের আরও দরিদ্র ও ঋণগ্রস্ত করে তোলে। অবশেষে এটা তাদের পুরোপুরি ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক বিষয় থেকে বেঁচে থাকো।'
তখন সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, সেগুলো কী কী?' নবীজি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেগুলো হলো, আল্লাহর সাথে শিরক করা,... সুদ খাওয়া...।' (৩৭০)
দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনের এ সকল নীতি-আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রয়োগের বাস্তব নমুনা ছিল আমাদের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোটা জীবন। যেমন হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, একবার এক আনসারি ব্যক্তি এসে নবীজির নিকট হাত পাতল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার ঘরে কি কিছু নেই?'
লোকটি বলল, 'একটি গালিচা আছে, যার কিছু অংশ আমরা পরিধান করি এবং কিছু অংশ বিছিয়ে রাখি। একটি পাত্রও আছে, তাতে আমরা পানি পান করি।'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'সেগুলো আমার কাছে নিয়ে এসো।'
লোকটি সেগুলো নিয়ে এলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা হাতে নিয়ে বললেন, 'এ দুটি কে ক্রয় করবে?'
এক ব্যক্তি বলল, 'আমি এগুলো এক দিরহামে ক্রয় করব।'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আরও দুইবার অথবা তিনবার বললেন, 'কেউ কি এর অধিক মূল্য দেবে?'
আরেকজন বলল, 'আমি দুই দিরহামে নেব।'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন এই ব্যক্তিকে জিনিস দুটি দিয়ে তার থেকে দিরহামদুটি গ্রহণ করলেন। এরপর সেই আনসারি ব্যক্তিকে তা প্রদান করে বললেন, 'এক দিরহাম দিয়ে খাবার কিনে পরিবার-পরিজনকে দাও এবং আরেক দিরহামে একটি কুঠারের ফলা কিনে আমার নিকট নিয়ে এসো।'
লোকটি তাই করল। এবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে সেই লৌহ কুঠারে একটি হাতল লাগিয়ে দিয়ে বললেন, 'যাও, তুমি এটা দিয়ে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করো এবং পনেরো দিন অতিবাহিত হওয়ার আগে আমার সাথে আর দেখা করবে না।'
লোকটি কুঠার হাতে চলে গেল। কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করতে লাগল। (এভাবে পনেরো দিন পার হলে) সে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সাক্ষাৎ করতে এলো। ইতিমধ্যে সে দশ দিরহাম উপার্জন করেছে। সে এর থেকে কিছু দিয়ে কাপড় এবং কিছু দিয়ে খাবার কিনল। এবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, «هَذَا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ تَجِيءَ الْمَسْأَلَةُ نُكْتَةٌ فِي وَجْهِكَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» ভিক্ষার কারণে কিয়ামতের দিন মুখমণ্ডলে দাগ নিয়ে ওঠার চেয়ে এটাই তোমার জন্য উত্তম。
(এরপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বললেন) তিন ব্যক্তি ব্যতীত কারও জন্য অন্যের কাছে হাত পেতে বেড়ানো বৈধ নয়। ১. প্রচণ্ড দরিদ্র ব্যক্তি। যথা : ২. ঋণে জর্জরিত ব্যক্তি। ৩. যার ওপর রক্তপণ আছে, অথচ সে তা পরিশোধ করতে অক্ষম। (৩৭১)
দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনে এটা ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বাস্তবসম্মত প্রায়োগিক পদক্ষেপ। যত সামান্যই হোক, তিনি দরিদ্র লোকটির শক্তি-সক্ষমতাকে ব্যবহার করতে শিখিয়েছেন। তাকে দেখিয়েছেন একটি সম্মানজনক কাজের মাধ্যমে হালাল রিজিক উপার্জন করার পথ ও পদ্ধতি।
কিন্তু অবস্থা যদি বেশি সংকীর্ণ হয়। মানুষটি কোনো কাজ করতে সক্ষম না হয় এবং সে একজন দরিদ্র অভাবী ব্যক্তি হিসেবে করুণ জীবনযাপন করতে থাকে, তখন তার এই সমস্যা সমাধানের জন্য ইসলামের নীতি হলো, সচ্ছল ধনী আত্মীয়রা তাদের দরিদ্র আত্মীয়দের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তাদের মাঝে যেহেতু নিকটাত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। আর আল্লাহ তাআলা বর্ণনা করেছেন, আত্মীয়দের জন্য এটি এক আবশ্যক অধিকার। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ﴾فَأْتِ ذَا الْقُرْنِى حَقَّهُ﴿ - তুমি নিকটাত্মীয়কে তার অধিকার প্রদান করে দাও। [সুরা রুম : ৩৮]
এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিতই আমাদের সামনে সর্বোত্তম প্রয়োগ ঘটিয়ে দেখিয়েছে এবং প্রতিটি মুসলমানের নিকট পারস্পরিক সংহতিমূলক দায়িত্ব পালনে অগ্রগণ্যতার বিন্যাস বর্ণনা করেছে। যেমন হজরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত, বনু উজরাহ গোত্রের এক ব্যক্তি তার গোলামকে তার মৃত্যুর পর মুক্তিলাভের ঘোষণা দিলেন। এ সংবাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কানে পৌছাল। তখন তিনি তাকে ডেকে বললেন, 'এ ছাড়া তোমার কাছে আর কি কোনো সম্পদ আছে?'
লোকটি বলল, 'না।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এমন কে আছ যে আমার থেকে এ গোলামটি ক্রয় করবে?'
তখন নুআইম ইবনে আবদুল্লাহ আদাবি তাকে আটশত দিরহামে ক্রয় করলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলো গ্রহণ করে লোকটিকে বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, (৩৭২)
ابْدَأُ بِنَفْسِكَ فَتَصَدَّقْ عَلَيْهَا فَإِنْ فَضَلَ شَيْءٍ فَلِأَهْلِكَ فَإِنْ فَضَلَ عَنْ أَهْلِكَ شَيْءٌ فَلِذِي قَرَابَتِكَ فَإِنْ فَضَلَ عَنْ ذِي قَرَابَتِكَ شَيْءٌ فَهُكَذَا وَهُكَذَا يَقُولُ فَبَيْنَ يَدَيْكَ وَعَنْ يَمِينِكَ وَعَنْ شِمَالِكَ»
এ অর্থ তুমি প্রথমে তোমার নিজের জন্য ব্যয় করো। তারপর যদি কিছু বাকি থাকে, তাহলে তোমার পরিবারের লোকদের জন্য ব্যয় করো। এরপর অবশিষ্ট থাকলে তোমার নিকটাত্মীয়দের জন্য ব্যয় করো। এরপরও যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে, তাহলে তা এদিকে-সেদিকে ব্যয় করো।' এ বলে তিনি সামনে, ডানে ও বামে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলেন। (৩৭৩)
কিন্তু যখন ধনী আত্মীয়গণ তাদের দরিদ্র আত্মীয়দের প্রয়োজন পূরণে অপারগ হবে, তখন সমাজের অন্যদের ওপর দরিদ্রদের দায়িত্ব বর্তাবে। তাদের তখন সেই জাকাত থেকে অর্থসম্পদ প্রদান করা হবে, যা আল্লাহ তাআলা ধনীদের সম্পদ থেকে দরিদ্রদের জন্য আবশ্যক সাব্যস্ত করেছেন। তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা সেই দরিদ্র ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট করেছেন, যে কর্ম করতে এবং উপার্জন করতে সক্ষম নয়। এ কারণে নবীজি বলেছেন,
«لَا تَحِلُّ الصَّدَقَةُ لِغَنِيٌّ وَلَا لِذِي مِرَّةٍ سَوِيٌّ»
জাকাতের সম্পদ গ্রহণ করা কোনো ধনীর জন্য বৈধ নয় এবং বৈধ নয় কোনো সুস্থ-সবল কর্মক্ষম ব্যক্তির জন্যও। (৩৭৪)
এ হাদিসের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্মহীন, অলস ভবঘুরে ব্যক্তিদের জন্য জাকাতের সম্পদে কোনো অধিকার রাখেননি। এর মাধ্যমে তিনি সক্ষম ব্যক্তিদের কর্ম ও উপার্জনের দিকে ধাবিত করতে চেয়েছেন।
কিন্তু জাকাতের সম্পদেও যদি সকল দরিদ্রের প্রয়োজন পূরণ না হয়, তখন মুসলিম রাষ্ট্রের পুরো ধনভান্ডার থেকে সম্পদ প্রদান করে তাদের দারিদ্র্য ও বেকারত্ব ঘুচানো হবে এবং স্বধর্মী-বিধর্মী সকলপ্রকার অভাবী ব্যক্তির আশ্রয়স্থল বিবেচিত হবে সেই রাষ্ট্রীয় কোষাগার। এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিতের মাঝে উত্তম দৃষ্টান্ত হলো 'আহলে সুফফা'(৩৭৫)-এর জন্য তাঁর যাবতীয় কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা।
এরপরও যদি সমাজে এমন দরিদ্র অবশিষ্ট থাকে, যে নিজে কাজ করতে সক্ষম নয়, তাহলে সমাজের সকল সদস্যের জন্য আবশ্যক হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখিরাতে প্রতিদান পাওয়ার লক্ষ্যে তাদের জন্য সদকা প্রদান করা।
মানবসমস্যা সমাধানে এটি ইসলামের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবিদের শিক্ষা দিতেন। যেমন হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. বর্ণনা করে বলেন, একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষদের মাঝে ভাষণ দিয়ে তাদেরকে দান-সদকার ওপর উৎসাহিত করলেন। কিন্তু লোকজন দান করতে বিলম্ব করছিল। এমনকি বিলম্বের কারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারায় রাগের ভাব পরিলক্ষিত হলো। তখন আনসারদের এক ব্যক্তি একটি থলে নিয়ে এলো এবং তা তাঁকে প্রদান করল। এরপর অনেকেই একের পর এক দান করতে লাগল। এমনকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারায় খুশির ভাব পরিদৃষ্ট হলো। তখন তিনি বললেন, যে লোক কোনো ভালো কাজের সূচনা করল এবং পরবর্তীকালে সে অনুসারে আমল করা হলো, তাহলে সেই কাজের সূচনার জন্য অন্যান্য আমলকারীর প্রতিদানের সমান প্রতিদান তার জন্য লিখিত হবে। তবে এতে পরবর্তী আমলকারীদের প্রতিদানে কোনো ঘাটতি হবে না। আর যে লোক কোনো খারাপ কাজের সূচনা করল এবং তারপর সে অনুযায়ী আমল করা হলো, তাহলে সেই কাজের সূচনার জন্য অন্য আমলকারীদের খারাপ প্রতিদানের সমান গুনাহ তার জন্যও লিখিত হবে। এতেও তাদের পাপ সামান্য পরিমাণ হ্রাস করা হবে না। (৩৭৬)
বস্তুত সমাজের সদস্যদের মাঝে এসব আদর্শ ও মূল্যবোধ চর্চার মাধ্যমে সমাজের বুনিয়াদ মজবুত হয়। তার ভিত্তিগুলো ভারসাম্যপূর্ণ হয়। তাকে তখন হিংসা ও বিদ্বেষের ব্যাধি দংশন করতে পারে না। অন্যদের দয়ার দানের দিকে বুভুক্ষুর মতো কাউকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। একদিকে কিছু লোকের উদরপূর্তি হবে, আর অন্যরা জীবনধারণের সামান্য অবলম্বনও পাবে না, তখন আর এমনটা হবে না।
মোটকথা, ইসলাম দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সমস্যা সমাধানে বাস্তবসম্মত ও প্রায়োগিক সমাধান প্রদানে সক্ষম হয়েছে। আর এ ধরনের সমস্যা সমাধানের এই অনন্যসাধারণ দূরদর্শী পদ্ধতিগুলো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার ওপর একটি উৎকৃষ্ট প্রমাণ। সেইসাথে এটাও প্রমাণিত হয় যে, সমাজের সামনে তিনি যে নীতি-বিধি উপস্থাপন করেছেন, এটা কোনো মানব-উদ্ভাবিত রীতি-পদ্ধতি নয়; অবশ্যই তা সর্বজ্ঞানী আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রেরিত আসমানি ওহির শিক্ষা।
টিকাঃ
৩৬৫. সুনানে আবু দাউদ: ৫০৯০, মুসনাদে আহমাদ: ২০৩৯৭।
৩৬৬. সহিহ বুখারি: ২০৭২, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৬৩৩৩।
৩৬৭. সহিহ বুখারি: ২২৬২, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২১৪৯।
৩৬৮. সহিহ বুখারি: ১৪৭০, ১৪৭১; সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৩৬, মুসনাদে আহমাদ: ১৪২৯।
৩৬৯. সহিহ বুখারি : ২২০০।
৩৭০. সহিহ বুখারি: ২৭৬৭, ৬৮৫৭; সহিহ মুসলিম: ৮৯।
৩৭১. সুনানে আবু দাউদ : ১৬৪১, সুনানে তিরমিজি : ৬৫৩, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২১৯৮, মুসনাদে আহমাদ : ১২১৫৫
৩৭২. আবদে মুদাব্বার তথা যেই গোলাম মালিকের মৃত্যুর পর আজাদ হয়ে যাবে তাকে বিক্রি করা যাবে কি যাবে না তা নিয়ে আহলুল ইলমগণের মাঝে ইখতিলাফ রয়েছে। এই হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা ও তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণমূলক আলোচনা শরহুল হাদিস ও ফিকহের গ্রন্থাবলিতে বিদ্যমান রয়েছে।-সম্পাদক।
৩৭৩. সহিহ মুসলিম: ৯৯৭, সুনানে নাসায়ি: ২৫৪৬।
৩৭৪. সুনানে আবু দাউদ: ১৬৩৪, সুনানে তিরমিজি: ৬৫২, সুনানে নাসায়ি: ২৫৯৭। কর্মক্ষম ব্যক্তি যদি দরিদ্র হয়, মৌলিকভাবে তো জাকাত তার জন্যও জায়েজ, তবে সেজন্য তার হাত পাতা বৈধ নয়। এটিই হাদিসের উদ্দেশ্য।-সম্পাদক
৩৭৫. أَهْلُ الصُّفَّةِ (ঝুপড়িবাসী)। 'আহলে সুফফা' বলা হতো সে সকল দরিদ্র মুহাজিরকে, যাদের বসবাসের নিজস্ব কোনো গৃহ ছিল না। মসজিদে নববির ছায়াময় এক জায়গায় তারা অবস্থান করতেন। (তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য অর্জন করতেন এবং দ্বীন-ইসলামের জ্ঞান চর্চা করতেন।)
৩৭৬. সহিহ মুসলিম: ১০১৭, সুনানে নাসায়ি: ২৫৫৪, মুসনাদে আহমাদ: ১৯২২৫।
📄 মাদক ও নেশাদ্রব্য প্রতিরোধে নবীজি ﷺ
ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ক্ষতি করে এমন সকল-কিছুকে ইসলাম হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আর সকল মানুষের জন্য উত্তম এবং উপকারী এমন সকল বিষয়কে করেছে হালাল ও বৈধ। বস্তুত আল্লাহ তাআলা যা- কিছু হারাম করেছেন, মানুষকে তার উত্তম বিকল্প প্রদানও করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَابِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ
সে তাদের জন্য উৎকৃষ্ট বস্তু হালাল করবে ও নিকৃষ্ট বস্তু হারাম করবে এবং তাদের থেকে তাদের ভার ও গলার বেড়ি নামাবে, যা তাদের ওপর চাপানো ছিল। [সুরা আরাফ: ১৫৭]
প্রকৃতপক্ষে মানুষের অন্তর বা নফস সর্বদা তার চাহিদাগুলো চরিতার্থ করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। কিন্তু পরিণামে তার যে বিরাট ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয় সেদিকে সে খেয়ালই করতে চায় না। এ কারণে ইসলাম তার অনুসারীদের নফসের খামখেয়ালি ও একগুঁয়েমির লাগাম টেনে ধরার নির্দেশ প্রদান করেছে। মানুষ যত ধরনের সমস্যা ও ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে, সেগুলো থেকে তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক নানা আইন ও বিধান প্রণয়ন করেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে যেগুলোর সর্বোত্তম প্রয়োগ ঘটেছিল।
মানুষের জন্য অনিষ্টকর এমন সমস্যাগুলোর মধ্যে প্রধান একটি সমস্যা হলো মাদকাসক্তি। প্রাচীন আরবদের মাঝে এটি রক্তমাংসের সাথে মিশে গিয়েছিল। তারা তাদের কবিতাগুলোর মধ্যেও মদের প্রশংসা করত। আরবদের কবিতায় প্রথমাংশে থাকত সাধারণত পরিত্যক্ত ঘরবাড়ির স্মৃতিকথা, এরপরই শুরু হয়ে যেত মদের বর্ণনা ও বিবরণ। তাদের ঘরে- বাইরে, সভা-বৈঠকে কোনো স্থানেই মদ ছাড়া চলত না। মদ ব্যতীত তারা যেন তাদের জীবনযাপন কল্পনাও করতে পারত না। এ কারণে এই সমস্যার প্রতিকারে আল্লাহপ্রদত্ত সমাধানও এসেছে অতি বিচক্ষণ পদ্ধতিতে, যা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে, সমাধানটি এসেছে সমস্ত জাহানের একমাত্র প্রতিপালক আল্লাহর পক্ষ থেকেই।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য কুরআনুল কারিমের আয়াতগুলো নাজিল হয়েছে অপূর্ব ধারাবাহিকতার সাথে। ধীরে ধীরে মানুষকে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রথমে মদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিচের আয়াতটি প্রথম নাজিল করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَمِنْ ثَمَرَاتِ النَّخِيلِ وَالْأَعْنَابِ تَتَّخِذُوْنَ مِنْهُ سَكَرًا وَرِزْقًا حَسَنًا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ ﴾
এবং খেজুরের ফল ও আঙুর থেকেও (আমি তোমাদের পানীয় দান করি), যা দ্বারা তোমরা মদ বানাও এবং উত্তম খাদ্যও (বানাও)। নিশ্চয় এর ভেতরও সেই সব লোকের জন্য নিদর্শন আছে, যারা বুদ্ধিকে কাজে লাগায়। [সুরা নাহল: ৬৭]
এখানে আল্লাহ তাআলা অন্যান্য খাদ্যকে 'উত্তম' বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু মদের ক্ষেত্রে 'উত্তম' শব্দ ব্যবহার করেননি। এর দ্বারা মূলত মদ পরে কোনো সময় হারাম হওয়ায় প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। এরপর তিনি মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়েছেন মদের ক্ষতিকর প্রভাবগুলোর দিকে বলেছেন। যদিও তাতে কিছু উপকার রয়েছে, কিন্তু উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيْهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِنْ نَّفْعِهِمَا ﴾
তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, এ দুটোর মধ্যে মহাপাপও রয়েছে এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও আছে। আর এ দুটোর পাপ তার উপকার অপেক্ষা গুরুতর। [সুরা বাকারা: ২১৯]
এর পরের ধাপে আল্লাহ তাআলা নামাজের পূর্বে মদ্যপান করা নিষেধ করেন। অর্থাৎ নামাজে আসার মুহূর্তে অবশ্যই তাদেরকে পূর্ণ সচেতন ও জাগ্রত থাকতে হবে, মাতাল থাকা যাবে না। এ কারণে আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنْتُمْ سُكْرَى حَتَّى تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ
হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নেশাগ্রস্ত থাকো, তখন নামাজের কাছেও যেয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা যা বলো তা বুঝতে পারো। [সুরা নিসা: ৪৩]
এভাবে একের পর এক সচেতনতার কারণে মানুষের অন্তর মদ হারাম হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অনেকটা প্রস্তুত হয়ে গেল এবং একদিন তা পরিপূর্ণরূপে হারাম হয়ে যাবে বলে মনে মনে দিন গুনতে লাগল। যেমন হজরত উমর রা. বলেন,
«اللَّهُمَّ بَيِّنْ لَنَا فِي الْخَمْرِ بَيَانًا شَافِيًا»
হে আল্লাহ, আপনি আমাদের জন্য মদের ব্যাপারে একেবারে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করুন। (৩৭৭)
এরূপ প্রস্তুত হয়ে ওঠার পরই একদিন আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণভাবে মদ হারাম করে দিলেন। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَيْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমার বেদি ও জুয়ার তির অপবিত্র, শয়তানি কাজ। সুতরাং এসব পরিহার করো, যেন তোমরা সফলতা অর্জন করো। [সুরা মায়িদা: ৯০]
হজরত আয়েশা রা. জাহেলি যুগের মানুষের অন্তরে মাদকাসক্তির গভীরতা সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই জানতেন। এ কারণে তিনি মদ নিষিদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে ওহির ক্রমধারাবাহিকতা সম্পর্কে বলেন,
...প্রথমবারেই যদি মদ সম্পর্কে নাজিল করা হতো তোমরা মদ পান করো না, তাহলে লোকেরা অবশ্যই বলে বসত, আমরা কখনোই মদ ছাড়ব না। (৩৭৮)
কিন্তু অন্তরে আল্লাহ তাআলার ধ্যান-খেয়ালের অনুভূতি সৃষ্টির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে সমাজকে ধীরে ধীরে তৈরি করেছিলেন, তাতে কুরআনের আয়াতে মদ হারামের কথা নাজিল হওয়ার সাথে সাথে সাহাবিগণ তাঁর আদেশকে মান্য করে নিয়ে ছিলেন। যেমন হজরত আনাস রা. বলেন, একদিন আমি আবু তালহার বাড়িতে লোকজনকে মদ পান করাচ্ছিলাম। সেদিন তারা 'ফাজিখ' নামক মদ পান করছিল। এদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে আদেশ করলেন, যেন সে এই মর্মে ঘোষণা দেয়, 'সাবধান! মদ এখন থেকে হারাম করে দেওয়া হয়েছে।'
এই ঘোষণা শুনে আবু তালহা আমাকে বললেন, 'বাইরে যাও এবং ঘরের সমস্ত মদ ফেলে দাও।' আমি বাইরে গেলাম এবং সমস্ত মদ রাস্তায় ঢেলে দিলাম।
আনাস রা. বলেন, সেদিন মদিনার রাস্তাঘাটে মদের প্লাবন বয়ে গিয়েছিল। (৩৭৯)
তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আয়াত নাজিলের মাধ্যমে অকাট্যভাবে মদ হারাম হওয়ার পরেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের মদ থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা অব্যাহত রেখেছিলেন। যেমন তিনি হজরত আবু দারদা রা.-কে বলেন, মদ পান করো না। কেননা, তা সকল অনিষ্টের চাবিকাঠি। (৩৮০)
এমনকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিশাপ দিয়েছেন তাদের ওপর, যারা মদ তৈরি করে, বিক্রি করে এবং পান করে। এ বিষয়ে তিনি বলেন,
لَعَنَ اللهُ الخَمْرَ وَشَارِبَهَا وَسَاقِيَهَا وَبَائِعَهَا وَمُبْتَاعَهَا وَعَاصِرَهَا وَمُعْتَصِرَهَا وَحَامِلَهَا وَالْمَحْمُولَةَ إِلَيْهِ
মদ, তা পানকারী, পরিবেশনকারী, বিক্রেতা, ক্রেতা, উৎপাদক, যে উৎপাদন করায়, সরবরাহকারী এবং যার জন্য সরবরাহ করা হয়, এদের সকলকে আল্লাহ তাআলা লানত করেছেন। (৩৮১)
কিন্তু তাই বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব মাদকাসক্ত ব্যক্তির জন্য তাওবার দরজা বন্ধ করে দেননি, বরং খোলাই রেখেছেন। এমনকি কেউ যদি বারবার ভুল করে তবুও। আবার তাদের একেবারে নির্ভয়েও ছেড়ে দেননি। বরং মদ্যপায়ীদের ওপর আল্লাহর ক্রোধ, আখিরাতের শাস্তি এবং তাঁর নিকট তাওবার তাওফিক না হওয়ার বিষয়ে ভীতি প্রদর্শন করেছেন। সমাজে শিকড় গেড়ে বসা এমন সমস্যাগুলোর সমাধানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবেই মহানুভব পন্থায় তার সমাধান করতেন। তাই তিনি সকলকে সতর্ক করার জন্য বলেছেন, 'যে ব্যক্তি মদ পান করে এবং মাতাল হয়, চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামাজ কবুল হবে না। এ অবস্থায় সে মারা গেলে জাহান্নামে যাবে।
আর যদি সে তাওবা করে, তবে আল্লাহ তাআলা তার তাওবা কবুল করবেন। পুনরায় মদ পান করলে ও মাতাল হলে চল্লিশ দিন পর্যন্ত নামাজ কবুল হবে না। এ অবস্থায় মারা গেলে জাহান্নামে যাবে। আর যদি এ অবস্থায়ও তাওবা করে তাহলেও আল্লাহ তাওবা কবুল করবেন। (আবার) এরপরও সে যদি মদ্যপানে লিপ্ত হয়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে অবশ্যই 'রাদাগাতুল খাবাল' পান করাবেন।'
সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, রাদাগাতুল খাবাল কী?' নবীজি বললেন, 'জাহান্নামিদের দেহ থেকে নির্গত পুঁজ ও রক্ত।' (৩৮২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েকজন সাহাবিকে বিশেষ কিছু উপদেশ প্রদান করেছিলেন। সেই উপদেশের মধ্যে মদের বিষয়টিও ছিল। এর দ্বারা বোঝা যায় তিনি উম্মতের মাঝে মদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করতে এবং তাদের সকল ধরনের মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যে আপতিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে চেয়েছেন। যেমন হজরত আবু দারদা রা. বর্ণনা করে বলেন, একবার এক লোক নবীজির কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে কিছু নসিহত করুন।' নবীজি তাকে বললেন,
«لا تُشْرِكْ بِاللهِ شَيْئًا وَإِنْ قُطَّعْتَ وَحُرِّقْتَ.... وَلَا تَشْرَبِ الْخَمْرَ فَإِنَّهَا مِفْتَاحُ كُلِّ شَر...»
আল্লাহর সাথে কিছু শরিক করো না, যদিও তোমাকে টুকরো টুকরো করা হয় এবং পুড়িয়ে দেওয়া হয়।... আর মদ পান করো না। কেননা এটা সকল অন্যায়ের চাবিস্বরূপ। (৩৮৩)
এ ছাড়া মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মদের ক্ষতিকারক প্রভাবের কথাও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করেছেন। একবার এক সাহাবি তার নিকট এসে মদকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি চেয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছিলেন, «إِنَّهَا دَاءُ وَلَيْسَتْ بِدَوَاءِ» -নিশ্চয় এটা (মদ) ব্যাধি, ব্যাধিনিরোধক (ওষুধ) নয়। (৩৮৪)
আজকের আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রও প্রমাণ করেছে, যারা মদ্যপানে অভ্যস্ত, তারা খুব সহজেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। যেমন লিভার ব্লক হয়ে যাওয়া। এর কারণ হলো মদ লিভারের দেহকোষকে ধ্বংস করে ফেলে। সেখানে চর্বি জমায়। এ ছাড়া মদের কারণে পরিপাকতন্ত্রে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ও দুরবস্থার সৃষ্টি হয়। তখন মানুষ তার স্বাভাবিক খাদ্যচাহিদা হারিয়ে ফেলে। পুষ্টিহীনতা ও ভিটামিনের ঘাটতি দেখা দেয়। স্নায়ুর ওপর ভীষণ চাপ পড়ে। ফলে স্নায়বিক দুর্বলতা দেখা দেয়। হার্টের মাংসপেশিতেও খারাপ প্রভাব ফেলে এবং রক্তগঠনের বিভিন্ন উপাদানেও সমস্যা দেখা দেয়। (৩৮৫)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে মদের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন করা অব্যাহত রেখেছিলেন। এজন্য তিনি বিভিন্ন পথ ও পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি অতীতের ঘটনাও উল্লেখ করেছেন। যাতে চিন্তাশীল ব্যক্তিরা এর দ্বারা উপদেশ গ্রহণ করে। হজরত উসমান ইবনে আফফান রা. বর্ণনা করে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা মাদকদ্রব্য পরিত্যাগ করো, কেননা তা নানারকম অপকর্মের উৎস। তোমাদের পূর্ববর্তী যুগে এক আবেদ ব্যক্তি ছিল। এক দুশ্চরিত্রা নারী তার প্রেমে পড়ে যায় ও তাকে কাছে পেতে সে তার এক দাসীকে সেই আবেদ ব্যক্তির নিকট প্রেরণ করে তাকে সাক্ষ্যদানের জন্য ডাকতে পাঠাল। তখন সেই আবেদ ব্যক্তি সাক্ষ্য প্রদানের জন্য দাসীর সাথে আগমন করল। সে যখনই কোনো দরজা অতিক্রম করত, দাসী পেছন থেকে সেই দরজা বন্ধ করে দিত। এভাবে সেই আবেদ ব্যক্তি এক অতি সুন্দরী নারীর সামনে এসে উপস্থিত হলো। নারীর সামনে ছিল একটি বাচ্চা ছেলে এবং এক পেয়ালা মদ। সেই নারী আবেদকে বলল, 'আল্লাহর শপথ! আমি আপনাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডেকে পাঠাইনি। বরং এজন্য ডেকে পাঠিয়েছি যে, আপনি আমার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হবেন, অথবা এই মদ পান করবেন, অথবা এই বাচ্চাকে হত্যা করবেন। (এই তিনটার যেকোনো একটি আপনাকে করতেই হবে।)
আবেদ বলল, 'আমাকে এক পেয়ালা মদ দাও।' সেই নারী তাকে এক পেয়ালা মদ পান করালো। তখন সে আবেদ বলল, 'আরও দাও...।' এভাবে সেই আবেদ আর থামল না। শেষপর্যন্ত সেই আবেদ নারীটির সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হলো এবং উক্ত বাচ্চাকেও হত্যা করল। অতএব, তোমরা মদ পরিত্যাগ করো। কেননা, আল্লাহর শপথ! মদ ও ঈমান কখনো একত্রে অবস্থান করতে পারে না। এর একটি অপরটিকে বের করে দেয়। (৩৮৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন যে সমস্যার সমাধান করেছেন, নামের তুলনায় তার বিষয় বা বস্তুর প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। যেমন তিনি যখন মদ হারাম করেছেন, তখন একইসাথে এমন সকল বিষয়কেও হারাম করেছেন, যেগুলো মদের মতো, মস্তিষ্ক বিকৃতিকারী। তার উৎস যেটাই হোক, আঙুর, খেজুর অথবা অন্যকিছু। সবই হারাম। যেমন হজরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
كُلُّ شَرَابٍ أَسْكَرَ فَهُوَ حَرَامٌ যে পানীয়ই মাদকতা সৃষ্টি করে, তা হারাম। (৩৮৭)
হজরত উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে নেশাজাতীয় সকলপ্রকার দ্রব্য শরিয়তে হারাম হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট করা হয়েছে। কেননা এটা ব্যক্তিকে ধ্বংস করে। সমাজকে দুর্বল করে। হাদিসটিতে তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল নেশাদায়ক ও অবসাদ সৃষ্টিকারী (৩৮৮) দ্রব্য থেকে নিষেধ করেছেন। (৩৮৯)
আমরা আরও দেখতে পাই, যা মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে, এমন সবকিছুই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারাম করেছেন। তিনি বলেছেন,
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَار» 'না সাধারণ অবস্থায় অন্যের ক্ষতি করা যাবে আর না প্রতিশোধের ভিত্তিতে একে অপরের ক্ষতি করার সুযোগ আছে।' (৩৯০) (অর্থাৎ ইসলাম কোনোভাবেই মানবসমাজের ক্ষতি সমর্থন করে না।)
অতএব, মদের ক্ষেত্রে যেরকম নিষিদ্ধতা ও শাস্তির বিধান রয়েছে, তদ্রূপ অন্য সকল সমাজবিধ্বংসী নেশাজাতীয় দ্রব্য ও বিষাক্ত বস্তুর ক্ষেত্রেও একইভাবে নিষিদ্ধতা ও শাস্তি প্রয়োগ হবে।
মদ ও মাদক হারাম হওয়ার পর যে ব্যক্তি এগুলো পান করবে, তার ক্ষেত্রে শরিয়তে স্পষ্ট শাস্তির বিধান এসেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শরিয়তের এ বিধানের যথাযথ প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। যেমন হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদপানের ক্ষেত্রে খেজুর গাছের ডাল এবং জুতা দিয়ে আঘাত করেছেন। (৩৯১)
আর হজরত কাবিসা ইবনে জুআইব রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ فَاجْلِدُوهُ»
যে ব্যক্তি মদ্যপান করে, তাকে তোমরা বেত্রাঘাত করো。(৩৯২)
তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টিতে এসব শাস্তির উদ্দেশ্য হলো, সেইসব ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও নিবৃত্ত করা, যাদের নফস তাদেরকে মাদক ও নেশাদ্রব্যের প্রতি প্ররোচিত করে। অর্থাৎ এ শাস্তির দ্বারা অপরাধীদের থেকে কোনোরূপ প্রতিশোধ গ্রহণ করা কিংবা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা উদ্দেশ্য নয়; বরং তাদের এই শাস্তি প্রকৃতপক্ষে তাদের প্রতি একধরনের সহানুভূতির প্রকাশ। কারণ, তারা অসুস্থ। তাদের চিকিৎসার প্রয়োজন। সহমর্মিতার সাথে তাদেরকে এটা থেকে ফিরিয়ে আনাই এ শাস্তির প্রধান উদ্দেশ্য। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের অন্তর থেকে ভুল ধারণা রহিত করার জন্য বাস্তব পদক্ষেপও নিয়েছেন। যেমন হজরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করে বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট একজন মদ্যপায়ী ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হলো। তখন নবীজি বললেন, 'তাকে প্রহার করো।'
আবু হুরাইরা রা. বলেন, আমাদের মধ্যে কেউ তখন তাকে হাত দিয়ে মারল। কেউ মারল জুতা দিয়ে। কেউ মারল কাপড় দিয়ে। এরপর লোকটি যখন ফিরে যাচ্ছিল, তখন লোকদের মধ্যে একজন তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, أَخْزَاكَ اللَّهُ -আল্লাহ তোমাকে লাঞ্ছিত করুক।
এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎক্ষণাৎ তাকে সংশোধন করে দিয়ে বললেন,
لَا تَقُوْلُوْا هَكَذَا لَا تُعِينُوا عَلَيْهِ الشَّيْطَانَ তোমরা কিছতেই এমন কথা বলো না। তার ওপর শয়তানকে সাহায্য করো না। (৩৯৩)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কার্যকরভাবে পর্যায়ক্রমে মাদক ও নেশার সমস্যা সমাধান করেছেন। প্রথমত আল্লাহ তাআলার ভয় বা তাকওয়ার শিক্ষা দিয়ে, আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে সতর্ক করে। কারণ, সকল মাদককে হারাম করেছেন আল্লাহ তাআলা। অর্থাৎ মাদকসমস্যার সমাধানে প্রথম পদ্ধতি হলো আল্লাহ তাআলার ভয় বা তাকওয়া। দ্বিতীয়ত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবাধ্য ও বিচ্যুতদের জন্য শাস্তির সকল দণ্ডবিধানই প্রয়োগ করেছেন। আর এ পদ্ধতিও বক্র লোকদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া থেকে নিয়ন্ত্রণ ও নিরোধ করে। আর এর মধ্যেই রয়েছে ব্যক্তি ও সমাজের সমূহ কল্যাণ ও সংশোধন।
সামসময়িক সমস্যাগুলোর সংশোধন ও সমাধানের ক্ষেত্রে এই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রীতি ও পদ্ধতি। এই পরিচ্ছেদে আমরা এর কিছু উদাহরণ উল্লেখ করেছি। তন্মধ্যে একটি হলো সহিংসতা ও সন্ত্রাস, যার দ্বারা গোটা বিশ্ব আক্রান্ত। আমরা দেখেছি, এই সমস্যার প্রতিরোধ ও প্রতিকারের লক্ষ্য নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত চমৎকার সমাধান করেছেন!
আরেকটি বিষয় ছিল সমাজের অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত, অর্থাৎ দারিদ্র্য ও বেকারত্ব। এখানেও আমরা দেখেছি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতি চমৎকারভাবে দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সমস্যার সমাধান করেছেন। সমাজের সকল ব্যক্তি ও শ্রেণির সামনে তিনি কাজকর্ম ও পরিশ্রমের দিগন্ত খুলে দিয়েছিলেন। হতাশ না হয়ে কর্মে উদ্যোগী হওয়ার প্রতি তাদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছিলেন।
সর্বশেষ আমরা দেখেছি, সমাজে শিকড় গেড়ে বসা অন্য আরেকটি ভয়াবহ সমস্যার সুন্দর একটি সমাধান তিনি দিয়েছেন। অর্থাৎ মাদকাসক্তি ও নেশাদ্রব্যের সমস্যা। এটাও তিনি সমাধান করেছেন অতি বিচক্ষণতার সাথে, পর্যায়ক্রমে।
মোটকথা, সকল সমস্যার সমাধানেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়ম ও পদ্ধতি ছিল অনন্য ও অসাধারণ। জাগতিক সকল পদ্ধতি থেকে যা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর তা হলো, সমাজের প্রতিটি সদস্যের অন্তরে আল্লাহ তাআলার সদা পর্যবেক্ষণের ভীতি রোপণ করে দেওয়া অর্থাৎ তাকওয়া বা খোদাভীতি সৃষ্টি করা। এই চেতনা ও মূল্যবোধের কারণে তারা নিজেরাই সব ধরনের খারাপ ও নিকৃষ্ট কাজ থেকে বিরত থেকেছে। প্রতিফলে সকলেই শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে জীবনযাপন করতে সক্ষম।
আমাদের সামসময়িক বিশ্বের আধুনিক সমাজেও এই সমস্যাগুলো ভীষণ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। পুরো বিশ্ব এখন এসব ভয়াবহ সমস্যা দ্বারা আক্রান্ত ও জর্জরিত। বলাবাহুল্য, কত তীব্রভাবেই-না বিশ্ব আজ এগুলোর সমাধানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই নিয়ম ও পদ্ধতির দিকে মুখাপেক্ষী হয়ে আছে। যেই সমাধানগুলোকে তিনি নিজের দিকে সম্বন্ধ করেননি। বরং এগুলোর সম্বন্ধ করেছেন আল্লাহ তাআলার দিকে। অর্থাৎ এই বিধানগুলো এসেছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। আর এর মাঝেই রয়েছে নবীজির সত্যতার ওপর এবং তাঁর নবুয়তের দাবির পেছনে ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ বা উদ্দেশ্য না থাকার অকাট্য প্রমাণ।
টিকাঃ
৩৬৫. সুনানে আবু দাউদ: ৫০৯০, মুসনাদে আহমাদ: ২০৩৯৭।
৩৬৬. সহিহ বুখারি: ২০৭২, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৬৩৩৩।
৩৬৭. সহিহ বুখারি: ২২৬২, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২১৪৯।
৩৬৮. সহিহ বুখারি: ১৪৭০, ১৪৭১; সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৩৬, মুসনাদে আহমাদ: ১৪২৯।
৩৬৯. সহিহ বুখারি : ২২০০।
৩৭০. সহিহ বুখারি: ২৭৬৭, ৬৮৫৭; সহিহ মুসলিম: ৮৯।
৩৭১. সুনানে আবু দাউদ : ১৬৪১, সুনানে তিরমিজি : ৬৫৩, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২১৯৮, মুসনাদে আহমাদ : ১২১৫৫
৩৭৭. সুনানে নাসায়ি : ৫৫৪০, মুসনাদে আহমাদ: ৩৭৮, মুসতাদরাকে হাকেম: ৩১০১।
৩৭৮. সহিহ বুখারি: ৪৯৯৩, বাইহাকি, শুআবুল ঈমান: ২২২৬, মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ৩/৩৫২।
৩৭৯. সহিহ বুখারি: ২৪৬৪, সহিহ মুসলিম: ১৯৮০।
৩৮০. সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৩৭১, মুসতাদরাকে হাকেম: ৭২৩১।
৩৮১. সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৭৪, সুনানে তিরমিজি: ১২৯৫, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৩৮০।
৩৮২. সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৮০, সুনানে তিরমিজি: ১৮৬২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৩৭৭। সুনানে দারেমি: ২০৯১, মুসনাদে আহমাদ: ৬৬৪৪, মুসতাদরাকে হাকেম : ৭২৩২।
৩৮৩. সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০৩৪, মুসনাদে আহমাদ: ২২১২, মুসতাদরাকে হাকেম: ৬৮৩০।
৩৮৪. মুসনাদে আহমাদ: ১৮৮৭৯, সহিহ ইবনে হিব্বান: ২০৬৫।
৩৮৫. জারিদাতর রিয়াদ। ওয়েবসাইট: www.alriyadh.com। আরও দেখুন, মুস্তফা সুওয়াইফ: আল-মুখাদ্দিরাত ওয়াল-মুজতামা: ৮৬-৯১。
৩৮৬. সুনানে নাসায়ি ৫৬৬৬, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৩৪৮।
৩৮৭. সহিহ বুখারি: ২৪২, ৫৫৮৫; সহিহ মুসলিম: ২০০১।
৩৮৮. অর্থাৎ এমনকিছু গ্রহণ করা যার পর শরীর নিস্তেজ হয়ে যায় এবং ছাড়া ছাড়া ভাব চলে আসে, যদিও পুরোপুরি নেশাগ্রস্ত হয় না।-সম্পাদক
৩৮৯. সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৮৬, মুসনাদে আহমাদ: ২৬৬৭৬।
৩৯০. সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪০, মুয়াত্তা মালেক: ১৪২৯, মুসনাদে আহমাদ: ২৮৬৭।
৩৯১. সহিহ বুখারি: ৬৭৭৩, সহিহ মুসলিম: ১৭০৬।
৩৯২. সুনানে আবু দাউদ: ৪৪৮৫, সুনানে নাসায়ি: ৫৬৬১, মুসনাদে আহমাদ: ৭৭৪৮।
৩৯৩. সহিহ বুখারি: ৬৭৭৭, সুনানে আবু দাউদ: ৪৪৭৭, মুসনাদে আহমাদ: ৭৯৭৩。