📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 বর্ণনারীর অলৌকিকতা

📄 বর্ণনারীর অলৌকিকতা


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার আরেকটি উজ্জ্বলতম প্রমাণ হলো তাঁকে দান করা হয়েছে (جوامع الکلم) জাওয়ামিউল কালিম) বা স্বল্প শব্দে অধিক অর্থসমৃদ্ধ কথার যোগ্যতা। তাঁর পূর্বে বা পরে আর কাউকে এই যোগ্যতা বা বৈশিষ্ট্য প্রদান করা হয়নি। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলেছেন,
«أُوتِيتُ جَوَامِعَ الْكَلِمِ، وَاخْتُصِرَ لِيَ الْكَلَامُ اخْتِصَارًا»
আমাকে প্রদান করা হয়েছে 'জাওয়ামিউল কালিম' (স্বল্প শব্দে অধিক অর্থসমৃদ্ধ কথার যোগ্যতা) এবং আমার জন্য কথাকে খুবই সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। (৩৩২)
অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন, «بُعِثْتُ بِجَوَامِعِ الْكَلِمِ»
আমি 'জাওয়ামিউল কালিম' সহকারে প্রেরিত হয়েছি। (৩৩৩)
'জাওয়ামিউল কালিম' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য স্বল্প শব্দে অনেক অর্থসমৃদ্ধ কথা প্রদান করেছিলেন (অর্থাৎ শব্দ কম, কিন্তু তার অর্থ, মর্ম বা ব্যাখ্যা অনেক দীর্ঘ ও বিস্তৃত)। এ কারণে আপনি দেখতে পাবেন, হাদিসের কথাগুলো খুবই স্বল্প শব্দবিশিষ্ট। তবুও এগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করে আছে অনেক বিধান, উপদেশ, শিক্ষা ও বিভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। এই বৈশিষ্ট্য আর কারও নেই। নবীজির আগেও আর কাউকে এই বৈশিষ্ট্য প্রদান করা হয়নি। আর এই বৈশিষ্ট্য শুধু তাঁর কথার একটি নির্দিষ্ট দিক বা তাঁর কিছু হাদিসের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়; বরং তাঁর সকল কথা, সকল হাদিসই এই বৈশিষ্ট্য ধারণ করে আছে। অবশ্যই এটি একটি অতি বিস্ময়কর এবং চ্যালেঞ্জিং বিষয়।
আমরা এটাও জানি, শব্দের সংক্ষিপ্ততা হাদিসগুলোকে মুখস্থ করতে ও স্মরণ রাখতে সহজ করে। আরেকটি বড় উপকার হলো, স্থান ও সময়ের পরিবর্তনের সাথে সংগতি রেখে এই নিগূঢ় অর্থসমৃদ্ধ কথা থেকে নতুন নতুন বিষয় ও বিধান উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়। এভাবেই ইসলামি শরিয়ত সকল যুগ ও স্থানের জন্য প্রযোজ্য ও উপযুক্ত হিসেবে গণ্য হতে থাকে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই অনন্য-অসাধারণ বৈশিষ্ট্য নিয়ে অনেক মুসলিম ফিকহবিদ বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছেন। যেমন কেউ কেউ তাঁর ছোট ছোট বাক্যের এমন কিছু হাদিস নির্বাচন করেছেন, যেগুলোর একটিকে অন্যটির সাথে মিলিয়ে নিলে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটে ওঠে। ইসলামি শরিয়তকে অভিনব ও সংক্ষিপ্তভাবে চিত্রিত করতে পারে। এমন একটি কাজ করেছেন হজরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ.। তিনি বলেন, ইসলামের ভিত্তি তিনটি হাদিস। যথা:
১. হজরত উমর রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, »إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنَّيَّاتِ« সকল আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। (৩৩৪)
২. হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, »مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدُّ«-যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সৃষ্টি করবে, যা এর মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত ও পরিত্যাজ্য। (৩৩৫)
৩. হজরত নুমান ইবনে বশির রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, »الْحَلَالُ بَيِّنُ وَالْحَرَامُ بَيِّنُ«-হালালও সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট। (৩৩৬) (৩৩৭)
উল্লিখিত প্রতিটি হাদিস অতি চমৎকারভাবে ইসলামের একেকটি দিককে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ করছে। এমনকি আপনি এর সবগুলো একসঙ্গে পড়ে ফেলা মানে আপনি যেন পুরো ইসলাম সম্পর্কেই পড়ে নিলেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসগুলোর মধ্যে উদাহরণ হিসেবে 'জাওয়ামিউল কালিম' নির্বাচন করা খুবই মুশকিলের ব্যাপার। কারণ, তাঁর প্রায় প্রতিটি কথা ও হাদিসই 'জাওয়ামিউল কালিম'-এর অন্তর্ভুক্ত। তাঁর প্রতিটি কথার মর্ম উদ্ধারে একটি বড় পরিসরের ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাপক অর্থ ধারণকারী হাদিসের ক্ষেত্রে। তবুও রাসুলের হাদিসের অলৌকিকতা বোঝার জন্য আমরা এখানে অল্প কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করার ইচ্ছা রাখি। যথা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبُ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا» নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা উত্তম, তিনি উত্তম ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না। (৩৩৮)
এই অতি সংক্ষেপ বাক্যগুলোর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, আল্লাহ তাআলা কোন কাজগুলো গ্রহণ করেন, আর কোনগুলো গ্রহণ করেন না। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা ভালো কাজগুলো গ্রহণ করেন। আর ভালো কাজেরও কোনো সীমাপরিসীমা নেই। ভালো কাজের মধ্যে আল্লাহ তাআলা গ্রহণ করেন সদকা, আত্মশুদ্ধি, ভালো কাজের আদেশ, সত্য ও সততা, আমানতদারি, সাহায্য-সহযোগিতা, হেদায়েত, বদান্যতা এবং এমন আরও লক্ষ-কোটি ভালো কাজ রয়েছে।
আর অন্যদিকে তিনি খারাপ কাজ গ্রহণ করেন না। সে কারণে তিনি গ্রহণ করেন না চুরি, খিয়ানত, ভীরুতা, ধোঁকা, প্রতারণা, অশ্লীলতা এবং এমন আরও লক্ষ-কোটি খারাপ কাজ। এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণিত ছোট্ট কথাটি ইসলামের অন্যতম স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।
উদাহরণ অনুযায়ী আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্য হাদিসগুলোর ব্যাখ্যা ভেবে নিতে পারেন। নিচে এমনই কয়েকটি হাদিস উপস্থাপন করা হলো-
«مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ» . হলো, অপ্রয়োজনীয় বিষয় বর্জন করা। (৩৩৯)
«إِزْهَدْ فِي الدُّنْيَا يُحِبُّكَ اللهُ وَازْهَدْ فِيمَا فِي أَيْدِي النَّاسِ يُحِبُّكَ النَّاسُ» . দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত হও। আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। আর মানুষের নিকট যা আছে, তুমি তার প্রতি অনাসক্ত হয়ে যাও, তারাও তোমাকে ভালোবাসবে। (৩৪০)
«تَعَرَّفْ إِلَى اللهِ فِي الرَّخَاءِ يَعْرِفْكَ فِي الشَّدَّةِ» . তাআলার কথা স্মরণ রাখো, তাহলে অভাবের সময় তিনিও তোমাকে মনে রাখবেন। (৩৪১)
»اِتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقٌ تَمْرَةٍ« 8.-আধখানা খেজুর দিয়ে হলেও জাহান্নাম থেকে বাঁচো। (৩৪২)
৫. »كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةً« প্রতিটি ভালো কাজই একটি সদকা। (৩৪৩)
৬. »الصَّوْمُ جُنَّةُ« -রোজা হলো ঢালস্বরূপ। (৩৪৪)
»لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ« 9. পরিমাণ অহংকার রয়েছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (৩৪৫)
৮. »كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ وَكُلُّ خَمْرٍ حَرَامٌ«-নেশা উদ্রেককারী প্রতিটি জিনিসই খমর (মদ), আর প্রত্যেক মদই হারাম। (৩৪৬)
৯. »خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ« - তোমাদের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ, যে তার স্ত্রীর কাছে ভালো। (৩৮৭)
এই হলো সামান্য কিছু উদাহরণ। কারণ, এটা এমন এক অধ্যায়, যার কোনো শেষ নেই। এমন এক সমুদ্র, যার কোনো কিনারা নেই। এগুলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিজাগুলোর মধ্যে উজ্জ্বলতম মুজিজা এবং তাঁর নবুয়তের অন্যতম প্রধান প্রমাণ।

টিকাঃ
৩৩২. কাশফুল খফা: ১/২৬৩。
৩৩৪. সহিহ বুখারি: ১, সহিহ মুসলিম: ১৯০৭, সুনানে আবু দাউদ: ২২০১, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২২৭।
৩৩৫. সহিহ বুখারি: ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম: ১৭১৮।
৩৩৬. সহিহ বুখারি: ২০৫১, সহিহ মুসলিম: ১৫৯৯।
৩৩৭. ইবনে রজব হাম্বলি: জামিউল উলুম ওয়াল-হিকাম: ১/৯। (ইমাম আহমাদের কথার সূত্র)
*০৮, সহিহ মুসলিম: ১০১৫, সুনানে তিরমিজি: ২৭৯৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৬১৩।
৩৩৯. সুনানে তিরমিজি: ২৩১৮, মুসনাদে আহমাদ: ১৭৩৭।
৩৪০. সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১০২, মুসতাদরাকে হাকেম: ৭৮৭৩।
৩৪১. মুসনাদে আহমাদ: ২৮০৪, মুসতাদরাকে হাকেম: ৬৩০৩।
৩৪২. সহিহ বুখারি: ১৪১৩, ৬০২৩, সহিহ মুসলিম: ১০১৬।
৩৪৩. সহিহ বুখারি: ৬০২১, সহিহ মুসলিম: ১০০৫।
৩৪৪. সুনানে নাসায়ি: ২২২৪।
৩৪৫. সহিহ মুসলিম: ৯১, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৫৯, মুসনাদে আহমাদ: ৩৯৪৭।
৩৪৬. সহিহ মুসলিম: ২০০৩, সুনানে ইবনে মাজাহ ৩৩৯০, মুসনাদে আহমাদ: ৪৮৩০।
৩৮৭. সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯০৭৭, সুনানে দারেমি : ২২৬০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00