📄 ভবিষ্যদ্বাণীর অলৌকিকতা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অলৌকিক ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর সত্যতার অন্যতম প্রধান প্রমাণ। কারণ, তিনি এমন সব বিষয়ে সংবাদ দিয়েছেন, যা তিনি কখনো দেখেননি বা শোনেননি, অথচ তাঁর অনেকগুলোই ইতিমধ্যে সংঘটিত হয়েছে কিংবা অচিরেই সংঘটিত হবে। এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে তাঁকে এই ভবিষ্যতের বিষয়গুলো জানিয়েছেন, যার সমর্থন পাওয়া যায় কুরআনের এই আয়াতের মধ্যে, আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ذلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ﴾
(হে নবী,) এসব অদৃশ্যের সংবাদ, যা ওহির মাধ্যমে আপনাকে দিচ্ছি। [সুরা আলে ইমরান: ৪৪]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অলৌকিক অদৃশ্যের বর্ণনা কিংবা ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে আমরা এখানে মাত্র কয়েকটি হাদিস উপস্থাপন করব। কারণ, সেগুলো অসংখ্য অগণিত আমাদের এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে একত্র করা সম্ভব নয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় সংঘটিত যে ঘটনা সম্পর্কে তিনি সংবাদ দিয়েছেন তার মধ্যে একটি হলো তৎকালীন হাবশা(৩১৩) (বর্তমান ইথিওপিয়া)-এর বাদশা নাজাশির মৃত্যুসংবাদ। হজরত আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠিক সেদিনেই নাজাশির মৃত্যুর সংবাদ দেন, যেদিন তার মৃত্যু হয়। এরপর তিনি জানাজার স্থানের দিকে গিয়ে সাহাবিদের কাতারবদ্ধ করে (জানাজার নামাজে) চারটি তাকবির দিলেন। (৩১৪)
হাদিসটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার ওপর একটি শক্তিশালী প্রমাণ। কারণ, তিনি নাজাশির মৃত্যুর সংবাদ সেদিনই দিয়েছেন, যেদিন তার মৃত্যু হয়। অথচ মদিনা থেকে হাবশা বহুদূরের পথ। জাগতিক কোনো মাধ্যমে নবীজির জন্য সেই মুহূর্তে কিংবা সেই দিনে এটা জানা সম্ভব ছিল না। সন্দেহাতীতভাবে এটা প্রমাণ করে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই তাঁকে নাজাশির মৃত্যু সম্পর্কে জানিয়েছিলেন। (৩১৫)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অলৌকিক ভবিষ্যদ্বাণীর আরেকটি হলো মুসলমানদের পারস্যবিজয় এবং আরব উপদ্বীপের অঞ্চলসমূহে ব্যাপক শান্তি ও নিরাপত্তার সংবাদ প্রদান। হাদিসে এসেছে, আদি ইবনে হাতিম রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মজলিসে বসা ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি এসে নবীজির নিকট দুর্ভিক্ষের অভিযোগ করল। অতঃপর আরেক ব্যক্তি এসে ডাকাতের উপদ্রবের কথা বলে অনুযোগ করল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে আদি! তুমি কি হিরা নামক স্থানটি দেখেছ?' আমি বললাম, 'আমি তা দেখিনি। কিন্তু স্থানটি সম্পর্কে আমার জানা আছে।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি যদি দীর্ঘজীবী হও, তবে দেখতে পাবে, একজন উষ্ট্রারোহী মহিলা হিরা হতে রওয়ানা হয়ে নিরাপদে বাইতুল্লাহ শরিফ তাওয়াফ করে যাবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সে ভয় করবে না।'
আমি মনে মনে বলতে লাগলাম, তখন তায়ি গোত্রের ডাকাতগুলো কোথায় থাকবে, যারা ফেতনা-ফ্যাসাদের আগুন জ্বালিয়ে দেশকে অস্থির করে তুলছে?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বললেন, 'তুমি যদি দীর্ঘজীবী হও, তবে নিশ্চয় দেখতে পাবে যে তোমরা কিসরার ধনভান্ডার দখল করেছ।'
আমি বললাম, 'কিসরা ইবনে হুরমুজের ধনভান্ডার?'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ, কিসরা ইবনে হরমুজের। তোমার আয়ু যদি আরও দীর্ঘ হয়, তবে অবশ্যই তুমি দেখতে পাবে, মানুষ দু-হাতভরে স্বর্ণ-রৌপ্য নিয়ে বের হবে এবং এমন ব্যক্তির খোঁজ করে বেড়াবে যে তার এ সম্পদ গ্রহণ করবে। কিন্তু সে এমন একটি লোকও খুঁজে পাবে না। তোমাদের প্রত্যেকটি মানুষ কিয়ামত দিবসে মহান আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করবে। তখন তার ও আল্লাহর মাঝে কোনো দোভাষী থাকবে না। আল্লাহ বলবেন, আমি কি তোমার কাছে আমার বাণী পৌঁছানোর জন্য রাসুল প্রেরণ করিনি? সে বলবে, হ্যাঁ, প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ বলবেন, আমি কি তোমাকে ধনসম্পদ দান করিনি এবং দয়া ও মেহেরবানি করিনি? তখন সে বলবে, হ্যাঁ, দিয়েছেন। অতঃপর সে ডান দিকে তাকাবে, সেদিকে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না। এরপর সে বাম দিকে তাকাবে, সেদিকেও সে জাহান্নাম ছাড়া কিছুই দেখতে পাবে না।'
সাহাবি হজরত আদি রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, অতএব, আধখানা খেজুর দান করে হলেও তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেদের রক্ষা করো। আর যদি কেউ আধখানা খেজুরও না পায়, তবে সে যেন মানুষের সাথে ভালো কথা বলে নিজেকে আগুন থেকে রক্ষা করে।
সাহাবি হজরত আদি রা. (ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে) বলেন, আমি নিজে দেখেছি, একজন উষ্ট্রারোহী মহিলা হিরা থেকে একাকী রওয়ানা হয়ে নিরাপদে কাবা শরিফ তাওয়াফ করে এসেছে। সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করেনি। আর পারস্যম্রাট কিসরা ইবনে হুরমুজের ধনভান্ডার যারা দখল করেছিল, তাদের মধ্যে আমি নিজেও ছিলাম। তোমরা যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকো, তাহলে আবুল কাসিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যেমনটি বলেছেন, এক ব্যক্তি হাতভরে সোনা-রুপা নিয়ে বের হবে, কিন্তু কেউ তা গ্রহণ করার থাকবে না, সেটাও তোমরা দেখতে পাবে। (৩১৬)
খলিফা হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর সময়ে এই ভবিষ্যদ্বাণীটিও বাস্তবায়িত হয়েছিল। খলিফার কর্মচারীরা জাকাতগ্রহীতার খোঁজে জাকাত নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন, কিন্তু কেউ সেই জাকাত গ্রহণ করেনি। এভাবেই খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. মানুষদের সচ্ছল করে দিয়েছিলেন।
এ সম্পর্কে মুহাজির ইবনে ইয়াজিদ রহ. বলেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ আমাদের পাঠাতেন, আমরা মানুষদের মাঝে জাকাত বণ্টন করতাম। আমরা কখনো এমনও পেয়েছি, গত বছর যাকে জাকাত প্রদান করা হয়েছে, পরবর্তী বছর আমরা তার থেকেই জাকাত উসুল করেছি (অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে গরিবরাও সচ্ছল হয়ে গেছে)। (৩১৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার ওপর সাক্ষ্য প্রদানকারী আরেকটি অলৌকিক ভবিষ্যদ্বাণী হলো বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কুস্তুনতুনিয়া (৩১৮) (কনস্টান্টিনোপল) বিজয়ের সুসংবাদ। (৩১৯) আবদুল্লাহ ইবনে বিশর তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, অতি অবশ্যই (মুসলমানদের হাতে) কুস্তুনতুনিয়া (কনস্টান্টিনোপল) বিজিত হবে। কতই-না উৎকৃষ্ট তার সেনাপতি! কতই-না উৎকৃষ্ট সে সৈন্যবাহিনী ! (৩২০)
ভবিষ্যতের অদৃশ্য সংবাদের ক্ষেত্রে এই হাদিসটি এতটাই বিস্ময়কর ছিল যে, মুসলমানদের তখনকার বাস্তব অবস্থা দেখে খুব কম মানুষই এটার ওপর আস্থা রাখতে পেরেছিল। কারণ, মুসলমানরা যখন মক্কায় ছিল, তখনও তারা ছিল দুর্বল ও দুর্দশাগ্রস্ত। আবার মদিনাতে এসেও সব সময় চারপাশে শত্রুদের আক্রমণের ভয়ে ছিল। এই যাদের অবস্থা, সেই মুসলমানরা কীভাবে জয় করবে সেই অজেয় কুস্তুনতুনিয়া! এটা ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী। প্রচণ্ড ক্ষমতাধর পরাশক্তি পারস্যও যেটা কখনো জয় করতে সক্ষম হয়নি। এই দুই শক্তিমান সাম্রাজ্যের মাঝে বারবার ভয়াবহ লড়াই সংঘটিত হয়েছে, কখনো পারস্য বিজয়ী হয়েছে, কখনো রোম। সভ্য পৃথিবীর অধিকাংশ জায়গা তখন এই দুই পরাশক্তির মাঝে বণ্টিত। তাহলে স্বল্পশক্তির মুসলমানগণ কীভাবে এই শক্তিধর সাম্রাজ্যের ওপর বিজয়ী হতে পারে!
কিন্তু আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথার প্রতি মুসলমানদের ছিল পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের বলে বলীয়ান হয়েই ইসলামের অনেক সেনাপতি কুস্তুনতুনিয়া বিজয়ের সম্মান অর্জনের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এই প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল হজরত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা.-এর সময় থেকেই। তিনি তার পুত্র ইয়াজিদকে সেনাপতি বানিয়ে বিশাল এক বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন, সেই বাহিনীতে অনেক সাহাবি এবং সাহাবিদের সন্তানও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা কুস্তুনতুনিয় বিজয়ী বাহিনীর জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণিত সম্মান ও প্রশংসা অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় ছিলেন। পরবর্তী সময়ে কুস্তুনতুনিয়া বিজয়ের একাধিক প্রচেষ্টা হয়েছে। অবশেষে ৮৫৭ হিজরি মোতাবেক ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মহান উসমানি খলিফা মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ-এর হাতে বিজিত হয়। এটা ছিল ইসলামের মহান এক বিজয়। বিরাট এক অর্জন, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে মুহাম্মাদ আল-ফাতিহকে প্রদান করা হয়েছিল। আর এই প্রশংসিত বিরাট বিজয়ের মধ্য দিয়েই বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পতন হয়, এরপর আর কোনোদিন তারা উঠে দাঁড়াতে সক্ষম হয়নি।
আমাদের আলোচনাটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই হাদিসের মাধ্যমে সমাপ্ত করতে চাই, যেটা তাঁর নবুয়তের সত্যতার ওপর একটি স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। সেটা হলো, হেজাজ (৩২১)ভূমিতে অগ্ন্যুৎপাতের ভবিষ্যদ্বাণী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَخْرُجَ نَارُ مِنْ أَرْضِ الْحِجَازِ تُضِيءُ أَعْنَاقَ الْإِبِلِ بصری কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না হেজাজভূমি থেকে এমন আগুন বের হবে, যা বুসরা (৩২২)র উটগুলোর গর্দানও আলোকিত করে দেবে。(৩২৩)
৬৫৪ হিজরি মোতাবেক ১২৫৬ খ্রিষ্টাব্দে মদিনার নিকটবর্তী হেজাজভূমিতে এই ভয়াবহ আগুনের প্রকাশ ঘটে। সামসময়িক অনেক ঐতিহাসিক তাদের গ্রন্থে এই ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন ইমাম কুরতুবি রহ. তার তাজকিরা ‘تذکرة’ গ্রন্থে (৩২৪) এবং ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাছির এবং অন্যরা বর্ণনা করেছেন。(৩২৫)
টিকাঃ
*১০. হাবশা : আরব উপদ্বীপ হতে সরাসরি দক্ষিণে অবস্থিত একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল হাবশা বা আবিসিনিয়া। বর্তমান ইরিত্রিয়া, উত্তর ইথিওপিয়া, সোমালিয়ার উত্তর-পূর্ব অংশ, জিবুতি, মিশরের দক্ষিণাঞ্চল, সুদানের পূর্বাঞ্চল ও ইয়ামেনজুড়ে এর বিস্তৃতি ছিল।-সম্পাদক
৩১৪. সহিহ বুখারি: ১১৮৮, সহিহ মুসলিম: ৯৫১।
৩১৫. ফাজেল সালেহ সামাররায়ি: নুবুওয়াতু মুহাম্মাদ মিনাশ-শাক্কি ইলাল-ইয়াকিন: ১৬২।
৩১৬. সহিহ বুখারি: ৩৫৯৫।
৩১৭. ইমাম নববি: তাহজিবুল আসমা ওয়াল-লুগাত: ২/২১।
৩১৮. কুস্তুনতুনিয়া: তুরস্কের অন্যতম শহর ইস্তাম্বুল আরবদের কাছে কুস্তুনতুনিয়া বলেই পরিচিত ছিল। مسلمانوں হাতে এ শহর বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এটি ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী। ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য বিজেতাগণ এটি বিজয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন।-সম্পাদক
৩১৯. একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুসংবাদ দিয়েছিলেন ইয়ামেন, ইরাক, শাম, বাইতুল মুকাদ্দাস, মিশর, রোম, পারস্য বিজয়ের। দেখুন, সহিহ বুখারি: ১৭৭৬, সহিহ মুসলিম: ১৩৮৮।
৩২০. মুসনাদে আহমাদ : ১৮৯৭৭, মুসতাদরাকে হাকেম : ৮৩০০, হাইছামি: মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৬/২২৯।
৩২১. হেজাজ : আরব উপদ্বীপের পশ্চিম অংশে অবস্থিত সারাত পর্বতমালা অধ্যুষিত অঞ্চল। হেজাজ ০৫৬কে তিহামা হতে পৃথক করে রেখেছে।-সম্পাদক
৩২২. বুসরা (بصری) : বর্তমান সিরিয়ার অন্তর্গত একটি ঐতিহাসিক নগরী। সিরিয়ার রাজধানী দামেশক হতে এর দূরত্ব প্রায় ১৪০ কিলোমিটার।-সম্পাদক
৩২৩. সহিহ বুখারি: ৭১১৮, সহিহ মুসলিম: ২৯০২।
৩২৪. ইমাম কুরতুবি: আত-তাজকিরা: ২২৫।
৩২৫. ইবনে তাইমিয়া: আল-জাওয়াবুস সহিহ : ৩/১৬২-১৬৩, ৫/৪২০, ৬/৮৯; ইবনে কাছির : আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ২/৩৯৫।
📄 বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের মধ্যেও অনেক বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিত রয়েছে। এগুলোকে তাঁর সর্বশেষ নবী ও রাসুল হওয়ার ওপর জলজ্যান্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয়। কেননা আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে তিনি এমন সব বৈজ্ঞানিক কথা বলেছেন এবং এমন পরিবেশে বলেছেন, যখন পৃথিবীতে এ ধরনের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের দ্বারই উন্মোচিত হয়নি। এ ছাড়া তাঁর উম্মি হওয়ার কারণে সমালোচকদের এ কথা বলার পথও রুদ্ধ হয়ে গেছে যে, তিনি এসব জ্ঞান অর্জন করেছেন 'বাহিরা' থেকে কিংবা 'ওরাকা ইবনে নওফল' থেকে কিংবা অন্য কারও থেকে। তাই নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল শিক্ষার একমাত্র উৎস হলেন মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলা।
হাদিসের মধ্যে বর্ণিত বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বিশেষ কয়েকটি রীতি অনুসরণ করা অপরিহার্য। যেমন, এমন হাদিস নির্বাচন করা, যেগুলোর মধ্যে এই বিশ্বজগৎ, তার গঠনরীতি এবং তার উপাদানসমূহের বর্ণনা রয়েছে। আবার হাদিসের মান বা বিশুদ্ধতা নিয়েও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। মাওজু বা অশুদ্ধ হাদিস থেকে বিরত থাকা চাই। একই বিষয়ের হাদিসসমূহ একত্র করা চাই। কারণ, কোনো হাদিস একই বিষয়ের অন্য হাদিসকে ব্যাখ্যা করে। কুরআন এবং হাদিসের ভাষ্যকে আরবি ভাষার শব্দগুলোর যথাযথ অর্থ এবং তার নিয়মকানুন অনুযায়ী অনুধাবন করা। নির্দিষ্ট হাদিসের পারিপার্শ্বিক ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সাথে সংগতি রেখে কুরআনের আলোকে অনুধাবন করা। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসগুলো কুরআনেরই ব্যাখ্যা এবং তাঁর আয়াতের অর্থগুলোকে সুস্পষ্টতা দানকারী। (৩২৬) এগুলোর সাথে সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক বিষয় সাব্যস্ত করার জন্য চেষ্টা না করা, যা সুস্পষ্ট ও অকাট্য নয়। এখানে আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসে বর্ণিত এমন কয়েকটি বৈজ্ঞানিক অলৌকিক বিষয় তুলে ধরব, যেগুলো তাঁর নবুয়তের সত্যতার ওপর সুস্পষ্ট প্রমাণ। যথা:
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসে বর্ণিত বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতার উজ্জ্বলতম উদাহরণ হলো তাঁর এই কথাটি :
«إِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَا يَخْسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلَا لِحَيَاتِهِ وَلَكِنَّهُمَا آيَتَانِ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُمَا فَصَلُّوا»
নিশ্চয় সূর্য ও চন্দ্র কারও মৃত্যু বা জীবনের কারণে গ্রহণগ্রস্ত হয় না। বরং এ দুটি হলো আল্লাহ তাআলার নিদর্শনাবলির মধ্য থেকে অন্যতম নিদর্শন। অতএব, তোমরা যখন সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ দেখবে, তখন তোমরা নামাজ আদায় করবে। (৩২৭)
এই হাদিসের মধ্যে যে বৈজ্ঞানিক তথ্য বর্ণিত হয়েছে, সেটা আজকের আধুনিক বিজ্ঞানও প্রমাণ করতে পারেনি। সেটা হলো, 'কারও মৃত্যু বা জীবনের কারণে গ্রহণগ্রস্ত হয় না' এই কথা। অর্থাৎ কোনোভাবেই পৃথিবীর কোনো ব্যক্তির মৃত্যু বা জন্ম অথবা কোনো জাগতিক ঘটনা সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের কারণ হতে পারে না। তবে এই জাগতিক ঘটনাগুলো গ্রহণ সংঘটিত হওয়ার সময়ে একীভূত হতে পারে। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বক্তব্যটি ছিল মানুষের মাঝে প্রচলিত কুসংস্কারের বিপরীতে। কারণ, তারা ধারণা করত, সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ পৃথিবীতে কোনো মহান ব্যক্তির মৃত্যু কিংবা জন্মের কারণে হয়ে থাকে।
আমরা যদি বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই হাদিসের প্রতি লক্ষ করি তাহলে দেখব, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র হজরত ইবরাহিম রা.-এর মৃত্যুর দিন সূর্যগ্রহণ সংঘটিত হয়। আরবের লোকেরা তখন বলাবলি করতে লাগল, ইবরাহিমের মৃত্যুতে সূর্যগ্রহণ হয়েছে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলে তাদের ভুল ধারণা অপনোদন করেন। অথচ তিনি ইচ্ছা করলে তখন এই সুযোগ গ্রহণ করতে পারতেন এবং কুসংস্কারটিকে সত্যায়ন করে নিজের ছেলের মর্যাদা ও সম্মান আরও বাড়িয়ে নিতে পারতেন, নিজেরও মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি এমনটি করেননি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের আরেকটি বৈজ্ঞানিক বিস্ময়কর বিষয় হলো তাঁর এই উক্তি,
«النُّجُومُ أَمَنَةٌ لِلسَّمَاءِ فَإِذَا ذَهَبَتِ النُّجُومُ أَتَى السَّمَاءَ مَا تُوعَدُ وَأَنَا أَمَنَةٌ لِأَصْحَابِي فَإِذَا ذَهَبْتُ أَتَى أَصْحَابِي مَا يُوعَدُونَ وَأَصْحَابِي أَمَنَةٌ لِأُمَّتِي فَإِذَا ذَهَبَ أَصْحَابِي أَتَى أُمَّتِي مَا يُوعَدُونَ»
তারকারাজি আসমানের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ। তারকারাজি যখন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে, তখন আসমানের জন্য প্রতিশ্রুত বিপদ আসন্ন হবে। (অর্থাৎ কিয়ামত এসে যাবে এবং আসমান ভেঙে খানখান হয়ে যাবে)। আমি আমার সাহাবিদের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ। আমি যখন বিদায় হয়ে যাব, তখন আমার সাহাবিদের ওপর প্রতিশ্রুত বিষয় উপস্থিত হবে। আর আমার সাহাবিগণ আমার উম্মতের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ। আমার সাহাবিগণ যখন বিদায় হয়ে যাবে, তখন আমার উম্মতের ওপর প্রতিশ্রুত বিষয় উপস্থিত হবে। (৩২৭)
এই হাদিসের মধ্যে এমন একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য বর্ণিত হয়েছে, আজকের আধুনিক বিজ্ঞান যেটাকে প্রমাণিত ও সত্যায়িত করেছে। আর সেটা হলো, তারকা-নক্ষত্রসমূহের পতন, তাদের ঝরে পড়া এবং বিলুপ্ত হওয়া। এরপর এগুলোর বিস্ফোরিত হয়ে মহাশূন্যের ধোঁয়ায় পরিণত হয়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া।
যে বিশাল নক্ষত্রপুঞ্জ পরিলক্ষিত হয়, এগুলো তার সীমাহীন আকর্ষণশক্তির মাধ্যমে মহাশূন্যে ঘুরে বেড়ানো অন্যান্য গ্রহ, উপগ্রহ, চন্দ্র, ধূমকেতু এবং এ ছাড়া আরও বহু মহাজাগতিক বস্তুকে নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করে। নিজেদের দিকে আকর্ষণ করে ধরে রাখে। তারকাগুলোও একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে পারস্পরিক আকর্ষণের মধ্যে অবস্থান করে। এভাবে সকল তারকা একত্রে মিলে বহু বড় বড় জগৎ তৈরি করে। সেখানেও নিজেদের মাঝে পারস্পরিক একটি আকর্ষণ বিদ্যমান থাকে। কিন্তু যখন এসব আকর্ষণ আলগা হয়ে যাবে কিংবা ভেঙে পড়বে, সেদিন তারকাগুলোও ধ্বংস হবে। তারকাগুলো ধ্বংস হওয়ার মাধ্যমে দুনিয়ার আসমানও ধ্বংস হবে। দুনিয়ার আসমান ধ্বংস হওয়ার মাধ্যমে পুরো বিশ্বজগৎ ধ্বংস হয়ে যাবে। আর এই কথাটিই হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে এভাবে,
النُّجُومُ أَمَنَةٌ لِلسَّمَاءِ فَإِذَا ذَهَبَتِ النُّجُومُ أَتَى السَّمَاءَ مَا تُوعَدُ
তারকারাজি আসমানের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ। তারকারাজি যখন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে, তখন আসমানের জন্য প্রতিশ্রুত বিপদ আসন্ন হবে (অর্থাৎ কিয়ামত এসে যাবে এবং আসমান ভেঙে খানখান হয়ে যাবে)। (৩২৮)
হাদিসটি স্পষ্টভাবেই একটি বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা ধারণ করছে। নতুবা বিশ্বজগতের এমন গঠন এবং তার ভারসাম্য সম্পর্কে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কে জানিয়েছে? এগুলো কীভাবে সেই উম্মি নবী জানবেন, যিনি নিজেও এমন এক মূর্খ-অজ্ঞ জাতির মাঝে জীবনযাপন করতেন, যেখানে এসব চিরন্তন বৈজ্ঞানিক তথ্যের কোনো ঝান্ডাই ওড়েনি? নিশ্চয় আল্লাহ তাআলাই তাঁর নবীকে ওহীর মাধ্যমে এসব বিষয় জানিয়েছেন। ফলে তাঁর রাসুল যা বলেছেন, সত্যই বলেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে হাদিসগুলো আধুনিক যুগের বহু অমুসলিম পণ্ডিতকেও হতবুদ্ধি করে দিয়েছে এবং তাদের অসংখ্য মানুষের ইসলামগ্রহণের কারণ হয়েছে, তেমনই একটি হাদিস হলো এই,
«قَالَ إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا ثُمَّ يَكُونُ عَلَقَةً مِثْلَ ذَلِكَ ثُمَّ يَكُونُ مُضْغَةً مِثْلَ ذَلِكَ ....
নিশ্চয় তোমাদের সকলের সৃষ্টির উপাদান নিজ নিজ মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত শুক্রাণুরূপে অবস্থান করে, অতঃপর তা জমাটবাঁধা রক্তে পরিণত হয়ে ওভাবে অবস্থান করে। অতঃপর তা মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়ে ওভাবে অবস্থান করে। (৩২৯)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদিস আমাদের নিকট স্পষ্ট করছে, গর্ভাশয়ে মানুষের সৃষ্টিপ্রক্রিয়া তিনটি ধাপ অতিক্রম করে। তা হলো, শুক্রাণু, রক্তপিণ্ড এবং মাংসপিণ্ড। মাতৃগর্ভে গর্ভসঞ্চার-প্রক্রিয়ার শুরু থেকে প্রথম চল্লিশ দিনে প্রথম ধাপটি পূর্ণ হয়। মানবভ্রূণবিদ্যা নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণগুলো এই বক্তব্যকেই সুদৃঢ় করে।
সাম্প্রতিক কিছু বিজ্ঞানী হাদিসে বর্ণিত সময়কে (তথা ৪০ দিন) তার তিনগুণ বুঝেছেন। অর্থাৎ একশ বিশদিন ধরেছেন। কারণ, তারা হাদিসের 'مِثْلَ ذَلِكَ' ওভাবে শব্দ দ্বারা মনে করেছেন, এখানে ভ্রূণ, জমাট রক্ত এবং মাংসপিণ্ড গঠনের প্রতিটি ধাপের সময়কে চল্লিশ দিন করে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি হাদিস তাদের এই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে দেয়। হাদিসটি এই,
إِذَا مَرَّ بِالنُّطْفَةِ ثِنْتَانِ وَأَرْبَعُونَ لَيْلَةً بَعَثَ اللَّهُ إِلَيْهَا مَلَكًا فَصَوَّرَهَا وَخَلَقَ سَمْعَهَا وَبَصَرَهَا وَجِلْدَهَا وَلَحْمَهَا وَعِظَامَهَا»
যখন (মাতৃগর্ভে) শুক্রাণুর ওপর বিয়াল্লিশ রাত চলে যায়, তখন আল্লাহ তাআলা একজন ফিরেশতা প্রেরণ করেন। তখন তিনি সেটাকে একটি রূপ দান করেন, তার কান, চোখ, চামড়া, গোশত ও হাড় সৃষ্টি করেন। (৩৩০)
তবে মাংসপিণ্ডের সাথে মানবাকৃতির নিকটতম কিংবা দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। (সুতরাং হাদিসটির অর্থ হলো,) মাংসপিণ্ডটি মাংসপিণ্ড হিসেবে গঠিত হওয়ার পরবর্তী পাঁচদিন থেকে ধীরে ধীরে মানবাকৃতি ধারণ করতে থাকে। অর্থাৎ গর্ভসঞ্চার হওয়ার চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ দিনের মধ্যে এটা গঠিত হওয়া শুরু করে। পঁয়তাল্লিশতম দিনে এর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও হাড়ের আকৃতির প্রকাশ পূর্ণতা লাভ করে। এরপর কেবল বিভিন্ন কোষ এবং গঠন-আকৃতির সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো তৈরি হয়।
মানবভ্রূণবিদ্যা সম্পর্কে ব্যাপক পরীক্ষানিরীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, মাংসপিণ্ডের গঠন সম্পূর্ণ না হলে এই ধাপগুলোর সূচনা হয় না। অর্থাৎ গর্ভধারণের পর ষষ্ঠ সপ্তাহ (হাদিসের ভাষায় বিয়াল্লিশ রাত) অতিবাহিত হওয়ার পর আকৃতিগঠনের কার্যক্রম শুরু হয়। এভাবেই এই দুটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথার সত্যতা প্রমাণিত হয় এবং তাঁর বলা সকল হাদিসেই তাঁর সত্যতা প্রমাণিত হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে জানলেন এই বৈজ্ঞানিক সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়াদি এবং ভ্রূণসৃষ্টির জটিলতা? আর কীভাবেই-বা জানলেন সেই শুক্রাণুর অবস্থা, অথচ বীর্যের মাত্র এক মিলিলিটারে অবস্থান করে দশহাজার শুক্রাণু! একবার স্খলিত সেই বীর্যের পরিমাণ এক মিলিলিটার থেকে দশ মিলিলিটার পর্যন্ত উপনীত হতে পারে! (৩৩১)
ভ্রূণ যদি অসম্পূর্ণ ও রক্তের সাথে মিশ্রিত অবস্থায় গর্ভপাতও হয়ে যায়, তাহলেও মানুষের জন্য তা বোঝা সম্ভব নয়। আর তা দেখতে পাওয়া, তার বিবরণ দেওয়া এবং তার স্তরের বিশুদ্ধ নামকরণ করা তো দূরের কথা। স্বাভাবিকভাবে খালি চোখে দেখে এবং তার সম্পর্কে কিছু না জেনে কিছুতেই তার সার্বিক বিবরণ প্রদান করা সম্ভব নয়। অথচ বর্ণিত হাদিসের মধ্যে ভ্রূণসৃষ্টির ধাপগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেওয়া হয়েছে। তৎকালের প্রেক্ষিতে অবশ্যই এটি এক বৈজ্ঞানিক বিস্ময় বা অলৌকিকতা। অতএব, বলা যায় নিঃসন্দেহে হাদিসটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার ওপর সুস্পষ্ট প্রমাণ।
এই হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের বৈজ্ঞানিক বিষয়াবলির প্রতি সামান্য কিছু ইশারা। আমাদের গ্রন্থের পরিসর এর চেয়ে অধিক বিষয় উপস্থাপনের উপযোগী নয়, তা আমাদের উদ্দেশ্যও নয়। তবে উদাহরণ হিসেবে এই দু-একটি উপস্থাপনই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা-কিছু আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন, তার সব ব্যাপারেই তিনি সত্য ও সঠিক বলেছেন।
টিকাঃ
*২৬. জগলুল নাজ্জার: আল-ইজাজুল ইলমি ফিস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যা : ২৬-৩২।
৩২৭. সহিহ বুখারি: ১০৪৪, সহিহ মুসলিম: ৯০৪
৩২৮. জগলুল নাজ্জার: আল-ইজাজুল ইলমি ফিস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যা: ১৩৪-১৩৫।
৩২৯. সহিহ বুখারি: ৩২০৮, ৩৩৩২; সহিহ মুসলিম: ২৬৪৩।
৩৩০. সহিহ মুসলিম: ২৬৪৫。
৩৩১. ড. আবদুল মাজিদ যানদানি ও শাইখ জাসির: আল-আজিন্নাতু ফিল কুরআনিল কারিম ওয়াল-কুতুবিল মুকাদ্দাসাতি ওয়া আগওয়ালিল আতিব্বায়িল মুতাকাদ্দিমিন: ২০-২৭, ড. মুহাম্মাদ আলি বার: খলকুল ইনসান বাইনাত তিব্বি ওয়াল কুরআন: ২০৭-২১৬, আল-ইজাজুল ইলমি ফিস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যা: ২১৬-২২২।
📄 বর্ণনারীর অলৌকিকতা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার আরেকটি উজ্জ্বলতম প্রমাণ হলো তাঁকে দান করা হয়েছে (جوامع الکلم) জাওয়ামিউল কালিম) বা স্বল্প শব্দে অধিক অর্থসমৃদ্ধ কথার যোগ্যতা। তাঁর পূর্বে বা পরে আর কাউকে এই যোগ্যতা বা বৈশিষ্ট্য প্রদান করা হয়নি। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলেছেন,
«أُوتِيتُ جَوَامِعَ الْكَلِمِ، وَاخْتُصِرَ لِيَ الْكَلَامُ اخْتِصَارًا»
আমাকে প্রদান করা হয়েছে 'জাওয়ামিউল কালিম' (স্বল্প শব্দে অধিক অর্থসমৃদ্ধ কথার যোগ্যতা) এবং আমার জন্য কথাকে খুবই সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। (৩৩২)
অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন, «بُعِثْتُ بِجَوَامِعِ الْكَلِمِ»
আমি 'জাওয়ামিউল কালিম' সহকারে প্রেরিত হয়েছি। (৩৩৩)
'জাওয়ামিউল কালিম' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য স্বল্প শব্দে অনেক অর্থসমৃদ্ধ কথা প্রদান করেছিলেন (অর্থাৎ শব্দ কম, কিন্তু তার অর্থ, মর্ম বা ব্যাখ্যা অনেক দীর্ঘ ও বিস্তৃত)। এ কারণে আপনি দেখতে পাবেন, হাদিসের কথাগুলো খুবই স্বল্প শব্দবিশিষ্ট। তবুও এগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করে আছে অনেক বিধান, উপদেশ, শিক্ষা ও বিভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। এই বৈশিষ্ট্য আর কারও নেই। নবীজির আগেও আর কাউকে এই বৈশিষ্ট্য প্রদান করা হয়নি। আর এই বৈশিষ্ট্য শুধু তাঁর কথার একটি নির্দিষ্ট দিক বা তাঁর কিছু হাদিসের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়; বরং তাঁর সকল কথা, সকল হাদিসই এই বৈশিষ্ট্য ধারণ করে আছে। অবশ্যই এটি একটি অতি বিস্ময়কর এবং চ্যালেঞ্জিং বিষয়।
আমরা এটাও জানি, শব্দের সংক্ষিপ্ততা হাদিসগুলোকে মুখস্থ করতে ও স্মরণ রাখতে সহজ করে। আরেকটি বড় উপকার হলো, স্থান ও সময়ের পরিবর্তনের সাথে সংগতি রেখে এই নিগূঢ় অর্থসমৃদ্ধ কথা থেকে নতুন নতুন বিষয় ও বিধান উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়। এভাবেই ইসলামি শরিয়ত সকল যুগ ও স্থানের জন্য প্রযোজ্য ও উপযুক্ত হিসেবে গণ্য হতে থাকে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই অনন্য-অসাধারণ বৈশিষ্ট্য নিয়ে অনেক মুসলিম ফিকহবিদ বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছেন। যেমন কেউ কেউ তাঁর ছোট ছোট বাক্যের এমন কিছু হাদিস নির্বাচন করেছেন, যেগুলোর একটিকে অন্যটির সাথে মিলিয়ে নিলে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটে ওঠে। ইসলামি শরিয়তকে অভিনব ও সংক্ষিপ্তভাবে চিত্রিত করতে পারে। এমন একটি কাজ করেছেন হজরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ.। তিনি বলেন, ইসলামের ভিত্তি তিনটি হাদিস। যথা:
১. হজরত উমর রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, »إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنَّيَّاتِ« সকল আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। (৩৩৪)
২. হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, »مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدُّ«-যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সৃষ্টি করবে, যা এর মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত ও পরিত্যাজ্য। (৩৩৫)
৩. হজরত নুমান ইবনে বশির রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, »الْحَلَالُ بَيِّنُ وَالْحَرَامُ بَيِّنُ«-হালালও সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট। (৩৩৬) (৩৩৭)
উল্লিখিত প্রতিটি হাদিস অতি চমৎকারভাবে ইসলামের একেকটি দিককে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ করছে। এমনকি আপনি এর সবগুলো একসঙ্গে পড়ে ফেলা মানে আপনি যেন পুরো ইসলাম সম্পর্কেই পড়ে নিলেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসগুলোর মধ্যে উদাহরণ হিসেবে 'জাওয়ামিউল কালিম' নির্বাচন করা খুবই মুশকিলের ব্যাপার। কারণ, তাঁর প্রায় প্রতিটি কথা ও হাদিসই 'জাওয়ামিউল কালিম'-এর অন্তর্ভুক্ত। তাঁর প্রতিটি কথার মর্ম উদ্ধারে একটি বড় পরিসরের ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাপক অর্থ ধারণকারী হাদিসের ক্ষেত্রে। তবুও রাসুলের হাদিসের অলৌকিকতা বোঝার জন্য আমরা এখানে অল্প কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করার ইচ্ছা রাখি। যথা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبُ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا» নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা উত্তম, তিনি উত্তম ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না। (৩৩৮)
এই অতি সংক্ষেপ বাক্যগুলোর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, আল্লাহ তাআলা কোন কাজগুলো গ্রহণ করেন, আর কোনগুলো গ্রহণ করেন না। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা ভালো কাজগুলো গ্রহণ করেন। আর ভালো কাজেরও কোনো সীমাপরিসীমা নেই। ভালো কাজের মধ্যে আল্লাহ তাআলা গ্রহণ করেন সদকা, আত্মশুদ্ধি, ভালো কাজের আদেশ, সত্য ও সততা, আমানতদারি, সাহায্য-সহযোগিতা, হেদায়েত, বদান্যতা এবং এমন আরও লক্ষ-কোটি ভালো কাজ রয়েছে।
আর অন্যদিকে তিনি খারাপ কাজ গ্রহণ করেন না। সে কারণে তিনি গ্রহণ করেন না চুরি, খিয়ানত, ভীরুতা, ধোঁকা, প্রতারণা, অশ্লীলতা এবং এমন আরও লক্ষ-কোটি খারাপ কাজ। এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণিত ছোট্ট কথাটি ইসলামের অন্যতম স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।
উদাহরণ অনুযায়ী আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্য হাদিসগুলোর ব্যাখ্যা ভেবে নিতে পারেন। নিচে এমনই কয়েকটি হাদিস উপস্থাপন করা হলো-
«مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ» . হলো, অপ্রয়োজনীয় বিষয় বর্জন করা। (৩৩৯)
«إِزْهَدْ فِي الدُّنْيَا يُحِبُّكَ اللهُ وَازْهَدْ فِيمَا فِي أَيْدِي النَّاسِ يُحِبُّكَ النَّاسُ» . দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত হও। আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। আর মানুষের নিকট যা আছে, তুমি তার প্রতি অনাসক্ত হয়ে যাও, তারাও তোমাকে ভালোবাসবে। (৩৪০)
«تَعَرَّفْ إِلَى اللهِ فِي الرَّخَاءِ يَعْرِفْكَ فِي الشَّدَّةِ» . তাআলার কথা স্মরণ রাখো, তাহলে অভাবের সময় তিনিও তোমাকে মনে রাখবেন। (৩৪১)
»اِتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقٌ تَمْرَةٍ« 8.-আধখানা খেজুর দিয়ে হলেও জাহান্নাম থেকে বাঁচো। (৩৪২)
৫. »كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةً« প্রতিটি ভালো কাজই একটি সদকা। (৩৪৩)
৬. »الصَّوْمُ جُنَّةُ« -রোজা হলো ঢালস্বরূপ। (৩৪৪)
»لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ« 9. পরিমাণ অহংকার রয়েছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (৩৪৫)
৮. »كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ وَكُلُّ خَمْرٍ حَرَامٌ«-নেশা উদ্রেককারী প্রতিটি জিনিসই খমর (মদ), আর প্রত্যেক মদই হারাম। (৩৪৬)
৯. »خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ« - তোমাদের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ, যে তার স্ত্রীর কাছে ভালো। (৩৮৭)
এই হলো সামান্য কিছু উদাহরণ। কারণ, এটা এমন এক অধ্যায়, যার কোনো শেষ নেই। এমন এক সমুদ্র, যার কোনো কিনারা নেই। এগুলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিজাগুলোর মধ্যে উজ্জ্বলতম মুজিজা এবং তাঁর নবুয়তের অন্যতম প্রধান প্রমাণ।
টিকাঃ
৩৩২. কাশফুল খফা: ১/২৬৩。
৩৩৪. সহিহ বুখারি: ১, সহিহ মুসলিম: ১৯০৭, সুনানে আবু দাউদ: ২২০১, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২২৭।
৩৩৫. সহিহ বুখারি: ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম: ১৭১৮।
৩৩৬. সহিহ বুখারি: ২০৫১, সহিহ মুসলিম: ১৫৯৯।
৩৩৭. ইবনে রজব হাম্বলি: জামিউল উলুম ওয়াল-হিকাম: ১/৯। (ইমাম আহমাদের কথার সূত্র)
*০৮, সহিহ মুসলিম: ১০১৫, সুনানে তিরমিজি: ২৭৯৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৬১৩।
৩৩৯. সুনানে তিরমিজি: ২৩১৮, মুসনাদে আহমাদ: ১৭৩৭।
৩৪০. সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১০২, মুসতাদরাকে হাকেম: ৭৮৭৩।
৩৪১. মুসনাদে আহমাদ: ২৮০৪, মুসতাদরাকে হাকেম: ৬৩০৩।
৩৪২. সহিহ বুখারি: ১৪১৩, ৬০২৩, সহিহ মুসলিম: ১০১৬।
৩৪৩. সহিহ বুখারি: ৬০২১, সহিহ মুসলিম: ১০০৫।
৩৪৪. সুনানে নাসায়ি: ২২২৪।
৩৪৫. সহিহ মুসলিম: ৯১, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৫৯, মুসনাদে আহমাদ: ৩৯৪৭।
৩৪৬. সহিহ মুসলিম: ২০০৩, সুনানে ইবনে মাজাহ ৩৩৯০, মুসনাদে আহমাদ: ৪৮৩০।
৩৮৭. সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯০৭৭, সুনানে দারেমি : ২২৬০।