📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 মনস্তাত্ত্বিক অলৌকিকতা

📄 মনস্তাত্ত্বিক অলৌকিকতা


আল্লাহ তাআলা এই শরিয়ত প্রদান করেছেন কিছু শব্দের অধীনে। তিনি এই শব্দগুলোকে করেছেন বিস্ময়কর ও বিমুগ্ধকর। আপনি বিশুদ্ধ নিয়তে এবং পরিচ্ছন্ন মন নিয়ে আল্লাহ তাআলার কিতাবের যেখানেই দৃষ্টি দিবেন, প্রতি আয়াতের মাঝেই আপনি একটি সুউচ্চ বিস্ময় এবং সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখতে পাবেন। এগুলো পরিদৃষ্ট হবে কুরআনের বর্ণনা-বক্তব্যের মাঝে, তার প্রদত্ত অর্থের মাঝে। এরই মাধ্যমে মুসলিমরা শরিয়তের হুকুমগুলো এমন বিস্ময়কর উজ্জ্বল আলোর মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়েছে, যার আলো সকল প্রান্তর ও অন্তরকে উদ্ভাসিত করে। তার পরশে বক্ষসমূহ উন্মোচিত ও উৎসারিত হয়। আর অন্তরগুলো ঈমানের জন্য হয় উন্মুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَنْ لَّمْ يَجْعَلِ اللَّهُ لَهُ نُورًا فَمَا لَهُ مِنْ نُوْرٍ
বস্তুত আল্লাহ যাকে আলো না দেন, তার নসিবে কোনো আলো নেই। [সুরা নূর: ৪০]
মানুষের মন ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে কুরআনে এমন অনেক সূক্ষ্ম বিবরণ ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা রয়েছে, যা শুধু সৃষ্টিকর্তাই জানতে পারেন। এ কারণে মানুষের মনস্তত্ত্ব বিষয়ে কুরআনুল কারিমের গভীর ভূমিকা রয়েছে। মনের ব্যাপারে কুরআনের আলোচনা কয়েক প্রকার, তন্মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকারটি হলো, মন সম্পর্কে সাধারণ আলোচনা, মনের ওপর কুরআনুল কারিমের প্রভাব এবং মনের সকল পর্দা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করা ইত্যাদি।
সুতরাং কুরআনুল কারিমে মনস্তাত্ত্বিক অলৌকিকতার বিষয়টা এই যে, কুরআনুল কারিমের আয়াতগুলো দৃষ্টি প্রদান করেছে মানুষের সকল শ্রেণি এবং তাদের সকল অবস্থার দিকে, তাদের অন্তরের সকল গোপন বিষয় এবং তাদের সকল প্রতিবন্ধকতার দিকে। কখনো কখনো মুসলমানদের শত্রুদের প্রতিও ইশারা করেছে এবং কোনো আয়াত যখন কোনো দৃশ্যের চিত্র তুলে ধরেছে, তখন তার সকল অবস্থা তথ্যসহ তুলে ধরেছে।
সেগুলোর জন্য স্পষ্ট এবং নির্ধারিত সীমারেখা এঁকে দিয়েছে। এভাবে মানুষের অন্তরের মধ্যে কুরআনুল কারিম একটি প্রশান্তিদায়ক অবস্থার সৃষ্টি করেছে।
কুরআনুল কারিমের এ ধরনের অলৌকিকতার বিষয়ে প্রথম যিনি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তিনি হলেন ইমাম খাত্তাবি রহ. (মৃত্যু : ৩৮৮ হিজরি)। তিনি তার আলোচনার শিরোনাম দেন: تأثير القرآن في القلوب অর্থাৎ অন্তরে কুরআনের প্রভাব। তিনি সেখানে উল্লেখ করেন, কুরআনুল কারিমের আরেকটি অলৌকিক দিক রয়েছে। ব্যতিক্রম দু-একজনের কথা বাদ দিলে সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে একদম অবগত নয়। বিষয়টা হলো, অন্তরে কুরআনুল কারিমের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি। আপনি কুরআন ব্যতীত এমন কোনো গদ্য-পদ্য পাবেন না, যা শুনলেই সর্বাবস্থায় আপনার অন্তর তার স্বাদ ও মিষ্টতার প্রতি ঝুঁকে পড়বে। একমাত্র কুরআনের ক্ষেত্রেই এমনটা হতে পারে। এর শোভা-সৌন্দর্য এবং ভীতি ও সতর্কতার ক্ষেত্রেও ভিন্ন ভিন্ন আকর্ষণ রয়েছে। কুরআনের মাধ্যমে অন্তরসমূহ সুসংবাদপ্রাপ্ত হয়, বক্ষসমূহ সম্প্রসারিত হয় আর অন্তরসমূহ যখন কুরআনের কোনো অংশ নিজের মধ্যে ধারণ করে, অন্তর ভীত হয়ে পড়ে।
অন্তরে ভয় এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। অন্তর হয় বিচলিত। জাহান্নামের ভয় ও শঙ্কা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। শরীরের চামড়া কাঁপতে থাকে। অন্তরসমূহ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। এটা তখন ব্যক্তি এবং তার গোপন বিষয়াবলির মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তাকে অপরাধ থেকে বিরত রাখে। আরবের কত বীর সাহসী ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গোপনে কিংবা প্রকাশে হত্যার ইচ্ছা নিয়ে এগিয়ে এসেছে, কিন্তু সেই মুহূর্তেও যখন তারা কুরআনের কিছু আয়াত শুনেছে, অমনি তারা তাদের পূর্ব ইচ্ছা থেকে ফিরে এসেছে। অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করেছে। শত্রুরা শান্তিস্থাপন করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। অবশেষে তারা কুরআনের ধর্মে প্রবেশ করেছে। তাদের শত্রুতা বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছে। আর তাদের কুফরি রূপান্তরিত হয়েছে ঈমানে। (২৯৮)
পৃথিবীর অনেক আলেম অন্তরে কুরআনুল কারিমের বিস্ময়কর প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন ইমাম জারকাশি রহ. বলেন, কুরআনুল কারিমের এই অসাধারণ সৌন্দর্য ও চমৎকারিত্ব শ্রোতা এবং পাঠকদের অন্তরে অনেক প্রভাব ফেলে। সেই ব্যক্তি কুরআনে বিশ্বাসী হোক কিংবা না হোক। আরেকটি বিস্ময় হলো, শ্রোতাদের কানে এবং পাঠকদের জিহ্বায় এটা সব সময়ই সজীব ও সতেজ মনে হতে থাকে। (২৯৯)
ওহিকে বলা হয় অন্তরের প্রাণ। আর দেহের প্রাণের চেয়ে অন্তরের প্রাণ শ্রেষ্ঠ।
কাজি ইয়াজ (৩০০) বলেন, কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রভাব, আরবের অনেক কাফেরের ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কুরআনুল কারিমে রয়েছে এমন এক চমৎকারিত্ব, যা শ্রবণের সময় শ্রোতাদের অন্তরসমূহকে নিমগ্ন করে। তিলাওয়াতের সময় এর প্রভাব তাদের পুরো সত্তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। পৃথিবীর অনেক মানুষ শুধু এর আয়াত শুনেই ইসলামগ্রহণ করেছে। যেমন হজরত যুবায়ের ইবনে মুতইম রা.। তিনি একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাগরিব নামাজে সুরা 'তুর' তিলাওয়াত করতে শুনলেন। তিনি বলেন, সুরাটি পড়তে পড়তে নবীজি যখন এ আয়াতে পৌঁছলেন,
أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ أَمْ خَلَقُوا السَّمَوتِ وَالْأَرْضَ بَلْ لَّا يُؤْقِنُوْنَ أَمْ عِنْدَهُمْ خَزَائِنُ رَبِّكَ أَمْ هُمُ الْمُصَّيْطِرُونَ ﴾
৩৫. তারা কি কারও মাধ্যম ছাড়াই আপনা-আপনি সৃষ্টি হয়ে গেছে, নাকি তারাই (নিজেদের) স্রষ্টা?
৩৬. নাকি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী তারা সৃষ্টি করেছে? না, বরং (মূলকথা হচ্ছে) তারা বিশ্বাসই রাখে না।
৩৭. তোমার প্রতিপালকের ভান্ডার কি তাদের কাছে, না তারাই (সবকিছুর) নিয়ন্ত্রক? [সুরা তুর: ৩৫-৩৭]
এগুলো শুনে আমার অন্তর যেন উড়ে গেল। ইসলাম আমার অন্তরে প্রভাব ফেলার এটাই প্রথম ঘটনা। (৩০১)
মানবমনের বিভিন্ন রোগ ও ব্যাধির চিকিৎসা ও নিরাময়ের ক্ষেত্রেও কুরআনুল কারিমের এই মনস্তাত্ত্বিক বিস্ময়কর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا﴾
আমি নাজিল করছি এমন কুরআন, যা মুমিনদের পক্ষে শিফা ও রহমত। তবে জালিমদের ক্ষেত্রে এর দ্বারা ক্ষতি ছাড়া অন্য কিছু বৃদ্ধি হয় না। [সুরা বনি ইসরাইল : ৮২]
অন্য আয়াতে এসেছে,
﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُمْ مَّوْعِظَةٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ﴾
হে মানুষ! তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এসেছে এক উপদেশ, অন্তরের রোগ-ব্যাধির উপশম এবং মুমিনদের পক্ষে হেদায়েত ও রহমত। [সুরা ইউনুস: ৫৭]
মানুষের শারীরিক চিকিৎসা করা হয় খাদ্য ও ওষুধের মাধ্যমে। আর আত্মার চিকিৎসা হয় তারই মতো কিছু আত্মিক বিষয় দ্বারা যা তাদের অন্তরের মধ্যে যে-সকল অন্যায় বিষয় উত্থিত হয়, সেগুলোকে দমন করবে। কুরআনুল কারিমও ঠিক সেটাই করে। সুতরাং কুরআনের মধ্যে রয়েছে অন্তরের শিফা, নিরাময় ও প্রতিষেধক। আর কুরআনের মধ্যে রয়েছে তাদের জন্য রহমত, যাদের অন্তরের সাথে মিশ্রিত হয়েছে ঈমানের প্রফুল্লতা। পরিণামে তাদের অন্তর হয়েছে আলোকিত। কুরআনের মাঝে নিহিত আরাম-প্রশান্তি, নিরাপত্তা, শান্তি এবং শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের জন্য তাদের অন্তর হয়েছে উন্মোচিত ও উদ্ভাসিত।
কুরআনের মাঝে আরও রয়েছে অন্তরের ওয়াসওয়াসা, দ্বিধা, অস্থিরতা ও পেরেশানি থেকে পরিত্রাণ। রয়েছে অতি দুঃখ এবং প্রচণ্ড কষ্ট থেকে মুক্তির উপায়। কুরআন তার অমিয় বাণীর মাধ্যমে অন্তরকে আল্লাহর নিকট পৌঁছে দেয়। তখন অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। কষ্ট প্রশমিত হয়। হৃদয়ে শান্তি আসে। অন্তর তখন এক অপার্থিব সহায়তা ও নিরাপত্তা অনুভব করে এবং সন্তুষ্ট থাকে। ফলে জীবন সম্পর্কে আল্লাহপ্রদত্ত সন্তষ্টি দ্বারা সে শান্তি লাভ করে। কেননা, অস্থিরতা হলো ব্যাধি, পেরেশানি হলো ক্লান্তি আর ওয়াসওয়াসা হলো রোগ।
এভাবেই কুরআনুল কারিম মুমিনদের জন্য রহমত বলে গণ্য হয়। কুরআন তার জীবন পালটে দেয়। কারণ, মানব-অন্তরের ওপর কুরআনের রয়েছে সীমাহীন প্রভাব। একজন কুরআন তিলাওয়াতকারী ক্রন্দনের আয়াত পড়ে ক্রন্দন করে। আবার সুসংবাদের আয়াত তিলাওয়াত করে আনন্দিত হয়। মনস্তাত্ত্বিক অলৌকিকতার ক্ষেত্রে এটাই হলো কুরআনুল কারিমের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
এ ছাড়া কুরআনুল কারিম চিন্তা ও দর্শনের বিভিন্ন বিরূপ ঝোঁক থেকেও নিরাপদ রাখে। তার মস্তিষ্ককে বিভিন্ন সীমালঙ্ঘন থেকে মুক্ত রাখে। তার অস্থিরতা ও নিরাশাকে ফলদায়ক কর্মের দিকে ধাবিত করে। অনর্থক ও অনুপকারী বিষয়ে শক্তি ব্যয় করা থেকে তাকে রক্ষা করে। তাকে প্রদান করে একটি সুস্থ, সুন্দর ও শক্তিশালী জীবনপদ্ধতি। তার উদ্যমকে করে ফলপ্রসূ এবং নিরাপদ। তাকে রক্ষা করে অন্যায় ও অধঃপতন থেকে।
এমনইভাবে এই কুরআনের মধ্যে রয়েছে সামাজিক সে সকল বিচ্যুতি ও রোগের নিরাময়, যেগুলো সমাজের সদস্যবৃন্দকে ধ্বংস করে, যেগুলো তাদের নিরাপত্তা, প্রশান্তি ও স্বস্তি দূর করে দেয়। কুরআনুল কারিমের এই চিকিৎসার কথা অনুধাবন করেছেন ইবনুল কাইয়িম রহ.। এ কারণে তিনি বলেছেন, অন্তরের রোগসমূহের প্রধান উপাদান হলো দুটি, সন্দেহ ও যৌনস্পৃহা। আর কুরআনুল কারিম এই দুটি বিষয়কেই প্রশমিত করে। (৩০২)
কুরআনুল কারিমের মাঝে এমন অনেক স্পষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ রয়েছে, যেগুলো সত্য-মিথ্যাকে স্পষ্ট করে। সেগুলো জ্ঞান, চিন্তা ও অনুধাবনের দূষিত সন্দেহগুলো বিদূরিত করে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া কুরআনকে রুহের সাথে তুলনা করে এই বক্তব্যকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছেন। কারণ, রুহ না থাকলে জীবন শেষ হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيْمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْنَاهُ نُورًا نَّهْدِي بِهِ مَنْ نَّشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
এভাবেই আমি আমার নির্দেশে আপনার প্রতি ওহিরূপে নাজিল করেছি এক রুহ। ইতিপূর্বে আপনি জানতেন না কিতাব কী এবং (জানতেন) না ঈমান। কিন্তু আমি একে (অর্থাৎ কুরআনকে) বানিয়েছি এক নুর, যার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের মধ্য হতে যাকে চাই হেদায়েত দান করি। নিশ্চয় আপনি মানুষকে দেখাচ্ছেন হেদায়েতের সরল পথ। [সুরা শুরা: ৫২]
এই আয়াতের মধ্যে দুটি মৌলিক বিষয়ের কথা বলা হয়েছে। রুহ ও আলো। অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা অন্তরের প্রাণ ও আলো হিসেবে প্রেরিত তাঁর ওহিকে তুলনা দিয়েছেন আসমান থেকে বর্ষিত সেই পানির সাথে, যা জমিনের প্রাণ এবং সেই আগুনের সাথেও তুলনা করেছেন, যার মাধ্যমে অর্জিত হয় আলো। আর এগুলো তিনি তাঁর বাণীর মাঝে প্রকাশ করেছেন এভাবে,
أَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَسَالَتْ أَوْدِيَةٌ بِقَدَرِهَا فَاحْتَمَلَ السَّيْلُ زَبَدًا رَّابِيَّا وَمِمَّا يُوْقِدُونَ عَلَيْهِ فِي النَّارِ ابْتِغَاءَ حِلْيَةٍ أَوْ مَتَاءٍ زَبَدٌ مِثْلُهُ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللهُ الْحَقَّ وَالْبَاطِلَ فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءٌ وَأَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, ফলে নদীনালা আপন- আপন সামর্থ্য অনুযায়ী প্লাবিত হয়েছে, তারপর পানির ধারা স্ফীত ফেনাসমূহ উপরিভাগে তুলে এনেছে। এ রকমের ফেনা সেই সময়ও ওঠে, যখন লোকে অলংকার বা পাত্র তৈরির উদ্দেশ্যে আগুনে ধাতু উত্তপ্ত করে। আল্লাহ এভাবেই সত্য ও মিথ্যার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করছেন যে, (উভয় প্রকারে) যা ফেনা, তা তো বাইরে পড়ে নিঃশেষ হয়ে যায় আর যা মানুষের উপকারে আসে তা জমিতে থেকে যায়। এ রকমেরই দৃষ্টান্ত আল্লাহ বর্ণনা করে থাকেন। (৩০০) [সুরা রাদ: ১৭]
এ ছাড়া কুরআনুল কারিম তার ঐশী অলৌকিক ইশারার মাধ্যমে কিছু মানুষের মনোবৃত্তি প্রকাশ করেছে। যেমন কুরআনুল কারিম আমাদের নিকট চিত্রিত করেছে রাজা-বাদশাদের মনোবৃত্তি। তারাই সবচেয়ে বেশি দরিদ্র, কারণ তাদেরই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ও চাহিদা, তারাই সবচেয়ে বেশি চিন্তিত থাকে। মানুষের রক্তপ্রবাহের (মানুষ হত্যা) ওপর আসক্ত থাকে। এগুলো তারা কেন করে? করে, নিজেদের সম্পদের আধিক্যের কারণে কিংবা উচ্চাভিলাষের কারণে। আল্লাহ তাআলা ইয়ামেনের রানির ভাষায় বলেন,
قَالَتْ إِنَّ الْمُلُوكَ إِذَا دَخَلُوا قَرْيَةً أَفْسَدُوهَا وَجَعَلُوا أَعِزَّةَ أَهْلِهَا أَذِلَّةً وَكَذَلِكَ يَفْعَلُونَ
রানি বলল, প্রকৃত ব্যাপার হলো, রাজা-বাদশাগণ যখন কোনো জনপদে ঢুকে পড়ে, তখন তাকে বরবাদ করে ফেলে এবং তার মর্যাদাবান বাসিন্দাদের লাঞ্ছিত করে ছাড়ে। এরাও তো তাই করবে। [সুরা নামল: ৩৪]
কুরআনুল কারিম এখানে রাজা-বাদশাদের স্বভাব ও চরিত্রের একটি বাস্তব চিত্র অঙ্কন করেছে।
এরপর ফিরাউন ও তার জাতির সাথে মুসা আলাইহিস সালামের কথোপকথনের মধ্য দিয়েও কুরআনুল কারিম রাজা-বাদশাদের চরিত্রের অতি বাস্তব এক চিত্র তুলে ধরেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
‎﴿قَالَ فِرْعَوْنُ وَمَا رَبُّ الْعَلَمِينَ ) قَالَ رَبُّ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا إِنْ كُنْتُمْ مُوْقِنِينَ قَالَ لِمَنْ حَوْلَهُ أَلَا تَسْتَمِعُونَ قَالَ رَبُّكُمْ وَرَبُّ أَبَا بِكُمُ الْأَوَّلِينَ قَالَ إِنَّ رَسُوْلَكُمُ الَّذِي أُرْسِلَ إِلَيْكُمْ لَمَجْنُونٌ قَالَ رَبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَمَا بَيْنَهُمَا إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ قَالَ لَبِنِ اتَّخَذْتَ إِلَهَا غَيْرِي لَأَجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُونِينَ﴾
২৩. ফিরাউন বলল, রাব্বুল আলামিন আবার কী? ২৪. মুসা বলল, তিনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও এ দুইয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর প্রতিপালক, যদি তোমাদের বাস্তবিকই বিশ্বাসী হও। ২৫. ফিরাউন তার আশপাশের লোকদের বলল, তোমরা শুনছ কি না? ২৬. মুসা বলল, তিনি তোমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও প্রতিপালক। ২৭. ফিরাউন বলল, তোমাদের এই রাসুল, যাকে তোমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে, সে একেবারেই উন্মাদ। ২৮. মুসা বলল, তিনি প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের প্রতিপালক এবং এ দুইয়ের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছুরও, যদি তোমরা বুদ্ধির সদ্ব্যবহার করো। ২৯. সে বলল, (মনে রেখো) তুমি যদি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ বলে গ্রহণ করো, তবে আমি তোমাকে অবশ্যই যারা জেলে পড়ে আছে, তাদের অন্তর্ভুক্ত করব। [সুরা শুআরা: ২৩-২৯]
একইভাবে কুরআনুল কারিম চিত্রিত করেছে খারাপ মানুষদের মনোবৃত্তি। বর্ণনা করেছে তাদের হতাশা, অস্থিরতা, ভয়হীনতা এবং তাদের মতোই খারাপ ব্যক্তিদের দিকে তাদের ধাবিত হওয়ার কথা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿كَالَّذِي اسْتَهْوَتْهُ الشَّيَاطِينُ فِي الْأَرْضِ حَيْرَانَ لَهُ أَصْحَابٌ يَدْعُوْنَهُ إِلَى الْهُدَى ائْتِنَا قُلْ إِنَّ هُدَى اللَّهِ هُوَ الْهُدَى وَأُمِرْنَا لِنُسْلِمَ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ﴾
সেই ব্যক্তির মতো, যাকে শয়তান দুনিয়ার পথ ভুলিয়ে হয়রান করে—তার কিছু সঙ্গী আছে, যারা তাকে হেদায়েতের দিকে ডাক দেয় যে, আমাদের কাছে এসো। বলো, আল্লাহপ্রদত্ত হেদায়েতই সত্যিকারের হেদায়েত। আর আমাদের আদেশ করা হয়েছে, যেন আমরা রাব্বুল আলামিনের সামনে নতিস্বীকার করি। [সুরা আনআম: ৭১]
إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوْهُمْ وَخَافُونِ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
প্রকৃতপক্ষে সে তো শয়তান, যে তার বন্ধুদের সম্পর্কে ভয় দেখায়। সুতরাং তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাকো, তবে তাদের ভয় করো না। বরং কেবল আমাকেই ভয় করো। [সুরা আলে ইমরান : ১৭৫]
অন্যদিকে কুরআনুল কারিম ভালো মানুষদের চারিত্রিক মনোবৃত্তিও চিত্রিত করেছে, যারা নিজেদের স্বভাবগত উৎকৃষ্টতা এবং কল্যাণকর্মের মাধ্যমে সৌভাগ্য অর্জন করেন। ভালো কাজের মাধ্যমে নিজেদের ঈমানকে সুউচ্চ করেন। ভালো কাজের ক্ষেত্রে নিজেদের ভেতর ও বাইরে সুসংগতি রাখেন (তাকওয়া অবলম্বন করেন)। আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ তারা সেই সব লোক, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে। তাদের দুনিয়ার জীবনেও সুসংবাদ আছে এবং আখিরাতেও। [সুরা ইউনুস: ৬৩-৬৪]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
প্রকৃতপক্ষে সমস্ত মুসলিম ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের দু-ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও, আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমাদের প্রতি রহমত করা হয়। [সুরা হুজুরাত : ১০] (৩০৪)
এ ছাড়া, কুরআনুল কারিমের আরেকটি অসাধারণ চমৎকারিত্ব এবং মহত্ত্ব ফুটে উঠেছে মানুষের আচরণকে খারাপ থেকে ভালোর দিকে পরিবর্তন করার সক্ষমতার মাঝে। কারণ, কুরআনুল কারিম মানুষের কঠিন কঠোর ও রুক্ষ অন্তরগুলোকে দয়া ও সহানুভূতিপূর্ণ অন্তরে পরিবর্তন করতে সক্ষম। তখন তাদের চোখগুলো কুরআনের আয়াত শ্রবণে অশ্রুপ্রবাহিত করে। এই বিষয়ে আমাদের নিকট রয়েছে হজরত উমর রা.-এর ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া সেই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
একইভাবে কুরআনুল কারিম ব্যক্তির স্বার্থপরতা থেকে অন্যের স্বার্থ সংরক্ষণের মানসিকতার দিকে ধাবিত করতেও সক্ষম। এই বিষয়টা প্রকাশ পায় আনসার সাহাবিদের পরিবর্তিত গুণাবলির মাধ্যমে। এ সকল মানুষ জাহেলি যুগে ভয়াবহ সব লড়াই করে বেড়াতো গনিমতের সম্পদ এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য। অথচ কুরআনের সংস্পর্শে এসে তাদের কত পরিবর্তন হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِيْنَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَبِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ)
(এবং 'ফাই'-এর সম্পদ) তাদেরও প্রাপ্য, যারা পূর্ব থেকেই এ নগরে (অর্থাৎ মদিনায়) ঈমানের সাথে অবস্থানরত আছে। যে-কেউ হিজরত করে তাদের কাছে আসে, তাদেরকে তারা ভালোবাসে এবং যা-কিছু তাদের (অর্থাৎ মুহাজিরদেরকে) দেওয়া হয়, তার জন্য নিজেদের অন্তরে কোনো চাহিদা বোধ করে না এবং তাদের তারা নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয়, যদিও তাদের অভাব-অনটন থাকে। যারা স্বভাবগত কার্পণ্য হতে মুক্তিলাভ করে, তারাই তো সফলকাম। [সুরা হাশর: ৯]
তাহলে বোঝা যায়, কুরআনুল কারিম আমাদের খারাপ আচরণ ও চরিত্রকে ভালো, সুন্দর ও কল্যাণে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ
বস্তুত এ কুরআন সেই পথ দেখায়, যা সর্বাপেক্ষা সরল ও সঠিক। [সুরা ইসরাইল: ৯]
এরকম অনেকভাবেই অন্তরের রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে কুরআনুল কারিমের কার্যকর প্রভাব প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত। আর এটাই তার অলৌকিকতার ওপর একটি বড় দৃষ্টান্ত। ইসলামে আত্মিক পরিশুদ্ধির চূড়ান্ত মাধ্যম হলো আল্লাহর জিকির। এই জিকির হয়ে থাকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে। যেমন, অন্তর, জিহ্বা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে, বিভিন্ন আচরণ ও কাজকর্মের মাধ্যমে এবং নিজেদের প্রতিটি কাজ ও কথার ক্ষেত্রে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের উপস্থিতি অনুভব করার মাধ্যমে। জিকিরের মধ্যে রয়েছে অন্তরের নিরাময়, নিরাপত্তা ও প্রশান্তি। কারণ, জিকির বান্দা ও তার রবের মাঝে ছিন্ন সম্পর্কের নবায়ন করে। অন্তরকে তার মূল উৎসের সাথে জুড়ে দেয়। সৃষ্টিকে তার স্রষ্টার সাথে মিলিয়ে দেয়। কারণ, আল্লাহ তাআলাই মানুষের অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানেন। ফলে তিনিই তার রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবগত। এ কারণে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ
তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন, আমাকে ডাকো। আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো। নিশ্চয় অহংকারবশে যারা আমার ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। [সুরা মুমিন: ৬০]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ
সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব। [সুরা বাকারা: ১৫২]
এমনটি করতে পারলে, পুনরায় হেদায়েতের নুর অন্তরকে প্লাবিত করবে। বিরান অন্তরকে আবাদ করবে। এভাবেই অনুগত বান্দার অন্তরে আল্লাহ তাআলার কালিমাসমূহ উদ্ভাসিত হয়ে থাকে।
কুরআনুল কারিম অন্তরের আরও যে-সকল ব্যাধির উপশম করে সেগুলো হলো, অন্তরের ওয়াসওয়াসা, অন্তরের দ্বিধাদ্বন্দ্ব। অন্তরের মাঝে আপতিত বিভিন্ন অন্যায় চিন্তাভাবনা। এগুলো অন্তরের সবচেয়ে মারাত্মক ও শক্তিশালী ব্যাধি। এগুলো মানুষের স্বভাবে প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। তাকে মানসিকভাবে কষ্ট দিতে থাকে। কুরআনুল কারিম আশ্চর্যজনক কার্যকরভাবে এই মানসিক ব্যাধির নিরাময় করতে সক্ষম। কিন্তু শর্ত একটাই, কুরআনের আহ্বানে সাড়া দিতে হবে। তার পথ অনুসরণ করতে হবে। এ ধরনের মানসিক অবস্থার ক্ষেত্রে অন্তরের পরিশুদ্ধি এবং সৌভাগ্য অর্জন মূলত আল্লাহর জিকির এবং কুরআন তিলাওয়াতের ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ وَقُرْآنٌ مُّبِينٌ لِيُنْذِرَ مَنْ كَانَ حَيًّا وَيَحِقَّ الْقَوْلُ عَلَى الْكَافِرِينَ
এটা তো এক উপদেশবাণী এবং এমন কুরআন যা (সত্যকে) সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করে। যাতে প্রত্যেক জীবিতজনকে সতর্ক করে দেয় এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে প্রমাণ চূড়ান্ত হয়ে যায়। [সুরা ইয়াসিন: ৬৯-৭০]
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা জানাচ্ছেন, কুরআন দ্বারা উপকৃত হওয়া ও সতর্কতা লাভ করা তারই হবে, যার অন্তর জীবন্ত। আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেন,
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْبٌ أَوْ أَلْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ
নিশ্চয় এর ভেতর এমন ব্যক্তির জন্য উপদেশ রয়েছে, যার আছে অন্তর কিংবা যে মনোযোগ দিয়ে কর্ণপাত করে। [সুরা কাফ : ৩৭]
অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُوْلِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ﴾
হে মুমিনগণ, আল্লাহ ও রাসুলের দাওয়াত কবুল করো, যখন তিনি (রাসুল) তোমাদের এমন বিষয়ের দিকে ডাকেন, যা তোমাদের জীবনদান করে। [সুরা আনফাল: ২৪]
সুতরাং আল্লাহ তাআলা জানাচ্ছেন, কুরআন আমাদের যে ঈমান ও আমলের দিকে আহ্বান করে, তার প্রতি সাড়া প্রদানের মধ্যেই রয়েছে আমাদের জীবন, আমাদের প্রকৃত বেঁচে থাকা। এটা এজন্যই যে, আত্মিক পরিশুদ্ধির পদ্ধতিসমূহের আধুনিক পদ্ধতি রয়েছে মুসলিহ পির-মাশাইখ তথা আত্মিক চিকিৎসকদের নিকট। পদ্ধতিটি হলো, আত্মিক রোগী যে অবস্থায় আছে তা শিথিল করার অনুশীলন করানো। যেমন কেউ হঠাৎ রাগান্বিত হয়ে উঠল। সে হয়তো দাঁড়িয়ে আছে, তাহলে তাকে বলা হবে বসে যেতে এবং নিজেকে শান্ত ও শিথিল করতে, যতক্ষণ না তার রাগ চলে যায়। এ ধরনের শিক্ষাকে 'সুলুকের পথ' বলে অভিহিত করা হয়। এটাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন। তিনি বলেন,
إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسُ فَإِنْ ذَهَبَ عَنْهُ الْغَضَبُ وَإِلَّا فَلْيَضْطَجِعْ
তোমাদের কেউ যখন রাগান্বিত হয়ে পড়ে আর সে দাঁড়ানো অবস্থায় থাকে, তাহলে সে যেন বসে পড়ে। এভাবে যদি তার ক্রোধ প্রশমিত হয়, তবে ভালো, অন্যথায় তখন সে যেন শুয়ে পড়ে। (৩০৫)
এ ছাড়া আরও কিছু আত্মিক ব্যাধি রয়েছে যেমন, ক্রোধ, দুঃখবোধ, ভয়, অস্থিরতা ইত্যাদি। নিজের অজান্তেই মানুষ খুব বেশি এসব সমস্যায় আক্রান্ত হয়। কুরআনুল কারিম তার অনেক আয়াতে প্রাসঙ্গিকভাবে মানুষের এসব রোগ থেকে নিরাময়ের আবশ্যকতা বর্ণনা করেছে। মানুষ তো খুব সহজেই শারীরিক অসুস্থতা থেকে নিজেকে মুক্ত ও নিরাপদ রাখতে পারে। কিন্তু তার জীবনের অধিকাংশ সময় কিংবা সারাটা জীবনই আত্মিক এসব ব্যাধির মধ্যে নিমজ্জিত ও নিপতিত থাকে। কারণ, তার জীবনযাপনের অধিকাংশ সময় কোনো দুঃখ, ক্রোধ এবং কষ্টের অনুভূতি থেকে মুক্ত থাকে না। মানুষের মেজাজ, স্বাস্থ্য ও অনুভূতির তারতম্য অনুযায়ী এই ব্যাধিগুলোর কমবেশও ঘটে। কিন্তু কেউ এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَ لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ ۖ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
প্রকৃতপক্ষে আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার অন্তরে যেসব ভাবনা-কল্পনা দেখা দেয়, সে সম্পর্কে আমি পরিপূর্ণরূপে অবগত এবং আমি তার গলদেশের শিরা অপেক্ষাও বেশি নিকটবর্তী।
[সুরা কাফ: ১৬]
আপনি দেখতে পাবেন, কুরআনুল কারিম মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহিত করেছে এবং খারাপ কাজের ব্যাপারে সতর্ক করেছে। পরিণামে পুরস্কার ও শাস্তির সংবাদ দিয়েছে। এগুলো কেন করা হয়েছে? করা হয়েছে মানুষের মনোবৃত্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করার জন্য। মানুষের ওপর যেসব দুর্যোগ আপতিত হয়, তার মনের ওপর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিষয়ে যে-সকল দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা আনাগোনা করে, সে সকল বিষয়ে সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রদানের জন্য এবং ইসলামি দর্শন বোঝানোর জন্য। যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে ফয়সালা ও তাকদির তথা ভাগ্য বিষয়ের দর্শন। এই বিষয়ে মানুষ খুব বেশি বিভিন্ন ধরনের ভুল ভাবনায় আক্রান্ত থাকে। ইসলামের দর্শন হলো, আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও অনিবার্য ভাগ্য বিশ্বাসের অর্থ কিছুতেই অক্ষমতা ও অধঃপতনের নিকট আত্মসমর্পণ নয়, কর্মে ক্ষান্ত দেওয়া নয়। বরং কুরআনুল কারিম আপনাকে সফলতার সকল উপকরণ গ্রহণ করার আহ্বান জানায়, ফলে অন্তর আবার আরেকটি সুযোগপ্রাপ্তির বিষয়ে আশান্বিত ও আগ্রহী হয় এবং কর্মের প্রতি নতুনভাবে উৎসাহিত হয়ে ওঠে।
এ বিষয়ে আমরা হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনার দিকে লক্ষ করতে পারি। এখানে স্রষ্টা কর্তৃক মানবপ্রবৃত্তির অসাধারণ চিত্রায়ণ বুঝতে পারলে আমরা কুরআনুল কারিমের মনস্তাত্ত্বিক অলৌকিকতার বিষয় অনুধাবন করতে সক্ষম হব। সুরাটির সূচনা হয়েছে এমন কিছু অপরাধপ্রবণ অন্তরের উপস্থাপনা দিয়ে, যেগুলোর অভ্যাস হলো অপরাধকে আড়াল করার জন্য কাল্পনিক বিভিন্ন বিষয় সজ্জিত করা। আল্লাহ তাআলা হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের ভাষায় বলেন,
قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنْفُسُكُمْ أَمْرًا فَصَبْرٌ جَمِيلٌ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ
ইয়াকুব বলল, (এটা সত্য নয়) বরং তোমাদের মন নিজের পক্ষ থেকে একটা গল্প বানিয়ে নিয়েছে। সুতরাং আমার জন্য ধৈর্যই শ্রেয়। আর তোমরা যেসব কথা তৈরি করছ সে ব্যাপারে আল্লাহরই সাহায্য প্রার্থনা করি। [সুরা ইউসুফ: ১৮]
ইউসুফ আলাইহিস সালামের এই ঘটনার বিষয়ে চিন্তাভাবনাকারী ব্যক্তি তার ভাইদের অন্তরে স্বার্থপরতা এবং হিংসার সূক্ষ্ম উপস্থিতি দেখতে পাবে এবং দেখতে পাবে পিতার স্নেহ-ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতি। হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম কর্তৃক রবের রহম থেকে নিরাশ না হওয়া। আরও পরিদৃষ্ট হবে মিশরে সেই সময়ে অনৈতিক কাজের সমর্থনে বিচারকের দায়িত্বে অবতীর্ণ হওয়া কিছু নারীর মনোবৃত্তির বিশ্লেষণ এবং হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সংযম।
এভাবে কুরআনুল কারিম অনেক ঘটনার মধ্যে 'নফসে আম্মারা' বা কুপ্রবৃত্তিকে প্রতিহত করার বিবরণ তুলে ধরেছে। সম্ভবত মানব-ইতিহাসের প্রথম যে ঘটনার মধ্যে 'নফসে আম্মারা'-র কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেটা হলো আমাদের আদি পিতা হজরত আদম আলাইহিস সালামের দুই সন্তানের ঘটনা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَطَوَّعَتْ لَهُ نَفْسُهُ قَتْلَ أَخِيهِ فَقَتَلَهُ فَأَصْبَحَ مِنَ الْخَاسِرِينَ﴾ পরিশেষে তার মন তাকে ভ্রাতৃ-হত্যায় প্ররোচিত করল, সুতরাং সে তার ভাইকে হত্যা করে ফেলল এবং সে অকৃতকার্যদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। [সুরা মায়িদা: ৩০]
একটু গভীর দৃষ্টি প্রদান করলে, কুরআনুল কারিমের মাঝে আরও অনেক স্পষ্ট মনস্তাত্ত্বিক অলৌকিক প্রভাব দেখতে পাবেন। যেমন, বাদশা নাজাশি(৩০৬) এবং তার পুরোহিতদের প্রভাবিত হওয়া। হাবশায় প্রথম হিজরতের পর বাদশার দরবারে হজরত জাফর ইবনু আবি তালিব রা. যখন বাদশার সামনে সুরা মারয়ামের প্রথম কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করেন, তখন এই বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটে। আয়াতগুলো শুনে বাদশা ক্রন্দন করতে থাকেন, এমনকি চোখের পানিতে তার দাড়ি সিক্ত হয়ে যায়। তিলাওয়াত শুনে কাঁদতে থাকে তার পুরোহিতগণও। তাদের সামনে থাকা কিতাব তাদের চোখের পানিতে ভিজে যায়। এরপর বাদশা নাজাশি সত্তরজন খ্রিষ্টান পণ্ডিতকে মদিনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে প্রেরণ করে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সামনে সুরা ‘ইয়াসিন' তিলাওয়াত করে শোনান। তখন তারা কেঁদে ফেলে এবং ইসলামগ্রহণ করে। আর এই ঘটনার দিকে ইশারা করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَى الرَّسُوْلِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ
এবং রাসুলের প্রতি যে কালাম নাজিল হয়েছে তারা যখন তা শোনে, তখন দেখবে তাদের চোখসমূহকে তা থেকে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে, যেহেতু তারা সত্য চিনে ফেলেছে। তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা ঈমান এনেছি। সুতরাং সাক্ষ্যদাতাদের সাথে আমাদের নামও লিখে নিন। [সুরা মায়িদা : ৮৩]
একইভাবে, কুরআনুল কারিমে মনস্তাত্ত্বিক এই প্রভাবের কথা ফুটে উঠেছে ব্রিটিশ নওমুসলিম মেরি ওয়াইল্ডজ (Mery Wyldz)-এর লেখায়। এ নারী তার 'রহলাতী মিনাল কানীসা এলাল মাসজিদ, লেমাজা' (relhati minal kaneesa ilal masjid, lemada?) (গির্জা ছেড়ে আমার মসজিদে গমন কেন?) গ্রন্থে বদিউজ্জামান সাইদ নুরসির ‘রাসায়িলুন নুর'-এর প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। যে-সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে মানুষ বিচলিত হয়ে পড়ে লেখক সাইদ নুরসি এই পুস্তিকাগুলোতে কুরআন ও হাদিসের আলোকে সেগুলোর উত্তর প্রদান করেছেন। এ সম্পর্কে লেখিকা বলেন,
আমি এতদিন আমার অন্তরের মধ্যে যে অন্ধকার গহ্বর অনুভব করতাম, এখন সেগুলো থেকে মুক্তি পেয়েছি। আমার ভেতর থেকে একটার পর একটা অন্ধকারের পর্দা অপসারিত হয়েছে। এগুলো সম্ভব হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কিছু মুসলিম বন্ধুর সহায়তায়, আমার প্রতি তাদের সীমাহীন ধৈর্য প্রদর্শন এবং আমাকে তাদের সহযোগিতার কারণে...। এই পৃথিবী এবং বিশ্বজগতের বাস্তবতা অনুধাবনের জন্য আমি একটি নতুন ভাষা শিখেছি, আর সেটা হলো কুরআনের ভাষা। (৩০৭)
এমনকি অনারবদের অন্তরেও কুরআনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যেমন এক যুগোস্লাভিয়ান (৩০৮) খ্রিষ্টান নারীর কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে সাইয়েদ কুতুব উল্লেখ করেছেন, এর কারণ হলো কুরআনের বর্ণনারীতি ও বিন্যাস মানুষের সকল বর্ণনারীতি ও বিন্যাস থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এজন্য এটা অন্তরের ওপর আশ্চর্যজনক প্রভাব ফেলে। এমনকি কখনো কখনো নিছক তিলাওয়াতের মাধ্যমে, যারা একবর্ণও আরবি জানে না, তাদের ওপরও কুরআনুল কারিম সীমাহীন প্রভাব ফেলে থাকে।
এই যুগোস্লাভিয়ান নারী একটি বক্তৃতা শোনেন যাতে কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। এরপর তিনি কুরআনের আয়াতসমূহের চমৎকারিত্ব এবং মানুষের অন্য যেকোনো কথা ও বক্তব্য থেকে এটার ভিন্নতা সম্পর্কে তার অনুভূতি ব্যক্ত করেন। এই কয়েকটি আয়াত শোনার সময় তিনি তার নিজের মধ্যে একধরনের কম্পন ও শিহরণ অনুভব করেন। যে নারী একবর্ণও আরবি জানে না, তার জন্য এটা কি মনস্তাত্ত্বিক অলৌকিকতা নয়? এমন আরও অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। (৩০৯)
অতএব, এ সকল আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হয়, কুরআনুল কারিম সুস্পষ্টভাবে ও বাস্তবতার সাথে মানুষের প্রকৃতি ও পরিচয় তুলে ধরেছে। কুরআন মানুষের নেতিবাচক দিকগুলো যেমন প্রকাশ করেছে, উল্লেখ করেছে তার ইতিবাচক দিকগুলোও। এবং স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মানুষের অভ্যন্তরে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই একসঙ্গে মিলেমিশে অবস্থান করে। কখনো একটি অন্যটির ওপর প্রভাব বিস্তার করে এবং তার শক্তিমত্তা দ্বারা বিজয়ী হয়। অন্য দিকটি তখন মানুষের অভ্যন্তরে পরাজিত হয়ে পড়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّنَهَا فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَّنَهَا﴾ ৭. এবং শপথ মানবাত্মার ও তাঁর, যিনি তাকে পরিপাটি করেছেন। ৮. অতঃপর তার জন্য যা পাপ এবং তার জন্য যা পরহেজগারি, তার ভেতর সেই বিষয়ে জ্ঞানোন্মেষ ঘটিয়েছেন। [সুরা শামস: ৭-৮] তিনি আরও স্পষ্ট করেছেন, অবাধ্যতা মানুষকে আল্লাহ তাআলার অস্বীকারের দিকে নিয়ে যায় এবং আল্লাহ তাআলার থেকে তাকে বিচ্যুত ও বিদূরিত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى أَنْ رَّاهُ اسْتَغْنَى﴾ ৬. বস্তুত মানুষ প্রকাশ্য অবাধ্যতা করছে। ৭. কেননা সে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে। [সুরা আলাক : ৬-৭](৩১০)
সন্দেহ নেই, কুরআনুল কারিম অনেক দার্শনিকের চারিত্রিক দর্শনের ঊর্ধ্বে। কারণ, তারা চরিত্র বা নৈতিকতাকে একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির (বা মতবাদের) মাঝে সীমাবদ্ধ করে নিয়েছে কিংবা পার্থিব উপকার অথবা মানুষের স্বভাবজাত আচরণের মধ্যে সীমিত করে ফেলেছে। কিন্তু কুরআনুল কারিম মানব-মনোবৃত্তির সকল দিক, তার সকল চাওয়া পাওয়া এবং উন্নতি-অগ্রগতির সার্বিক বিষয়ে দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছে। এ কারণে কুরআন কখনো একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গির কাছে থমকে থাকেনি। সুতরাং কুরআনুল কারিমের আদর্শগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ হলো, মানবপ্রবৃত্তিকে চারিত্রিক ও মানসিকভাবে অনেক ঊর্ধ্বে তুলে ধরা এবং আদর্শ পৃথিবী বিনির্মাণে যতটুকু সক্ষমতা তার আয়ত্তে রয়েছে, তার সকল উপযোগিতায় তাকে উন্নীত করা। আর আমরা খুব ভালোভাবেই জানি, মানুষ কোনো সভ্যতাকে ততক্ষণ পর্যন্ত শক্তিশালী ও স্থায়ীভাবে লাভ করতে পারে না, যতক্ষণ না তার নিয়মনীতি মানবিক ও যথার্থ হয়।
মানবচরিত্রের পরিবর্তনগুলোয় কুরআনুল কারিমের আরেকটি বিস্ময় হলো, বড় কোনো ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ ছাড়াই কুরআনুল কারিম খুব সহজেই মানবপ্রবৃত্তিকে সত্য ও কল্যাণের দিকে ধাবিত করতে সক্ষম, যদিও সে ব্যক্তি ইসলামের সবচেয়ে অগ্রগামী শত্রু হয়। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যা হজরত উমর রা. এবং যুবায়ের ইবনে মুতইম রা.-এর ইসলামগ্রহণের ঘটনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। (৩১১)
সুতরাং কুরআন শুধু এসব ব্যক্তির ওপর নিজের অলৌকিক প্রভাব বিস্তারই করেনি, বরং তাদেরকে খারাপ থেকে ভালোর দিকে ফিরিয়ে এনেছে। ফলে তাদের চোখসমূহ আলোকিত হয়েছে। অন্তর হয়েছে প্রসারিত। এ কারণে তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়ত ও মুজিজার ওপর ঈমান এনেছে তার থেকে কিছু আয়াত শ্রবণের মাধ্যমেই।
তবে এটা ঠিক যে, কুরআন তাদের ওপর কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি, যারা অবাধ্যতা ও মিথ্যাবাদিতার মধ্যে জিদ ধরে বসে ছিল।
বাস্তবতা হলো, ঈমানগ্রহণে অগ্রগামীদের অন্তরেই শুধু কুরআনুল কারিম তার অলৌকিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেনি; বরং যারা তাদের বাপদাদার ধর্মকে আঁকড়ে ধরে উদ্ধত হয়ে নিজেদের মূর্খতা ও শিরকের মাঝে লিপ্ত ছিল। কুরআন তাদের অন্তরেও প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেছে। এ কারণে আমরা দেখি, নবুয়তের প্রাথমিক যুগে কুরাইশদের বড় বড় মূর্তিপূজক নেতা নিজেদের অনিচ্ছাতেই এই কুরআন শোনার জন্য গোপনে একত্র হতো! (৩১২)

টিকাঃ
২৯৮. খাত্তাবি: সালাসু রাসায়িলা ফি ইজাজিল কুরআন: ৬৪।
২৯৯. জারকাশি : আল-বুরহান ফি উলুমিল কুরআন: ২/১০৭।
৩০০. কাজি ইয়াজ। মালিকি মাজহাবের একজন বড় শাইখ (৪৪৬-৫৪৪ হি.)। তিনি বহু বিদ্যায় পণ্ডিত ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ যেমন, আশ-শিফা, শারহু মুসলিম, মাসারিকুল আনওয়ার ইত্যাদি। মদিনায় ইন্তেকাল করেন। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন, ইবনে কাছির: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ১২/২২৫।
৩০১. কাজি ইয়াজ : আশ-শিফা বি-তারিফি হুকুকিল মুসতাফা: ১/২৭৪।
৩০২. ইরনাল কাইয়িমিয়া, মিফতাহু দারিস সাআদাহ: ১/২৫০।
৩০৩. ইবনে তাইমিয়া: মাজমুউল ফাতাওয়া: ১৯/৯৪।
৩০৪. বিলকাসিম মুহাম্মদ গলি : মালামিহুল ইজাজিন নফসি ফিল-কুরআনিল কারিম : ১৭
৩০৫. সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮২, মুসনাদে আহমাদ: ২১৩৮৬, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৮৮।
৩০৬. নাজাশি কোনো বিশেষ ব্যক্তির নাম নয়; বরং তৎকালীন আবিসিনিয়া সাম্রাজ্যের প্রত্যেক অধিপতিকেই সম্মানসূচক সম্বোধন হিসেবে নাজাশি বলা হতো। তদ্রূপ রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতিকে কায়সার, পারস্য সাম্রাজ্যের অধিপতিকে কিসরা, মিশর ও আলেকজান্দ্রিয়ার শাসককে মুকাওকিস এবং তুর্কি সাম্রাজ্যের অধিপতিকে খাকান বলা হতো। আলোচ্য নাজাশি বা হাবশা-রাজের নাম ছিল আসহামা বিন আবজার। তিনি সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, যার জন্য নবীজি গায়েবি জানাযা আদায় করেছিলেন। তিনি মক্কা বিজয়ের পূর্বেই ইন্তেকাল করেন।-সম্পাদক
৩০৭. মেরি ওয়াইল্ডজ (Mery Wyldz) : রিহলাতি মিনাল কানিসা ইলাল মাসজিদ লিমাজা, ভূমিকা : মুহাম্মাদ ইজ্জত তাহতাবি: ১৫।
৩০৮. যুগোশ্লাভিয়া : পূর্বে কয়েকটি জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল এই ইউরোপীয় রাষ্ট্রে। তারা হলো সার্বিয়ান, ক্রোয়েশিয়ান, বসনিয়ান (বসনিয়া ও কুমান গোত্রগুলো তাদের মাতৃভূমি ত্যাগ করে ভলগা নদীর অববাহিকায় অভিবাসী হয় এবং বলকানের স্থায়ী নাগরিক হয়ে যায়), ম্যাকডোনিয়ান, আলবেনিয়ান, স্লোভেনিয়ান ও মন্টেনিগ্রিন।-সম্পাদক
৩০৯. আল-ফুরকান (পত্রিকা) সংখ্যা: ৬ জুলাই ২০০০। পৃষ্ঠা: ৫৯, ৬০।
৩১০. আকরাম উমরি: আর-রিসালাতু ওয়ার-রাসুল: ৫১-৫৪।
৩১১. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৩৪৭-৩৪৮, আর-রওজুল উনুফ: ৩/৩২৬-৩২৭।
৩১২. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৩৩৬, ইবনুল জাওযি: সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/১৯৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00