📄 আইনপ্রণয়নে অলৌকিকতা
কুরআনুল কারিম নিজের মধ্যে আরও একপ্রকার অলৌকিকতা ধারণ করে। আরবি না জানলেও সকল সচেতন ব্যক্তিই কুরআনের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা স্বীকার করে। কারণ, এটি কুরআনুল কারিমের ভেতরগত বিধান ও আলোচ্য বিষয় হওয়ায় সকলের জন্য তা উপলব্ধি করা সম্ভব হয়। আর সেটা হলো, কুরআনের সমাজ সংস্কার ও আইন প্রণয়নের বিধানাবলির অলৌকিকতা। এর মাঝেই রয়েছে মানুষের জন্য মহান ও উন্নত শিক্ষা। এর মাঝেই রয়েছে মানুষের সবচেয়ে সঠিক পথ প্রদর্শনের নির্ভুল ব্যবস্থাপনা। ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি, পারিবারিক দায়িত্বপালন, সমাজ পরিচালনা, রাষ্ট্র গঠন, মজবুত ভিত্তির ওপর আন্তঃদেশীয় সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি সকল বিধান বিবৃত হয়েছে এই কুরআনের মাঝে。(২৪৮)
আমরা জানি, ইসলামি সংবিধানের প্রধান ও প্রথম উৎস হলো কুরআনুল কারিম। কুরআনুল কারিমের ভাষা, বক্তব্য ও কথা সবই অকাট্য ও অখণ্ডনীয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে এটি আমাদের নিকট অকাট্য, অবিকৃত ও অক্ষুণ্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী, প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুসলমানরা লিখে এবং হিফজ তথা মুখস্থ করে পরবর্তীদের নিকট এটা পৌঁছে দিয়েছেন। এই সাড়ে চৌদ্দশত বছরের মধ্যে কোথাও সেই লিখিত বিষয় এবং মুখস্থ রূপের মধ্যে সামান্য পরিবর্তনও সাধিত হয়নি।
কুরআনুল কারিম ইসলামের জন্য একটি সর্বজনীন অলৌকিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে এসেছে আর সেটা হলো, মানুষের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান। কুরআনের এই বিধান আত্মা ও শরীর উভয়ের অধিকার রক্ষা করে। দুনিয়া ও আখিরাতের সমূহ কল্যাণের পথ দেখায়। যেমন আল্লাহ তাআলা কুরআনে বর্ণনা করেন,
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا
(হে মুসলিমগণ!) এভাবেই আমি তোমাদের এক মধ্যমপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা অন্যান্য লোক সম্পর্কে সাক্ষী হও এবং রাসুল হন তোমাদের পক্ষে সাক্ষী। [সুরা বাকারা: ১৪৩]
এ কারণে কুরআনুল কারিমের মূল উদ্দেশ্য হলো, বিশুদ্ধ ঈমানের মাধ্যমে আল্লাহর মারিফাত, সৎকর্ম, উন্নত চারিত্রিক গুণাবলি অর্জন ও ভালো কার্যাবলি দ্বারা দুনিয়া ও আখিরাতের সমূহ কল্যাণের দিকে ধাবিত হওয়া এবং আত্মশুদ্ধি অবলম্বন করা। কুরআনের এই বিধান নিছক কোনো আশ্বাস ও ভরসা প্রদানের কথা বলে না এবং কোনো সুপারিশ বা অস্বাভাবিক কাজকর্মের দিকেও আহ্বান করে না। বরং কুরআন মুমিনদের ঈমান ও আমলের মাঝে সমন্বয় করার আহ্বান করে, ঈমানের পাশাপাশি তার বিধানও মেনে চলার কথা বলে।
কুরআনুল কারিমের এই বিধান খুব সহজ ও স্পষ্ট, এর মধ্যে নেই কোনো কাঠিন্য বা কঠোরতা, বাধ্য করা কিংবা কষ্টে ফেলা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
আল্লাহ কারও ওপর তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব অর্পণ করেন না। [সুরা বাকারা: ২৮৬]
এ ছাড়া আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِّنْ حَرَجٍ
আল্লাহ তোমাদের ওপর কোনো কষ্ট চাপাতে চান না। [সুরা মায়িদা: ৬]
কুরআনুল কারিমের বক্তব্যের এই মূলনীতির ভিত্তিতে বলা হয়, যদি আবশ্যক কাজটি আদায় করা কোনো ব্যক্তির জন্য কষ্টসাধ্য হয়, তাহলে সেই কাজের পরিবর্তে সে অন্য কাজ করবে কিংবা সেটা তার জন্য রহিত হয়ে যাবে। যেমন অসুস্থ ব্যক্তি দু ধরনের: ১. যার সুস্থতার আশা আছে ২. যার সুস্থতার আশা নেই। প্রথম ব্যক্তি মুসাফিরের মতো রোজা ভঙ্গ করে অন্য সময় তা আদায় করবে। আর দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য রোজা রাখা আবশ্যক হবে না। বরং সে মিসকিনকে খাবার খাওয়ানোর মাধ্যমে তার প্রতিদিনের রোজার ফিদয়া আদায় করে দেবে, যদি আর্থিকভাবে সক্ষম হয়।
ইসলাম সব সময় তার অনুসারীকে ধর্মের মধ্যে বাড়াবাড়ি কিংবা নিজেকে অনর্থক কষ্টের মধ্যে ফেলতে বারণ করে। বরং কোনো ধরনের অপচয় ও অহংকার ব্যতীত ভালো খাওয়াদাওয়া করা, ভালো জিনিস ব্যবহার করা, সাজসজ্জা করাকে বৈধতা প্রদান করে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُبَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُوْنَ ) قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلُ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
হে আদমের সন্তানসন্ততিগণ! যখনই তোমরা কোনো মসজিদে আসবে, তখন নিজেদের শোভার বস্তু (অর্থাৎ শরীরের পোশাক) নিয়ে আসবে এবং খাও ও পান করো, কিন্তু অপব্যয় করো না। আল্লাহ অপব্যয়কারীদের পছন্দ করেন না। বলো, আল্লাহ নিজ বান্দাদের জন্য যে শোভার উপকরণ সৃষ্টি করেছেন, কে তা হারাম করেছে? এবং (এমনইভাবে) উৎকৃষ্ট জীবিকার বস্তুসমূহ?
বলো, এগুলো পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্য (এবং) কিয়ামতের দিনে বিশেষভাবে (তাদেরই)। যারা জ্ঞানকে কাজে লাগায়, তাদের জন্য এভাবেই আমি আয়াতসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করি। বলে দাও, আমার প্রতিপালক তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজসমূহ, প্রকাশ্য হোক বা গোপন এবং সর্বপ্রকার গুনাহ, অন্যায়ভাবে (কারও প্রতি) সীমালঙ্ঘন, আল্লাহ যে সম্পর্কে কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি, এমন জিনিসকে আল্লাহর শরিক সাব্যস্তকরণ এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কথা বলাকে, যে সম্পর্কে তোমাদের বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই। [সুরা আরাফ: ৩১-৩৩]
আল্লাহ তাআলা বাড়াবাড়ি না-করা সম্পর্কে আরও বলেন, ﴿قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ﴾ (এবং তাদেরকে এটাও) বলে দাও যে, হে কিতাবিগণ! নিজেদের দ্বীন নিয়ে অন্যায় বাড়াবাড়ি করো না। [সুরা মায়িদা: ৭৭]
সুতরাং কুরআনে নিষেধ করা হচ্ছে ইবাদতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা থেকে, ভালো জিনিস বর্জন করা থেকে এবং বৈরাগ্য গ্রহণ করা থেকে।
এভাবেই কুরআনুল কারিম তার বিধানের ক্ষেত্রে মানুষের জ্ঞানবুদ্ধির তারতম্যের প্রতি লক্ষ রেখেছে। তাদের মনোবলের উচ্চতা ও নিচুতা সম্পর্কে খেয়াল রেখেছে। কুরআনুল কারিমের স্বাভাবিক বিচারে সকলেই সাধারণ—মধ্যম মানের। আর ব্যতিক্রমভাবে কিছু মানুষ রয়েছে ভিন্ন—উচ্চমানের। তবে তাদের মাঝেও মেধা-জ্ঞান-বুদ্ধির তারতম্য রয়েছে। এ কারণে প্রতিটি ব্যক্তি সেভাবেই কোনো বিষয়কে গ্রহণ করে, তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা তাকে যতটুকু অনুধাবন করায়। সুরা বাকারার মধ্যে মদ ও জুয়া হারাম হওয়া নিয়ে যখন অস্পষ্টভাবে প্রথম আয়াত নাজিল হলো, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের তাদের নিজস্ব জ্ঞানবুদ্ধির ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। অবশেষে সুরা মায়িদার মধ্যে অকাট্যভাবে এগুলো হারাম করা হয়। জ্ঞানবুদ্ধির ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে রয়েছে এমনই তারতম্য। এ কারণে আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ وَمَا يَعْقِلُهَا إِلَّا الْعَلِمُونَ﴾
আমি মানুষের কল্যাণার্থে এসব দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকি, কিন্তু তা বোঝে কেবল তারাই, যারা জ্ঞানবান। [সুরা আনকাবুত : ৪৩]
সুতরাং দ্বীনের সকল সাধারণ আবশ্যক কর্ম এবং দ্বীনের সকল নিষিদ্ধ বিষয় অকাট্য দলিল দিয়েই সাব্যস্ত ও প্রমাণিত, যাতে সকলেই খুব সহজে সেগুলো বুঝতে পারে।
এ ছাড়া কুরআনুল কারিম মানুষের সাথে আচারব্যবহারের মূলনীতি স্থির করেছে মানুষের বাহ্যিক অবস্থার ভিত্তিতে। অন্যদিকে মানুষের অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলি অর্পণ করা হয়েছে আল্লাহ তাআলার নিকট। এ কারণে কোনো শাসক, কোনো সাংবিধানিক নেতা বা খলিফার জন্য অধিকার নেই মানুষের অন্তরের এবং গোপন কোনো বিষয়ের হিসাব নেওয়ার কিংবা শান্তি প্রদান করার। বরং শাস্তি প্রদান করা হবে সে সকল প্রকাশ্য ও বাস্তব অপরাধের বিষয়ে, যেগুলো বাহ্যিকভাবে মানবাধিকার ও তাদের স্বার্থের সাথে জড়িত।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত বিধানাবলির বাহ্যিক অনুসরণ ও অনুকরণই হলো ইসলামি শরিয়তে ইবাদতের ভিত্তি। এ কারণে, ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্য কারও ব্যক্তিগত বক্তব্য, মন্তব্য বা কর্তৃত্বের কোনো সুযোগই নেই। তবে এর অভ্যন্তরীণ অবস্থা আল্লাহ তাআলার প্রতি মানুষের ইখলাস ও বিশুদ্ধ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। এটা কাউকে দেখানো সম্ভব নয়।
উল্লিখিত প্রতিটি বিষয়ই ওহির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হতে পারে এবং এগুলো দ্বারাই প্রমাণিত হয় যে, এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। এভাবেই কুরআন তার সকল বিধানের ক্ষেত্রে অলৌকিকতার পরিচয় বহন করে। সেইসাথে বান্দার সমূহ কল্যাণও প্রতিষ্ঠা করে। (২৪৯)
কুরআনুল কারিমের বিধানগত অলৌকিকতা শুধু ব্যক্তির নিজের অবস্থা ও পালনীয় বিষয়াবলিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কুরআনুল কারিম জনসাধারণের রাজনৈতিক চিন্তাধারার কথাও বিবৃত করেছে। সুতরাং ইসলামি বিধান হলো, নেতা বা শাসকগণ রাষ্ট্রীয় কোনো কাজ সম্পাদন করার ক্ষেত্রে অন্যদের পরামর্শ গ্রহণ করবেন। একটি ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান নেতা বা খলিফা হলেন পৃথিবীতে আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় দায়িত্বপ্রাপ্ত। আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে বলেছেন,
وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ
তাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শক্রমে সম্পন্ন হয়। [সুরা শুরা: ৩৮] এ কারণে ইসলামের নির্দেশনা হলো, যেখানে মুসলমানদের উপস্থিতি রয়েছে, সেখানে ইমাম বা শাসক জনগণের কল্যাণ সাধনে এমন মুসলমানদের পরামর্শ নেবেন, যাদের পরামর্শ দেওয়ার উপযুক্ততা রয়েছে। ইমাম বা শাসক তাদের পরামর্শ নেবেন, যাদের প্রতি সাধারণ জনগণ আস্থা রাখেন, যাদের কথা ও বক্তব্যকে তারা মান্য করে। আর এই পরামর্শ গ্রহণে প্রথম দৃষ্টান্ত বা আদর্শ হলেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। রাজনৈতিক কোনো বিষয়ে এবং জনপ্রশাসনের কোনো বিষয়ে যোগ্য ও জ্ঞানবান ব্যক্তিদের পরামর্শ ব্যতীত তিনি কোনো কাজ সম্পাদন করেননি। নবীজির এমন করার কারণ হলো, যাতে তিনি পরবর্তীদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হতে পারেন।
এরপর কুরআনুল কারিম আর্থিক বিষয়েও সঠিক পথ অবলম্বনের নির্দেশনা প্রদান করেছে। এ কারণে কুরআনুল কারিম ধনসম্পদের যে বাস্তবতা বর্ণনা করেছে। মানুষের এটা খুব ভালো করে বুঝে রাখা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَتُبْلَونَ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ
অবশ্যই তোমাদেরকে তোমাদের ধনসম্পদের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হবে। [সুরা আলে ইমরান: ১৮৬]
সুতরাং সম্পদ মানবজাতির জন্য একটি ফেতনা বা পরীক্ষার বিষয়। এটা যেমন মানুষের সৌভাগ্য ও সফলতার মাধ্যম, আবার এটাই মানুষের লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার কারণ। সুতরাং যে ব্যক্তি সম্পদকে ভালো কাজে ব্যবহার করবে, দুনিয়া ও আখিরাতে সে সৌভাগ্য ও সফলতা অর্জন করবে। আর যে ব্যক্তি তা আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতায় খরচ করবে, সে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ভোগ করবে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَنْفِقُوا فِي سَبِيْلِ اللَّهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
আর আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করো এবং নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসের মাঝে নিক্ষেপ করো না। এবং সৎকর্ম অবলম্বন করো। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। [সুরা বাকারা : ১৯৫]
অতএব, যারা মানুষদের আল্লাহর রাস্তা থেকে বাধা প্রদানের জন্য নিজেদের সম্পদ খরচ করে, আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ فَسَيُنْفِقُوْنَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ﴾
যারা কুফর অবলম্বন করেছে, তারা আল্লাহর পথে (মানুষকে) বাধা দেওয়ার জন্য নিজেদের অর্থসম্পদ ব্যয় করে। এর পরিণام হবে এই যে, তারা অর্থসম্পদ ব্যয় করতে থাকবে, অতঃপর সেসব তাদের মনস্তাপের কারণ হয়ে যাবে এবং শেষপর্যন্ত তারা পরাভূত হবে। আর যারা কুফরি করে, তাদের (আখিরাতে) জাহান্নামে একত্র করা হবে। [সুরা আনফাল : ৩৬] (২৫০)
এরপর ধনসম্পদের প্রতি মানুষের লোভ নির্মূলে কুরআনুল কারিম নিছক কিছু নির্দেশ ও দর্শন বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং এর জন্য বাস্তব কিছু কার্যকর দায়িত্ব ও কর্মপদ্ধতিও বর্ণনা করে দিয়েছে। অর্থাৎ সম্পদে জাকাতের বিধান দিয়েছে এবং সেগুলো খরচ করার বিভিন্ন ক্ষেত্রও বর্ণনা করেছে। সুদ হারাম করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبوا أَضْعَافًا مُّضَاعَفَةٌ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ)
হে মুমিনগণ! তোমরা কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে সুদ খেয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলতা লাভ করতে পারো। [সুরা আলে ইমরান: ১৩০]
একইসাথে কুরআনুল কারিম ঘুষ দিতে নিষেধ করেছে। নিষেধ করেছে অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করতে এবং মানুষকে ওজনে কম দিতে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ ( وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ
বহু দুর্ভোগ আছে তাদের, যারা মাপে কম দেয়। তারা মানুষের নিকট থেকে যখন মেপে নেয়, পূর্ণমাত্রায় নেয়, আর যখন অন্যকে মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কমিয়ে দেয়।
[সুরা মুতাফফিফিন: ১-৩]
এভাবে আমরা দেখতে পাই, ইসলামি বিধান প্রতিটি যুগে এবং প্রতিটি স্থানেই উপযুক্ত। ইসলামি ইতিহাসের ধারাবাহিক সূত্রে এই মূলনীতি অথবা এই দর্শনটি অকাট্যভাবে সত্য প্রমাণিত হয়ে এসেছে। কত প্রজন্ম গত হয়ে গেল। কত শ্রেণির মানুষ এই ধর্মে দীক্ষিত হলো। যাদের নানারকম ভাষা, সংস্কৃতি এবং বংশ ও দেশ। অথচ ইসলামি শরিয়ত, যার প্রথম উৎস হলো কুরআনুল কারিম, তাদের সকলের জীবনের ছোট-বড় বিচিত্র সকল বিষয়ে সঠিক, সুন্দর ও উপযুক্ত সমাধানে সর্বদা সক্ষমতা প্রদর্শন করে এসেছে।
আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করি, ইসলামের এই সংবিধান (কুরআনুল কারিম) মানুষের সকল অধিকার ও কর্তব্যগুলোকে সন্নিবেশিত করতে অসাধারণ সক্ষমতা ও যোগ্যতা দেখিয়েছে। অথচ এটি তো নাজিল হয়েছে উম্মি নবী মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর। অধিকাংশ বিধান নাজিল হয়েছে অতি অল্প সময়ের মধ্যে, মদিনায় অবস্থানের মাত্র দশ বছরের মধ্যে। আর সেটাও হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে!
অর্থাৎ মানুষের পার্থিব জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়, সাধারণ জীবনযাপনের সকল নিয়মকানুন ও রীতিনীতি এবং শরিয়তের বিধানাবলিকে কুরআনুল কারিম পরিপূর্ণ ও উত্তমরূপে উপস্থাপন করেছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ
আমি এই কিতাবে কিছুমাত্র ত্রুটি রাখিনি। [সুরা আনআম : ৩৮]
বিদায় হজের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াত পাঠ করেন। আল্লাহর বাণী,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে ইসলামকে (চিরদিনের জন্য) পছন্দ করে নিলাম। [সুরা মায়িদা: ৩]
সুতরাং ইসলামি বিধান একটি পরিপূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধান। এটি তার অভ্যন্তরে এমন এক অলৌকিতা ধারণ করে, যেটা প্রমাণ করে তার মহত্ত্ব, উচ্চতা এবং নব-রচিত নিয়মকানুন থেকে তার ভিন্নতা ও অনন্যতা। কারণ, নব-রচিত নিয়মাবলি সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়। বরং জগতে মানুষের এমন বিধানও আছে, যা বছরে বছরে পরিবর্তিত হয়, মাসে মাসে হয়। আবার নিয়মগুলো এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভিন্নরকম হয়ে যায়।
যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজদারি আইনের প্রতি যদি লক্ষ করেন, আপনি দেখতে পাবেন, সেখানে এক রাজ্যের বিধান অন্য রাজ্যের বিধান থেকে ভিন্নতর। হয়তো একটি রাজ্যের বিধানে কোনো অপরাধের প্রেক্ষিতে অপরাধীকে কোনো শাস্তিই প্রদান করা হয় না। অথচ সেই একই অপরাধে অন্য রাজ্যে অপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু কুরআনের বিধান খুবই স্পষ্ট ও পরিষ্কার, তাতে কোনো অস্পষ্টতার মিশ্রণ নেই। এটি অতীতের সকল সময়ে, সকল স্থানে সমানভাবে প্রযোজ্য ছিল এবং একইভাবে ভবিষ্যতেও আগের মতোই অবিকৃতভাবে প্রযোজ্য হবে। এটা অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ, সকল সময় ও স্থানের জন্য সমানভাবে কার্যকরী এবং প্রযোজ্য। এর মাঝে কোনো বিচ্যুতি, ত্রুটি বা কমতি নেই।
কুরআনে বর্ণিত বিধানের আরেকটি অলৌকিকতা হচ্ছে, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে এই বিধানের প্রয়োগকে দৃষ্টান্ত ও আদর্শ মান্য করা হয়। যেমন নবুয়তের যুগ। এ যুগে সামান্য কিছু দণ্ডবিধান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর দ্বারা এ কথাই জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়, যে সমাজেই ইসলামি বিধান প্রয়োগ করা হোক না কেন, সেটা সমাজের অস্তিত্ব, নিরাপত্তা এবং তার স্থিতি বজায় রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। খলিফা হজরত আবু বকর রা.-এর যুগে হজরত উমর রা. ছিলেন বিচারক। তখন ইসলামি বিধানকে সমাজে পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল। এ সময় একবার হজরত উমর রা. বিচারকের পদ থেকে অব্যাহতি প্রদানের ইচ্ছা পোষণ করেন। কারণ, তিনি দীর্ঘ একটি বছর বিচারকের দায়িত্ব নিয়ে বসে আছেন, অথচ এখন পর্যন্ত তার নিকট কোনো বাদী-বিবাদী বিচার নিয়ে আগমন করেননি। এর দ্বারা ইসলামি সমাজের মহত্ত্বের পরিচয় প্রকাশ পায়। প্রমাণিত হয় যে, ইসলামি সমাজ তার সাধারণ ব্যক্তিদের মাঝে শান্তি ও সমতা স্থাপন করতে পেরেছিল। (২৫১)
তেমনই খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের সময়ে ইসলামি সভ্যতা তার সর্বোচ্চ শক্তিমত্তা ও মর্যাদায় উপনীত হয়েছিল। এটা এ কারণেই সম্ভব হয়েছিল যে, তিনি ইসলামি শরিয়তকে ন্যায়-ইনসাফের সাথে, প্রজ্ঞার সাথে বাস্তবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এভাবে আমরা আরও বিভিন্ন যুগের দিকে লক্ষ করে দেখি, যে-সকল রাষ্ট্র তাদের সময়ে আল্লাহর শরিয়তের প্রয়োগ ঘটিয়েছে এবং কুরআনুল কারিমের বিধানকে প্রতিষ্ঠা করেছে, সে সকল রাষ্ট্রই তার সময়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সামাজিক এবং সভ্যতা-সংস্কৃতির দিক দিয়ে সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদার আসনে আরোহণ করেছে। যেমন সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি, তার পূর্বে সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ জিনকি এবং আন্দালুসে উমাইয়া শাসন...। এমনই আরও বহু রাজ্য। এর সকল কিছুই কুরআনুল কারিমের মহত্ত্ব ও তার সীমাহীন প্রভাবের প্রমাণ বহন করে।
কুরআনের বিধান সকল যুগ ও অঞ্চলের জন্য উপযুক্ত উদাহরণ এত বেশি যে, সেগুলো গুনে শেষ করা যাবে না। উদাহরণ হিসেবে এখানে আমরা একটি উল্লেখ করছি। যেমন কুরআনুল কারিমে বর্ণিত উত্তরাধিকারের বিধান। আজ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রাচীন সকল জাতিই অন্তত দশবার তার উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন করেছে। কিন্তু উত্তরাধিকার বিষয়ে কুরআনুল কারিমের আয়াতসমূহ নাজিল হওয়ার সময় থেকে এখন পর্যন্ত একইরকম উপযুক্ত, কার্যকরী এবং অপরিবর্তিত রয়েছে। আমরা সুরা নিসার মধ্যে দেখতে পাই, এই সুরাকে আল্লাহ তাআলা 'সুরা নিসা' হিসেবে নামকরণ করেছেন নারীদের সম্মান এবং সমাজে তাদের অবস্থানের প্রতি লক্ষ রেখে। এই সুরায় যে উত্তরাধিকারের সূত্র বর্ণনা করা হয়েছে, ঠিক সেই বিধানকেই আজ প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর ধরে কোটি কোটি মুসলমানের উত্তরাধিকার আইন হিসেবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, সামান্যতম পরিবর্তন ছাড়াই। আল্লাহ তাআলা বলেন,
۞ يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ فَإِنْ كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ وَإِنْ كَانَتْ وَاحِدَةٌ فَلَهَا النِّصْفُ وَلِأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِنْ كَانَ لَهُ وَلَدٌ فَإِنْ لَّمْ يَكُن لَّهُ وَلَدٌ وَوَرِثَهُ أَبَوَاهُ فَلِأُمِّهِ الثُّلُثُ فَإِنْ كَانَ لَهُ إِخْوَةٌ فَلِأُمِّهِ السُّدُسُ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِى بِهَا أَوْ دَيْنٍ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ لَا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعًا فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا وَلَكُمْ نِصْفُ مَا تَرَكَ أَزْوَاجُكُمْ إِنْ لَّمْ يَكُن لَّهُنَّ وَلَدٌ فَإِنْ كَانَ لَهُنَّ وَلَدٌ فَلَكُمُ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْنَ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُؤْصِينَ بِهَا أَوْ دَيْنٍ وَلَهُنَّ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْتُمْ إِنْ لَّمْ يَكُن لَّكُمْ وَلَدٌ فَإِنْ كَانَ لَكُمْ وَلَدٌ فَلَهُنَّ الثُّمُنُ مِمَّا تَرَكْتُمْ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ تُؤْصُونَ بِهَا أَوْ دَيْنٍ وَإِنْ كَانَ رَجُلٌ يُورَثُ كَلَلَةً أَوِ امْرَأَةٌ وَلَهُ أَخٌ أَوْ أُخْتٌ فَلِكُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا السُّدُسُ فَإِنْ كَانُوا أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ فَهُمْ شُرَكَاءُ فِي الثُّلُثِ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصَى بِهَا أَوْ دَيْنٍ غَيْرَ مُضَارٍ وَصِيَّةً مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَلِيمٌ
১১. আল্লাহ তোমাদের সন্তানসন্ততি সম্পর্কে তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, পুরুষের অংশ দুই নারীর সমান। যদি (কেবল) দুই বা ততোধিক নারীই থাকে, তবে মৃত ব্যক্তি যা কিছু রেখে গেছে, তারা তার দুই-তৃতীয়াংশ পাবে। যদি কেবল একজন নারী থাকে, তবে সে (পরিত্যক্ত সম্পত্তির) অর্ধেক পাবে। মৃত ব্যক্তির পিতামাতার মধ্য হতে প্রত্যেকের প্রাপ্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ, যদি মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকে। আর যদি তার কোনো সন্তান না থাকে এবং তার পিতামাতাই তার ওয়ারিশ হয়, তবে তার মায়ের প্রাপ্য এক-তৃতীয়াংশ। অবশ্য তার যদি কয়েক ভাই থাকে, তবে তার মায়ের জন্য এক-ষষ্ঠাংশ, (আর এ বণ্টন করা হবে) মৃত ব্যক্তি যে ওসিয়ত করে গেছে তা কার্যকর করার কিংবা (তার যদি কোনো) দেনা (থাকে, তা) পরিশোধ করার পর। তোমরা আসলে জানো না, তোমাদের পিতা ও পুত্রের মধ্যে কে উপকার সাধনের দিক থেকে তোমাদের নিকটতর। (এসব) আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত অংশ। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
১২. তোমাদের স্ত্রীগণ যা কিছু রেখে যায়, তার অর্ধাংশ তোমাদের, যদি তাদের কোনো সন্তান (জীবিত) না থাকে। যদি তাদের কোনো সন্তান থাকে, তবে তারা (যে) ওসিয়ত (করে যায় তা) কার্যকর করার এবং তারা যে দেনা রেখে যায় তা পরিশোধ করার পর, তোমরা তার রেখে যাওয়া সম্পদের এক-চতুর্থাংশ পাবে। আর তোমরা যা-কিছু ছেড়ে যাও, তার এক-চতুর্থাংশ তারা (স্ত্রীগণ) পাবে, যদি তোমাদের (জীবিত) কোনো সন্তান থাকে, তবে তোমরা যে ওসিয়ত করে যাও তা কার্যকর করার এবং (তোমাদের) দেনা পরিশোধ করার পর তারা তোমাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-অষ্টমাংশ পাবে। যার মিরাছ বণ্টন করা হচ্ছে, সেই পুরুষ বা নারী যদি এমন হয় যে, না তার পিতামাতা জীবিত আছে, না সন্তানসন্ততি আর তার এক ভাই বা এক বোন জীবিত থাকে, তবে তাদের প্রত্যেকের প্রাপ্য এক-ষষ্ঠাংশ। তারা যদি আরও বেশি সংখ্যক থাকে, তবে তারা সকলে এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে অংশীদার হবে, (কিন্তু তা) যে ওসিয়ত করা হয়েছে তা করার পর, যদি (ওসিয়ত বা দেনার স্বীকারোক্তির দ্বারা) কারও ক্ষতি না করে থাকে। (এসব) আল্লাহর হুকুম। আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞাত, সহনশীল। [সুরা নিসা: ১১-১২]
কুরআনে বর্ণিত উত্তরাধিকারের এই বিধান আমাদের নিকট আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে, যখন এটাকে আমরা বিশ্বের কিছু প্রাচীন রীতি এবং পাশ্চাত্যের আধুনিক রীতির সাথে তুলনা করি। রোমানদের উত্তরাধিকার আইন অনেকাংশে ইসলামের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কারণ, সেখানেও উত্তরাধিকারের মৌলিক ভিত্তি ছিল রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়তা। তারা আত্মীয়তার মধ্যে অধস্তন ব্যক্তিদের তথা মৃত ব্যক্তির সন্তানাদি ও সন্তানদের সন্তানাদিদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছিল কিন্তু তারা বৈবাহিক আত্মীয়তার দিকে দৃষ্টি দেয়নি। আর তাদের নিকট কন্যার উত্তরাধিকার ছিল নিছক বাহ্যিকতা। কারণ, কন্যার সকল অংশই পরিশেষে তার ভাইদের অধিকারে চলে যেত। এ ছাড়া তারা অধস্তনদের জন্য কোনো আড়াল বা প্রতিবন্ধকতা রাখত না। এবং অধস্তনরা বিদ্যমান থাকতে ঊর্ধ্বতনদের অর্থাৎ পিতা, দাদা এবং আরও ঊর্ধ্বের ব্যক্তিদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে কোনো উত্তরাধিকার রাখত না। কিন্তু ইসলাম অধস্তনরা থাকা সত্ত্বেও ঊর্ধ্বতনদের উত্তরাধিকার প্রদান করে এবং বৈবাহিক সম্পর্ককে উত্তরাধিকারের একটি মৌলিক কারণ হিসেবে সাব্যস্ত করে।
এদিকে ইহুদিদের উত্তরাধিকার আইনানুসারে তারা শুধু পরিবারের বড় ছেলের উত্তরাধিকার স্বীকার করে। আর বড় ছেলে না থাকলে পরিত্যক্ত সম্পত্তি চলে যায় অধস্তন নারীর নিকট, নতুবা পিতার নিকট নতুবা দাদার নিকট অথবা ভাইদের নিকট। তারা স্বামী-স্ত্রীর একে অন্যের থেকে উত্তরাধিকার স্বীকার করে না, যাতে পরিবার থেকে সম্পদ বাইরে চলে যেতে না পারে। তবে তারা এটা সাব্যস্ত করে যে, স্বামী তার স্ত্রী থেকে উত্তরাধিকার পেতে পারবে। অর্থাৎ শুধু স্বামীই স্ত্রীর উত্তরাধিকারী হতে পারবে, কিন্তু স্ত্রী কখনো স্বামীর পরিত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকার পাবে না।
আর আমরা পাশ্চাত্যের উত্তরাধিকার আইনের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখতে পাব, পশ্চিমাদের মধ্যে ফ্রান্সের উত্তরাধিকার আইন ইসলামের সবচেয়ে কাছাকাছি। বিশেষ করে উত্তরাধিকারের যোগ্য হওয়ার মাধ্যম বা উপকরণের দিক থেকে। কিন্তু ইসলামের সাথে এর পার্থক্য হলো, ইসলামি আইনে অধস্তন নারী-পুরুষের উপস্থিতি সত্ত্বেও স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের থেকে সম্পত্তি পায়, যদিও উপস্থিতির সময় অনুপস্থিতির চেয়ে পরিমাণে কম পায়। কিন্তু ফরাসি উত্তরাধিকার আইন স্ত্রীর পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে স্বামীর জন্য কোনো উত্তরাধিকার সাব্যস্ত করে না। বরং স্বামী স্ত্রীর পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে সুবিধা গ্রহণ করতে পারে, সামাজিকভাবে স্ত্রীর সম্পত্তি সংরক্ষণ ও দেখাশোনার পারিশ্রমিক হিসেবে। আর ব্রিটিশ উত্তরাধিকার আইন স্বামী-স্ত্রীর একে অন্যের থেকে উত্তরাধিকার সাব্যস্ত করে না। অধস্তনদের উপস্থিতিতে ঊর্ধ্বতনদের উত্তরাধিকার স্বীকার করে না। বরং তারা বড় ছেলেকে উত্তরাধিকারী বানায় এবং তাকে সকলের ওপরে প্রাধান্য দেয়।
আর জামান উত্তরাধিকারনীতি ইসলামি নীতি এবং ফরাসি উত্তরাধিকারনীতির কাছাকাছি। তবে তারা ছেলে ও মেয়ের মাঝে সমান অংশ সাব্যস্ত করে। সেইসাথে তারা অন্য নিকটাত্মীয়দেরও উত্তরাধিকার প্রদান করে। যেমন ফুফু, মামা ও খালা। (২৫২)
অন্যদিকে গোটা ইসলামি বিশ্ব প্রায় দীর্ঘ সাড়ে চৌদ্দশ বছর কুরআনের এই উন্নত বিধানটি নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করে আসছে এবং তাদের পারিবারিক উত্তরাধিকারের সমস্যা সমাধান করে আসছে। এটাতে তারা কখনো সমস্যা অনুভব করেনি। অথচ ঠিক এই সময়ের মধ্যে মানবরচিত অন্য নীতিগুলো বারবার নবায়ন, সংশোধন, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতে হয়েছে। অবশেষে সেগুলোও এখন প্রায় ইসলামি বিধানের কাছাকাছি এসে গেছে।
অমুসলিমদের মধ্য থেকেও অনেক সুবিবেচক লেখক কুরআনুল কারিমের এই ব্যতিক্রমী চমৎকার বিধানের অনন্যতার সাক্ষ্য দিয়েছেন। যেমন আলফ্রেড ভন ক্রেমার (Alfred von Kremer) (২৫৩)। তিনি বলেন, ইসলামি বিধানাবলির মধ্যে ইসলামের উত্তরাধিকার-বিধানটি খুবই মৌলিক এবং অনন্যবৈশিষ্ট্যপূর্ণ এক বিধান।
অন্য আরও দুজন ব্যক্তি ইসলামের এই উত্তরাধিকার-বিধানের চমৎকারিত্ব ও অনন্যতা সম্পর্কে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। তারা হলেন, গানার (جانا) এবং ব্যারি (بري)। তারা তাদের গ্রন্থে )الاقتصاد الهندي : ভারতীয় অর্থনীতি) উল্লেখ করেছেন, মুসলমানদের মাঝে পারস্পরিক আদান-প্রদান ছাড়াও একজন মুসলমান যতদিন জীবিত থাকে, ততদিন সে তার সকল অর্জিত এবং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর পরিপূর্ণ কর্তৃত্বশীল থাকে। এবং মৃত্যুর পর তার সম্পদগুলো বিভিন্ন শ্রেণির উত্তরাধিকারীদের নিকট হস্তান্তরিত হয়। কিন্তু ভারতীয় আইনে সম্পদ এত প্রকারের উত্তরাধিকারীরা পায় না। (১৫৪)
ধারণা করি, পাঠকের বিস্ময় আরও বেড়ে যাবে, যখন তিনি জানবেন যে, এমন চমৎকার উত্তরাধিকার-বিধানের পেছনে ইসলাম ও কুরআনুল কারিমের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য রয়েছে। ১. সম্পদের বিভাজন বা বিস্তৃত বণ্টন। আমাদের জানা আছে, আল্লাহ তাআলা ইসলামে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের বৈধতা দিয়েছেন। মানুষের জন্য দুহাতে যত ইচ্ছা সম্পদ অর্জনের দরজা খুলে দিয়েছেন। এতে কোনো অসুবিধা কিংবা বাধা নেই, তবে শর্ত হলো, এই অর্জনটা হতে হবে আল্লাহ তাআলার নির্দেশিত বৈধ পন্থায়। মানুষের এভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের কারণে অনেক সময় অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে প্রচুর সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। আর এই সীমাহীন পুঞ্জীভূত সম্পদের অহমিকা কখনো কখনো তাদেরকে অল্পসংখ্যক দরিদ্রের প্রতি স্বেচ্ছাচারিতার দিকে ঠেলে দেয়। তারা তখন ন্যায় ও ইনসাফের মাপকাঠিতে শূন্যের কোঠায় চলে যায়। এ কারণে আল্লাহ তাআলা বলেন,
(مَّا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنكُمْ ۚ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ)
আল্লাহ তাঁর রাসুলকে জনপদবাসীদের থেকে ‘ফাই’ হিসেবে যে সম্পদ দিয়েছেন, তা আল্লাহর, তাঁর রাসুলের, (রাসুলের) আত্মীয়বর্গের, ইয়াতিমদের, অভাবগ্রস্তদের ও মুসাফিরদের প্রাপ্য, যাতে সে সম্পদ তোমাদের মধ্যকার কেবল বিত্তবানদের মধ্যেই আবর্তন না করে। রাসুল তোমাদের যা দেয়, তা গ্রহণ করো আর তোমাদের যা থেকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।
[সুরা হাশর: ৭]
এভাবেই ইসলাম চেয়েছে, ব্যক্তির পুঞ্জীভূত সম্পদ অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। ফলে কুরআনুল কারিম সকলের মাঝে এই সম্পদ ছড়িয়ে দেওয়ার অনেকগুলো পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে এই উত্তরাধিকারের নীতি। এর মাধ্যমে কয়েকটি বিষয় সম্পাদিত হয়। সম্ভবত তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তি তিনভাগে, চারভাগে এবং আটভাগে বণ্টিত হওয়ার বিধান প্রদান করা। পরিত্যক্ত সম্পত্তির শুধু একজনই উত্তরাধিকারী হয়, এমন খুবই কম সংঘটিত হয়। কুরআনুল কারিমে এই বণ্টিত অংশগুলো তার প্রাপককে অনিবার্যভাবে আদায় করে দেওয়ার প্রতি কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا
পুরুষদের জন্যও সেই সম্পদে অংশ রয়েছে, যা পিতামাতা ও নিকটতম আত্মীয়বর্গ রেখে যায় আর নারীদের জন্যও সেই সম্পদে অংশ রয়েছে, যা পিতামাতা ও নিকটতম আত্মীয়বর্গ রেখে যায়, চাই সে (পরিত্যক্ত) সম্পদ কম হোক বা বেশি। এ অংশ (আল্লাহর তরফ থেকে) নির্ধারিত। [সুরা নিসা : ৭]
বৈবাহিক বা দাম্পত্যসম্পর্কের মাধ্যমে সম্পদের অনেক অংশ একটি পরিবার থেকে অন্য পরিবারে স্থানান্তরিত হয়। আর ইসলাম তার সকল অনুসারীর মাঝে সমতা বিধান করেছে। হয়তো কখনো কোনো ধনী ব্যক্তি কোনো দরিদ্র নারীকে বিবাহ করেন আবার কখনো এর উলটোটাও হয়। আর এভাবেই সম্পদ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয় এবং সমতা স্থাপনের পথ তৈরি হয়।
আরেকটি আশ্চর্যকর বিষয় হলো, ইসলামের এই উত্তরাধিকারের মাঝে অনেক সামাজিক প্রভাব ও ভালো ফলাফল দেখতে পাওয়া যায়। এই অলৌকিক বিধানের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই, এটি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মাঝে নৈকট্য স্থাপন করতে সক্ষম। এটি তার কার্যকারিতার মাধ্যমে সম্পদকে বিভিন্ন ব্যক্তির মাঝে বণ্টনের ব্যবস্থা করেছে। এ কারণে এখন আর সম্পদ শুধু কিছুসংখ্যক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণেই আবর্তিত হয় না।
যিনি আজকে অনেক ধনী, এক কি দুই প্রজন্মের পরই তার সম্পদ তার সন্তানসন্ততি, নাতি-নাতনি এবং নিকটাত্মীয়দের নিকট স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। আর প্রজন্মের ধারাবাহিকতায় যে ব্যক্তিটি আজ নিঃস্ব ও দরিদ্র, হয়তো তার সন্তানদের দ্বিতীয় প্রজন্মে কিংবা তার সময়েই সে তার বংশধরকে মধ্যবিত্তে রূপান্তরিত হতে দেখবে। এটা হতে পারে, নিজের কোনো নিকটাত্মীয়ের ইনতেকালের মাধ্যমে কিংবা এমন কোনো নারীকে বিবাহের মাধ্যমে, যার অনেক সম্পদ রয়েছে। এভাবে কেউ কেউ তার নিজের জীবনেও বহু সম্পদের অধিকারী হয়ে ওঠা অসম্ভব কিছু নয়। (২৫৫)
তা ছাড়া কুরআনের উত্তরাধিকার আইনের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা পারিবারিক বন্ধনকে শক্তিশালী হয়ে উঠতে দেখি। পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুত্র, পিতা এবং স্ত্রী উত্তরাধিকারী হয়। মেয়ে তার আপন বোন কিংবা বৈমাত্রেয়ী বোনের সাথে উত্তরাধিকারী হয়। আর যে-সকল ব্যক্তি উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদ প্রাপ্ত হয় না, কুরআনুল কারিম তাদের পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে ওসিয়তের মাধ্যমে সম্পদ প্রদানের প্রতি আহ্বান করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِنْ تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ لِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ
তোমাদের ওপর ফরজ করা হয়েছে যে, তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অর্থসম্পদ রেখে যায়, তবে যখন তার মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হবে, তখন নিজ পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনের পক্ষে ন্যায়সংগতভাবে ওসিয়ত করবে। এটা মুত্তাকিদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। [সুরা বাকারা: ১৮০]
এমনকি যাদের জন্য উত্তরাধিকারে কোনো অংশ নেই এবং যে-সকল নিকটাত্মীয়ের জন্য ওসিয়ত করা হয়নি, কুরআনুল কারিম তাদের ক্ষেত্রে আহ্বান করেছে যে, তাদের যেন সহমর্মিতার ভিত্তিতে মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে সামান্য হলেও প্রদান করা হয় এবং তাদের সাথে যেন ভালো আচরণ করা হয়। এভাবেই তারা সম্পদের উত্তরাধিকারে শরিক হতে সক্ষম হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا حَضَرَ الْقِسْمَةَ أُولُو الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسْكِينُ فَارْزُقُوهُمْ مِنْهُ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَعْرُوفًا
আর যখন (মিরাস) বণ্টনের সময় (ওয়ারিশ নয় এমন) আত্মীয়, ইয়াতিম ও মিসকিন উপস্থিত হয়, তখন তাদেরও তা থেকে কিছু দিয়ে দাও এবং তাদের সাথে সদালাপ করো। [সুরা নিসা: ৮]
এবার ওসিয়তের কথা বলি, এটা কার্যকর করা হয় ব্যক্তির মৃত্যুর পর। আর্থিকভাবে সামাজিক দায়দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ওসিয়তের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। তবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এটার জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেটা হলো, ওসিয়ত কখনো সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি হতে পারবে না। যাতে এটা উত্তরাধিকারীদের অংশে ক্ষতিসাধন না করে। শরিয়ত আরও শর্ত করেছে, এই ওসিয়তের মাধ্যমে উত্তরাধিকারীদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্য থাকতে পারবে না এবং সেটা ভালো কাজের জন্য হতে হবে। অর্থাৎ কোনো সওয়াবের কাজে হতে হবে। ওসিয়তের বিধানের যৌক্তিকতা হলো, মানুষ কখনো কখনো তার প্রতি অনুগ্রহকারীর প্রতি সহমর্মিতা দেখাতে আগ্রহী হয়। তা ছাড়া উত্তরাধিকারীদের বাইরেও নিজের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে কারও জন্য নিজের পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে কিছু প্রদান করতে আগ্রহী হয়। যাতে সে তাকে একটি সম্মানজনক জীবনযাপনে সহযোগিতা করতে পারে। কিংবা কখনো সে নিজের জীবদ্দশায় যেমন সাহায্য করত, সেভাবেই সমাজের কাউকে নিজের পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে সেই সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে আগ্রহী হয়। আর এ কাজগুলো শুধু ওসিয়তের মাধ্যমেই সম্পাদন করা সম্ভব। (২৫৬)
ড. রিফআত আওয়াদি বলেন, মিরাসের হুকুমের মাধ্যমে ইসলাম শুধু সম্পদগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাই করেনি, বরং এর সাথে ওসিয়তের ব্যবস্থা রেখে বিষয়টাকে পূর্ণতা দান করেছে। ইসলাম ওসিয়ত সম্পাদনের পদ্ধতি বর্ণনা করেছে, যাতে এর মাধ্যমে মুসলিম সমাজের অন্য অনেক প্রয়োজনীয় খরচের ব্যবস্থা করা যায়। এই পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে মুসলিম সমাজের চাহিদাগুলো পূরণ করতে ইসলাম মুসলমানদের দায়িত্ব দিয়েছে। হতে পারে সেই চাহিদা কোনো ব্যক্তির, অথবা সামাজিক কোনো সংগঠন কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। এভাবে ওসিয়তের মাধ্যমে ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থসমাগমের একটি নতুন উৎস তৈরি হয়। এখন সম্পদের মালিক যদি সামাজিক কল্যাণের দিকে মনোনিবেশ করে কিংবা ইচ্ছা করে, তাহলে সে এমন সব ব্যক্তি কিংবা বিষয়ের খেদমত করতে সক্ষম হবে, যারা জ্ঞাত ও নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারীদের বাইরে রয়ে গেছে। (২৫৭)
আর যে বিষয়টি কুরআনের বিধানাবলির অনন্যসাধারণ মহত্ত্ব ও উচ্চ মর্যাদার দিকে ইশারা করে, সেটা হলো, এগুলো অমুসলিমদের নিকটও তার সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে। এমনকি উন্নত ইউরোপের বহু দেশের বিধান, নিয়ম ও সংবিধানের মধ্যেও তার অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। যেমন ব্রিটিশ সংবাদপত্র ডেইলি মেইল(২৫৮) জানিয়েছে, ব্রিটেনের অন্তত ৮৫টি আদালত ইসলামি বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। পত্রিকাটি আরও জানাচ্ছে যে, বর্তমানে এই সংখ্যা অতীতের চেয়ে ১৭ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্রিটিশ লেখক, গবেষক ডেনিস ম্যাক ইয়ন (Denis MacEoio)-এর গবেষণামতে ব্রিটেনে কমপক্ষে ৮৫টি শরিয়া আদালত তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং শরিয়া আইনের বিস্তার দিন দিন বেড়েই চলছে।
ক্যানটারবেরির আর্চবিশপ ড. রোয়ান উইলিয়ামস (Rowan Williams) বলেন, ব্রিটেনে ইসলামি বিধান প্রয়োগের বিষয়্টা এমনই একটি বিষয়, ভবিষ্যতে যা প্রয়োগ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। এ ছাড়া জুলাই ২০০৮ সালে ব্রিটেনের প্রধান বিচারপতি লর্ড ফিলিপস (Lord Phillips) ঘোষণা করেন, দাম্পত্যকলহ এবং সম্পদবিষয়ক সমস্যা নিরসনের জন্য অবশ্যই এখানে ইসলামি বিধান প্রয়োগ করা যেতে পারে। (২৫৯)
এ ছাড়া সে সকল ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অর্থনীতি বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত, কুরআনুল কারিমে বর্ণিত বিধান সে সকল চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা মোকাবিলায় নিজের শক্তি ও সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। অনেক ইউরোপীয় রাষ্ট্র এবং সংস্থা ইসলামের অর্থনৈতিক বিধানের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। যেমন ইসলামি অর্থব্যবস্থার জন্য মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সেন্টারের একটি গবেষণায় ইসলামি ব্যাংকগুলোর অনেক প্রশংসা করা হয়েছে। কারণ, গতানুগতিক ব্যাংকগুলোর তুলনায় ইসলামি ব্যাংকগুলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধস ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। গবেষণাটি আরও জানিয়েছে যে, অধিকাংশ পর্যবেক্ষকদের বিশ্বাস, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকট থেকে দ্রুত মুক্তি লাভের ক্ষেত্রে 'ইসলামি অর্থব্যবস্থা' একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। গবেষণাটি দৃঢ়তার সাথে এটাও জানাচ্ছে যে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্য ব্যাংকগুলোর তুলনায় ইসলামি ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমান সংকটকালে এবং ভবিষ্যতের জন্যও বিনিয়োগকারী এবং কোম্পানিগুলোর মাঝে নিজেদের একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে।
খ্রিষ্টানদের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ভ্যাটিকান সিটি ইসলামের অর্থনৈতিক বিধানের প্রশংসা করেছে। কারণ, এর মূলনীতির মধ্যে রয়েছে উন্নত নৈতিক গুণাবলি। (২৬০)
আমাদের এতক্ষণের এই দীর্ঘ বর্ণনা শুধু এটা প্রমাণ করার জন্যই যে, ইসলামি বিধান হলো একটি ঐশী ও চিরন্তন বিধান। এটি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সকল সময়ের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য ও উপযুক্ত। নিঃসন্দেহে মানুষের জন্য এটি একটি বিস্ময়কর ঐশী অলৌকিকতা।
টিকাঃ
২৪৮. ইউসুফ কারজাবি : মাদখালুন লি দিরাসাতিশ শারিআতিল ইসলামিয়া : ৩৬।
২৪৯. মুহাম্মাদ রশিদ রেজা : আল-ওয়াহয়ুল মুহাম্মাদি: ২৮৩-২৮৭।
২৫০. মুহাম্মাদ রশিদ রেজা : আল-ওয়াহয়ুল মুহাম্মাদি : ২৯৯-৩০৫।
২৫১. ইমাম তাবারি: তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক: ২/৩৫১।
২৫২. ফিলিস্তিনভিত্তিক আরবি অনলাইন নিউজ পোর্টাল (دنيا الوطن) দুনয়াল ওয়াতান-এ ড. আবদুল ওয়াহহাব মুহাম্মাদ আল-জুবুরির কলাম: ا قراءة موجزة في فلسفة الميراث قبل الإسلام و بعده ওয়েবসাইট লিংক: https://pulpit.alwatanvoice.com/content-179367.html
২৫৩. আলফ্রেড ভন ক্রেমার Alfred von Kremer (১২৪৩-১৩০৬ হি./১৮২৮-১৮৮৯ খ্রি.): তিনি ছিলেন একজন অস্ট্রিয়ান প্রাচ্যবিদ এবং রাজনীতিবিদ। মিশর এবং বৈরুতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি প্রায় বিশটির মতো আরবি কিতাব লিখেছেন। ইসলাম, ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি সম্পর্কে জার্মান ভাষায়ও অনেক বই লিখেছেন। বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তিনি দীর্ঘদিন দামেস্কে অবস্থান করেছেন।-অনুবাদক।
২৫৪. মির্জা মুহাম্মাদ হুসাইন রচিত, আবদুর রহমান আইয়ুব কর্তৃক আরবি ভাষায় অনূদিত আল-ইসলাম ওয়াল-ইশতিরাকিয়্যা : ২২২। (ড. মুহাম্মাদ শরিফ-এর আল-মিরাছ ওয়াল-ওয়াসিয়্যা ওয়া দিরাসাতু কুরআনিয়া গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।)
২৫৫. কুয়েত ধর্ম মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত الإعجاز العلمي في القرآن والسنة তথা 'কুরআন ও হাদিসের বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা' শীর্ষক অষ্টম আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে আহমাদ ইউসুফ সুলাইমান কর্তৃক পঠিত প্রবন্ধ الإعجاز التشريعي لنظام الميراث في القرآن الكريم وأثره الاقتصادي والاجتماعي : পৃষ্ঠা : ১২৫-১২৬।
২৫৬. আহমাদ ইউসুফ সুলাইমান: প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১২৭, ১২৮।
২৫৭. রিফআত আওয়াদি: নাযরিয়্যাতুত তাওযি: ৩৩০।
২৫৮. ডেইলি মেইল, ২৯ জুন, ২০০৯
২৫৯. বিস্তারিত এই লিংকে: https://www.dailymail.co.uk/news/article-1196165
২৬০. সূত্র: আরব আমিরাতভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক দ্য ন্যাশনাল।
📄 বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা
কুরআনুল কারিমের আরেকটি ইজাজ বা অলৌকিকতা হলো তার বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা। কুরআনুল কারিমের এই দিকটা নিয়ে প্রাচীন কালের আলেমগণ তেমন একটা আলোচনা করেননি। বরং তাদের সকল গুরুত্ব ও আলোচনা আবর্তিত হয়েছে কুরআনুল কারিমের বাগ্মিতা, ভাষা, তার বিস্ময়কর বিন্যাস ও ইতিহাস নিয়ে। তারা কুরআনুল কারিমের বৈজ্ঞানিক বিস্ময় বিষয়ে পর্যালোচনা করেননি। এখানে কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিস্ময় দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কুরআনুল কারিম এমন কিছু বৈজ্ঞানিক প্রায়োগিক সূত্র ও নিয়ম বর্ণনা করেছে, যেগুলোর আবিষ্কার ও উন্মোচনে বহু জ্ঞানী ও বিজ্ঞানী বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হয়েছেন।
তবে আমাদের মনে রাখা উচিত, কুরআনুল কারিম কখনোই নিছক কোনো বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ নয়, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বিতরণ তার মৌলিক কোনো উদ্দেশ্যও নয়। বরং মানুষের হেদায়েতের নির্দেশনা প্রদানের প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিকভাবে কিছু বৈজ্ঞানিক আলোচনা বা সূত্র বর্ণিত হয়েছে। আমরা সেগুলোর কয়েকটি এখানে উল্লেখ করব, ইনশাআল্লাহ।
১. পরাগায়ন (২৬১)
কুরআনুল কারিম উদ্ভিদের মাঝে মিশ্র পরাগায়নের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। যে পরাগায়নটি হয়ে থাকে পরাগের স্থানান্তরের মাধ্যমে। আর এর একটি প্রধান মাধ্যম হলো বাতাস। আল্লাহ তাআলা তাঁর বাণীর মাধ্যমে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন এভাবে,
﴿وَأَرْسَلْنَا الرِّيَاحَ لَوَاقِحَ ﴾
এবং আমি পাঠিয়েছি সেই বায়ু, যা মেঘমালাকে করে পানিপূর্ণ...। [সুরা হিজর: ২২]
২. বিশ্বজগতের বিস্তৃতি
আল্লাহর কিতাব কুরআনুল কারিমে যে-সকল বৈজ্ঞানিক বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, তার আরেকটি উত্তম দৃষ্টান্ত হলো বিশ্বজগতের বিস্তৃতি। আধুনিক বিজ্ঞান বিভিন্ন প্রায়োগিক পরীক্ষা ও প্রমাণের মাধ্যমে এর বিশুদ্ধতা সাব্যস্ত করেছে। এই যে কুরআনুল কারিম—প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে এমন এক সময়ে নাজিল হয়েছে, যখন জ্যোতির্বিজ্ঞান ছিল একেবারেই প্রাথমিক স্তরে, ঠিক সেই সময়ে কুরআনুল কারিম বিশ্বজগতের বিস্তৃতির এই দর্শন বর্ণনা করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ আমি আকাশকে নির্মাণ করেছি (আমার) ক্ষমতাবলে এবং নিশ্চয় আমি বিস্তৃতি দানকারী। [সুরা জারিয়াত: ৪৭]
এ আয়াতে যে وَالسَّمَاءَ﴿ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, এটি কুরআনুল কারিমের অনেক স্থানেই বিশ্বজগৎ ও মহাশূন্য বোঝানোর জন্য এসেছে। কুরাআনুল কারিমের এই আয়াত বোঝায় যে, এই বিশ্বজগৎ সম্প্রসারিত ও বিস্তৃত হচ্ছে। আর আমাদের সময়ের আধুনিক বিজ্ঞানও অবশেষে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছে। অথচ বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেও বৈজ্ঞানিক দর্শন হিসেবে বিশ্বে বহুলভাবে প্রচলিত ছিল যে, এই বিশ্বজগৎ একেবারে স্থির। অনাদি কাল থেকে তা এভাবেই অবস্থিত। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বহু গবেষণা, পর্যালোচনা, পর্যবেক্ষণ ও হিসাবনিকাশ আর পরীক্ষানিরীক্ষার পর সাব্যস্ত হয়েছে যে, এই বিশ্বজগতের একটি সূচনা রয়েছে এবং তখন থেকেই এটি একটি নিয়মের অধীনে সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বেলজিয়ান পদার্থ ও জ্যোতির্বিদ জর্জ লি ম্যাইট্রি (২৬২) এই থিউরি প্রদান করেন যে, এই বিশ্বজগৎ সর্বদা গতিশীল এবং এটি প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
১৯২৯ সালে আমেরিকান জ্যোতির্বিদ এডউইন হাবল (২৬৩) এই থিউরিকে আরও শক্তিশালী করেন। তিনিও সাব্যস্ত করেন মহাশূন্যের সকল তারকা-নক্ষত্র এবং ছায়াপথ (Galaxy) একে অপর থেকে প্রতিনিয়ত দূরে সরে যাচ্ছে। এই বিশ্বজগতের প্রতিটি জিনিস একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং তা প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিতও হচ্ছে। (২৬৪)
৩. সূর্যের আবর্তন
কুরআনুল কারিমের বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতার আরেকটি আয়াত হলো আল্লাহ তাআলার এই বাণী,
وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍ لَّهَا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ﴾
সূর্য আপন গন্তব্যের দিকে পরিভ্রমণ করছে। এসব পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ সত্তার স্থিরীকৃত (ব্যবস্থাপনা)। [সুরা ইয়াসিন: ৩৮]
বাস্তবিকই এই আয়াতের মধ্যে এক মহাবিস্ময় লুক্কায়িত রয়েছে। কারণ, এই আয়াতে تَجْرِی )পরিভ্রমণ করছে) শব্দ দ্বারা সূর্যের সেই গতি বা নড়াচড়াকে বোঝানো হয়নি, সূর্য উদিত হওয়ার সময় মানুষ বাহ্যিকভাবে যা দেখে। বরং এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে সেই বাস্তব ও মহাজাগতিক গতিশীলতা, যা আজকের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ আবিষ্কার করেছে ও গবেষণা জানাচ্ছে যে, সূর্য প্রতি পঁচিশ দিনে একবার তার অক্ষের চারপাশে আবর্তন করে। (২৬৫) এভাবে আমাদের পৃথিবীর ছায়াপথেরও গতি নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিশাল ছায়াপথের একটি সদস্য হলো সূর্য। এই ছায়াপথটি সেকেন্ডে প্রায় ৯৮০ কিলোমিটার গতিতে বিশ্বজগতের অন্য ছায়াপথগুলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। (২৬৬)
৪. পানির বিভাজন
কুরআনুল কারিমের আরেক বৈজ্ঞানিক বিস্ময় হলো পানির বিভাজনের বর্ণনা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ يَلْتَقِيَانِ بَيْنَهُمَا بَرْزَخٌ لَّا يَبْغِيَانِ
তিনিই দুই সাগরকে এভাবে প্রবাহিত করেন যে, তারা পরস্পর মিলিত হয়। কিন্তু (তা সত্ত্বেও) তাদের মধ্যে থাকে এক অন্তরাল, যা তারা অতিক্রম করতে পারে না। [সুরা আর-রহমান: ১৯-২০]
বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে ভূমধ্যসাগর এবং অতলান্তিক সাগর জাবালে তারেক বা জিব্রাল্টার প্রণালীর যে স্থানে মিলিত হয়েছে, দুটি ধারার মাঝে সেখানে একটি অন্তরাল রয়েছে। এই দুই ধারার পানির রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে দুটি পানির প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভূমধ্যসাগরের পানি অতলান্তিক সাগরের পানির চেয়ে বেশি লবণাক্ত এবং বেশি উষ্ণ। এভাবে সকল জীবের ক্ষেত্রে এ দুই সাগরের মাঝে ভিন্নতা রয়েছে। (২৬৭) যেমন ব্রিটিশ পদার্থবিদ জন এমিরি (Victor John Emery-1934-2002) এবং মিশর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদলের আকাবা উপসাগরের পানিবিষয়ক একটি যৌথ গবেষণা প্রকাশ পায়। তাতে দেখা যায়, আকাবা উপসাগরের পানির সাথে লোহিত সাগরের পানির রাসায়নিক এবং প্রাকৃতিক গঠন, কাঠামো এবং বৈশিষ্ট্যগত ভিন্নতা রয়েছে। (২৬৮)
৫. ভূতত্ত্ববিদ্যা
কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিস্ময়কর আয়াতের আরেকটি হলো এই ভূতত্ত্ববিদ্যা, আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالْجِبَالَ أَوْتَادًا এবং পাহাড়সমূহকে কী (ভূমিতে প্রোথিত) কীলক বানাইনি?। [সুরা নাবা: ৭] আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَأَلْقَى فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ
আমি জমিনের মধ্যে পাহাড়গুলো স্থাপন করেছি যাতে জমিন তোমাদের নিয়ে হেলে না পড়ে। [সুরা নাহল, ১৫; সুরা লুকমান, ১০]
আধুনিক যুগে এসে ভূতত্ত্ববিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, পৃথিবীর বিশাল বিশাল পাহাড়ের নিচেও তার বিস্তৃত শিকড় আছে এবং উপরের পাথরের স্তরের নিচে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ও প্রলম্বিত পাহাড় প্রোথিত হয়ে আছে। অনেক ক্ষেত্রে উপরের উচ্চতার চেয়েও নিচের শিকড় ও বিস্তৃতি অনেক বেশি। আল্লাহ তাআলা এই বিস্তৃতি প্রদান করেছেন, যাতে করে এটি পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে সাথে ভূখণ্ডের ঘূর্ণনকে আটকে রাখতে পারে। অথচ ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা ভূতত্ত্বের এই বাস্তবতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল না। (২৬৯)
বিভিন্ন গবেষণা আরও আবিষ্কার করেছে, পৃথিবীর যে-সকল ভূভাগে পাহাড় রয়েছে, পৃথিবীর অন্যান্য অংশ থেকে সেসব ভূ-খণ্ডের আলাদা রকমের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন, সকল পাহাড়ের উচ্চতা তার জমিনের অভ্যন্তরের অংশের সাথে সামঞ্জস্য রাখে। সেখানকার অবস্থিত পাথরের সাথে এবং চারপাশের জমিনের চরিত্রের সাথেও এগুলো সামঞ্জস্য রাখে। এভাবে বিজ্ঞানীরা এটাও পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, এই যে ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশে পাহাড়গুলোকে স্থাপন করা হয়েছে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, জমিনকে ঝুঁকে পড়া এবং নিজস্ব স্থান থেকে বিচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করা। (২৭০) অথচ কুরআনুল কারিম প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগেই এই বাস্তবতা বর্ণনা করেছে। সত্যই বলেছেন আল্লাহ তাআলা এবং সত্যই বলেছেন তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
এরপর আমরা লক্ষ করতে পারি আল্লাহ তাআলার এই বাণীর দিকে, وَالْبَحْرِ الْمَسْجُورِ উত্তপ্ত সমুদ্রের শপথ! [সুরা তুর: ৬] এখানে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে শপথ করা হয়েছে। তিনি সেখানে সমুদ্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, সমুদ্র উত্তপ্ত। আমরা জানি, শপথ করা হয় কোনো কথার দৃঢ়তা ও নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য। আল্লাহর কথায় এমন বাড়তি দৃঢ়তা ও নিশ্চয়তা প্রদানের প্রয়োজন পড়ে না। কেননা, তাঁর সকল কথাই সত্য ও সুদৃঢ়। এ জন্য কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে,
وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا
এবং আল্লাহ অপেক্ষা কথায় বেশি সত্যবাদী কে হতে পারে? [সূরা নিসা : ১২২]
এরপরও মাঝে মাঝে আল্লাহ তাআলা শপথ সহকারে কোনো কথা বলেন। কেন বলেন? উদাসীনদের সতর্ক করার জন্য। ত্রুটি অন্বেষণকারীদের পথ দেখানোর জন্য এবং অস্বীকারকারীদের বিপক্ষে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। যেমন এখানে করেছেন।
আয়াতে ﴾الْمَسْجُورِ﴿ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যেটা আগুন দ্বারা প্রজ্বলিত ও উত্তপ্ত। আল্লাহ তাআলা এখানে শপথ করেছেন এ কথা বোঝানোর জন্য যে, আগুনে প্রজ্বলিত ও উত্তপ্ত সাগরের অস্তিত্ব রয়েছে। কারণ, এখানে উত্তপ্ত সাগর বলতে দুনিয়ার সাগরকেই বোঝানো হয়েছে, আখিরাতের সাগর নয়। আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করেছেন কুরআনুল কারিমের এই সত্য আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণার আলোয় একদিন উদ্ভাসিত হবে। তখন মানুষ সত্যটা বুঝবে। এতদিন পর এখন সমুদ্রবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছেন, সমুদ্রের নিচে উত্তপ্ত বিভিন্ন আগ্নেয়গিরির অস্তিত্ব রয়েছে, এ কারণে পানিও সেখানে ফুটন্ত ও উত্তপ্ত থাকে।
ড. জামালুদ্দিন ফিন্দি তার গ্রন্থ তবিইয়্যাতুল বাহরি ওয়া জাওয়াহিরুহু (طَبِيْعِيَّاتُ الْبَحْرِ وَظَوَاهِرُهُ)-এ উল্লেখ করেছেন, বিভিন্ন গবেষণা প্রমাণ করে যে, সমুদ্রের তলদেশে অনেক গভীর গর্ত ও ছিদ্র রয়েছে। তাপমাত্রা ওজনের তারতম্যের ফলে সমুদ্রের তলদেশ ফেটে গিয়ে এসব ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে। আর এই তারতম্যগুলো সংঘটিত হয় উত্তাপের মাধ্যমে প্রসারিত এবং ঠান্ডার কারণে সমুদ্রের তলদেশ সংকুচিত হয়ে পড়ার কারণে। এভাবে সেই সম্প্রসারিত দীর্ঘ জায়গাজুড়ে একটি দুর্বল স্তরের সৃষ্টি হয়। তখন ভূগর্ভ থেকে আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত গলিত পদার্থগুলো সমতলের এই দুর্বল জায়গাগুলো দিয়ে উপরে উৎক্ষিপ্ত হতে থাকে। এভাবেই সেখানে গর্তের সৃষ্টি হয়। এরপর আগ্নেয়গিরির সেই উত্তপ্ত গলিত পদার্থগুলো সমুদ্রের মাঝে সবেগে নির্গত হতে থাকে। কিন্তু সমুদ্রের পানির চাপে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সেগুলো আর জমিনের উপরে উৎক্ষিপ্ত হতে পারে না। কিন্তু সমুদ্রের পানিকে ঠিকই গরম ও উত্তপ্ত করে তোলে।
এতৎসত্ত্বেও সমুদ্রের আগ্নেয়গিরিগুলো ক্রমাগত উত্তপ্ত গলিত পদার্থ উপরের দিকে উৎক্ষিপ্ত করতে থাকে। তার কূপের মতো সংকীর্ণ গর্ত থেকে ক্রমাগত উপরের দিকে উত্তপ্ত গলিত পদার্থগুলো উদ্গিরণ করতে থাকে। এমনকি কখনো কখনো আগ্নেয়গিরিগুলোর এসব অগ্ন্যুৎপাত সমুদ্রের স্বাভাবিক জোয়ারভাটার মাঝে তারতম্য ঘটিয়ে দেয়। কখনো হঠাৎ সুনামি বা জলোচ্ছ্বাসের উদ্ভব ঘটায়। এমনই একটি সুনামি সংঘটিত হয়েছিল ১৮৮৩ সালে। এতে বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হয় ক্রাকাতোয়া দ্বীপ। (২৭১) ভারত সাগরের পুরো পূর্বাঞ্চল এর ফলে আন্দোলিত হয়ে পড়ে। সেই আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের ফলে যে সুনামির সৃষ্টি হয় তাতে দুদিনেই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪০০ ফিট উপরে অবস্থিত এই দ্বীপটি প্লাবিত হয়ে যায়। তখন সামান্য অংশ ব্যতীত অক্ষত আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না দ্বীপটির। (২৭২)
রাশিয়ান-মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ জর্জ গামু (George Gamow) তার গ্রন্থ কাওকাবুন ইসমুহুল আরদ (كَوْكَبُ اِسْمُهُ الْأَرْضُ)-এ একটি অধ্যায় রচনা করেছেন 'আমাদের পায়ের নিচে জাহান্নাম' শিরোনামে। এই অধ্যায়ে তিনি সমুদ্রের তলদেশ উত্তপ্ত হওয়া, তার আগুন এবং সেখানে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি এর সূচনায় বলেছেন, 'গভীরতার সাথে উষ্ণতার বৃদ্ধি, বিক্ষুব্ধ সকল আগ্নেয়গিরির গর্তগুলো থেকে উৎক্ষিপ্ত সাদা ধোঁয়াগুলো যদি টেনে সামনে আনা হয় তাহলে তার চারপাশে উৎক্ষিপ্ত তপ্ত গলিত প্রজ্বলিত পদার্থগুলো এবং উত্তপ্ত পানির ঝরনাগুলো, অবশ্যই পৃথিবীতে হেঁটে চলা মানুষকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করবে যে, প্রজ্বলিত আগুন আমাদের থেকে বেশি দূরে নয়; সেটা বরং অবস্থান করছে আমাদের পায়ের নিচেই, যাকে প্রস্তুত করা হয়েছে বিচ্যুত বিভ্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য। (২৭৩)
এখানে কুরআনিক অলৌকিকতার বিষয়টি সুস্পষ্ট, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কুরআনুল কারিম সাব্যস্ত করছে যে, সমুদ্রের নিম্নদেশ আগুনের কারণে উত্তপ্ত। এটি ইতিপূর্বে কখনো জানা যায়নি। এমনকি কুরআনুল কারিম নাজিল হওয়ার পরও এতদিন এই বাস্তবতা আমাদের নিকট অনাবিষ্কৃত ছিল। পরিশেষে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বিভিন্ন ঘটনা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীদের নিকট প্রতিফলিত হয় যে, আগ্নেয়গিরির প্রজ্বলিত আগুনের কারণে সমুদ্রের তলদেশ উত্তপ্ত, প্রজ্বলিত ও বিস্ফোরিত হয়ে থাকে। অথচ সামুদ্রিক এই বাস্তবতাটি আল্লাহ তাআলা তাঁর এই কথার মাঝে সাব্যস্ত করে দিয়েছেন,
﴿وَالْبَحْرِ الْمَسْجُورِ﴾ উত্তপ্ত সমুদ্রের শপথ। [সুরা তুর: ৬]
এটা তখন মানুষের অজ্ঞাত ছিল। তাহলে কে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানালো সমুদ্রের তলদেশ এমন উত্তপ্ত এবং তা আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে বিস্ফোরক ও উত্তপ্ত হয়ে আছে যেগুলো গলিত অগ্নিলাভা উৎক্ষিপ্ত করে! (২৭৪)
আল্লাহ তাআলার বাণী- ﴿وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ﴾
আমি আকাশকে নির্মাণ করেছি (আমার) ক্ষমতাবলে এবং নিশ্চয় আমি এর বিস্তৃতি দানকারী। [সুরা যারিয়াত: ৪৭]
এদিকে লক্ষ করলে, জানতে পারি কুরআনুল কারিমের এই আয়াত, যা আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর পূর্বে নাজিল হয়েছে। তা আলোচনা করছে বিশ্বজগতের অব্যাহতভাবে সম্প্রসারিত হওয়া নিয়ে, যখন পৃথিবীর কোথাও এই ধারণা বা থিউরি জ্ঞাত ও প্রমাণিত ছিল না।
অথচ এই বাস্তবতা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন আরও শতশত বছর আগে। আর জ্যোতির্বিদ ও মহাকাশ বিজ্ঞানীরা সেটা আবিষ্কার করল বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে এসে। অথচ এর আগে মহাশূন্যবিজ্ঞানীরা দাবি করত বিশ্বজগৎ স্থির, অনাদি এবং অপরিবর্তনীয়। তারা সৃষ্টি ও স্রষ্টাকে নাকচ করার জন্য এমন আরও অনেক ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। কিন্তু বারবার অস্বীকারকারীদের বিপরীত বিষয়টিই জগতের সামনে সাব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সি ডপলার (C Doppler) আমাদের ছায়াপথের বাইরে অন্যান্য ছায়াপথের নড়াচড়া প্রমাণ করেন। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানজগতের আগের অনেক ধারণাই মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে যায়।
থিউরিটি আবিষ্কারের পেছনে সি ডপলারের চমৎকার কিছু পর্যবেক্ষণ কাজ করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের কথা। অস্ট্রিয়ান এই বিজ্ঞানী লক্ষ করে দেখেন, দ্রুতগামী ট্রেনগুলো তার চলার সময় হুইসেল বা সাইরেন বাজিয়ে যায়। স্টেশনে ট্রেনের পর্যবেক্ষণকারী তার এই আওয়াজ একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গধ্বনির সাথে শ্রবণ করে। কিন্তু ট্রেনটি যখন পর্যবেক্ষণকারীর নিকটবর্তী হয়, তখন সেই আওয়াজ অনেক জোরে ও তীব্রতার সাথে শুনতে পায়। আর দূরে চলে গেলে আওয়াজও ক্রমেই ধীর ও ক্ষীণ হয়ে আসে। ডপলার এর কারণ ব্যাখ্যায় বললেন, ট্রেনের সাইরেন বাতাসের মাঝে কিছু শব্দতরঙ্গ ছড়িয়ে দেয়। তাই শব্দের উৎস যখন কাছে থাকে, তখন এই শব্দতরঙ্গগুলো নিজেদের মাঝে ভীষণ রকমের চাপাচাপির মধ্যে থাকে, এ কারণে তখন শব্দতরঙ্গ উচ্চকিত হয়ে ওঠে। আর এর বিপরীতে শব্দের উৎস যখন দূরে সরে যায়, তখন সেই শব্দতরঙ্গ চারদিকে বিস্তৃতভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে তার কিছু কিছু তরঙ্গ পর্যবেক্ষণকারীর নিকট এসে পৌঁছে, এ কারণে তখন শব্দতরঙ্গ নিম্নমানের হয়, আওয়াজ কম হয়।
বিজ্ঞানী ডপলার ঠিক একই অবস্থা সংঘটিত হতে দেখতে পান আলোর তরঙ্গের ক্ষেত্রে। আলো যখন যথেষ্ট গতিশীল কোনো উৎস থেকে পর্যবেক্ষণকারীর চোখে এসে পড়ে, তখন সেই আলোর প্রতিফলনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটে যায়, আলোর তীব্রতা কমে যায়। আর যদি আলোর উৎসটি পর্যবেক্ষণকারীর খুবই কাছে বিদ্যমান থাকে, তখন আলোর তরঙ্গ পরস্পরের সাথে ঘন হয়ে থাকে এবং অনুভূত আলোর মাঝে পরিবর্তন ঘটতে থাকে। (এটা তখন নীল বর্ণের দিকে ধাবিত হয়।) এটাকে নীলাভ আভা বলে অভিহিত করা হয়। আর যখন দূর থেকে আলোর উৎসটি আন্দোলিত হয়, আলোর তরঙ্গ তখন চারদিকে বিস্তৃত ও বিকীর্ণ হয়ে পড়ে এবং অনুভূত আলোর তরঙ্গ নিম্নমানের হয়ে পড়ে (অর্থাৎ ক্রমে এটা তখন লাল বর্ণের দিকে ধাবিত হয়)। আর বাহ্যিক এই অবস্থাটিকে লাল আভা বলে অভিহিত করা হয়।
এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ ও থিউরি। পরে জ্যোতির্বিদরা যখন আমাদের ছায়াপথের বাইরের তারকাগুলো থেকে আগত আলোর বিশ্লেষণ ও গবেষণার নিয়ম-রীতি প্রয়োগের চেষ্টা করতে থাকেন, তখন এই থিউরি বা দর্শনের গুরুত্ব আরও বহুগুণে বেড়ে যায়।
১৯১৪ সালে মার্কিন জ্যোতির্বিদ স্নিফার (Slipher) আমাদের থেকে সুদূরবর্তী কিছু ছায়াপথের দূরবর্তী তারকাগুলো থেকে আগত আলোর ওপর ডপলারের এই থিউরি প্রয়োগ করেন। এর মাধ্যমে তার কাছে প্রমাণিত হয়, তিনি যে ছায়াপথগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তার অধিকাংশই ক্রমে আমাদের থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছে। এমনকি অতি দ্রুততার সাথে তারা নিজেরাও একে অন্যের থেকে প্রতিনিয়ত দূরে সরে যাচ্ছে। জ্যোতির্বিদরা এটা নিয়ে গবেষণায় লেগে পড়লেন। তারা বুঝতে চেষ্টা করলেন, তবে কি বিশ্বজগৎ নিজেও ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে? অর্থাৎ বিশ্বজগতের ছায়াপথগুলো কি আমাদের থেকে এবং পরস্পর থেকে অতি দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে?
১৯২৫ সালের দিকে এসে জ্যোতির্বিদ স্নিফার প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে, তার পর্যবেক্ষণে থাকা চল্লিশটা ছায়াপথ বাস্তবেই অকল্পনীয় দ্রুততার সাথে আমাদের ছায়াপথ Milky Way (মিল্কিওয়ে) থেকে দূরে চলে গেছে এবং নিজেরাও পরস্পর থেকে প্রতিনিয়ত দূরে সরে যাচ্ছে।
১৯২৯ সালে প্রখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিদ এডউইন হাবল (Edwin Hubble) মহাকাশ সম্বন্ধে একটি অতি সূক্ষ্ম সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম হন। যার মূল বক্তব্য হলো, ছায়াপথগুলো আমাদের থেকে দূরবর্তী হওয়ার দ্রুততার অনুপাতেই সেগুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে এই থিউরি Hubble's Law বা হাবলের সূত্র নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই সূত্র প্রয়োগ করে বিজ্ঞানী হাবল অনেক ছায়াপথের দূরত্ব এবং সেগুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাওয়ার গতি অনুমান করতে সক্ষম হন। আর এটা তিনি করেন আরেক মার্কিন জ্যোতির্বিদ মিল্টন হিউম্যাসন। (Milton Humason)-এর সহযোগিতায়। তিনি হাবলের সাথে ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট উইলসন পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে কাজ করেন। অবশেষে ১৯৩৪ সালে তারা দুজন একসঙ্গে এই থিউরি প্রকাশ করেন।
এভাবে ছায়াপথগুলোর আমাদের থেকে এবং পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়া বিশ্বজগতের সম্প্রসারিত হওয়ার বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। এই বিষয়টি জ্যোতির্বিদদের মাঝে অনেক বড় প্রভাব ফেলে। বহু বিতর্কের সৃষ্টি করে। এমনকি তারা এটাকে প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রতিহত করার ব্যাপারে বিপরীত দুটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু অবশেষে বিভিন্ন গাণিতিক পরীক্ষানিরীক্ষা এবং জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে ব্যাপক জানাশোনা ও পর্যালোচনার পর বিষয়টি প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়। (২৭৫)
যাচাই করার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বিজ্ঞানীরা অতি শক্তিশালী বিভিন্ন বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তারকাগুলোর আলোর বর্ণালি পরীক্ষানিরীক্ষা করতে শুরু করেন। (২৭৬)
অনেক দিনের দীর্ঘ বিশ্লেষণ ও নিরীক্ষণের পর তারা এই ব্যাপারে নিশ্চিত হন যে, আলোর বর্ণালি রেখাগুলো সর্বদাই লালের দিকে ঝুঁকে চলেছে। যখনই জমিনের উপরে অবস্থিত পর্যবেক্ষণকেন্দ্র থেকে আলোর উৎস দূরে সরে যায়, তখনই আলোর প্রতিফলন ক্ষীণ ও দুর্বল হয়ে আসে। সর্বশেষ লাল বর্ণটিই শুধু অবশিষ্ট থাকে। এভাবে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হলেন, আলোর বর্ণালি রেখাগুলোর ঝোঁক লালের দিকেই। তাই তারকাগুলোর আলো ক্রমে লালে পরিণত হওয়া এটাই ইঙ্গিত করছে যে, সকল তারকা ক্রমে আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যার অনিবার্য পরিণতি হলো, বিশ্বজগৎ প্রতিনিয়ত তার স্বাভাবিক নিয়মে সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে।
আমরা তারই পবিত্রতা ও প্রশংসা জ্ঞাপন করি, যিনি আমাদের এই বাস্তবতা জানিয়ে দিয়েছেন আরও প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগেই। (২৭৭)
৬. লোহার উৎস
কুরআনুল কারিমের আরেকটি বৈজ্ঞানিক বিস্ময় হলো লোহার উৎস বর্ণনা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ)
এবং আমি অবতীর্ণ করেছি লোহা, যার ভেতর রয়েছে প্রচণ্ডশক্তি এবং মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ। [সুরা হাদিদ : ২৫]
কেউ কেউ ধারণা করে, এখানে আয়াতের মধ্যে লোহার ক্ষেত্রে أنزلنا (অবতীর্ণ করেছি) ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে রূপক অর্থে। অর্থাৎ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তাআলা লোহা সৃষ্টি করেছেন মানুষের উপকারের জন্য। কিন্তু আমরা ক্রিয়াটির আক্ষরিক অর্থের দিকে তাকালে তখন অর্থ হবে, লোহা আসমান থেকে নাজিল করা হয়। তাই আমরা অনুধাবন করতে সক্ষম হব যে, আয়াতটি একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক বিস্ময়ের সংবাদ প্রদান করছে। আধুনিক মহাকাশ গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে যে, আমাদের বিশ্বে যে লোহা আমরা বিদ্যমান দেখতে পাই, তা মূলত আসে পৃথিবীর বাইরের মহাশূন্যের বিশাল কোনো নক্ষত্র থেকে।
বিশ্বজগতের ভারী খনিজ পদার্থগুলো উৎপন্ন হয় বড় কোনো নক্ষত্রের পরমাণু থেকে। এগুলো উৎপন্ন হতে অত্যধিক ভর ও প্রজ্বলন প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের সৌরজগৎ এমন উপযুক্ত পরিমাণ বিক্রিয়া ধারণ করতে পারে না, যার মাধ্যমে সে নিজেই লোহা উৎপন্ন করতে সক্ষম হবে। সুতরাং লোহা উৎপন্ন হতে হলে আমাদের সূর্য থেকেও বড় কোনো নক্ষত্রের প্রয়োজন হয়। যেখানে শত কোটিগুণ বেশি তাপ বিকিরণ হতে পারে। তাই মহাশূন্যের কোনো নক্ষত্রে যখন স্বাভাবিকের তুলনায় তার লোহার পরিমাণ বেড়ে যায়, তখন সেই বাড়তি পরিমাণের সাথে নক্ষত্রটি আর নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না। পরিণামে সেটা বিস্ফোরিত হয় এবং গোটা নক্ষত্রটি প্রজ্বলিত জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়, অথবা সুপারনোভার সৃষ্টি হয়। (এটা এমন এক নক্ষত্র, হঠাৎ যার আলোর ঝলকানি বহুগুণে বেড়ে যায় এবং কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছর পর আবার সেটা প্রশমিত হয়ে আসে।) আর এই বিস্ফোরণের কারণে বিশ্বজগতের মহাশূন্যের বিভিন্ন দিকে উল্কাপিণ্ড ছড়িয়ে পড়ে, এগুলোর মাঝেই লোহা থাকে। এগুলো মহাশূন্যে ভেসে বেড়ায় এবং আসমানের নক্ষত্রগুলোর কোনো আকর্ষণকারী শক্তি এটাকে নিজের দিকে টেনে নেয়। (২৭৮)
অর্থাৎ এই পুরো পদ্ধতিটা প্রকাশ করছে, লোহা জমিন থেকে উৎপন্ন হয় না। জমিন থেকে বেরও হয় না। বরং মহাশূন্যের বিশাল কোনো তাপবাহী নক্ষত্রের বিস্ফোরণের কারণে উৎপন্ন উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে লোহা জমিনে অবতীর্ণ হয়। বর্ণিত আয়াতটিও সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। এ কথা স্পষ্ট যে, লৌহকেন্দ্রিক এই বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা নিয়ে পৃথিবীতে কুরআনুল কারিম যখন নাজিল হয়েছিল, সেই খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে এটা কারও নিকট বৈজ্ঞানিক জ্ঞান হিসেবে একেবারেই পরিচিত ছিল না। (২৭৯)
৭. মানবসৃষ্টি
কুরআনুল কারিমের আরেকটি আয়াতে আমরা স্পষ্ট অলৌকিকতা খুঁজে পাই। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُّطْفَةٍ أَمْشَاجِ আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শুক্রবিন্দু হতে। [সুরা দাহর : ২]
সকল মুফাসসির একমত যে ﴾نُطْفَةٍ أَمْشَاجِ﴿ বলতে পুরুষ ও নারীর মিলিত পানিকে বোঝায়। ﴾أَمْشَاجِ﴿ অর্থ নারী-পুরুষের মিশ্র পানি। অণুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে, যা কুরআনুল কারিম নাজিল হওয়ারও হাজার বছর পর আবিষ্কৃত হয়েছে, তখন কেউই জানত না উৎপাদনশক্তিসম্পন্ন ডিম্বাণু (Fertilized Egg) থেকে ভ্রূণের সৃষ্টি হওয়া যাকে তুলনা করা হচ্ছে نُّطْفَةٍ-এর সাথে। অর্থাৎ نُطْفَةٍ বলতে বোঝায় নারী-পুরুষের মিশ্রিত অতি সূক্ষ্ম পানিবিন্দু, যার মাঝে পিতামাতা উভয়ের জিনগত উপাদান বিদ্যমান থাকে। আজকের সময়ে যাকে আমরা ক্রোমোজম (Chromosome) বলে থাকি।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنثَى হে মানুষ, আমি তোমাদের সকলকে এক পুরুষ ও এক নারী হতে সৃষ্টি করেছি। [সুরা হুজুরাত : ১৩] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন, আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে বর্ণনা করেছেন, তিনি সকল মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পুরুষ ও নারী হতে। অবশ্য কিছু মানুষ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, ভ্রূণ শুধু পুরুষের বীর্য থেকেই উৎপন্ন হয়। সেটা পরে মায়ের উদরে এসে প্রতিপালিত হয় এবং সেখানকার রক্ত আহরণ করে বেড়ে ওঠে। কিন্তু বিশুদ্ধ কথা হলো, মানবশিশুর সকল সৃষ্টিই পুরুষ ও নারী, উভয়ের পানি থেকে উৎপন্ন হয়।
উল্লিখিত আয়াতটিও সে কথাই বোঝায়। এটি এমনই স্পষ্ট আয়াত, যার কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। (২৮০)
তবে মানবসৃষ্টির স্তরগুলো শুরু হয় পিতার শুক্রকীটের জন্মের মধ্য দিয়ে। কারণ, মায়ের ডিম্বাণুগুলো পূর্ব থেকেই প্রস্তুত থাকে। শুক্রাণুর সংস্পর্শে এসে তা ভ্রূণে পরিণত হয়। আর নির্গত বীর্যকে তুলনা করা যায় কিছু শুক্রাণু অর্থাৎ পানিবিন্দুর সাথে। কুরআনুল কারিম এই বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে এভাবে, আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَبَدَأَ خَلْقَ الْإِنْسَانِ مِنْ طِينٍ ثُمَّ جَعَلَ نَسْلَهُ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ مَّاءٍ مَّهِينٍ
আর তিনি মানবসৃষ্টির সূচনা করেছেন কাদা হতে। অতঃপর তার বংশধারা চালু করেছেন নিঃসারিত তুচ্ছ পানি থেকে।
[সুরা সাজদা: ৬-৭]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
أَلَمْ نَخْلُقْتُكُمْ مِنْ مَّاءٍ مَّهِينٍ
আমি কি তোমাদের তুচ্ছ পানি থেকে সৃষ্টি করিনি?
[সুরা মুরসালাত: ২০]
কিন্তু নির্গত বীর্য বা শুক্রাণুর সকল বিন্দুই সন্তানগঠনে সক্ষম বা উপযুক্ত হয় না, বরং মাত্র একটি শুক্রাণু (Drop-like Embryo) সন্তানগঠনের ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়। কুরআনুল কারিম এই বিষয়টিকে কয়েকটি আয়াতের মাধ্যমে বিবৃত ও প্রতিষ্ঠিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَنْ يُتْرَكَ سُدًى أَلَمْ يَكُ نُطْفَةً مِّنْ مَّنِي يُمْنَى
মানুষ কি মনে করে তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেওয়া হবে? সে কি ছিল না এক বিন্দু বীর্য, যা (মাতৃগর্ভে) স্খলিত করা হয়?
[সুরা কিয়ামাহ: ৩৬-৩৭]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ
তিনি মানুষকে শুক্রবিন্দু হতে সৃষ্টি করেছেন। [সুরা নাহল : ৪] অন্য আয়াতে বলেন,
أَوَلَمْ يَرَ الْإِنْسَانُ أَنَّا خَلَقْنَهُ مِنْ نُطْفَةٍ মানুষ কি লক্ষ করেনি আমি তাকে সৃষ্টি করেছি শুক্রবিন্দু দ্বারা? [সুরা ইয়াসিন : ৭৭]
আমাদের বিস্ময়ের সীমা থাকে না যখন দেখি, কুরআনুল কারিম বীর্যের উপাদান বর্ণনার ক্ষেত্রে কর্মকারকের (ইসমুল মাফউল) পরিবর্তে কর্তৃকারক (ইসমুল ফায়িল) পদ উপস্থাপন করেছে। অথচ তখন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে এর গতি ও প্রকৃতি পৃথিবীর কেউই প্রত্যক্ষ করেনি! আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَلْيَنْظُرِ الْإِنْسَانُ مِمَّ خُلِقَ خُلِقَ مِنْ مَّاءٍ دَافِقٍ সুতরাং মানুষ লক্ষ করুক তাকে কীসের দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি দ্বারা। [সুরা তারিক : ৫-৬] প্রাথমিক মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখা কষ্টসাধ্য হওয়ায় ১৬৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ডালিমপাটিয়াস (Dalempatius) পুরো মানবদেহকে শুক্রাণুর মাথায় অঙ্কন করেছেন। অর্থাৎ অষ্টাদশ শতাব্দী শুরু হওয়ার মাত্র এক বছর আগে। অথচ পৃথিবীর মানুষ পিতামাতার ভ্রূণগঠনের স্তরকে দেখার আগেই কুরআনুল কারিম আমাদের সেই সপ্ত শতাব্দীতেই ভ্রূণের বেড়ে ওঠার স্তরগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
مَا لَكُمْ لَا تَرْجُونَ لِلَّهِ وَقَارًا وَقَدْ خَلَقَكُمْ أَطْوَارًا তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর মহিমাকে স্বীকার করতে চাও না? অথচ তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন ধাপে ধাপে। [সুরা নুহ : ১৩-১৪] ভ্রূণ বেড়ে ওঠার প্রথম ধাপ নিয়ে আপনি অবাক হবেন। কুরআনুল কারিম প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হওয়ার স্থান হিসেবে بطن (উদর/গর্ভ) শব্দ ব্যবহার করেছে, যা খুবই যথার্থ হয়েছে। (জরায়ু বা গর্ভাশয় বলেনি। কারণ ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি, প্রথম ধাপটি পেটের ভেতরে, জরায়ুর বাইরে সম্পন্ন হয়ে থাকে।) আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿يَخْلُقُكُمْ فِي بُطُونِ أُمَّهَتِكُمْ خَلْقًا مِنْ بَعْدِ خَلْقٍ فِي ظُلُمَاتٍ ثَلَاثٍ ﴾
তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মাতৃগর্ভে এভাবে সৃষ্টি করেন যে, তিন অন্ধকারের মধ্যে তোমরা একের পর এক সৃজনস্তর অতিক্রম করো। [সূরা যুমার : ৬]
আর বাস্তবেও ভ্রূণকে তিনটি প্রকাশ্য স্তর বা আবরণ পরিবেষ্টন করে রাখে।
কুরআনুল কারিম বিস্তারিতভাবে ভ্রূণগঠনের বিভিন্ন ধাপ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বর্ণনা করেছে এবং বাস্তবেই সেগুলো ভ্রূণগঠনের প্রকৃত স্তরের সাথে হুবহু মিল রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
﴿ وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ طِينٍ ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَكِينٍ ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ ﴾
১২. আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির সারাংশ দ্বারা।
১৩. তারপর তাকে শুক্র বিন্দুরূপে এক সংরক্ষিত স্থানে রাখি।
১৪. তারপর আমি সেই শুক্র বিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করি। তারপর সেই জমাট রক্তকে গোশতপিণ্ড বানিয়ে দিই। তারপর সেই গোশতপিণ্ডকে অস্থিতে রূপান্তরিত করি। তারপর অস্থিরাজিতে গোশতের আচ্ছাদন লাগিয়ে দিই। তারপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলি। বস্তুত সকল কারিগরের শ্রেষ্ঠ কারিগর আল্লাহ কত মহান! [সূরা মুমিনুন : ১২-১৪]
মাতৃগর্ভের প্রাথমিক অবস্থায় ভ্রূণ একটি জমাট রক্তের (Leech-like Embryo) মতো অবস্থান করে। এই সময়ে তার আকৃতির উল্লেখযোগ্য কোনো দৃষ্টান্ত হয় না। সেটা নিছক একটি লম্বাটে আকৃতি নিয়ে অবস্থান করে। তাতে কোনো স্পন্দিত কলব বা হার্ট থাকে না। তখন সেটি যার সাথে সংলগ্ন থাকে, তার রক্ত থেকে খাদ্য গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। মাতৃগর্ভে এটি ভ্রূণের একদম প্রাথমিক অবস্থা। এরপর ধীরে ধীরে তার প্রাথমিক অঙ্গগুলো গঠিত হতে থাকে। তখন ভ্রূণ কিছুটা কুঁকড়ে ভাঁজযুক্ত হয়। তার মাঝে বিভিন্ন ধরনের ভাঁজ ও সংকোচনের সৃষ্টি হয়। শারীরিক অবয়ব স্পষ্ট হতে থাকে, যেটা আসলে প্রথমে মেরুদণ্ডের হাড় গঠন করে। সেটার অবস্থা তখন যেন মানুষের মুখের মধ্যে প্রথম দাঁতের সৃষ্টি হওয়ার মতো অথবা একটি গোশতের টুকরার মতো। এ সময় ভ্রূণটা এমন অবয়ব ধারণ করে, দেখে মনে হবে যেন তাকে চিবানো হয়েছে। এভাবে সেটা একটি আকৃতির দিকে ঝুঁকতে থাকে। সুতরাং এই স্তরে এসে তার যে গঠন হয়, তার পরিচয়ে مُضْغَةٌ বা গোশতপিণ্ড (Chewable mass-like Embryo) খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশ্লেষণ। এরপর সপ্তম সপ্তাহে অস্থি-হাড় গঠনের সূচনার মাধ্যমে প্রাথমিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো গঠনের স্তরটি সমাপ্ত হয়। এরপর অষ্টম সপ্তাহে এসে মাংসপেশী সেগুলোকে আবৃত করে নেয়। এই অবস্থাকেই আল্লাহ তাআলা ব্যক্ত করেন এভাবে,
فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَمًا فَكَسَوْنَا الْعِظْمَ لَحْمًا
তারপর সেই গোশতপিণ্ডকে অস্থিতে রূপান্তরিত করি। তারপর অস্থিরাজিতে গোশতের আচ্ছাদন লাগিয়ে দিই।' [সুরা মমিনুন: ১৪]
এটা খুবই অসাধারণ এক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। এর আগে অন্য কোনো গ্রন্থে, এমনকি কোনো ঐশী গ্রন্থেও এই বর্ণনা উপস্থাপিত হয়নি। এভাবে অষ্টম সপ্তাহে প্রাথমিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ (Organogenesis) গঠনের স্তর সমাপ্ত হয়। আর মূলত সপ্তম সপ্তাহের পরে প্রাথমিক আকৃতি সম্পন্ন হওয়ার পর ভ্রূণটি ধীরে ধীরে মানবাকৃতি ধারণ করতে থাকে। এরপর আর নতুন কিছু গঠিত হওয়ার বাকি থাকে না। বরং শুধু আকৃতিটা বাড়তে থাকে, গঠনটি সামঞ্জস্যশীল হতে থাকে এবং মাথা ও শরীরের মাঝে যোগসূত্র তৈরি হতে থাকে। এই অবস্থাটিকে আল্লাহ তাআলা বর্ণনা করেন এভাবে,
ثُمَّ أَنْشَأْنُهُ خَلْقًا أَخَرَ فَتَبْرَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَلِقِينَ
তারপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলি। বস্তুত সকল কারিগরের শ্রেষ্ঠ কারিগর আল্লাহ কত মহান! [সুরা মমিনুন: ১৪]
এখন একজন স্বাভাবিক বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিও দৃঢ় বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে, বিষয় থেকে সামান্যতম বিচ্যুত না হয়ে এ সকল বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা নিয়ে কুরআনুল কারিম এমন সূক্ষ্ম ও অভ্রান্ত বর্ণনা উপস্থাপন করেছে। অণুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারা না দেখে এগুলোর এমন নিখুঁত বর্ণনা কোনো মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়। অথচ অন্যরা এটা জেনেছে এই কিছুদিন আগে, বৈজ্ঞানিক রেনেসাঁসের যুগে এসে। বিশেষ করে সর্বশেষ তিন শতাব্দীতে। এ কারণে ইসলামে ত্রুটি অন্বেষণকারীরা যে-সকল কথা বলে, তারা অবাধ্যতা, হঠকারিতা ও বিজ্ঞানের বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে এবং কুরআনুল কারিমে বর্ণিত ওহির প্রমাণাদি সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণের কারণে এ সকল কথা বলে। (২৮১)
এ ছাড়া আমরা যদি কুরআনুল কারিমে বর্ণিত বিজ্ঞানবিষয়ক আয়াতসমূহ নিয়ে চিন্তাভাবনা করি, তখন সেখানে বিস্ময়ে অভিভূত হওয়ার মতো চমৎকার সব বিষয় পাই। যেমন আমরা দুধভাইয়ের সাথে বিবাহ হারাম হওয়ার হিকমত এবং এই আয়াতের মধ্যে যে বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক সূত্র রয়েছে, সেটা নিয়ে চিন্তা করতে পারি। আমরা জানি, কুরআনুল কারিম দুধভাইকেও রক্তের সম্পর্কের আপন ভাইয়ের মতো সাব্যস্ত করেছে। এ কারণে দুধভাইয়ের জন্য দুধবোনের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনকে হারাম ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ وَعَمَاتُكُمْ وَخَالَاتُكُمْ وَبَنَاتُ الْأَخِ وَبَنَاتُ الْأُخْتِ وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ مِنَ الرضاعة
তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, তোমাদের মেয়ে, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, তোমাদের ভাতিজী, তোমাদের ভাগনি, তোমাদের সেই সকল মা, যারা তোমাদেরকে দুধপান করিয়েছে, তোমাদের দুধবোন। [সুরা নিসা: ২৩]
আধুনিক কালের পরীক্ষিত বিজ্ঞান প্রমাণ করে, মায়ের দুধে এমন উপাদান রয়েছে, তিন কি পাঁচ ঢোক পরিমাণ দুধপান করার মাধ্যমে দুধপানকারী সন্তানের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। মানবশিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে এই পরিমাণ দুধকে উপযুক্ত ধরা হয়। এমনকি এই পরিমাণ দুধ সদ্যভূমিষ্ঠ অন্য কোনো প্রাণীর মাঝেও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে সহায়তা করে এবং এমন প্রাণীর ক্ষেত্রেও করে যার শারীরিক গঠন এখনো পূর্ণতায় উপনীত হয়নি। সুতরাং শিশু যখন দুধপান করবে, স্বাভাবিকভাবেই দুধদানকারী নারীর দুধ থেকে সৃষ্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাধ্যমে বিশেষ জিনগত বৈশিষ্ট্য সেই শিশুর মাঝে সঞ্চারিত হবে। আর এই কারণেই সে তার দুধভাই বা বোনের সাথে জিনগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যাবে। আর হতে পারে সেই বোনের সাথে দাম্পত্যসম্পর্ক সৃষ্টি হলে এই রোগ প্রতিরোধকারী কণাগুলো তাদেরকে বিভিন্ন রোগের দিকে ঠেলে দেবে。(২৮২)
কুরআনুল কারিমের আলোচ্য আয়াতে এভাবেই আমরা দুধবোনের সাথে বিবাহ হারাম হওয়ার একটি সূক্ষ্ম কার্যকারণ দেখতে পাই। আর হাদিসে এই দুধপানের পরিমাণ নির্ধারিত হয়েছে পাঁচ ঢোক বা চুমুক。(২৮৩)
এই হলো কুরআনুল কারিমে বর্ণিত বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতার অল্প কিছু নমুনা। এগুলো অকাট্যভাবে সাব্যস্ত করে, এটি এমন এক ওহি, যা আল্লাহ তাআলা শব্দ ও অর্থসহ তাঁর বান্দা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর নাজিল করেছেন। এগুলো নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্ত জাহানের মানুষের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রেরিত একজন বান্দা। পাশ্চাত্যের অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিও কুরআনুল কারিমের এই চিরন্তন মুজিজা বা অলৌকিকতা স্বীকার করে নিয়েছেন। সে সকল পণ্ডিতদের মধ্যে একজন হলেন এমিল ডারমেনহেম (Emule Dermenghem)। তিনি কুরআনুল কারিম সম্পর্কে বলেন,
সকল নবীরই তার নবুয়তের সত্যতার প্রমাণ থাকে এবং তার এমন একটি মুজিজাও থাকে, যার মাধ্যমে তিনি অন্যদের চ্যালেঞ্জ করতে পারেন... আর কুরআন হলো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই ধরনের মুজিজা। এর বিস্ময়কর বর্ণনারীতি এবং আলোচনার শক্তিমত্তা আমাদের যুগের পাঠকের অন্তরকেও প্রশান্ত করে দেয়, যদিও সে বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত না হয়। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবজাতি এবং জিনজাতিকে এমন একটি রচনা উপস্থাপনের জন্য চ্যালেঞ্জ করেছেন। আর এই চ্যালেঞ্জটিই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ। (২৮৪)
টিকাঃ
২৬১. জীববিজ্ঞানের ভাষায় পরাগায়ন হলো পরাগধানী হতে পরাগরেণু সেই ফুলে বা একই জাতের অন্য ফুলের গর্ভমুণ্ডে স্থানান্তরিত হওয়া।
২৬২. জর্জ লি ম্যাইট্রি (George Le Maitre: 1894-1966)। বেলজিয়ান জ্যোতির্বিদ ও মহাকাশ বিজ্ঞানী। মহাবিস্ফোরণের একজন শক্তিশালী প্রচারক। তার দর্শন হলো, এক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে এই বিশ্বজগতের সূচনা ও সৃষ্টি হয়েছে।
২৬৩. এডউইন হাবল (Edwin Hubble : 1889-1953)। মার্কিন জ্যোতির্বিদ। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ ছাড়াও আরও ছায়াপথের অস্তিত্ব আছে বলে তিনি প্রমাণ করেন।
২৬৪. হারুন ইয়াহইয়া, আল-মুজিজাতুল কুরআনিয়্যা: ১২, ১৩।
২৬৫. খলিল বাদাবি: আল-মাওসুআতুল ফালাকিয়্যা: ২১।
২৬৬. ইবরাহিম গাওরি: আশ-শামস: ১৮।
২৬৭. মারওয়ান তাফতানাযি: আল-ইজাজুল কুরআনি ফি দাওয়িল ইকতিশাফিল ইলমিল হাদিস: ৩৮৪।
২৬৮. ইয়াকুব ইউসুফ: লাফাতাতুন ইলমিয়্যাতুন মিনাল কুরআন: ৫৭
২৬৯. আবদুল মাজিদ যানদানি : কিতাবুত তাওহিদ: ৭২।
২৭০. মারওয়ান তাফতানাযি : আল এজাজুল কুরআনি ফি দাউইল ইকতিশাফিল ইলমিল হাদিস : ৩৫২।
২৭১. ক্রাকাতোয়া (Krakatoa or Krakatau)। ইন্দোনেশিয়ার জাভা এবং সুমাত্রার মাঝে সুন্দা প্রণালির নিকট অবস্থিত একটি দ্বীপ। ১৮৮৩ সালের এই জলোচ্ছ্বাসে দ্বীপটির দুই-তৃতীয়াংশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এটিকে জানা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জলোচ্ছ্বাস হিসেবে গণ্য করা হয়, যার সৃষ্টি হয়েছিল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে। এতে দ্বীপটির ৩৬ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যায়।- অনুবাদক
২৭২. মুহাম্মাদ জামালুদ্দিন ফিন্দি: তবিয়িয়্যাতুল বাহরি ওয়া জাওয়াহিরুহু: ২১০।
২৭৩. জর্জ গামু (George Gamow): কাওকাবুন ইসমুহু আল-আরদ: ৭৪
২৭৪. মারওয়ান তাফতানাযি: আল-ইজাজুল কুরআনি ফি দাওয়িল ইকতিশাফিল ইলমিল হাদিস: ৩৯০, ৩৯১।
২৭৫. মারওয়ান তাফতানাযি: আল-ইজাজুল কুরআনি : ১৮৯-১৯২।
২৭৬. জোয়েল ডো রুনি ও অন্যান্য: নাহনু ওয়াল কাওন : ২৪
২৭৭. মুখলিছ রাইস ও আলি মুসা: কিসসাত নুশুয়িল কাওন : ৪১
২৭৮. লোহার উৎস নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। কারণ, লোহা আমাদের পৃথিবীতে সৃষ্ট নয়। আমাদের সৌরজগতেও এর সৃষ্টি হয়নি। জেনে রাখা প্রয়োজন, পৃথিবীসহ আমাদের সৌরজগতের সকল গ্রহ ও উপগ্রহ সূর্য থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়েছে। সূর্যে কোনোপ্রকার লোহার উৎপাদন হয় না। কারণ, তাপক্ষরণের মাত্রার বিবেচনায় সূর্য একটি মধ্যবর্তী নক্ষত্র। সাধারণভাবে এর উপরিতলের তাপমাত্রা ৬,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং এর অভ্যন্তরের সাধারণ তাপমাত্রা ১,৫০,০০,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। লোহার গঠনের জন্য এরূপ তাপমাত্রা যথেষ্ট নয়। সম্প্রতি প্রমাণ করা হয়েছে, আমাদের সূর্যের থেকে দশগুণ বেশি ভরসম্পন্ন নক্ষত্রসমূহে তাদের উন্নতির শেষ পর্যায়ে নিউক্লিয়ার ফিউশনের মাধ্যমে লিথিয়ামের থেকে অধিক ভারী বিভিন্ন পদার্থের উদ্ভব ঘটে। অধিক ভরসম্পন্ন এই নক্ষত্রসমূহে হিলিয়াম পুড়ে কার্বন, অক্সিজেন, সিলিকন, সালফার এবং সর্বশেষ লোহার উদ্ভব ঘটে। এভাবে লোহার যখন উদ্ভব ঘটতে থাকে, নক্ষত্রসমূহের নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়া তখন আর অব্যাহত থাকতে সক্ষম হয় না। আরও বিভিন্ন প্রক্রিয়া-ঘটনার কারণে নক্ষত্রসমূহে অপরিমেয় শক্তির নিঃসরণ ঘটে। পরে নক্ষত্রটি বিস্ফোরিত হয়। এই বিস্ফোরণ সুপারনোভা নামে পরিচিত। সুপারনোভা সংগঠনের পর লোহাসহ এই ভারী পদার্থগুলো মহাবিশ্বের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন গ্রহ ও নক্ষত্রে পরে এই ভারী পদার্থসমূহ আপতিত হয়।- অনুবাদক
২৭৯. হারুন ইয়াহইয়া : আল-মুজিজাতুল কুরআনিয়্যা : ৩৪।
২৮০. ইমাম কুরতুবি: আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন: ১৬/৩৪২, ৩৪৩।
২৮১. ড. মুহাম্মদ দাহদুহ। কলাম : ﴾إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ تُطْفَةٍ أَمْشَامٍ﴿। বিস্তারিত পড়তে : https://bit.ly/2HSum73
২৮২. 'জাদিদুল ইলম' (আধুনিক বিজ্ঞান বিষয়ক) ওয়েবসাইট: এখানে ড. মার্ক কোরিগান (Mark Corrigan) শিশুদের ওপর মায়ের দুধের প্রভাব প্রমাণ করেন।
২৮৩. উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রথমে কুরআনুল কারিমের নাজিলকৃত বিধানে হারাম হওয়ার জন্য দশ চুমুক বিধান ছিল। পরে জ্ঞাত পাঁচ চুমুকের মাধ্যমে সেটা রহিত হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের এই বিধানের ওপর রেখেই ইনতেকাল করেছেন। সূত্র: সহিহ মুসলিম: ১৪৫২।
২৮৪. এমিল ডারমেনহেম: হায়াতু মুহাম্মাদ: ২৮৯।
📄 ইতিহাস বর্ণনায় অলৌকিকতা
কুরআনুল কারিম অতীত ব্যক্তিদের ইতিহাস বর্ণনায় অনেক গুরুত্ব প্রদান করেছে। এগুলোর মাধ্যমে তার বিরোধিতাকারীদের প্রতি একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। এ কারণে কুরআনুল কারিম এমন মানুষদের জীবন সম্পর্কে সংবাদ প্রদান করেছে, যারা হাজার বছর ধরে প্রবল শক্তিমত্তা, সীমাহীন ভোগবিলাস ও শৌখিনতা নিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছে। অথচ কোনো ঐতিহাসিকই ইতিহাসের এই দিকে এতদূর পৌছতেই পারেনি, তার বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ প্রদান তো দূরের কথা।
কুরআনুল কারিম অনেকগুলো উদ্দেশ্য নিয়ে অতীত জাতিগুলোর ইতিহাস বর্ণনা করেছে। স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তার উদ্দেশ্য নিছক কোনো সান্ত্বনা প্রদান বা সময় পার করা নয়; বরং এ সকল ঘটনা উপস্থাপনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো উপদেশ ও হিকমত বর্ণনা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَى وَلَكِنْ تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ ) নিশ্চয় তাদের ঘটনায় বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের উপাদান আছে। এটা এমন কোনো বাণী নয়, যা মিছামিছি গড়ে নেওয়া হয়েছে। বরং এটা এর পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সমর্থক, সবকিছুর বিশদ বিবরণ এবং ঈমানদার জাতির জন্য হেদায়েত ও রহমতের উপকরণ। [সুরা ইউসুফ: ১১১]
কুরআনুল কারিমের ঐতিহাসিক অলৌকিকতার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ইমাম সুয়তি রহ. বলেন, এই কুরআন বর্ণনা করেছে অতীতের বিভিন্ন ঘটনা ও অনেক ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির ইতিহাস এবং যুগে যুগে আবর্তিত বিভিন্ন ধর্মের বিবরণ। আহলে কিতাবদের মধ্যে গভীর জ্ঞানের অধিকারী হাতেগোনা কিছু ধর্মগুরু ছাড়া এ সমস্ত ঘটনা সম্পর্কে আর কেউ জানত না। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই অজানা অলেখা ঘটনাগুলো নির্ভুলভাবে বর্ণনা করেছেন এবং সেগুলোর যথাযথ বক্তব্যকে উপস্থাপন করেছেন অথচ তিনি ছিলেন একজন উম্মি, পড়তে ও লিখতে জানতেন না। (২৮৫)
মানুষ আসলে মানুষই, শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিবাহিত হয়েছে, হয়তো সামনে আরও বহু শতাব্দী আসবে, কিন্তু কিছুতেই মানুষের স্বভাব পরিবর্তন হওয়ার নয়। তার মৌলিকতা বদল হওয়ার নয়। এ কারণে কুরআনুল কারিম নবীদের বিবরণের সাথে সাথে পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ঘটনাও সংরক্ষণ করেছে। বহু যুগ-শতাব্দী অতিবাহিত হওয়ার পর কুরআনুল কারিম আবার নতুনভাবে তাদের কথা মানুষের সামনে এনেছে, যাতে করে একই রোগে আক্রান্ত মানুষেরা এর দ্বারা চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারে। কুরআনে বহু ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে, সামাজিক সে সকল ব্যাধি ও রোগের চিকিৎসার জন্য এবং শিক্ষা ও সতর্কতার মাধ্যমে এর রোগজীবাণুগুলো দূর করার জন্য। (২৮৬)
উদাহরণ হিসেবে আমরা হজরত নুহ আলাইহিস সালামের ঘটনা নিয়ে চিন্তা করতে পারি। কুরআনে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। ঘটনার শুরু হয়েছে এভাবে—নুহ আলাইহিস সালাম তার জাতিকে সাড়ে নয়শ বছর দাওয়াত প্রদান করেন। কিন্তু তার সম্প্রদায়ের নেতৃবর্গ সীমাহীন হঠকারিতা প্রদর্শন করে এবং তাকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে। অল্পসংখ্যক মানুষই তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে। এরপর আল্লাহর নির্দেশে তিনি জাহাজ বানানো শুরু করেন। পূর্বপ্রতিশ্রুত সেই মহাপ্রাবনের সময় মুমিনরা তাতে আরোহণ করেন। আরও আছে মহাপ্রাবনের ভয়াবহ বর্ণনা। নুহ আ.-এর ছেলে ও স্ত্রীর নিমজ্জিত হওয়া এবং এরপর পৃথিবীতে হজরত নুহ আলাইহিস সালাম এবং মুমিনদের কর্তৃত্ব ও বসবাস শুরু এসব ঘটনার বিস্তারিত নির্ভুল বিবরণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে জানতে পারলেন? যেখানে অন্যান্য ঐশী গ্রন্থে শুধু ঘটনার কিছু দিক বর্ণনা করা হয়েছে। অন্য দিকগুলো সেখানে অনুপস্থিত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবকিছুর বিবরণ দিয়েছেন পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে। এ কারণে আমাদের প্রতিপালক নুহ আলাইহিস সালামের ঘটনার সমাপ্তি টেনেছেন এভাবে,
﴿تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ ۚ مَا كُنْتَ تَعْلَمُهَا أَنْتَ وَلَا قَوْمُكَ مِنْ قَبْلِ هَٰذَا ۖ فَاصْبِرْ ۖ إِنَّ الْعَاقِبَةَ لِلْمُتَّقِينَ﴾
(হে নবী,) এগুলো গায়েবের কিছু বৃত্তান্ত, যা আমি ওহির মাধ্যমে আপনাকে জানাচ্ছি। এসব বৃত্তান্ত আপনিও ইতিপূর্বে জানতেন না এবং আপনার সম্প্রদায়ও না। সুতরাং ধৈর্য ধারণ করুন। শেষ পরিণাম মুত্তাকিদেরই অনুকূলে থাকবে। [সুরা হুদ: ৪৯]
কুরআনুল কারিমের ঘটনাগুলোর মধ্যে এই যে ঘটনার নিশ্চিত বিবরণ এবং নির্ভুল ইতিহাস, এটাই প্রমাণ করে, কুরআনুল কারিম তার ঐতিহাসিক নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে এক মহাবিস্ময়। এর মাঝে রয়েছে অসংখ্য বিবরণ, যেগুলো অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং মানুষের চারিত্রিক উন্নতি সাধন করে।
কুরআনুল কারিমের ঐতিহাসিক অলৌকিকতার বিবরণের মধ্যে আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো, কুরআনের মধ্যে মুসা আলাইহিস সালাম ও ফিরাউনের সাথে হামানের নাম উল্লেখ করা এবং হামানকে ফিরাউনের একজন নৈকট্যশীল হিসেবে উপস্থাপন করা। আল্লাহ তাআলা ফিরাউনের ভাষায় বলেন,
﴿فَأَوْقِدْ لِي يَا هَامَانُ عَلَى الطِّينِ فَاجْعَلْ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَطَّلِعُ إِلَىٰ إِلَٰهِ مُوسَىٰ وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ مِنَ الْكَاذِبِينَ﴾
আর হে হামান, তুমি আমার জন্য আগুন দিয়ে মাটি জ্বালাও (অর্থাৎ ইট তৈরি করো) এবং আমার জন্য একটি উঁচু ইমারত তৈরি করো, যাতে আমি তার ওপর উঠে মুসার প্রভুকে উঁকি মেরে দেখতে পারি। আমি মনে করি সে একজন মিথ্যাবাদী। [সুরা কাসাস: ৩৮]
কুরআনুল কারিম হামানের যে চিত্র তুলে ধরেছে, ওল্ড টেস্টামেন্টের এক গ্রন্থে (২৮৭) তার বিপরীত চিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। সেই গ্রন্থে হামানকে বাবেলের (ইরাক) এক বাদশার সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এবং সে বনি ইসরাইলের অনেক ক্ষতি সাধন করে। অথচ এই ঘটনা সংঘটিত হয়েছে হজরত মুসা আলাইহিস সালামের ইনতেকালের প্রায় এগারোশ বছর পর। কিন্তু ফিরাউনকেন্দ্রিক বর্তমান সকল উদ্ভাবন ও আবিষ্কার কুরআনুল কারিমের বর্ণনাকেই বিশুদ্ধ সাব্যস্ত করছে। বিভিন্ন লিখিত বর্ণনা এবং হাইরোগ্লিফিক চিত্র অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পরিচয় তুলে ধরেছে। সেখানে দেখা গিয়েছে, প্রাচীন মিশরীয় লিপিগুলোতে হামানের নাম এসেছে। যে পাথরের ওপর তার নাম অঙ্কিত, সে পাথরটি বর্তমানে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অবস্থিত হফ (هوف) জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। এমনইভাবে তার নাম উল্লেখিত হয়েছে أسماء معجم Dictionary of personal name | الأشخاص في الإمبراطورية الجديدة of the New Empire সংকলন গ্রন্থে, যেটা লিখিত হয়েছে প্রাচীন মিশরের সকল পাথর ও ফলকে অঙ্কিত জ্ঞাত নামগুলোর ওপর ভিত্তি করে। সেখানে হামানের দায়িত্বের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, হামান পাথর তোলার স্থানে কর্মী পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। (২৮৮)
হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সময়ে মিশরের শাসনকর্তার উপাধি হিসেবে ‘মালিক’ শব্দ ব্যবহার করাটাও কুরআনুল কারিমের আরেক বিস্ময়কর ঐতিহাসিক বিবরণ। (২৮৯) আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَالَ الْمَلِكُ إِنِّي أَرَى سَبْعَ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ
বাদশা বলল, আমি দেখলাম সাতটি মোটাতাজা গাভি...। [সুরা ইউসুফ: ৪৩]
এই আয়াতে মিশরের বাদশাহকে ‘মালিক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ এই একই শাসকের ক্ষেত্রে তাওরাত ‘ফিরাউন’ উপাধি ব্যবহার করেছে। কিন্তু হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সময়ের শাসকের ক্ষেত্রে কুরআনুল কারিমে ‘ফিরাউন’ উপাধি ব্যবহার না করার কারণ হলো, সেই সময়ে (হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সময়ে) মিশরের শাসকের জন্য ‘ফারাউ’ (এটাই ছিল ‘ফিরআউন’ এর আসল উপাধি) উপাধি ব্যবহার করা হতো না। বরং তখনকার সম্রাট নিজেকে 'মালিক' (রাজকীয় প্রাসাদের মালিক) উপাধিতে পরিচয় প্রদান করতেন। আর মিশরের শাসকের জন্য 'ফিরাউন' উপাধি ব্যবহার শুরু হয় হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ইনতেকালের অন্তত দুইশ বছর পর থেকে। (২৯০)
এই হিসেবে মুসা আলাইহিস সালামের সময়ে মিশরের শাসকের উপাধি 'ফিরাউন' ব্যবহার করা হতো। এটাই সঠিক ব্যবহার। এভাবেই কুরআনুল কারিমের ঐতিহাসিক অলৌকিকতা প্রকাশিত হয়। বিষয়টা ছিল খুবই সূক্ষ্ম এবং একটি ঐতিহাসিক সত্যতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ কারণে কুরআনুল কারিম শুধু মুসা আলাইহিস সালামের সময়ের শাসকের ক্ষেত্রে 'ফিরাউন' উপাধি ব্যবহার করেছে, তার আগের শাসকের ক্ষেত্রে এই উপাধি ব্যবহার করেনি। অথচ তাওরাতে বাছবিচার ছাড়াই ব্যাপকভাবে ইবরাহিম, ইউসুফ ও মুসা আলাইহিমুস সালামের যুগের মিশরের সকল শাসকের ক্ষেত্রে 'ফিরাউন' উপাধি এসেছে। বাস্তবতা হলো, মিশরবাসী ইবরাহিম ও ইউসুফ আলাইহিমাস সালামের যুগের মিশরের শাসকদের ক্ষেত্রে 'ফিরাউন' উপাধি ব্যবহার করত না। (২৯১)
আমাদের এই আলোচনাটি ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি রহ.-এর একটি চমৎকার বর্ণনা দিয়ে সমাপ্ত করতে চাই। তিনি বলেন, এ সকল ঘটনা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের সত্যতার প্রমাণ বহন করে। কারণ, তিনি ছিলেন একজন উম্মি, কোনো কিতাব অধ্যয়ন করেননি এবং কোনো শিক্ষকের ছাত্রত্ব গ্রহণ করেননি। তাই তিনি যখন কোনো ধরনের বিকৃতি ও ভুল ছাড়া এই ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছেন, তাহলে বোঝা যায়, এগুলো তিনি কেবল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওহির মাধ্যমে অবগত হয়েছেন। আর এটাই তাঁর নবুয়তের সত্যতার অকাট্য প্রমাণ। (২৯২)
টিকাঃ
২৮৫. জালালুদ্দিন সুযুতি: আল-ইতকান ফি উলুমিল কুরআন: ২/৩২৩।
২৮৬. ইমাম গাজালি: নাজারাত ফিল কুরআন: ৯৫-৯৮।
২৮৭. (ইদিদের পবিত্র গ্রন্থসমূহ) (كُتُبُ الْيَهُودِ الْمُقَدَّسَةُ ١٧٦٠)
২৮৮. হারুন ইয়াহইয়া: আল-মুজিজাতুল কুরআনিয়্যা: ৭১, ৭২।
২৮৯. সুরা ইউসুফ: ৪৩, ৫০, ৫৪, ৭২।
২৯০. অথচ এদিকে 'বিট্রিশ এনসাইক্লোপিডিয়া' জানাচ্ছে, 'মালিক' শব্দটি ব্যবহার করা হতো সেই সকল যাযাবর গোত্রের লোকদের ক্ষেত্রে, যারা ১৬৪৮ থেকে ১৫৪০ খ্রিষ্টপূর্ব সময়ে অর্থাৎ ইউসুফ আলাইহিস সালামের মিশরে আগমনের সময়ে জোর করে মিশরে বসতি স্থাপন করেছিল।
২৯১. হারুন ইয়াহইয়া: আল-মুজিজাতুল কুরআনিয়্যা : ৭৪, ৭৫।
২৯২. ইমাম রাজি : মাফাতিহুল গাইব: ১৪/১১৯।
📄 ভবিষ্যৎ বর্ণনায় অলৌকিকতা
কুরআনুল কারিমের অলৌকিকতার উজ্জ্বলতম প্রমাণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তার ভবিষ্যদ্বাণী। অর্থাৎ কুরআনুল কারিম এমন কিছু বিষয়ে সংবাদ প্রদান করেছে, যা ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে এবং কুরআনুল কারিম যেভাবে যা সংঘটিত হওয়ার সংবাদ প্রদান করেছিল, তা সেভাবেই সংঘটিত হয়েছে, তার কোনো পরিবর্তন বা অন্যথা হয়নি। কোনো মানুষের জন্য কিছুতেই এটা সম্ভব না। অথচ কুরআনুল কারিমে এ ধরনের অনেক বিষয় রয়েছে। আমরা সেগুলোর মাত্র কয়েকটি এখানে উপস্থাপন করার ইচ্ছা রাখি, যাতে অন্যগুলোর সাথে এগুলোও প্রমাণ হিসেবে পরিগণিত হয়।
ভবিষ্যৎ বর্ণনার অলৌকিকতার উদাহরণ হিসেবে কুরআনুল কারিমের নিচের আয়াতগুলো উপস্থাপন করা যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿الم غُلِبَتِ الرُّوْمُ فِي أَدْنَى الْأَرْضِ وَهُمْ مِنْ بَعْدِ غَلَبِهِمْ سَيَغْلِبُونَ فِي بِضْعِ سِنِينَ لِلَّهِ الْأَمْرُ مِنْ قَبْلُ وَمِنْ بَعْدُ وَيَوْمَئِذٍ يَفْرَحُ الْمُؤْمِنُونَ ) بِنَصْرِ اللَّهِ يَنْصُرُ مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ﴾
১. আলিফ-লাম-মিম। ২-৩. রোমানরা নিকটবর্তী অঞ্চলে পরাজিত হয়েছে, কিন্তু তারা তাদের পরাজয়ের পর বিজয় অর্জন করবে। ৪. বছর কয়েকের মধ্যেই। সমস্ত ক্ষমতা আল্লাহরই, পূর্বেও এবং পরেও। সেদিন মুমিনগণ আনন্দিত হবে। ৫. আল্লাহপ্রদত্ত বিজয়ের কারণে। তিনি যাকে ইচ্ছা বিজয় দান করেন। তিনিই ক্ষমতার মালিক, পরম দয়ালুও বটে। [সুরা রুম : ১-৫]
মূল ঘটনা হলো, অগ্নিপূজক পারস্যজাতি আহলে কিতাব খ্রিষ্টান রোমানদের পরাজিত করে। তখন মক্কায় কাফেররা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথিদের এটা শুনিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে থাকে। বলতে থাকে, অগ্নিপূজক রোমানরা যেমন কিতাবধারী খ্রিষ্টানদের পরাজিত করেছে, আমরাও তেমন কিতাবধারী তোমাদের পরাজিত করব। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াতগুলো নাজিল করেন। এতে আরবদের চ্যালেঞ্জ প্রদান করা হয় এবং মুমিনদের সুসংবাদ প্রদান করা হয়। কারণ, এতে অন্তত কিতাবের প্রতি ঈমান স্থাপনকারী লোকদের বিজয় অর্জিত হবে। কিন্তু এখানে আমাদের আলোচনার আগ্রহের বিষয় হলো, কুরআনুল কারিম এখানে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। ওই সময়ের কেউ এটাকে পরিবর্তন করতে পারেনি কিংবা মিথ্যাপ্রতিপন্ন করতেও সক্ষম হয়নি। এটা অতি অবশ্যই কুরআনুল কারিমের একটি অলৌকিক ভবিষ্যদ্বাণী, যার মাধ্যমে কুরআন তার সকল বিরোধীকে এবং অস্বীকারকারীকে চ্যালেঞ্জ করেছে। অবশেষে আল্লাহ তাআলা যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সেটাই সংঘটিত হয়েছে, অর্থাৎ অবশেষে রোম পারস্যের ওপর বিজয়ী হয়। এদিকে আরবে তখন চলছিল বদরের যুদ্ধ, যেখানে মুমিনরাও মুশরিকদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়। (২৯৩)
কুরআনুল কারিমের যে আয়াতগুলো মক্কার দুর্বল মুসলমানদের ভবিষ্যদ্বাণীর মাধ্যমে সুসংবাদ প্রদান করেছিল, অচিরেই তারা তাদের শত্রুদের ওপর বিজয়ী হবে এবং তাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হবে, সে আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُوَلُّوْنَ الدُّبُرَ
(সত্য কথা এই যে,) এই দল অচিরেই পরাস্ত হবে এবং তারা পিছন ফিরে পালাবে। [সুরা কমার: ৪৫]
ইবনে কাছির রহ. তার তাফসিরগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এই আয়াত যখন নাজিল হলো, তখন হজরত উমর রা. বললেন, কোন দলটি পরাজিত হবে? আর কোন দলটি বিজয়ী হবে? এরপর যখন বদর যুদ্ধ সংঘটিত হলো, সেই সময়ের অবস্থা বর্ণনা করে হজরত উমর রা. বললেন, আমি দেখলাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ম পরে আছেন আর মুখে বলছেন,
سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُوَلُّونَ الدُّبُرَ এই দল অচিরেই পরাস্ত হবে এবং তারা পিছন ফিরে পালাবে।
উমর রা. বলেন, ওইদিন আমি এই আয়াতের ব্যাখ্যা বুঝতে পারলাম। (২৯৪)
ভবিষ্যদ্বাণীর অলৌকিকতার আরেকটি ঘটনা হলো, আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুমিনদের মাসজিদুল হারামে প্রবেশ এবং পবিত্র কাবার তাওয়াফ করার অগ্রিম সুসংবাদ প্রদান করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَقَدْ صَدَقَ اللهُ رَسُولَهُ الرُّؤْيَا بِالْحَقِّ لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ إِنْ شَاءَ اللهُ أَمِنِينَ مُحَلِّقِينَ رُءُوسَكُمْ وَمُقَصِّرِينَ لَا تَخَافُونَ فَعَلِمَ مَا لَمْ تَعْلَمُوا فَجَعَلَ مِنْ دُوْنِ ذَلِكَ فَتْحًا قَرِيبًا
বস্তুত আল্লাহ তাঁর রাসুলকে সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যা ছিল সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত। আল্লাহর ইচ্ছায় তোমরা অবশ্যই মাসজিদুল হারামে নিরাপদে প্রবেশ করবে, এমন অবস্থায় যে, তোমরা (কিছু সংখ্যক) মাথা কামানো থাকবে এবং (কিছু সংখ্যক) থাকবে চুল ছাঁটা। তোমাদের কোনো ভয় থাকবে না, আল্লাহ এমন সব বিষয় জানেন, যা তোমরা জানো না। সুতরাং সে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগে স্থির করে দিলেন এক আসন্ন বিজয়। [সুরা ফাতহ : ২৭]
হুদাইবিয়া থেকে ফেরার সময় এই আয়াত নাজিল হয়।
ইমাম ইবনে কাছির রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখানো হয়, তিনি মক্কায় প্রবেশ করেছেন, বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করছেন। পরে তিনি এই স্বপ্নের কথা মদিনায় সাহাবিদের বললেন। এরপর তারা যখন হুদাইবিয়ার বছরে মক্কার দিকে যাত্রা করলেন, তাদের সকলেই প্রবল ধারণা করল, এই বছরই সেই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হবে। এরপর হুদাইবিয়ায় যা ঘটার তা তো ঘটল। তাদের বাধা প্রদান করা হলো। সন্ধি সম্পাদিত হলো। এই বছর তাদের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়েই মদিনায় ফিরে আসতে হলো, এই শর্তে যে, আগামী বছর তারা আবার আসবে। অর্থাৎ তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। এ কারণে কিছু সাহাবির অন্তরে কিছু সংশয় সৃষ্টি হলো। এমনকি হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনি কি আমাদের সংবাদ প্রদান করেননি, আমরা বাইতুল্লাহ যাব এবং তাওয়াফ করব?'
উত্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই আমি তোমাকে সংবাদ দিয়েছি। কিন্তু কোন বছর আমরা আসব তা কি বলেছি?'
উমর রা. বললেন, 'না।' নবীজি বললেন, 'তুমি অবশ্যই সেখানে যাবে এবং তাওয়াফ করবে।'(২৯৫), (২৯৬)
এই প্রতিশ্রুতি পরের বছরই বাস্তবায়িত হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এবং তাঁর সকল সাহাবি ঠিক সেভাবেই ওমরা পালন করেন, যেভাবে আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। অর্থাৎ মাসজিদুল হারামে নিরাপদে তাওয়াফ করা, মাথা মুণ্ডানো, চুল ছাঁটা। আর এই ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল হিজরতের সপ্তম বছরে, জিলকদ মাসে। (২৯৭)
নিশ্চয় কুরআনুল কারিম যেভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে এবং সুসংবাদ প্রদান করেছে, কোনো ধরনের ব্যতিক্রম এবং সময়ের হেরফের না হয়ে মুসলমানদের জীবনে সেই বিষয়গুলো হুবহু সেভাবেই সংঘটিত হওয়া, স্পষ্টভাবে আল্লাহ তাআলার কথা এবং তাঁর রাসুলের নবুয়তের সত্যতার প্রমাণ বহন করে।
যেমন কুরআনুল কারিম মুসলমানদের পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং তাদের খিলাফত কায়েম করার ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنَا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَبِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ﴾
তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদের পৃথিবীতে নিজ খলিফা বানাবেন, যেমন খলিফা বানিয়েছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদের এবং তাদের জন্য তিনি সেই দ্বীনকে অবশ্যই প্রতিষ্ঠা দান করবেন, যে দ্বীনকে তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তারা যে ভয়-ভীতির মধ্যে আছে, তার পরিবর্তে তাদের অবশ্যই নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না। এরপরও যারা অকৃতজ্ঞতা করবে, তারাই অবাধ্য সাব্যস্ত হবে। [সুরা নুর: ৫৫]
পঁচিশ বছরেরও কম সময়ে মুসলমানদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে। চারপাশে তাদের একের পর এক বিজয় অর্জিত হয়েছে। সকলে তাদের আনীত মূল্যবোধ ও সভ্যতায় অবগাহন করেছে। তাদের খিলাফত বিস্তৃতি লাভ করেছে পূর্বে চীন এবং পশ্চিমে অতলান্তিক মহাসাগর পর্যন্ত। এমনকি উত্তরে ইউরোপ পর্যন্ত তাদের খিলাফত বিস্তৃতি লাভ করে।
এই হলো কুরআনুল কারিমের অসাধারণ অলৌকিকতার কিছু দিক। এগুলো এমনই অলৌকিক, যার অলৌকিকতা বা বিস্ময় কখনো শেষ হবার নয়। বারবার জানা ও চর্চার মাধ্যমেও যেগুলো কখনো জীর্ণ ও মলিন হবে না। এটি এমনই এক গ্রন্থ, যার কোনো প্রান্তেই কোনো ভুল-ভ্রান্তি-বিচ্যুতি বা ত্রুটি নেই। অবশ্যই এটি সর্বদিক দিয়ে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিরন্তন মুজিজা হওয়ার উপযুক্ত।
টিকাঃ
২৯৩. ওয়াহিদি: আসবাবুন নুজুল: ২৩১, ২৩২।
২৯৪. ইবনে কাছির: তাফসিরুল কুরআনিল আজিম : ৭/৪৮২।
২৯৫. সহিহ বুখারি: ২৭৩১, ২৭৩২।
২৯৬. ইবনে কাছির: তাফসিরুল কুরআনিল আজিম: ৭/৩৫৬।
২৯৭. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/২৭০।