📄 নবীজি ﷺ ও অসুস্থ-প্রতিবন্ধীদের অধিকার
অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি ইসলামের রয়েছে বিশেষ সহানুভূতি ও যত্নশীল মনোভাব। প্রথমত ইসলাম তাদের জন্য শরিয়তের অনেক বিধান সহজ ও শিথিল করে দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
لَيْسَ عَلَى الْأَعْمَىٰ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ (জিহাদ না করাতে) কোনো অন্ধের জন্য গুনাহ নেই, পায়ে সমস্যা আছে এমন ব্যক্তির জন্যও গুনাহ নেই। কোনো অসুস্থ ব্যক্তির জন্যও গুনাহ নেই। [সুরা নূর: ৬১]
আর চূড়ান্তভাবে ইসলামই তাদের অন্তরে আশা জাগিয়েছে এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক অধিকারগুলোর প্রতি যত্নশীল হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোনো অসুস্থ ব্যক্তির সংবাদ পেতেন, তখন নিজের বহু পেরেশানি ও কর্মব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও তাকে দেখার জন্য দ্রুত তার বাড়িতে ছুটে যেতেন। তাঁর এই অসুস্থকে দেখতে যাওয়ার মধ্যে কোনো লৌকিকতা বা বাধ্যবাধকতা ছিল না। বরং এটিকে তিনি নিজের স্বাভাবিক কর্তব্য বলে গণ্য করতেন। আর কেনই-বা করবেন না! তিনি তো সেই নবী, 'খোঁজখবর' নেওয়াকে যিনি অসুস্থ ব্যক্তির অধিকার হিসেবে গণ্য করেছেন। তিনি বলেছেন,
حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ خَمْسُ ؛ رَدُّ السَّلَامِ، وَعِيَادَةُ الْمَرِيضِ، وَاتَّبَاعُ الْجَنَائِزِ، وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ، وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ» এক মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিমের পাঁচটি অধিকার রয়েছে, যেমন সালামের উত্তর প্রদান করা, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজখবর নেওয়া, জানাজায় উপস্থিত হওয়া, দাওয়াত গ্রহণ করা এবং হাঁচির উত্তর প্রদান করা। (১৮৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা অসুস্থ ব্যক্তিকে তার রোগ ও দুর্ভোগ সহজ করে দেখাতেন। কোনোপ্রকার লৌকিকতা ছাড়া সমবেদনা ও সহানুভূতি প্রকাশ করতেন। তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। এগুলো সেই অসুস্থ ব্যক্তি এবং তার পরিবারকে স্বস্তি ও সুখ প্রদান করত। এ বিষয়ে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, সাদ ইবনে উবাদাহ রা. অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুর রহমান ইবনে আউফ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-কে সাথে নিয়ে সাদ ইবনে উবাদা রা.-কে দেখতে এলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঘরে প্রবেশ করে তাকে পরিবার-পরিজনবেষ্টিত দেখতে পেলেন। তারা সকলেই ছিল চিন্তিত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তাঁর কি মৃত্যু হয়ে গেছে?' তারা বললেন, 'না, ইয়া রাসুলাল্লাহ!' তখন নবীজির চোখে পানি চলে এলো। তাঁর কান্না দেখে উপস্থিত লোকেরাও কাঁদতে শুরু করল। তখন তিনি বললেন, 'শুনে রাখো! নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা চোখের পানি এবং অন্তরের শোক-ব্যথার কারণে আজাব দেন না। তিনি আজাব দেন এটার কারণে (এই বলে তিনি জিহ্বার দিকে ইশারা করলেন), অথবা এটার কারণেই তিনি রহম করেন।'(১৮৮)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ ব্যক্তির জন্য দোয়া করতেন এবং তার ওপর আপতিত অসুস্থতার পরিণামে তাকে সওয়াব ও প্রতিদানের সুসংবাদ শোনাতেন। এভাবে তিনি বিষয়টিকে সহজ করে দেখাতেন এবং এই অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট করে তুলতেন। পরিণামে অসুস্থ ব্যক্তির মনেও শান্তি ও স্বস্তি ফিরে আসত। যেমন উম্মে আলা রা.(১৮৯) বর্ণনা করে বলেন, একবার আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখতে এসে বললেন, 'হে উম্মে আলা, তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা, মুসলমানদের অসুখের মাধ্যমে আল্লাহ এমনভাবে তাদের গুনাহ দূর করে দেন, যেমনভাবে আগুন সোনা-রুপার খাদ দূর করে দেয়। (১৯০)
অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শরিয়তের অনেক বিষয়ে সহজ পথ বলে দিতেন, তাদের প্রতি কখনোই কঠোরতা আরোপ করতেন না। এ বিষয়ে হজরত জাবের রা. থেকে একটি বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা একবার একটি সফরে বের হলাম। পথিমধ্যে আমাদের একজন পাথরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এতে তার মাথা ফেটে যায়। পরে এ অবস্থায় তার স্বপ্নদোষ হয়। তিনি তার সাথিদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমার কি এখন তায়াম্মুমের সুযোগ আছে?' সাথিরা বললেন, 'যেহেতু তুমি পানি ব্যবহার করতে সক্ষম তাই তোমার তায়াম্মুমের সুযোগ নেই।'
এ কথা শুনে সে গোসল করল এবং মৃত্যুবরণ করল। সফর থেকে ফেরার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই সংবাদ দেওয়া হলো। নবীজি তখন বললেন, 'তার সাথিরা তাকে হত্যা করেছে। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন! যেহেতু বিষয়টা তারা অবগত ছিল না, তাহলে কেন তারা জিজ্ঞাসা করে নিলো না? নিশ্চয় অজ্ঞতার সমাধান হলো জিজ্ঞাসা করা। সে ব্যক্তি তায়াম্মুম করে তার আহত স্থানে পট্টি বেঁধে তার ওপর মাসেহ করে নিত এবং শরীরের অন্য স্থানগুলো ধুয়ে ফেললেই হতো।' (১৯১)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ ব্যক্তির প্রয়োজনে তার ডাকে সাড়া দিতেন এবং তার প্রয়োজন পূরণ করার লক্ষ্যে তার সাথে সাথে চলতেন। একবার তাঁর কাছে এক মহিলা এলো, যার মস্তিষ্কে কিছুটা সমস্যা ছিল। সে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনার কাছে আমার একটা প্রয়োজন আছে।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে অমুক! তোমার ইচ্ছামতো যেকোনো রাস্তায় তুমি অপেক্ষা করো, যাতে আমি তোমার প্রয়োজন পূরণ করতে পারি।' এরপর তিনি কোনো এক রাস্তায় মহিলাটিকে একাকী সময় দিলেন(১৯২) এবং মহিলাটি তার প্রয়োজন পূরণ করল। (১৯৩)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চিকিৎসা গ্রহণ করাকে তার মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য করেছেন। কেননা ইসলামের অন্যতম উদ্দেশ্যে হলো, একজন মানুষ শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই যেন সুস্থ ও সবল থাকে। একবার কিছু বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিকিৎসা গ্রহণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
تَدَاوَوْا عِبَادَ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ سُبْحَانَهُ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ مَعَهُ شِفَاءً إِلَّا الْهَرَمَ»
হে আল্লাহর বান্দারা, তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা আল্লাহ তাআলা যত রোগ সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে বার্ধক্য ছাড়া সকল রোগেরই ওষুধ সৃষ্টি করেছেন। (১৯৪)
একইভাবে প্রয়োজনের সময় কোনো মুসলিম মহিলাকে কোনো মুসলিম পুরুষের চিকিৎসা করতেও নিষেধ করেননি। যেমন খন্দকের যুদ্ধে যখন সাদ ইবনে মুআজ রা. তিরবিদ্ধ হন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুফায়দা নামের আসলাম গোত্রের এক মহিলাকে সাদ ইবনে মুআজ রা.-এর চিকিৎসায় নিযুক্ত করেন। মহিলাটি আহতদের চিকিৎসা করতেন এবং এই দুর্বল-আহত মুসলমানদের চিকিৎসা করাকে নিজের জন্য সওয়াব বলে গণ্য করতেন। (১৯৫)
আমর ইবনে জামুহ রা.-এর সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত চমৎকার সহানুভূতির আচরণই না করেছেন! আমর ইবনে জামুহ রা. ছিলেন শারীরিক প্রতিবন্ধী। কিন্তু তার ছিল উচ্চ মনোবল এবং নিজেকে আল্লাহর রাস্তায় সঁপে দেওয়ার অনন্য আকাঙ্ক্ষা। এ কারণে শারীরিক ত্রুটি তার সুউচ্চ মর্যাদাপাপ্তির ক্ষেত্রে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তার পা ছিল খোঁড়া। তবে তার ছিল সিংহের মতো সাহসী চারজন পুত্র। সকল যুদ্ধেই তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে উপস্থিত থাকতেন। উহুদ যুদ্ধের সময় তারা তাদের পিতাকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে চাইলেন। ছেলেদের কথা শুনে তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে অনুযোগ করে বললেন, 'আমার ছেলেরা খোঁড়া হওয়ার কারণে আমাকে আপনার সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করছে। আল্লাহর কসম! আমার আকাঙ্ক্ষা, আমি এই খোঁড়া পা নিয়েই (শহিদ হয়ে) জান্নাতের ভূমিতে বিচরণ করব।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে বললেন, 'আল্লাহ তাআলা তোমাকে অপারগ করেছেন। সুতরাং তোমার ওপর এখন জিহাদ আবশ্যক নয়।'
এরপর তিনি তার ছেলেদেরকে বললেন, 'তোমাদের জন্যও তাকে বাধা দেওয়া উচিত নয়। হতে পারে আল্লাহ তাআলা তাকে শাহাদাত নসিব করবেন।'
অবশেষে আমর ইবনে জামুহ রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে পড়েন এবং উহুদের ময়দানে শাহাদাতের সৌভাগ্য অর্জন করেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপারে বললেন, 'আল্লাহর এমন কিছু বান্দা আছে, যারা আল্লাহর নামে কসম করলে আল্লাহ তাআলা তাদের কসমকে পূর্ণ করেন। তাদের মধ্যে আমর ইবনে জামুহ অন্যতম। আমি দেখেছি সে জান্নাতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে।'(১৯৬)
অসুস্থ ব্যক্তিদের সাথে অমায়িক আচরণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সকল মুসলমানের জন্য উত্তম আদর্শ ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। এজন্য হজরত উসমান ইবনে আফফান রা. বলেন, আল্লাহর কসম! আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মুকিম ও মুসাফির হয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছি। তিনি অসুস্থকে দেখতে যেতেন। জানাজায় অংশগ্রহণ করতেন। আমাদের সাথেই যুদ্ধে অংশ নিতেন। অল্প বা বেশি-সকল দুঃখ-কষ্টের সময় তিনি আমাদেরকে আন্তরিক সান্ত্বনা দিতেন। (১৯৭)
টিকাঃ
১৮৭. সহিহ বুখারি: ১২৪০, সহিহ মুসলিম: ২১৬২।
১৮৮. সহিহ বুখারি: ১৩০৪, সহিহ মুসলিম: ৯২৪।
১৮৯. উম্মুল আলা: তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ইসলামগ্রহণ করেন এবং বায়াত হন। পুরো পরিচয়: উম্মে খারিজা বিনতে যায়েদ বিন ছাবেত রা.। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন ইবনুল আছির: উসদুল গাবাহ ৬/৩৮২, ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা: জীবনী নং: ১২১৬৮।
১৯০. সুনানে আবু দাউদ: ৩০৯২।
১৯১. সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৬, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৫৭২, মুসনাদে আহমাদ: ৩০৫৭।
১৯২. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাটির সাথে মানুষ চলাচলের রাস্তায় কথা বলেছিলেন। কিন্তু অন্যদের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে। যাতে সেই মহিলা নিঃসংকোচে তার কথা বলতে পারে। সুতরাং এটা গায়রে মাহরাম মহিলার সাথে একাকী ও নির্জন হওয়া ছিল না। বরং দূর থেকে সকল মানুষই তাদের দেখছিল। কিন্তু তাদের কথা শুনতে পাচ্ছিল না। কারণ, মহিলার কথাটি ছিল এমন, যা সে প্রকাশ্যে বলতে চায় না। দ্রষ্টব্য: ইমাম নববি রহ. রচিত মিনহাজ: ১৫/৮৩
১৯৩. সহিহ মুসলিম: ২৩২৬, মুসনাদে আহমাদ: ১৪০৭৮, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৫২৭
১৯৪. সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫৫, সুনানে তিরমিজি: ২০৩৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৪৩৬, মুসনাদে আহমাদ: ১৮৩৭৭।
১৯৫. ইমাম বুখারি: আল-আদাবুল মুফরাদ: ১/৩৮৫, ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/২৩৯, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/২৩৩।
১৯৬. সহিহ ইবনে হিব্বান: ৭০২৪, ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়নুল আছার: ১/৪২৩, সালেহি শামি: সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ ফি সিরাতে খাইরিল ইবাদ: ৪/২১৪।
১৯৭. মুসনাদে আহমাদ: ৫০৪।
📄 নবীজি ﷺ ও এতিম-মিসকিন-বিধবাদের অধিকার
ইসলামি শরিয়তের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এতিম-মিসকিন ও বিধবাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা। মুসলিম সমাজের নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানে ইসলাম তাদের মানসিক ও জাগতিক উভয় প্রকার সহযোগিতা-সংহতির সুব্যবস্থা করেছে। এই প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তাআলা এতিমদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের জন্য আমাদের আদেশ করেছেন। তিনি বলেছেন,
فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ
যে এতিম, তুমি তার প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করো না। [সুরা দুহা: ৯] একইভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে মিসকিনের জন্য নির্ধারিত যে অধিকার রয়েছে, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সে অধিকারসমূহ প্রদান করার আদেশ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন,
وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا
আত্মীয়স্বজনকে তাদের হক দিয়ে দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও (তাদের হক প্রদান করো)। আর নিজেদের অর্থসম্পদ অপ্রয়োজনীয় কাজে খরচ করবে না। [সুরা বনি ইসরাইল: ২৬]
মিসকিন ও বিধবাদের প্রয়োজন পূরণ করার প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেছেন। যেমন তিনি বলেন,
«السَّاعِي عَلَى الْأَرْمَلَةِ وَالْمِسْكِينِ كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ الْقَائِمِ اللَّيْلَ الصَّائِمِ النَّهَارَ
বিধবা ও মিসকিনদের (প্রয়োজন পূরণে) সচেষ্ট ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধরত মুজাহিদের ন্যায় অথবা রাত জেগে ইবাদতকারী ও দিনভর সিয়াম পালনকারীর ন্যায়। (১৯৮)
হাদিসটির মাধ্যমে মিসকিন ও বিধবাদের সহযোগিতাকারীদের মর্যাদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতটাই বৃদ্ধি করেছেন, যার কল্পনাও কেউ কখনো করতে পারে না! সওয়াব ও প্রতিদানের দিক দিয়ে এরচেয়ে বড় কিছু হতে পারে না!
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতিমদের লালনপালন এবং তাদের যত্ন নেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। এর জন্য অনেক সওয়াব ও প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'আমি ও এতিমের ভরণপোষণকারী ব্যক্তি জান্নাতে এভাবে (পাশাপাশি) থাকব।' এ কথা বলার সময় তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল মিলিয়ে ইশারা করে দেখান। (১৯৯)
বলা যায়, এতিমের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়া ও সহানুভূতি এতটা বেশি ছিল যে, তিনি উম্মতকে নিজেদের সন্তানের সাথে একজন করে এতিমের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি নিজের সন্তানের মাঝে একজন এতিমকে তার খাদ্য-খাবারে এমনভাবে মিলিয়ে নেয় যে, তার সকল প্রয়োজন পূরণ হয়ে যায়, তাহলে তার জন্য জান্নাত আবশ্যক হয়ে যায়।' (২০০)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান আদর্শ হলো, একজন এতিম, মিসকিন ও বিধবাকে এভাবে বিবেচনা করা যাবে না যে, তারা শুধু পার্থিব জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুর মুখাপেক্ষী এবং এগুলো প্রদান করলেই তাদের অধিকার আদায় হয়ে যাবে। বরং তাদের ক্ষেত্রে বিবেচনা করতে হবে, তারা আমাদের মতোই মানুষ, তাদেরও সবকিছু পাওয়ার অধিকার রয়েছে, অথচ তারা সবরকম স্নেহ, মায়া ও মমতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু এতিমদের লালনপালন ও যত্নের প্রতি সাধারণ উৎসাহ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি আরও বিভিন্ন পদ্ধতিতে বিষয়গুলোর প্রতি চূড়ান্তরকম উৎসাহিত করেছেন। যেমন একবার এক ব্যক্তি নবীজির নিকট এসে নিজের অন্তরের কঠোরতার অভিযোগ করল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'তুমি কি চাও তোমার অন্তর নরম হোক এবং তোমার মনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হোক? তাহলে তুমি এতিমের প্রতি দয়া করো। তার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দাও। তোমার খাবারে তাকে শরিক করো। এতে তোমার অন্তর নরম হবে এবং তোমার মনের আশা পূরণ হবে।' (২০১)
অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতিমদের প্রতি জুলুম না করতে এবং অন্যায়ভাবে তাদের অধিকার খর্ব না করতে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, 'সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে: ... (তন্মধ্যে একটি হলো) এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা।' (২০২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদেরকে এতিম ও মিসকিনদের জন্য খরচ করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, وَإِنَّ هَذَا الْمَالَ خَضِرَةٌ حُلْوَةٌ، فَنِعْمَ صَاحِبُ الْمُسْلِمِ مَا أَعْطَى مِنْهُ الْمِسْكِينَ وَالْيَتِيمَ وَابْنَ السَّبِيلِ»
নিশ্চয় এই সম্পদ হলো সতেজ, আকর্ষণীয় ও মিষ্ট বস্তু। তবে সে কতই-না ভাগ্যবান মুসলিম, যে এই সম্পদ থেকে মিসকিন, এতিম ও মুসাফিরকে দান করে। (২০৩)
আমরা দেখি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ওলিমার ব্যাপারে নিন্দা করেছেন, যেখানে শুধু ধনীদেরই দাওয়াত করা হয় এবং ফকির, মিসকিন, এতিম ও অসহায়দের বঞ্চিত রাখা হয়। তিনি বলেছেন, 'যে ওলিমায় (বিবাহ উপলক্ষ্যে বরের পক্ষ থেকে খাদ্যের আয়োজন) শুধু ধনীদের দাওয়াত করা হয় এবং গরিবদের দাওয়াত করা হয় না, সেই ওলিমা কতই-না নিকৃষ্ট। আর যে ব্যক্তি দাওয়াত কবুল করে না, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে নাফরমানি করে।' (২০৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে শুধু উৎসাহ দিয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং তিনি নিজেও এতিম, মিসকিন ও অসহায়দের অভিভাবকত্ব ও দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করেছেন এবং একজন যোগ্য রাষ্ট্রনায়কের মতো তিনি ঘোষণা করেছেন, 'আল্লাহর বিধানানুসারে সকল মানুষের চেয়ে আমিই মুমিনদের অধিক নিকটতর। এতএব, তোমাদের কোনো ব্যক্তি যদি কোনো ঋণ কিংবা এতিম সন্তান রেখে যায়, তাহলে তোমরা (সেই বিষয়ে) আমাকে আহ্বান করবে। আমিই হব তার অভিভাবক।' (২০৫)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে যা বলতেন, অন্য মানুষদের চেয়ে সর্বাগ্রে এবং অতি দ্রুত তিনিই তা আগে বাস্তবায়ন করে দেখাতেন। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে আবু আউফা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিধবা ও গরিবদের সাথে চলাফেরায় কোনো সংকোচবোধ করতেন না। এতে তিনি কোনো অসম্মানবোধ করতেন না। তিনি তাদের প্রয়োজন পূরণ করতেন। (২০৬)
এভাবেই ইসলাম এতিম, মিসকিন ও বিধবাদের সাথে সহানুভূতিশীল আচরণের কিছু মূলনীতি স্থাপন করেছে। এইসব মূলনীতি বাস্তবায়নে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সমুজ্জ্বল উদাহরণ। এ ক্ষেত্রে তিনিই হলেন অনুসরণীয় আদর্শ ও উত্তম দৃষ্টান্ত। জগতে তাঁর চেয়ে মহান আর কোনো আদর্শ নেই!
টিকাঃ
১৯৮. সহিহ বুখারি: ৬০০৬, সহিহ মুসলিম: ২৯৮৩。
১৯৯. সহিহ বুখারি: ৫৩৫৩, সহিহ মুসলিম: ২৯৮২।
২০০. মুসনাদে আহমাদ: ১৯০৪৭, ইমাম বুখারি: আল-আদাবুল মুফরাদ: ৭৮, ইমাম তাবারানি : মুজামুল কাবির: ৬৭০।
২০১. মুসনাদে আহমাদ: ৭৫৬৬, ইমাম বাইহাকি: আস-সুনানুল কুবরা: ৬৮৮৬।
২০২. সহিহ বুখারি: ২৭৬৬, সহিহ মুসলিম: ৮৯।
২০৩. সহিহ বুখারি: ১৪৬৫, সুনানে নাসায়ি: ২৫৮১, মুসনাদে আহমাদ: ১১১৭৩।
২০৪. সহিহ বুখারি: ৫১৭৭, সহিহ মুসলিম: ১৪৩২, সুনানে আবু দাউদ: ৩৭৪২, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯১৩।
২০৫. সহিহ বুখারি: ২২৯৭, সহিহ মুসলিম: ১৬১৯, মুসনাদে আহমাদ: ৭৮৩৯।
২০৬. সুনানে নাসায়ি: ১৪১৪, সুনানে দারেমি: ৭৪, সহিহ ইবনে হিব্বان: ৬৪২৩।
📄 নবীজি ﷺ ও প্রাণী অধিকার
জীবজন্তুর প্রতি ইসলামের রয়েছে একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি। এর অনেক গুরুত্ব রয়েছে, কারণ পার্থিব জীবনে, মানুষের বহুবিধ কল্যাণ অর্জনে, পৃথিবীর নির্মাণ এবং তার স্থায়িত্বে এগুলোর ব্যাপক ভূমিকা স্বীকৃত। এই সীমাহীন গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে আমরা দেখতে পাই, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে জীবজন্তুর নামে অনেকগুলো সুরার নামকরণ করেছেন। যেমন সুরা বাকারা (গরু), সুরা আনআম (চতুষ্পদ প্রাণী), সুরা নাহল (মৌমাছি), সুরা আনকাবুত (মাকড়সা), সুরা ফিল (হাতি), সুরা নামল (পিঁপড়া) ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالأَنْعَامَ خَلَقَهَا لَكُمْ فِيهَا دِفْءٌ وَمَنَافِعُ وَمِنْهَا تَأْكُلُونَ وَلَكُمْ فِيهَا جَمَالٌ حِينَ تُرِيحُونَ وَحِينَ تَسْرَحُوْنَ وَتَحْمِلُ أَثْقَالَكُمْ إِلَى بَلَدٍ لَّمْ تَكُونُوا بَالِغِيْهِ إِلَّا بِشِقِّ الْأَنْفُسِ إِنَّ رَبَّكُمْ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ
তিনিই চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য শীত থেকে বাঁচার উপকরণ এবং তা ছাড়া আরও বহু উপকার এবং তা থেকেই তোমরা ভক্ষণ করো। তোমরা সন্ধ্যাকালে যখন সেগুলোকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনো এবং ভোরবেলা যখন সেগুলোকে চারণভূমিতে নিয়ে যাও, তখন তার ভেতর তোমাদের জন্য দৃষ্টিনন্দন শোভাও রয়েছে। এবং তারা তোমাদের ভার বয়ে নিয়ে যায় এমন নগরে, যেখানে প্রাণান্তকর কষ্ট ছাড়া তোমরা পৌঁছতে পারতে না। প্রকৃতপক্ষে তোমাদের প্রতিপালক অতি মমতাময়, পরম দয়ালু। [সুরা নাহল: ৫-৭]
প্রাণী বা জীবজন্তুর অধিকারসমূহের মধ্যে অত্যন্ত বড় এক হলো, তাদেরকে কষ্ট না দেওয়া। হজরত জাবের রা. বর্ণনা করে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার একটি গাধার সামনে দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। গাধাটির মুখের ওপর আঘাতের দাগ ছিল। এটা দেখে তিনি বললেন, 'যে ব্যক্তি এটাকে দাগ দিয়েছে, আল্লাহ তাকে অভিশপ্ত করুন।' (২০৭)
হযরত জাবের রা. অন্য আরেকটি বর্ণনায় বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (প্রাণীদের) মুখের ওপর মারতে ও দাগ দিতে নিষেধ করেছেন। (২০৮)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, যে ব্যক্তি পশুর অঙ্গবিকৃতি ঘটায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ওপর অভিসম্পাত করেছেন। (২০৯)
অর্থাৎ এভাবে জীবজন্তুকে কষ্ট দেওয়া, সেগুলোকে অনর্থক আঘাত করা এবং সেগুলোর প্রতি নির্মম আচরণ করা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে একটি বড় রকমের অপরাধ।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবজন্তুর অধিকার প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে জীবজন্তুকে আটক করে ক্ষুধার্ত রাখা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, 'এক মহিলাকে একটি বিড়ালের কারণে আজাব দেওয়া হয়। সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল। অবশেষে বিড়ালটি ক্ষুধার কারণে মারা যায়। সে তাকে খাদ্য-পানিও দেয়নি আবার ছেড়েও দেয়নি, যাতে সে জমিনের পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে।' (২১০)
হযরত সাহল ইবনে হানজালিয়া রা. বর্ণনা করে বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একটি উটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, অনাহারে যার পেট ও পিঠ প্রায় একত্র হয়ে গিয়েছিল। তা দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা এ বোবা পশুদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সেবাযত্নের মাধ্যমে এগুলোতে আরোহণ করো এবং সেবাযত্নের পরই এদের ভক্ষণ করো।' (২১১)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও আদেশ করেছেন, যে পশুকে আল্লাহ তাআলা মানুষের যে ধরনের উপকারের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তার থেকে শুধু সেই ধরনের উপকার গ্রহণ করবে। তিনি প্রাণী ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্যও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'তোমরা তোমাদের ভারবাহী পশুর পিঠে মিম্বার বানিয়ে বসে থাকা পরিত্যাগ করবে (অর্থাৎ বিনা প্রয়োজনে এর পিঠে বসে থাকবে না)। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা প্রাণান্তকর কষ্ট ব্যতীত যেখানে পৌঁছতে পারতে না, সেখানে তারা তোমাদের সহজে পৌঁছে দিতে পারে。(২১২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পশুকে তির (বা এ-জাতীয় কিছু) নিক্ষেপের 'লক্ষ্য' নির্ধারণ করতে নিষেধ করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. একবার কিছু যুবকের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন, তারা একটি পাখি বেঁধে তার দিকে তির ছুড়ছে। তখন তিনি তাদেরকে বললেন, 'এ ধরনের কাজ যে করে, আল্লাহ তার ওপর লানত করেন। প্রাণবিশিষ্ট কোনো জিনিসকে যে তির নিক্ষেপের লক্ষ্য বানায়, তার ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিশাপ দিয়েছেন。(২১৩)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবজন্তুর আরেকটি অধিকার নির্ধারণ করেছেন। তা হলো, তাদের প্রতি দয়া ও সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ করা। এ কথার সমর্থন পাওয়া যাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতে। তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। এ সময় তার তীব্র পিপাসা লাগে এবং সম্মুখেই সে একটি কূপ দেখতে পায়। লোকটি তাতে নেমে পানি পান করে। তারপর উঠে এসে সে দেখতে পায় পাশেই একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে। পিপাসায় কাতর হয়ে জিহ্বা বের করে কাদা চাটছে। লোকটি ভাবে, নিশ্চয় এই কুকুরটি পিপাসায় তেমনই কষ্ট পাচ্ছে, যেমন কষ্ট আমার হয়েছিল। তখন সে আবার কূপে নেমে তার মোজার মধ্যে পানি ভরে। তারপর মুখ দিয়ে (কামড় দিয়ে) ধরে উপরে উঠে আসে। এভাবে সে কুকুরটিকে পানি পান করায়। আল্লাহ এতে খুশি হন এবং তাকে মাফ করে দেন।'
সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, জীবজন্তুর প্রতি সদাচরণেও কি আমাদের জন্য পুরস্কার রয়েছে?' উত্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
فِي كُلِّ ذَاتِ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرُ»
হ্যাঁ, প্রতিটি আর্দ্র হৃদয়ের (প্রাণবিশিষ্ট) অধিকারীর ক্ষেত্রেই পুরস্কার রয়েছে। (২১8)
জীবজন্তুর প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছিল পরম দয়া ও সহানুভূতি। তাঁর এই দয়া ও সহানুভূতির প্রকাশ ঘটে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর একটি বর্ণনায়। তিনি বলেন, আমরা একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সফরে ছিলাম। তিনি একসময় নিজের প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য একটু নির্জনে চলে গেলেন। এদিকে আমরা একটি ছোট পাখি দেখতে পেলাম। তার সঙ্গে ছিল দুটি বাচ্চা। আমরা বাচ্চা দুটিকে ধরে নিয়ে এলাম। তখন মা পাখিটি আমাদের কাছে এসে ডানা ঝাপটাতে লাগল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এসে এই অবস্থা দেখে বললেন, 'বাচ্চা ধরে রেখে কে এই পাখিটিকে কষ্ট দিয়েছে? তোমরা তার বাচ্চা তার কাছে ফিরিয়ে দাও।'(২১৫)
এমনইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে আদেশ করেছেন, আমরা যেন জীবজন্তুর জন্য শস্যশ্যামল চারণভূমি নির্বাচন করি। যদি এমন জায়গা না পাওয়া যায়, তবে এইসব পশুর মালিকদের উচিত হবে পশুকে ভিন্ন কোনো স্থানে নিয়ে যাওয়া, যেখানে তাদের জন্য ভালো খাদ্য পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা কোমল। তিনি কোমলতা পছন্দ করেন। কোমলতায় সন্তুষ্ট হন। তিনি কোমলতার জন্য যেভাবে সাহায্য করেন, কঠোরতার ক্ষেত্রে তা করেন না। তাই তোমরা যখন এই বাক্শক্তিহীন পশুর ওপর আরোহণ করো, তখন তাকে তার উপযুক্ত স্থানে চরাও (যেখানে পর্যাপ্ত ঘাস ও লতাপাতা আছে)। যেখানে বিশ্রাম করবে, সেখানকার জায়গা যদি অনুর্বর হয়, ঘাস না থাকে, তবে দ্রুত সেখান থেকে বের করে নিয়ে যাও。(২১৬)
এ ছাড়া জীবজন্তুর প্রতি স্বাভাবিক সহানুভূতি ও ভালোবাসার চেয়েও আরও মূল্যবান ও উচ্চ একটি অনুভূতির বিষয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য আবশ্যক করেছেন আর তা হলো, জীবজন্তুর প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন করা এবং তাদের অনুভূতির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। এ ক্ষেত্রেও সবচেয়ে সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কারণ, গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রাণী জবাই করা হলেও, সেটিকে তিনি কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন, চাই সেটা ভুলভাবে জবাই কিংবা জবাইয়ের অস্ত্রের ধারহীনতার কারণে শারীরিক কষ্ট হোক অথবা ছুরি প্রদর্শনের মাধ্যমে মানসিক কষ্ট। এগুলোর মাধ্যমে তাকে একাধিক মৃত্যুর কষ্ট প্রদান করা হয়। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রাণীকে কষ্ট দিয়ে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। এ বিষয়ে শাদ্দাদ ইবনে আউস রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে দুটি কথা আত্মস্থ করে রেখেছি। সেই দুটি কথা হলো, 'আল্লাহ তাআলা প্রতিটি জিনিসের সাথে কোমল আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন, অতএব যখনই তোমরা হত্যা করবে (কিসাসস্বরূপ) তখন হত্যার মধ্যে সহজ পদ্ধতি অবলম্বন করো। আর যখন (জীবজন্তুকে) জবাই করবে, তখন সহজভাবে জবাই করবে এবং ছুরি, তরবারি ইত্যাদি ভালোভাবে ধার করে নেবে; যাতে জাবাইযোগ্য প্রাণীটিকে সহজেই জবাই করা যায়。(২১৭)
এ বিষয়ে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকেও একটি বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি জবাই করার উদ্দেশ্যে তার পশুকে আগে শুইয়ে দিলো, এরপর সে তার ছুরি ধার দিতে শুরু করল। এই দৃশ্য দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি কি তাকে একাধিক মৃত্যু দিতে চাও? তাকে শুইয়ে দেওয়ার পূর্বেই কেন তুমি তোমার ছুরি ধার দিয়ে নিলে না?'(২১৮)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল কথা ও কাজের বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সুন্দর পরিবেশে জীবজন্তুর অধিকারগুলো সংরক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। তাদেরকে শান্তি, নিরাপত্তা ও পরিতৃপ্তির উপভোগ্যতা প্রদান করা হয়েছে।
টিকাঃ
২০৭. সহিহ মুসলিম: ২১১৭।
২০৮. সহিহ মুসলিম: ২১১৬, সহিহ ইবনে খুজাইমা: ২৩৪৯।
২০৯. সহিহ বুখারি: ৫৫১৩, সুনানে নাসায়ি: ৪৪৪২, সুনানে দারেমি: ১৯৭৩।
২১০. সহিহ বুখারি: ২৩৬৫, সহিহ মুসলিম: ২২৪২, সুনানে দারেমি: ২৮১৪।
২১১. সুনানে আবু দাউদ: ২৫৪৮, মুসনাদে আহমাদ: ১৭৬৬২, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৪৬।
২১২. সুনানে আবু দাউদ: ২৫৬৭, ইমাম বাইহাকি: আস-সুনানুল কুবরা: ১০১১৫।
২১৩. সহিহ বুখারি: ৫৫১৫, সহিহ মুসলিম: ১৯৫৮, সুনানে নাসায়ি: ৪৪৪১, মুসনাদে আহমাদ: ১৪০১৪।
২১৪. সহিহ বুখারি: ৫৬৬৩, সহিহ মুসলিম: ২২৪৪।
২১৫. সুনানে আবু দাউদ: ৫২৬৮, মুসতাদরাকে হাকেম: ৭৫৯৯।
২১৬. মুয়াত্তা মালেক: ১৭৬৭।
২১৭. সহিহ মুসলিম: ১৯৫৫, সুনানে আবু দাউদ: ২৮১৫, সুনানে তিরমিজি: ১৪০৯।
২১৮. মুসতাদরাকে হাকেম: ৭৫৬৩。
📄 নবীজি ﷺ ও পরিবেশ অধিকার
আল্লাহ তাআলা জগতের প্রকৃতি ও পরিবেশকে স্বচ্ছ, সুন্দর, নির্মল ও উপকারী করে সৃষ্টি করেছেন। এরপর এটিকে তিনি মানুষের অধীন করেছেন এবং মানুষকে আদেশ করেছেন, সে যেন এই প্রকৃতি ও পরিবেশের উপযোগিতা সংরক্ষণ করে। একইভাবে আল্লাহ তাআলা তাকে এই নির্দেশও করেছেন যে, সে যেন আল্লাহ তাআলার সৃষ্ট জাগতিক এইসব সুন্দর ও মনোরম নিদর্শনাবলি নিয়ে চিন্তাভাবনা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿أَفَلَمْ يَنْظُرُوا إِلَى السَّمَاءِ فَوْقَهُمْ كَيْفَ بَنَيْنَاهَا وَزَيَّنَّاهَا وَمَا لَهَا مِنْ فُرُوجِ وَالْأَرْضَ مَدَدْنَاهَا وَأَلْقَيْنَا فِيهَا رَوَاسِيَ وَأَنْبَتْنَا فِيهَا مِنْ كُلِّ زَوْجٍ بَهِيجٍ﴾
তবে কি তারা তাদের ওপর দিকে আকাশমণ্ডলী দেখেনি যে, আমি তাকে কীভাবে নির্মাণ করেছি? আমি তাকে শোভা দান করেছি এবং তাতে কোনো রকমের ফাটল নেই। আর ভূমিকে আমি বিস্তার করে দিয়েছি, তাতে স্থাপিত করেছি পর্বতমালার নোঙর। আর তাতে সবরকম নয়নাভিরাম বস্তু উদ্গত করেছি। [সুরা কাফ: ৬-৭]
মানুষকে পরিবেষ্টন করে রাখা জগতের এই নির্মল পরিবেশ ও প্রকৃতি প্রাণহীন ও প্রাণসম্পন্ন সবকিছুর সাথেই মানুষের একটি বন্ধন ও ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি করে দিয়েছে। সুতরাং এখন মানুষের জন্য আবশ্যক হলো, জগতের এই প্রকৃতি ও পরিবেশের নির্মলতা বজায় রাখা। কেননা এর মধ্যেই যেমন রয়েছে মানুষের পার্থিব জীবনের অবস্থান, সুস্থতা ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার উপকরণ; আবার আখিরাতের জীবনেও তার জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে অফুরন্ত পুরস্কার ও প্রতিদান।
জগৎ বিষয়ে কুরআনুল কারিমের এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছেন। কেননা, মানুষ ও প্রকৃতির মাঝে পারস্পরিক অবিচ্ছেদ্য একটি সম্পর্ক বিদ্যমান। প্রকৃতির স্বচ্ছতা ও নির্মলতার ওপর নির্ভর করে মানুষের পার্থিব জীবন এবং তার স্থায়িত্ব। সেইসাথে আল্লাহ তাআলার প্রতি মানুষের বিশ্বাস স্থাপনের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় মাধ্যম। কারণ, মানুষ যখন ব্যাপকভাবে প্রকৃতির উপাদানগুলোর অপব্যবহার করবে এবং নির্বিচারে এর কার্যক্ষমতাগুলো ধ্বংস করতে থাকবে, গোটা জগৎ তখন বিপর্যস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অনিবার্য কারণেই মানুষের পার্থিব জীবনও তখন বিপন্ন ও বিপদ্গ্রস্ত হয়ে পড়বে।
এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পৃথিবীর সবুজ সমারোহে বেঁচে থাকতে চাওয়া প্রতিটি মানুষের জন্য একটি সাধারণ নীতি অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন। আর তা হলো, এই মহাবিশ্বে কোনো ধরনের ক্ষতিকারক বিষয়ের উদ্ভব না ঘটানো। এ জন্য তিনি মূলনীতি হিসেবে বলেছেন,
(لا ضرر ولا ضرار)
না সাধারণ অবস্থায় অন্যের ক্ষতি করা যাবে আর না প্রতিশোধের ভিত্তিতে একে অপরের ক্ষতি করার সুযোগ আছে। (২১৯)
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবেশ দূষণ থেকেও উম্মতকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, 'তোমরা তিনটি অভিশপ্ত কর্ম থেকে বিরত থাকো। সেগুলো হচ্ছে, মানুষের সমাগমস্থল, চলাচলের পথ ও ছায়াবিশিষ্ট জায়গায় পেশাব-পায়খানা করা।'(২২০)
রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাস্তার অধিকার হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। তিনি তাঁর সাহাবিদের, যারা রাস্তার ওপর বসার ইচ্ছা পোষণ করছিলেন তাদেরকে বললেন, 'তোমরা রাস্তার ওপর বসা ছেড়ে দাও।'
সাহাবিরা বললেন, 'এ ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। কেননা, এটাই আমাদের ওঠাবসার জায়গা এবং এখানেই আমরা কথাবার্তা বলে থাকি।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, 'একান্তই যদি তোমাদের সেখানে বসতে হয়, তাহলে তোমরা রাস্তার হক আদায় করো।'
সাহাবিরা বললেন, 'রাস্তার হক কী?' নবীজি বললেন, ‘...কষ্ট দেওয়া হতে বিরত থাকা... ।'(২২১)
এখানে 'কষ্ট দেওয়া হতে বিরত থাকা' কথাটি এমন সকল বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে, যা রাস্তা ও পথ ব্যবহার করতে মানুষদের কষ্ট দেয়। পরিবেশ দূষণ এর অন্যতম।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিতে আমরা দেখতে পাই, তিনি পরিবেশ রক্ষার সাথে আল্লাহ তাআলার প্রতিদানের একটি যোগসূত্র তৈরি করেছেন। তিনি বলেছেন, 'আমার উম্মতের ভালো-মন্দ সব আমল আমার সামনে পেশ করা হয়েছিল। আমি দেখলাম, তাদের সকল উত্তম কাজের মধ্যে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণকে একটি উত্তম কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আর আমি এও দেখলাম যে, তাদের খারাপ কাজসমূহের মধ্যে মসজিদে কাশি বা থুথু ফেলা এবং তা দাফন না করাকেও (পরিষ্কার না করা) একটি খারাপ আমল বা মন্দ কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।'(২২২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবেই আমাদের আবাসস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে আদেশ করেছেন। তিনি বলেছেন, إِنَّ اللهَ طَيِّبُ يُحِبُّ الطَّيِّبَ، نَظِيفُ يُحِبُّ النَّظَافَةَ، كَرِيمُ يُحِبُّ الْكَرَمَ، جَوَادُ يُحِبُّ الْجُودَ، فَنَظَفُوا أَرَاهُ، قَالَ أَفْنِيَتَكُمْ وَلَا تَشَبَّهُوا بِالْيَهُودِ» নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা উত্তম, তিনি উত্তমতাকে ভালোবাসেন। তিনি পরিচ্ছন্ন, পরিচ্ছন্নতাকে ভালোবাসেন। তিনি সম্মানিত, সম্মাননাকে ভালোবাসেন। তিনি দানশীল, দানশীলতাকে ভালোবাসেন। সুতরাং তোমরা তোমাদের ঘরবাড়ির আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবে, তোমরা ইহুদিদের মতো হয়ো না। (২২৩)
কত সুন্দর আর চমৎকার এই নববি শিক্ষা! যার মাধ্যমে তিনি বারবার সকল ধরনের দূষণ থেকে আমাদের দুনিয়ার জীবনকে সুরক্ষার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। এটা যদি যথাযথভাবে মান্য করা হয়, অবশ্যই আমাদের পৃথিবীতে মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বস্তি ও শান্তি সুরক্ষিত হবে।
পরিবেশ ও তার পরিচ্ছন্নতার প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আন্তরিক ভালোবাসার মাধ্যমে আমরা তাঁর অভিজাত রুচি ও সৌন্দর্যবোধের পরিচয় পাই। এ কারণে তিনি নিজেও সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করতেন এবং অন্যদেরকে এর প্রতি উৎসাহিত করতেন। একবার এক সাহাবি এসে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, তার পোশাক সুন্দর হোক এবং জুতাজোড়াও সুন্দর হোক, এটা কি তার অহংকার বলে গণ্য হবে?' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে বললেন,
إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقَّ وَغَمْطُ النَّاسِ)
আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। প্রকৃতপক্ষে অহংকার হচ্ছে, সত্য ও ন্যায়কে উপেক্ষা করা এবং মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা। (২২৪)
সন্দেহ নেই, আল্লাহ তাআলার এই অপরূপ সৃষ্টি, নয়নাভিরাম প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা পোষণ মানুষের মনের সৌন্দর্যবোধেরই বহিঃপ্রকাশ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিতে আমরা দেখতে পাই, তিনি নিজে সুগন্ধি পছন্দ করতেন। অন্যদের তা ব্যবহার করতে নির্দেশ দিতেন এবং মানুষের মাঝে এটিকে ছড়িয়ে দিতে এবং পরস্পর হাদিয়া প্রদান করতে উৎসাহিত করতেন। এর দ্বারা পরিবেশ সুন্দর ও সুরভিত হয় এবং দূষণ থেকে পরিবেশ মুক্ত হয়। যেমন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ عُرِضَ عَلَيْهِ رَيْحَانُ فَلَا يَرُدُّهُ فَإِنَّهُ خَفِيفُ الْمَحْمِل طَيِّبُ الرِّيحِ )
কাউকে সুগন্ধি ফুল দেওয়া হলে সে যেন তা ফিরিয়ে না দেয়। কেননা, তা সহজেই বহন করা যায় এবং তা সুগন্ধিযুক্ত。(২২৫)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে বেশি বেশি শস্য ফলাতে এবং বৃক্ষরোপণ করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো মুসলমান যদি (ফলবান) গাছ রোপণ করে, তবে তা থেকে যা কিছু খাওয়া হবে, সেটা তার জন্য সদকা, তা থেকে যা কিছু চুরি হবে, তাও তার জন্য সদকা। চতুষ্পদ প্রাণী যা খাবে, তাও তার জন্য সদকা, পাখি যা খাবে, সেটাও তার জন্য সদকা এবং যে কেউ তা থেকে কিছু নেবে সেটাও তার জন্য সদকা (অর্থাৎ এগুলোর মাধ্যমে সে সদকার সওয়াব পাবে)। (২২৬)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, এই ভালো কাজ তার জন্য কিয়ামতের দিন পর্যন্ত সদকা হিসেবে গণ্য হবে। এটা ইসলামের একটি অনন্য মহিমা, পরিবেশের জন্য উপকারী এ বৃক্ষরোপণের পর এ বৃক্ষ থেকে যতদিন উপকৃত হওয়া যাবে, ততদিন রোপণকারী সওয়াবপ্রাপ্ত হবে এমনকি বৃক্ষ যদি হাতবদল হয়ে অন্যের মালিকানায় চলে যায় অথবা বৃক্ষরোপণকারী বা শস্য ফলনকারী যদি মারাও যায়, তবুও সে এর থেকে সওয়াব পেতে থাকবে।
এমনইভাবে ইসলাম পতিত জমিকে চাষাবাদের উপযোগী করে ব্যবহারের প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই চাষাবাদ হতে পারে গাছ রোপণ করে, অথবা বীজ বপন করে কিংবা শুষ্ক জমিতে পানি সিঞ্চন করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মৃত জমিকে ফসল চাষের উপযোগী করে তোলে, তার জন্য রয়েছে পুরস্কার। সেই ফসল থেকে পশুপাখি যা খাবে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে। (২২৭)
এখানে পানির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো, সুন্দর ও মনোরম পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে পানিই হলো প্রধান উপাদান। পানির পরিমিত ব্যবহার এবং তার পবিত্রতা রক্ষা করা এই দুটি বিষয় ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আমরা দেখি, তাঁর নিকট কখনো পর্যাপ্ত পানি থাকলেও, তিনি তার পরিমিত ব্যবহার করতেন। এ বিষয়ে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বর্ণনা করে বলেন, একবার হজরত সাদ রা. (২২৮) অজু করার সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। (হয়তো তিনি একটু বেশি পানি খরচ করছিলেন এ কারণে) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'হে সাদ! এই অপচয় কেন?'
সাদ রা. বললেন, 'অজুতেও কি অপচয় আছে?' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ, যদিও তুমি প্রবহমান নদীতে থাকো।' (২২৯)
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানি দূষণ করতেও নিষেধ করেছেন। এ কারণে ইসলামে আবদ্ধ পানিতে প্রস্রাব করা নিষিদ্ধ। (২৩০)
প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসৃত কিছু নীতিমালা উপস্থাপন করা হলো। এগুলো আমাদের নিশ্চয়তা প্রদান করে যে, আমরা যদি পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সক্রিয়তার সাথে এই নীতিগুলো মান্য করি এবং প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসি, তাহলে আল্লাহপ্রদত্ত এই সুন্দর পৃথিবীকে আমরা আরও স্বাস্থ্যকর, আরও পরিচ্ছন্ন এবং আরও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তুলতে পারব।
***
টিকাঃ
২১৯. মুসনাদে আহমাদ: ২৭১৯, মুসতাদরাকে হাকেম: ২৩৪৫।
২২০. সুনানে আবু দাউদ: ২৬, মুসনাদে আহমাদ: ২৭১৫, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩২৮।
২২১. সহিহ বুখারি : ২৪৬৫, সহিহ মুসলিম : ২১২১, সুনানে আবু দাউদ : ৪৮১৫, মুসনাদে আহমাদ : ১০৯১৬।
২২২. সহিহ মুসলিম : ৫৫৩, মুসনাদে আহমাদ : ২১৫৮৯, সুনানে ইবনে মাজাহ :৩৬৮৩।
২২৩. সুনানে তিরমিজি: ২৭৯৯, মুসনাদে আবু ইয়ালা: ৭৯০, মিশকাতুল মাসাবিহ: ৪৪১৩।
২২৪. সহিহ মুসলিম: ৯১, মুসনাদে আহমাদ: ৩৭৮৯, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৪৬৬।
২২৫. সহিহ মুসলিম: ২২৫৩, সুনানে তিরমিজি: ২৭৯১।
২২৬. সহিহ মুসলিম: ১৫৫২, মুসনাদে আহমাদ: ২৭৪০১।
২২৭. সুনানে নাসায়ি: ৫৬৫৭, সহিহ ইবনে হিব্বان: ৫২০৫, মুসনাদে আহমাদ: ১৪৩১০।
২২৮. তিনি সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস বিন উহাইব যুহরি রা.। তিনি আশারায়ে মুবাশশারা বিল জান্নাত বা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তদের অন্যতম। তিনি তাদের সবার শেষে ইনতেকাল করেছেন। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন, ইবনুল আছির: উসদুল গাবাহ: ২/৪৩৩, ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা: ৩/৭৩, জীবনী নং: ৩১৯৬।
২২৯. সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫, মুসনাদে আহমাদ: ৭০৬৫।
২৩০. সহিহ মুসলিম: ২৮১, সুনানে আবু দাউদ: ৬৯, সুনানে তিরমিজি: ৬৮।