📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 নবীজি ﷺ ও শ্রমিক অধিকার

📄 নবীজি ﷺ ও শ্রমিক অধিকার


ইসলাম দাস-দাসী, কর্মচারী ও শ্রমিকদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করেছে। তাদের প্রতি বিশেষ যত্ন ও মনোযোগ দিয়েছে এবং মানব-ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইসলামই তাদের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ প্রাচীন কিছু সভ্যতায় শ্রম মানেই ছিল দাসত্ব ও পরাধীনতা, কিছু সভ্যতায় তার অপর নাম ছিল অপমান ও লাঞ্ছনা। কিন্তু ইসলাম চেয়েছে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে এবং তাদেরকে একটি পূর্ণ সম্মানজনক জীবন প্রদান করতে।
সেবক ও শ্রমিকদের প্রতি ইসলামের মহান দৃষ্টিভঙ্গির শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিত। সেখানে আমরা দেখতে পাই, নবীজির পক্ষ থেকে সর্বতোভাবে সেবক ও শ্রমিকদের সকল অধিকারের কথা স্বীকার করা হয়েছে। তিনি মালিকশ্রেণিকে আহ্বান করেছেন শ্রমিকদের সাথে মানবিক আচরণ করতে, তাদের প্রতি দয়াপরবশ হতে, সদাচারী হতে এবং সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ তাদের ওপর চাপিয়ে না দিতে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِخْوَانُكُمْ خَوَلُكُمْ جَعَلَهُمْ اللهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ، فَمَنْ كَانَ أَخُوهُ تَحْتَ يَدِهِ فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ، وَلَا تُكَلِّفُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ، فَإِنْ كَلَّفْتُمُوهُمْ فَأَعِينُوهُمْ»
তোমাদের দাস-দাসীরা (সেবক-সেবিকারা) তোমাদেরই ভাই-বোন। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। সুতরাং যার ভাই তার অধীনে থাকবে, সে নিজে যা খায়, তাকেও যেন তা খাওয়ায় এবং নিজে যা পরে, তাকেও যেন তা পরিধান করায়। তোমরা তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দিয়ো না, যা তাদের জন্য অসাধ্য। আর তোমরা যদি তাদেরকে এমন কঠিন কাজ করতে দাও, তাহলে তোমরা নিজেরাও তাদের সে কাজে সহযোগিতা করবে। (১৭৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্পষ্ট বাণী ‘দাস-দাসীরা তোমাদের ভাইবোন’ এসেছে। যেন তাদেরকে দাস-দাসীর স্তর থেকে ভাই-বোনের মর্যাদায় উন্নীত করে এবং এই সর্বজনীন নীতিমালা মানবজাতির সকল সদস্যের জন্য সম্মানজনক এক জীবনের ব্যবস্থা করে。
অন্যদিকে মালিকের জন্যও ইসলাম আবশ্যক করেছে, তারা যেন সেবক-সেবিকা ও শ্রমিকদের কাজের উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদান করে। পারিশ্রমিক প্রদানে তাদের প্রতি যেন অন্যায় ও বিলম্ব না করে। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «أَعْطُوا الْأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ» শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তাকে তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও। (১৭৮)
শ্রমিকদের প্রতি জুলুম করার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করে বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথের মাধ্যমে কোনো মুসলমানের সম্পদ আত্মসাৎ করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জাহান্নাম আবশ্যক করেন আর জান্নাত হারাম করে দেন।
এ সময় এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রাসুল, যদিও তা ক্ষুদ্র জিনিস হয়?'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'যদি তা বাবলা গাছের একটি শাখা হয়, তবুও।' (১৭৯)
তাদের আর্থিক অধিকার সব ধরনের প্রতারণা, শোষণ, অত্যাচার ও অবিচার থেকে সুরক্ষিত থাকা তাদের অন্যতম অধিকার। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা (হাদিসে কুদসিতে) বলেন,
ثَلَاثَةُ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ... وَرَجُلٌ اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَاسْتَوْفَى مِنْهُ وَلَمْ يُعْطِ أَجْرَهُ
কিয়ামতের দিন আমি নিজে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হব। (তাদের মধ্যে) একজন হলো এমন ব্যক্তি, যে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করে তার থেকে পরিপূর্ণ কাজ আদায় করল অথচ তার পারিশ্রমিক প্রদান করল না। (১৮০)
অতএব, যারা শ্রমিক বা দাস-দাসীর ওপর জুলুম করে, তাদের জেনে নেওয়া উচিত, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাকে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং কিয়ামতের দিন তিনি তাদের বিরুদ্ধে বাদী হবেন।
মালিকের জন্য উচিত হলো, শ্রমিকদের ওপর অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে না দেওয়া। যার ফলে তাদের শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং কাজ-কর্মে অক্ষম হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তুমি তোমার দাস-দাসী বা শ্রমিক থেকে যে পরিমাণ কাজের বোঝা কমিয়ে দেবে, তোমার আমলনামায় সেই পরিমাণ সওয়াব যুক্ত হবে। (১৮১)
ইসলামি বিধানে শ্রমিকদের অধিকারের আরেকটি উজ্জ্বল নিদর্শন হলো, দাস-দাসী ও শ্রমিকদের সাথে নম্র ও কোমল আচরণ করা। এটা শ্রমিকদের অধিকার। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে উৎসাহ দিতে গিয়ে বলেছেন, 'সে ব্যক্তি অহংকারী নয়, যে তার চাকরকে সঙ্গে নিয়ে খাওয়াদাওয়া করে, গাধায় চড়ে বাজারে যায়, ছাগল পালন করে এবং তার দুধ দোহন করে। (১৮২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোটা জীবনে নিজের বলা প্রতিটি কথার বাস্তব নমুনা ছিলেন। যেমন হজরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো নিজ হাতে কোনো কিছুকে আঘাত করেননি—কোনো স্ত্রীকেও নয়, কোনো সেবককেও নয়। (১৮৩)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম হজরত আনাস রা. ছিলেন এ বিষয়ের একজন বাস্তব সাক্ষী। তিনি সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। একদিন তিনি আমাকে কোনো কাজে পাঠাতে চাইলে আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম, আমি সেখানে যাব না।' তবে মনে মনে ছিল যে, আল্লাহর নবী আমাকে যে কাজের আদেশ করেছেন, আমি সে কাজে যাব। এই মনোভাব নিয়ে আমি বাইরে বের হলাম। যেতে যেতে একদল বালকের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। তারা বাজারে খেলাধুলা করছিল। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা দেখছিলাম। এমন সময় হঠাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেছন থেকে আমার ঘাড়ের ওপর হাত রাখলেন। আমি তাকিয়ে দেখি, তিনি হাসছেন। তারপর তিনি আমাকে বললেন, 'ছোট্ট আনাস! আমি তোমাকে যেখানে যাওয়ার আদেশ করেছিলাম সেখানে যাও।'
আমি বললাম, 'এখনই যাচ্ছি, ইয়া রাসুলাল্লাহ!'
হজরত আনাস রা. বলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি দীর্ঘ নয় কি সাত বছর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেবায় নিয়োজিত ছিলাম। আমার কোনো কাজের কারণে 'তুমি কেন এমনটা করেছ?' কিংবা কোনো কাজ করতে না পারলে 'তুমি কেন এটা করোনি?' বলেছেন বলে আমার মনে পড়ে না। (১৮৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেবকদের প্রতি এতটা খেয়াল রাখতেন যে, তাদের বিবাহ-বিষয়েও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চিন্তাভাবনা করতেন। যেমন হজরত রবিআ ইবনে কাব আল-আসলামি রা. বলেন, আমি তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম ছিলাম। একদিন তিনি আমাকে বললেন, 'হে রবিআ, তুমি কি বিবাহ করবে না?'
আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসুল, না। আমার বিবাহের কোনো ইচ্ছা নেই, স্ত্রীর ভরণপোষণের সামর্থ্য নেই। তা ছাড়া কোনো বস্তু আপনার থেকে আমাকে দূরে রাখুক, আমি তা চাই না। এ শুনে তিনি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।'
এরপর তিনি আবার আমাকে বললেন, 'হে রবিআ, তুমি কি বিবাহ করবে না?'
আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসুল, না। আমার বিবাহের কোনো ইচ্ছা নেই, স্ত্রীর ভরণপোষণেরও সামর্থ্য নেই। তা ছাড়া কোনো বস্তু আমাকে আপনার থেকে দূরে রাখুক, আমি তা চাই না। এ শুনে তিনি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।'
তবে পরমুহূর্তেই আমি এই বিষয়ে কিছুটা চিন্তাভাবনা করলাম এবং মনে মনে বলতে লাগলাম, 'আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসুল, আমার দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের বিষয়ে আপনিই সবচেয়ে ভালো জানেন।' আর আমি তখনই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, তিনি যদি তৃতীয়বার আমাকে এই কথা জিজ্ঞাসা করেন, তবে আমি 'হ্যাঁ' বলব (অর্থাৎ বিবাহ করতে রাজি আছি)। রবিআ রা. বলেন, তিনি আমাকে তৃতীয়বার জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে রবিআ, তুমি কি বিবাহ করবে না?'
এবার আমি বললাম, 'অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল, আপনি যা চান আমাকে আদেশ করুন।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'অমুক পরিবারের কাছে যাও।' (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কোনো এক আনসারি গোত্রের কাছে যেতে বলেছেন।) (১৮৫)
এমনইভাবে অমুসলিম সেবক বা খাদেমের প্রতিও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্নেহ-সহানুভূতি ছিল অবারিত। যেমনটি তিনি করেছেন এক ইহুদি বালকের সাথে, যে তাঁর খেদমত করত। একবার সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে যেতেন এবং খোঁজখবর নিতেন। তার মৃত্যু ঘনিয়ে এলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে গেলেন এবং তার মাথার কাছে বসে তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন।
বালকটি তখন জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে তার পিতার দিকে তাকাল। পিতা তাকে বলল, 'তুমি আবুল কাসিম (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কথা মেনে নাও।' পিতার সম্মতি পেয়ে বালকটি ইসলামগ্রহণ করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বালকটির বাড়ি থেকে আসার সময় বললেন, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি বালকটিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলেন।’ (১৮৬)
দাস-দাসী ও শ্রমিকদের অধিকার বিষয়ে এখানে অল্প কিছু বিষয় উপস্থাপন করা হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে এগুলো এমন একটি সময়ে বাস্তবায়িত করেছেন, যে সময়ে তাদের ওপর শুধু জুলুম, অত্যাচার ও কঠোরতার কথাই শোনা যেত।

টিকাঃ
১৭৭. সহিহ বুখারি: ৩০, সহিহ মুসলিম: ১৬৬১।
১৭৮. সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৪৪৩।
১৭৯. সহিহ মুসলিম: ১৩৭, সুনানে নাসায়ি ৫৪১৯, মুসনাদে আহমাদ: ২২২৯৩
১৮০. সহিহ বুখারি: ২২২৭, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৪৪২, মুসনাদে আবু ইয়ালা: ৬৪৩৬
১৮১. সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৩১৪, মুসনাদে আবু ইয়ালা: ১৪৭২।
১৮২. ইমাম বুখারি: আল-আদাবুল মুফরাদ: ২/৩২১।
১৮৩. সহিহ মুসলিম: ২৩২৮, সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮৬, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯৮৪।
১৮৪. সহিহ মুসলিম: ২৩১০, সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৭৩।
১৮৫. মুসনাদে আহমাদ: ১৬৬২৭, মুসতাদরাকে হাকেম: ২৭১৮।
১৮৬. সহিহ বুখারি: ১৩৫৬, সুনানে তিরমিজি: ২২৪৭, মুসতাদরাকে হাকেম: ১৩৪২。

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 নবীজি ﷺ ও অসুস্থ-প্রতিবন্ধীদের অধিকার

📄 নবীজি ﷺ ও অসুস্থ-প্রতিবন্ধীদের অধিকার


অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি ইসলামের রয়েছে বিশেষ সহানুভূতি ও যত্নশীল মনোভাব। প্রথমত ইসলাম তাদের জন্য শরিয়তের অনেক বিধান সহজ ও শিথিল করে দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
لَيْسَ عَلَى الْأَعْمَىٰ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ (জিহাদ না করাতে) কোনো অন্ধের জন্য গুনাহ নেই, পায়ে সমস্যা আছে এমন ব্যক্তির জন্যও গুনাহ নেই। কোনো অসুস্থ ব্যক্তির জন্যও গুনাহ নেই। [সুরা নূর: ৬১]
আর চূড়ান্তভাবে ইসলামই তাদের অন্তরে আশা জাগিয়েছে এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক অধিকারগুলোর প্রতি যত্নশীল হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোনো অসুস্থ ব্যক্তির সংবাদ পেতেন, তখন নিজের বহু পেরেশানি ও কর্মব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও তাকে দেখার জন্য দ্রুত তার বাড়িতে ছুটে যেতেন। তাঁর এই অসুস্থকে দেখতে যাওয়ার মধ্যে কোনো লৌকিকতা বা বাধ্যবাধকতা ছিল না। বরং এটিকে তিনি নিজের স্বাভাবিক কর্তব্য বলে গণ্য করতেন। আর কেনই-বা করবেন না! তিনি তো সেই নবী, 'খোঁজখবর' নেওয়াকে যিনি অসুস্থ ব্যক্তির অধিকার হিসেবে গণ্য করেছেন। তিনি বলেছেন,
حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ خَمْسُ ؛ رَدُّ السَّلَامِ، وَعِيَادَةُ الْمَرِيضِ، وَاتَّبَاعُ الْجَنَائِزِ، وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ، وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ» এক মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিমের পাঁচটি অধিকার রয়েছে, যেমন সালামের উত্তর প্রদান করা, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজখবর নেওয়া, জানাজায় উপস্থিত হওয়া, দাওয়াত গ্রহণ করা এবং হাঁচির উত্তর প্রদান করা। (১৮৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা অসুস্থ ব্যক্তিকে তার রোগ ও দুর্ভোগ সহজ করে দেখাতেন। কোনোপ্রকার লৌকিকতা ছাড়া সমবেদনা ও সহানুভূতি প্রকাশ করতেন। তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। এগুলো সেই অসুস্থ ব্যক্তি এবং তার পরিবারকে স্বস্তি ও সুখ প্রদান করত। এ বিষয়ে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, সাদ ইবনে উবাদাহ রা. অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুর রহমান ইবনে আউফ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-কে সাথে নিয়ে সাদ ইবনে উবাদা রা.-কে দেখতে এলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঘরে প্রবেশ করে তাকে পরিবার-পরিজনবেষ্টিত দেখতে পেলেন। তারা সকলেই ছিল চিন্তিত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তাঁর কি মৃত্যু হয়ে গেছে?' তারা বললেন, 'না, ইয়া রাসুলাল্লাহ!' তখন নবীজির চোখে পানি চলে এলো। তাঁর কান্না দেখে উপস্থিত লোকেরাও কাঁদতে শুরু করল। তখন তিনি বললেন, 'শুনে রাখো! নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা চোখের পানি এবং অন্তরের শোক-ব্যথার কারণে আজাব দেন না। তিনি আজাব দেন এটার কারণে (এই বলে তিনি জিহ্বার দিকে ইশারা করলেন), অথবা এটার কারণেই তিনি রহম করেন।'(১৮৮)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ ব্যক্তির জন্য দোয়া করতেন এবং তার ওপর আপতিত অসুস্থতার পরিণামে তাকে সওয়াব ও প্রতিদানের সুসংবাদ শোনাতেন। এভাবে তিনি বিষয়টিকে সহজ করে দেখাতেন এবং এই অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট করে তুলতেন। পরিণামে অসুস্থ ব্যক্তির মনেও শান্তি ও স্বস্তি ফিরে আসত। যেমন উম্মে আলা রা.(১৮৯) বর্ণনা করে বলেন, একবার আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখতে এসে বললেন, 'হে উম্মে আলা, তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা, মুসলমানদের অসুখের মাধ্যমে আল্লাহ এমনভাবে তাদের গুনাহ দূর করে দেন, যেমনভাবে আগুন সোনা-রুপার খাদ দূর করে দেয়। (১৯০)
অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শরিয়তের অনেক বিষয়ে সহজ পথ বলে দিতেন, তাদের প্রতি কখনোই কঠোরতা আরোপ করতেন না। এ বিষয়ে হজরত জাবের রা. থেকে একটি বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা একবার একটি সফরে বের হলাম। পথিমধ্যে আমাদের একজন পাথরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এতে তার মাথা ফেটে যায়। পরে এ অবস্থায় তার স্বপ্নদোষ হয়। তিনি তার সাথিদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমার কি এখন তায়াম্মুমের সুযোগ আছে?' সাথিরা বললেন, 'যেহেতু তুমি পানি ব্যবহার করতে সক্ষম তাই তোমার তায়াম্মুমের সুযোগ নেই।'
এ কথা শুনে সে গোসল করল এবং মৃত্যুবরণ করল। সফর থেকে ফেরার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই সংবাদ দেওয়া হলো। নবীজি তখন বললেন, 'তার সাথিরা তাকে হত্যা করেছে। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন! যেহেতু বিষয়টা তারা অবগত ছিল না, তাহলে কেন তারা জিজ্ঞাসা করে নিলো না? নিশ্চয় অজ্ঞতার সমাধান হলো জিজ্ঞাসা করা। সে ব্যক্তি তায়াম্মুম করে তার আহত স্থানে পট্টি বেঁধে তার ওপর মাসেহ করে নিত এবং শরীরের অন্য স্থানগুলো ধুয়ে ফেললেই হতো।' (১৯১)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ ব্যক্তির প্রয়োজনে তার ডাকে সাড়া দিতেন এবং তার প্রয়োজন পূরণ করার লক্ষ্যে তার সাথে সাথে চলতেন। একবার তাঁর কাছে এক মহিলা এলো, যার মস্তিষ্কে কিছুটা সমস্যা ছিল। সে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনার কাছে আমার একটা প্রয়োজন আছে।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে অমুক! তোমার ইচ্ছামতো যেকোনো রাস্তায় তুমি অপেক্ষা করো, যাতে আমি তোমার প্রয়োজন পূরণ করতে পারি।' এরপর তিনি কোনো এক রাস্তায় মহিলাটিকে একাকী সময় দিলেন(১৯২) এবং মহিলাটি তার প্রয়োজন পূরণ করল। (১৯৩)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চিকিৎসা গ্রহণ করাকে তার মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য করেছেন। কেননা ইসলামের অন্যতম উদ্দেশ্যে হলো, একজন মানুষ শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই যেন সুস্থ ও সবল থাকে। একবার কিছু বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিকিৎসা গ্রহণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
تَدَاوَوْا عِبَادَ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ سُبْحَانَهُ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ مَعَهُ شِفَاءً إِلَّا الْهَرَمَ»
হে আল্লাহর বান্দারা, তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা আল্লাহ তাআলা যত রোগ সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে বার্ধক্য ছাড়া সকল রোগেরই ওষুধ সৃষ্টি করেছেন। (১৯৪)
একইভাবে প্রয়োজনের সময় কোনো মুসলিম মহিলাকে কোনো মুসলিম পুরুষের চিকিৎসা করতেও নিষেধ করেননি। যেমন খন্দকের যুদ্ধে যখন সাদ ইবনে মুআজ রা. তিরবিদ্ধ হন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুফায়দা নামের আসলাম গোত্রের এক মহিলাকে সাদ ইবনে মুআজ রা.-এর চিকিৎসায় নিযুক্ত করেন। মহিলাটি আহতদের চিকিৎসা করতেন এবং এই দুর্বল-আহত মুসলমানদের চিকিৎসা করাকে নিজের জন্য সওয়াব বলে গণ্য করতেন। (১৯৫)
আমর ইবনে জামুহ রা.-এর সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত চমৎকার সহানুভূতির আচরণই না করেছেন! আমর ইবনে জামুহ রা. ছিলেন শারীরিক প্রতিবন্ধী। কিন্তু তার ছিল উচ্চ মনোবল এবং নিজেকে আল্লাহর রাস্তায় সঁপে দেওয়ার অনন্য আকাঙ্ক্ষা। এ কারণে শারীরিক ত্রুটি তার সুউচ্চ মর্যাদাপাপ্তির ক্ষেত্রে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তার পা ছিল খোঁড়া। তবে তার ছিল সিংহের মতো সাহসী চারজন পুত্র। সকল যুদ্ধেই তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে উপস্থিত থাকতেন। উহুদ যুদ্ধের সময় তারা তাদের পিতাকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে চাইলেন। ছেলেদের কথা শুনে তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে অনুযোগ করে বললেন, 'আমার ছেলেরা খোঁড়া হওয়ার কারণে আমাকে আপনার সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করছে। আল্লাহর কসম! আমার আকাঙ্ক্ষা, আমি এই খোঁড়া পা নিয়েই (শহিদ হয়ে) জান্নাতের ভূমিতে বিচরণ করব।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে বললেন, 'আল্লাহ তাআলা তোমাকে অপারগ করেছেন। সুতরাং তোমার ওপর এখন জিহাদ আবশ্যক নয়।'
এরপর তিনি তার ছেলেদেরকে বললেন, 'তোমাদের জন্যও তাকে বাধা দেওয়া উচিত নয়। হতে পারে আল্লাহ তাআলা তাকে শাহাদাত নসিব করবেন।'
অবশেষে আমর ইবনে জামুহ রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে পড়েন এবং উহুদের ময়দানে শাহাদাতের সৌভাগ্য অর্জন করেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপারে বললেন, 'আল্লাহর এমন কিছু বান্দা আছে, যারা আল্লাহর নামে কসম করলে আল্লাহ তাআলা তাদের কসমকে পূর্ণ করেন। তাদের মধ্যে আমর ইবনে জামুহ অন্যতম। আমি দেখেছি সে জান্নাতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে।'(১৯৬)
অসুস্থ ব্যক্তিদের সাথে অমায়িক আচরণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সকল মুসলমানের জন্য উত্তম আদর্শ ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। এজন্য হজরত উসমান ইবনে আফফান রা. বলেন, আল্লাহর কসম! আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মুকিম ও মুসাফির হয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছি। তিনি অসুস্থকে দেখতে যেতেন। জানাজায় অংশগ্রহণ করতেন। আমাদের সাথেই যুদ্ধে অংশ নিতেন। অল্প বা বেশি-সকল দুঃখ-কষ্টের সময় তিনি আমাদেরকে আন্তরিক সান্ত্বনা দিতেন। (১৯৭)

টিকাঃ
১৮৭. সহিহ বুখারি: ১২৪০, সহিহ মুসলিম: ২১৬২।
১৮৮. সহিহ বুখারি: ১৩০৪, সহিহ মুসলিম: ৯২৪।
১৮৯. উম্মুল আলা: তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ইসলামগ্রহণ করেন এবং বায়াত হন। পুরো পরিচয়: উম্মে খারিজা বিনতে যায়েদ বিন ছাবেত রা.। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন ইবনুল আছির: উসদুল গাবাহ ৬/৩৮২, ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা: জীবনী নং: ১২১৬৮।
১৯০. সুনানে আবু দাউদ: ৩০৯২।
১৯১. সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৬, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৫৭২, মুসনাদে আহমাদ: ৩০৫৭।
১৯২. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাটির সাথে মানুষ চলাচলের রাস্তায় কথা বলেছিলেন। কিন্তু অন্যদের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে। যাতে সেই মহিলা নিঃসংকোচে তার কথা বলতে পারে। সুতরাং এটা গায়রে মাহরাম মহিলার সাথে একাকী ও নির্জন হওয়া ছিল না। বরং দূর থেকে সকল মানুষই তাদের দেখছিল। কিন্তু তাদের কথা শুনতে পাচ্ছিল না। কারণ, মহিলার কথাটি ছিল এমন, যা সে প্রকাশ্যে বলতে চায় না। দ্রষ্টব্য: ইমাম নববি রহ. রচিত মিনহাজ: ১৫/৮৩
১৯৩. সহিহ মুসলিম: ২৩২৬, মুসনাদে আহমাদ: ১৪০৭৮, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৫২৭
১৯৪. সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫৫, সুনানে তিরমিজি: ২০৩৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৪৩৬, মুসনাদে আহমাদ: ১৮৩৭৭।
১৯৫. ইমাম বুখারি: আল-আদাবুল মুফরাদ: ১/৩৮৫, ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/২৩৯, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/২৩৩।
১৯৬. সহিহ ইবনে হিব্বান: ৭০২৪, ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়নুল আছার: ১/৪২৩, সালেহি শামি: সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ ফি সিরাতে খাইরিল ইবাদ: ৪/২১৪।
১৯৭. মুসনাদে আহমাদ: ৫০৪।

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 নবীজি ﷺ ও এতিম-মিসকিন-বিধবাদের অধিকার

📄 নবীজি ﷺ ও এতিম-মিসকিন-বিধবাদের অধিকার


ইসলামি শরিয়তের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এতিম-মিসকিন ও বিধবাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা। মুসলিম সমাজের নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানে ইসলাম তাদের মানসিক ও জাগতিক উভয় প্রকার সহযোগিতা-সংহতির সুব্যবস্থা করেছে। এই প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তাআলা এতিমদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের জন্য আমাদের আদেশ করেছেন। তিনি বলেছেন,
فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ
যে এতিম, তুমি তার প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করো না। [সুরা দুহা: ৯] একইভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে মিসকিনের জন্য নির্ধারিত যে অধিকার রয়েছে, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সে অধিকারসমূহ প্রদান করার আদেশ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন,
وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا
আত্মীয়স্বজনকে তাদের হক দিয়ে দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও (তাদের হক প্রদান করো)। আর নিজেদের অর্থসম্পদ অপ্রয়োজনীয় কাজে খরচ করবে না। [সুরা বনি ইসরাইল: ২৬]
মিসকিন ও বিধবাদের প্রয়োজন পূরণ করার প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেছেন। যেমন তিনি বলেন,
«السَّاعِي عَلَى الْأَرْمَلَةِ وَالْمِسْكِينِ كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ الْقَائِمِ اللَّيْلَ الصَّائِمِ النَّهَارَ
বিধবা ও মিসকিনদের (প্রয়োজন পূরণে) সচেষ্ট ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধরত মুজাহিদের ন্যায় অথবা রাত জেগে ইবাদতকারী ও দিনভর সিয়াম পালনকারীর ন্যায়। (১৯৮)
হাদিসটির মাধ্যমে মিসকিন ও বিধবাদের সহযোগিতাকারীদের মর্যাদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতটাই বৃদ্ধি করেছেন, যার কল্পনাও কেউ কখনো করতে পারে না! সওয়াব ও প্রতিদানের দিক দিয়ে এরচেয়ে বড় কিছু হতে পারে না!
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতিমদের লালনপালন এবং তাদের যত্ন নেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। এর জন্য অনেক সওয়াব ও প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'আমি ও এতিমের ভরণপোষণকারী ব্যক্তি জান্নাতে এভাবে (পাশাপাশি) থাকব।' এ কথা বলার সময় তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল মিলিয়ে ইশারা করে দেখান। (১৯৯)
বলা যায়, এতিমের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়া ও সহানুভূতি এতটা বেশি ছিল যে, তিনি উম্মতকে নিজেদের সন্তানের সাথে একজন করে এতিমের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি নিজের সন্তানের মাঝে একজন এতিমকে তার খাদ্য-খাবারে এমনভাবে মিলিয়ে নেয় যে, তার সকল প্রয়োজন পূরণ হয়ে যায়, তাহলে তার জন্য জান্নাত আবশ্যক হয়ে যায়।' (২০০)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান আদর্শ হলো, একজন এতিম, মিসকিন ও বিধবাকে এভাবে বিবেচনা করা যাবে না যে, তারা শুধু পার্থিব জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুর মুখাপেক্ষী এবং এগুলো প্রদান করলেই তাদের অধিকার আদায় হয়ে যাবে। বরং তাদের ক্ষেত্রে বিবেচনা করতে হবে, তারা আমাদের মতোই মানুষ, তাদেরও সবকিছু পাওয়ার অধিকার রয়েছে, অথচ তারা সবরকম স্নেহ, মায়া ও মমতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু এতিমদের লালনপালন ও যত্নের প্রতি সাধারণ উৎসাহ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি আরও বিভিন্ন পদ্ধতিতে বিষয়গুলোর প্রতি চূড়ান্তরকম উৎসাহিত করেছেন। যেমন একবার এক ব্যক্তি নবীজির নিকট এসে নিজের অন্তরের কঠোরতার অভিযোগ করল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'তুমি কি চাও তোমার অন্তর নরম হোক এবং তোমার মনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হোক? তাহলে তুমি এতিমের প্রতি দয়া করো। তার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দাও। তোমার খাবারে তাকে শরিক করো। এতে তোমার অন্তর নরম হবে এবং তোমার মনের আশা পূরণ হবে।' (২০১)
অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতিমদের প্রতি জুলুম না করতে এবং অন্যায়ভাবে তাদের অধিকার খর্ব না করতে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, 'সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে: ... (তন্মধ্যে একটি হলো) এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা।' (২০২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদেরকে এতিম ও মিসকিনদের জন্য খরচ করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, وَإِنَّ هَذَا الْمَالَ خَضِرَةٌ حُلْوَةٌ، فَنِعْمَ صَاحِبُ الْمُسْلِمِ مَا أَعْطَى مِنْهُ الْمِسْكِينَ وَالْيَتِيمَ وَابْنَ السَّبِيلِ»
নিশ্চয় এই সম্পদ হলো সতেজ, আকর্ষণীয় ও মিষ্ট বস্তু। তবে সে কতই-না ভাগ্যবান মুসলিম, যে এই সম্পদ থেকে মিসকিন, এতিম ও মুসাফিরকে দান করে। (২০৩)
আমরা দেখি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ওলিমার ব্যাপারে নিন্দা করেছেন, যেখানে শুধু ধনীদেরই দাওয়াত করা হয় এবং ফকির, মিসকিন, এতিম ও অসহায়দের বঞ্চিত রাখা হয়। তিনি বলেছেন, 'যে ওলিমায় (বিবাহ উপলক্ষ্যে বরের পক্ষ থেকে খাদ্যের আয়োজন) শুধু ধনীদের দাওয়াত করা হয় এবং গরিবদের দাওয়াত করা হয় না, সেই ওলিমা কতই-না নিকৃষ্ট। আর যে ব্যক্তি দাওয়াত কবুল করে না, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে নাফরমানি করে।' (২০৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে শুধু উৎসাহ দিয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং তিনি নিজেও এতিম, মিসকিন ও অসহায়দের অভিভাবকত্ব ও দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করেছেন এবং একজন যোগ্য রাষ্ট্রনায়কের মতো তিনি ঘোষণা করেছেন, 'আল্লাহর বিধানানুসারে সকল মানুষের চেয়ে আমিই মুমিনদের অধিক নিকটতর। এতএব, তোমাদের কোনো ব্যক্তি যদি কোনো ঋণ কিংবা এতিম সন্তান রেখে যায়, তাহলে তোমরা (সেই বিষয়ে) আমাকে আহ্বান করবে। আমিই হব তার অভিভাবক।' (২০৫)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে যা বলতেন, অন্য মানুষদের চেয়ে সর্বাগ্রে এবং অতি দ্রুত তিনিই তা আগে বাস্তবায়ন করে দেখাতেন। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে আবু আউফা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিধবা ও গরিবদের সাথে চলাফেরায় কোনো সংকোচবোধ করতেন না। এতে তিনি কোনো অসম্মানবোধ করতেন না। তিনি তাদের প্রয়োজন পূরণ করতেন। (২০৬)
এভাবেই ইসলাম এতিম, মিসকিন ও বিধবাদের সাথে সহানুভূতিশীল আচরণের কিছু মূলনীতি স্থাপন করেছে। এইসব মূলনীতি বাস্তবায়নে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সমুজ্জ্বল উদাহরণ। এ ক্ষেত্রে তিনিই হলেন অনুসরণীয় আদর্শ ও উত্তম দৃষ্টান্ত। জগতে তাঁর চেয়ে মহান আর কোনো আদর্শ নেই!

টিকাঃ
১৯৮. সহিহ বুখারি: ৬০০৬, সহিহ মুসলিম: ২৯৮৩。
১৯৯. সহিহ বুখারি: ৫৩৫৩, সহিহ মুসলিম: ২৯৮২।
২০০. মুসনাদে আহমাদ: ১৯০৪৭, ইমাম বুখারি: আল-আদাবুল মুফরাদ: ৭৮, ইমাম তাবারানি : মুজামুল কাবির: ৬৭০।
২০১. মুসনাদে আহমাদ: ৭৫৬৬, ইমাম বাইহাকি: আস-সুনানুল কুবরা: ৬৮৮৬।
২০২. সহিহ বুখারি: ২৭৬৬, সহিহ মুসলিম: ৮৯।
২০৩. সহিহ বুখারি: ১৪৬৫, সুনানে নাসায়ি: ২৫৮১, মুসনাদে আহমাদ: ১১১৭৩।
২০৪. সহিহ বুখারি: ৫১৭৭, সহিহ মুসলিম: ১৪৩২, সুনানে আবু দাউদ: ৩৭৪২, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯১৩।
২০৫. সহিহ বুখারি: ২২৯৭, সহিহ মুসলিম: ১৬১৯, মুসনাদে আহমাদ: ৭৮৩৯।
২০৬. সুনানে নাসায়ি: ১৪১৪, সুনানে দারেমি: ৭৪, সহিহ ইবনে হিব্বان: ৬৪২৩।

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 নবীজি ﷺ ও প্রাণী অধিকার

📄 নবীজি ﷺ ও প্রাণী অধিকার


জীবজন্তুর প্রতি ইসলামের রয়েছে একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি। এর অনেক গুরুত্ব রয়েছে, কারণ পার্থিব জীবনে, মানুষের বহুবিধ কল্যাণ অর্জনে, পৃথিবীর নির্মাণ এবং তার স্থায়িত্বে এগুলোর ব্যাপক ভূমিকা স্বীকৃত। এই সীমাহীন গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে আমরা দেখতে পাই, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে জীবজন্তুর নামে অনেকগুলো সুরার নামকরণ করেছেন। যেমন সুরা বাকারা (গরু), সুরা আনআম (চতুষ্পদ প্রাণী), সুরা নাহল (মৌমাছি), সুরা আনকাবুত (মাকড়সা), সুরা ফিল (হাতি), সুরা নামল (পিঁপড়া) ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالأَنْعَامَ خَلَقَهَا لَكُمْ فِيهَا دِفْءٌ وَمَنَافِعُ وَمِنْهَا تَأْكُلُونَ وَلَكُمْ فِيهَا جَمَالٌ حِينَ تُرِيحُونَ وَحِينَ تَسْرَحُوْنَ وَتَحْمِلُ أَثْقَالَكُمْ إِلَى بَلَدٍ لَّمْ تَكُونُوا بَالِغِيْهِ إِلَّا بِشِقِّ الْأَنْفُسِ إِنَّ رَبَّكُمْ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ
তিনিই চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য শীত থেকে বাঁচার উপকরণ এবং তা ছাড়া আরও বহু উপকার এবং তা থেকেই তোমরা ভক্ষণ করো। তোমরা সন্ধ্যাকালে যখন সেগুলোকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনো এবং ভোরবেলা যখন সেগুলোকে চারণভূমিতে নিয়ে যাও, তখন তার ভেতর তোমাদের জন্য দৃষ্টিনন্দন শোভাও রয়েছে। এবং তারা তোমাদের ভার বয়ে নিয়ে যায় এমন নগরে, যেখানে প্রাণান্তকর কষ্ট ছাড়া তোমরা পৌঁছতে পারতে না। প্রকৃতপক্ষে তোমাদের প্রতিপালক অতি মমতাময়, পরম দয়ালু। [সুরা নাহল: ৫-৭]
প্রাণী বা জীবজন্তুর অধিকারসমূহের মধ্যে অত্যন্ত বড় এক হলো, তাদেরকে কষ্ট না দেওয়া। হজরত জাবের রা. বর্ণনা করে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার একটি গাধার সামনে দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। গাধাটির মুখের ওপর আঘাতের দাগ ছিল। এটা দেখে তিনি বললেন, 'যে ব্যক্তি এটাকে দাগ দিয়েছে, আল্লাহ তাকে অভিশপ্ত করুন।' (২০৭)
হযরত জাবের রা. অন্য আরেকটি বর্ণনায় বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (প্রাণীদের) মুখের ওপর মারতে ও দাগ দিতে নিষেধ করেছেন। (২০৮)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, যে ব্যক্তি পশুর অঙ্গবিকৃতি ঘটায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ওপর অভিসম্পাত করেছেন। (২০৯)
অর্থাৎ এভাবে জীবজন্তুকে কষ্ট দেওয়া, সেগুলোকে অনর্থক আঘাত করা এবং সেগুলোর প্রতি নির্মম আচরণ করা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে একটি বড় রকমের অপরাধ।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবজন্তুর অধিকার প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে জীবজন্তুকে আটক করে ক্ষুধার্ত রাখা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, 'এক মহিলাকে একটি বিড়ালের কারণে আজাব দেওয়া হয়। সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল। অবশেষে বিড়ালটি ক্ষুধার কারণে মারা যায়। সে তাকে খাদ্য-পানিও দেয়নি আবার ছেড়েও দেয়নি, যাতে সে জমিনের পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে।' (২১০)
হযরত সাহল ইবনে হানজালিয়া রা. বর্ণনা করে বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একটি উটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, অনাহারে যার পেট ও পিঠ প্রায় একত্র হয়ে গিয়েছিল। তা দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা এ বোবা পশুদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সেবাযত্নের মাধ্যমে এগুলোতে আরোহণ করো এবং সেবাযত্নের পরই এদের ভক্ষণ করো।' (২১১)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও আদেশ করেছেন, যে পশুকে আল্লাহ তাআলা মানুষের যে ধরনের উপকারের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তার থেকে শুধু সেই ধরনের উপকার গ্রহণ করবে। তিনি প্রাণী ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্যও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'তোমরা তোমাদের ভারবাহী পশুর পিঠে মিম্বার বানিয়ে বসে থাকা পরিত্যাগ করবে (অর্থাৎ বিনা প্রয়োজনে এর পিঠে বসে থাকবে না)। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা প্রাণান্তকর কষ্ট ব্যতীত যেখানে পৌঁছতে পারতে না, সেখানে তারা তোমাদের সহজে পৌঁছে দিতে পারে。(২১২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পশুকে তির (বা এ-জাতীয় কিছু) নিক্ষেপের 'লক্ষ্য' নির্ধারণ করতে নিষেধ করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. একবার কিছু যুবকের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন, তারা একটি পাখি বেঁধে তার দিকে তির ছুড়ছে। তখন তিনি তাদেরকে বললেন, 'এ ধরনের কাজ যে করে, আল্লাহ তার ওপর লানত করেন। প্রাণবিশিষ্ট কোনো জিনিসকে যে তির নিক্ষেপের লক্ষ্য বানায়, তার ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিশাপ দিয়েছেন。(২১৩)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবজন্তুর আরেকটি অধিকার নির্ধারণ করেছেন। তা হলো, তাদের প্রতি দয়া ও সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ করা। এ কথার সমর্থন পাওয়া যাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতে। তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। এ সময় তার তীব্র পিপাসা লাগে এবং সম্মুখেই সে একটি কূপ দেখতে পায়। লোকটি তাতে নেমে পানি পান করে। তারপর উঠে এসে সে দেখতে পায় পাশেই একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে। পিপাসায় কাতর হয়ে জিহ্বা বের করে কাদা চাটছে। লোকটি ভাবে, নিশ্চয় এই কুকুরটি পিপাসায় তেমনই কষ্ট পাচ্ছে, যেমন কষ্ট আমার হয়েছিল। তখন সে আবার কূপে নেমে তার মোজার মধ্যে পানি ভরে। তারপর মুখ দিয়ে (কামড় দিয়ে) ধরে উপরে উঠে আসে। এভাবে সে কুকুরটিকে পানি পান করায়। আল্লাহ এতে খুশি হন এবং তাকে মাফ করে দেন।'
সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, জীবজন্তুর প্রতি সদাচরণেও কি আমাদের জন্য পুরস্কার রয়েছে?' উত্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
فِي كُلِّ ذَاتِ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرُ»
হ্যাঁ, প্রতিটি আর্দ্র হৃদয়ের (প্রাণবিশিষ্ট) অধিকারীর ক্ষেত্রেই পুরস্কার রয়েছে। (২১8)
জীবজন্তুর প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছিল পরম দয়া ও সহানুভূতি। তাঁর এই দয়া ও সহানুভূতির প্রকাশ ঘটে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর একটি বর্ণনায়। তিনি বলেন, আমরা একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সফরে ছিলাম। তিনি একসময় নিজের প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য একটু নির্জনে চলে গেলেন। এদিকে আমরা একটি ছোট পাখি দেখতে পেলাম। তার সঙ্গে ছিল দুটি বাচ্চা। আমরা বাচ্চা দুটিকে ধরে নিয়ে এলাম। তখন মা পাখিটি আমাদের কাছে এসে ডানা ঝাপটাতে লাগল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এসে এই অবস্থা দেখে বললেন, 'বাচ্চা ধরে রেখে কে এই পাখিটিকে কষ্ট দিয়েছে? তোমরা তার বাচ্চা তার কাছে ফিরিয়ে দাও।'(২১৫)
এমনইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে আদেশ করেছেন, আমরা যেন জীবজন্তুর জন্য শস্যশ্যামল চারণভূমি নির্বাচন করি। যদি এমন জায়গা না পাওয়া যায়, তবে এইসব পশুর মালিকদের উচিত হবে পশুকে ভিন্ন কোনো স্থানে নিয়ে যাওয়া, যেখানে তাদের জন্য ভালো খাদ্য পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা কোমল। তিনি কোমলতা পছন্দ করেন। কোমলতায় সন্তুষ্ট হন। তিনি কোমলতার জন্য যেভাবে সাহায্য করেন, কঠোরতার ক্ষেত্রে তা করেন না। তাই তোমরা যখন এই বাক্শক্তিহীন পশুর ওপর আরোহণ করো, তখন তাকে তার উপযুক্ত স্থানে চরাও (যেখানে পর্যাপ্ত ঘাস ও লতাপাতা আছে)। যেখানে বিশ্রাম করবে, সেখানকার জায়গা যদি অনুর্বর হয়, ঘাস না থাকে, তবে দ্রুত সেখান থেকে বের করে নিয়ে যাও。(২১৬)
এ ছাড়া জীবজন্তুর প্রতি স্বাভাবিক সহানুভূতি ও ভালোবাসার চেয়েও আরও মূল্যবান ও উচ্চ একটি অনুভূতির বিষয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য আবশ্যক করেছেন আর তা হলো, জীবজন্তুর প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন করা এবং তাদের অনুভূতির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। এ ক্ষেত্রেও সবচেয়ে সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কারণ, গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রাণী জবাই করা হলেও, সেটিকে তিনি কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন, চাই সেটা ভুলভাবে জবাই কিংবা জবাইয়ের অস্ত্রের ধারহীনতার কারণে শারীরিক কষ্ট হোক অথবা ছুরি প্রদর্শনের মাধ্যমে মানসিক কষ্ট। এগুলোর মাধ্যমে তাকে একাধিক মৃত্যুর কষ্ট প্রদান করা হয়। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রাণীকে কষ্ট দিয়ে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। এ বিষয়ে শাদ্দাদ ইবনে আউস রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে দুটি কথা আত্মস্থ করে রেখেছি। সেই দুটি কথা হলো, 'আল্লাহ তাআলা প্রতিটি জিনিসের সাথে কোমল আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন, অতএব যখনই তোমরা হত্যা করবে (কিসাসস্বরূপ) তখন হত্যার মধ্যে সহজ পদ্ধতি অবলম্বন করো। আর যখন (জীবজন্তুকে) জবাই করবে, তখন সহজভাবে জবাই করবে এবং ছুরি, তরবারি ইত্যাদি ভালোভাবে ধার করে নেবে; যাতে জাবাইযোগ্য প্রাণীটিকে সহজেই জবাই করা যায়。(২১৭)
এ বিষয়ে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকেও একটি বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি জবাই করার উদ্দেশ্যে তার পশুকে আগে শুইয়ে দিলো, এরপর সে তার ছুরি ধার দিতে শুরু করল। এই দৃশ্য দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি কি তাকে একাধিক মৃত্যু দিতে চাও? তাকে শুইয়ে দেওয়ার পূর্বেই কেন তুমি তোমার ছুরি ধার দিয়ে নিলে না?'(২১৮)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল কথা ও কাজের বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সুন্দর পরিবেশে জীবজন্তুর অধিকারগুলো সংরক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। তাদেরকে শান্তি, নিরাপত্তা ও পরিতৃপ্তির উপভোগ্যতা প্রদান করা হয়েছে।

টিকাঃ
২০৭. সহিহ মুসলিম: ২১১৭।
২০৮. সহিহ মুসলিম: ২১১৬, সহিহ ইবনে খুজাইমা: ২৩৪৯।
২০৯. সহিহ বুখারি: ৫৫১৩, সুনানে নাসায়ি: ৪৪৪২, সুনানে দারেমি: ১৯৭৩।
২১০. সহিহ বুখারি: ২৩৬৫, সহিহ মুসলিম: ২২৪২, সুনানে দারেমি: ২৮১৪।
২১১. সুনানে আবু দাউদ: ২৫৪৮, মুসনাদে আহমাদ: ১৭৬৬২, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৪৬।
২১২. সুনানে আবু দাউদ: ২৫৬৭, ইমাম বাইহাকি: আস-সুনানুল কুবরা: ১০১১৫।
২১৩. সহিহ বুখারি: ৫৫১৫, সহিহ মুসলিম: ১৯৫৮, সুনানে নাসায়ি: ৪৪৪১, মুসনাদে আহমাদ: ১৪০১৪।
২১৪. সহিহ বুখারি: ৫৬৬৩, সহিহ মুসলিম: ২২৪৪।
২১৫. সুনানে আবু দাউদ: ৫২৬৮, মুসতাদরাকে হাকেম: ৭৫৯৯।
২১৬. মুয়াত্তা মালেক: ১৭৬৭।
২১৭. সহিহ মুসলিম: ১৯৫৫, সুনানে আবু দাউদ: ২৮১৫, সুনানে তিরমিজি: ১৪০৯।
২১৮. মুসতাদরাকে হাকেম: ৭৫৬৩。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00