📄 নবীজি ﷺ ও মানবাধিকার
মানুষের অধিকার সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই উদার, উন্নত ও সর্বজনীন। মানুষের অধিকার রক্ষায় ইসলামের রয়েছে অনন্যসব বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো, অধিকারের ব্যাপকতা। (১৩৮)
ইসলাম মানুষের সকল ধরনের অধিকারকে নিশ্চিত করে, হোক তা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক। পাশাপাশি এর সর্বজনীনতাও ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই অধিকারগুলো সকলের জন্যই সমান, হোক সে মুসলিম কিংবা অমুসলিম। এগুলো প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বর্ণ, গোত্র, ভাষা বা ধর্মের কোনো ব্যবধান নেই। আরও বড় কথা হলো, এই অধিকারগুলো কারও পক্ষে উপেক্ষা বা পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। কেননা, এগুলো মহান প্রতিপালক আল্লাহপ্রদত্ত ও নির্দেশিত চূড়ান্ত বিধান。
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও কাজগুলো ছিল এই অধিকারগুলো বাস্তবায়নের উত্তম নমুনা। এগুলো প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি যেমন অন্যদের উৎসাহিত করেছেন, উদ্বুদ্ধ করেছেন তেমনি নিজেও বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। যেমন তাঁর বিদায় হজের হৃদয়স্পর্শী ভাষণে, যার পুরোটাই ছিল মানবাধিকার সম্পর্কিত। তিনি এই ভাষণে বলেন,
«فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامُ؛ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا إِلَى يَوْمِ تَلْقَوْنَ رَبَّكُمْ»
তোমাদের জান ও মাল তোমাদের জন্য তোমাদের রবের সঙ্গে সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত এমন সম্মানিত, যেমন সম্মান রয়েছে তোমাদের এই দিনের, তোমাদের এই মাসের এবং তোমাদের এই শহরের। (১৩৯)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সংক্ষিপ্ত ভাষণটি সকল মানবাধিকারকে সন্নিবেশিত করেছে। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের জান, মাল ও সম্মান ইত্যাদির নিরাপত্তা。
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীতে আমরা দেখতে পাই, তিনি সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। কারণ, মানুষের সবচেয়ে বড় অধিকার হলো তার জীবনের নিরাপত্তা। একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, সবচেয়ে বড় গুনাহগুলো কী কী। উত্তরে তিনি বলেন, '(সেগুলো হচ্ছে) আল্লাহর সাথে শরিক করা..., কোনো প্রাণনাশ করা...(ইত্যাদি)।' (১৪০)
'প্রাণ' বলতে এখানে সকল মানুষের প্রাণকেই বোঝানো হয়েছে। সুতরাং শরিয়তের বিধান ছাড়া অন্যায়ভাবে কোনো প্রাণীকে হত্যা করা বৈধ নয়。
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও একধাপ অগ্রসর হয়ে মানুষের জীবনকে স্বয়ং ব্যক্তি নিজের থেকেও রক্ষা করেছেন। এ কারণে তিনি আত্মহত্যাকে হারাম করেছেন। এ ব্যাপারে মানুষকে কঠিনভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি পাহাড়ের ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের আগুনে পুড়বে, চিরদিন সে জাহান্নামের মধ্যে এভাবেই লাফিয়ে পড়তে থাকবে। যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামের আগুনের মধ্যেও তার হাতে বিষ থাকবে, চিরকাল সে জাহান্নামের মধ্যে তা পান করতে থাকবে। যে ব্যক্তি লোহার আঘাতে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামের আগুনের মধ্যে তার হাতে সেই লোহা থাকবে, চিরকাল সে তা দ্বারা নিজের পেটে আঘাত করতে থাকবে।' (১৪১)
এমনইভাবে যেসব কর্মকাণ্ড মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, ইসলাম সেগুলোও হারাম করেছে। সেই কর্মটি হতে পারে কাউকে ভয় দেখানো, অপমান করা কিংবা আঘাত করা। যেমন হজরত হিশাম ইবনে হাকিম রা. বর্ণনা করে বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
«إِنَّ اللهَ يُعَذِّبُ الَّذِينَ يُعَذِّبُونَ النَّاسَ فِي الدُّنْيَا»
যারা দুনিয়াতে মানুষকে (অন্যাভাবে) শান্তি দেবে, আল্লাহ তাদেরকে নিশ্চিত শাস্তি প্রদান করবেন। (১৪২)
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষের অধিকারে সমতা বিধানের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। যেমন ব্যক্তি ও দলের মাঝে, জাতি ও গোত্রের মাঝে, শাসক ও শাসিতের মাঝে, রাজা ও প্রজার মাঝে। অর্থাৎ মানুষ হিসেবে সকলের মাঝেই সমতা স্থাপন করতে হবে, এর মধ্যে কোনো পার্থক্য বা সীমাবদ্ধতা নেই। নেই বিশেষ কোনো বিবেচনা। আরব ও অনারবের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই, সাদা-কালোর মাঝেও নেই কোনো ভেদাভেদ। নেই শাসক ও শাসিতের মাঝেও কোনো তারতম্য। বরং সকলের সম্মান ও মর্যাদার মাপকাঠি একটাই, আর সেটা হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে লোক সকল! নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক এক ও অদ্বিতীয়, নিশ্চয় তোমাদের সকলের পিতা একজন, তোমরা সকলেই আদমের সন্তান, আর আদম মাটি থেকে সৃষ্ট। তোমাদের মধ্যে আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে সম্মানিত ওই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে ভয় করে। আল্লাহভীতি ব্যতীত একজন অনারবের ওপর একজন আরবের বিশেষ কোনো মর্যাদা নেই। (১৪৩)
আমরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্ব ও মহানুভবতা অনুধাবনের জন্য এ সম্পর্কিত আরও একটি বর্ণনার দিকে দৃষ্টি দিতে পারি। যেমন হজরত আবু উমামা রা. বলেন, একবার হজরত আবু যর রা. হজরত বেলাল রা.-কে তার মায়ের নামে কটুভাবে বলেছিলেন, 'হে কৃষ্ণাঙ্গ মহিলার পুত্র!'
বেলাল রা. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে এ বিষয়ে অভিযোগ করলেন। এটা শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। এরপর যখন আবু যর রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এলেন, তিনি তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু রাগের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বোধগম্য না হওয়ার কারণে আবু যর রা. বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, নিশ্চয় আপনার কাছে আমার থেকে অপছন্দনীয় কিছু এসে পৌছেছে, যার কারণে আপনি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি কেন বেলালের মায়ের নাম তুলে কটু কথা বলেছ! সেই সত্তার কসম, যিনি মুহাম্মাদের ওপর কুরআন নাজিল করেছেন, আমল ব্যতীত আমার নিকট কারও কোনো বিশেষ মর্যাদা নেই। তোমাদের সকলেই পাল্লার দুটি পাট্টার ন্যায় (সমান; কেউ কারও থেকে শ্রেষ্ঠ নয়)। (১৪৪)
পারস্পরিক সমান অধিকারের পাশাপাশি আরেকটি অধিকার হলো ইনসাফ বা ন্যায়বিচার। ন্যায়বিচার মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবি ও উম্মতকে ইনসাফ ও ন্যায়ের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'বিচারক তিন প্রকার। প্রথম প্রকার যাবে জান্নাতে আর বাকি দুই প্রকার যাবে জাহান্নামে। যে বিচারক জান্নাতে যাবে সে তো এমন ব্যক্তি, যে সত্যকে জানার পর সে অনুযায়ী বিচার করে। পক্ষান্তরে যে বিচারক সত্যকে সত্য হিসেবে জানার পরও বিচারের ক্ষেত্রে জুলুম করে, সে যাবে জাহান্নামে। আর যে ব্যক্তি না জেনে ভুল বিচার করে, সেও জাহান্নামে যাবে। (১৪৫)
এমনইভাবে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিচারককে কোনো দাবিদারের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার বিনষ্ট করতে নিষেধ করতেন, যাতে দুপক্ষের কথা শ্রবণের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। এজন্য তিনি বলতেন,
فإِنَّ لِصاحب الحقِّ مَقالًا»
পাওনাদারেরও আছে (কড়া) কথা বলার অধিকার। (১৪৬)
যে ব্যক্তি বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং মানুষের মাঝে বিচারকার্য সম্পাদন করে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উদ্দেশে বলেন, 'যখন দুটি পক্ষ তোমার নিকটে কোনো বিচার নিয়ে আসে, তখন তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেবে না, যতক্ষণ না তুমি দ্বিতীয় ব্যক্তির বক্তব্য শ্রবণ করবে, যেভাবে তুমি শ্রবণ করেছ প্রথম ব্যক্তির কথা। তোমার নিকট সঠিক বিচার প্রকাশিত হওয়ার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে সঠিক পদ্ধতি। (১৪৭)
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রবর্তিত মানুষের অধিকারসমূহের মধ্যে আরেকটি অধিকার হলো, স্বাধীনভাবে ধর্মীয় আকিদা-বিশ্বাস লালনের অধিকার। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ﴿لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ﴾
ধর্ম (গ্রহণের) বিষয়ে কোনো জবরদস্তি নেই। [সুরা বাকারা : ২৫৬] (১৪৮) অতএব, কাউকে নির্দিষ্ট মতবাদে বিশ্বাসী করার জন্য বলপ্রয়োগ করা যাবে না। এ কারণে মক্কা বিজয়ের দিন নিজের ক্ষমতা ও বিজয় প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের ইসলামগ্রহণ করতে বাধ্য করেননি। বরং তিনি তাদেরকে বলেছেন, «اذْهَبُوا فَأَنْتُمُ الطَّلَقَاءُ»
যাও, তোমরা সকলেই মুক্ত-স্বাধীন। (১৪৯) এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বারা মানুষের প্রাপ্ত অধিকারের তালিকা দীর্ঘায়ত হয়েছে মানুষের স্বাধীন মত ও চিন্তার অধিকার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে। তিনি অন্যের মতামতকে মূল্যায়ন করতেন এবং নিজের মত প্রকাশে অনুপ্রাণিত করতেন। কোনো বিষয়ে তিনি একটি মত দিলেন পরে তাঁর সাহাবিদের মধ্যে কেউ ভিন্নমত প্রদান করলেন, আর এটার মধ্যেই রয়েছে সম্ভাব্য কল্যাণ, তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মত থেকে সেই ভিন্নমতের দিকেই ফিরে আসতেন। উহুদের ঘটনাটি ছিল এর জ্বলন্ত প্রমাণ। সেদিন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তরুণ-যুবকদের মত অনুযায়ী (এবং তাদের সংখ্যাই ছিল বেশি) সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। তারা মদিনার বাইরে এসে কুরাইশদের মুখোমুখি হওয়াটাকে প্রাধান্য দিয়েছিল। অথচ এটা ছিল তাঁর মতের বিপরীত। (১৫০)
ইসলামি শরিয়ত মানুষের জন্য এমন এক অনন্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, মানবরচিত কোনো বিধান যার কথা কখনো বলেনি কিংবা মানুষের অধিকার আদায়ে পৃথিবীতে এমন কোনো দৃষ্টান্ত কখনো দেখা যায়নি, আর সেই অধিকারটি হলো মানুষের জীবনযাপনের পর্যাপ্ত জীবিকাপ্রাপ্তির অধিকার। অর্থাৎ একটি ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসকারী সকল নাগরিক তার জীবনযাপনের আবশ্যকীয় সব উপকরণপ্রাপ্তির অধিকার রাখে, যার মাধ্যমে সে সম্মানের সাথে জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে। যেগুলোর মাধ্যমে জীবনযাপনের ভারসাম্যপূর্ণ একটি উপযুক্ত অবস্থান তার জন্য নিশ্চিত হবে। মানবরচিত বিধানগুলো মানুষের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম জীবিকাব্যবস্থার যে কথা বলে, ইসলামের এই অধিকার তারচেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন。
এই পর্যাপ্ত জীবিকাব্যবস্থার বিষয়টি মূলত কার্যকর হবে নাগরিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার মাধ্যমে। কিন্তু কেউ যদি কর্মে অক্ষম হয়, তখন ইসলামি বিধানে তাকে জাকাতের মাধ্যমে সাহায্য করা হয়। আর যদি জাকাতও সকল অক্ষম-অসহায়দের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম না হয়, তাহলে রাষ্ট্র নিজের কোষাগার থেকে সেই দায়িত্ব পালন করবে। মানুষের এই অধিকারের প্রতি জোর প্রদান করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'সে আমার প্রতি বিশ্বাসী নয়, যে নিজে খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে রাত্রিযাপন করে আর তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে। অথচ সে প্রতিবেশীর এই দুরবস্থা সম্পর্কে অবগত। (১৫১)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশংসা করে বলেছেন, ‘আশআরি গোত্রের লোকেরা যখন জিহাদে গিয়ে খাদ্য সংকটে পড়ে কিংবা শহরেই থাকাকালীন তাদের পরিবার-পরিজনদের খাবার কম হয়ে যায়, তখন তারা তাদের অবশিষ্ট সকল খাবার একটা কাপড়ে জমা করে। তারপর একটা পাত্র দিয়ে মেপে তা নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নেয়। কাজেই তারা আমার এবং আমি তাদের।’(১৫২)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের সকল অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একজন অগ্রদূত এবং শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক। বিশ্বের সকল মানুষের নিকট তিনি যে মহান বার্তা নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন, এটা এক মানবিকতাপূর্ণ বার্তা। মানুষ হিসেবে একজন মানুষের যত রকম অধিকার রয়েছে, তাঁর এই বার্তা সেই সকল অধিকারকে ধারণ ও লালন করে, প্রতিষ্ঠিত ও সংরক্ষণ করে。
হে আল্লাহর রাসুল, আপনার মানবিকতাবোধ কতই-না উত্তম ও মহান ছিল! (আল্লাহ আপনার ওপর রহমত ও শান্তিধারা বর্ষণ করুন।)
টিকাঃ
১৩৮. ঈষৎ পরিমার্জিত।-সম্পাদক
১৩৯. সহিহ বুখারি : ৪৪০৬, ৪৬৬২, ১৬৭১; সহিহ মুসলিম: ১৬৭৯, সুনানে আবু দাউদ : ১৯৪৭, মুসনাদে আহমাদ: ১৯৮৭৩।
১৪০. সহিহ বুখারি : ২৬৫৩, সুনানে নাসায়ি: ৪০০৯, মুসনাদে আহমাদ: ৬৮৮৪。
১৪১. সহিহ বুখারি: ৫৭৭৮, সহিহ মুসলিম : ১০৯।
১৪২. সহিহ মুসলিম: ২৬১৩, ৬৪৬৯, সুনানে আবু দাউদ: ৩০৪৫, মুসনাদে আহমাদ: ১৫৩৬৬।
১৪৩. মুসনাদে আহমাদ: ২৩৫৩৬। ইমাম তাবারানি: মুজামুল কাবির : ১৪৪৪৪।
১৪৪. ইমাম বাইহাকি : শুআবুল ঈমান: ৫১৩৫।
১৪৫. সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৭৩, সুনানে তিরমিজি: ১৩২২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৩১৫।
১৪৬. সহিহ বুখারি : ২৩০৬, ২৩৯০, সহিহ মুসলিম : ১৬০১, সুনানে তিরমিজি : ১৩১৭, সুনানে নাসাঈ: ৪৬১৮।
১৪৭. সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৮২, সুনানে তিরমিজি: ১৩৩১, মুসনাদে আহমাদ: ৮৮২।
১৪৮. স্বাধীন ধর্ম লালনের ক্ষেত্রে 'অধিকার' শব্দের বদলে 'ছাড়/সুযোগ দেওয়া হয়েছে' কথাটুকু এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত। কারণ, ইসলাম নিন্দাহীনভাবে কারও জন্য কুফরি বিশ্বাস লালন করার অধিকার দেয়নি। যেমন, এ প্রসঙ্গে উল্লিখিত আয়াতের পরবর্তী অংশটি হচ্ছে, ﴿قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ﴾ (হেদায়েতের পথ পথভ্রষ্টতার পথ থেকে স্পষ্টরূপে পৃথক হয়ে গেছে)। অতএব আয়াতটির মর্ম হচ্ছে, আল্লাহর পথ আর শয়তানের পথের পার্থক্য হয়ে গেছে। এখন দুনিয়ার এই পরীক্ষাগৃহে যার যেটা ইচ্ছা গ্রহণ করে আখেরাতে আগমন করুক!-সম্পাদক
১৪৯. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৪১১, তাবারি : তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক : ২/৫৫, ইবনে কাছির: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ৪/৩০১।
১৫০. বাইহাকি : আস-Sুনানুল কুবরা : ১৩০৬১, সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ: ৫/২৪৫, ২৪৬, ইবনে সাইয়েদিন নাস : উয়ুনুল আছার: ১/৪১২, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ৩/২৪।
১৫১. মুসতাদরাকে হাকেম : ৭৩০৭, ইমাম তাবারানি: মুজামুল কাবির : ৭৫০, ইমাম বাইহাকি : শুআবুল ঈমান : ৩২৩৮।
১৫২. সহিহ বুখারি : ২৪৮৬, সহিহ মুসলিম : ২৫০০。
📄 নবীজি ﷺ ও নারী অধিকার
ইসলাম নারীকে গুরুত্ব ও মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়েছে। ইসলাম তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। একজন মেয়ে, স্ত্রী, বোন ও মা হিসেবে নারীকে বিশেষ সম্মান ও সদাচারপ্রাপ্তির অধিকারী করেছে। অতি দৃঢ়তার সাথে ইসলাম এ কথাও ব্যক্ত করেছে যে, নারী ও পুরুষ সকলেরই সৃষ্টি হয়েছে একই উপাদান থেকে। এ কারণে মানবিক অধিকারের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সকলেই সমান মর্যাদার অধিকারী। (১৫৩) আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً
হে লোক সকল! নিজ প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি হতে এবং তারই থেকে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন। আর তাদের উভয় থেকে বহু নর-নারী (পৃথিবীতে) ছড়িয়ে দিয়েছেন। [সুরা নিসা : ১]
কুরআনুল কারিমে এমন আরও অনেক আয়াত রয়েছে, যেগুলো প্রমাণ করে, মানবিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মাঝে কোনোপ্রকার পার্থক্য নেই。
ইসলাম সে সমস্ত নীতির ওপর ভিত্তি করে এবং পূর্ববর্তী অনেক জাতি- গোষ্ঠী কর্তৃক নারীদের অবমাননার বিষয়গুলো অপসারিত করে নারীদের বিশেষ মর্যাদায় উন্নীত করেছে। এটি ইসলামের একটি বিশেষ অবদান ও মহত্ত্ব। নারীদের অবমাননা দূর করতে এবং তাদের অধিকার সমুন্নত রাখতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ভূমিকা পালন করেছেন অতীতের তাবৎ সভ্যতায় এর কোনো দৃষ্টান্ত নেই এবং তাঁর পরবর্তীকালেও কেউ সেই স্থানে পৌঁছতে সক্ষম হয়নি। নারীদের জন্য একজন মা, বোন, স্ত্রী ও মেয়ে হিসেবে তিনি প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে যে মহান অধিকারগুলো নিশ্চিত করেছেন, আজকের পাশ্চাত্য সমাজের নারীরা সেই অধিকার অর্জনের জন্য এখনো চিৎকার করে, তবুও সেগুলো আজও তাদের নাগালের বাইরেই রয়ে গেছে! ব্যর্থ হয়েছে তাদের সকল চেষ্টা!
নারীদের ক্ষেত্রে অতি সংক্ষিপ্ত ও সরল একটি বাক্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের একটি মূলনীতি ব্যক্ত করেছেন। আর তা হলো, সম্মান ও মর্যাদার দিক থেকে নারী-পুরুষ সকলেই সমান। তাই শুধু নারী হওয়ার কারণে তাকে কেউ মর্যাদাহীন মনে করতে পারে না। এজন্য তিনি বলেছেন,
إِنَّ النِّسَاءَ شَقَائِقُ الرِّجَالِ নারীরা পুরুষদেরই সহোদরা। (১৫৪)
অর্থাৎ নারীরা মানবিক মর্যাদায় পুরুষদের সমতুল্য ও সমকক্ষ। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা নারীদের সাথে উত্তম আচরণের উপদেশ দিতেন। তিনি সাহাবিদের বলতেন,
«فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا» তোমরা নারীদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে। (১৫৫)
বিদায় হজের সময়ও তিনি হাজার হাজার সাহাবির সামনে বারবার এই উপদেশ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন。
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের স্থায়ীভাবে যে পরিমাণ মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেছেন, সেটা যদি আমরা ভালোভাবে অনুধাবন করতে চাই, তাহলে আমাদের আগে জানতে হবে প্রাচীন জাহেলি যুগে এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামসময়িক জাহেলি যুগের নারীদের অবস্থান। তখন আমরা দেখতে পাব জুলুমের সেই প্রকৃত অন্ধকার, যেগুলো সহ্য করেছে প্রাচীন জাহেলি যুগের নারীরা এবং সহ্য করে যাচ্ছে বর্তমান জাহেলিয়াতের নারীগণও। এ সকল আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে আমাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে উঠবে, ইসলামের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা ও ব্যবস্থাপনায় নারীদের অবস্থান ছিল কতটা মহান ও মর্যাদাকর。
আমরা জানি, তখনকার জাহেলি যুগে আরব সমাজে মেয়েদের জীবন্ত পুঁতে হত্যা করার প্রথা ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে একটি বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছেন এবং এটাকে হারাম ঘোষণা করেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হুকুমটি কুরআনুল কারিমের বক্তব্য থেকেই উৎসারিত। কেননা, কুরআনুল কারিমে জাহেলি যুগে কন্যাসন্তানকে লাঞ্ছনার মনে করা এবং তাকে জীবন্ত পুঁতে হত্যা করার বিষয়টি অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অমানবিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَإِذَا الْمَوْعُودَةُ سُئِلَتْ بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তাকে কোন অপরাধে হত্যা করা হয়েছিল? [সুরা তাকভির : ৮-৯]
বরং আমরা দেখতে পাই, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটিকে অন্যতম বড় গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেমন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বর্ণনা করে বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'হে আল্লাহর রাসুল, কোন গুনাহ সবচেয়ে বড়?'
তিনি বললেন, 'কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করা, অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।'
আমি বললাম, 'তারপর কোনটি?'
তিনি বললেন, 'তোমার সাথে খাবে, এই ভয়ে তোমার সন্তানকে হত্যা করা।'
আমি বললাম, 'এরপর কোনটি?'
তিনি বললেন, 'প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে জিনা করা।' (১৫৬)
এভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে কন্যাসন্তানের শুধু জীবিত থাকার অধিকারকেই নিশ্চিত করেননি, বরং শৈশব-কৈশোরে তাদের প্রতি স্নেহ, মায়া-মমতা প্রদর্শনের প্রতিও উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন,
«مَنِ ابْتُلِيَ مِنَ الْبَنَاتِ بِشَيْءٍ فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِنَ النَّارِ»
যাকে কন্যাসন্তান প্রদানের মাধ্যমে পরীক্ষায় ফেলা হয়, এরপর সে তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করে, তাহলে এ কন্যারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে প্রতিবন্ধক হবে। (১৫৭)
একইভাবে তিনি কন্যাসন্তানদের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
«أَيُّمَا رَجُلٍ كَانَتْ عِنْدَهُ وَلِيدَةٌ، فَعَلَّمَهَا فَأَحْسَنَ تَعْلِيمَهَا وَأَدَّبَهَا فَأَحْسَنَ تَأْدِيبَهَا، ثُمَّ أَعْتَقَهَا وَتَزَوَّجَهَا، فَلَهُ أَجْرَانِ»
যে ব্যক্তি নিজের ক্রীতদাসীকে উত্তমভাবে ইলম শিক্ষা প্রদান করে এবং উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়, এরপর তাকে স্বাধীন করে বিবাহ করে নেয়, তবে তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব। (১৫৮)
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জন্য সপ্তাহের একটি দিন নির্ধারণ করেছিলেন, সেদিন তিনি নারীদের উদ্দেশে ওয়াজ-নসিহত করতেন এবং তাদেরকে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের প্রতি আদেশ দিতেন。
এরপর কন্যাসন্তান যখন প্রাপ্ত বয়সে পৌঁছে, তখনও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তার অধিকার দিয়েছেন। তিনি তাকে কোনো কিছু গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার ন্যায্য অধিকার প্রদান করেছেন। তার অপছন্দের কোনো পুরুষের সাথে বিবাহে আবদ্ধ হতে তার ওপর বলপ্রয়োগ করাকে অবৈধ করেছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেছেন,
«الْأَيِّمُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا، وَالْبِكْرُ تُسْتَأْذَنُ فِي نَفْسِهَا، وَإِذْنُهَا صُمَاتُهَا»
স্বামী-পরিত্যক্তা নারীরা (নিজেদের বিয়ের ব্যাপারে) অভিভাবকের চেয়ে বেশি অধিকার রাখে। আর কুমারী মেয়েদের নিকট থেকেও তার বিবাহের ব্যাপারে অনুমতি গ্রহণ করতে হবে, আর তার চুপ থাকাটা তার অনুমতি。(১৫৯)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,
«لَا تُنْكَحُ الْأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ، وَلَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ! وَكَيْفَ إِذْنُهَا؟ قَالَ: أَنْ تَسْكُتَ»
স্বামী-পরিত্যক্তা নারীকে তার সম্মতি ছাড়া বিবাহ দেওয়া যাবে না এবং কুমারী মেয়েকেও তার অনুমতি ব্যতীত বিবাহ প্রদান করা হবে না। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল, কেমন করে কুমারীর অনুমতি বোঝা যাবে? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার চুপ থাকাটাই তার অনুমতি。(১৬০)
এরপর সেই কন্যা যখন কারও স্ত্রী হবে, তখনও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে উত্তম আচরণ ও সুন্দর ব্যবহারের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন। এমনকি স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণ করাকে পুরুষের সম্মানিত এবং উন্নত চরিত্রবান হওয়ার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ কারণে তিনি বলেন, 'স্বামী যদি তার স্ত্রীকে পানি পান করায়, তাহলে তাকে এর সওয়াব দেওয়া হবে।'(১৬১)
তিনি আরও বলেন, «اللَّهُمَّ إِنِّي أُحَرِّجُ حَقَّ الضَّعِيفَيْنِ الْيَتِيمِ وَالْمَرْأَةِ»
হে আল্লাহ, এতিম ও নারী, আমি এই দুইপ্রকার দুর্বলের হক নষ্ট হওয়া প্রতিহত করব。(১৬২)
আবার কোনো স্ত্রী যদি তার স্বামীকে অপছন্দ করে এবং স্বামীর সাথে তার জীবনযাপন কষ্টকর হয়ে ওঠে, সে ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত নারীকে তার স্বামীর বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নেওয়ার অধিকার দিয়েছেন। যাকে ফিকহের ভাষায় বলা হয় (خلعة) 'খুলা'। যেমন হজরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, একবার সাবেত ইবনে কায়েসের স্ত্রী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, চারিত্রিক বা ধর্মীয় বিষয়ে সাবেত ইবনে কায়েসের ওপর আমি কোনো অভিযোগ আরোপ করছি না। তবে আমি কুফরির (অর্থাৎ, স্বামীর সাথে অমিল হওয়ায় তার অবাধ্যতার) ভয় করছি।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, '(আলাদা হতে পারবে, তবে) তুমি কি তার বাগানটি তাকে ফিরিয়ে দেবে?'
মহিলা উত্তর দিলো, 'হ্যাঁ।'
এরপর স্ত্রী বাগানটি সাবেত ইবনে কায়েসকে ফিরিয়ে দিলো। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবেত ইবনে কায়েসকে তালাক প্রদানের নির্দেশ দিলেন। ফলে সাবেত ইবনে কায়েস তার স্ত্রীকে তালাক প্রদান করলেন। (১৬৩)
নারী যদি সম্পদের মালিক হয়, তাহলে পুরুষদের মতো সেও সেগুলো নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারবে। সম্পদগুলোর মাধ্যমে নিজের ইচ্ছামতো ক্রয়-বিক্রয়, ব্যবসাবাণিজ্য ও দানখয়রাত করতে পারবে। এতে তার কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই, যতদিন পর্যন্ত সে সুস্থ-সবল ও সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্না থাকে। এ বিষয়টি বোঝা যায় আল্লাহ তাআলার এই বাণীর মাধ্যমেও। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
فَإِنْ أَنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ
তখন যদি উপলব্ধি করো তাদের (অর্থাৎ, এতিম-প্রতিপালিতদের) মধ্যে বুঝ-সমঝ এসে গেছে, তবে তাদের সম্পদ তাদের হাতে অর্পণ করো। [সুরা নিসা : ৬]
একবার হজরত উম্মে হানি রা. দুজন মুশরিককে আশ্রয় প্রদান করেন। তবে তার ভাই আলি রা. এটা প্রত্যাখ্যান করলেন এবং তিনি সেই মুশরিক দুজনকে হত্যা করতে উদ্যত হলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিদ্ধান্ত দিলেন, 'হে উম্মে হানি, তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছ, আমিও তাকে আশ্রয় প্রদান করলাম। (১৬৪)
এর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে হানি রা.-কে নারী হিসেবে এই অধিকার দিলেন যে, সেও কোনো অমুসলিমকে যুদ্ধাবস্থায় কিংবা স্থিতি অবস্থায় নিরাপত্তা ও আশ্রয় দিতে পারে。
এভাবেই একজন মুসলিম নারী নববি শিক্ষার ছায়াতলে পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদার সাথে নিরাপদে জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়。
টিকাঃ
১৫৩. উল্লেখ্য, ইসলাম মানুষ হিসেবে মৌলিকভাবে নারী-পুরুষকে সমান দৃষ্টিতে বিচার করেছে। পক্ষান্তরে আনুষঙ্গিক বিধিবিধানের ক্ষেত্রে উভয়ের প্রাকৃতিক অবস্থা ও যোগ্যতা-সামর্থ্যের প্রতি লক্ষ রেখে অনেক ক্ষেত্রে পার্থক্যপূর্ণ অধিকার ও কর্তব্য প্রদান করেছে। আধুনিক নারীবাদী মানসে সকল ক্ষেত্রে সাম্যের যে ধারণা, ইসলাম সেই সাম্য অস্বীকার করে। বস্তুত তা অদূরদর্শী চিন্তাচেতনা থেকে উদ্ভূত।-সম্পাদক
১৫৪. সুনানে তিরমিজি: ১১৩, সুনানে আবু দাউদ: ২৩৬, মুসনাদে আহমাদ : ২৬৩২৮।
১৫৫. সহিহ বুখারি: ৩৩৩১, সহিহ মুসলিম: ১৪৬৮, সুনানে তিরমিজি: ১১৮৮, মুসনাদে আহমাদ : ১০৪৭৫।
১৫৬. সহিহ বুখারি : ৬০০১, সুনানে তিরমিজি: ৩১৮২, মুসনাদে আহমাদ: ৪১৩১।
১৫৭. সহিহ বুখারি : ৫৯৯৫, সহিহ মুসলিম: ২৬২৯।
১৫৮. সহিহ বুখারি: ৪৭৯৫।
১৫৯. সহিহ মুসলিম : ১৪২১, সহিহ মুসলিম: ৩৩৪০, সুনানে তিরমিজি : ১১০৮।
১৬০. সহিহ বুখারি : ৫১৩৬, সহিহ মুসলিম : ২৬২৯।
১৬১. মুসনাদে আহমাদ: ১৭১৯৫, ইমাম তাবারানি: মুজামুল কাবির : ১৫৩৫৬।
১৬২. সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬৭৮, মুসনাদে আহমাদ: ৯৬৬৪, মুসতাদরাকে হাকেম: ২১১।
১৬৩. সহিহ বুখারি : ৫২৭৬।
১৬৪. সহিহ বুখারি: ৩০৩৩, সহিহ মুসলিম: ২৪১৫, সুনানে নাসায়ি: ৮২৪৩।
📄 নবীজি ﷺ ও শিশু অধিকার
ইসলামি দৃষ্টিকোণে শিশুরা হলো পার্থিব জীবনের পুষ্প এবং হৃদয়কাড়া শোভা-সৌন্দর্য। তারা অন্তরের প্রশান্তি এবং চোখের শীতলতা। তাদের প্রতি ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুকোমল মনোযোগী দৃষ্টি। এ কারণে তিনি শিশুদের অধিকার বিষয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর এই গুরুত্বারোপ এসেছে শিশুর জন্মগ্রহণের আগে থেকেই, এমনকি সেটা ভ্রূণ ও বাচ্চার আকৃতি ধারণ করারও আগে। এ কারণে তিনি বিবাহ-ইচ্ছুক পুরুষকে আদেশ করেছেন, সে যেন একজন দ্বীনদার নেককার নারীকে বিবাহ করে। এতেই রয়েছে সন্তানের কল্যাণ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ؛ لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرُ بِذَاتِ الدِّينِ، تَرِبَتْ يَدَاكَ»
মহিলাদেরকে চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রেখে বিবাহ করা হয়— তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারি। সুতরাং তুমি দ্বীনদারিকেই প্রাধান্য দেবে; তোমার হস্তদ্বয় ধুলোধূসরিত হোক (১৬৫) (১৬৬)
একইভাবে তিনি নারীদেরকেও নির্দেশ দিয়েছেন ধার্মিক ও সৎ গুণাবলিসম্পন্ন স্বামী নির্বাচন করতে। এতেই রয়েছে সন্তানের কল্যাণ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ، فَزَوِّجُوهُ إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادُ عَرِيضُ»
যদি তোমাদের কাছে এমন কোনো পুরুষ বিবাহের প্রস্তাব দেয়, যার দ্বীন ও চরিত্রের ব্যাপারে তোমরা সন্তুষ্ট, তাহলে তোমরা তাকে বিবাহ করিয়ে দাও। আর যদি এমনটা না করো, তবে পৃথিবীতে অনেক ফেতনা ও বিরাট বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। (১৬৭)
অতএব, পিতার ওপর সন্তানের প্রথম অধিকার হলো পিতা একজন দ্বীনদার নেককার স্ত্রী (অর্থাৎ সন্তানের মা) নির্বাচন করবে। সন্দেহ নেই, এই সঠিক নির্বাচন এবং নীতি অনাগত শিশুর কল্যাণ ও সুন্দর আচরণে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে, যে শিশুটি হবে এই দুজন সৎ ও দ্বীনদার মানুষের ঔরসজাত ফসল। এভাবে সেই শিশুটি একটি প্রীতিবন্ধনময় পরিবারে এবং ইসলামি শিক্ষার আলোকে প্রতিপালিত হতে সক্ষম হবে।
এরপর মা যখন সন্তান গর্ভে ধারণ করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনও মায়ের প্রতি এবং অনাগত শিশুর প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করেছেন। এজন্য তিনি গর্ভবতী নারীর জন্য রমজানে রোজা না রাখার বৈধতা দিয়েছেন। (১৬৮)
অতঃপর সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তানের ডান কানে আজান এবং বাম কানে ইকামত দেওয়ার রীতি নির্ধারণ করেছেন, যাতে পার্থিব জীবনের শুরুতেই সন্তানের কর্ণকুহরে পৌঁছে যায় মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলার সাক্ষ্য ও তাঁর একত্ববাদের ঘোষণা।
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের জন্য একটি সুন্দর নাম নির্বাচন করার আদেশ করেছেন। নামটি হতে হবে ভালো গুণবাচক কিংবা সুন্দর অর্থসংবলিত। যে নামটি সন্তানকে স্বস্তি দেবে এবং তার অন্তরকে করবে প্রশান্ত। যেন নামের এই মর্যাদাপূর্ণ অর্থ ও পবিত্র অনুভূতি ছোট থেকেই তার মাঝে একটি সুকুমারবৃত্তি জাগ্রত করতে পারে এবং সে যেন এই নামের মাধ্যমে অনুভব করতে পারে তার সম্মান ও মর্যাদা। এই সুন্দর নামটি তাকে মানুষের উপহাস ও ব্যঙ্গ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
تَسَمَّوْا بِأَسْمَاءِ الْأَنْبِيَاءِ؛ وَأَحَبُّ الْأَسْمَاءِ إِلَى اللَّهِ عَبْدُ اللَّهِ وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ، وَأَصْدَقُهَا حَارِثُ وَهَمَّامٌ، وَأَقْبَحُهَا حَرْبُ وَمُرَّةٌ)
তোমরা নবী-রাসুলগণের নামে নামকরণ করো। আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় নাম হলো আবদুল্লাহ (আল্লাহর বান্দা) ও আব্দুর রাহমান (দয়াবানের বান্দা); হারেস (অর্জনকারী) ও হাম্মام (কর্ম-ইচ্ছুক) হলো বাস্তবসম্মত নাম এবং হারব (যুদ্ধ) ও মুররাহ (তিক্ত) হলো নিকৃষ্টতম নাম। (১৬৯)
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের জন্য আকিকা করাকে সুন্নত সাব্যস্ত করেছেন। নতুন সন্তানের আগমনের কারণে এটি একপ্রকার আনন্দ ও খুশিরও প্রকাশ। তিনি বলেন, 'কারও যদি কোনো শিশুসন্তান জন্ম নেয়, আর সে তার পক্ষ হতে কুরবানি (পশু জবাই) করতে চায়, তবে তার উচিত হবে পুত্রসন্তানের জন্য দুটি একই ধরনের ছাগল এবং কন্যাসন্তানের পক্ষে একটি ছাগল জবাই করা (অর্থাৎ, আকিকা করা)। (১৭০)
এভাবে সন্তান-জন্মের আনন্দে পিতামাতার সাথে ইসলামি সমাজের সকলেই যেন আনন্দিত হয়ে উঠল。
আবার শিশুর দুধপানের অধিকার নিয়েও পবিত্র কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَالْوُلِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দুবছর দুধ পান করাবে। এ সময়কাল তাদের জন্য, যারা দুধ পান করানোর মেয়াদ পূর্ণ করতে চায়। সন্তান যে পিতার, তার কর্তব্য হলো ন্যায়সংগতভাবে মায়েদের খোরপোশের ভার বহন করা। [সুরা বাকারা: ২৩৩]
নিঃসন্দেহে এই পার্থিব জীবনে একজন মানুষের শরীরিক গঠন, মানসিক বিকাশ এবং সামাজিক আচরণে মায়ের দুধের গভীর প্রভাব রয়েছে।
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তানদের মাঝে সমতা বিধানের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। যেমন তিনি বলেন, «اعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ فِي الْعَطِيَّةِ» কিছু প্রদানের ক্ষেত্রে তোমরা সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা করো। (১৭১) আবার তিনি পিতাদেরকে উপদেশ দিতেন, «وَلَا تَدْعُوا عَلَى أَوْلَادِكُمْ» তোমরা সন্তানসন্ততির প্রতি বদদোয়া করো না। (১৭২)
কারণ, হয়তো পিতামাতার পক্ষ থেকে এমন সময় বদদোয়া করা হলো, যখন তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে গেল। তখন এটা সন্তানের সারা জীবনের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে。
সেই সাথে ইসলামি বিধানে একটি শিশু জন্ম থেকেই তার পূর্ণ অধিকার ভোগ করার যোগ্যতা লাভ করে। জন্মের পর থেকেই সে যোগ্য হয়ে ওঠে উত্তরাধিকার, ওসিয়ত, ওয়াকফ ও দানের মালিকানা লাভের ক্ষেত্রে এবং সমজাতীয় সকল বিষয়ে। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়ে ক্রন্দন করলেই তাকে ওয়ারিশ করা হবে। (১৭৩)
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অল্পবয়স থেকেই সন্তানের প্রতি যত্নশীল হওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। যেমন সন্তানের প্রতি স্নেহশীল হওয়া, সহানুভূতি দেখানো, ভালোবাসা প্রদর্শন করা, তার সাথে খেলাধুলা করা, তাকে আনন্দে রাখা। যেমনটি আমরা আগেই মুসলমান শিশুদের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণের ক্ষেত্রে আলোচনা করে এসেছি।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রীতি ছিল শিশুর ইলম ও আমলের প্রতিও সজাগ দৃষ্টি দেওয়া, অন্যকে সম্মান করার শিক্ষা দেওয়া, ছোট থেকেই সর্বদা সত্যকথনে অভ্যস্ত করা, ভালো বন্ধুদের সংস্রবে রাখার চেষ্টা করা, তার জন্য দোয়া করা এবং আচরণগত দিক ও সামাজিকভাবেও তাকে গুরুত্ব দেওয়া।
এ সকল নীতি ও মূল্যবোধের পরিচর্চার মাধ্যমে একটি শিশু সমাজের মধ্যে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে সক্ষম হয়। এজন্য হজরত উমর রা. তার সন্তানকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মজলিসে নিয়ে যেতেন, যাতে নবীজির সান্নিধ্যে সন্তানেরা শিষ্টাচারের বাস্তব শিক্ষা নিতে পারে এবং অন্যকে সম্মান করার যোগ্যতা অর্জন করে। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণনা করে বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত ব্যক্তিদের বললেন, 'এমন একটি গাছ আছে, যার পাতা ঝরে পড়ে না এবং তা মুসলিমের দৃষ্টান্ত। তোমরা আমাকে বলো তো সেটা কোন গাছ?'
লোকজন তখন জঙ্গলের বিভিন্ন গাছগাছালির নাম ধারণা করতে লাগল। তবে আমার মনে হতে লাগল যে, এটি হবে খেজুর গাছ। কিন্তু আমি জবাব দিতে লজ্জাবোধ করছিলাম। এ সময় সাহাবিরা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনিই আমাদের তা বলে দিন।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এটা হলো খেজুর গাছ।'
ইবনে উমর রা. বলেন, অতঃপর (মজলিস থেকে ফিরে আসার পর) আমি আমার পিতাকে আমার মনে যা এসেছিল তা বললাম। তিনি বললেন, 'তুমি যদি (মজলিসে) তা বলতে অমুক অমুক জিনিস অর্জন করার চেয়ে আমি বেশি খুশি হতাম (অর্থাৎ, খুব খুশি হতাম)। (১৭৪)
এভাবেই আমাদের সন্তানদের ইসলামি মূল্যবোধ শিক্ষা করা উচিত, যেগুলো সমাজকে সুসংহত করে, সভ্যভব্য করে তোলে। তাহলে ধীরে ধীরে সন্তানরাও একদিন সামাজিক উন্নয়নে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হবে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা এক কিশোর উমর ইবনে আবু সালামা রা. (১৭৫)-এর একটি চমৎকার কথার মাধ্যমে আমরা এই পরিচ্ছেদের সমাপ্তি ঘটাতে চাই। উমর ইবনে আবু সালামা রা. বলেন, আমি শৈশবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিপালনের অধীনে ছিলাম। একদিন খাওয়ার সময় আমার হাত খাবারের বাসনে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছিল। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, 'হে বৎস, বিসমিল্লাহ বলে ডান হাতে আহার করো এবং তোমার সামনে থেকে খাও।' এরপর থেকে আমি সব সময় এ পদ্ধতিতেই আহার করতাম। (১৭৬) এমনই ছিলেন আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি তাঁর স্নেহ, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে বর্তমানের শিশু আর ভবিষ্যতের হয়ে ওঠা দায়িত্ববান ব্যক্তিদের শিখিয়েছেন ইসলামের সুমহান মূল্যবোধ ও শিষ্টাচার।
টিকাঃ
১৬৫. কোনো কিছুর প্রতি আশ্চর্য প্রকাশ বা উৎসাহ প্রদানের জন্য আরবরা এ বাক্যটি ব্যবহার করত।-সম্পাদক
১৬৬. সহিহ বুখারি: ৫০৯০, সহিহ মুসলিম: ১৪৬৬।
১৬৭. সুনানে তিরমিজি: ১০০৪。
১৬৮. গর্ভবতী মায়ের জন্য রমজানের রোজা না রাখার এ বিধান নিঃশর্ত নয়। যদি রোজা রাখার কারণে গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা হয়, কিংবা গর্ভবতী মায়ের মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয় থাকে, তাহলে রোজা রাখবে না। তার জন্য রোজা না রাখা ও ভাঙা জায়েজ আছে। পরবর্তী সময়ে এর কাজা করে নেবে। (ফাতাওয়ায়ে রহিমিয়া: ৭/৪০৪, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া: ৩/৪০৪)-সম্পাদক।
১৬৯. সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৫০, মুসনাদে আহমাদ: ১৯০৫৪।
১৭০. সুনানে আবু দাউদ: ২৮৪৪, মুসনাদে আহমাদ: ৬৮২২, মুসতাদরাকে হাকেম: ৭৫৯২।
১৭১. সহিহ বুখারি: ২৫৮৭, সহিহ মুসলিম: ১৬২৩।
১৭২. সহিহ মুসলিম: ৩০০৯, সুনানে আবু দাউদ: ১৫৩২।
১৭৩. সুনানে আবু দাউদ: ২৯২০, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৭৫০।
১৭৪. সহিহ বুখারি: ১৩১, সহিহ মুসলিম: ২৮১১।
১৭৫. তিনি হলেন উমর ইবনে আবু সালামা রা.। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন, ইবনে আবদুল বার রহ. রচিত আল-ইসতিআব: জীবনী নং: ১৬৯৯, ইবনে হাজার আসকালানি রহ. রচিত: আল-ইসাবা: জীবনী নং: ৫৭৪৪।
১৭৬. সহিহ বুখারি: ৫৩৭৬।
📄 নবীজি ﷺ ও শ্রমিক অধিকার
ইসলাম দাস-দাসী, কর্মচারী ও শ্রমিকদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করেছে। তাদের প্রতি বিশেষ যত্ন ও মনোযোগ দিয়েছে এবং মানব-ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইসলামই তাদের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ প্রাচীন কিছু সভ্যতায় শ্রম মানেই ছিল দাসত্ব ও পরাধীনতা, কিছু সভ্যতায় তার অপর নাম ছিল অপমান ও লাঞ্ছনা। কিন্তু ইসলাম চেয়েছে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে এবং তাদেরকে একটি পূর্ণ সম্মানজনক জীবন প্রদান করতে।
সেবক ও শ্রমিকদের প্রতি ইসলামের মহান দৃষ্টিভঙ্গির শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিত। সেখানে আমরা দেখতে পাই, নবীজির পক্ষ থেকে সর্বতোভাবে সেবক ও শ্রমিকদের সকল অধিকারের কথা স্বীকার করা হয়েছে। তিনি মালিকশ্রেণিকে আহ্বান করেছেন শ্রমিকদের সাথে মানবিক আচরণ করতে, তাদের প্রতি দয়াপরবশ হতে, সদাচারী হতে এবং সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ তাদের ওপর চাপিয়ে না দিতে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِخْوَانُكُمْ خَوَلُكُمْ جَعَلَهُمْ اللهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ، فَمَنْ كَانَ أَخُوهُ تَحْتَ يَدِهِ فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ، وَلَا تُكَلِّفُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ، فَإِنْ كَلَّفْتُمُوهُمْ فَأَعِينُوهُمْ»
তোমাদের দাস-দাসীরা (সেবক-সেবিকারা) তোমাদেরই ভাই-বোন। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। সুতরাং যার ভাই তার অধীনে থাকবে, সে নিজে যা খায়, তাকেও যেন তা খাওয়ায় এবং নিজে যা পরে, তাকেও যেন তা পরিধান করায়। তোমরা তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দিয়ো না, যা তাদের জন্য অসাধ্য। আর তোমরা যদি তাদেরকে এমন কঠিন কাজ করতে দাও, তাহলে তোমরা নিজেরাও তাদের সে কাজে সহযোগিতা করবে। (১৭৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্পষ্ট বাণী ‘দাস-দাসীরা তোমাদের ভাইবোন’ এসেছে। যেন তাদেরকে দাস-দাসীর স্তর থেকে ভাই-বোনের মর্যাদায় উন্নীত করে এবং এই সর্বজনীন নীতিমালা মানবজাতির সকল সদস্যের জন্য সম্মানজনক এক জীবনের ব্যবস্থা করে。
অন্যদিকে মালিকের জন্যও ইসলাম আবশ্যক করেছে, তারা যেন সেবক-সেবিকা ও শ্রমিকদের কাজের উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদান করে। পারিশ্রমিক প্রদানে তাদের প্রতি যেন অন্যায় ও বিলম্ব না করে। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «أَعْطُوا الْأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ» শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তাকে তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও। (১৭৮)
শ্রমিকদের প্রতি জুলুম করার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করে বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথের মাধ্যমে কোনো মুসলমানের সম্পদ আত্মসাৎ করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জাহান্নাম আবশ্যক করেন আর জান্নাত হারাম করে দেন।
এ সময় এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রাসুল, যদিও তা ক্ষুদ্র জিনিস হয়?'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'যদি তা বাবলা গাছের একটি শাখা হয়, তবুও।' (১৭৯)
তাদের আর্থিক অধিকার সব ধরনের প্রতারণা, শোষণ, অত্যাচার ও অবিচার থেকে সুরক্ষিত থাকা তাদের অন্যতম অধিকার। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা (হাদিসে কুদসিতে) বলেন,
ثَلَاثَةُ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ... وَرَجُلٌ اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَاسْتَوْفَى مِنْهُ وَلَمْ يُعْطِ أَجْرَهُ
কিয়ামতের দিন আমি নিজে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হব। (তাদের মধ্যে) একজন হলো এমন ব্যক্তি, যে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করে তার থেকে পরিপূর্ণ কাজ আদায় করল অথচ তার পারিশ্রমিক প্রদান করল না। (১৮০)
অতএব, যারা শ্রমিক বা দাস-দাসীর ওপর জুলুম করে, তাদের জেনে নেওয়া উচিত, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাকে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং কিয়ামতের দিন তিনি তাদের বিরুদ্ধে বাদী হবেন।
মালিকের জন্য উচিত হলো, শ্রমিকদের ওপর অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে না দেওয়া। যার ফলে তাদের শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং কাজ-কর্মে অক্ষম হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তুমি তোমার দাস-দাসী বা শ্রমিক থেকে যে পরিমাণ কাজের বোঝা কমিয়ে দেবে, তোমার আমলনামায় সেই পরিমাণ সওয়াব যুক্ত হবে। (১৮১)
ইসলামি বিধানে শ্রমিকদের অধিকারের আরেকটি উজ্জ্বল নিদর্শন হলো, দাস-দাসী ও শ্রমিকদের সাথে নম্র ও কোমল আচরণ করা। এটা শ্রমিকদের অধিকার। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে উৎসাহ দিতে গিয়ে বলেছেন, 'সে ব্যক্তি অহংকারী নয়, যে তার চাকরকে সঙ্গে নিয়ে খাওয়াদাওয়া করে, গাধায় চড়ে বাজারে যায়, ছাগল পালন করে এবং তার দুধ দোহন করে। (১৮২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোটা জীবনে নিজের বলা প্রতিটি কথার বাস্তব নমুনা ছিলেন। যেমন হজরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো নিজ হাতে কোনো কিছুকে আঘাত করেননি—কোনো স্ত্রীকেও নয়, কোনো সেবককেও নয়। (১৮৩)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম হজরত আনাস রা. ছিলেন এ বিষয়ের একজন বাস্তব সাক্ষী। তিনি সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। একদিন তিনি আমাকে কোনো কাজে পাঠাতে চাইলে আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম, আমি সেখানে যাব না।' তবে মনে মনে ছিল যে, আল্লাহর নবী আমাকে যে কাজের আদেশ করেছেন, আমি সে কাজে যাব। এই মনোভাব নিয়ে আমি বাইরে বের হলাম। যেতে যেতে একদল বালকের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। তারা বাজারে খেলাধুলা করছিল। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা দেখছিলাম। এমন সময় হঠাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেছন থেকে আমার ঘাড়ের ওপর হাত রাখলেন। আমি তাকিয়ে দেখি, তিনি হাসছেন। তারপর তিনি আমাকে বললেন, 'ছোট্ট আনাস! আমি তোমাকে যেখানে যাওয়ার আদেশ করেছিলাম সেখানে যাও।'
আমি বললাম, 'এখনই যাচ্ছি, ইয়া রাসুলাল্লাহ!'
হজরত আনাস রা. বলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি দীর্ঘ নয় কি সাত বছর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেবায় নিয়োজিত ছিলাম। আমার কোনো কাজের কারণে 'তুমি কেন এমনটা করেছ?' কিংবা কোনো কাজ করতে না পারলে 'তুমি কেন এটা করোনি?' বলেছেন বলে আমার মনে পড়ে না। (১৮৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেবকদের প্রতি এতটা খেয়াল রাখতেন যে, তাদের বিবাহ-বিষয়েও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চিন্তাভাবনা করতেন। যেমন হজরত রবিআ ইবনে কাব আল-আসলামি রা. বলেন, আমি তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম ছিলাম। একদিন তিনি আমাকে বললেন, 'হে রবিআ, তুমি কি বিবাহ করবে না?'
আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসুল, না। আমার বিবাহের কোনো ইচ্ছা নেই, স্ত্রীর ভরণপোষণের সামর্থ্য নেই। তা ছাড়া কোনো বস্তু আপনার থেকে আমাকে দূরে রাখুক, আমি তা চাই না। এ শুনে তিনি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।'
এরপর তিনি আবার আমাকে বললেন, 'হে রবিআ, তুমি কি বিবাহ করবে না?'
আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসুল, না। আমার বিবাহের কোনো ইচ্ছা নেই, স্ত্রীর ভরণপোষণেরও সামর্থ্য নেই। তা ছাড়া কোনো বস্তু আমাকে আপনার থেকে দূরে রাখুক, আমি তা চাই না। এ শুনে তিনি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।'
তবে পরমুহূর্তেই আমি এই বিষয়ে কিছুটা চিন্তাভাবনা করলাম এবং মনে মনে বলতে লাগলাম, 'আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসুল, আমার দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের বিষয়ে আপনিই সবচেয়ে ভালো জানেন।' আর আমি তখনই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, তিনি যদি তৃতীয়বার আমাকে এই কথা জিজ্ঞাসা করেন, তবে আমি 'হ্যাঁ' বলব (অর্থাৎ বিবাহ করতে রাজি আছি)। রবিআ রা. বলেন, তিনি আমাকে তৃতীয়বার জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে রবিআ, তুমি কি বিবাহ করবে না?'
এবার আমি বললাম, 'অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল, আপনি যা চান আমাকে আদেশ করুন।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'অমুক পরিবারের কাছে যাও।' (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কোনো এক আনসারি গোত্রের কাছে যেতে বলেছেন।) (১৮৫)
এমনইভাবে অমুসলিম সেবক বা খাদেমের প্রতিও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্নেহ-সহানুভূতি ছিল অবারিত। যেমনটি তিনি করেছেন এক ইহুদি বালকের সাথে, যে তাঁর খেদমত করত। একবার সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে যেতেন এবং খোঁজখবর নিতেন। তার মৃত্যু ঘনিয়ে এলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে গেলেন এবং তার মাথার কাছে বসে তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন।
বালকটি তখন জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে তার পিতার দিকে তাকাল। পিতা তাকে বলল, 'তুমি আবুল কাসিম (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কথা মেনে নাও।' পিতার সম্মতি পেয়ে বালকটি ইসলামগ্রহণ করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বালকটির বাড়ি থেকে আসার সময় বললেন, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি বালকটিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলেন।’ (১৮৬)
দাস-দাসী ও শ্রমিকদের অধিকার বিষয়ে এখানে অল্প কিছু বিষয় উপস্থাপন করা হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে এগুলো এমন একটি সময়ে বাস্তবায়িত করেছেন, যে সময়ে তাদের ওপর শুধু জুলুম, অত্যাচার ও কঠোরতার কথাই শোনা যেত।
টিকাঃ
১৭৭. সহিহ বুখারি: ৩০, সহিহ মুসলিম: ১৬৬১।
১৭৮. সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৪৪৩।
১৭৯. সহিহ মুসলিম: ১৩৭, সুনানে নাসায়ি ৫৪১৯, মুসনাদে আহমাদ: ২২২৯৩
১৮০. সহিহ বুখারি: ২২২৭, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৪৪২, মুসনাদে আবু ইয়ালা: ৬৪৩৬
১৮১. সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৩১৪, মুসনাদে আবু ইয়ালা: ১৪৭২।
১৮২. ইমাম বুখারি: আল-আদাবুল মুফরাদ: ২/৩২১।
১৮৩. সহিহ মুসলিম: ২৩২৮, সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮৬, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯৮৪।
১৮৪. সহিহ মুসলিম: ২৩১০, সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৭৩।
১৮৫. মুসনাদে আহমাদ: ১৬৬২৭, মুসতাদরাকে হাকেম: ২৭১৮।
১৮৬. সহিহ বুখারি: ১৩৫৬, সুনানে তিরমিজি: ২২৪৭, মুসতাদরাকে হাকেম: ১৩৪২。