📄 বংশধরদের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ
পিতামাতা ও সন্তানসন্ততির সাথে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের একটি বাস্তবসম্মত মানদণ্ড রয়েছে। সেই মানদণ্ডটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে সন্তানদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পিতার ভালোবাসা, আদর-স্নেহ, সহানুভূতি, পরম যত্ন, বিশুদ্ধ পরিচর্চা এবং সঠিক প্রতিপালনের ওপর। সন্তানদের জন্য পিতা হলো একটি নিরাপদ দুর্গ, যেখানে সন্তানরা সর্বদা আশ্রয় ও নিরাপত্তা খুঁজে পায়। কুরআনুল কারিম সম্পর্কের এই দৃঢ় বন্ধনকে স্থায়িত্ব দান করেছে, সন্তানের উদ্দেশে হজরত লুকমান আলাইহিস সালামের উপদেশ উল্লেখ করে সেখানে সন্তানকে প্রতিপালন করার সকল পদ্ধতিও শিখিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশচ্ছলে বলেছিল, পুত্র আমার, আল্লাহর সাথে শিরক করো না। নিশ্চিত জেনো, শিরক করা চরম জুলুম। [সুরা লুকমান: ১৩]
আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণে পিতা ও কন্যার এক চমৎকার হৃদয়স্পর্শী সম্পর্ক দেখতে পাই। সেই সম্পর্কের শোভা-সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন হজরত আয়েশা রা.। তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চলার ভঙ্গিতে ফাতেমা রা. আমাদের নিকট আগমন করলেন। তাকে দেখে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমার স্নেহের কন্যাকে অনেক অনেক মোবারকবাদ।' তারপর তাকে তাঁর ডান পাশে অথবা বামপাশে বসালেন এবং তার সাথে চুপিচুপি (কী যেন) কথা বললেন। তখন ফাতেমা রা. কেঁদে দিলেন। আমি তাকে বললাম, 'কাঁদছেন কেন?'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় তার সাথে চুপিচুপি কী যেন বললেন। এবার তিনি (ফাতেমা রা.) হেসে উঠলেন। আমি বললাম, 'আজকের মতো দুঃখের সাথে সাথে এমন খুশি আমি আর কখনো দেখিনি।' আমি তাকে (ফাতেমা রা.) জিজ্ঞাসা করলাম, 'তিনি (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আপনাকে কী বললেন?' ফাতেমা রা. বললেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপন কথা এখন প্রকাশ করতে পারব না।'
অবশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আমি আবার ফাতেমাকে সেদিনের বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমবার আমাকে বলেছিলেন, 'জিবরাইল আলাইহিস সালাম প্রতি বছর একবার আমার সাথে কুরআন পাঠের দাওর (শোনাশুনি) করতেন, কিন্তু এ বছর তিনি তা দুইবার করেছেন। আমার মনে হয়, আমার বিদায়কাল ঘনিয়ে এসেছে এবং আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই প্রথম আমার সাথে মিলিত হবে।' এ কথা শুনে আমি কেঁদে দিলাম। দ্বিতীয়বার তিনি আমাকে বলেছিলেন, 'তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, জান্নাতি মহিলাদের অথবা মুমিন মহিলাদের তুমি প্রধান (নেত্রী) হবে!' তখন এ কথা শুনে আমি হেসেছিলাম। (৯৮)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কন্যাকে স্নেহ-ভালোবাসা, আদর ও মমতার সাথে লালনপালন করেছেন। নিজের কন্যাকে গড়ে তুলেছেন।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় পুত্র ইবরাহিম(৯৯) যখন ইন্তেকাল করেন, তখনও প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর স্নেহ ও ভালোবাসার গভীরতা। তিনি যখন নিজের সন্তানকে সম্বোধন করে নিচের কথাগুলো বলেন, তখনও দেখা গিয়েছিল সন্তানের প্রতি পিতার হৃদয় নিংড়ানো স্নেহের অপার নিদর্শন। তিনি সন্তানকে সম্বোধন করে বলেন, 'হে ইবরাহিম, যদি তা (মৃত্যু) অবধারিত ও সত্য ওয়াদা না হতো, কিয়ামতের দিন একত্র হওয়ার কথা না থাকত এবং যদি তা সীমাবদ্ধ কিছু কাল ও সত্য সময় না হতো, তাহলে ইবরাহিম! আমরা তোমার জন্য যে কষ্ট পেয়েছি, তারচেয়ে আরও অধিক কষ্ট পেতাম। আমরা তোমার জন্য অবশ্যই দুঃখিত। চোখ অশ্রু বর্ষণ করছে। হৃদয় ব্যথিত হচ্ছে। তবে আমরা এমন কিছু বলছি না, যা আমাদের প্রভুকে অসন্তুষ্ট করে।'
নবী-পুত্র ইবরাহিমের ইনতেকালের পর তিনি সাহাবিদের বলেছিলেন, 'আমি না দেখা পর্যন্ত তোমরা তাকে কাফনে মুড়ে দিয়ো না।' এরপর তিনি তার নিকট এলেন, শায়িত ইবরাহিমের মৃত শরীরের দিকে ঝুঁকলেন এবং কেঁদে ফেললেন। (১০০)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের নাতি-নাতনিদের ক্ষেত্রেও অনেক যত্নবান ছিলেন। তাদেরকে অনেক আদর করতেন। ভালোবাসতেন। তাদের জন্য সুন্দর সুন্দর নাম নির্বাচন করে দিতেন। এ প্রসঙ্গে হজরত আলি রা. বলেন, যখন হাসান জন্মগ্রহণ করল আমি তার নাম রাখলাম 'হারব'। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন এবং বললেন, 'আমার নাতিকে নিয়ে এসো, তোমরা তার কী নাম রেখেছ? আমি বললাম, 'হারব।' তিনি বললেন, 'না, বরং তার নাম হাসান।' অতঃপর যখন হুসাইন জন্মগ্রহণ করল, তখনও আমি তার নাম 'হারব' রেখেছিলাম। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন এবং বললেন, 'আমার নাতিকে আমার নিকট নিয়ে এসো, তোমরা তার কী নাম রেখেছ?' আমি বললাম, 'হারব।' তিনি বললেন, 'না, বরং তার নাম হুসাইন।' এভাবে যখন আমার তৃতীয় সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো, তখনও আমি তার নাম রেখেছিলাম 'হারব'। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট এলেন এবং বললেন, 'আমার নাতিকে নিয়ে এসো, তোমরা তার কী নাম রেখেছ?' আমি বললাম, 'হারব।' তিনি বললেন, 'না, বরং তার নাম মুহসিন।'
এরপর তিনি বললেন, 'আমি তাদের এই নাম রেখেছি হজরত হারুন আলাইহিস সালামের সন্তানদের নামানুসারে। হারুন আলাইহিস সালাম তাঁর সন্তানদের নাম রেখেছিলেন শাবার, শুবাইর ও মুশবির।'(১০১)
নাতি-নাতনিদের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা ছিল অত্যধিক প্রগাঢ় ও গভীর। এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে বুরাইদা রা.-এর একটি বর্ণনা থেকে। তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে খুতবা দিচ্ছিলেন। এ সময় হজরত হাসান ও হুসাইন রা. লাল ডোরাবিশিষ্ট জামা পরিধান করে সেদিকে আসছিলেন। কিন্তু আসতে গিয়ে (কম বয়সী হওয়ায়) হোঁচট খেয়ে পড়ে যান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা বন্ধ করে মিম্বর থেকে অবতরণ করেন এবং তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় মিম্বরে আরোহণ করেন। এরপর তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা সত্যই বলেছেন,
إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানাদি পরীক্ষাস্বরূপ। [সুরা তাগাবুন : ১৫] আমি উভয়কে (পড়ে যেতে) দেখে আর সহ্য করতে পারিনি।' এরপর নবীজি আবার খুতবা দেওয়া শুরু করলেন। (১০২)
এমন ভালোবাসা তাঁর অন্য নাতি-নাতনিদের ক্ষেত্রেও ছিল। যেমন হজরত আবু কাতাদা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মেয়ে যায়নাবের কন্যা উমামা রা.-কে কাঁধে নিয়ে নামাজ আদায় করতেন। তিনি যখন সেজদায় যেতেন, তখন তাঁকে নামিয়ে রাখতেন। আবার যখন দাঁড়াতেন, তখন তাঁকে কাঁধে তুলে নিতেন। (১০৩)
স্নেহ ও ভালোবাসার এমনই আরেকটি চমৎকার ঘটনা আছে। ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ রা.। তিনি বলেন, একদিন বিকেলের কোনো এক নামাজের সময় (অর্থাৎ জোহর বা আসরে) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আগমন করলেন। তখন তিনি হাসান বা হুসাইন রা.-এর মধ্য থেকে একজনকে বহন করে আনলেন। ইমামতির জন্য সামনে অগ্রসর হয়ে তাকে ডান পাশে রেখে দিলেন। তারপর নামাজের জন্য তাকবির বললেন ও নামাজ শুরু করলেন। নামাজের মধ্যে একটি সেজদা অনেক দীর্ঘ করলেন। আমার বাবা (শাদ্দাদ) বলেন, আমি সেজদা থেকে মাথা উঠিয়ে দেখলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেজদারত আছেন আর বাচ্চাটি (হাসান বা হুসাইন) তাঁর পিঠের ওপর বসে রয়েছে। তারপর আমি আবার সেজদায় চলে গেলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ শেষ করলে লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আপনার নামাজের মধ্যে একটি সেজদা এত বেশি লম্বা করলেন, যা আগে কখনো করেননি। আমরা ধারণা করলাম, হয়তো এভাবেই আপনাকে আদেশ করা হয়েছে অথবা আপনার ওপর ওহি নাজিল হচ্ছে।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এগুলোর কোনোটিই ঘটেনি। বরং আমার নাতি আমাকে বাহন বানিয়েছিল (অর্থাৎ আমার ওপর উঠে বসেছিল)। তাই আমি সেজদা থেকে তাড়াতাড়ি উঠতে অপছন্দ করলাম, যাতে সে তার কাজ সমাধা করতে পারে।' (১০৪)
এমন স্নেহ-ভালোবাসার ঘটনা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে আকস্মিকভাবে দু-একটি ঘটলেও এটি ছিল তাঁর স্বভাবজাত ও উত্তম চরিত্রের অনন্য এক বৈশিষ্ট্য। হজরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার হাসান ইবনে আলি রা.-কে চুম্বন করেন। সেখানে তখন আকরা ইবনে হাবিস তামিমি রা. বসা ছিলেন। এটা দেখে আকরা ইবনে হাবিস রা. বললেন, 'আমার দশটি পুত্র আছে। অথচ আমি তাদের কাউকে কোনোদিন চুম্বন করিনি।' এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ
যে দয়া করে না, তাকেও দয়া করা হয় না। (১০৫)
তবে, সন্তানসন্ততি ও নাতি-নাতনিদের প্রতি এমন অপরূপ ভালোবাসা সত্ত্বেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কারণে কখনো অন্য কোনো মুসলমানকে কষ্টে ফেলেননি। বরং তাদেরকেই অন্য মুসলমানদের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করতে শিখিয়েছেন। যেমন বর্ণিত আছে,
হজরত আলি রা. একদিন হজরত ফাতেমা রা.-এর নিকট অভিযোগ করে বললেন, 'কুয়া থেকে মশক (বালতি) দিয়ে পানি টানতে টানতে আমার বুক ব্যথা হয়ে গেছে।' ফাতেমা রা.-ও বললেন, 'আল্লাহর কসম! আটা ভাঙানোর জাঁতা ঘুরাতে ঘুরাতে আমারও হাতে ফোঁসকা পড়ে গেছে।' তখন আলি রা. বললেন, 'ফাতেমা, তুমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যাও। তাঁর নিকট কিছু বন্দি গোলাম এসেছে, তুমি চাইলে হয়তো একজন গোলামকে তোমার খাদেম হিসেবে দিয়ে দেবেন।'
তখন ফাতেমা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গেলেন, কিন্তু শূন্য হাতেই ফিরে এলেন। পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাদের নিকট আগমন করলেন এবং তাদেরকে বললেন, 'তোমরা একজন খাদেম পাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে আমার নিকট গিয়েছিলে। আমি তোমাদের এমন একটি কথা বলে দিতে পারি, যা তোমাদের জন্য খাদেমের চেয়েও কল্যাণকর হবে। তোমরা যদি চাও, তাহলে আমি তোমাদের এমন একটি বিষয় বলে দেবো, যা তোমাদের জন্য খাদেমের চেয়েও কল্যাণকর হবে। সেটা হলো, তোমরা উভয়েই প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়বে। এরপর রাতে শোয়ার সময়েও একশবার পড়বে।' (১০৬)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তানদের কল্যাণকর বিষয় শিক্ষা দিতেন। তিনি তাদের শিখিয়েছেন যে, (তাদের প্রতি তাঁর অত্যধিক ভালোবাসা সত্ত্বেও) তিনি অন্য মুসলমানদের ওপর প্রাধান্য দিয়ে তাদেরকে ভালোবাসেন না। তিনি আল্লাহ তাআলার সাথে তাদের ভালোবাসার বন্ধন মজবুত করার শিক্ষা দিতেন। কেননা তাদের সকল কর্মে আল্লাহ তাআলাই সর্বোত্তম সাহায্যকারী। শুধু তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনাই একজন মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্যবান করে তোলে।
একজন পিতা ও নানা হিসেবে সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সাথে এমনটাই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পর্ক, যা প্রতিষ্ঠিত ছিল অপার স্নেহ, সহানুভূতি ও ভালোবাসার ওপর। তাঁর মহানুভব ছায়ায় পরিবারের সকলেই শান্তি ও স্বস্তি অনুভব করত। হে আল্লাহর রাসুল, পিতা ও নানা হিসাবে আপনি কতইনা মহান!
টিকাঃ
৯৮. সহিহ বুখারি: ৩৬২৩।
৯৯. ইবরাহিম : তিনি মারিয়া কিবতিয়া রা.-এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মুবারকের সাথে তার চেহারা অনেক মিল ছিল।-সম্পাদক
১০০. সহিহ মুসলিম : ২৩১৫। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হজরত আনাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যখন শিশু ইবরাহিমকে নিয়ে আসা হলো, তিনি তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন এবং আল্লাহর যা ইচ্ছা ছিল তাই বললেন। আনাস রা. বলেন, আমি দেখলাম ইবরাহিম অতি কষ্টে শ্বাস নিচ্ছে। (এ করুণ দৃশ্য দেখে) নবীজির দুচোখ বেয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। তিনি বললেন, 'চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে, হৃদয় অস্থির হচ্ছে, তবে আমার প্রভুর যাতে খুশি, তার বিপরীত কিছু বলব না। আল্লাহর কসম! হে ইবরাহিম, তোমার জন্য আমরা সবাই উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত।' সহিহ মুসলিম: ৫৮৫৩।
১০১. মুসনাদে আহমাদ: ৭৬৯, মুসতাদরাকে হাকেম : ৪৭৭৩।
১০২. সুনানে আবু দাউদ: ১১০৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬০০।
১০৩. সহিহ বুখারি : ৫১৬, সহিহ মুসলিম: ৫৪৩।
১০৪. সুনানে নাসায়ি : ১১৪১, মুসনাদে আহমাদ: ১৬০৭৬, মুসতাদরাকে হাকেম : ৪৭৭৫।
১০৫. সহিহ বুখারি : ৫৯৯৭, ৫৫৭১; সুনানে আবু দাউদ: ৫২১৮।
১০৬. সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫৫২৪, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ৭/৩৮।
📄 সাহাবিদের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ
মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি বড় নিয়ামত হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পারস্পরিক ভালোবাসা তথা ( الْحُبُّ فِي الله ) |
এই নিয়ামতের কারণে ইসলামের সূচনা হতেই মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ় ও মজবুত হয়েছে। অথচ এই মানুষগুলোই জাহিলিয়াতের যুগে একজন অপরজনের ‘প্রাণের শত্রু’ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে তারা যখন ইসলামে দীক্ষিত হলেন, তখন তারাই হয়ে গেলেন পরস্পরের প্রতি প্রাণ উৎসর্গকারী মুসলিম ভাই। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا
ফলে তাঁর (আল্লাহর) অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেলে। [সুরা আলে ইমরান : ১০৩] এরপর আল্লাহ তাআলা এই প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকেই একজন বান্দার জন্য তার প্রতিপালকের প্রতি ঈমানের পরিচয় হিসেবে ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
প্রকৃতপক্ষে সকল মুমিন পরস্পর ভাই ভাই। [সুরা হুজুরাত : ১০]
‘আল্লাহর জন্য’ একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা পোষণকারীদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক প্রশংসা করেছেন। আখিরাতের ময়দানে এই ভালোবাসার মহান সফলতার কথাও ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন,
«سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ فِي ظِلَّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ ... وَرَجُلَانِ تَحَابًا فِي اللَّهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ»
সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা সেদিন তাঁর (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দান করবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত কোনো ছায়া থাকবে না...। (সেই সাত শ্রেণির ব্যক্তির মধ্যে) এমন দুজন ব্যক্তি থাকবে, যারা পরস্পরকে ভালোবাসে আল্লাহর জন্য, একত্র হয় আল্লাহর জন্য এবং পৃথকও হয় আল্লাহর জন্য। (১০৭)
অন্যদিকে সাহাবিদের মাঝে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ঝগড়া-বিবাদকে তিনি অত্যন্ত অপছন্দ করেছেন। তিনি বলেন,
«لَا يَحِلُّ لِرَجُلٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ يَلْتَقِيَانِ؛ فَيُعْرِضُ هَذَا وَيُعْرِضُ هَذَا، وَخَيْرُهُمَا الَّذِي يَبْدَأُ بِالسَّلَامِ»
কোনো ব্যক্তির জন্য হালাল নয় যে, সে তার ভাইয়ের (মুসলিম ভাই) সাথে তিন দিনের বেশি এমনভাবে সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে যে, দুজনে সাক্ষাৎ হলেও একজন এদিকে আর অন্যজন ওদিকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। তবে তাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই উত্তম, যে প্রথম সালাম প্রদান করবে। (১০৮)
আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীতে দেখতে পাই, তাঁর আচরণে সাহাবিদের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসার প্রকাশ ঘটত। ফলে সকল সাহাবিই ধারণা করতেন যে, অন্যদের চেয়ে তাকেই বুঝি তিনি বেশি ভালোবাসেন। তাঁর জীবনচরিতে আমরা আরও পাই, তিনি তাঁর সাহাবিদের এমন কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কথা ব্যক্ত করেছেন, যেগুলো তাঁর এবং সাহাবিদের মাঝে গভীর হৃদ্যতা ও নৈকট্যের প্রতি ইঙ্গিত করে। যেমন হজরত জুবাইর ইবনে আওয়াম রা.-এর ক্ষেত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতিটি নবীরই একজন বিশেষ সাহায্যকারী থাকে আর আমার সাহায্যকারী হলো জুবাইর। (১০৯)
হজরত আবু বকর ও উমর রা. সম্পর্কে বলেছেন, প্রত্যেক নবীরই দুনিয়াবাসী থেকে দুজন পরামর্শদাতা থাকে, আমার জন্য তারা হলো আবু বকর ও উমর রা.। (১১০)
হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রা.-এর ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের 'কাতিমু সিররিহি', অর্থাৎ গোপন কথার সঙ্গী। (১১১)
আর হজরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা. সম্পর্কে তিনি বলেছেন, প্রত্যেক উম্মতের একজন আমানতদার থাকে, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা. হলো এই উম্মতের আমানতদার। (১১২)
এভাবে আমরা তাঁর জীবনীতে আরও দেখতে পাই, সান্নিধ্য ও ভালোবাসা বৃদ্ধির জন্য তিনি সাহাবিদের সাথে পানাহারে অংশগ্রহণ করতেন এবং তাদেরকেও তাঁর পানাহারে অংশীদার করাতেন। যেমন হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, একবার আমি আমাদের ঘরে বসা ছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। তিনি ইশারায় আমাকে ডাকলেন। আমি উঠে তাঁর নিকট গেলাম। তিনি আমার হাত ধরলেন। এরপর আমরা উভয়ে রওয়ানা হলাম। অবশেষে তিনি তাঁর এক স্ত্রীর ঘরে প্রবেশ করলেন। কিছুক্ষণ পর আমাকেও প্রবেশের অনুমতি দিলেন। আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম। নবীজির স্ত্রী পর্দার আড়ালে ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'খাওয়ার কিছু আছে কি?'
বললেন, 'হ্যাঁ। অতঃপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য তিনটা রুটি এনে দস্তরখানে রাখা হলো। তিনি একটি রুটি তুলে নিজের সামনে রাখলেন। আরেকটি রুটি তুলে আমার সামনে রাখলেন। এরপর তৃতীয় রুটিটি হাতে নিয়ে দুই ভাগ করে অর্ধেকটা নিজের সামনে এবং বাকি অর্ধেক আমার সামনে রাখলেন। অতঃপর তিনি আবার বললেন, 'কোনো তরকারি আছে কি?'
তারা বললেন, 'না, তবে সামান্য সিরকা আছে।' নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'সেটাই নিয়ে এসো। সেটাও তো উত্তম তরকারি। (১১৩)
এমনইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাস্যরস ও মজার আলোচনার মধ্যেও সাহাবিদের শরিক করতেন। তবে তাঁর হাস্যরসও ছিল সত্যাশ্রিত। সাহাবিদের সাথে এই হাস্যরস ছিল তাঁর নৈকট্য, ঘনিষ্ঠতা ও ভালোবাসা বৃদ্ধির অন্যতম উপকরণ। এমনই এক চমৎকার ও মজার হাস্যরসের ঘটনা বর্ণনা করেছেন হজরত আনাস রা.।
তিনি বলেন, প্রায়ই এক গ্রাম্য বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসত। লোকটির নাম ছিল 'যাহির'। সে গ্রাম থেকে আসার সময় নবীজির জন্য কিছু উপহার নিয়ে আসত। প্রয়োজন সেরে বাড়িতে ফেরার সময় নবীজিও তাকে কিছু হাদিয়া দিয়ে দিতেন। একদিন তিনি মজা করে বললেন, 'যাহির হলো আমাদের গ্রাম আর আমরা হলাম তার শহর।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে খুব ভালোবাসতেন। অথচ লোকটি দেখতে তেমন সুন্দর ছিল না। একবার নবীজি তার নিকট গিয়ে দেখলেন, সে বাজারে পণ্য বিক্রি করছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপিসারে তার পেছনের দিকে গিয়ে তার চোখ ধরে বললেন, 'বলো তো আমি কে?'
সে বলতে থাকল, 'আমাকে ছাড়ো। তুমি কে?' পরে মাথা ঘুরিয়ে দেখল এবং নবীজিকে চিনতে পারল। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ধরে বলতে লাগলেন, 'কে এই গোলামকে (সাহাবি যাহিরকে) ক্রয় করবে?'
তখন বেদুইন যাহির বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কসম! এই গোলাম তো অচল। (এত কুৎসিত গোলামকে কে কিনবে! বিনিময়ে আপনি সামান্য পয়সাও পাবেন না।)'
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'কিন্তু আল্লাহর নিকট তুমি অচল নও।' অথবা তিনি বললেন, 'বরং আল্লাহর নিকট তুমি অনেক মূল্যবান।' (১১৪)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা সাহাবিদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতেন। তাদের সকলের সাথে মিলেমিশে থাকতেন। তাদেরকে মর্যাদা দিতেন। তাদের খুশিতে খুশি হতেন এবং তাদের দুঃখে দুঃখী হতেন।
মুসলমানদের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোতেও সাহাবিদের সাথে আমরা তাঁকে দেখতে পেয়েছি তাদেরই একজন হিসেবে। যে কারণে তারা চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হতেন, তিনিও সে কারণে চিন্তিত হতেন। তারা যে কারণে কষ্ট পেতেন, তিনিও সে কারণে কষ্ট পেতেন। নিজের ক্ষুধার কথা ভুলে তিনি তাদের ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা করতেন। তাদের দুঃখ ও কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করতেন। খন্দকযুদ্ধের ময়দানে মুসলমানদের ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণা থাকা অবস্থায়, জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা.-এর প্রস্তুতকৃত খাবারের স্বল্পতা সত্ত্বেও তিনি সাহাবিদের রেখে নিজে পরিতৃপ্ত হয়ে খাওয়াটা পছন্দ করেননি, অথচ জাবির রা. শুধু তাঁকে একাই খাওয়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে ঘোষণা দিলেন, 'হে খন্দকবাসী! জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. তোমাদের জন্য খাবারের আয়োজন করেছে, তাই তোমরা সকলেই আমার সাথে চলো।'(১১৫)
সাহাবিদের জীবনে আপতিত যেকোনো বিপদ বা সংকটময় মুহূর্তে তিনি তাদের সঙ্গ দিতেন। বিভিন্নভাবে তাদেরকে সান্ত্বনা দিতেন। কখনো আখিরাতে আল্লাহর পক্ষ হতে উত্তম প্রতিদান ও সওয়াব অর্জনের সুসংবাদ দিয়ে। আবার কখনো সংকট থেকে উত্তরণের বাস্তব কোনো সমাধানের পথ বাতলে দিয়ে। এমনই এক সংকটময় মুহূর্তে সুসংবাদের মাধ্যমে সান্ত্বনা প্রদান করেন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা.-কে, যখন আবু সুফিয়ান ইবনে হারব অন্যায়ভাবে তার জমি দখল করে বিক্রি করে দিয়েছিল। আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এই বিপদের কথা উল্লেখ করলেন, তখন নবীজি তাকে সুসংবাদ দিয়ে বললেন, 'হে আবদুল্লাহ, আল্লাহ জান্নাতে তোমাকে এর চেয়ে উত্তম বাড়ি দান করবেন, এতে কি তুমি খুশি নও?' জবাবে তিনি বললেন, 'অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল!' নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাহলে তোমার জন্য সেখানে তা-ই রয়েছে।'(১১৬)
একবার এক সাহাবি ব্যবসার উদ্দেশ্যে ফল খরিদ করে লোকসানের শিকার হলেন। এতে তার ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেল এবং তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়লেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন লোকদের বললেন, 'তোমরা তার জন্য সদকা করো।'
লোকেরা তাকে দানসদকা করল। কিন্তু সেগুলোও তার সকল ঋণ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট হলো না। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণদাতাদের বললেন, 'এখান থেকে তোমরা যে পরিমাণ পাচ্ছ, সেটা গ্রহণ করে নাও। তোমরা এর অধিক আর কিছু পাবে না।' (১১৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সাহাবিদের উত্তম সঙ্গী। তিনি তাদের সঙ্গ দিয়েছেন তাদের হাসি-কান্নায়, তাদের সুখ-দুঃখে এবং তাদের দুর্বলতা ও শক্তিতে। তিনি নিজেকে কখনো বিশেষ মর্যাদায় মর্যাদাবান মনে করে তাদের থেকে পৃথক হয়ে থাকতেন না; বরং তিনি নিজের খাদ্য-খাবার ও পোশাক-আশাকে তাদের মতোই সাধারণ জীবনযাপন করতেন, যেন তিনি তাদেরই একজন। অনেক অমুসলিম তাঁর এই অসাধারণ চারিত্রিক গুণের কারণে যারপরনাই আশ্চর্যবোধ করত। আরও আশ্চর্য হতো তাঁর জন্য সাহাবিদের সুতীব্র ভালোবাসা ও ব্যাকুলতা দেখে। এ কারণে আবু সুফিয়ান ইবনে হারব অমুসলিম অবস্থায় বলেছিলেন, আমি কোনো মানুষকে এত বেশি ভালোবাসতে দেখিনি, যেমন মুহাম্মাদের সাথীরা মুহাম্মাদকে ভালোবাসে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। (১১৮)
টিকাঃ
১০৭. সহিহ বুখারি : ৬৬০, ৬২৭।
১০৮. সহিহ বুখারি : ৬০৭৭।
১০৯. সহিহ বুখারি : ২৮৪৬।
১১০. সুনানে তিরমিজি : ৩৬৮০, মুসতাদরাকে হাকেম : ৩০৪৬।
১১১. সহিহ বুখারি : ৩৭৪২।
১১২. সহিহ বুখারি : ৪৩৮০।
১১৩. সহিহ মুসলিম : ২০৫২।
১১৪. মুসনাদে আহমাদ: ১২৬৬৯।
১১৫. সহিহ বুখারি : ২৯০৫, ২৮৫৩; সহিহ মুসলিম : ২০৩৯।
১১৬. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/২৮, সুহাইলি : আর-রওজুল উনুফ: ৪/১৬৬।
১১৭. সহিহ মুসলিম : ১৫৫৬, ৩৮৩৬, সুনানে তিরমিজি : ৬৫৫, সুনানে নাসায়ি : ৪৫৩০, সুনানে আবু দাউদ : ৩৪৬৯।
১১৮. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/১৭২।
📄 সৈনিকদের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ
নেতৃত্বের যোগ্যতা এমন একটি গুণ, যার জন্য আল্লাহ তাআলা বিশেষ কিছু ব্যক্তিকে নির্বাচন করেছেন। তারা হলেন অন্যদের তুলনায় নেতৃত্ব প্রদানে অনন্য ও অসাধারণ। এই নেতৃত্বপ্রদানকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বাধিক যোগ্য হলেন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রেরিত নবী ও রাসুলগণ। তারা তাদের জাতি-গোষ্ঠীকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে পরিচালিত করেছেন। কুরআনুল কারিম অনেক নবী ও রাসুলের ঘটনা উল্লেখ করেছে এবং তাদের জাতি-গোষ্ঠীর সাথে নবী-রাসুলদের আচরণের বিষয়গুলো বিস্তারিত বর্ণনা করেছে, যাতে এগুলো আগত এবং অনাগত সকল নেতার জন্য নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الأَلْبَابِ)
নিশ্চয় তাদের ঘটনায় বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের উপাদান আছে। [সুরা ইউসুফ: ১১১]
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এ সকল নবী প্রেরণের ধারাবাহিকতায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়াতে সর্বশেষ নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। সুতরাং তিনি হলেন মানব-ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিতের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, জীবনের সকল বিষয়ে তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ নেতা, হোক তা পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কিংবা সামরিক। নিজের সৈন্যদের মানসিকতা ও সক্ষমতা সম্পর্কে তাঁর যথেষ্ট ও সঠিক ধারণা ছিল। এজন্য তিনি তাদের অন্তরে ইসলামি মূল্যবোধের প্রধান নীতিগুলোর বীজ বপন করেছেন। তিনি সকল কাজে তাদের জন্য সঠিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্থির করে দিয়েছেন। আর সেটা হলো, মানুষকে মানুষের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর আনুগত্যের দিকে বের করে আনা। আর এই ক্ষেত্রেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন উত্তম আদর্শ এবং অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। ফলে আমরা দেখতে পাই, কুরাইশ নেতৃবর্গ যখন তাঁর নিকট দুনিয়ার বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে দাওয়াত থেকে বিরত থাকার প্রস্তাব পেশ করেছিল, তখন তিনি তাদেরকে বলেছিলেন,
'আমি তোমাদের নিকট যে বার্তা নিয়ে এসেছি, এর মাধ্যমে আমি তোমাদের সম্পদ চাই না, তোমাদের মাঝে সম্মান ও মর্যাদাও চাই না। তোমাদের ওপর কর্তৃত্বও করতে চাই না। বরং আল্লাহ তাআলা আমাকে তোমাদের সকলের নিকট রাসুল করে পাঠিয়েছেন এবং আমার ওপর তাঁর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আমাকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তোমাদের (জান্নাতের) সুসংবাদ প্রদান করি এবং (জাহান্নামের) ভীতি প্রদর্শন করি। আমি আমার প্রতিপালকের বার্তা তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। তোমাদের মঙ্গল কামনা করেছি। তোমরা যদি এটা গ্রহণ করে নাও, তবে তোমরা দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণের অধিকারী হবে। আর যদি না মানো, তাহলে আমি আল্লাহ তাআলার জন্যই ধৈর্যধারণ করব, যতক্ষণ না মহিমান্বিত আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সত্য ফয়সালা করে দেন।' (১১৯)
অতএব দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিজের লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার। কাফেরদের শত অস্বীকার ও বিরোধিতা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সাহায্যের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আস্থা ও বিশ্বাস।
এরপর আমরা দেখি, আল্লাহ তাআলার প্রতি নিজের আস্থাশীলতার গুণ তিনি তাঁর সাহাবিদের মাঝেও সঞ্চারিত করেছেন। হজরত খাব্বাব ইবনে আরত রা. তার প্রতি কুরাইশদের নির্মম নির্যাতনের বিষয়ে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অভিযোগ করলেন, তখন নবীজি তাকে বললেন, 'আল্লাহর কসম! আল্লাহ এ দ্বীনকে অবশ্যই পূর্ণতা দান করবেন (এবং সর্বত্র নিরাপদ ও শান্তিময় অবস্থা প্রতিষ্ঠিত করবেন)। তখন একজন উষ্ট্রারোহী সানআ(১২০) থেকে হাজরামাউত (১২১) পর্যন্ত (নিরাপদে) ভ্রমণ করবে, (এ দীর্ঘ পথে সে) আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করবে না। অথবা তার মেষপালের জন্য নেকড়ের ভয়ও করবে না। কিন্তু তোমরা (ওই সময়ের অপেক্ষা না করে) তাড়াহুড়া করছ। (১২২)
আমরা আরও দেখতে পাই, তিনি প্রত্যেক যোগ্য ব্যক্তিকে তার উপযুক্ত স্থানই প্রদান করতেন। ব্যক্তির যোগ্যতা ও সক্ষমতা সম্পর্কেও তিনি খুব ভালোভাবে অবগত ছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে এ সকল অনুগত মানুষের ওপর নির্ভর করেই একজন নেতা তার নেতৃত্ব পরিচালনা করবেন। নেতৃত্বের মূল উপাদানই হলো এ সকল যোগ্য মানুষ। সুতরাং সৈন্যদের সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান নেতা এবং সৈন্যদের মাঝে একটি পারস্পরিক গভীর সম্পর্ক তৈরি করে এবং তাদেরকে যুদ্ধের ময়দানে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করে, এমনকি কাজের প্রতি তাদের অগ্রগামিতা এবং স্বতঃস্ফূর্ততা তৈরি করে। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমরা আমাদের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীতে দেখতে পাই। বদরযুদ্ধের দিন জায়গা নির্বাচনের ক্ষেত্রে হজরত হুবাব ইবনে মুনজির ইবনে জামুহ রা. (যিনি যুদ্ধক্ষেত্র সম্পর্কে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের বর্তমান এই জায়গাটি ভালো নয়। অতএব আপনি সবাইকে নিয়ে এখান থেকে এগিয়ে চলুন। আমরা ওই কূপের কাছে গিয়ে ছাউনি স্থাপন করব, যা কুরাইশদের অতি নিকটে। এরপর আমরা সে জায়গার আশপাশের অন্য কূপগুলো বন্ধ করে দেবো। আমরা আমাদের জায়গায় একটি হাউজ তৈরি করে তাতে পানি ভরে রাখব। পরে আমরা শত্রুপক্ষের সাথে লড়াই করব। তখন আমরা পানি পান করতে পারব কিন্তু ওরা পানি পাবে না।' এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি সঠিক পরামর্শ দিয়েছ।'(১২৩)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক সাহাবির সঠিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত ছিলেন। কারণ, সাহাবিদের মধ্যে একেকজন একেক বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে তাদের এই বিশেষ গুণ ও বৈশিষ্ট্যগুলো খুব ভালোভাবে চিনতেন ও বুঝতেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর মাঝে কোনো দ্বিধা বা অস্পষ্টতা ছিল না। একজন নেতার জন্য এটি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণে তিনি বিভিন্ন সাহাবির বৈশিষ্ট্য বর্ণনার ক্ষেত্রে বলেছেন, 'আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দয়ার্দ্র হলো আবু বকর রা.। আর আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সবচেয়ে কঠোর হলো উমর রা.। তাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি লজ্জাশীল হলো উসমান রা.। আর সবচেয়ে বিচক্ষণ বিচারক হলো আলি ইবনে আবু তালিব রা.। আল্লাহর কিতাবের সর্বোত্তম তিলাওয়াতকারী হলো উবাই ইবনে কাব রা.। আর হালাল-হারাম সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞাত হলো মুআজ ইবনে জাবাল রা. এবং ফারায়েজ (সম্পত্তি বণ্টন) সম্পর্কিত বিষয়ে সবচেয়ে জ্ঞানী হলো যায়েদ ইবনে সাবিত রা. এবং উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম আমানতদার হলো আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা. এবং হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা. হলো আল্লাহর সিংহ।'(১২৪)
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন অসাধারণ নেতা ও পরিচালক। এই ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল সামরিক ক্ষেত্র। বদরযুদ্ধের অবিস্মরণীয় বিজয় ছিল তাঁর যোগ্য নেতৃত্বের বাস্তব প্রতিফলন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তিনি সৈন্যদের সারিবদ্ধভাবে সজ্জিত করেন, যাতে কুরাইশবাহিনীর সম্মুখে তারা তাদের পূর্ণ ক্ষমতা ও যোগ্যতা প্রদর্শন করতে পারে। এরপর কুরাইশরা যখন মল্লযুদ্ধের আহ্বান জানাল, তখন তিনি তিনজন শক্তিশালী সৈন্যকে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য নির্বাচন করলেন। তাঁর নির্বাচন ছিল অত্যন্ত সফল ও কার্যকরী। আগে থেকেই তিনি তাদের অবস্থা ও মানসিকতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন। তাই তিনি সম্মুখ লড়াইয়ের জন্য তিনজনকে আহ্বান করে বললেন, 'ওঠো, হে উবাইদা ইবনে হারেস। ওঠো, হে হামজা এবং ওঠো, হে আলি। আল্লাহর হুকুমে তাদের হাতে উতবা, শাইবা ও ওয়ালিদ ইবনে উতবা নিহত হয় আর উবাইদা রা. কিছুটা আহত হন। মুসলমানদের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধের আগে এটি ছিল মুশরিকদের জন্য একটি মানসিক পরাজয়। এ যুদ্ধে মুসলমানরা কাফেরদের ৭০ জনকে হত্যা করে আর বন্দি করে আরও ৭০ জনকে। (১২৫)
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৈনিকদের মাঝে বিভিন্ন উদ্যম, উদ্যোগ ও সৃজনশীল মানসিকতা তৈরি করেছিলেন। এ সকল গুণ তাদেরকে নতুন কোনো সমস্যায় দ্রুত ও কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম করে তোলে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও এর কিছু প্রকৃষ্ট উদাহরণ ও আদর্শ স্থাপন করেছেন। যেমন আমরা হুদাইবিয়াতে কুরাইশদের সাথে তাঁর সন্ধির বিষয়ে দৃষ্টি দিতে পারি। এটা ছিল একজন রাসুল ও নেতার পক্ষ থেকে গভীর দূরদর্শিতা এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতার এক অভূতপূর্ব উদাহরণ। কারণ, প্রথম এই চুক্তির মাধ্যমেই মুসলমানগণ রাজনৈতিকভাবে কুরাইশদের সমশক্তিসম্পন্ন একটি জাতি-গোষ্ঠী হিসেবে পরিগণিত হয়। এর মাধ্যমেই আসে সবচেয়ে শক্তিশালী শত্রুদের কাছ থেকে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রথম স্বীকৃতি, যারা আরববিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের নেতৃত্ব দিত। এ ছাড়াও এটি (হুদাইবিয়ার সন্ধি) ছিল সকল গোত্রের সমন্বিত একটি চুক্তি, যা মূলত মুসলমানদের সাহায্য করেছিল নিরাপত্তার সাথে নিজেদের ধর্ম পালন করতে এবং অন্য জাতি ও গোত্রের মাঝে সেটাকে প্রচার ও প্রসার করতে। সুতরাং এই চুক্তিটি ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গভীরতম অন্তর্দৃষ্টির একটি উজ্জ্বল প্রমাণ। (১২৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গভীর দূরদর্শিতা ও সৃষ্টিশীলতার আরেকটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো তাঁর হিজরতের নিখুঁত পরিকল্পনা। শুরুতেই তিনি প্রিয় সঙ্গী আবু বকর রা.-কে নির্বাচন করেন, যিনি ছিলেন সাহাবিদের মধ্যে মর্যাদাগত দিক দিয়ে সর্বোত্তম। এরপর নির্বাচন করেন হিজরতের পথ। এ ক্ষেত্রে তিনি সেই পথই নির্বাচন করেন, যা ছিল কুরাইশদের পরিচিত পথ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর, সেটি ছিল উপকূলীয় পথ। তিনি জাবালে সওর বা সওর পাহাড়ের গুহায় তিনদিন অবস্থান করেন। যাতে এ সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়। তিনি মুশরিক আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিতকে পথপ্রদর্শক হিসেবে নির্বাচন করেন এবং আবু বকর রা.-এর ছেলে আবদুল্লাহকে নিযুক্ত করেন কুরাইশদের সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য। এরপর পরিপূর্ণ নিরাপত্তার স্বার্থে গুহা-মুখের চারপাশে বকরি চরানোর জন্য তিনি আমের ইবনে ফুহাইরাকে নিযুক্ত করেন। এটি ছিল এক নিখুঁت পরিকল্পনা। এরপর বাহ্যিক এত ব্যবস্থাপনার পরও নবীজির নেতৃত্বের মহত্ত্ব ও অনন্যতা প্রকাশ পেয়েছে আল্লাহ তাআলার প্রতি তাঁর ঐকান্তিক ভরসা করার মাধ্যমে। (১২৭) তিনি তাঁর সঙ্গী আবু বকর রা.-কে বলেন,
مَا ظَنُّكَ بِاثْنَيْنِ اللَّهُ ثَالِثُهُمَا
আবু বকর! ওই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, যার তৃতীয় হলেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা! (অর্থাৎ ভয়ের কিছু নেই। তিনি আমাদের সাথেই আছেন। তিনিই আমাদের সাহায্য করবেন।) (১২৮)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এইসব মূল্যবোধ ও নীতিমালাকে শুধু মৌখিক শব্দ এবং কর্মহীন কথামালা দ্বারাই প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং তিনি এসব ক্ষেত্রে নিজের পরিচালিত কর্মপন্থা এবং বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে সকলের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ ও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তিনি তাঁর নম্রতা, সহনশীলতা, সহানুভূতি ও ধৈর্যশীল আচরণে এবং তাঁর সকল কথা ও কাজের মাধ্যমে অন্যদের প্রভাবিত করেছেন। খন্দকযুদ্ধের দিকে দৃষ্টি ফেরালে আমরা দেখতে পাই, তিনি সৈন্যদের মনোবল বাড়িয়ে তোলার জন্য এবং মানসিক প্রফুল্লতা অব্যাহত রাখার জন্য খন্দক খননের কাজে নিজেও অংশগ্রহণ করেছেন।
[মানচিত্র নং-২ খন্দক যুদ্ধ (শাওয়াল ৫ হিজরি)]
এই চিত্রটি অতি সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.-এর কথায়। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাটি সরানোর চিত্র বর্ণনা করে বলেন, (আমরা দেখেছি) তিনি তাঁর শুভ্র সুন্দর পেটের ওপরে লেগে থাকা মাটি ঝাড়ছিলেন। (১২৯)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এভাবে সবার সাথে অংশগ্রহণ এবং প্রফুল্লতা প্রদান যুদ্ধের ময়দানে সাহাবিদের কষ্ট লাঘবে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। এমনকি শত্রুদের মদিনায় পৌঁছানোর আগেই কাজ শেষ করার প্রতি এগুলো তাদের মাঝে উৎসাহ, উদ্যমতা ও স্পৃহা তৈরি করেছিল। এসব কারণে খুব সহজেই প্রমাণিত হয়, তিনি ছিলেন জগতের শ্রেষ্ঠ নেতা ও রাসুল।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের মধ্যে অবিচল থাকার মানসিকতা তৈরি করেছিলেন এবং তিনি নিজেও এই মূল্যবান গুণে গুণান্বিত ছিলেন। আমরা তাঁর এই অবিচল থাকার উপমা দেখতে পাই খন্দকযুদ্ধের শেষে তাঁর নির্দেশের মধ্যে। তিনি সাহাবিদের বলেন,
لَا يُصَلِّيَنَّ أَحَدُ الْعَصْرَ إِلَّا فِي بَنِي قُرَيْظَةَ
তোমরা কুরাইজা গোত্রের এলাকায় পৌঁছার আগে কেউ আসরের নামাজ পড়বে না। (১৩০)
এটি ছিল সৈন্যদের প্রতি একজন সেনাপতির সুদৃঢ় নির্দেশ। সেই নির্দেশনায় সাহাবিরা প্রবল উদ্যমে অগ্রসর হয়েছিলেন বিশ্বাসঘাতক এবং শত্রুদের সাহায্যকারী বনু কুরাইজাকে প্রতিহত করার জন্য।
সৈন্যদের প্রতি ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতুলনীয় দৃষ্টান্ত ও আদর্শ স্থাপন করেছিলেন। যেমন, বদরযুদ্ধের দিন তিনি সাহাবিদের কাতার ঠিক করছিলেন। সকলকে সমান কাতারে দাঁড় করাচ্ছিলেন। তিনি তাঁর হাতে থাকা একটি তির দিয়ে কাতার সোজা করছিলেন। এ সময় সাওয়াদ ইবনে গাজিয়া রা. (১৩১) কাতার থেকে একটু সামনে অগ্রসর হয়ে পড়েন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পাশ দিয়ে অতিক্রমের সময় হাতের তির দিয়ে তার পেটে সামান্য খোঁচা দিয়ে বললেন, 'সাওয়াদ, তুমি কাতারে সমান হয়ে দাঁড়াও।'
এ সময় সাওয়াদ রা. বলে উঠলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমাকে ব্যথা দিলেন? অথচ আল্লাহ তাআলা আপনাকে সত্য ও ন্যায়সহ প্রেরণ করেছেন! আপনি আমাকে এর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ দিন।'
সাওয়াদ রা.-এর এই কাণ্ড দেখে সকল সাহাবিই বিস্মিত ও হতভম্ব হয়ে পড়েন। সাওয়াদ এটা কী বলে! কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎক্ষণাৎ তাঁর পেটের কাপড় সরিয়ে নিলেন এবং তাকে প্রতিশোধ নিতে বললেন। তখন সাওয়াদ রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জড়িয়ে ধরে পেটে চুমু খেলেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'সাওয়াদ, তুমি এমন করলে কেন?'
সাওয়াদ রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের সামনে যে ভয়াবহ অবস্থা, লড়াইয়ের দিন, এটা আপনিও দেখছেন। তাই আমার বড় আকাঙ্ক্ষা জাগল জীবনের এই শেষ মুহূর্তে আমার শরীর আপনার পবিত্র শরীরের স্পর্শে ধন্য হোক।'
সাওয়াদ রা.-এর এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কল্যাণের জন্য অনেক দোয়া করলেন। (১৩২)
সৈন্যদের প্রতি এমনই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ। এভাবেই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং প্রতিটি যুদ্ধে তিনি ছিলেন একজন আদর্শবান মানুষ এবং মানবিক নেতা। তাঁর এ সকল পরিচালনা ছিল জগতের নিকট এক নতুন ধরনের উন্নত নেতৃত্ব, যা তিনি প্রাপ্ত হয়েছিলেন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। যাতে কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত সকল নেতা ও শাসক তাঁর এই আদর্শগুলো অনুসরণ করে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পারে।
টিকাঃ
১১৯. সহিহ বুখারি : ৪০৮, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৪৭৯।
১২০. ইয়ামেনের রাজধানী।-সম্পাদক
১২১. ইয়ামেনের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি শহর।-সম্পাদক
১২২. সহিহ বুখারি : ৩৪১৬, সুনানে আবু দাউদ: ২৬৪৯, মুসনাদে আহমাদ: ২১০৯৫।
১২৩. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৬২০, সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ : ৩/৬২, ইমাম তাবারি : তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক : ২/২৯।
১২৪. হাদিসটিকে ইমাম বুখারি রহ. 'মানাকিবুস সাহাবা' ও মুসলিম রহ. 'ফাজায়িলুস সাহাবা' অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। আর ইমাম তিরমিজি রহ. উল্লেখ করেছেন 'মানাকিব' অধ্যায়ে। সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৫৪।
১২৫. ইবনে কাছির : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/৪২৩, ইবনে সাইয়েদিন নাস : উয়ুনুল আছার : ১/৩৭১, ইমাম তাবারি : তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক : ২/২২।
১২৬. মাহমুদ শিত খাত্তাব : আর-রাসুলুল কায়িদ : ২৮৮।
১২৭. সুহাইলি : আর-রওজুল উনুফ: ২/৩১৫, ইবনে কাছির: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ا : ৩/১৭৯-১৮২, ইবনুল কাইয়িম: জাদুল মাআদ : ৩/৪৫।
১২৮. সহিহ বুখারি : ৩৬৫৩, ৩৯২২, ৩৩৯১; সহিহ মুসলিম: ২৩৮১, সুনানে তিরমিজি : ৩০৯৬।
১২৯. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৪৯৫। ইবনে কাছির : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/৩০৬। সুহাইলি : আর-রওজুল উনুফ : ২/৩৩৬।
১৩০. সহিহ বুখারি : ৯৪৬, সহিহ মুসলিম : ১৭৭০, সহিহ ইবনে হিব্বান : ১৪৮৪।
১৩১. তিনি সাওয়াদ ইবনে গাজিয়া আনসারি। বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। এরপর আরও বহু যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তিনিই বদরযুদ্ধের দিন খালেদ ইবনে হিশাম আল-মাখজুমিকে বন্দি করেছিলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে খায়বারের গভর্নর নিযুক্ত হন। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন ইবনুল আছির : উসদুল গাবাহ : ২/৫৬১, ইবনে আবদুল বার : আল-ইসতিআব: ২/৬৭৩।
১৩২. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৬২৬, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/৪১০।
📄 অপরিচিতদের সাথে নবীজি ﷺ-এর আচরণ
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবী বা রাসুল হওয়ার অন্যতম উজ্জ্বল প্রমাণ হলো, অপরিচিতদের সাথেও তাঁর অনন্যসুন্দর আচরণ।
কেননা, আমরা সাধারণত পরিচিত ব্যক্তিদের সাথে ভালো ব্যবহার করি আর অপরিচিতদের সাথে করি রূঢ় আচরণ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সীমাহীন দয়া করেছেন। তাঁকে একটি বিনয়-নম্র হৃদয় দান করেছেন এবং পরিচিত-অপরিচিত সকলের সাথেই নম্র ব্যবহারের হৃদয়গ্রাহী গুণে গুণান্বিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ﴾
(হে নবী,) এটা আল্লাহর রহমতই ছিল, যার কারণে আপনি মানুষের সাথে কোমল আচরণ করেছেন। আপনি যদি রূঢ় প্রকৃতির ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে গিয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে যেত। [সুরা আলে ইমরান : ১৫৯]
তাঁর জীবনে অপরিচিতদের সাথে চমৎকার ব্যবহারের অনেক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা রয়েছে। যেমন আমরা এখানে উম্মে মাবাদের সাথে সংঘটিত ঘটনাটি স্মরণ করতে পারি। উম্মে মাবাদের ভাই হুবাইশ ইবনে খালেদ বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা থেকে হিজরতের উদ্দেশ্যে মদিনার পথে বের হলেন, সাথে ছিলেন আবু বকর রা., ছিলেন আবু বকরের গোলাম আমের ইবনে ফুহাইরা আর তাদের পথ দেখাচ্ছিলেন আবদুল্লাহ আল-লাইছি। উম্মে মাবাদের তাঁবুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তারা তার থেকে কিছু খেজুর ও গোশত কিনতে চাইলেন। কিন্তু পরিবারটির নিকট তারা এ জাতীয় কিছু পেলেন না। কেননা পরিবারটি ছিল দুর্ভিক্ষপীড়িত। এ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের তাঁবুর একপাশে একটি শীর্ণকায় বকরি দেখতে পেলেন। নবীজি সেটা দেখিয়ে বললেন, 'উম্মে মাবাদ, এই বকরিটার কী অবস্থা?'
উম্মে মাবাদ বলল, 'অতি দুর্বলতার কারণে সে বকরির পালের সাথে অগ্রসর হতে পারেনি, তাই এখানে পড়ে আছে।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এটার কি দুধ দোহন করা সম্ভব?'
উম্মে মাবাদ বলল, 'এমন চেষ্টা করাও অনর্থক হবে।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি কি আমাকে বকরিটির দুধ দোহনের অনুমতি দেবে?'
সে বলল, 'আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক! আপনি যদি সক্ষম হন তবে দুধ দোহন করুন।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বকরিটির নিকটে গিয়ে বকরিটির ওলান স্পর্শ করলেন, বিসমিল্লাহ বললেন এবং বরকতের দোয়া করলেন। আল্লাহ তাআলার কুদরতে তৎক্ষণাৎ বকরিটির ওলান দুধে পূর্ণ হয়ে গেল। শরীর হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠল। মুখে জাবর কাটতে লাগল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি পাত্র চাইলেন। পাত্র প্রদান করা হলে তিনি সেই পাত্র পূর্ণ করে দুধ দোহন করলেন, এমনকি দুধ উপচে পড়ার উপক্রম হলো। এরপর তিনি পরিতৃপ্তির সাথে পান করলেন। তাঁর সঙ্গীরাও পরিতৃপ্তির সাথে পান করলেন। এরপর অন্যরাও (উম্মে মাবাদের পরিবার) তৃপ্তির সাথে দুধ পান করল। অতঃপর পুনরায় তিনি প্রথমবারের মতো দুধ দোহন করে পাত্রটি পূর্ণ করলেন। এরপর এটা উম্মে মাবাদের নিকট অর্পণ করলেন, তার থেকে কিছুটা ক্রয় করলেন অতঃপর আবার সবাইকে নিয়ে সেখান থেকে নিজেদের পথে রওয়ানা করলেন। (১৩৩)
এই ঘটনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্বের প্রকাশ ঘটেছে। তিনি এখানে উম্মে মাবাদের সাথে ন্যায়পূর্ণ আচরণ করেছেন। অথচ তিনি বের হয়েছেন মুহাজির হিসেবে। সাথে তেমন কোনো পাথেয় নেই, না খাবার, না পানি। আর উম্মে মাবাদ তাঁকে চিনত না। খুব সহজেই তিনি তার থেকে সম্পদ নিয়ে নিমেষে চোখের আড়াল হয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে নবীসুলভ আচরণ করেছেন। জোর করে অন্যের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া ডাকাত ও দস্যুদের মতো আচরণ করেননি।
অপরিচিতদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন অনন্যসাধারণ আচরণ অনেক সাহাবির ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার অন্যতম প্রধান উপলক্ষ্য হয়েছে। এভাবে তাদের নিকট তাঁর নবুয়তের সত্যতা এবং উম্মতের প্রতি তাঁর সীমাহীন দরদ ও ভালোবাসা উদ্ভাসিত হয়েছে। নবীজির এই আচরণ তাদেরকে ইসলামের জন্য উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করেছে। যেমন মুনজির ইবনে জারির রা. তার পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন, আমরা একবার সকালের দিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত ছিলাম। এ সময় তাঁর কাছে জুতাহীন, বস্ত্রহীন, গলায় চামড়ার আবা পরিহিত এবং ঝুলন্ত তরবারি সাথে নিয়েই একদল লোকের আগমন ঘটল। এদের অধিকাংশ সদস্য কিংবা সকলেই ছিল মুজার গোত্রের লোক। অভাব-অনটনে তাদের এই করুণ অবস্থা দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখমণ্ডল বিবর্ণ ও বিষণ্ণ হয়ে গেল। তিনি নিজের কামরায় প্রবেশ করলেন। অতঃপর আবার বেরিয়ে এলেন। বিলাল রা.-কে আজান দিতে নির্দেশ দিলেন। বিলাল রা. আজান ও ইকামত দিলেন। নামাজ শেষ করে নবীজি উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন এবং এ আয়াত পাঠ করলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
হে মানবজাতি! তোমরা নিজেদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের মাত্র একজন ব্যক্তি থেকে (আদম আলাইহিস সালাম) সৃষ্টি করেছেন। এবং তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার সঙ্গিনী। এবং তাদের দুজনের মাধ্যমে অনেক পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় করো, যার দোহাই দিয়ে তোমরা একে অন্যের নিকট প্রার্থনা করো। এবং আত্মীয়তার সম্পর্ককেও ভয় করে চলো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। [সুরা নিসা : ১]
অতঃপর তিনি সুরা হাশরের শেষদিকের এই আয়াত পাঠ করলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আর প্রত্যেক ব্যক্তি যেন ভবিষ্যতের (আখিরাতের) জন্য কী সঞ্চয় করেছে সেদিকে লক্ষ করে এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। [সুরা হাশর: ১৮]
এরপর উপস্থিত লোকদের কেউ একটি দিনার, কেউ একটি দিরহাম, কেউ কাপড়, কেউ-বা এক সা'(১৩৪) আটা আবার কেউ এক সা' খেজুর দান করল। অবশেষে তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'অন্তত এক টুকরো খেজুর হলেও তোমরা নিয়ে এসো।' আনসার সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি একটি বড় থলে নিয়ে এলেন। থলের ভারে তার হাত নুয়ে পড়ছিল। এরপর লোকেরা সারিবদ্ধভাবে একের পর এক দান করতে লাগল। ফলে খাদ্য ও কাপড়ের দুটো স্তুপ হয়ে গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মুবারক স্বর্ণের মতো জ্বলজ্বল করতে লাগল। অতঃপর তিনি বললেন, 'যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে কোনো উত্তম কাজের প্রচলন করে, সে তার এই কাজের সওয়াব পাবে এবং তার পরে যারা এ কাজ করবে, সে এর বিনিময়েও সওয়াব পাবে। তবে এতে তাদের সওয়াবের কোনো অংশ কমানো হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে (ইসলাম পরিপন্থী) কোনো খারাপ কাজের প্রচলন করবে, তাকে এ কাজের বোঝা (গুনাহ ও শান্তি) বহন করতে হবে। তারপর যারা এই কাজ করবে, তাদের সমপরিমাণ বোঝা তাকেও বইতে হবে। তবে এতে তাদের অপরাধ ও শান্তির কোনো অংশই কমবে না।' (১৩৫)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণ অপরিচিত ব্যক্তিদের সাথেও সুন্দর আচরণ করেছেন। বরং তাঁর এই অমায়িক অনন্যসাধারণ আচরণ অন্যদের ইসলামগ্রহণের কারণ হয়েছিল। যেমন যায়েদ ইবনে সাআনা রা.। তিনি ছিলেন একজন ইহুদি পাদরি। তিনি নিজের ইসলামগ্রহণের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, নবুয়তের আলামতসমূহের মধ্যে সকল আলামতই আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু মাত্র দুটি আলামতের পরীক্ষা বা প্রত্যক্ষ দর্শন তখনও আমার বাকি ছিল। আলামত দুটি হলো : ১. সহনশীলতা তাঁর ক্রোধের ওপর প্রবল হবে। ২. তাঁর সাথে যতই মূর্খতাসুলভ আচরণ করা হবে, ততই তাঁর সহনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
তারপর যায়েদ ইবনে সাআনা বললেন, আমি নবীজির এই দুটি আলামত পরীক্ষা করার সুযোগ খুঁজতে লাগলাম। তাঁর সাথে মিশতে লাগলাম, যাতে আলামত দুটি প্রত্যক্ষ করতে পারি। একদিন তিনি নিজের ঘরের বাইরে এলেন। তখন তাঁর সাথে ছিলেন হজরত আলি রা.। ইতিমধ্যে বেদুইনের মতো দেখতে এক লোক এসে আবেদন করল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমার গোত্র ইসলামগ্রহণ করেছে। আমি তাদেরকে বলেছিলাম, মুসলমান হয়ে গেলে তোমাদের রিজিকের আর কোনো অভাব থাকবে না। কিন্তু এখন তারা অনাবৃষ্টির কারণে দুর্ভিক্ষপীড়িত হয়ে পড়েছে। ভীষণ অভাব-অনটন তাদেরকে আঁকড়ে ধরেছে। আমার ভয় হচ্ছে, এ অবস্থায় তারা ইসলাম ছেড়ে না দেয়! তারা হয়তো যে সচ্ছলতার আশা নিয়ে ইসলামগ্রহণ করেছিল, আবার একই আশায় ইসলাম পরিত্যাগ করবে। যদি ভালো মনে করেন, তবে আপনি তাদেরকে কিছু সাহায্য করুন।'
লোকটির এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পাশের ব্যক্তি উমর রা.-এর দিকে তাকালেন। উমর রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, কিছুই তো মজুদ নেই।'
তখন আমি (যায়েদ ইবনে সাআনা) বললাম, 'হে মুহাম্মাদ, যদি আপনি অমুক ব্যক্তির বাগানের এই পরিমাণ খেজুর নির্দিষ্ট মেয়াদের শর্তে আমার নিকট বিক্রি করেন, তবে আমি অগ্রিম মূল্য দিয়ে দেবো এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে খেজুর নিয়ে নেব।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে ইহুদি, এটা হতে পারে না। বরং তুমি যদি বাগান নির্দিষ্ট না করো (শুধু খেজুরের পরিমাণ নির্দিষ্ট করো), তবে আমি এই চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারি।'
আমি তাঁর প্রস্তাব মেনে নিলাম এবং তিনি আমার সাথে চুক্তিবদ্ধ হলেন আর আমি আমার থলের মুখ খুলে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ খেজুরের মূল্য হিসেবে আশি মিছকাল (এক মিছকাল=৪.৫ গ্রাম) স্বর্ণ প্রদান করলাম। তিনি এই স্বর্ণ সেই বেদুইন ব্যক্তির হাতে দিয়ে বললেন, 'এগুলো দিয়ে তাদের অভাব দূর করে দাও।' (যায়েদ ইবনে সাআনা পরবর্তী সময়ে মুসলমান হন এবং তাবুক যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন।) (১৩৬)
সুন্দর হয়, আমরা যদি অপরিচিত ব্যক্তিদের সাথে নবীজির অমায়িক আচরণের একটি চমৎকার ঘটনা দিয়ে এই পরিচ্ছেদটি শেষ করি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ। অতিথিদের আপ্যায়নের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যধিক আগ্রহী। কিন্তু নিজের দরিদ্রতার কারণে তাঁর এই মনোবাসনা অনেক সময় অপূর্ণ রয়ে যেত।
একবার এক অপরিচিত 'আনসারি যুবক' মেহমান হিসেবে তাঁর নিকট আগমন করলেন। ঘটনাটি হজরত আবু হুরাইরা রা. বলেন, যুবকটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, আমি ভীষণ ক্ষুধার্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাঁর একজন স্ত্রীর কাছে কোনো খাবার আছে কি না তা খোঁজ নেওয়ার জন্য পাঠালেন। স্ত্রী বলে পাঠালেন, সেই সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, পানি ছাড়া আমার কাছে কোনো খাবার নেই। এরপর তিনি তাঁর আরেক স্ত্রীর কাছে পাঠালেন। সেখান থেকেও একই উত্তর এলো। এভাবে একে একে শেষ পর্যন্ত সকলেই একই কথা বলে পাঠালেন যে, সেই সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, পানি ছাড়া আমার নিকট এখন কোনো খাবার নেই।
তখন তিনি উপস্থিত লোকদের বললেন, 'এমন কে আছে যে আজ রাতে এই লোকটির মেহমানদারি করতে পারে? আল্লাহ তাআলা তার প্রতি অনুগ্রহ করবেন।' এক আনসারি সাহাবি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমি তার মেহমানদারি করাব...।' (১৩৭)
এভাবেই আমাদের প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপরিচিতদের সাথেও অত্যন্ত সুন্দর ও অমায়িক আচরণ করেছেন। এটা ছিল তাঁর নবুয়তের সত্যতার ওপর অন্যতম প্রমাণ। কেননা, তিনি তাঁর জীবনের সকল কাজে সকলের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত সহানুভূতিশীল, দয়ার্দ্র এবং উদার মনের অধিকারী।
টিকাঃ
১৩৩. মুসতাদরাকে হাকেম : ৪২৭৪।
১৩৪. এক সা' = ৩২৭০.৬০ গ্রাম (প্রায়)। সূত্র: মাসিক আল কাউসার, জুলাই-আগস্ট ২০১১।-সম্পাদক
১৩৫. সহিহ মুসলিম: ২৩৯৮, সুনানে নাসায়ি: ২৫৫৪, মুসনাদে আহমাদ : ১৯২২৫।
১৩৬. সহিহ ইবনে হিব্বান : ২৮৮, মুসতাদরাকে হাকেম : ৬৫৪৭।
১৩৭. সহিহ মুসলিম : ২০৫৪, সহিহ ইবনে হিব্বان : ৫২৮৬।