📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 নবীজি ﷺ-এর সাহসিকতা ও বীরত্ব

📄 নবীজি ﷺ-এর সাহসিকতা ও বীরত্ব


কুরআনুল কারিম মুমিনদের সব সময় সাহসী হতে উৎসাহিত করেছে। কুরআনুল কারিমের আয়াতগুলোই হলো সেই উৎসারিত ঝরনাধারা, যার স্রোতধারা থেকেই মুসলিম উম্মাহ পান করে সাহসিকতার পানি। এ কারণে আল্লাহ তাআলা এই উম্মত ও তাঁর রাসুলকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ الَّذِيْنَ يَشْرُوْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ وَمَنْ يُقَاتِلُ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ فَيُقْتَلُ أَوْ يَغْلِبُ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
সুতরাং যারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবনকে বিক্রি করে, তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করুক। যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে, অতঃপর নিহত বা জয়যুক্ত হবে (সর্বাবস্থায়), আমি তাদেরকে মহা পুরস্কার দান করব। [সুরা নিসা : ৭৪]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের সকল কথা এবং কাজ ছিল বীরত্বের উচ্চতম নিদর্শন। আমরা যদি তাঁর জীবনচরিতের দিকে অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিই, তাহলে দেখতে পাব, জীবন চলার পথে যেকোনো পরিস্থিতি কিংবা যেকোনো বিপদে তিনি ছিলেন দৃঢ় মনোবলের অধিকারী, প্রবল বিশ্বাসী এবং অসীম সাহসের অধিকারী। এজন্যই আল্লাহ তাআলা তাঁর উদ্দেশে বলেন,
فَقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا تُكَلِّفُ إِلَّا نَفْسَكَ وَحَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ
(হে নবী) আপনি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করুন। আপনার ওপর আপনার নিজের ছাড়া অন্য কারও দায়ভার নেই এবং মুমিনদের উৎসাহ দিতে থাকুন। [সুরা নিসা : ৮৪]
শৈশব থেকেই এ ধরনের বীরত্ব ও সাহসিকতা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উন্নত চরিত্রের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল। যার নমুনা হিসেবে আমরা দেখতে পাই, তিনি তাঁর চাচাদের সাথে ‘ফিজার’ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, যখন তাঁর বয়স পনেরোও পেরোয়নি।(৬৯) এ ছাড়া নির্জন মরুভূমির সুউচ্চ পর্বতের হেরা গুহায় দীর্ঘদিন তিনি একাকী অবস্থান করেছেন।(৭০) এ কারণে নবুয়ত-পরবর্তী সময়ের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর যে বীরত্বের প্রকাশ ঘটেছে, তাতে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই। সাহসিকতা ছিল তাঁর স্বভাবজাত। আর এগুলো নিছক কোনো কথার কথা নয়, বরং তাঁর জীবনজুড়ে এর অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। কোনো ধরনের দ্বিধা, সংকোচ ও ভীরুতা ছাড়া তিনি সারাজীবন অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। যেমন ইসলামি দাওয়াতের শুরুলগ্নেই তিনি মুশরিকদের বিভিন্ন বাধার মুখোমুখি হন। তিনি তাদের এমন বিষয়ের দাওয়াত দেন যা ছিল তাদের নিকট খুবই অপছন্দের। এজন্য তারা এটা গ্রহণ করতে এবং মেনে নিতে রাজি হয়নি। তারা নতুন এই আহ্বানের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে। তবে তাদের এই বাধা ও ভীতিপ্রদর্শন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াতের রাস্তা থেকে সামান্যতমও বিরত রাখতে পারেনি। এর মাধ্যমে তিনি উম্মতের সামনে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সেটা হলো, দৃঢ় সাহসিকতার সাথে, সাধ্যের সবটুকু শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রকাশ্যে বাতিলের সামনে সত্যের আওয়াজকে তুলে ধরতে হবে, যদিও শত্রুপক্ষ সত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং সর্বশক্তি ব্যয় করে সত্যকে প্রতিহত করতে চায়।
জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসীম সাহসিকতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে জুলুম প্রতিহত করার ক্ষেত্রে। কোনো ধরনের ভয় বা দ্বিধা ছাড়াই তিনি জালেমের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। তিনিই আমাদের সেই নবী, যিনি অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং অত্যাচারীকে প্রতিহত করে অত্যাচারিতের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন। যেমন ইবনে হিশাম রহ. বলেন, ইরাশ গোত্রের এক ব্যক্তি উট বিক্রির উদ্দেশ্যে মক্কায় এলে আবু জাহেল তা ক্রয় করে। কিন্তু দাম পরিশোধে সে টালবাহানা শুরু করে। নিরুপায় হয়ে সেই ইরাশি লোক কুরাইশদের একটি সভাস্থলে এসে উপস্থিত হয়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সেখানে মসজিদের একপাশে বসেছিলেন। ইরাশি লোকটি তাদেরকে বলল, 'হে কুরাইশরা, তোমাদের মধ্যে কেউ আছে কি, যে আবু জাহেলের নিকট থেকে আমার উটের দাম আদায় করে দেবে? আমি একজন বিদেশি মুসাফির। সে আমার অধিকার (মূল্য) আদায়ে গড়িমসি করছে।'
তখন মজলিসের লোকেরা তাকে বলল, 'তুমি কি ওই বসা লোকটি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে দেখতে পাচ্ছ? তুমি তার কাছে যাও। সে আবু জাহেল থেকে তোমার পাওনা আদায় করে দেবে।'
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু জাহেলের মধ্যকার শত্রুতার কথা জানত বলেই তারা মজা করার জন্য এমনটি বলেছিল।
ইরাশি লোকটি নবীজির সামনে এসে বলল, 'হে আল্লাহর বান্দা, আবু জাহেলের কাছে আমার কিছু পাওনা রয়েছে, কিন্তু আমাকে দুর্বল পেয়ে সে তা আদায়ে গড়িমসি করছে। আমি একজন বিদেশি মুসাফির। আমি ওই মজলিসের লোকদের নিকট তার থেকে আমার হক আদায়ের ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা আপনাকে দেখিয়ে দিয়েছে। আপনি আমার পাওনা আদায় করে দিন, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটির কথা শুনে বললেন, 'তার কাছে চলো।'
এ কথা বলে তিনি নিজেও লোকটির সাথে চললেন। এটা দেখে মজলিসের লোকেরা একজনকে বলল, 'তুমি তাঁর অনুসরণ করো আর সে কী করে দেখে এসো।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে বের হয়ে সোজা আবু জাহেলের বাড়ি এসে উপস্থিত হলেন এবং তার দরজার কড়া নাড়লেন।' সে ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করল, 'কে?'
নবীজি বললেন, 'আমি মুহাম্মাদ। বাইরে আসুন।'
আবু জাহেল বাইরে বেরিয়ে এলো। এ সময় ভয়ে-আতঙ্কে তার মুখ ছিল বিবর্ণ। প্রাণ যেন বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'আপনি এই লোকটির পাওনা দিয়ে দিন।'
আবু জাহেল বলল, 'হ্যাঁ, একটু দাঁড়াও, আমি এখনই তার পাওনা দিয়ে দিচ্ছি।' এই বলে সে ভেতরে চলে গেল এবং লোকটির পাওনা এনে তাকে দিয়ে দিলো। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এলেন এবং ইরাশি ব্যক্তিকে বললেন, 'তুমি এবার নিজের কাজে চলে যাও।'
ইরাশি ব্যক্তিটি আবার সেই মজলিসে গিয়ে হাজির হলো এবং তাদের লক্ষ্য করে বলল, 'আল্লাহ তাআলা তাঁকে (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে) উত্তম বিনিময় দিন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার পাওনা আদায় করে দিয়েছেন।'
এদিকে কুরাইশদের প্রেরিত সেই লোকটিও ফিরে এলো। তারা জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কী দেখলে বলো?'
লোকটি বলল, 'আমি আজ এক বিস্ময়কর বিষয় প্রত্যক্ষ করেছি। আল্লাহর কসম! তিনি গিয়ে শুধু আবু জাহেলের দরজায় করাঘাত করলেন, তখন আবু জাহেল বেরিয়ে এলো। ভয়ে তার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। মুহাম্মাদ তাকে বললেন, এই লোকটির পাওনা দিয়ে দিন। আর সে বলল, একটু দাঁড়াও, এক্ষুনি তার পাওনা দিয়ে দিচ্ছি। এই বলে সে ভেতরে গেল এবং তার পাওনা এনে তাকে দিয়ে দিলো।'
একটু পরে আবু জাহেল নিজেও সেই মজলিসে এসে উপস্থিত হলো। তখন মজলিসের লোকেরা তাকে তিরস্কার করে বলল, 'আপনার কী হলো? আল্লাহর কসম! আজ যা করলেন, আমরা কখনো আপনাকে এমন করতে দেখিনি।'
আবু জাহেল বলল, 'ধিক তোমাদের! আল্লাহর কসম! সে গিয়ে যখন আমার দরজায় করাঘাত করল এবং আমি তার সামনে বেরিয়ে এলাম, দেখলাম তাঁর মাথার ওপর একটি ভয়ানক উট দাঁড়িয়ে আছে। উটটির মাথা বৃহদাকার, কাঁধ চওড়া এবং দাঁতগুলো ধারালো। এমন ভয়ংকর উট আমি আগে কখনো দেখিনি। আল্লাহর কসম! তখন আমি যদি তার পাওনা পরিশোধ করতে অস্বীকার করতাম, তবে সেই উট আমাকে আস্ত গিলে ফেলত। (৭১)
একইভাবে তাঁর পরিবার এবং সাহাবিদের বিপদের সময়ও তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত সাহসিকতার স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে। এ বিষয়ে হজরত আনাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে সাহসী এবং সবচেয়ে দানশীল। এক রাতে মদিনাবাসী এক বিকট শব্দ শুনে ঘাবড়ে গেল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু তালহা রা.-এর জিনবিহীন ঘোড়ায় চড়ে তরবারি ঝুলিয়ে সেখানে পৌঁছে গেলেন। তিনি তখন লোকদের লক্ষ্য করে বলছিলেন, 'তোমরা ভীত হয়ো না, তোমরা ভীত হয়ো না।' অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি এটাকে দ্রুতগামী পেয়েছি।' (অর্থাৎ এটি একটি দ্রুতগামী ঘোড়ার আওয়াজ ছিল।) (৭২)
যুদ্ধের ময়দানেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতার অনুপম দৃষ্টান্ত ও আদর্শ রেখে গেছেন। তাঁর বীরত্ব ছিল আলোকিত মশালের ন্যায়। পরবর্তী সময়ে সাহাবায়ে কেরাম যার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে হজরত আলি রা. বলেন, যখন যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত, একদল অন্যদলের ওপর তীব্র গতিতে আক্রমণ করত, আমরা তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে চিন্তিত থাকতাম (না জানি তাঁর কোনো ক্ষতি হয়ে যায়)! কেননা, তাঁর চেয়ে শত্রুবাহিনীর অধিক নিকটে আমাদের মধ্যে আর কেউ যেত না। (৭৩)
উহুদ যুদ্ধের সংকটময় মুহূর্তে শত্রুবাহিনীর তীব্র আক্রমণের ফলে মুসলমানরা যখন সাময়িক পরাজয়ের মুখে আপতিত হয়, তখনও আমরা তাঁকে নির্ভীক ও সাহসী দেখতে পাই। তিনি তখনও মুশরিক নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিলেন। এ সময় উবাই ইবনে খালফ ময়দানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্ধান পেয়ে তাঁর নিকট এগিয়ে এসে বলল, 'হে মুহাম্মাদ, আজ তুমি বেঁচে গেলে আমার আর রক্ষা নেই।' তখন মুসলমানরা জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কেউ কি তার দিকে অগ্রসর হব?'
নবীজি বললেন, 'তাকে তার অবস্থায় ছেড়ে দাও (অর্থাৎ তাকে আসতে দাও)।'
এরপর উবাই ইবনে খালফ যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছাকাছি চলে এলো, তখন নবীজি হারেস ইবনে সিমমা রা. থেকে একটি বর্শা নিয়ে এমন শক্তিমত্তার সাথে ঝাঁকুনি দিলেন যে, আমরা চারদিকে এমনভাবে ছিটকে পড়লাম, ভীমরুলের ঝাঁক যেমন উটের তাড়া খেয়ে উটের পিঠ থেকে উড়ে যায়। এরপর তিনি উবাই ইবনে খালফের দিকে অগ্রসর হলেন এবং তার ঘাড়ে আঘাত হানলে সে ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ে এবং মাটিতে কয়েকবার গড়াগড়ি খায়। অবশেষে মক্কায় ফেরার পথে মারা যায়। (৭৪)
হজরত মিকদাদ ইবনে আমর রা. উহুদ যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃঢ়তা ও সাহসিকতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, সেই সত্তার কসম! যিনি তাঁকে সত্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন! তিনি যুদ্ধ করতে করতে শত্রুবাহিনীর এত নিকটে পৌঁছে যেতেন যে, তাঁর এবং শত্রুর মাঝে মাত্র এক বিঘতের ব্যবধান থাকত। তিনি একেবারে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে যেতেন। সাহাবিরাও যুদ্ধ করতে করতে একসময় তাঁর নিকটে পৌঁছে যেত, আবার তাঁর থেকে দূরে সরে যেত। আমি তাঁকে দেখতাম, তিনি কখনো দাঁড়িয়ে ধনুক থেকে তির নিক্ষেপ করছেন। আবার কখনো পাথর নিক্ষেপ করছেন। ফলে কাফেররা দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আপন স্থানে) অবিচল আছেন। যেমন তিনি তার সাথে যুদ্ধের কষ্ট সহ্যকারী বাহিনীর মাঝে অবিচল থাকতেন। (৭৫)
এ ছাড়া হুনাইনের যুদ্ধের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, মানব সভ্যতার ইতিহাসে তা এক উজ্জ্বল সাহসিকতার দৃষ্টান্ত হিসেবে রয়ে যাবে।
[মানচিত্র নং-১ হুনাইন যুদ্ধ (৮ হিজরি)]
এটা তখন ঘটেছিল, যখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সৈন্যবাহিনী পিছু হটতে লাগল। তখন তিনি নিজের বাহন থেকে নিচে নামলেন এবং (আল্লাহর কাছে) দোয়া করে সাহায্যের প্রার্থনা করলেন। আর বলতে থাকলেন,
«أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِب... أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِب»
আমি যে নবী, তা মিথ্যা নয়, আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।
এবং তিনি দোয়ার মধ্যে বলতে লাগলেন, اَللَّهُمَّ نَزَّلْ نَصْرَكَ — হে আল্লাহ, তুমি তোমার সাহায্য নাজিল করো।(৭৬)
সেদিন যুদ্ধের ময়দানে তাঁর চেয়ে দৃঢ় এবং শত্রুর অধিক নিকটবর্তী আর কাউকে দেখা যায়নি। (৭৭) শত্রুবাহিনীর মোকাবিলায় তিনি সেদিন তাদের সামনে একাই দৃঢ়পদ ছিলেন। তিনি জমিন থেকে একমুষ্টি ধুলামাটি তুলে নিলেন, এরপর شَاهَتِ الوجوه — 'তোমাদের মুখ কালো হোক'(৭৮) বলে তা শত্রুদের দিকে নিক্ষেপ করলেন। তারপর শত্রুদের কেউ তাঁর সামান্যতম ক্ষতিও করতে পারেনি। (৭৯)
আমরা আরও দেখি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে সকল প্রকার ভীরুতা ও কাপুরুষতা থেকে আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। কেননা দুনিয়ার হায়াত, রিজিক এবং সমগ্র বিশ্বজগৎ— সবকিছুই আল্লাহর কুদরতি হাতের নিয়ন্ত্রণে। তিনি যেভাবে ইচ্ছা পরিবর্তন করতে পারেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করতেন,
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ ...» হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি কাপুরুষতা এবং কৃপণতা হতে...।(৮০)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে জীবনের সকল ক্ষেত্রেই সাহসিকতার শিক্ষা দিতেন। সত্যকথন থেকে শুরু করে জিহাদের ময়দান পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই। সাহসিকতা প্রদর্শনের এ সকল বিষয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো জুলুমের প্রতিবাদ। এজন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَفْضَلُ الْجِهَادِ كَلِمَةُ عَدْلٍ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ» স্বৈরাচারী বাদশার সামনে ন্যায়সংগত কথা বলা হলো সর্বোত্তম জিহাদ। (৮১)
এ ছাড়া জিহাদের ফজিলত এবং নিজের জান ও সম্পদ নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার ফজিলت সম্পর্কে তিনি বলেন, لَغَدْوَةُ فِي سَبِيلِ اللهِ أَوْ رَوْحَةٌ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا আল্লাহর রাস্তায় একটি সকাল বা একটি বিকাল অতিবাহিত করা দুনিয়া ও তাতে যা কিছু আছে, তা থেকে উত্তম। (৮২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল সাহসিকতার গুণে গুণান্বিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর সাহসিকতার মধ্যে কোনো আক্রমণাত্মক দিক কিংবা অদূরদর্শিতা ছিল না, বরং তাঁর সাহসিকতা ছিল প্রখর বুদ্ধিমত্তা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমরা তায়েফ দুর্গের অবরোধ নিয়ে তাঁর গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়টি লক্ষ করতে পারি। এই অবরোধ স্থায়ী হয়েছিল চল্লিশ দিনেরও বেশি সময়। এর মাঝে তিনি জানতে পারলেন, দুর্গে যে খাদ্য ও পানীয় মজুদ আছে, তা তাদের পুরো এক বছর কিংবা কয়েক বছরের জন্য যথেষ্ট হবে। তখন আমাদের এই সাহসী নবী ও সেনাপতি অবরোধ অব্যাহত রাখার সম্ভাব্য ক্ষতি ও লাভ সম্পর্কে একটি জরিপ করলেন। তিনি ভেবে দেখলেন, এই স্থানে তার দীর্ঘদিন অবরোধ ও অবস্থানের মাঝে তায়েফবাসীর চেয়ে ইসলামি রাষ্ট্রের ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি। কারণ, ইসলামি শক্তি বা বাহিনী তো নিছক একটি ইসলামি সৈন্যবাহিনীর দল বা অংশ নিয়ে গঠিত নয়; বরং পুরো ইসলামি সমাজ মিলেই তার বাহিনী। অথচ মদিনায় নারী এবং ঘরবাড়ি পাহারার জন্য খুবই অল্পসংখ্যক পুরুষ রেখে আসা হয়েছে। তাই এখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করলে মদিনায় ইহুদি ও মুশরিকদের আক্রমণের ভয় রয়েছে। এ কারণে বলা যায়, অবরোধ উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে নবীজি একটি দূরদর্শী ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। (৮৩)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহসিকতা ছিল দয়া ও অনুগ্রহের গুণেও গুণান্বিত। তিনি তার শক্তি ও সাহসিকতা ব্যবহার করেছেন শুধু জিহাদের ময়দানে। আল্লাহ তাআলার দ্বীনকে সমুন্নত করার জন্য। তিনি কখনো নিজের জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। যুদ্ধের ময়দান ব্যতীত নিজ হাতে কাউকে কোনোদিন আঘাত করেননি। যেমনটি হজরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনোদিন কাউকে নিজ হাতে আঘাত করেননি। এমনকি তাঁর কোনো স্ত্রী ও খাদেমকেও না। কেবল আল্লাহর পথে জিহাদের ক্ষেত্র ছিল এর ব্যতিক্রম। এ ছাড়া নবীজির ওপর (ব্যক্তিগতভাবে) কোনো আঘাত এলে, তিনি প্রতিপক্ষ থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। হ্যাঁ, আল্লাহর কোনো বিধানকে লঙ্ঘন করা হলে, তিনি কেবল আল্লাহর জন্যই দণ্ড প্রয়োগ করতেন। (৮৪)
এমনটাই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহসিকতা, যা প্রতিষ্ঠিত ছিল দৃঢ় বিশ্বাস, উত্তম চরিত্র এবং ন্যায়নিষ্ঠার ওপর। এ কারণে বীরত্ব ও সাহসিকতার ক্ষেত্রে সকল প্রজন্মের জন্য এটা সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং অনুসরণীয় আদর্শ। জগতে তাঁর সাহসিকতার চেয়ে মহৎ কোনো সাহসিকতা নেই!

টিকাঃ
৬৯. ফিজার (الفجار) : এই যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির প্রায় ২০-২৫ বছর আগে। কুরাইশ ও তার মিত্রবাহিনী এবং হাওয়াজিন গোত্রের মাঝে এই যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। আবার এটি হয়েছিল পবিত্র মাসগুলোর মধ্যে। তারা যখন এই মাসগুলোতে যুদ্ধ করেছে, তখন তারাই বলেছে আমরা অপরাধ করছি। এ কারণে এটাকে বলা হয় فجار বা অপরাধের যুদ্ধ। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন, ইবনে কাছির : আল-বিদায়া ওয়ান- নিহায়া: ২/২৮৯, ২৯১।
৭০. ইবনে কাছির : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৩৮৫।
৭১. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৩৮৯, ৩৯১।
৭২. সহিহ বুখারি : ২৮২০, সহিহ মুসলিম : ২৩০৭, ৫৮৩৫; সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৮৮, সুনানে তিরমিজি: ১৬৮৭।
৭৩. মুসনাদে আহমাদ : ১৩৪৬, মুসতাদরাকে হাকেম : ২৬৩৩।
৭৪. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/৮৩।
৭৫. বাইহাকি : দালায়িলুন নুবুওয়া : ৩/২৪৬।
৭৬. সহিহ বুখারি : ২৮৬৪, সহিহ মুসলিম : ১৭৭৬, ৪৪৬৭; সুনানে তিরমিজি : ১৬৮৮।
৭৭. ইবনে সাইয়েদিন নাস : উয়ুনুল আছার: ২/৪২২, ইবনুল কাইয়িম : জাদুল মাআদ : ৩/৯০।
৭৮. সহিহ মুসলিম : ১৭৭৭, মুসনাদে আহমাদ : ২৭৬২।
৭৯. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৬২৮, সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ: ১/২২৮, ২২৯।
৮০. সহিহ বুখারি : ৬৩৬৭, সহিহ মুসলিম: ২৭০৬, সুনানে নাসায়ি : ৫৪৮১।
৮১. সুনানে আবু দাউদ: ৪৩৪৪, সুনানে তিরমিজি : ২১৭৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০১১।
৮২. সহিহ বুখারি : ২৭৯২, সহিহ মুসলিম: ১৮৮০।
৮৩. সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ: ২৫৫-২৬৬, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ৩/৬৫২-৭০৯।
৮৪. সহিহ মুসলিম : ২৩২৮, ৫৮৭৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00