📄 নবীজি ﷺ-এর ন্যায়পরায়ণতা
ন্যায়পরায়ণতা মানুষের শ্রেষ্ঠতম চারিত্রিক গুণাবলির একটি। অন্যের প্রতি একটি দরদি মনের বহিঃপ্রকাশ ও মজলুমের জন্য আশা ও সান্ত্বনার আশ্রয়। এ কারণে কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ निश्चय আল্লাহ ইনসাফ করার (ন্যায়পরায়ণতা) হুকুম দেন। [সুরা নাহল: ৯০]
ন্যায়পরায়ণতা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলাম শত্রুদের বিভিন্ন অপছন্দনীয় কর্মকাণ্ড সত্ত্বেও তাদের সাথে ন্যায়পরায়ণতার আদেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَانُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوى কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে ইনসাফ (ন্যায়পরতা) পরিত্যাগে প্ররোচিত না করে। ন্যায়পরতা অবলম্বন করো। এ পন্থাই তাকওয়ার বেশি নিকটবর্তী। [সুরা মায়িদা : ৮]
ন্যায়পরতা সকল বিষয়ের যথাযথ মূল্য প্রদান করে। ন্যায়পরতার মাধ্যমেই মানুষের যথাযথ অধিকার নিশ্চিত হয়। যে জাতির মাঝে ন্যায়পরতা রয়েছে, তারা সৌভাগ্যবান এবং উন্নত। আর যে জাতি ন্যায়পরতার গুণ থেকে বঞ্চিত, তারাই সবচেয়ে দুর্ভাগা এবং অনুন্নত জাতি হিসেবে গণ্য।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবিদের ন্যায়পরতার শিক্ষা দিয়েছেন, যাতে কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিদানের পাল্লা ভারী হয়। তিনি বলেন,
«إِنَّ الْمُقْسِطِينَ فِي الدُّنْيَا عَلَى مَنَابِرَ مِنْ لُؤْلُوْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بَيْنَ يَدَيِ الرَّحْمٰنِ بِمَا أَقْسَطُوا فِي الدُّنْيَا»
নিশ্চয় দুনিয়ায় ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিগণ কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর নিকট মুক্তাখচিত মিম্বারে অবস্থান করবে, যেহেতু তারা দুনিয়াতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে। (৪৪)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রত্যেক সাহাবির অন্তরে ন্যায়পরতার বীজ বপন করেছেন। সেই শৈশব থেকেই ন্যায়পরতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল উপমা। যেমন তিনি নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই অত্যাচারিতের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের বাড়িতে 'হিলফুল ফুজুল' (৪৫) নামক সংগঠন প্রতিষ্ঠার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কুরাইশের কিছু যুবক তা প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ ছাড়া কাবাঘর পুনর্নির্মাণের সময় 'হাজরে আসওয়াদ' স্থাপন করা নিয়ে কুরাইশদের মধ্যে যে বিতর্ক হয়েছিল, তখনও তারা তাঁর বিচার ও ন্যায়পরতার প্রতি আস্থা রেখেছিল, যদিও সেই বিবদমান গোত্রগুলোর মধ্যে তাঁর গোত্র বনু হাশেমও ছিল। তবুও তাঁর ন্যায়পরতা ও সততার প্রতি আস্থার কারণে সকলেই তাঁকে বিচারক হিসেবে মেনে নিয়েছিল।
এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিশ্ববাসীর পথপ্রদর্শনের জন্য নবুয়ত প্রদান করেন। তখনও তিনি তাঁর সাহাবিদের মাঝে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং প্রতিটি স্থানে ন্যায়পরতাকে বিচারিক মানদণ্ড বানিয়েছেন। তাঁর জীবনের ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠার ঘটনাসমূহের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ঘটনা সেটাই, যা হজরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেছেন। এই ঘটনার মাঝে তাঁর ন্যায়পরতা এবং সত্যের প্রতি তাঁর অবিচল দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে। হজরত আয়েশা রা. বলেন, 'মাখজুম সম্প্রদায়ের এক মহিলার চুরির ঘটনায় কুরাইশ বংশের লোকেরা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। (প্রকাশ্যে হাত কাটা হলে একটা মানসম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তাই তারা শাস্তিটা কমাতে চাচ্ছিল।) তারা বলল, বিষয়টা নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কে কথা বলবে? অতঃপর তারাই বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়পাত্র উসামা ইবনে যায়েদ রা. ছাড়া এমন সাহস কে করতে পারে? অবশেষে উসামা রা. নবীজির সাথে কথা বললেন। উসামার কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি এসেছ আল্লাহ তাআলার শাস্তির বিধানের ক্ষেত্রে সুপারিশ করতে!' এরপর তিনি দাঁড়িয়ে খুতবায় বললেন,
إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا»
হে মানব সকল, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ধ্বংস করেছেন এ জন্য যে, যখন তাদের মধ্যে কোনো অভিজাত ব্যক্তি চুরি করত, তারা তাকে রেহাই দিয়ে দিত। আর যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত, তাঁর ওপর দণ্ড প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতেমাও যদি চুরি করে, অবশ্যই আমি তার হাত কেটে দেবো। (৪৬)
আমরা দেখতে পাই, তিনি সর্বদা সতর্ক থাকতেন, যেন মানুষের প্রতি কোনো অন্যায় বা অবিচার না হয়ে যায়। যেমন হজরত সুওয়াইদ ইবনে কায়েস রা. থেকে বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, আমি ও মাখরাফা আবদি রা. একবার 'হাজর' (একটি স্থানের নাম) থেকে কাপড় কিনে বিক্রির জন্য মক্কায় নিয়ে আসি। এ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে আসেন এবং একটি পায়জামার দরদাম করেন। সে সময় আমাদের নিকট এক ব্যক্তি উপস্থিত ছিল, যে টাকার বিনিময়ে মানুষের জিনিসপত্র মেপে দিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, يَا وَزَّانُ، زِنْ وَأَرْجِحْ হে মাপ নিরূপণকারী, তুমি মাপবে এবং তা সঠিক করবে।(৪৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দীর্ঘ জীবনে ন্যায়পরতা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকে নিজের জন্য আবশ্যক করে নিয়েছিলেন। তাঁর একনিষ্ঠ ন্যায়পরতার হাজারো উপমায় সিরাত গ্রন্থসমূহ পূর্ণ হয়ে আছে। একজন পাঠক সেগুলো পড়ার সময় নিজের মধ্যে শিহরণ ও পুলক অনুভব করবে। যখন সে নিজের ক্ষেত্রে, পরিবার-পরিজন ও চারপাশের মানুষের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দৃঢ়তা ও শক্তিমত্তা দেখতে পাবে। চাই সেই ন্যায়পরতা আল্লাহ তাআলার কোনো দণ্ডবিধানের ক্ষেত্রে হোক অথবা সন্ধি ও যুদ্ধের কোনো বিষয়ে। অথবা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে সম্পর্কিত সামান্য কোনো ব্যাপার হোক। একবার এক মুনাফিক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়পরতায় কলঙ্ক লেপনের চেষ্টা করেছিল। তখন তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তা ও প্রতাপের সাথে মুনাফিকের সেই কথাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন,
«وَيْلَكَ وَمَنْ يَعْدِلُ إِذَا لَمْ أَعْدِلْ؟ لَقَدْ خِبْتُ وَخَسِرْتُ إِنْ لَمْ أَعْدِلْ» হতভাগা! আমিই যদি ন্যায় প্রতিষ্ঠা না করি, তাহলে আর কে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে? আমি যদি ন্যায় প্রতিষ্ঠা না করি, তবে তো আমি হতভাগ্য ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাব।(৪৮)
এমনইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের স্ত্রীদের সাথেও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতেন, এমনকি সংসারের সামান্য ছোটখাটো বিষয়েও। হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এক স্ত্রীর নিকট অবস্থান করছিলেন। সে সময় তাঁর কোনো এক স্ত্রী তাঁর জন্য একটি পাত্রে কিছু খাদ্য পাঠালেন। এটা দেখে, যে স্ত্রীর ঘরে তিনি অবস্থান করছিলেন, তিনি পাত্র বহনকারী খাদেমের হাতে আঘাত করলেন। ফলে খাদ্যের পাত্রটি পড়ে ভেঙে গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন পাত্রের ভাঙা টুকরাগুলো একত্র করলেন। তারপর খাদ্যগুলো একত্র করে তাতে রাখলেন এবং বললেন, তোমাদের আম্মাজানের আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত লেগেছে। এরপর তিনি খাদেমকে অপেক্ষা করতে বললেন এবং যে স্ত্রীর ঘরে ছিলেন তার থেকে একটি ভালো পাত্র নিয়ে যার পাত্র ভেঙেগিয়েছিল, তাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন এবং ভাঙা পাত্রটি যিনি ভেঙেছিলেন তার কাছে রেখে দিলেন। (৪৯)
অমুসলিমদের প্রতিও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়পরতা সদা প্রসারিত ছিল। যেমন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'কোনো ব্যক্তি যদি কোনো মুসলিমের সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্য মিথ্যা শপথ করে, তাহলে সে আল্লাহর নিকট এমন অবস্থায় হাজির হবে যে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর অত্যধিক রাগান্বিত থাকবেন।'
হজরত আশআস ইবনে কায়েস রা.(৫০) বলেন, আমার ও এক ইহুদি ব্যক্তির মাঝে যৌথ মালিকানায় একখণ্ড জমি ছিল। একবার সে আমার মালিকানার অংশ অস্বীকার করে বসল। আমি তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে গেলাম। তিনি আমাকে বললেন, 'তোমার কি কোনো সাক্ষী আছে?' আমি বললাম, 'না।' তখন তিনি ইহুদিকে বললেন, 'তুমি কসম করো।'
আমি তখন বললাম, 'হে আল্লাহর রাসুল, সে তো (গুনাহের তোয়াক্কা না করে মিথ্যাভাবে) কসম করবে এবং আমার সম্পত্তি নিয়ে নেবে।' তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করেন-
إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَبِكَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ও নিজেদের কসমের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে, আখিরাতে তাদের কোনো অংশ নেই। আর আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের দিকে (সদয় দৃষ্টিতে) তাকাবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না। তাদের জন্য থাকবে কেবল যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [সুরা আলে ইমরান: ৭৭] (৫১)
সকলের মাঝে ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিশ্চয় এটি এক বিরল দৃষ্টান্ত! ঘটনাটিতে দেখা যাচ্ছে দুই ব্যক্তির মাঝে ঝগড়া হয়েছে। তাদের একজন হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় সাহাবি, অন্যজন ইহুদি কাফের। তারা তাঁর নিকট বিচার নিয়ে এলেন সমাধানের জন্য। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাঝে শরিয়তের সত্য বিধান প্রয়োগ করেছেন, কারও প্রতি কোনো ধরনের টান বা পক্ষপাতের দিকে খেয়াল করেননি। উল্লিখিত বিষয়ে শরিয়তের বিধান হলো, নিজের দাবির পক্ষে বাদী প্রমাণ উপস্থাপন করবে। এখানে বাদী হলেন আশআস ইবনে কয়েস রা.। বাদী যদি দলিল-প্রমাণ উপস্থিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন বিবাদীকে কসম করতে বলা হবে। এখানে বিবাদী হলো একজন ইহুদি কাফের। তার কর্তব্য হবে বাদী তার ব্যাপারে যে অভিযোগ আরোপ করছে, তা অস্বীকার করে কসম করা। আর এতে তাকে সত্যায়িত করা হবে। অথচ আমরা জানি, চিরাচরিত অভ্যাস হিসেবে ধর্মীয় ভীতি না থাকায় সেই ইহুদি মিথ্যা কসম করে সম্পদ নিয়ে নিতে পারে। তবুও বিচার সেভাবেই করা হয়েছে যেটা নিয়ম।
এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মূলনীতি হলো এই হাদিস, «البينة على المدَّعِي واليمين على من أنكر» বাদী নিজ দাবির পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করবে, অন্যথায় বিবাদী কসম করবে। (৫২)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রত্যেক শাসক, প্রশাসক ও বিচারকের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও আদর্শ রেখে গেছেন। এমনকি তাঁর পুরো জীবন পরিচালিত হয়েছে আল্লাহ তাআলার নির্দেশমতো। এ কারণে প্রতিটি মানুষ তাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে। প্রতিটি অন্তর তাতে শান্তি ও স্বস্তি খুঁজে পেয়েছে এবং তাঁর ন্যায়নিষ্ঠায় পুরো মানবজাতি হয়েছে ধন্য।
টিকাঃ
৪৪. সহিহ মুসলিম: ১৮২৭, সুনানে নাসায়ি : ৫৩৭৯, মুসনাদে আহমাদ: ৬৪৮৫, মুসতাদরাকে হাকেম: ৭০০৬।
৪৫. হিলফ শব্দের অর্থ অঙ্গীকার আর ফুজুল অর্থ মজলুমের প্রাপ্য অধিকার। সুতরাং হিলফুল ফুজুল অর্থ মজলুম ও অত্যাচারিতের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার।-সম্পাদক
৪৬. সহিহ বুখারি: ৬৭৮৮, সহিহ মুসলিম: ১৬৮৮।
৪৭. সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৩৬, সুনানে তিরমিজি: ১৩০৫, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২২০।
৪৮. সহিহ বুখারি: ১১৩৮, সহিহ মুসলিম: ১০৬৩, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৭২, মুসনাদে আহমাদ : ১৪১৫১।
৪৯. সহিহ বুখারি: ১১৩৮, ৫২২৫; সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৬৭, মুসনাদে আহমাদ: ১২০৪৬।
৫০. পুরো নাম আশআস ইবনে কায়েস আল-কিন্দি। নবুয়তের দশম বছরে তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রতিনিধি হিসেবে আগমন করেন। তিনি ছিলেন 'কিন্দাহ' গোত্রের প্রধান। রাসুলের ইনতেকালের পর তিনি মুরতাদ হয়ে যান। অবশ্য এরপর আবার তিনি ইসলামে ফিরে আসেন। তখন আবু বকর সিদ্দিক রা. তার সাথে নিজের বোনের বিবাহ দেন। তিনি কাদেসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সিফফিনের যুদ্ধের সময় তিনি আলি রা.-এর সঙ্গে ছিলেন। হজরত আলি রা.-এর হত্যার চল্লিশ দিন পর তিনি ইনতেকাল করেন। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন, ইবনুল আছির : উসদুল গাবাহ: ১/৯৭। ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা: জীবনী নং: ২০৫।
৫১. সহিহ বুখারি: ২৩৫৭, ২৪১৭; সহিহ মুসলিম: ১৩৮, সুনানে আবু দাউদ: ৩২৪৩, সুনানে তিরমিজি: ২৩৯৬, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩২৩।
৫২. সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩২৩, মুয়াত্তা মালেক: ৮৪৪।
📄 নবীজি ﷺ-এর দানশীলতা
ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে দয়া ও দানশীলতার ওপর। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দয়া ও দানশীলতার গুণে গুণান্বিত করেছেন। তিনি কুরআনুল কারিমে বলেন,
إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ وَمَا هُوَ بِقَوْلُ شَاعِرٍ قَلِيلًا مَّا تُؤْمِنُونَ
এটা (কুরআন) এক মহানুভব বার্তাবাহকের বাণী। এটা কোনো কবির বাণী নয়, (কিন্তু) তোমরা খুব অল্পই ঈমান আনো।
[সুরা আলহাক্কা: ৪০-৪১]
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যান্য মহান গুণের মধ্যে শুধু তাঁর মহানুভবতার কথা উল্লেখ করেছেন। কেননা এই গুণের মাঝেই নিহিত রয়েছে তাঁর অন্য সকল গুণ। তাঁর চরিত্রে সমাহার ঘটেছিল বহু উত্তম গুণের, যেগুলোর ভিত্তি ছিল উদারতা, দানশীলতা এবং বদান্যতা। আসমান থেকে তাঁর ওপর ওহি অবতীর্ণ হওয়ার আগ থেকেই তিনি এসব গুণে গুণান্বিত ও প্রসিদ্ধ ছিলেন। যেমন আমরা দেখতে পাই হজরত খাদিজা রা. তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তাঁর গুণাবলি সম্পর্কে বলেছিলেন,
كَلَّا وَاللَّهِ مَا يُخْزِيكَ اللهُ أَبَدًا؛ إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ وَتَحْمِلُ الْكُلَّ وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ وَتَقْرِي الضَّيْفَ وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ»
আল্লাহর কসম! কক্ষনো না। আল্লাহ আপনাকে কখনো অপমানিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন, অসহায় দুর্বলদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন এবং সত্যপথের বিপদ্গ্রস্ত ব্যক্তিদের সাহায্য করেন। (৫৩)
এ সকল চারিত্রিক গুণের উৎস হলো 'উদারতা ও বদান্যতা'। কারণ এই গুণগুলো উদারতা ও বদান্যতার কথাই ব্যক্ত করে। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানশীলতার বর্ণনা দিতে গিয়ে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। এ ছাড়া রমজানে তিনি আরও বেশি বেশি দান করতেন, যখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন। আর রমজানের প্রতি রাতেই জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং তারা পরস্পর কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। নিশ্চয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রহমতের বাতাসের থেকেও অধিক দানশীল ছিলেন। (৫৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়ত-পরবর্তী জীবনেও আমরা দেখতে পাই, তিনি তাঁর সাহাবিদের সর্বদা দান ও বদান্যতার প্রতি উৎসাহ দিতেন। দানের দ্বারা অন্তর প্রশস্ত হয় এবং সম্পদের বৃদ্ধি ঘটে। এজন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সকল সাহাবি ও অনাগত উম্মতের শিক্ষার উদ্দেশ্যে বলেছেন, ما من يوم يصبح العباد فيه إلا ملكان ينزلان فيقول أحدهما : اللهم أعط منفقا خلفا، ويقول الآخر : اللهم أعط ممسكا تلفا»
বান্দার জীবনের প্রতিটি সকালে আসমান থেকে দুজন ফিরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ, দাতাকে তার দানের উত্তম প্রতিদান দিন। আর অন্য ফিরেশতা বলেন, হে আল্লাহ, কৃপণকে ধ্বংস করে দিন। (৫৫)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সারা জীবন যা বিশ্বাস করেছেন এবং বলেছেন, তাঁর সবকিছুই বাস্তবে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন। সেইসব মুসলমান কতই-না সৌভাগ্যবান, যারা তাঁর এই শিক্ষা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন। হজরত সাহল ইবনে সাদ রা. বলেন, একবার এক মহিলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট একটি চাদর নিয়ে এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, পরিধানের জন্য আমি আপনাকে এটি হাদিয়া দিলাম।' তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাদরটি এমনভাবে গ্রহণ করলেন, যেন এটি তাঁর খুব প্রয়োজন ছিল। এরপর তিনি এটি পরিধান করলেন। তখন সাহাবিদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি নবীজির পরিধেয় চাদরটি দেখে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, এটা কতই-না সুন্দর! আপনি এটি আমাকে দিয়ে দিন।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ (দিয়ে দিলাম)।' এরপর নবীজি যখন মজলিস থেকে উঠে গেলেন, তখন অন্য সাহাবিরা উক্ত সাহাবিকে তিরস্কার করে বলতে লাগলেন, 'তুমি ভালো করোনি। তুমি দেখলে যে নবীজি চাদরটি এমনভাবে গ্রহণ করেছেন, যেন এটি তাঁর খুব প্রয়োজন ছিল। এরপরও তুমি এটি চেয়ে বসলে! অথচ তুমি অবশ্যই জানো যে, তাঁর কাছে কখনো কোনো জিনিস চাওয়া হলে তিনি তাকে ফিরিয়ে দেন না।
তখন সেই সাহাবি বললেন, 'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই চাদরটি পরিধান করেছেন, এ কারণে তাঁর বরকত অর্জন করার আকাঙ্ক্ষায় আমি এমনটি করেছি, যাতে আমি এ চাদরটাকে আমার কাফন বানাতে পারি।' অন্য বর্ণনায় আছে, সাহল রা. বলেন, (পরবর্তী সময়ে) এটি তার কাফন হয়েছিল। (৫৬)
এ বিষয়ে আমরা হজরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি। তিনি বলেন-
مَا سُئِلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ شَيْءٍ قَطُّ فَقَالَ: لَا»
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এমন কোনো জিনিস চাওয়া হয়নি, যার উত্তরে তিনি 'না' বলেছেন। (৫৭)
এই হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাস্তব আমলের কিছু উৎকৃষ্ট নিদর্শন। সাধ্যের মধ্যে তিনি কখনো প্রার্থনাকারীকে ফিরিয়ে দেননি এবং নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে তার চাওয়াকে পূরণ করেছেন।
দানশীলতার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য অনেক অনুপম দৃষ্টান্ত ও আদর্শ রেখে গিয়েছেন। যেমন, একবার বাহরাইন থেকে তাঁর কাছে কিছু সম্পদ এলো। তাঁর নিকট ইতিপূর্বে যত সম্পদ আনা হয়েছে, এটার পরিমাণ তারচেয়ে বেশি ছিল। সম্পদগুলো আসার পর তিনি সাহাবিদের বললেন, 'এগুলো মসজিদে রেখে দাও।' (পরে মসজিদ থেকেই তিনি সেগুলো দান করে দেন।) (৫৮)
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সার্বক্ষণিক অভ্যাস ছিল, কারও চাওয়ার আগেই তিনি তাকে দান করতেন। এটা ছিল তার দানশীলতার এক অনুপম বৈশিষ্ট্য। এ প্রসঙ্গে তিনি বলতেন, 'আমার নিকট উহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনা হোক আর ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্য ব্যতীত সেগুলোর একটি দিনারও আমার কাছে জমা থাকুক এবং এ অবস্থায় তিন দিন অতিবাহিত হোক, তা আমাকে আনন্দিত করবে না। তবে আমি তা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এভাবে.. এভাবে... এভাবে... বিলিয়ে দেবো।' তিনি তার হাত দিয়ে ডান, বাম ও পেছনের দিকে ইশারা করলেন। (৫৯)
অনেক মানুষের ইসলামগ্রহণের মাধ্যম ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই দানশীলতার গুণ। কেননা তিনি এভাবে দান করতেন, যাতে দরিদ্রতার ভয় ছিল না। যেমন হজরত আনাস রা. বর্ণনা করে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ইসলামগ্রহণের শর্তে যখনই কিছু চাওয়া হয়েছে, তিনি অবশ্যই তা দান করেছেন। আনাস রা. আরও বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক ব্যক্তি এসে কিছু চাইল। তখন তিনি তাকে এত বিপুল পরিমাণ বকরি দান করলেন, যাতে দুই পাহাড়ের মাঝের জায়গা ভরে যাবে। ওই ব্যক্তি সেগুলো নিয়ে নিজের সম্প্রদায়ের নিকট গিয়ে বলতে লাগল, 'হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা ইসলামগ্রহণ করো। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন উজাড় করে দান করেন যে, নিজের অন্ন-কষ্টের কোনো ভয়ই করেন না।' (৬০)
তাঁর দানশীলতার অনেক ঘটনা রয়েছে। যেমন রুবাইয়া বিনতে মুআওয়িজ ইবনে আফরা রা. বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট একপাত্র ভেজা খেজুর, একঝুড়ি শাকসবজি হাদিয়া হিসেবে পেশ করলাম। এরপর তিনি আমাকে একমুষ্টি অলংকার দান করলেন...। অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'আমাকে স্বর্ণ দিলেন' এবং বললেন, 'এর দ্বারা নিজেকে সজ্জিত করো।'(৬১)
এটা হলো তাঁর অপরিসীম দানের কিছু নমুনা। অথচ তিনি নিজে কঠিন দরিদ্রতার মাঝে জীবন অতিবাহিত করতেন, কখনো কোনো সম্পদের মালিকানা রাখতেন না। কিন্তু যখনই তাঁর নিকট কোনো সম্পদ আসত, দুহাত উজাড় করে তা মুমিনদের দান করে দিতেন। অপরদিকে তিনি একজন অতি সাধারণ মুসলিম মহিলার বিনম্র উপহারও সম্মানের সাথে গ্রহণ করতেন এবং এই গ্রহণ করাটাই ছিল তাঁর বিনয়ের অনন্য নিদর্শন এবং ওই মহিলার চিত্ত-প্রশান্তির কারণ।
দান ও সদকা প্রদানের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যধিক আগ্রহের কথা আমরা জানি। এমনকি ইন্তেকালের আগমুহূর্তে মুমূর্ষু অবস্থায় বিছানায় শায়িত থেকেও তিনি দানের কথা চিন্তা করেছেন! অন্যের প্রয়োজনে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দানশীলতার যে অনুপম দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তাঁর কাছাকাছিও কোনো উপমা নেই। এ প্রসঙ্গে উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুস্থতা বেড়ে গেল। প্রায়ই বেহুঁশ হয়ে পড়ছিলেন। এ সময় আমাদের ঘরে সাতটি বা নয়টি দিনার জমা ছিল। তিনি বললেন, 'হে আয়েশা, ওই স্বর্ণমুদ্রাগুলো কী করেছ?' আমি বললাম, 'আমার নিকটে আছে।' তিনি বললেন, 'সেগুলো সদকা করে দাও।'
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. বলেন, কাজের ব্যস্ততায় আমি সদকা করতে ভুলে যাই। পরে তিনি পুনরায় আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আয়েশা, ওই স্বর্ণমুদ্রাগুলো কী করেছ?' আমি বললাম, 'আমার নিকটে আছে।' তিনি বললেন, 'সেগুলো আমার নিকটে নিয়ে এসো।'
হজরত আয়েশা রা. বলেন, আমি স্বর্ণমুদ্রাগুলো নিয়ে এসে তাঁকে দিলাম। তিনি সেগুলো হাতে নিলেন। অতঃপর বললেন, 'মুহাম্মাদের জন্য কি এটি শোভা পায় যে, সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে অথচ এগুলো তাঁর কাছে রয়ে যাবে? (৬২)
এ সময় সেখানে হজরত উম্মে সালামা রা.(৬৩) প্রবেশ করলেন। তিনি দেখলেন তাঁর চেহারা খুবই বিষণ্ণ। তিনি ভাবলেন, হয়তো রোগের তীব্রতায় এমনটা হয়েছে। এরপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনার মুখ এমন মলিন কেন?’
তিনি বললেন, 'এই সাতটি দিনারের জন্য, যা গতকাল আমার নিকট এসেছে। আমি রাত্রযাপন করেছি অথচ এটা আমার বিছানার পাশে ছিল।' (৬৪)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘এগুলো আমার নিকট এসেছে অথচ এখন পর্যন্ত তা দান করতে পারিনি।' (৬৫)
সুন্দর হয়, যদি বদান্যতা ও দানশীলতার আরেকটি চমৎকার ঘটনা দিয়ে আমাদের এই পরিচ্ছেদের ইতি টানি। ঘটনাটি ছিল হুনাইনের যুদ্ধের সময়ের। এই যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিরা প্রচুর গনিমত অর্জন করেছিলেন। হুনাইন থেকে ফেরার পথে রাসুলের সাথে ছিলেন হজরত জুবাইর ইবনে মুতইম রা.। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনাইনের ময়দান থেকে ফিরে আসছিলেন, তখন আমিও তাঁর সাথে ছিলাম। বেদুইন লোকেরা তাঁর কাছে গনিমতের সম্পদ চাইতে এসে তাঁকে ঠেলতে ঠেলতে একটি বাবলা গাছের সাথে ঠেকিয়ে দিলো এবং গাছের কাঁটায় তাঁর চাদর আটকে গেল। সেখানে তিনি থেমে গেলেন। তারপর বললেন, 'আমার চাদরখানি দাও। আমার নিকট যদি এ সকল কাঁটাদার বন্য বৃক্ষের সমপরিমাণ পশুও থাকত, তবুও সেগুলো আমি তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দিতাম। তোমরা আমাকে কখনো কৃপণ, মিথ্যাবাদী এবং দুর্বলচিত্ত পাবে না।' (৬৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো নিজের জন্য কোনো সম্পদ গচ্ছিত রাখতেন না। সৈন্যবাহিনীর মাঝেও কিছু বিতরণ করতেন। কিন্তু সেই বিতরণের সময় তাদেরকেও তিনি ভালোভাবে সতর্ক করে বলতেন 'দেখো, এ সকল সম্পদ নিছক একটা উপলক্ষ্য ও উপকরণ, কিছুতেই এগুলো চূড়ান্ত কোনো লক্ষ্য নয়।'
বাস্তবেই সম্পদ সব সময় নবীজির নিকট তুচ্ছ উপলক্ষ্যই মনে হয়েছে। এ কারণে সম্পদগুলো তিনি মক্কার বড় বড় নেতাকে আকৃষ্ট করার জন্য এবং তাদের ইসলামগ্রহণে আগ্রহী করে তোলার জন্য ব্যবহার করেছেন। যেমন আবু সুফিয়ান, হাকিম ইবনে হিজাম, হারেস ইবনে হিশাম (আবু জাহালের ভাই), নুজায়ের ইবনে হারেস (কুরাইশের কুখ্যাত দুষ্টলোক ও নবীজির প্রতি প্রচণ্ড বিদ্বেষ পোষণকারী নজর ইবনে হারিসের ভাই) প্রমুখ ব্যক্তিদের ইসলামগ্রহণে আগ্রহী করে তুলতে নবীজি অনেক সম্পদ ব্যয় করেছেন। একইভাবে আরবের কিছু বড় নেতাকেও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য তিনি সম্পদ খরচ করেছেন। যেমন বনু ফাজারার নেতা উয়াইনা ইবনে হাসান, বনু তামিমের নেতা আকরা ইবনে হাবিস। (৬৭) এ সকল ব্যক্তির প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদারতা ও দানশীলতা তাদের অন্তরে ইসলামের বীজ বপন করেছিল এবং এটা হয়েছিল তাদের ইসলামগ্রহণের অন্যতম উপলক্ষ্য।
অবশ্য পরে তারাও প্রকৃত মুসলমান হিসেবে গড়ে উঠেন। সম্পদের মোহ পরিত্যাগ করেন। তাদের অবস্থা সম্পর্কে হজরত আনাস রা.-এর এই উক্তিটি ছিল যথার্থ। তিনি বলেন, এ সময় কোনো ব্যক্তি যখন প্রথম ইসলামগ্রহণ করত, তখন শুধু দুনিয়ার উদ্দেশ্যেই ইসলামগ্রহণ করত। প্রকৃতপক্ষে (আন্তরিকতা নিয়ে) ইসলামগ্রহণ করত না। কিন্তু (ক্রমশ ইসলাম তাদের অন্তরে বদ্ধমূল হলে) অবশেষে দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় সম্পদ থেকে ইসলামই হয়ে উঠত তার নিকট অধিকতর প্রিয়। (৬৮)
টিকাঃ
৫৩. সহিহ বুখারি: ৩, সহিহ মুসলিম: ১৬০।
৫৪. সহিহ বুখারি: ৬, সহিহ মুসলিম: ২৩০৮।
৫৫. সহিহ বুখারি: ১৪৪২, ১৩৫৮; মুসনাদে আহমাদ: ২৭২৯৪।
৫৬. সহিহ বুখারি: ৫৬৮৯, ১৯৮৭; সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৫৫৫, মুসনাদে আহমাদ : ২২৮৭৬।
৫৭. সহিহ বুখারি: ৬০৩৪, সহিহ মুসলিম: ২৩১১, সুনানে দারেমি: ৭০।
৫৮. সহিহ বুখারি: ৪১১, আস-সুনানুল কুবরা লিল-বাইহাকি: ১২৮০৭。
৫৯. সহিহ বুখারি: ৬০৭৯, ৬০০০。
৬০. সহিহ মুসলিম: ২৩১২, মুসনাদে আহমদ: ১২৮১৩, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৬৩৭৩।
৬১. মুসনাদে আহমাদ: ২৭০৬৫, শামায়েল তিরমিজি: ২০১।
৬২. সহিহ ইবনে হিব্বান: ৭১৫, মুসনাদে আহমাদ: ২৪৬০৪, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ৮/১৩৪, ১৩৫।
৬৩. তিনি হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া হুজাইফা ইবনুল মুগিরা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে মাখজুম। তিনি ছিলেন একজন কুরাইশি, মাখজুম গোত্রের। তিনি ছিলেন উম্মুল মুমিনিন অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন সম্মানিতা স্ত্রী। বিস্তারিত তথ্যের জন্য দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা: ৮/১৫০, জীবনী নং: ১১৮৪৫।
৬৪. মুসনাদে আহমাদ: ২৬৫৫৭, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫১৬০।
৬৫. মুসনাদে আহমাদ: ৬২৭১৪。
৬৬. সহিহ বুখারি : ২৯৭৯, ২৯২৭; সুনানে নাসায়ি: ৩৬৮৮, সহিহ ইবনে হিব্বان: ৪৮৫
৬৭. ইবনুল আছির: উসদুল গাবাহ : ৪/২৮৬, তাফসিরে ইবনে আবু হাতেম: ৬/১৮২২, ১৮২৩, আল্লামা তাবারি : তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক: ২/১৭৫, ইবনে কাছির: আল-বিদায়ا ওয়ান- নিহায়া: ৪/৩৬০।
৬৮. সহিহ মুসলিম: ২৩১২, ৫৮৪৯।
📄 নবীজি ﷺ-এর সাহসিকতা ও বীরত্ব
কুরআনুল কারিম মুমিনদের সব সময় সাহসী হতে উৎসাহিত করেছে। কুরআনুল কারিমের আয়াতগুলোই হলো সেই উৎসারিত ঝরনাধারা, যার স্রোতধারা থেকেই মুসলিম উম্মাহ পান করে সাহসিকতার পানি। এ কারণে আল্লাহ তাআলা এই উম্মত ও তাঁর রাসুলকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ الَّذِيْنَ يَشْرُوْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ وَمَنْ يُقَاتِلُ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ فَيُقْتَلُ أَوْ يَغْلِبُ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
সুতরাং যারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবনকে বিক্রি করে, তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করুক। যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে, অতঃপর নিহত বা জয়যুক্ত হবে (সর্বাবস্থায়), আমি তাদেরকে মহা পুরস্কার দান করব। [সুরা নিসা : ৭৪]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের সকল কথা এবং কাজ ছিল বীরত্বের উচ্চতম নিদর্শন। আমরা যদি তাঁর জীবনচরিতের দিকে অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিই, তাহলে দেখতে পাব, জীবন চলার পথে যেকোনো পরিস্থিতি কিংবা যেকোনো বিপদে তিনি ছিলেন দৃঢ় মনোবলের অধিকারী, প্রবল বিশ্বাসী এবং অসীম সাহসের অধিকারী। এজন্যই আল্লাহ তাআলা তাঁর উদ্দেশে বলেন,
فَقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا تُكَلِّفُ إِلَّا نَفْسَكَ وَحَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ
(হে নবী) আপনি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করুন। আপনার ওপর আপনার নিজের ছাড়া অন্য কারও দায়ভার নেই এবং মুমিনদের উৎসাহ দিতে থাকুন। [সুরা নিসা : ৮৪]
শৈশব থেকেই এ ধরনের বীরত্ব ও সাহসিকতা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উন্নত চরিত্রের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল। যার নমুনা হিসেবে আমরা দেখতে পাই, তিনি তাঁর চাচাদের সাথে ‘ফিজার’ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, যখন তাঁর বয়স পনেরোও পেরোয়নি।(৬৯) এ ছাড়া নির্জন মরুভূমির সুউচ্চ পর্বতের হেরা গুহায় দীর্ঘদিন তিনি একাকী অবস্থান করেছেন।(৭০) এ কারণে নবুয়ত-পরবর্তী সময়ের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর যে বীরত্বের প্রকাশ ঘটেছে, তাতে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই। সাহসিকতা ছিল তাঁর স্বভাবজাত। আর এগুলো নিছক কোনো কথার কথা নয়, বরং তাঁর জীবনজুড়ে এর অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। কোনো ধরনের দ্বিধা, সংকোচ ও ভীরুতা ছাড়া তিনি সারাজীবন অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। যেমন ইসলামি দাওয়াতের শুরুলগ্নেই তিনি মুশরিকদের বিভিন্ন বাধার মুখোমুখি হন। তিনি তাদের এমন বিষয়ের দাওয়াত দেন যা ছিল তাদের নিকট খুবই অপছন্দের। এজন্য তারা এটা গ্রহণ করতে এবং মেনে নিতে রাজি হয়নি। তারা নতুন এই আহ্বানের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে। তবে তাদের এই বাধা ও ভীতিপ্রদর্শন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াতের রাস্তা থেকে সামান্যতমও বিরত রাখতে পারেনি। এর মাধ্যমে তিনি উম্মতের সামনে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সেটা হলো, দৃঢ় সাহসিকতার সাথে, সাধ্যের সবটুকু শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রকাশ্যে বাতিলের সামনে সত্যের আওয়াজকে তুলে ধরতে হবে, যদিও শত্রুপক্ষ সত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং সর্বশক্তি ব্যয় করে সত্যকে প্রতিহত করতে চায়।
জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসীম সাহসিকতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে জুলুম প্রতিহত করার ক্ষেত্রে। কোনো ধরনের ভয় বা দ্বিধা ছাড়াই তিনি জালেমের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। তিনিই আমাদের সেই নবী, যিনি অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং অত্যাচারীকে প্রতিহত করে অত্যাচারিতের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন। যেমন ইবনে হিশাম রহ. বলেন, ইরাশ গোত্রের এক ব্যক্তি উট বিক্রির উদ্দেশ্যে মক্কায় এলে আবু জাহেল তা ক্রয় করে। কিন্তু দাম পরিশোধে সে টালবাহানা শুরু করে। নিরুপায় হয়ে সেই ইরাশি লোক কুরাইশদের একটি সভাস্থলে এসে উপস্থিত হয়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সেখানে মসজিদের একপাশে বসেছিলেন। ইরাশি লোকটি তাদেরকে বলল, 'হে কুরাইশরা, তোমাদের মধ্যে কেউ আছে কি, যে আবু জাহেলের নিকট থেকে আমার উটের দাম আদায় করে দেবে? আমি একজন বিদেশি মুসাফির। সে আমার অধিকার (মূল্য) আদায়ে গড়িমসি করছে।'
তখন মজলিসের লোকেরা তাকে বলল, 'তুমি কি ওই বসা লোকটি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে দেখতে পাচ্ছ? তুমি তার কাছে যাও। সে আবু জাহেল থেকে তোমার পাওনা আদায় করে দেবে।'
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু জাহেলের মধ্যকার শত্রুতার কথা জানত বলেই তারা মজা করার জন্য এমনটি বলেছিল।
ইরাশি লোকটি নবীজির সামনে এসে বলল, 'হে আল্লাহর বান্দা, আবু জাহেলের কাছে আমার কিছু পাওনা রয়েছে, কিন্তু আমাকে দুর্বল পেয়ে সে তা আদায়ে গড়িমসি করছে। আমি একজন বিদেশি মুসাফির। আমি ওই মজলিসের লোকদের নিকট তার থেকে আমার হক আদায়ের ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা আপনাকে দেখিয়ে দিয়েছে। আপনি আমার পাওনা আদায় করে দিন, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটির কথা শুনে বললেন, 'তার কাছে চলো।'
এ কথা বলে তিনি নিজেও লোকটির সাথে চললেন। এটা দেখে মজলিসের লোকেরা একজনকে বলল, 'তুমি তাঁর অনুসরণ করো আর সে কী করে দেখে এসো।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে বের হয়ে সোজা আবু জাহেলের বাড়ি এসে উপস্থিত হলেন এবং তার দরজার কড়া নাড়লেন।' সে ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করল, 'কে?'
নবীজি বললেন, 'আমি মুহাম্মাদ। বাইরে আসুন।'
আবু জাহেল বাইরে বেরিয়ে এলো। এ সময় ভয়ে-আতঙ্কে তার মুখ ছিল বিবর্ণ। প্রাণ যেন বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'আপনি এই লোকটির পাওনা দিয়ে দিন।'
আবু জাহেল বলল, 'হ্যাঁ, একটু দাঁড়াও, আমি এখনই তার পাওনা দিয়ে দিচ্ছি।' এই বলে সে ভেতরে চলে গেল এবং লোকটির পাওনা এনে তাকে দিয়ে দিলো। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এলেন এবং ইরাশি ব্যক্তিকে বললেন, 'তুমি এবার নিজের কাজে চলে যাও।'
ইরাশি ব্যক্তিটি আবার সেই মজলিসে গিয়ে হাজির হলো এবং তাদের লক্ষ্য করে বলল, 'আল্লাহ তাআলা তাঁকে (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে) উত্তম বিনিময় দিন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার পাওনা আদায় করে দিয়েছেন।'
এদিকে কুরাইশদের প্রেরিত সেই লোকটিও ফিরে এলো। তারা জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কী দেখলে বলো?'
লোকটি বলল, 'আমি আজ এক বিস্ময়কর বিষয় প্রত্যক্ষ করেছি। আল্লাহর কসম! তিনি গিয়ে শুধু আবু জাহেলের দরজায় করাঘাত করলেন, তখন আবু জাহেল বেরিয়ে এলো। ভয়ে তার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। মুহাম্মাদ তাকে বললেন, এই লোকটির পাওনা দিয়ে দিন। আর সে বলল, একটু দাঁড়াও, এক্ষুনি তার পাওনা দিয়ে দিচ্ছি। এই বলে সে ভেতরে গেল এবং তার পাওনা এনে তাকে দিয়ে দিলো।'
একটু পরে আবু জাহেল নিজেও সেই মজলিসে এসে উপস্থিত হলো। তখন মজলিসের লোকেরা তাকে তিরস্কার করে বলল, 'আপনার কী হলো? আল্লাহর কসম! আজ যা করলেন, আমরা কখনো আপনাকে এমন করতে দেখিনি।'
আবু জাহেল বলল, 'ধিক তোমাদের! আল্লাহর কসম! সে গিয়ে যখন আমার দরজায় করাঘাত করল এবং আমি তার সামনে বেরিয়ে এলাম, দেখলাম তাঁর মাথার ওপর একটি ভয়ানক উট দাঁড়িয়ে আছে। উটটির মাথা বৃহদাকার, কাঁধ চওড়া এবং দাঁতগুলো ধারালো। এমন ভয়ংকর উট আমি আগে কখনো দেখিনি। আল্লাহর কসম! তখন আমি যদি তার পাওনা পরিশোধ করতে অস্বীকার করতাম, তবে সেই উট আমাকে আস্ত গিলে ফেলত। (৭১)
একইভাবে তাঁর পরিবার এবং সাহাবিদের বিপদের সময়ও তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত সাহসিকতার স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে। এ বিষয়ে হজরত আনাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে সাহসী এবং সবচেয়ে দানশীল। এক রাতে মদিনাবাসী এক বিকট শব্দ শুনে ঘাবড়ে গেল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু তালহা রা.-এর জিনবিহীন ঘোড়ায় চড়ে তরবারি ঝুলিয়ে সেখানে পৌঁছে গেলেন। তিনি তখন লোকদের লক্ষ্য করে বলছিলেন, 'তোমরা ভীত হয়ো না, তোমরা ভীত হয়ো না।' অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি এটাকে দ্রুতগামী পেয়েছি।' (অর্থাৎ এটি একটি দ্রুতগামী ঘোড়ার আওয়াজ ছিল।) (৭২)
যুদ্ধের ময়দানেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতার অনুপম দৃষ্টান্ত ও আদর্শ রেখে গেছেন। তাঁর বীরত্ব ছিল আলোকিত মশালের ন্যায়। পরবর্তী সময়ে সাহাবায়ে কেরাম যার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে হজরত আলি রা. বলেন, যখন যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত, একদল অন্যদলের ওপর তীব্র গতিতে আক্রমণ করত, আমরা তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে চিন্তিত থাকতাম (না জানি তাঁর কোনো ক্ষতি হয়ে যায়)! কেননা, তাঁর চেয়ে শত্রুবাহিনীর অধিক নিকটে আমাদের মধ্যে আর কেউ যেত না। (৭৩)
উহুদ যুদ্ধের সংকটময় মুহূর্তে শত্রুবাহিনীর তীব্র আক্রমণের ফলে মুসলমানরা যখন সাময়িক পরাজয়ের মুখে আপতিত হয়, তখনও আমরা তাঁকে নির্ভীক ও সাহসী দেখতে পাই। তিনি তখনও মুশরিক নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিলেন। এ সময় উবাই ইবনে খালফ ময়দানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্ধান পেয়ে তাঁর নিকট এগিয়ে এসে বলল, 'হে মুহাম্মাদ, আজ তুমি বেঁচে গেলে আমার আর রক্ষা নেই।' তখন মুসলমানরা জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কেউ কি তার দিকে অগ্রসর হব?'
নবীজি বললেন, 'তাকে তার অবস্থায় ছেড়ে দাও (অর্থাৎ তাকে আসতে দাও)।'
এরপর উবাই ইবনে খালফ যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছাকাছি চলে এলো, তখন নবীজি হারেস ইবনে সিমমা রা. থেকে একটি বর্শা নিয়ে এমন শক্তিমত্তার সাথে ঝাঁকুনি দিলেন যে, আমরা চারদিকে এমনভাবে ছিটকে পড়লাম, ভীমরুলের ঝাঁক যেমন উটের তাড়া খেয়ে উটের পিঠ থেকে উড়ে যায়। এরপর তিনি উবাই ইবনে খালফের দিকে অগ্রসর হলেন এবং তার ঘাড়ে আঘাত হানলে সে ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ে এবং মাটিতে কয়েকবার গড়াগড়ি খায়। অবশেষে মক্কায় ফেরার পথে মারা যায়। (৭৪)
হজরত মিকদাদ ইবনে আমর রা. উহুদ যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃঢ়তা ও সাহসিকতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, সেই সত্তার কসম! যিনি তাঁকে সত্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন! তিনি যুদ্ধ করতে করতে শত্রুবাহিনীর এত নিকটে পৌঁছে যেতেন যে, তাঁর এবং শত্রুর মাঝে মাত্র এক বিঘতের ব্যবধান থাকত। তিনি একেবারে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে যেতেন। সাহাবিরাও যুদ্ধ করতে করতে একসময় তাঁর নিকটে পৌঁছে যেত, আবার তাঁর থেকে দূরে সরে যেত। আমি তাঁকে দেখতাম, তিনি কখনো দাঁড়িয়ে ধনুক থেকে তির নিক্ষেপ করছেন। আবার কখনো পাথর নিক্ষেপ করছেন। ফলে কাফেররা দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আপন স্থানে) অবিচল আছেন। যেমন তিনি তার সাথে যুদ্ধের কষ্ট সহ্যকারী বাহিনীর মাঝে অবিচল থাকতেন। (৭৫)
এ ছাড়া হুনাইনের যুদ্ধের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, মানব সভ্যতার ইতিহাসে তা এক উজ্জ্বল সাহসিকতার দৃষ্টান্ত হিসেবে রয়ে যাবে।
[মানচিত্র নং-১ হুনাইন যুদ্ধ (৮ হিজরি)]
এটা তখন ঘটেছিল, যখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সৈন্যবাহিনী পিছু হটতে লাগল। তখন তিনি নিজের বাহন থেকে নিচে নামলেন এবং (আল্লাহর কাছে) দোয়া করে সাহায্যের প্রার্থনা করলেন। আর বলতে থাকলেন,
«أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِب... أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِب»
আমি যে নবী, তা মিথ্যা নয়, আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।
এবং তিনি দোয়ার মধ্যে বলতে লাগলেন, اَللَّهُمَّ نَزَّلْ نَصْرَكَ — হে আল্লাহ, তুমি তোমার সাহায্য নাজিল করো।(৭৬)
সেদিন যুদ্ধের ময়দানে তাঁর চেয়ে দৃঢ় এবং শত্রুর অধিক নিকটবর্তী আর কাউকে দেখা যায়নি। (৭৭) শত্রুবাহিনীর মোকাবিলায় তিনি সেদিন তাদের সামনে একাই দৃঢ়পদ ছিলেন। তিনি জমিন থেকে একমুষ্টি ধুলামাটি তুলে নিলেন, এরপর شَاهَتِ الوجوه — 'তোমাদের মুখ কালো হোক'(৭৮) বলে তা শত্রুদের দিকে নিক্ষেপ করলেন। তারপর শত্রুদের কেউ তাঁর সামান্যতম ক্ষতিও করতে পারেনি। (৭৯)
আমরা আরও দেখি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে সকল প্রকার ভীরুতা ও কাপুরুষতা থেকে আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। কেননা দুনিয়ার হায়াত, রিজিক এবং সমগ্র বিশ্বজগৎ— সবকিছুই আল্লাহর কুদরতি হাতের নিয়ন্ত্রণে। তিনি যেভাবে ইচ্ছা পরিবর্তন করতে পারেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করতেন,
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ ...» হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি কাপুরুষতা এবং কৃপণতা হতে...।(৮০)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে জীবনের সকল ক্ষেত্রেই সাহসিকতার শিক্ষা দিতেন। সত্যকথন থেকে শুরু করে জিহাদের ময়দান পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই। সাহসিকতা প্রদর্শনের এ সকল বিষয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো জুলুমের প্রতিবাদ। এজন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَفْضَلُ الْجِهَادِ كَلِمَةُ عَدْلٍ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ» স্বৈরাচারী বাদশার সামনে ন্যায়সংগত কথা বলা হলো সর্বোত্তম জিহাদ। (৮১)
এ ছাড়া জিহাদের ফজিলত এবং নিজের জান ও সম্পদ নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার ফজিলت সম্পর্কে তিনি বলেন, لَغَدْوَةُ فِي سَبِيلِ اللهِ أَوْ رَوْحَةٌ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا আল্লাহর রাস্তায় একটি সকাল বা একটি বিকাল অতিবাহিত করা দুনিয়া ও তাতে যা কিছু আছে, তা থেকে উত্তম। (৮২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল সাহসিকতার গুণে গুণান্বিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর সাহসিকতার মধ্যে কোনো আক্রমণাত্মক দিক কিংবা অদূরদর্শিতা ছিল না, বরং তাঁর সাহসিকতা ছিল প্রখর বুদ্ধিমত্তা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমরা তায়েফ দুর্গের অবরোধ নিয়ে তাঁর গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়টি লক্ষ করতে পারি। এই অবরোধ স্থায়ী হয়েছিল চল্লিশ দিনেরও বেশি সময়। এর মাঝে তিনি জানতে পারলেন, দুর্গে যে খাদ্য ও পানীয় মজুদ আছে, তা তাদের পুরো এক বছর কিংবা কয়েক বছরের জন্য যথেষ্ট হবে। তখন আমাদের এই সাহসী নবী ও সেনাপতি অবরোধ অব্যাহত রাখার সম্ভাব্য ক্ষতি ও লাভ সম্পর্কে একটি জরিপ করলেন। তিনি ভেবে দেখলেন, এই স্থানে তার দীর্ঘদিন অবরোধ ও অবস্থানের মাঝে তায়েফবাসীর চেয়ে ইসলামি রাষ্ট্রের ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি। কারণ, ইসলামি শক্তি বা বাহিনী তো নিছক একটি ইসলামি সৈন্যবাহিনীর দল বা অংশ নিয়ে গঠিত নয়; বরং পুরো ইসলামি সমাজ মিলেই তার বাহিনী। অথচ মদিনায় নারী এবং ঘরবাড়ি পাহারার জন্য খুবই অল্পসংখ্যক পুরুষ রেখে আসা হয়েছে। তাই এখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করলে মদিনায় ইহুদি ও মুশরিকদের আক্রমণের ভয় রয়েছে। এ কারণে বলা যায়, অবরোধ উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে নবীজি একটি দূরদর্শী ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। (৮৩)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহসিকতা ছিল দয়া ও অনুগ্রহের গুণেও গুণান্বিত। তিনি তার শক্তি ও সাহসিকতা ব্যবহার করেছেন শুধু জিহাদের ময়দানে। আল্লাহ তাআলার দ্বীনকে সমুন্নত করার জন্য। তিনি কখনো নিজের জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। যুদ্ধের ময়দান ব্যতীত নিজ হাতে কাউকে কোনোদিন আঘাত করেননি। যেমনটি হজরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনোদিন কাউকে নিজ হাতে আঘাত করেননি। এমনকি তাঁর কোনো স্ত্রী ও খাদেমকেও না। কেবল আল্লাহর পথে জিহাদের ক্ষেত্র ছিল এর ব্যতিক্রম। এ ছাড়া নবীজির ওপর (ব্যক্তিগতভাবে) কোনো আঘাত এলে, তিনি প্রতিপক্ষ থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। হ্যাঁ, আল্লাহর কোনো বিধানকে লঙ্ঘন করা হলে, তিনি কেবল আল্লাহর জন্যই দণ্ড প্রয়োগ করতেন। (৮৪)
এমনটাই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহসিকতা, যা প্রতিষ্ঠিত ছিল দৃঢ় বিশ্বাস, উত্তম চরিত্র এবং ন্যায়নিষ্ঠার ওপর। এ কারণে বীরত্ব ও সাহসিকতার ক্ষেত্রে সকল প্রজন্মের জন্য এটা সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং অনুসরণীয় আদর্শ। জগতে তাঁর সাহসিকতার চেয়ে মহৎ কোনো সাহসিকতা নেই!
টিকাঃ
৬৯. ফিজার (الفجار) : এই যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির প্রায় ২০-২৫ বছর আগে। কুরাইশ ও তার মিত্রবাহিনী এবং হাওয়াজিন গোত্রের মাঝে এই যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। আবার এটি হয়েছিল পবিত্র মাসগুলোর মধ্যে। তারা যখন এই মাসগুলোতে যুদ্ধ করেছে, তখন তারাই বলেছে আমরা অপরাধ করছি। এ কারণে এটাকে বলা হয় فجار বা অপরাধের যুদ্ধ। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন, ইবনে কাছির : আল-বিদায়া ওয়ান- নিহায়া: ২/২৮৯, ২৯১।
৭০. ইবনে কাছির : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৩৮৫।
৭১. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৩৮৯, ৩৯১।
৭২. সহিহ বুখারি : ২৮২০, সহিহ মুসলিম : ২৩০৭, ৫৮৩৫; সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৮৮, সুনানে তিরমিজি: ১৬৮৭।
৭৩. মুসনাদে আহমাদ : ১৩৪৬, মুসতাদরাকে হাকেম : ২৬৩৩।
৭৪. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/৮৩।
৭৫. বাইহাকি : দালায়িলুন নুবুওয়া : ৩/২৪৬।
৭৬. সহিহ বুখারি : ২৮৬৪, সহিহ মুসলিম : ১৭৭৬, ৪৪৬৭; সুনানে তিরমিজি : ১৬৮৮।
৭৭. ইবনে সাইয়েদিন নাস : উয়ুনুল আছার: ২/৪২২, ইবনুল কাইয়িম : জাদুল মাআদ : ৩/৯০।
৭৮. সহিহ মুসলিম : ১৭৭৭, মুসনাদে আহমাদ : ২৭৬২।
৭৯. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৬২৮, সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ: ১/২২৮, ২২৯।
৮০. সহিহ বুখারি : ৬৩৬৭, সহিহ মুসলিম: ২৭০৬, সুনানে নাসায়ি : ৫৪৮১।
৮১. সুনানে আবু দাউদ: ৪৩৪৪, সুনানে তিরমিজি : ২১৭৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০১১।
৮২. সহিহ বুখারি : ২৭৯২, সহিহ মুসলিম: ১৮৮০।
৮৩. সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ: ২৫৫-২৬৬, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ৩/৬৫২-৭০৯।
৮৪. সহিহ মুসলিম : ২৩২৮, ৫৮৭৭।