📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 নবীজি ﷺ-এর চারিত্রিক গুণাবলির পূর্ণতা

📄 নবীজি ﷺ-এর চারিত্রিক গুণাবলির পূর্ণতা


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সকলের জন্য উত্তম আদর্শ। জীবনের প্রতিটি কাজে ও কর্মে একজন অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। তাঁর আখলাক-চরিত্র ব্যক্তি ও সমাজের জন্য উদাহরণ এবং তাঁর নবুয়তের সত্যতার ওপর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। তিনি সক্ষম হয়েছেন আল্লাহপ্রদত্ত ওহির আলোকে একেবারে শূন্য থেকে একটি মহান জাতি গড়ে তুলতে। যুগের প্রতিকূলতার ওপর দাঁড়িয়েও তৈরি করেছেন এমন এক অনন্য সভ্যতা, যা সকল যুগের সকল মানুষের জন্য অনুসরণীয় এবং যার ভিত্তি হলো উত্তম আখলাক ও চরিত্র। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّمَا بُعِثْتُ لأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ
আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে চরিত্রমাধুর্যের পূর্ণতা প্রদানের জন্য। (১)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, মহান আল্লাহ তাআলা নিজেই তাঁর উন্নত চরিত্রের সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ﴾وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ﴿ ‘নিশ্চয় আপনি চরিত্রের সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছেন’। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নবীর প্রতি এই মহান সাক্ষ্যটিই প্রমাণ করে, জীবনের সূচনা হতেই তাঁর চরিত্র ছিল মহান ও শ্রেষ্ঠ। এজন্য তিনি তাঁর জাতির নিকট পরিচিত ছিলেন 'বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী' হিসেবে। কেউ কখনো তাঁকে 'মিথ্যাবাদী বা খিয়ানতকারী' বলার দুঃসাহস দেখায়নি। বরং তাঁর দুর্নিবার আকর্ষণ থেকে মানুষকে বিরত রাখার জন্য কাফেররা তাঁর সম্পর্কে অন্য অনেক অপবাদ আরোপ করেছে... পাগল, জাদুকর ইত্যাদি। কিন্তু 'মিথ্যাবাদী বা খিয়ানতকারী' বলার দুঃসাহস কেউ করেনি।
আর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীর প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করার জন্যই কেবল এই উত্তম চরিত্রের কথা উল্লেখ করেননি, বরং তিনি এ সাক্ষ্যের মাধ্যমে এদিকেও ইশারা করেছেন যে, মানুষেরা তাঁর সম্পর্কে যে খারাপ মন্তব্যগুলো করে—পাগল, জাদুকর ইত্যাদি বলে এ ত্রুটিগুলো কিছুতেই এমন উত্তম চরিত্রের সাথে একত্র হতে পারে না। কারণ, যে ব্যক্তি এমন সব মহান চরিত্রের অধিকারী, অতি অবশ্যই তিনি সকল প্রকার পাগলামি থেকে মুক্ত হবেন। (১০)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আখলাক-চরিত্রে বিমুগ্ধ হয়েছেন বহু মানুষ—তাঁর সাহাবিরা, এমনকি তাঁর শত্রুরাও। শুধু এই চরিত্রমাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে তাদের অনেকে ইসলামগ্রহণ করেছিল। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামসময়িক ওমানের বাদশাহ জুলানদি (১১) নবীজির চরিত্রের কথা শুনে অত্যন্ত বিমোহিত হয়ে বলেছিলেন,
«وَاللَّهِ لَقَدْ دَلَّنِي عَلَى هَذَا النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ أَنَّهُ لَا يَأْمُرُ بِخَيْرٍ إِلَّا كَانَ أَوَّلَ آخِذٍ بِهِ، وَلَا يَنْهَى عَنْ شَيْءٍ إِلَّا كَانَ أَوَّلَ تَارِكِ لَهُ، وَأَنَّهُ يَغْلِبُ فَلَا يَبْطَرُ ويُغْلَبُ فَلَا يَضْجَرُ وَيَفِي بِالْعَهْدِ وَيَنْجُزُ الْمَوْعُوْدَ وَأَشْهَدُ أَنَّهُ نَبِيٌّ
আল্লাহর কসম! সে আমাকে এমন একজন উম্মি নবীর কথা বলেছে, তিনি যখনই কোনো ভালো কাজের আদেশ করেন, প্রথমে তিনিই সেই কাজটি করেন। আর যে কাজ হতে তিনি নিষেধ করেন, প্রথমে তিনিই তা বর্জন করেন। তিনি বিজয়ী হয়েও অহংকার করেন না। কেউ তাঁর ওপর প্রতাপ দেখালেও তিনি রুষ্ট হন না। তিনি ওয়াদা পালন করেন। চুক্তিসমূহ বাস্তবায়ন করেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিঃসন্দেহে তিনি একজন সত্য নবী। (১২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আখলাক-চরিত্র ছিল পূর্ণ ও পরিব্যাপ্ত। এটা ছিল তাঁর চারিত্রিক মহত্ত্ব। এ কারণে তাঁর চরিত্রের সকল দিক ছিল সমপর্যায়ের। তাঁর ছিল যেমন পাহাড়সম ধৈর্য, তেমনই ছিল দুর্বার সাহসিকতা। দয়ার মতোই ছিল তাঁর পূর্ণ আমানতদারি। তাঁর সততার মতোই ছিল তাঁর অপরিসীম সহনশীলতা এবং সময়ের আবর্তনে তাঁর চরিত্রের মাঝে কখনো কোনো তারতম্য ঘটেনি। জীবনের কোনো সময়ে একটু বেশি আবার কখনো একটু কম এমন কখনো হয়নি। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত জগতের আর কোনো মানুষের মাঝে একসঙ্গে এতগুলো চারিত্রিক গুণ কখনো পরিলক্ষিত হয়নি। (১৩)
এ কারণে বিখ্যাত জার্মান লেখক ও কবি জোহান গ্যোটে বলেছেন, 'ইতিহাসের পাতায় আমি তন্নতন্ন করে সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠ মানুষের দৃষ্টান্ত খুঁজেছি, অবশেষে তা পেয়েছি আরব নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে।' (১৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম চরিত্রাবলির মূল উৎস ছিল পবিত্র কুরআন। কুরআনুল কারিম থেকেই তিনি তাঁর চারিত্রিক গুণাবলি আহরণ ও সমৃদ্ধ করেছেন। অতএব, এই কুরআনই তাঁর পূর্ণ গুণাবলিকে পৌঁছে দিয়েছে সর্বোচ্চ পূর্ণতায়। তাঁর সুন্দর শিষ্টাচারকে করেছে আরও সৌন্দর্যময়। আর এটা সম্ভব হওয়ার কারণ হলো, কুরআনুল কারিমে বর্ণিত সকল কল্যাণের দিকে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেছেন। কুরআনের নির্দেশনার সকল-কিছুই তিনি তাঁর জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন। এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন জমিনে বিচরণকারী এক জীবন্ত কুরআন। হয়ে উঠেছিলেন কুরআনে বর্ণিত প্রতিটি ভালো কাজ ও কর্মের উজ্জ্বল উদাহরণ। এ কারণে হজরত সাদ ইবনে হিশাম ইবনে আমের রা. যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্রের ব্যাপারে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা.-কে প্রশ্ন করেছিলেন, তখন আয়েশা রা. তার উত্তরে বলেছিলেন, 'তুমি কি কুরআন পড়োনি?' সাদ ইবনে হিশাম বললেন, 'পড়েছি।' হজরত আয়েশা রা. বললেন,
فَإِنَّ خُلُقَ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ الْقُرْآنَ»
কুরআনই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আখলাক-চরিত্র (অর্থাৎ তাঁর চরিত্র ছিল কুরআনে বর্ণিত চরিত্রের অনুরূপ)।(১৫)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'নবীজির চরিত্র ছিল কুরআনের বর্ণনার অনুরূপ' এই বলে হজরত আয়েশা রা. সুরা মুমিনুনের ﴾قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ﴿ প্রথম ১০টি আয়াত তিলাওয়াত করেন এবং বলেন, 'কুরআনে বর্ণিত এই গুণগুলো পরিপূর্ণভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে বিদ্যমান ছিল।' (১৬)
কত সূক্ষ্মভাবেই না উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারিত্রিক গুণাবলি বর্ণনা করে দিয়েছেন!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইসলামের চাহিদার অনুরূপ। তাঁর এই ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছিল উত্তম চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে। ইসলামের দিকে তাঁর দাওয়াতের শুরুলগ্ন থেকেই আরবরা এটা বুঝতে পেরেছিল। অনেক সময় তাঁর এই ব্যক্তিত্বই হয়ে উঠেছে তাদের জন্য দাওয়াত। যেমন তিনি যখন শাইবান ইবনে ছালাবার জনপ্রতিনিধিদলকে দাওয়াত প্রদান করেন, তখন তাদের মধ্যে ছিল মাফরুক ইবনে আমর, মুছান্না ইবনে হারেসা, হানি ইবনে কাবিসাহ, নুমান ইবনে শরিক। এদের সকলের উদ্দেশ্যে তিনি প্রথমে মহান আল্লাহর বাণী তিলাওয়াত করলেন,
قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ مِنْ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ذَلِكُمْ وَضْكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ)
(তাদেরকে) বলুন, এসো, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের প্রতি যা-কিছু হারাম করেছেন, আমি তা তোমাদেরকে পড়ে শোনাই। তা এই যে, তোমরা তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না, পিতামাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। দারিদ্র্যের কারণে তোমরা নিজ সন্তানদের হত্যা করো না, আমি তোমাদেরও রিজিক দেবো এবং তাদেরও, আর তোমরা প্রকাশ্য হোক বা গোপন কোনোরকম অশ্লীল কাজের নিকটেও যেয়ো না, আর আল্লাহ যে প্রাণকে মর্যাদা দান করেছেন তাকে যথার্থ কারণ ছাড়া হত্যা করো না। হে মানুষ! এই হচ্ছে সেইসব বিষয়, যা আল্লাহ তোমাদের আদেশ করেছেন, যাতে তোমরা উপলব্ধি করো। [সুরা আনআম : ১৫১]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই তিলাওয়াত শুনে মাফরুক ইবনে আমর বলল, 'এটা জগতের কোনো মানুষের রচিত কথা নয়, যদি এগুলো মানুষের কথা হতো, তাহলে তা আমাদের বোধগম্য হতো।' অতঃপর নবীজি আবার তিলাওয়াত করলেন,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ, দয়া এবং আত্মীয়স্বজনকে (তাদের হক) প্রদানের হুকুম দেন, আর অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও জুলুম করতে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো। [সুরা নাহল : ৯০]
এবার এই আয়াত শুনে মাফরুক ইবনে আমর আরও আশ্চর্য হলো এবং নবীজিকে বলল, 'আল্লাহর কসম! হে আমার কুরাইশি সঙ্গী, তুমি উত্তম চরিত্রবান হওয়ার প্রতি আহ্বান করেছ। কিন্তু তোমার সম্প্রদায় সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। তোমাকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করেছে এবং তারা তোমার বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে।(১৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক হাদিসে উত্তম চরিত্রের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রকাশ পেয়েছে। যেমন নিচের হাদিসটিতে তিনি তাঁর সাহাবিদের উত্তম চরিত্রবান হওয়ার শিক্ষা প্রদান করেছেন। তিনি বলেন,
«إِنَّ مِنْ أَكْمَلِ الْمُؤْمِنِينَ إِيْمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَأَلْطَفُهُمْ بِأَهْلِهِ»
নিশ্চয় মুমিনদের মধ্যে তার ঈমান পরিপূর্ণ, যার চরিত্র সর্বোৎকৃষ্ট এবং যে তার স্ত্রী-পরিবারের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল। (১৮)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই উত্তম চারিত্রিক গুণাবলি শুধু তাঁর গোত্রের সীমিত কিছু মানুষের মধ্যে কিংবা বিশেষ কোনো দলের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং যেকোনো স্থানে এবং যেকোনো ক্ষেত্রেই তাঁর আচার-ব্যবহারে চরিত্রের এই শ্রেষ্ঠতা প্রকাশ পেত। তিনি তাঁর অধিকাংশ সময় সাহাবিদের মাঝে অতিবাহিত করতেন। তিনি কখনো নিজেকে তাদের থেকে আলাদা মনে করতেন না। তিনি গরিবদের সাথে ওঠাবসা করতেন। মিসকিনদের সাহায্য করতেন। যেকোনো দাসী বা চাকরানি তাঁকে মদিনার রাস্তায় যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেতে পারত। তিনি অসুস্থকে দেখতে যেতেন। জানাজায় উপস্থিত হতেন। সাহাবিদের বাড়িতে গিয়ে তাদের খোঁজখবর নিতেন। তারাও তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে তাঁর বাড়িতে আসতেন। তিনি সর্বদা হাসিমুখে থাকতেন। তাঁর ছিল প্রশস্ত কপাল। চওড়া কাঁধ। বলিষ্ঠ শরীর। প্রফুল্ল চেহারা। তিনি ছিলেন উম্মতের জন্য অতিশয় দরদি। কঠিন ও সহজ এমন দুটি বিষয়ের মধ্যে তাঁকে স্বাধীনতা দেওয়া হলে তিনি সহজটাই গ্রহণ করতেন, যদি না সেটা গুনাহের কোনো কাজ হতো। আর যদি কোনো গুনাহের কাজ হতো, তাহলে সবার তুলনায় তিনিই সবচেয়ে বেশি তা থেকে দূরে থাকতেন। তিনি বেশি বেশি ক্ষমা করতেন। এমনকি যে তাঁর ওপর জুলুম করেছে এবং জুলুমের ক্ষেত্রে অত্যধিক বাড়াবাড়ি করেছে, তাকেও তিনি ক্ষমা করে দিতেন।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম চরিত্রের প্রকাশ ঘটেছে তাঁর পরিবারের সাথে, সমাজে বসবাসরত অমুসলিমদের সাথে, এমনকি যুদ্ধরত শত্রুদলের সাথেও তাঁর সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ তাঁর চরিত্রকে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়। যেমন আবু সুফিয়ান রা. ইসলামগ্রহণের পূর্বে তাঁর উত্তম চরিত্রের নমুনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তিনি যখন কাফেরদের সর্দার। ইসলামগ্রহণের পর তিনি অকপটে স্বীকার করে বলেছিলেন, فداك أبي وأمي، والله إنك لكريم، ولقد حاربتك؛ فنعم محاربي كنت، ثم سالمتك؛ فنعم المسالم أنت، فجزاك الله خيرا
আপনার ওপর আমার পিতামাতা উৎসর্গিত হোক। আল্লাহর কসম! নিশ্চয় আপনি একজন মহান ব্যক্তি। আমি যুদ্ধ করেছি আপনার বিরুদ্ধে, আপনি কতই-না উত্তম যোদ্ধা ছিলেন! আমি আপনার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি, আপনি কতই-না উত্তম চুক্তিকারী ছিলেন! মহান আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। (১৯)
মূলকথা, গ্রন্থের এই গুটিকয়েক পাতায় কিছুতেই আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম চরিত্রের ব্যাপকতা ব্যক্ত করতে সক্ষম নই। এটা যেন এক বিশাল দরিয়া। তাঁর চরিত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা করে বারবার বিস্মিত ও বিমুগ্ধ হয়েছে মুসলিম থেকে শুরু করে বিশ্বের অনেক অমুসলিম পণ্ডিত পর্যন্ত। যেমন বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক উইলিয়াম ম্যুর (William Muir : ১৮১৯-১৯০৫ খ্রি.)(২০) নবী-জীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, 'তাঁর পুরো জীবন ছিল সহজ ও স্বাভাবিকতার নান্দনিক চিত্র। তাঁর অনন্য রুচি ও ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাঁর বহু অনুসারীর কথায়। বিনয়, নম্রতা, সহানুভূতি, ধৈর্য, অন্যকে নিজের ওপর প্রাধান্যদান এবং প্রচুর দানশীলতা তাঁর চরিত্রকে দিয়েছিল এক অনন্যসাধারণ সৌন্দর্য। তাঁর ভালোবাসার আকর্ষণ চারপাশের সকলকে মোহিত করে রাখত। কোনো সামান্য-সাধারণ ব্যক্তির দাওয়াতও তিনি কখনো প্রত্যাখ্যান করেননি। অতি স্বল্প হলেও হাদিয়া গ্রহণে কখনো অস্বীকৃতি জানাননি। বৈঠকে তিনি কখনো নিজের বড়ত্ব ও মহত্ত্ব প্রকাশ করেননি। কেউ কখনো অনুভব করেনি যে, দারিদ্র্যের কারণে তাঁর আগমনকে উপেক্ষা করা হয়েছে। বরং যখনই কেউ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছে, তিনি হাসিমুখে তাকে সাদরে গ্রহণ করে কাছে টেনে নিয়েছেন। সবার সুখে অংশগ্রহণ করতেন আবার অসহায় ও দুঃখী মানুষের সাথে তাদের কষ্টকেও ভাগ করে নিতেন। তাদের প্রতি সমবেদনা জানাতেন। তিনি সর্বদা এই কর্ম ও চিন্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন যে, কীভাবে তাঁর চারপাশের মানুষকে আরও বেশি সুখে, শান্তিতে ও স্বস্তিতে রাখা যায়। (২১)
তিনিই আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), যাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি এবং আমাদের সাথে গর্ব করে সমগ্র মানবসভ্যতা। জগতে একমাত্র তিনিই ছিলেন এই কথার যোগ্য-'নিশ্চয় তাঁর চরিত্র ছিল কুরআনের প্রতিচ্ছবি'।

টিকাঃ
১. ছকেম: ৪২২১, আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি: ২০৫৭১
১০. শিহাবুদ্দিন আলুসি রহ, রচিত রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআনিল আজিম: ২৯/২৫। (ঈষৎ পরিমার্জিত)
১১. ওমানের বাদশাহ। তার কাছেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের দাওয়াত দিতে দূত হিসেবে হজরত আমর ইবনে আসকে পাঠিয়েছিলেন। দেখুন, আল-ইসাবা: ১/৫৩৮।
১২. কাজি ইয়াজ: আশ-শিফা: ১/২৪৮।
১৩. মুহাম্মাদ সাদেক আরজুন (محمد الصادق عرجون) : মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ: ১/২১১, ২১২।
১৪. ফিরিস্তি হুস্কে: শামসুল আরাব তাসতায়ু আলাল গারব: ৪৬৫।
১৮. সুনানে তিরমিজি: ২৬১২, মুসনাদে আহমাদ: ২৪২৫০, ২৪৭২১।
১৯. আবু নুয়াইম ইস্পাহানি: মারিফাতুস সাহাবাহ: ৩/১৫০৯।
২০. স্যার উইলিয়াম ম্যুর (William Muir : ১৮১৯-১৯০৫ খ্রি.)। তিনি একজন ইংরেজ ঐতিহাসিক ও প্রাচ্যবিদ। ইসলাম নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচার-আচরণ ও আখলাক নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন। এডিনবার্গ এবং গ্লাসগো ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং পরে এডিনবার্গ ইউনিভার্সিটির প্রিপিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
২১. হায়াতু মুহাম্মাদ: উইলিয়াম ম্যুর। তার থেকে এটি উদ্ধৃত করেছেন সাইদ হাউওয়া। তার কিতাব: আর-রাসুল: ১৪৭।

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 নবীজি ﷺ-এর সততা

📄 নবীজি ﷺ-এর সততা


মানুষের মহান গুণাবলির মধ্যে অন্যতম একটি গুণ হলো সততা। এ কারণে কুরআনুল কারিমেও বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে সততার প্রতি। আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদের সততার প্রতি আহ্বান করে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো। [সুরা তাওবা: ১১৯]
অর্থাৎ কুরআনুল কারিম মুসলিম সমাজকে আহ্বান করছে সততার মতো এই সুউচ্চ গুণে গুণান্বিত হওয়ার প্রতি, সৎ ব্যক্তিদের সঙ্গী হওয়ার প্রতি। কেননা সততাই হলো সকল কল্যাণের চাবিকাঠি।
এই মহান গুণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন উত্তম দৃষ্টান্ত এবং আদর্শ। তাঁর নবুয়তপ্রাপ্তিরও বহু আগে কুরাইশদের পক্ষ থেকে তাঁকে 'আস-সাদিক, আল-আমিন' (সত্যবাদী ও আমানতদার) উপাধি প্রদান করা হয়েছিল। এই বিশ্বস্ততার কারণেই তারা তাদের মূল্যবান প্রয়োজনীয় সম্পদ তাঁর নিকট গচ্ছিত রাখত। তাদের গোপন বস্তুসমূহ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাঁকেই তারা নিরাপদ মনে করত।
কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁকে যখন নবুয়ত প্রদান করলেন, তখন তাঁর আত্মীয় ও তাঁর বংশ (কুরাইশ) তাঁর সাথে শত্রুতা, বিদ্বেষ, ঘৃণা ও বিরোধিতা প্রকাশ করতে শুরু করে। এই কঠিন মুহূর্তেও তিনি তাঁর মহান সততা ও আমানতদারির প্রকাশ ঘটিয়েছেন এবং তাদের সেই গচ্ছিত আমানত যথাযথভাবে তাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে গেছেন। (২২)
আল্লাহ তাআলা যখন তাঁকে নিজের নিকটাত্মীয়দের আখিরাতের প্রতি সতর্ক করার আদেশ দিলেন, তখন তিনি সাফা পর্বতে আরোহণ করে সকলকে ডেকে বললেন,
أَرَأَيْتَكُمْ لَوْ أَخْبَرْتُكُمْ أَنَّ خَيْلًا بِالْوَادِي تُرِيدُ أَنْ تُغِيْرَ عَلَيْكُمْ، أَكُنْتُمْ مُصَدِّقِيَّ؟ قَالُوا : نَعَمْ، مَا جَرَّبْنَا عَلَيْكَ إِلَّا صِدْقًا
বলো তো, আমি যদি তোমাদের বলি, অশ্বারোহী শত্রুসৈন্য উপত্যকায় এসে পড়েছে, তারা তোমাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করতে উদ্যত, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?
তারা বলল, হ্যাঁ, আমরা সর্বদা তোমাকে কথা ও কাজে সত্যবাদী পেয়েছি...। (২৩)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সততার সাক্ষ্য দিয়েছিল তাঁর চরম শত্রু নজর ইবনে হারেস। সে কুরাইশ গোত্রের সামনে এসে অকপটে স্বীকার করে বলেছিল, 'হে কুরাইশরা, আল্লাহর কসম! তোমাদের ওপর এমন একটা দুর্যোগ নেমে এসেছে, যা থেকে রক্ষা পাওয়া তোমাদের সাধ্যের বাইরে। মুহাম্মাদ যখন তোমাদের মধ্যে একজন তরুণ যুবক, তখন সে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে সত্যবাদী ও সবচেয়ে আমানতদার। অবশেষে যখন তোমরা তাঁর মধ্যে প্রৌঢ়ত্বের ছাপ দেখলে এবং সে একটা অভিনব মতাদর্শ তোমাদের কাছে নিয়ে এলো, তখন তোমরা বললে, সে জাদুকর। অথচ আল্লাহর কসম! সে জাদুকর নয়। আমরা তো জাদুকরের ঝাড়ফুঁক ও তাবিজ-কবজ দেখেছি। তোমরা আবার বললে, সে একজন গণক, কিন্তু আল্লাহর কসম! সে গণক নয়। আমরা গণকের সূক্ষ্ম হেঁয়ালি ও ছন্দোবদ্ধ কথাবার্তা অনেক শুনেছি। এরপর তোমরা বললে, সে একজন কবি। অথচ আল্লাহর কসম! সে কবি নয়। আমরা সবরকম কবিতা শুনেছি ও দেখেছি। আবার তোমরা বললে, সে একজন পাগল। অথচ আল্লাহর কসম! সে পাগলও নয়। আমরা অনেক পাগল দেখেছি। তাঁর মধ্যে পাগলামির কোনো চিহ্ন নেই। অতএব, হে কুরাইশরা, তোমরা নিজেদের ব্যাপারে চিন্তা করো। আল্লাহর কসম! তোমাদের ওপর অবশ্যই একটি ঘোরতর দুর্যোগ নেমে এসেছে।(২৪)
সবচেয়ে বড় কথা হলো, তাঁর সততার ব্যাপারে সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক স্বয়ং আল্লাহ তাআলার সাক্ষ্য রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ أُولَبِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে ব্যক্তি সত্য কথা নিয়ে এসেছে এবং নিজেও তা বিশ্বাস করে, এরূপ লোকই মুত্তাকি। [সুরা যুমার: ৩৩]
যিনি সত্য কথা নিয়ে এসেছেন তিনি হলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর যিনি তাঁর আনীত বাণীর সত্যতার বিষয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তিনিই হলেন আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। সাক্ষ্য দিচ্ছেন তাঁর সেই বাণী কুরআনুল কারিমে, যা সপ্তাকাশ থেকে জমিনে নাজিল হয়েছে।
ইমাম ইবনে আশুর রহ. উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'যিনি সত্য নিয়ে এসেছেন তিনি হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর সত্য হলো মহাগ্রন্থ আল কুরআন।'(২৫)
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা তাঁর কথা ও কাজে অন্যদেরও সত্য ও সততার প্রতি উৎসাহিত করতেন। তিনি বলেন,
عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ؛ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ، وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصِّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ صِدِّيقًا، وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ؛ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ، وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا»
তোমরা সততাকে গ্রহণ করো। কেননা সত্য সৎকাজের দিকে পথ প্রদর্শন করে এবং সৎকাজ বেহেশতের পথ দেখায়। আর কোনো ব্যক্তি সত্য বলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত তাঁর নাম আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হিসেবে লেখা হয়। আর মিথ্যা পাপাচারের দিকে পথ দেখায় এবং পাপাচার জাহান্নামের পথ দেখায়। আর মানুষ মিথ্যা বলতে থাকলে অবশেষে আল্লাহর কাছে সে মিথ্যাবাদী হিসেবে লিখিত হয়ে যায়। (২৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের সম্বোধন করে আরও বলেছেন,
«اضْمَنُوا لِي سِتًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنْ لَكُمُ الْجَنَّةَ؛ أَصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ وَأَوْفُوْا إِذَا وَعَدْتُمْ وَأَدُّوْا إِذَا اؤْتُمِنْتُمْ وَاحْفَظُوا فُرُوْجَكُمْ وَغُضُوْا أَبْصَارَكُمْ وَكُفُوْا أَيْدِيَكُمْ»
তোমরা নিজেদের ব্যাপারে ৬টি জিনিসের দায়িত্ব নাও, তাহলে আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের দায়িত্ব নেব। ১. তোমরা যখন কথা বলবে সত্য বলবে। ২. ওয়াদা করলে পূরণ করবে। ৩. আমানত রাখলে তার যথাযথ সংরক্ষণ করবে। ৪. নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে। ৫. তোমাদের দৃষ্টি (হারাম দৃশ্য থেকে) অবনত রাখবে। ৬. এবং জুলুম থেকে নিজেদের বিরত রাখবে। (২৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যে, তিনি সন্দেহপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে চলতেন। এ ব্যাপারে তিনি নিজে যেমন সচেতন ছিলেন, তেমনি অন্য মুসলমানকেও সচেতন থাকার শিক্ষা দিতেন। সত্য ও সততার প্রতি ভালোবাসার কারণেই তিনি এমনটা করতেন এবং বলতেন। এ ব্যাপারে সবচেয়ে উত্তম উদাহরণ হলো হজরত আবুল হাওরা সাদি রহ.-এর বর্ণনা। তিনি বলেন, 'আমি একবার হজরত হাসান ইবনে আলি রা.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কী কী বিষয় সংরক্ষণ করেছেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আমি সংরক্ষণ করেছি এই কথাটি-
دَعْ مَا يُرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يُرِيبُكَ؛ فَإِنَّ الصِّدْقَ طُمَأْنِيْنَهُ وَإِنَّ الْكَذِبَ رِيبَةٌ
যাতে তোমার দ্বিধা আছে তা পরিত্যাগ করো, যাতে তোমার দ্বিধা নেই তা গ্রহণ করো। সত্য হলো প্রশান্তিময় আর মিথ্যা হলো দ্বিধাপূর্ণ। (২৮)
সত্যের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই আগ্রহ ও ভালোবাসা সাময়িক ছিল না। বরং তিনি সর্বদা জীবনের সকল কাজ ও কর্মে সত্যের ওপর অবিচল থেকেছেন। সত্য ছিল তাঁর স্বভাবজাত। এ কারণে তিনি মজা ও হাস্যরসের সময়ও সত্য বলতেন। অথচ কেউ কেউ মনে করেন, এইসব ক্ষেত্রে একটু মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া দোষের কিছু নয়। হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেন, একবার এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে একটা বাহনের ব্যবস্থা করে দিন।' তখন তিনি তাকে বললেন, 'আমি তোমাকে বাহনের জন্য একটা উটনীর বাচ্চা দেবো।'
লোকটি বলল, 'উটনীর বাচ্চা দিয়ে আমি কী করব?' তিনি বললেন, 'সকল উটকে তো উটনীই জন্ম দেয়!' (২৯)
আত্মিক নৈকট্য, সহজ সাবলীলতা ও প্রীতিকর সম্পর্ক বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণ মানুষের সাথে কখনো কখনো এমন হাস্যরস করতেন। কিন্তু এ সকল ক্ষেত্রেও তিনি সর্বদা সত্যই বলতেন।
এ একই অবস্থা ছিল তাঁর যুদ্ধের ময়দানেও। যদিও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শত্রুবাহিনীর ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য এবং হামলা প্রতিহত করার জন্য যুদ্ধে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার বৈধতার কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি নিজে কখনো এমন অবস্থাতেও সত্য ছাড়া মিথ্যা বলেননি। বদর যুদ্ধের শুরুর দিকে লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকবাহিনীর খোঁজখবর নেওয়ার জন্য বের হলেন। সাথে ছিলেন আবু বকর রা.। কিছুদূর যাওয়ার পর তারা এক বৃদ্ধ আরবের সাক্ষাৎ পেলেন। (বৃদ্ধ লোকটি নবীজিকে চিনত না) তারা বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করলেন, সে কুরাইশ গোত্রের কোনো তৎপরতার কথা জানে কি না, কিংবা মুহাম্মাদ ও তাঁর সাথিদের কোনো খবর রাখে কি না।
বৃদ্ধ বলল, 'তোমরা কারা সেটা আগে বলো, নইলে আমি তোমাদের প্রশ্নের উত্তর দেবো না।'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমরা যা জানতে চেয়েছি, সেটা আগে বলো। তারপর আমরা আমাদের পরিচয় দেবো।'
বৃদ্ধ বলল, 'অর্থাৎ খবরের বিনিময়ে পরিচয়।'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ।'
তখন বৃদ্ধ বলল, 'শুনেছি মুহাম্মাদ ও তাঁর সাথিরা অমুক দিন যাত্রা শুরু করেছে। খবর সত্য হলে তাদের এখন অমুক জায়গায় থাকার কথা, আর আমি এও খবর পেয়েছি যে, কুরাইশরা অমুক দিন বের হয়েছে। এ খবর যদি সঠিক হয়, তবে তারা আজ অমুক স্থানে থাকার কথা।'
বস্তুত, বৃদ্ধ লোকটি যে স্থানের কথা বলেছিল, কুরাইশরা তখন সেখানেই অবস্থান করছিল। বৃদ্ধ তার খবর দেওয়া শেষ করে জিজ্ঞেস করল, 'এবার বলো, তোমরা কোত্থেকে এসেছ?'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'مَاءٍ مِنْ نَحْنُ-আমরা পানি থেকে এসেছি।' এ কথা বলে তিনি বৃদ্ধের কাছ থেকে চলে এলেন। লোকটি তখন নিজে নিজে বলতে লাগল, 'আমরা পানি থেকে এসেছি'-এর তাৎপর্য কী? পানি থেকে, ইরাকের পানি থেকে নাকি? (৩০)
আমাদের এই পরিচ্ছেদের একটি চমৎকার সমাপ্তি ঘটাতে চাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই ঘটনাটি বর্ণনার মাধ্যমে, যা সংঘটিত হয়েছিল হাওয়াজিন গোত্রের প্রতিনিধির সঙ্গে। হাওয়াজিন গোত্রের লোকেরা ইসলামগ্রহণের দিন যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হাজির হলো, তখন তিনি তাদেরকে ইসলামের মহান আদর্শ সততার মূল্য শিক্ষা দিতে গিয়ে বললেন,
«أَحَبُّ الْحَدِيثِ إِلَيَّ أَصْدَقُهُ»
কথার মধ্যে আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় হলো সত্য কথা...। (৩১)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোটা জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রই ছিল সত্য ও সততায় পরিপূর্ণ। এ কারণে থমাস কার্লাইল (Thomas Carlyle)-এর মতো দার্শনিক বলতে বাধ্য হয়েছেন, 'আপনারা ভেবে বলুন তো, একজন মিথ্যাবাদী ও অজ্ঞ ব্যক্তি কি কখনো এমন একটি অনিন্দ্য সুন্দর স্থায়ী ধর্ম তৈরি করতে পারে? আর মিথ্যাবাদী ও অজ্ঞ ব্যক্তি তো ইটের তৈরি একটি ঘরও বানাতে পারে না! যে ব্যক্তি ভবনের চুন, সিমেন্ট, মাটি ও বিল্ডিংয়ের নকশা বা ডিজাইনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিছুই জানে না, সে যদি একটি ভবন নির্মাণ করে, তাহলে সেই ভবনের অবস্থা কেমন হয়? সেটা হয় অতি ভঙ্গুর একটি টিলার মতো। সেটা হয় বিভিন্ন উপকরণের সমন্বয়ে গঠিত বিশৃঙ্খল একটি স্তুপ। সেটা কিছুতেই এমন স্থায়িত্বের গুণ পেতে পারে না, যার আশ্রয়ে দুইশ মিলিয়ন (২০ কোটি) (৩২) মানুষ বারোটি শতাব্দীরও বেশি (এখন প্রায় সাড়ে চৌদ্দ শতাব্দী) সময় বসবাস করবে। বরং হওয়ার কথা তো ছিল, সময়ের পরিক্রমায় কিছুদিনের মধ্যেই এর স্তম্ভগুলো ভেঙে পড়বে এবং সেটা এমনভাবে বিলীন হয়ে যাবে, মনে হবে যেন এখানে কোনোদিন এ জাতীয় কোনো বস্তুর অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু ইসলামের ভবনের ক্ষেত্রে তেমনটি কখনো হয়নি।
আমি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একজন মানুষের জন্য উচিত হবে তার জীবনের সকল বিষয়ে প্রাকৃতিক নিয়মাবলির অনুসরণ করা। নতুবা কখনো তার উদ্দেশ্য সফল হবে না। অথচ এ সকল অবিশ্বাসী মানুষ প্রাকৃতিক সত্যকে অস্বীকার করে শুধু মিথ্যাকেই ছড়িয়েছে। তারা এতটা সুশোভিতভাবে মিথ্যার ফুলঝুরি ছড়িয়েছে যে, আজ সেটাকেই মানুষ সত্য বলে ভাবতে শুরু করেছে... পরিতাপের বিষয় যে, এইসব বিভ্রান্তির কারণে বহু দল ও জাতি প্রতারিত ও বিভ্রান্ত হয়েছে...। (৩৩)

টিকাঃ
২২. আস-সুনানুল কুবরা লিল-বাইহাকি : ১২৪৭৭, ইবনে কাছির: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ৯/২/১-৫৯; আল্লামা তাবারি: তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক : ১/৫৬৯।
২৩. সহিহ বুখারি : ৪৭৭০, সহিহ মুসলিম : ৫০৮।
২৪. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা (السيرة النببية) : ১/২৯৯-৩০০, সুহাইলি (السهیلی) : আর-রওজুল উনুফ (الروض الأنف) : ৩/৬৮, ইবনে সাইয়েদিন নাস (ابن سید (الناس : উয়ুনুল আছার (عيون الأثر) : ২/৪২৭।
২৫. ইবনে আশুর (ابن عاشور) : আত-তাহরির ওয়াত-তানবির (التحرير والتنوير) : ২৪/৮৬
২৬. সহিহ মুসলিম: ২৬০৭, সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৮৯, সুনানে তিরমিজি: ১৯৭১, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৮৪৯।
২৭. মুসনাদে আহমাদ: ২২৮০৯, ২২৭৫৭; সহিহ ইবনে হিব্বান: ২৭১।
২৮. সুনানে তিরমিজি: ২৫১৮, ২৫২০; মুসনাদে আহমাদ: ১৭২৩, সুনানে নাসায়ি: ৭২৭৫।
২৯. সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৯৮, মুসনাদে আহমাদ: ১৩৮৪৪।
৩০. ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৩৯৬, ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৬১৫, সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ : ৫/৭৩, ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার ১/৩২৯।
৩১. সহিহ বুখারি: ২৩০৭, সুনানে আবু দাউদ: ২৬৯৩, ২৬৮৪; মুসনাদে আহমাদ: ১৮৯৩৪।
৩২. থমাস কার্লাইল মুসলমানদের এই জনসংখ্যা উল্লেখ করেছিলেন তার গ্রন্থ আল-আবতাল প্রকাশের সময়ের হিসেবে। কিন্তু এখন, ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বে مسلمانوں সংখ্যা ১.৩ বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। এর জন্য দেখুন, আরবি সংবাদপত্র 'আশ-শারকুল আওসাত'-এর ওয়েবসাইট : www.asharqalawsat.com। (বর্তমান ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে www.worldpopulationriview.com-এর তথ্যমতে মুসলমানদের সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ১.৯ বিলিয়নে। শিয়া-কাদিয়ানি ইত্যাদিসহ কাদিয়ানি ছাড়া ১.৫ বিলিয়ন। অনুবাদক)
৩৩. থমাস কার্লাইল: আবতাল: ৪৩।

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 নবীজি ﷺ-এর দয়া ও অনুগ্রহ

📄 নবীজি ﷺ-এর দয়া ও অনুগ্রহ


দয়া ও অনুগ্রহ, আল্লাহ তাআলার মহান গুণাবলির একটি। সৃষ্টির প্রতি তাঁর সবচেয়ে বড় দয়া হলো, তিনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে বের করার জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মানবজাতির রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
(হে নবী,) আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত করেই পাঠিয়েছি। [সুরা আম্বিয়া: ১০৭]
এজন্য অধিকাংশ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ! إِنَّمَا أَنَا رَحْمَةٌ مُهْدَاةٌ
হে মানুষেরা, নিশ্চয় আমি উপহার হিসেবে প্রদত্ত এক রহমত। (৩৪)
তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ ছিল সকল মানুষের জন্য সমান ও ব্যাপক, বিশেষত এই উম্মতের জন্য। নিচের হাদিসটির দিকে লক্ষ করলেই আমরা এর বাস্তবতা অনুধাবন করতে সক্ষম হব। তিনি বলেন, আমার ও লোকদের দৃষ্টান্ত এমন এক ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালাল; যখন তার চতুর্দিক আলোকিত হয়ে গেল, তখন পতঙ্গের দল আগুনে এসে পড়তে লাগল। সে সেগুলোকে আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য টেনে ধরতে লাগল। কিন্তু তারা তাকে ব্যর্থ করে দিয়ে প্রজ্বলিত আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। তেমনইভাবে আমিও তোমাদের কোমর ধরে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করছি অথচ তোমরা তাতেই ঝাঁপিয়ে পড়ছ। (৩৫)
এ এক অভূতপূর্ব দয়া ও মমতার নিদর্শন। গোটা জগতে দয়া ও মমতার এমন দৃষ্টান্ত কিংবা তার কাছাকাছি দৃষ্টান্তও কোথাও পাওয়া যাবে না।
তাঁর সীমাহীন দয়া ঘিরে রেখেছিল ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, কাছে-দূরের সকলকেই, এমনকি বন্ধু এবং শত্রুকেও। তাঁর দয়া বা অনুগ্রহ কোনো স্থান বা সময়ের সাথে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সকল জগৎ অর্থাৎ মানুষ, জিন এবং সকল প্রাণীর জন্যই তাঁর দয়া ছিল অবারিত। এভাবে তাঁর দয়া বা অনুগ্রহ কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা সময়ের সাথেও সীমাবদ্ধ নয়। বরং তাঁর জন্মের শুরু থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সকলের জন্যই এটি পরিব্যাপ্ত। এ কারণেই আমরা দেখতে পাই, তিনি তাঁর উম্মতকেও দয়ার গুণ অর্জনের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন,
«إِنَّمَا يَرْحَمُ اللَّهُ مِنْ عِبَادِهِ الرُّحَمَاءَ»
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে দয়ালু ও স্নেহপরায়ণদের প্রতি দয়া করেন। (৩৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি কথা ও কাজে দয়া ও মমতার যে নিদর্শন ফুটে উঠত, তা কোনো লৌকিকতাপূর্ণ দয়া ছিল না যে, সামাজিকতা ও লোক দেখানোর জন্য তা করা হয়েছে। বরং তাঁর দয়া ও মমতা ছিল তাঁর সত্তাগত ও স্বভাবজাত, যা সর্বক্ষণ সর্বক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়েছে। স্থানের পার্থক্য এবং বিষয়ের ভিন্নতার ক্ষেত্রেও তা একইরকম ছিল। এমনকি দয়া ও মমতার গুণটি তাঁর চরিত্রের অন্য সকল গুণকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাই এটাই সব জায়গায় সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিয়েছে। আর এটা আশ্চর্যেরও কোনো বিষয় নয়। কেননা কুরআনুল কারিমে একটু গভীরভাবে দৃষ্টিপ্রদানকারী যে-কেউ দেখতে পাবে, তাতে বর্ণিত সকল গুণের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম গুণ হলো দয়া বা অনুগ্রহ। (চিত্র নং-১)
বয়স্ক ও ছোটদের প্রতি নবীজির দয়ার কথা আমরা এই হাদিসের মাঝে লক্ষ করতে পারি। তিনি বলেন,
«لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيْرَنَا وَيُوَقِّرْ كَبِيرَنَا»
যে ব্যক্তি ছোটদের স্নেহ আর বড়দের শ্রদ্ধা করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (৩৭)
সেই সমাজের চেয়ে মহান সমাজ আর কোনটি হতে পারে, যে সমাজের সকলকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা ও কর্মের মাধ্যমে পরস্পরের প্রতি দয়া ও সহানুভূতিপূর্ণ আচরণের শিক্ষা দিয়েছেন!
আমরা আরও দেখি, তিনি এমন অপরাধীর প্রতিও দয়া ও সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ করেছেন, যারা তাঁর নিকট এসে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে। সাহাবিদের মধ্যে কেউ যদি নিজের গুনাহের কাফফারা (অপরাধের ক্ষতিপূরণ) আদায় করতে অক্ষম হতো, সে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট চলে আসত এই আশায় যে, তিনি অপরাধের কাফফারা আদায় করে দেবেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে এমন বহু ঘটনা রয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো হজরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণিত একটি ঘটনা। তিনি বলেন, একবার এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমি তো ধ্বংস হয়ে গিয়েছি!'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমার কী হয়েছে?'
লোকটি বলল, 'আমি রোজা অবস্থায় স্ত্রী-সহবাস করে ফেলেছি।' নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আজাদ করার মতো তোমার কি কোনো ক্রীতদাস আছে?'
সে বলল, 'না।'
নবীজি বললেন, 'তাহলে তুমি কি একাধারে দুই মাস রোজা রাখতে পারবে?'
সে বলল, 'না।'
নবীজি বললেন, 'তাহলে কি ষাটজন মিসকিন খাওয়াতে পারবে?'
সে বলল, 'না।'
তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ হয়ে গেলেন। আমরাও তখন তাঁর নিকট বসে আছি। এ সময় তাঁর নিকট খেজুরভরতি একটি ঝুড়ি পেশ করা হলো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'প্রশ্নকারী কোথায়?'
সে বলল, 'এই যে আমি।'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এগুলো নিয়ে সদকা করে দাও।'
লোকটি বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, এটা কি আমি আমার চেয়েও বেশি অভাবগ্রস্তকে সদকা করব? আল্লাহর শপথ, মদিনার দুই প্রান্তে আমার পরিবারের চেয়ে অভাবগ্রস্ত আর কেউ নেই।'
এবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন। এমনকি তাঁর সামনের দাঁত প্রকাশিত হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, এগুলো তুমি তোমার পরিবারকে খাওয়াও।' (৩৮)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই আচরণটি কতই-না দয়া ও সহানুভূতিপূর্ণ ছিল। কোনো ধরনের ক্রোধ বা ক্ষোভের প্রকাশ ছাড়াই তিনি বারবার লোকটিকে কাফফারা আদায়ের উপায় বলে দিচ্ছিলেন। তার বিষয়টাকে মৃদু হেসে সহজ-স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন, যা অপরাধীকে একপ্রকার মানসিক প্রশান্তি দেয়। এরপর লোকটি যখন কাফফারা আদায়ের সকল পদ্ধতিতে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করল, তখনও নবীজি বিরক্ত হননি। বরং কেউ যখন তাঁর জন্য খেজুর হাদিয়া নিয়ে এলো, তিনি সন্তুষ্টচিত্তে সেটা সেই সাহাবির হাতে দিয়ে বললেন, এই নাও খেজুর, এর দ্বারা তুমি তোমার গুনাহের কাফফারা আদায় করে দাও।
ইবাদতের ক্ষেত্রেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দয়ার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে বলল, অমুক ইমাম নামাজ দীর্ঘ আদায় করেন। এ কারণে আমি ফজরের নামাজে উপস্থিত হতে পারি না। বর্ণনাকারী সাহাবি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোনো বয়ানের মধ্যে সেদিনের চেয়ে বেশি রাগান্বিত হতে দেখিনি। এরপর তিনি বললেন,
«يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ مِنْكُمْ مُنَفِّرِيْنَ، فَمَنْ أَمَّ النَّاسَ فَلْيَتَجَوَّزْ؛ فَإِنَّ خَلْفَهُ الضَّعِيفَ وَالْكَبِيرَ وَذَا الْحَاجَةِ»
তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ বিতৃষ্ণা সৃষ্টিকারী আছে। সুতরাং যে জামাতের ইমামতি করে, সে যেন সংক্ষেপ করে। কারণ তার পেছনে দুর্বল, বৃদ্ধ এবং কর্মব্যস্ত লোক থাকে। (৩৯)
যুদ্ধবন্দিদের সাথে আচরণেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়ার প্রকাশ ঘটেছে। যেমন হাতিম তায়ির মেয়ের (৪০) ক্ষেত্রে ঘটেছে। তায়ি গোত্রের বন্দিদের সাথে তাকেও বন্দি করা হয়েছিল। পরে তাকে মসজিদের সামনে একটি সংরক্ষিত স্থানে রাখা হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিক দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। হাতিম-তনয়া তাঁকে দেখে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী ও স্পষ্টভাষিণী। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমার পিতা মৃত্যুবরণ করেছেন। আমার অভিভাবকও (ভাই আদি ইবনে হাতেম রা.) অনুপস্থিত। সুতরাং আপনি আমার প্রতি সদয় হোন। আল্লাহ তাআলাও আপনার প্রতি সদয় হবেন।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতিম-কন্যার এ কথা শুনে বললেন, 'ঠিক আছে, আমি তোমাকে মুক্ত করে দিলাম। কিন্তু তুমি এখনই চলে যাওয়ার ইচ্ছা করো না। বরং তুমি যদি তোমার সম্প্রদায়ের বিশ্বস্ত কাউকে পাও, যে তোমাকে তোমার দেশে পৌঁছে দেবে, তখন আমার নিকট এসো, তারপর যেয়ো।'
হাতিমের মেয়ে বলেন, এরপর আমি সেভাবেই অবস্থান করতে থাকলাম। অবশেষে একদিন শুনতে পেলাম, বালি অথবা কুজাআ থেকে একটি প্রতিনিধিদল এসেছে। আমিও শামে অবস্থানকারী আমার ভাইয়ের নিকট যাওয়ার ইচ্ছা করছিলাম। এবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে বললাম, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমার সম্প্রদায়ের একটি কাফেলা এসেছে। তাতে এমন নির্ভরযোগ্য লোক আছে, যে আমাকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দেবে।' তখন নবীজি আমাকে কাপড়, বাহন ও পথখরচ প্রদান করলেন। আমি সেগুলো নিয়ে কাফেলার সাথে বের হয়ে পড়লাম এবং শামে চলে এলাম। (৪১)
বিষয়টি একটু ভেবে দেখুন! এই বন্দিনির সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতটা দয়াপূর্ণ মানবিক আচরণ করেছেন! তিনি তাকে মুক্ত করে দিলেন। শুধু তাই নয়, একজন নারী হিসেবে তার কল্যাণ চিন্তা করে তার একাকী রওয়ানা হওয়ার প্রতি সম্মত ছিলেন না। বরং তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, 'তুমি এখনই বের হওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ো না; বরং তোমার গোত্রের নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যক্তি পেলে তার সাথে চলে যেয়ো।' তারপর যাওয়ার সময় তাকে বাহন, পোশাক ও রাস্তাখরচ দিয়ে দিলেন!
এ ছাড়াও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়া ও ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে সকল প্রাণী, পশু, পাখি ও কীটপতঙ্গের প্রতিও। তাঁর জীবনীতে আমরা দেখতে পাই, তিনি এমন এক ব্যভিচারিণী মহিলার সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছেন, যে একটি কুকুরের প্রতি সদয় ব্যবহার করেছিল। কুকুরটিকে পানি পান করিয়েছিল। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন! (৪২)
এভাবে নবীজির করুণার পরশ পেয়েছে জীব-জানোয়ার থেকে শুরু করে ছোট পাখি পর্যন্ত, যদিও অন্য প্রাণীগুলোর মতো এগুলো বাহ্যত মানুষের তেমন কোনো উপকারে আসে না। সামান্য একটি চড়ুই পাখির প্রতি আমরা তাঁর অগাধ মমতা ও ভালোবাসা লক্ষ করি! তিনি বলেন,
مَنْ قَتَلَ عُصْفُورًا عَبَثًا عَجَّ إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَقُولُ: يَا رَبِّ! إِنَّ فُلَانًا قَتَلَنِي عَبَثًا وَلَمْ يَقْتُلْنِي لِمَنْفَعَةٍ
কেউ যদি অনর্থক কোনো চড়ুই পাখিকে হত্যা করে, তবে সেই পাখি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার নিকট অনুযোগ করে বলবে, হে আমার প্রতিপালক, আপনার অমুক বান্দা আমাকে অনর্থক হত্যা করেছিল। কোনো প্রয়োজনে সে আমাকে হত্যা করেনি। (৪৩)
এই হলো প্রবৃত্তির কোনো চাহিদা ছাড়াই একনিষ্ঠ দয়া ও ভালোবাসা। এই দয়ার পেছনে পার্থিব কোনো স্বার্থ নেই। কত চমৎকার এই দয়া ও ভালোবাসা, যার অনাবিল স্পর্শে ব্যথিতের যাতনা কমে; লাঘব হয় দুঃখীর দুঃখ।

টিকাঃ
৩৪. সুনানে দারেমি: ১৫, মুসতাদরাকে হাকেম: ১০০।
৩৫. সহিহ বুখারি: ৬৪৮৩, ৬০৩৯; সহিহ মুসলিম: ৬০৯৫।
৩৬. সহিহ বুখারি: ১২৮৪, সহিহ মুসলিম: ৯২৩।
৩৭. সুনানে তিরমিজি: ১৯১৯, ১৯২৫; মুসনাদে আহমাদ: ৬৭৩৩, আল-আদাবুল মুফরাদ লিল শিরি: ৩৫৮।
৩৮. সহিহ বুখারি: ১৯৩৬, ১৮১২; সহিহ মুসলিম: ১১১১।
৩৯. সহিহ বুখারি: ৭০৪, ৬৬৩; সহিহ মুসলিম: ৪৬৬।
৪০. তার নাম সাফফানাহ বিনতে হাতিম তায়ি। তার পিতা ছিলেন আরবের বিখ্যাত দানবীর হাতিম তায়ি। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন, ইবনুল আছির: উসদুল গাবাহ : ৬/১৪৬, ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা: জীবনী নং: ১১২৯১।
৪১. আল্লামা তাবারি : তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক: ২/১৮৮, ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়‍্যা: ৫/২৭৬, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়‍্যা: ৪/১২৩, ১২৪।
৪২. সহিহ বুখারি: ৩৩২১, সহিহ মুসলিম: ২২৪৫।
৪৩. সুনানে নাসায়ি : ৪৪৪৬, মুসনাদে আহমাদ : ১৯৪৮৮, ১৯৪৭০; সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫৯৯৩।

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 নবীজি ﷺ-এর ন্যায়পরায়ণতা

📄 নবীজি ﷺ-এর ন্যায়পরায়ণতা


ন্যায়পরায়ণতা মানুষের শ্রেষ্ঠতম চারিত্রিক গুণাবলির একটি। অন্যের প্রতি একটি দরদি মনের বহিঃপ্রকাশ ও মজলুমের জন্য আশা ও সান্ত্বনার আশ্রয়। এ কারণে কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ निश्चय আল্লাহ ইনসাফ করার (ন্যায়পরায়ণতা) হুকুম দেন। [সুরা নাহল: ৯০]
ন্যায়পরায়ণতা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলাম শত্রুদের বিভিন্ন অপছন্দনীয় কর্মকাণ্ড সত্ত্বেও তাদের সাথে ন্যায়পরায়ণতার আদেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَانُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوى কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে ইনসাফ (ন্যায়পরতা) পরিত্যাগে প্ররোচিত না করে। ন্যায়পরতা অবলম্বন করো। এ পন্থাই তাকওয়ার বেশি নিকটবর্তী। [সুরা মায়িদা : ৮]
ন্যায়পরতা সকল বিষয়ের যথাযথ মূল্য প্রদান করে। ন্যায়পরতার মাধ্যমেই মানুষের যথাযথ অধিকার নিশ্চিত হয়। যে জাতির মাঝে ন্যায়পরতা রয়েছে, তারা সৌভাগ্যবান এবং উন্নত। আর যে জাতি ন্যায়পরতার গুণ থেকে বঞ্চিত, তারাই সবচেয়ে দুর্ভাগা এবং অনুন্নত জাতি হিসেবে গণ্য।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবিদের ন্যায়পরতার শিক্ষা দিয়েছেন, যাতে কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিদানের পাল্লা ভারী হয়। তিনি বলেন,
«إِنَّ الْمُقْسِطِينَ فِي الدُّنْيَا عَلَى مَنَابِرَ مِنْ لُؤْلُوْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بَيْنَ يَدَيِ الرَّحْمٰنِ بِمَا أَقْسَطُوا فِي الدُّنْيَا»
নিশ্চয় দুনিয়ায় ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিগণ কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর নিকট মুক্তাখচিত মিম্বারে অবস্থান করবে, যেহেতু তারা দুনিয়াতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে। (৪৪)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রত্যেক সাহাবির অন্তরে ন্যায়পরতার বীজ বপন করেছেন। সেই শৈশব থেকেই ন্যায়পরতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল উপমা। যেমন তিনি নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই অত্যাচারিতের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের বাড়িতে 'হিলফুল ফুজুল' (৪৫) নামক সংগঠন প্রতিষ্ঠার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কুরাইশের কিছু যুবক তা প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ ছাড়া কাবাঘর পুনর্নির্মাণের সময় 'হাজরে আসওয়াদ' স্থাপন করা নিয়ে কুরাইশদের মধ্যে যে বিতর্ক হয়েছিল, তখনও তারা তাঁর বিচার ও ন্যায়পরতার প্রতি আস্থা রেখেছিল, যদিও সেই বিবদমান গোত্রগুলোর মধ্যে তাঁর গোত্র বনু হাশেমও ছিল। তবুও তাঁর ন্যায়পরতা ও সততার প্রতি আস্থার কারণে সকলেই তাঁকে বিচারক হিসেবে মেনে নিয়েছিল।
এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিশ্ববাসীর পথপ্রদর্শনের জন্য নবুয়ত প্রদান করেন। তখনও তিনি তাঁর সাহাবিদের মাঝে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং প্রতিটি স্থানে ন্যায়পরতাকে বিচারিক মানদণ্ড বানিয়েছেন। তাঁর জীবনের ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠার ঘটনাসমূহের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ঘটনা সেটাই, যা হজরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেছেন। এই ঘটনার মাঝে তাঁর ন্যায়পরতা এবং সত্যের প্রতি তাঁর অবিচল দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে। হজরত আয়েশা রা. বলেন, 'মাখজুম সম্প্রদায়ের এক মহিলার চুরির ঘটনায় কুরাইশ বংশের লোকেরা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। (প্রকাশ্যে হাত কাটা হলে একটা মানসম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তাই তারা শাস্তিটা কমাতে চাচ্ছিল।) তারা বলল, বিষয়টা নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কে কথা বলবে? অতঃপর তারাই বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়পাত্র উসামা ইবনে যায়েদ রা. ছাড়া এমন সাহস কে করতে পারে? অবশেষে উসামা রা. নবীজির সাথে কথা বললেন। উসামার কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি এসেছ আল্লাহ তাআলার শাস্তির বিধানের ক্ষেত্রে সুপারিশ করতে!' এরপর তিনি দাঁড়িয়ে খুতবায় বললেন,
إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا»
হে মানব সকল, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ধ্বংস করেছেন এ জন্য যে, যখন তাদের মধ্যে কোনো অভিজাত ব্যক্তি চুরি করত, তারা তাকে রেহাই দিয়ে দিত। আর যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত, তাঁর ওপর দণ্ড প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতেমাও যদি চুরি করে, অবশ্যই আমি তার হাত কেটে দেবো। (৪৬)
আমরা দেখতে পাই, তিনি সর্বদা সতর্ক থাকতেন, যেন মানুষের প্রতি কোনো অন্যায় বা অবিচার না হয়ে যায়। যেমন হজরত সুওয়াইদ ইবনে কায়েস রা. থেকে বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, আমি ও মাখরাফা আবদি রা. একবার 'হাজর' (একটি স্থানের নাম) থেকে কাপড় কিনে বিক্রির জন্য মক্কায় নিয়ে আসি। এ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে আসেন এবং একটি পায়জামার দরদাম করেন। সে সময় আমাদের নিকট এক ব্যক্তি উপস্থিত ছিল, যে টাকার বিনিময়ে মানুষের জিনিসপত্র মেপে দিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, يَا وَزَّانُ، زِنْ وَأَرْجِحْ হে মাপ নিরূপণকারী, তুমি মাপবে এবং তা সঠিক করবে।(৪৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দীর্ঘ জীবনে ন্যায়পরতা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকে নিজের জন্য আবশ্যক করে নিয়েছিলেন। তাঁর একনিষ্ঠ ন্যায়পরতার হাজারো উপমায় সিরাত গ্রন্থসমূহ পূর্ণ হয়ে আছে। একজন পাঠক সেগুলো পড়ার সময় নিজের মধ্যে শিহরণ ও পুলক অনুভব করবে। যখন সে নিজের ক্ষেত্রে, পরিবার-পরিজন ও চারপাশের মানুষের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দৃঢ়তা ও শক্তিমত্তা দেখতে পাবে। চাই সেই ন্যায়পরতা আল্লাহ তাআলার কোনো দণ্ডবিধানের ক্ষেত্রে হোক অথবা সন্ধি ও যুদ্ধের কোনো বিষয়ে। অথবা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে সম্পর্কিত সামান্য কোনো ব্যাপার হোক। একবার এক মুনাফিক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়পরতায় কলঙ্ক লেপনের চেষ্টা করেছিল। তখন তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তা ও প্রতাপের সাথে মুনাফিকের সেই কথাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন,
«وَيْلَكَ وَمَنْ يَعْدِلُ إِذَا لَمْ أَعْدِلْ؟ لَقَدْ خِبْتُ وَخَسِرْتُ إِنْ لَمْ أَعْدِلْ» হতভাগা! আমিই যদি ন্যায় প্রতিষ্ঠা না করি, তাহলে আর কে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে? আমি যদি ন্যায় প্রতিষ্ঠা না করি, তবে তো আমি হতভাগ্য ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাব।(৪৮)
এমনইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের স্ত্রীদের সাথেও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতেন, এমনকি সংসারের সামান্য ছোটখাটো বিষয়েও। হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এক স্ত্রীর নিকট অবস্থান করছিলেন। সে সময় তাঁর কোনো এক স্ত্রী তাঁর জন্য একটি পাত্রে কিছু খাদ্য পাঠালেন। এটা দেখে, যে স্ত্রীর ঘরে তিনি অবস্থান করছিলেন, তিনি পাত্র বহনকারী খাদেমের হাতে আঘাত করলেন। ফলে খাদ্যের পাত্রটি পড়ে ভেঙে গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন পাত্রের ভাঙা টুকরাগুলো একত্র করলেন। তারপর খাদ্যগুলো একত্র করে তাতে রাখলেন এবং বললেন, তোমাদের আম্মাজানের আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত লেগেছে। এরপর তিনি খাদেমকে অপেক্ষা করতে বললেন এবং যে স্ত্রীর ঘরে ছিলেন তার থেকে একটি ভালো পাত্র নিয়ে যার পাত্র ভেঙেগিয়েছিল, তাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন এবং ভাঙা পাত্রটি যিনি ভেঙেছিলেন তার কাছে রেখে দিলেন। (৪৯)
অমুসলিমদের প্রতিও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়পরতা সদা প্রসারিত ছিল। যেমন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'কোনো ব্যক্তি যদি কোনো মুসলিমের সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্য মিথ্যা শপথ করে, তাহলে সে আল্লাহর নিকট এমন অবস্থায় হাজির হবে যে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর অত্যধিক রাগান্বিত থাকবেন।'
হজরত আশআস ইবনে কায়েস রা.(৫০) বলেন, আমার ও এক ইহুদি ব্যক্তির মাঝে যৌথ মালিকানায় একখণ্ড জমি ছিল। একবার সে আমার মালিকানার অংশ অস্বীকার করে বসল। আমি তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে গেলাম। তিনি আমাকে বললেন, 'তোমার কি কোনো সাক্ষী আছে?' আমি বললাম, 'না।' তখন তিনি ইহুদিকে বললেন, 'তুমি কসম করো।'
আমি তখন বললাম, 'হে আল্লাহর রাসুল, সে তো (গুনাহের তোয়াক্কা না করে মিথ্যাভাবে) কসম করবে এবং আমার সম্পত্তি নিয়ে নেবে।' তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করেন-
إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَبِكَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ও নিজেদের কসমের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে, আখিরাতে তাদের কোনো অংশ নেই। আর আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের দিকে (সদয় দৃষ্টিতে) তাকাবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না। তাদের জন্য থাকবে কেবল যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [সুরা আলে ইমরান: ৭৭] (৫১)
সকলের মাঝে ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিশ্চয় এটি এক বিরল দৃষ্টান্ত! ঘটনাটিতে দেখা যাচ্ছে দুই ব্যক্তির মাঝে ঝগড়া হয়েছে। তাদের একজন হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় সাহাবি, অন্যজন ইহুদি কাফের। তারা তাঁর নিকট বিচার নিয়ে এলেন সমাধানের জন্য। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাঝে শরিয়তের সত্য বিধান প্রয়োগ করেছেন, কারও প্রতি কোনো ধরনের টান বা পক্ষপাতের দিকে খেয়াল করেননি। উল্লিখিত বিষয়ে শরিয়তের বিধান হলো, নিজের দাবির পক্ষে বাদী প্রমাণ উপস্থাপন করবে। এখানে বাদী হলেন আশআস ইবনে কয়েস রা.। বাদী যদি দলিল-প্রমাণ উপস্থিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন বিবাদীকে কসম করতে বলা হবে। এখানে বিবাদী হলো একজন ইহুদি কাফের। তার কর্তব্য হবে বাদী তার ব্যাপারে যে অভিযোগ আরোপ করছে, তা অস্বীকার করে কসম করা। আর এতে তাকে সত্যায়িত করা হবে। অথচ আমরা জানি, চিরাচরিত অভ্যাস হিসেবে ধর্মীয় ভীতি না থাকায় সেই ইহুদি মিথ্যা কসম করে সম্পদ নিয়ে নিতে পারে। তবুও বিচার সেভাবেই করা হয়েছে যেটা নিয়ম।
এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মূলনীতি হলো এই হাদিস, «البينة على المدَّعِي واليمين على من أنكر» বাদী নিজ দাবির পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করবে, অন্যথায় বিবাদী কসম করবে। (৫২)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রত্যেক শাসক, প্রশাসক ও বিচারকের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও আদর্শ রেখে গেছেন। এমনকি তাঁর পুরো জীবন পরিচালিত হয়েছে আল্লাহ তাআলার নির্দেশমতো। এ কারণে প্রতিটি মানুষ তাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে। প্রতিটি অন্তর তাতে শান্তি ও স্বস্তি খুঁজে পেয়েছে এবং তাঁর ন্যায়নিষ্ঠায় পুরো মানবজাতি হয়েছে ধন্য।

টিকাঃ
৪৪. সহিহ মুসলিম: ১৮২৭, সুনানে নাসায়ি : ৫৩৭৯, মুসনাদে আহমাদ: ৬৪৮৫, মুসতাদরাকে হাকেম: ৭০০৬।
৪৫. হিলফ শব্দের অর্থ অঙ্গীকার আর ফুজুল অর্থ মজলুমের প্রাপ্য অধিকার। সুতরাং হিলফুল ফুজুল অর্থ মজলুম ও অত্যাচারিতের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার।-সম্পাদক
৪৬. সহিহ বুখারি: ৬৭৮৮, সহিহ মুসলিম: ১৬৮৮।
৪৭. সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৩৬, সুনানে তিরমিজি: ১৩০৫, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২২০।
৪৮. সহিহ বুখারি: ১১৩৮, সহিহ মুসলিম: ১০৬৩, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৭২, মুসনাদে আহমাদ : ১৪১৫১।
৪৯. সহিহ বুখারি: ১১৩৮, ৫২২৫; সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৬৭, মুসনাদে আহমাদ: ১২০৪৬।
৫০. পুরো নাম আশআস ইবনে কায়েস আল-কিন্দি। নবুয়তের দশম বছরে তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রতিনিধি হিসেবে আগমন করেন। তিনি ছিলেন 'কিন্দাহ' গোত্রের প্রধান। রাসুলের ইনতেকালের পর তিনি মুরতাদ হয়ে যান। অবশ্য এরপর আবার তিনি ইসলামে ফিরে আসেন। তখন আবু বকর সিদ্দিক রা. তার সাথে নিজের বোনের বিবাহ দেন। তিনি কাদেসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সিফফিনের যুদ্ধের সময় তিনি আলি রা.-এর সঙ্গে ছিলেন। হজরত আলি রা.-এর হত্যার চল্লিশ দিন পর তিনি ইনতেকাল করেন। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন, ইবনুল আছির : উসদুল গাবাহ: ১/৯৭। ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা: জীবনী নং: ২০৫।
৫১. সহিহ বুখারি: ২৩৫৭, ২৪১৭; সহিহ মুসলিম: ১৩৮, সুনানে আবু দাউদ: ৩২৪৩, সুনানে তিরমিজি: ২৩৯৬, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩২৩।
৫২. সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩২৩, মুয়াত্তা মালেক: ৮৪৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00