📄 ভূমিকা
প্রথম পরিচ্ছেদ
নিশ্চয় আপনি সর্বোন্নত চারিত্রিক গুণাবলির অধিকারী
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিতের দিকে লক্ষ করলে মনে হবে, এটা যেন স্বচ্ছ স্রোতস্বিনী কোনো ঝরনা এবং সকল মানবীয় মহানুভবতার উচ্ছল কোনো উৎস। আর এমনটা হবেই-না বা - কেন! আল্লাহ তাআলা নিজে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য তাঁকে নির্বাচিত করেছেন, তাঁর দ্বারা সমাপ্তি ঘটিয়েছেন নবী-রাসুলদের আগমনের ধারা। তাঁর পুরো জীবনটাই ছিল শুভ্র, স্বচ্ছ ও পবিত্র। মানবসভ্যতার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কেউ তাঁর উচ্চতাকে স্পর্শ করতে পারেনি। এ কারণেই তিনি উপযুক্ত হয়েছেন আল্লাহপ্রদত্ত সেই মহান গুণের, যার কথা তিনি নিজেই কুরআনুল কারিমে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন,
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ নিশ্চয় আপনি চরিত্রের সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছেন। [সুরা কলাম: ৪]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারিত্রিক পূর্ণতাই তাঁর নবী হওয়ার প্রমাণ বহন করে। শুধু তাঁর এই অমায়িক চরিত্রমাধুর্য প্রত্যক্ষ করেই বহু মানুষ ইসলামগ্রহণ করেছে। এমনকি তাঁর ইনতেকালের পর তাঁর জীবনী পড়েও অসংখ্য মানুষ ঈমান এনেছে। এটা ছিল তাঁর বাস্তব ও জীবন্ত চরিত্র। মানবীয় গুণাবলির যতগুলো দিক আমাদের নিকট জ্ঞাত ও পরিচিত, তাঁর সবগুলো দিকের অতি উত্তম এবং পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটেছিল তাঁর মাঝে। সামনের আলোচনা থেকে আমরা তাঁর মহান চরিত্রের দীপ্তিময় প্রান্তগুলোর কয়েকটি দিক অনুধাবন করার চেষ্টা করব।
প্রথম অনুচ্ছেদ
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারিত্রিক গুণাবলির পূর্ণতা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সকলের জন্য উত্তম আদর্শ। জীবনের প্রতিটি কাজে ও কর্মে একজন অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। তাঁর আখলাক-চরিত্র ব্যক্তি ও সমাজের জন্য উদাহরণ এবং তাঁর নবুয়তের সত্যতার ওপর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। তিনি সক্ষম হয়েছেন আল্লাহপ্রদত্ত ওহির আলোকে একেবারে শূন্য থেকে একটি মহান জাতি গড়ে তুলতে। যুগের প্রতিকূলতার ওপর দাঁড়িয়েও তৈরি করেছেন এমন এক অনন্য সভ্যতা, যা সকল যুগের সকল মানুষের জন্য অনুসরণীয় এবং যার ভিত্তি হলো উত্তম আখলাক ও চরিত্র। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّمَا بُعِثْتُ لأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ
আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে চরিত্রমাধুর্যের পূর্ণতা প্রদানের জন্য। (১)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, মহান আল্লাহ তাআলা নিজেই তাঁর উন্নত চরিত্রের সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ﴾وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ﴿ ‘নিশ্চয় আপনি চরিত্রের সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছেন’। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নবীর প্রতি এই মহান সাক্ষ্যটিই প্রমাণ করে, জীবনের সূচনা হতেই তাঁর চরিত্র ছিল মহান ও শ্রেষ্ঠ। এজন্য তিনি তাঁর জাতির নিকট পরিচিত ছিলেন 'বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী' হিসেবে। কেউ কখনো তাঁকে 'মিথ্যাবাদী বা খিয়ানতকারী' বলার দুঃসাহস দেখায়নি। বরং তাঁর দুর্নিবার আকর্ষণ থেকে মানুষকে বিরত রাখার জন্য কাফেররা তাঁর সম্পর্কে অন্য অনেক অপবাদ আরোপ করেছে... পাগল, জাদুকর ইত্যাদি। কিন্তু 'মিথ্যাবাদী বা খিয়ানতকারী' বলার দুঃসাহস কেউ করেনি।
আর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীর প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করার জন্যই কেবল এই উত্তম চরিত্রের কথা উল্লেখ করেননি, বরং তিনি এ সাক্ষ্যের মাধ্যমে এদিকেও ইশারা করেছেন যে, মানুষেরা তাঁর সম্পর্কে যে খারাপ মন্তব্যগুলো করে—পাগল, জাদুকর ইত্যাদি বলে এ ত্রুটিগুলো কিছুতেই এমন উত্তম চরিত্রের সাথে একত্র হতে পারে না। কারণ, যে ব্যক্তি এমন সব মহান চরিত্রের অধিকারী, অতি অবশ্যই তিনি সকল প্রকার পাগলামি থেকে মুক্ত হবেন। (১০)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আখলাক-চরিত্রে বিমুগ্ধ হয়েছেন বহু মানুষ—তাঁর সাহাবিরা, এমনকি তাঁর শত্রুরাও। শুধু এই চরিত্রমাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে তাদের অনেকে ইসলামগ্রহণ করেছিল। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামসময়িক ওমানের বাদশাহ জুলানদি (১১) নবীজির চরিত্রের কথা শুনে অত্যন্ত বিমোহিত হয়ে বলেছিলেন,
«وَاللَّهِ لَقَدْ دَلَّنِي عَلَى هَذَا النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ أَنَّهُ لَا يَأْمُرُ بِخَيْرٍ إِلَّا كَانَ أَوَّلَ آخِذٍ بِهِ، وَلَا يَنْهَى عَنْ شَيْءٍ إِلَّا كَانَ أَوَّلَ تَارِكِ لَهُ، وَأَنَّهُ يَغْلِبُ فَلَا يَبْطَرُ ويُغْلَبُ فَلَا يَضْجَرُ وَيَفِي بِالْعَهْدِ وَيَنْجُزُ الْمَوْعُوْدَ وَأَشْهَدُ أَنَّهُ نَبِيٌّ
আল্লাহর কসম! সে আমাকে এমন একজন উম্মি নবীর কথা বলেছে, তিনি যখনই কোনো ভালো কাজের আদেশ করেন, প্রথমে তিনিই সেই কাজটি করেন। আর যে কাজ হতে তিনি নিষেধ করেন, প্রথমে তিনিই তা বর্জন করেন। তিনি বিজয়ী হয়েও অহংকার করেন না। কেউ তাঁর ওপর প্রতাপ দেখালেও তিনি রুষ্ট হন না। তিনি ওয়াদা পালন করেন। চুক্তিসমূহ বাস্তবায়ন করেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিঃসন্দেহে তিনি একজন সত্য নবী। (১২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আখলাক-চরিত্র ছিল পূর্ণ ও পরিব্যাপ্ত। এটা ছিল তাঁর চারিত্রিক মহত্ত্ব। এ কারণে তাঁর চরিত্রের সকল দিক ছিল সমপর্যায়ের। তাঁর ছিল যেমন পাহাড়সম ধৈর্য, তেমনই ছিল দুর্বার সাহসিকতা। দয়ার মতোই ছিল তাঁর পূর্ণ আমানতদারি। তাঁর সততার মতোই ছিল তাঁর অপরিসীম সহনশীলতা এবং সময়ের আবর্তনে তাঁর চরিত্রের মাঝে কখনো কোনো তারতম্য ঘটেনি। জীবনের কোনো সময়ে একটু বেশি আবার কখনো একটু কম এমন কখনো হয়নি। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত জগতের আর কোনো মানুষের মাঝে একসঙ্গে এতগুলো চারিত্রিক গুণ কখনো পরিলক্ষিত হয়নি। (১৩)
এ কারণে বিখ্যাত জার্মান লেখক ও কবি জোহান গ্যোটে বলেছেন, 'ইতিহাসের পাতায় আমি তন্নতন্ন করে সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠ মানুষের দৃষ্টান্ত খুঁজেছি, অবশেষে তা পেয়েছি আরব নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে।' (১৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম চরিত্রাবলির মূল উৎস ছিল পবিত্র কুরআন। কুরআনুল কারিম থেকেই তিনি তাঁর চারিত্রিক গুণাবলি আহরণ ও সমৃদ্ধ করেছেন। অতএব, এই কুরআনই তাঁর পূর্ণ গুণাবলিকে পৌঁছে দিয়েছে সর্বোচ্চ পূর্ণতায়। তাঁর সুন্দর শিষ্টাচারকে করেছে আরও সৌন্দর্যময়। আর এটা সম্ভব হওয়ার কারণ হলো, কুরআনুল কারিমে বর্ণিত সকল কল্যাণের দিকে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেছেন। কুরআনের নির্দেশনার সকল-কিছুই তিনি তাঁর জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন। এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন জমিনে বিচরণকারী এক জীবন্ত কুরআন। হয়ে উঠেছিলেন কুরআনে বর্ণিত প্রতিটি ভালো কাজ ও কর্মের উজ্জ্বল উদাহরণ। এ কারণে হজরত সাদ ইবনে হিশাম ইবনে আমের রা. যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্রের ব্যাপারে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা.-কে প্রশ্ন করেছিলেন, তখন আয়েশা রা. তার উত্তরে বলেছিলেন, 'তুমি কি কুরআন পড়োনি?' সাদ ইবনে হিশাম বললেন, 'পড়েছি।' হজরত আয়েশা রা. বললেন,
فَإِنَّ خُلُقَ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ الْقُرْآنَ»
কুরআনই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আখলাক-চরিত্র (অর্থাৎ তাঁর চরিত্র ছিল কুরআনে বর্ণিত চরিত্রের অনুরূপ)।(১৫)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'নবীজির চরিত্র ছিল কুরআনের বর্ণনার অনুরূপ' এই বলে হজরত আয়েশা রা. সুরা মুমিনুনের ﴾قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ﴿ প্রথম ১০টি আয়াত তিলাওয়াত করেন এবং বলেন, 'কুরআনে বর্ণিত এই গুণগুলো পরিপূর্ণভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে বিদ্যমান ছিল।' (১৬)
কত সূক্ষ্মভাবেই না উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারিত্রিক গুণাবলি বর্ণনা করে দিয়েছেন!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইসলামের চাহিদার অনুরূপ। তাঁর এই ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছিল উত্তম চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে। ইসলামের দিকে তাঁর দাওয়াতের শুরুলগ্ন থেকেই আরবরা এটা বুঝতে পেরেছিল। অনেক সময় তাঁর এই ব্যক্তিত্বই হয়ে উঠেছে তাদের জন্য দাওয়াত। যেমন তিনি যখন শাইবান ইবনে ছালাবার জনপ্রতিনিধিদলকে দাওয়াত প্রদান করেন, তখন তাদের মধ্যে ছিল মাফরুক ইবনে আমর, মুছান্না ইবনে হারেসা, হানি ইবনে কাবিসাহ, নুমান ইবনে শরিক। এদের সকলের উদ্দেশ্যে তিনি প্রথমে মহান আল্লাহর বাণী তিলাওয়াত করলেন,
قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ مِنْ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ذَلِكُمْ وَضْكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ)
(তাদেরকে) বলুন, এসো, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের প্রতি যা-কিছু হারাম করেছেন, আমি তা তোমাদেরকে পড়ে শোনাই। তা এই যে, তোমরা তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না, পিতামাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। দারিদ্র্যের কারণে তোমরা নিজ সন্তানদের হত্যা করো না, আমি তোমাদেরও রিজিক দেবো এবং তাদেরও, আর তোমরা প্রকাশ্য হোক বা গোপন কোনোরকম অশ্লীল কাজের নিকটেও যেয়ো না, আর আল্লাহ যে প্রাণকে মর্যাদা দান করেছেন তাকে যথার্থ কারণ ছাড়া হত্যা করো না। হে মানুষ! এই হচ্ছে সেইসব বিষয়, যা আল্লাহ তোমাদের আদেশ করেছেন, যাতে তোমরা উপলব্ধি করো। [সুরা আনআম : ১৫১]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই তিলাওয়াত শুনে মাফরুক ইবনে আমর বলল, 'এটা জগতের কোনো মানুষের রচিত কথা নয়, যদি এগুলো মানুষের কথা হতো, তাহলে তা আমাদের বোধগম্য হতো।' অতঃপর নবীজি আবার তিলাওয়াত করলেন,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ, দয়া এবং আত্মীয়স্বজনকে (তাদের হক) প্রদানের হুকুম দেন, আর অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও জুলুম করতে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো। [সুরা নাহল : ৯০]
এবার এই আয়াত শুনে মাফরুক ইবনে আমর আরও আশ্চর্য হলো এবং নবীজিকে বলল, 'আল্লাহর কসম! হে আমার কুরাইশি সঙ্গী, তুমি উত্তম চরিত্রবান হওয়ার প্রতি আহ্বান করেছ। কিন্তু তোমার সম্প্রদায় সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। তোমাকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করেছে এবং তারা তোমার বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে।(১৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক হাদিসে উত্তম চরিত্রের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রকাশ পেয়েছে। যেমন নিচের হাদিসটিতে তিনি তাঁর সাহাবিদের উত্তম চরিত্রবান হওয়ার শিক্ষা প্রদান করেছেন। তিনি বলেন,
«إِنَّ مِنْ أَكْمَلِ الْمُؤْمِنِينَ إِيْمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَأَلْطَفُهُمْ بِأَهْلِهِ»
নিশ্চয় মুমিনদের মধ্যে তার ঈমান পরিপূর্ণ, যার চরিত্র সর্বোৎকৃষ্ট এবং যে তার স্ত্রী-পরিবারের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল। (১৮)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই উত্তম চারিত্রিক গুণাবলি শুধু তাঁর গোত্রের সীমিত কিছু মানুষের মধ্যে কিংবা বিশেষ কোনো দলের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং যেকোনো স্থানে এবং যেকোনো ক্ষেত্রেই তাঁর আচার-ব্যবহারে চরিত্রের এই শ্রেষ্ঠতা প্রকাশ পেত। তিনি তাঁর অধিকাংশ সময় সাহাবিদের মাঝে অতিবাহিত করতেন। তিনি কখনো নিজেকে তাদের থেকে আলাদা মনে করতেন না। তিনি গরিবদের সাথে ওঠাবসা করতেন। মিসকিনদের সাহায্য করতেন। যেকোনো দাসী বা চাকরানি তাঁকে মদিনার রাস্তায় যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেতে পারত। তিনি অসুস্থকে দেখতে যেতেন। জানাজায় উপস্থিত হতেন। সাহাবিদের বাড়িতে গিয়ে তাদের খোঁজখবর নিতেন। তারাও তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে তাঁর বাড়িতে আসতেন। তিনি সর্বদা হাসিমুখে থাকতেন। তাঁর ছিল প্রশস্ত কপাল। চওড়া কাঁধ। বলিষ্ঠ শরীর। প্রফুল্ল চেহারা। তিনি ছিলেন উম্মতের জন্য অতিশয় দরদি। কঠিন ও সহজ এমন দুটি বিষয়ের মধ্যে তাঁকে স্বাধীনতা দেওয়া হলে তিনি সহজটাই গ্রহণ করতেন, যদি না সেটা গুনাহের কোনো কাজ হতো। আর যদি কোনো গুনাহের কাজ হতো, তাহলে সবার তুলনায় তিনিই সবচেয়ে বেশি তা থেকে দূরে থাকতেন। তিনি বেশি বেশি ক্ষমা করতেন। এমনকি যে তাঁর ওপর জুলুম করেছে এবং জুলুমের ক্ষেত্রে অত্যধিক বাড়াবাড়ি করেছে, তাকেও তিনি ক্ষমা করে দিতেন।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম চরিত্রের প্রকাশ ঘটেছে তাঁর পরিবারের সাথে, সমাজে বসবাসরত অমুসলিমদের সাথে, এমনকি যুদ্ধরত শত্রুদলের সাথেও তাঁর সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ তাঁর চরিত্রকে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়। যেমন আবু সুফিয়ান রা. ইসলামগ্রহণের পূর্বে তাঁর উত্তম চরিত্রের নমুনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তিনি যখন কাফেরদের সর্দার। ইসলামগ্রহণের পর তিনি অকপটে স্বীকার করে বলেছিলেন, فداك أبي وأمي، والله إنك لكريم، ولقد حاربتك؛ فنعم محاربي كنت، ثم سالمتك؛ فنعم المسالم أنت، فجزاك الله خيرا
আপনার ওপর আমার পিতামাতা উৎসর্গিত হোক। আল্লাহর কসম! নিশ্চয় আপনি একজন মহান ব্যক্তি। আমি যুদ্ধ করেছি আপনার বিরুদ্ধে, আপনি কতই-না উত্তম যোদ্ধা ছিলেন! আমি আপনার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি, আপনি কতই-না উত্তম চুক্তিকারী ছিলেন! মহান আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। (১৯)
মূলকথা, গ্রন্থের এই গুটিকয়েক পাতায় কিছুতেই আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম চরিত্রের ব্যাপকতা ব্যক্ত করতে সক্ষম নই। এটা যেন এক বিশাল দরিয়া। তাঁর চরিত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা করে বারবার বিস্মিত ও বিমুগ্ধ হয়েছে মুসলিম থেকে শুরু করে বিশ্বের অনেক অমুসলিম পণ্ডিত পর্যন্ত। যেমন বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক উইলিয়াম ম্যুর (William Muir : ১৮১৯-১৯০৫ খ্রি.)(২০) নবী-জীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, 'তাঁর পুরো জীবন ছিল সহজ ও স্বাভাবিকতার নান্দনিক চিত্র। তাঁর অনন্য রুচি ও ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাঁর বহু অনুসারীর কথায়। বিনয়, নম্রতা, সহানুভূতি, ধৈর্য, অন্যকে নিজের ওপর প্রাধান্যদান এবং প্রচুর দানশীলতা তাঁর চরিত্রকে দিয়েছিল এক অনন্যসাধারণ সৌন্দর্য। তাঁর ভালোবাসার আকর্ষণ চারপাশের সকলকে মোহিত করে রাখত। কোনো সামান্য-সাধারণ ব্যক্তির দাওয়াতও তিনি কখনো প্রত্যাখ্যান করেননি। অতি স্বল্প হলেও হাদিয়া গ্রহণে কখনো অস্বীকৃতি জানাননি। বৈঠকে তিনি কখনো নিজের বড়ত্ব ও মহত্ত্ব প্রকাশ করেননি। কেউ কখনো অনুভব করেনি যে, দারিদ্র্যের কারণে তাঁর আগমনকে উপেক্ষা করা হয়েছে। বরং যখনই কেউ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছে, তিনি হাসিমুখে তাকে সাদরে গ্রহণ করে কাছে টেনে নিয়েছেন। সবার সুখে অংশগ্রহণ করতেন আবার অসহায় ও দুঃখী মানুষের সাথে তাদের কষ্টকেও ভাগ করে নিতেন। তাদের প্রতি সমবেদনা জানাতেন। তিনি সর্বদা এই কর্ম ও চিন্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন যে, কীভাবে তাঁর চারপাশের মানুষকে আরও বেশি সুখে, শান্তিতে ও স্বস্তিতে রাখা যায়। (২১)
তিনিই আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), যাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি এবং আমাদের সাথে গর্ব করে সমগ্র মানবসভ্যতা। জগতে একমাত্র তিনিই ছিলেন এই কথার যোগ্য-'নিশ্চয় তাঁর চরিত্র ছিল কুরআনের প্রতিচ্ছবি'।
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সততা
মানুষের মহান গুণাবলির মধ্যে অন্যতম একটি গুণ হলো সততা। এ কারণে কুরআনুল কারিমেও বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে সততার প্রতি। আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদের সততার প্রতি আহ্বান করে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো। [সুরা তাওবা: ১১৯]
অর্থাৎ কুরআনুল কারিম মুসলিম সমাজকে আহ্বান করছে সততার মতো এই সুউচ্চ গুণে গুণান্বিত হওয়ার প্রতি, সৎ ব্যক্তিদের সঙ্গী হওয়ার প্রতি। কেননা সততাই হলো সকল কল্যাণের চাবিকাঠি।
এই মহান গুণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন উত্তম দৃষ্টান্ত এবং আদর্শ। তাঁর নবুয়তপ্রাপ্তিরও বহু আগে কুরাইশদের পক্ষ থেকে তাঁকে 'আস-সাদিক, আল-আমিন' (সত্যবাদী ও আমানতদার) উপাধি প্রদান করা হয়েছিল। এই বিশ্বস্ততার কারণেই তারা তাদের মূল্যবান প্রয়োজনীয় সম্পদ তাঁর নিকট গচ্ছিত রাখত। তাদের গোপন বস্তুসমূহ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাঁকেই তারা নিরাপদ মনে করত।
কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁকে যখন নবুয়ত প্রদান করলেন, তখন তাঁর আত্মীয় ও তাঁর বংশ (কুরাইশ) তাঁর সাথে শত্রুতা, বিদ্বেষ, ঘৃণা ও বিরোধিতা প্রকাশ করতে শুরু করে। এই কঠিন মুহূর্তেও তিনি তাঁর মহান সততা ও আমানতদারির প্রকাশ ঘটিয়েছেন এবং তাদের সেই গচ্ছিত আমানত যথাযথভাবে তাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে গেছেন। (২২)
আল্লাহ তাআলা যখন তাঁকে নিজের নিকটাত্মীয়দের আখিরাতের প্রতি সতর্ক করার আদেশ দিলেন, তখন তিনি সাফা পর্বতে আরোহণ করে সকলকে ডেকে বললেন,
«أَرَأَيْتَكُمْ لَوْ أَخْبَرْتُكُمْ أَنَّ خَيْلاً بِالْوَادِي تُرِيدُ أَنْ تُغِيْرَ عَلَيْكُمْ، أَكُنْتُمْ مُصَدِّقِي؟ قَالُوا : نَعَمْ، مَا جَرَّبْنَا عَلَيْكَ إِلَّا صِدْقًا»
বলো তো, আমি যদি তোমাদের বলি, অশ্বারোহী শত্রুসৈন্য উপত্যকায় এসে পড়েছে, তারা তোমাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করতে উদ্যত, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?
তারা বলল, হ্যাঁ, আমরা সর্বদা তোমাকে কথা ও কাজে সত্যবাদী পেয়েছি...। (২৩)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সততার সাক্ষ্য দিয়েছিল তাঁর চরম শত্রু নজর ইবনে হারেস। সে কুরাইশ গোত্রের সামনে এসে অকপটে স্বীকার করে বলেছিল, 'হে কুরাইশরা, আল্লাহর কসম! তোমাদের ওপর এমন একটা দুর্যোগ নেমে এসেছে, যা থেকে রক্ষা পাওয়া তোমাদের সাধ্যের বাইরে। মুহাম্মাদ যখন তোমাদের মধ্যে একজন তরুণ যুবক, তখন সে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে সত্যবাদী ও সবচেয়ে আমানতদার। অবশেষে যখন তোমরা তাঁর মধ্যে প্রৌঢ়ত্বের ছাপ দেখলে এবং সে একটা অভিনব মতাদর্শ তোমাদের কাছে নিয়ে এলো, তখন তোমরা বললে, সে জাদুকর। অথচ আল্লাহর কসম! সে জাদুকর নয়। আমরা তো জাদুকরের ঝাড়ফুঁক ও তাবিজ-কবজ দেখেছি। তোমরা আবার বললে, সে একজন গণক, কিন্তু আল্লাহর কসম! সে গণক নয়। আমরা গণকের সূক্ষ্ম হেঁয়ালি ও ছন্দোবদ্ধ কথাবার্তা অনেক শুনেছি। এরপর তোমরা বললে, সে একজন কবি। অথচ আল্লাহর কসম! সে কবি নয়। আমরা সবরকম কবিতা শুনেছি ও দেখেছি। আবার তোমরা বললে, সে একজন পাগল। অথচ আল্লাহর কসম! সে পাগলও নয়। আমরা অনেক পাগল দেখেছি। তাঁর মধ্যে পাগলামির কোনো চিহ্ন নেই। অতএব, হে কুরাইশরা, তোমরা নিজেদের ব্যাপারে চিন্তা করো। আল্লাহর কসম! তোমাদের ওপর অবশ্যই একটি ঘোরতর দুর্যোগ নেমে এসেছে।(২৪)
সবচেয়ে বড় কথা হলো, তাঁর সততার ব্যাপারে সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক স্বয়ং আল্লাহ তাআলার সাক্ষ্য রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ أُولَبِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে ব্যক্তি সত্য কথা নিয়ে এসেছে এবং নিজেও তা বিশ্বাস করে, এরূপ লোকই মুত্তাকি। [সুরা যুমার: ৩৩]
যিনি সত্য কথা নিয়ে এসেছেন তিনি হলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর যিনি তাঁর আনীত বাণীর সত্যতার বিষয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তিনিই হলেন আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। সাক্ষ্য দিচ্ছেন তাঁর সেই বাণী কুরআনুল কারিমে, যা সপ্তাকাশ থেকে জমিনে নাজিল হয়েছে।
ইমাম ইবনে আশুর রহ. উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'যিনি সত্য নিয়ে এসেছেন তিনি হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর সত্য হলো মহাগ্রন্থ আল কুরআন।'(২৫)
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা তাঁর কথা ও কাজে অন্যদেরও সত্য ও সততার প্রতি উৎসাহিত করতেন। তিনি বলেন,
عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ؛ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ، وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصِّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ صِدِّيقًا، وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ؛ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ، وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا»
তোমরা সততাকে গ্রহণ করো। কেননা সত্য সৎকাজের দিকে পথ প্রদর্শন করে এবং সৎকাজ বেহেশতের পথ দেখায়। আর কোনো ব্যক্তি সত্য বলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত তাঁর নাম আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হিসেবে লেখা হয়। আর মিথ্যা পাপাচারের দিকে পথ দেখায় এবং পাপাচার জাহান্নামের পথ দেখায়। আর মানুষ মিথ্যা বলতে থাকলে অবশেষে আল্লাহর কাছে সে মিথ্যাবাদী হিসেবে লিখিত হয়ে যায়। (২৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের সম্বোধন করে আরও বলেছেন,
«اضْمَنُوا لِي سِتًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنْ لَكُمُ الْجَنَّةَ؛ أَصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ وَأَوْفُوْا إِذَا وَعَدْتُمْ وَأَدُّوْا إِذَا اؤْتُمِنْتُمْ وَاحْفَظُوا فُرُوْجَكُمْ وَغُضُوْا أَبْصَارَكُمْ وَكُفُوْا أَيْدِيَكُمْ»
তোমরা নিজেদের ব্যাপারে ৬টি জিনিসের দায়িত্ব নাও, তাহলে আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের দায়িত্ব নেব। ১. তোমরা যখন কথা বলবে সত্য বলবে। ২. ওয়াদা করলে পূরণ করবে। ৩. আমানত রাখলে তার যথাযথ সংরক্ষণ করবে। ৪. নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে। ৫. তোমাদের দৃষ্টি (হারাম দৃশ্য থেকে) অবনত রাখবে। ৬. এবং জুলুম থেকে নিজেদের বিরত রাখবে। (২৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যে, তিনি সন্দেহপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে চলতেন। এ ব্যাপারে তিনি নিজে যেমন সচেতন ছিলেন, তেমনি অন্য মুসলমানকেও সচেতন থাকার শিক্ষা দিতেন। সত্য ও সততার প্রতি ভালোবাসার কারণেই তিনি এমনটা করতেন এবং বলতেন। এ ব্যাপারে সবচেয়ে উত্তম উদাহরণ হলো হজরত আবুল হাওরা সাদি রহ.-এর বর্ণনা। তিনি বলেন, 'আমি একবার হজরত হাসান ইবনে আলি রা.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কী কী বিষয় সংরক্ষণ করেছেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আমি সংরক্ষণ করেছি এই কথাটি-
دَعْ مَا يُرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يُرِيبُكَ؛ فَإِنَّ الصِّدْقَ طُمَأْنِيْنَهُ وَإِنَّ الْكَذِبَ رِيبَةٌ
যাতে তোমার দ্বিধা আছে তা পরিত্যাগ করো, যাতে তোমার দ্বিধা নেই তা গ্রহণ করো। সত্য হলো প্রশান্তিময় আর মিথ্যা হলো দ্বিধাপূর্ণ। (২৮)
সত্যের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই আগ্রহ ও ভালোবাসা সাময়িক ছিল না। বরং তিনি সর্বদা জীবনের সকল কাজ ও কর্মে সত্যের ওপর অবিচল থেকেছেন। সত্য ছিল তাঁর স্বভাবজাত। এ কারণে তিনি মজা ও হাস্যরসের সময়ও সত্য বলতেন। অথচ কেউ কেউ মনে করেন, এইসব ক্ষেত্রে একটু মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া দোষের কিছু নয়। হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেন, একবার এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে একটা বাহনের ব্যবস্থা করে দিন।' তখন তিনি তাকে বললেন, 'আমি তোমাকে বাহনের জন্য একটা উটনীর বাচ্চা দেবো।'
লোকটি বলল, 'উটনীর বাচ্চা দিয়ে আমি কী করব?' তিনি বললেন, 'সকল উটকে তো উটনীই জন্ম দেয়!' (২৯)
আত্মিক নৈকট্য, সহজ সাবলীলতা ও প্রীতিকর সম্পর্ক বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণ মানুষের সাথে কখনো কখনো এমন হাস্যরস করতেন। কিন্তু এ সকল ক্ষেত্রেও তিনি সর্বদা সত্যই বলতেন।
এ একই অবস্থা ছিল তাঁর যুদ্ধের ময়দানেও। যদিও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শত্রুবাহিনীর ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য এবং হামলা প্রতিহত করার জন্য যুদ্ধে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার বৈধতার কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি নিজে কখনো এমন অবস্থাতেও সত্য ছাড়া মিথ্যা বলেননি। বদর যুদ্ধের শুরুর দিকে লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকবাহিনীর খোঁজখবর নেওয়ার জন্য বের হলেন। সাথে ছিলেন আবু বকর রা.। কিছুদূর যাওয়ার পর তারা এক বৃদ্ধ আরবের সাক্ষাৎ পেলেন। (বৃদ্ধ লোকটি নবীজিকে চিনত না) তারা বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করলেন, সে কুরাইশ গোত্রের কোনো তৎপরতার কথা জানে কি না, কিংবা মুহাম্মাদ ও তাঁর সাথিদের কোনো খবর রাখে কি না।
বৃদ্ধ বলল, 'তোমরা কারা সেটা আগে বলো, নইলে আমি তোমাদের প্রশ্নের উত্তর দেবো না।'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমরা যা জানতে চেয়েছি, সেটা আগে বলো। তারপর আমরা আমাদের পরিচয় দেবো।'
বৃদ্ধ বলল, 'অর্থাৎ খবরের বিনিময়ে পরিচয়।'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ।'
তখন বৃদ্ধ বলল, 'শুনেছি মুহাম্মাদ ও তাঁর সাথিরা অমুক দিন যাত্রা শুরু করেছে। খবর সত্য হলে তাদের এখন অমুক জায়গায় থাকার কথা, আর আমি এও খবর পেয়েছি যে, কুরাইশরা অমুক দিন বের হয়েছে। এ খবর যদি সঠিক হয়, তবে তারা আজ অমুক স্থানে থাকার কথা।'
বস্তুত, বৃদ্ধ লোকটি যে স্থানের কথা বলেছিল, কুরাইশরা তখন সেখানেই অবস্থান করছিল। বৃদ্ধ তার খবর দেওয়া শেষ করে জিজ্ঞেস করল, 'এবার বলো, তোমরা কোত্থেকে এসেছ?'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'مَاءٍ مِنْ نَحْنُ-আমরা পানি থেকে এসেছি।' এ কথা বলে তিনি বৃদ্ধের কাছ থেকে চলে এলেন। লোকটি তখন নিজে নিজে বলতে লাগল, 'আমরা পানি থেকে এসেছি'-এর তাৎপর্য কী? পানি থেকে, ইরাকের পানি থেকে নাকি? (৩০)
আমাদের এই পরিচ্ছেদের একটি চমৎকার সমাপ্তি ঘটাতে চাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই ঘটনাটি বর্ণনার মাধ্যমে, যা সংঘটিত হয়েছিল হাওয়াজিন গোত্রের প্রতিনিধির সঙ্গে। হাওয়াজিন গোত্রের লোকেরা ইসলামগ্রহণের দিন যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হাজির হলো, তখন তিনি তাদেরকে ইসলামের মহান আদর্শ সততার মূল্য শিক্ষা দিতে গিয়ে বললেন,
«أَحَبُّ الْحَدِيثِ إِلَيَّ أَصْدَقُهُ»
কথার মধ্যে আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় হলো সত্য কথা...। (৩১)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোটা জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রই ছিল সত্য ও সততায় পরিপূর্ণ। এ কারণে থমাস কার্লাইল (Thomas Carlyle)-এর মতো দার্শনিক বলতে বাধ্য হয়েছেন, 'আপনারা ভেবে বলুন তো, একজন মিথ্যাবাদী ও অজ্ঞ ব্যক্তি কি কখনো এমন একটি অনিন্দ্য সুন্দর স্থায়ী ধর্ম তৈরি করতে পারে? আর মিথ্যাবাদী ও অজ্ঞ ব্যক্তি তো ইটের তৈরি একটি ঘরও বানাতে পারে না! যে ব্যক্তি ভবনের চুন, সিমেন্ট, মাটি ও বিল্ডিংয়ের নকশা বা ডিজাইনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিছুই জানে না, সে যদি একটি ভবন নির্মাণ করে, তাহলে সেই ভবনের অবস্থা কেমন হয়? সেটা হয় অতি ভঙ্গুর একটি টিলার মতো। সেটা হয় বিভিন্ন উপকরণের সমন্বয়ে গঠিত বিশৃঙ্খল একটি স্তুপ। সেটা কিছুতেই এমন স্থায়িত্বের গুণ পেতে পারে না, যার আশ্রয়ে দুইশ মিলিয়ন (২০ কোটি) (৩২) মানুষ বারোটি শতাব্দীরও বেশি (এখন প্রায় সাড়ে চৌদ্দ শতাব্দী) সময় বসবাস করবে। বরং হওয়ার কথা তো ছিল, সময়ের পরিক্রমায় কিছুদিনের মধ্যেই এর স্তম্ভগুলো ভেঙে পড়বে এবং সেটা এমনভাবে বিলীন হয়ে যাবে, মনে হবে যেন এখানে কোনোদিন এ জাতীয় কোনো বস্তুর অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু ইসলামের ভবনের ক্ষেত্রে তেমনটি কখনো হয়নি।
আমি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একজন মানুষের জন্য উচিত হবে তার জীবনের সকল বিষয়ে প্রাকৃতিক নিয়মাবলির অনুসরণ করা। নতুবা কখনো তার উদ্দেশ্য সফল হবে না। অথচ এ সকল অবিশ্বাসী মানুষ প্রাকৃতিক সত্যকে অস্বীকার করে শুধু মিথ্যাকেই ছড়িয়েছে। তারা এতটা সুশোভিতভাবে মিথ্যার ফুলঝুরি ছড়িয়েছে যে, আজ সেটাকেই মানুষ সত্য বলে ভাবতে শুরু করেছে... পরিতাপের বিষয় যে, এইসব বিভ্রান্তির কারণে বহু দল ও জাতি প্রতারিত ও বিভ্রান্ত হয়েছে...। (৩৩)
তৃতীয় অনুচ্ছেদ
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়া ও অনুগ্রহ
দয়া ও অনুগ্রহ, আল্লাহ তাআলার মহান গুণাবলির একটি। সৃষ্টির প্রতি তাঁর সবচেয়ে বড় দয়া হলো, তিনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে বের করার জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মানবজাতির রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
(হে নবী,) আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত করেই পাঠিয়েছি। [সুরা আম্বিয়া: ১০৭]
এজন্য অধিকাংশ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ! إِنَّمَا أَنَا رَحْمَةٌ مُهْدَاةٌ
হে মানুষেরা, নিশ্চয় আমি উপহার হিসেবে প্রদত্ত এক রহমত। (৩৪)
তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ ছিল সকল মানুষের জন্য সমান ও ব্যাপক, বিশেষত এই উম্মতের জন্য। নিচের হাদিসটির দিকে লক্ষ করলেই আমরা এর বাস্তবতা অনুধাবন করতে সক্ষম হব। তিনি বলেন, আমার ও লোকদের দৃষ্টান্ত এমন এক ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালাল; যখন তার চতুর্দিক আলোকিত হয়ে গেল, তখন পতঙ্গের দল আগুনে এসে পড়তে লাগল। সে সেগুলোকে আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য টেনে ধরতে লাগল। কিন্তু তারা তাকে ব্যর্থ করে দিয়ে প্রজ্বলিত আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। তেমনইভাবে আমিও তোমাদের কোমর ধরে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করছি অথচ তোমরা তাতেই ঝাঁপিয়ে পড়ছ। (৩৫)
এ এক অভূতপূর্ব দয়া ও মমতার নিদর্শন। গোটা জগতে দয়া ও মমতার এমন দৃষ্টান্ত কিংবা তার কাছাকাছি দৃষ্টান্তও কোথাও পাওয়া যাবে না।
তাঁর সীমাহীন দয়া ঘিরে রেখেছিল ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, কাছে-দূরের সকলকেই, এমনকি বন্ধু এবং শত্রুকেও। তাঁর দয়া বা অনুগ্রহ কোনো স্থান বা সময়ের সাথে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সকল জগৎ অর্থাৎ মানুষ, জিন এবং সকল প্রাণীর জন্যই তাঁর দয়া ছিল অবারিত। এভাবে তাঁর দয়া বা অনুগ্রহ কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা সময়ের সাথেও সীমাবদ্ধ নয়। বরং তাঁর জন্মের শুরু থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সকলের জন্যই এটি পরিব্যাপ্ত। এ কারণেই আমরা দেখতে পাই, তিনি তাঁর উম্মতকেও দয়ার গুণ অর্জনের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন,
«إِنَّمَا يَرْحَمُ اللَّهُ مِنْ عِبَادِهِ الرُّحَمَاءَ»
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে দয়ালু ও স্নেহপরায়ণদের প্রতি দয়া করেন। (৩৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি কথা ও কাজে দয়া ও মমতার যে নিদর্শন ফুটে উঠত, তা কোনো লৌকিকতাপূর্ণ দয়া ছিল না যে, সামাজিকতা ও লোক দেখানোর জন্য তা করা হয়েছে। বরং তাঁর দয়া ও মমতা ছিল তাঁর সত্তাগত ও স্বভাবজাত, যা সর্বক্ষণ সর্বক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়েছে। স্থানের পার্থক্য এবং বিষয়ের ভিন্নতার ক্ষেত্রেও তা একইরকম ছিল। এমনকি দয়া ও মমতার গুণটি তাঁর চরিত্রের অন্য সকল গুণকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাই এটাই সব জায়গায় সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিয়েছে। আর এটা আশ্চর্যেরও কোনো বিষয় নয়। কেননা কুরআনুল কারিমে একটু গভীরভাবে দৃষ্টিপ্রদানকারী যে-কেউ দেখতে পাবে, তাতে বর্ণিত সকল গুণের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম গুণ হলো দয়া বা অনুগ্রহ।
[চিত্র নং-১ আল-কুরআনে বর্ণিত রাসূল -এর চারিত্রিক গুণাবলি]
বয়স্ক ও ছোটদের প্রতি নবীজির দয়ার কথা আমরা এই হাদিসের মাঝে লক্ষ করতে পারি। তিনি বলেন,
«لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيْرَنَا وَيُوَقِّرْ كَبِيرَنَا»
যে ব্যক্তি ছোটদের স্নেহ আর বড়দের শ্রদ্ধা করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (৩৭)
সেই সমাজের চেয়ে মহান সমাজ আর কোনটি হতে পারে, যে সমাজের সকলকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা ও কর্মের মাধ্যমে পরস্পরের প্রতি দয়া ও সহানুভূতিপূর্ণ আচরণের শিক্ষা দিয়েছেন!
আমরা আরও দেখি, তিনি এমন অপরাধীর প্রতিও দয়া ও সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ করেছেন, যারা তাঁর নিকট এসে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে। সাহাবিদের মধ্যে কেউ যদি নিজের গুনাহের কাফফারা (অপরাধের ক্ষতিপূরণ) আদায় করতে অক্ষম হতো, সে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট চলে আসত এই আশায় যে, তিনি অপরাধের কাফফারা আদায় করে দেবেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে এমন বহু ঘটনা রয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো হজরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণিত একটি ঘটনা। তিনি বলেন, একবার এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমি তো ধ্বংস হয়ে গিয়েছি!'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমার কী হয়েছে?'
লোকটি বলল, 'আমি রোজা অবস্থায় স্ত্রী-সহবাস করে ফেলেছি।' নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আজাদ করার মতো তোমার কি কোনো ক্রীতদাস আছে?'
সে বলল, 'না।'
নবীজি বললেন, 'তাহলে তুমি কি একাধারে দুই মাস রোজা রাখতে পারবে?'
সে বলল, 'না।'
নবীজি বললেন, 'তাহলে কি ষাটজন মিসকিন খাওয়াতে পারবে?'
সে বলল, 'না।'
তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ হয়ে গেলেন। আমরাও তখন তাঁর নিকট বসে আছি। এ সময় তাঁর নিকট খেজুরভরতি একটি ঝুড়ি পেশ করা হলো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'প্রশ্নকারী কোথায়?'
সে বলল, 'এই যে আমি।'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এগুলো নিয়ে সদকা করে দাও।'
লোকটি বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, এটা কি আমি আমার চেয়েও বেশি অভাবগ্রস্তকে সদকা করব? আল্লাহর শপথ, মদিনার দুই প্রান্তে আমার পরিবারের চেয়ে অভাবগ্রস্ত আর কেউ নেই।'
এবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন। এমনকি তাঁর সামনের দাঁত প্রকাশিত হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, এগুলো তুমি তোমার পরিবারকে খাওয়াও।' (৩৮)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই আচরণটি কতই-না দয়া ও সহানুভূতিপূর্ণ ছিল। কোনো ধরনের ক্রোধ বা ক্ষোভের প্রকাশ ছাড়াই তিনি বারবার লোকটিকে কাফফারা আদায়ের উপায় বলে দিচ্ছিলেন। তার বিষয়টাকে মৃদু হেসে সহজ-স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন, যা অপরাধীকে একপ্রকার মানসিক প্রশান্তি দেয়। এরপর লোকটি যখন কাফফারা আদায়ের সকল পদ্ধতিতে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করল, তখনও নবীজি বিরক্ত হননি। বরং কেউ যখন তাঁর জন্য খেজুর হাদিয়া নিয়ে এলো, তিনি সন্তুষ্টচিত্তে সেটা সেই সাহাবির হাতে দিয়ে বললেন, এই নাও খেজুর, এর দ্বারা তুমি তোমার গুনাহের কাফফারা আদায় করে দাও।
ইবাদতের ক্ষেত্রেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দয়ার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে বলল, অমুক ইমাম নামাজ দীর্ঘ আদায় করেন। এ কারণে আমি ফজরের নামাজে উপস্থিত হতে পারি না। বর্ণনাকারী সাহাবি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোনো বয়ানের মধ্যে সেদিনের চেয়ে বেশি রাগান্বিত হতে দেখিনি। এরপর তিনি বললেন,
«يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ مِنْكُمْ مُنَفِّرِيْنَ، فَمَنْ أَمَّ النَّاسَ فَلْيَتَجَوَّزْ؛ فَإِنَّ خَلْفَهُ الضَّعِيفَ وَالْكَبِيرَ وَذَا الْحَاجَةِ»
তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ বিতৃষ্ণা সৃষ্টিকারী আছে। সুতরাং যে জামাতের ইমামতি করে, সে যেন সংক্ষেপ করে। কারণ তার পেছনে দুর্বল, বৃদ্ধ এবং কর্মব্যস্ত লোক থাকে। (৩৯)
যুদ্ধবন্দিদের সাথে আচরণেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়ার প্রকাশ ঘটেছে। যেমন হাতিম তায়ির মেয়ের (৪০) ক্ষেত্রে ঘটেছে। তায়ি গোত্রের বন্দিদের সাথে তাকেও বন্দি করা হয়েছিল। পরে তাকে মসজিদের সামনে একটি সংরক্ষিত স্থানে রাখা হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিক দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। হাতিম-তনয়া তাঁকে দেখে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী ও স্পষ্টভাষিণী। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমার পিতা মৃত্যুবরণ করেছেন। আমার অভিভাবকও (ভাই আদি ইবনে হাতেম রা.) অনুপস্থিত। সুতরাং আপনি আমার প্রতি সদয় হোন। আল্লাহ তাআলাও আপনার প্রতি সদয় হবেন।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতিম-কন্যার এ কথা শুনে বললেন, 'ঠিক আছে, আমি তোমাকে মুক্ত করে দিলাম। কিন্তু তুমি এখনই চলে যাওয়ার ইচ্ছা করো না। বরং তুমি যদি তোমার সম্প্রদায়ের বিশ্বস্ত কাউকে পাও, যে তোমাকে তোমার দেশে পৌঁছে দেবে, তখন আমার নিকট এসো, তারপর যেয়ো।'
হাতিমের মেয়ে বলেন, এরপর আমি সেভাবেই অবস্থান করতে থাকলাম। অবশেষে একদিন শুনতে পেলাম, বালি অথবা কুজাআ থেকে একটি প্রতিনিধিদল এসেছে। আমিও শামে অবস্থানকারী আমার ভাইয়ের নিকট যাওয়ার ইচ্ছা করছিলাম। এবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে বললাম, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমার সম্প্রদায়ের একটি কাফেলা এসেছে। তাতে এমন নির্ভরযোগ্য লোক আছে, যে আমাকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দেবে।' তখন নবীজি আমাকে কাপড়, বাহন ও পথখরচ প্রদান করলেন। আমি সেগুলো নিয়ে কাফেলার সাথে বের হয়ে পড়লাম এবং শামে চলে এলাম। (৪১)
বিষয়টি একটু ভেবে দেখুন! এই বন্দিনির সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতটা দয়াপূর্ণ মানবিক আচরণ করেছেন! তিনি তাকে মুক্ত করে দিলেন। শুধু তাই নয়, একজন নারী হিসেবে তার কল্যাণ চিন্তা করে তার একাকী রওয়ানা হওয়ার প্রতি সম্মত ছিলেন না। বরং তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, 'তুমি এখনই বের হওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ো না; বরং তোমার গোত্রের নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যক্তি পেলে তার সাথে চলে যেয়ো।' তারপর যাওয়ার সময় তাকে বাহন, পোশাক ও রাস্তাখরচ দিয়ে দিলেন!
এ ছাড়াও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়া ও ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে সকল প্রাণী, পশু, পাখি ও কীটপতঙ্গের প্রতিও। তাঁর জীবনীতে আমরা দেখতে পাই, তিনি এমন এক ব্যভিচারিণী মহিলার সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছেন, যে একটি কুকুরের প্রতি সদয় ব্যবহার করেছিল। কুকুরটিকে পানি পান করিয়েছিল। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন! (৪২)
এভাবে নবীজির করুণার পরশ পেয়েছে জীব-জানোয়ার থেকে শুরু করে ছোট পাখি পর্যন্ত, যদিও অন্য প্রাণীগুলোর মতো এগুলো বাহ্যত মানুষের তেমন কোনো উপকারে আসে না। সামান্য একটি চড়ুই পাখির প্রতি আমরা তাঁর অগাধ মমতা ও ভালোবাসা লক্ষ করি! তিনি বলেন,
مَنْ قَتَلَ عُصْفُورًا عَبَثًا عَجَّ إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَقُولُ: يَا رَبِّ! إِنَّ فُلَانًا قَتَلَنِي عَبَثًا وَلَمْ يَقْتُلْنِي لِمَنْفَعَةٍ
কেউ যদি অনর্থক কোনো চড়ুই পাখিকে হত্যা করে, তবে সেই পাখি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার নিকট অনুযোগ করে বলবে, হে আমার প্রতিপালক, আপনার অমুক বান্দা আমাকে অনর্থক হত্যা করেছিল। কোনো প্রয়োজনে সে আমাকে হত্যা করেনি। (৪৩)
এই হলো প্রবৃত্তির কোনো চাহিদা ছাড়াই একনিষ্ঠ দয়া ও ভালোবাসা। এই দয়ার পেছনে পার্থিব কোনো স্বার্থ নেই। কত চমৎকার এই দয়া ও ভালোবাসা, যার অনাবিল স্পর্শে ব্যথিতের যাতনা কমে; লাঘব হয় দুঃখীর দুঃখ।
চতুর্থ অনুচ্ছেদ
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়পরায়ণতা
ন্যায়পরায়ণতা মানুষের শ্রেষ্ঠতম চারিত্রিক গুণাবলির একটি। অন্যের প্রতি একটি দরদি মনের বহিঃপ্রকাশ ও মজলুমের জন্য আশা ও সান্ত্বনার আশ্রয়। এ কারণে কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ निश्चय আল্লাহ ইনসাফ করার (ন্যায়পরায়ণতা) হুকুম দেন। [সুরা নাহল: ৯০]
ন্যায়পরায়ণতা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলাম শত্রুদের বিভিন্ন অপছন্দনীয় কর্মকাণ্ড সত্ত্বেও তাদের সাথে ন্যায়পরায়ণতার আদেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَانُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوى কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে ইনসাফ (ন্যায়পরতা) পরিত্যাগে প্ররোচিত না করে। ন্যায়পরতা অবলম্বন করো। এ পন্থাই তাকওয়ার বেশি নিকটবর্তী। [সুরা মায়িদা : ৮]
ন্যায়পরতা সকল বিষয়ের যথাযথ মূল্য প্রদান করে। ন্যায়পরতার মাধ্যমেই মানুষের যথাযথ অধিকার নিশ্চিত হয়। যে জাতির মাঝে ন্যায়পরতা রয়েছে, তারা সৌভাগ্যবান এবং উন্নত। আর যে জাতি ন্যায়পরতার গুণ থেকে বঞ্চিত, তারাই সবচেয়ে দুর্ভাগা এবং অনুন্নত জাতি হিসেবে গণ্য।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবিদের ন্যায়পরতার শিক্ষা দিয়েছেন, যাতে কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিদানের পাল্লা ভারী হয়। তিনি বলেন,
«إِنَّ الْمُقْسِطِينَ فِي الدُّنْيَا عَلَى مَنَابِرَ مِنْ لُؤْلُوْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بَيْنَ يَدَيِ الرَّحْمٰنِ بِمَا أَقْسَطُوا فِي الدُّنْيَا»
নিশ্চয় দুনিয়ায় ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিগণ কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর নিকট মুক্তাখচিত মিম্বারে অবস্থান করবে, যেহেতু তারা দুনিয়াতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে। (৪৪)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রত্যেক সাহাবির অন্তরে ন্যায়পরতার বীজ বপন করেছেন। সেই শৈশব থেকেই ন্যায়পরতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল উপমা। যেমন তিনি নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই অত্যাচারিতের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের বাড়িতে 'হিলফুল ফুজুল' (৪৫) নামক সংগঠন প্রতিষ্ঠার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কুরাইশের কিছু যুবক তা প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ ছাড়া কাবাঘর পুনর্নির্মাণের সময় 'হাজরে আসওয়াদ' স্থাপন করা নিয়ে কুরাইশদের মধ্যে যে বিতর্ক হয়েছিল, তখনও তারা তাঁর বিচার ও ন্যায়পরতার প্রতি আস্থা রেখেছিল, যদিও সেই বিবদমান গোত্রগুলোর মধ্যে তাঁর গোত্র বনু হাশেমও ছিল। তবুও তাঁর ন্যায়পরতা ও সততার প্রতি আস্থার কারণে সকলেই তাঁকে বিচারক হিসেবে মেনে নিয়েছিল।
এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিশ্ববাসীর পথপ্রদর্শনের জন্য নবুয়ত প্রদান করেন। তখনও তিনি তাঁর সাহাবিদের মাঝে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং প্রতিটি স্থানে ন্যায়পরতাকে বিচারিক মানদণ্ড বানিয়েছেন। তাঁর জীবনের ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠার ঘটনাসমূহের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ঘটনা সেটাই, যা হজরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেছেন। এই ঘটনার মাঝে তাঁর ন্যায়পরতা এবং সত্যের প্রতি তাঁর অবিচল দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে। হজরত আয়েশা রা. বলেন, 'মাখজুম সম্প্রদায়ের এক মহিলার চুরির ঘটনায় কুরাইশ বংশের লোকেরা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। (প্রকাশ্যে হাত কাটা হলে একটা মানসম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তাই তারা শাস্তিটা কমাতে চাচ্ছিল।) তারা বলল, বিষয়টা নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কে কথা বলবে? অতঃপর তারাই বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়পাত্র উসামা ইবনে যায়েদ রা. ছাড়া এমন সাহস কে করতে পারে? অবশেষে উসামা রা. নবীজির সাথে কথা বললেন। উসামার কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি এসেছ আল্লাহ তাআলার শাস্তির বিধানের ক্ষেত্রে সুপারিশ করতে!' এরপর তিনি দাঁড়িয়ে খুতবায় বললেন,
إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا»
হে মানব সকল, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ধ্বংস করেছেন এ জন্য যে, যখন তাদের মধ্যে কোনো অভিজাত ব্যক্তি চুরি করত, তারা তাকে রেহাই দিয়ে দিত। আর যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত, তাঁর ওপর দণ্ড প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতেমাও যদি চুরি করে, অবশ্যই আমি তার হাত কেটে দেবো। (৪৬)
আমরা দেখতে পাই, তিনি সর্বদা সতর্ক থাকতেন, যেন মানুষের প্রতি কোনো অন্যায় বা অবিচার না হয়ে যায়। যেমন হজরত সুওয়াইদ ইবনে কায়েস রা. থেকে বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, আমি ও মাখরাফা আবদি রা. একবার 'হাজর' (একটি স্থানের নাম) থেকে কাপড় কিনে বিক্রির জন্য মক্কায় নিয়ে আসি। এ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে আসেন এবং একটি পায়জামার দরদাম করেন। সে সময় আমাদের নিকট এক ব্যক্তি উপস্থিত ছিল, যে টাকার বিনিময়ে মানুষের জিনিসপত্র মেপে দিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, يَا وَزَّانُ، زِنْ وَأَرْجِحْ হে মাপ নিরূপণকারী, তুমি মাপবে এবং তা সঠিক করবে।(৪৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দীর্ঘ জীবনে ন্যায়পরতা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকে নিজের জন্য আবশ্যক করে নিয়েছিলেন। তাঁর একনিষ্ঠ ন্যায়পরতার হাজারো উপমায় সিরাত গ্রন্থসমূহ পূর্ণ হয়ে আছে। একজন পাঠক সেগুলো পড়ার সময় নিজের মধ্যে শিহরণ ও পুলক অনুভব করবে। যখন সে নিজের ক্ষেত্রে, পরিবার-পরিজন ও চারপাশের মানুষের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দৃঢ়তা ও শক্তিমত্তা দেখতে পাবে। চাই সেই ন্যায়পরতা আল্লাহ তাআলার কোনো দণ্ডবিধানের ক্ষেত্রে হোক অথবা সন্ধি ও যুদ্ধের কোনো বিষয়ে। অথবা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে সম্পর্কিত সামান্য কোনো ব্যাপার হোক। একবার এক মুনাফিক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়পরতায় কলঙ্ক লেপনের চেষ্টা করেছিল। তখন তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তা ও প্রতাপের সাথে মুনাফিকের সেই কথাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন,
«وَيْلَكَ وَمَنْ يَعْدِلُ إِذَا لَمْ أَعْدِلْ؟ لَقَدْ خِبْتُ وَخَسِرْتُ إِنْ لَمْ أَعْدِلْ» হতভাগা! আমিই যদি ন্যায় প্রতিষ্ঠা না করি, তাহলে আর কে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে? আমি যদি ন্যায় প্রতিষ্ঠা না করি, তবে তো আমি হতভাগ্য ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাব।(৪৮)
এমনইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের স্ত্রীদের সাথেও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতেন, এমনকি সংসারের সামান্য ছোটখাটো বিষয়েও। হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এক স্ত্রীর নিকট অবস্থান করছিলেন। সে সময় তাঁর কোনো এক স্ত্রী তাঁর জন্য একটি পাত্রে কিছু খাদ্য পাঠালেন। এটা দেখে, যে স্ত্রীর ঘরে তিনি অবস্থান করছিলেন, তিনি পাত্র বহনকারী খাদেমের হাতে আঘাত করলেন। ফলে খাদ্যের পাত্রটি পড়ে ভেঙে গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন পাত্রের ভাঙা টুকরাগুলো একত্র করলেন। তারপর খাদ্যগুলো একত্র করে তাতে রাখলেন এবং বললেন, তোমাদের আম্মাজানের আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত লেগেছে। এরপর তিনি খাদেমকে অপেক্ষা করতে বললেন এবং যে স্ত্রীর ঘরে ছিলেন তার থেকে একটি ভালো পাত্র নিয়ে যার পাত্র ভেঙেগিয়েছিল, তাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন এবং ভাঙা পাত্রটি যিনি ভেঙেছিলেন তার কাছে রেখে দিলেন। (৪৯)
অমুসলিমদের প্রতিও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়পরতা সদা প্রসারিত ছিল। যেমন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'কোনো ব্যক্তি যদি কোনো মুসলিমের সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্য মিথ্যা শপথ করে, তাহলে সে আল্লাহর নিকট এমন অবস্থায় হাজির হবে যে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর অত্যধিক রাগান্বিত থাকবেন।'
হজরত আশআস ইবনে কায়েস রা.(৫০) বলেন, আমার ও এক ইহুদি ব্যক্তির মাঝে যৌথ মালিকানায় একখণ্ড জমি ছিল। একবার সে আমার মালিকানার অংশ অস্বীকার করে বসল। আমি তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে গেলাম। তিনি আমাকে বললেন, 'তোমার কি কোনো সাক্ষী আছে?' আমি বললাম, 'না।' তখন তিনি ইহুদিকে বললেন, 'তুমি কসম করো।'
আমি তখন বললাম, 'হে আল্লাহর রাসুল, সে তো (গুনাহের তোয়াক্কা না করে মিথ্যাভাবে) কসম করবে এবং আমার সম্পত্তি নিয়ে নেবে।' তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করেন-
إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَبِكَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ও নিজেদের কসমের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে, আখিরাতে তাদের কোনো অংশ নেই। আর আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের দিকে (সদয় দৃষ্টিতে) তাকাবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না। তাদের জন্য থাকবে কেবল যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [সুরা আলে ইমরান: ৭৭] (৫১)
সকলের মাঝে ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিশ্চয় এটি এক বিরল দৃষ্টান্ত! ঘটনাটিতে দেখা যাচ্ছে দুই ব্যক্তির মাঝে ঝগড়া হয়েছে। তাদের একজন হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় সাহাবি, অন্যজন ইহুদি কাফের। তারা তাঁর নিকট বিচার নিয়ে এলেন সমাধানের জন্য। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাঝে শরিয়তের সত্য বিধান প্রয়োগ করেছেন, কারও প্রতি কোনো ধরনের টান বা পক্ষপাতের দিকে খেয়াল করেননি। উল্লিখিত বিষয়ে শরিয়তের বিধান হলো, নিজের দাবির পক্ষে বাদী প্রমাণ উপস্থাপন করবে। এখানে বাদী হলেন আশআস ইবনে কয়েস রা.। বাদী যদি দলিল-প্রমাণ উপস্থিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন বিবাদীকে কসম করতে বলা হবে। এখানে বিবাদী হলো একজন ইহুদি কাফের। তার কর্তব্য হবে বাদী তার ব্যাপারে যে অভিযোগ আরোপ করছে, তা অস্বীকার করে কসম করা। আর এতে তাকে সত্যায়িত করা হবে। অথচ আমরা জানি, চিরাচরিত অভ্যাস হিসেবে ধর্মীয় ভীতি না থাকায় সেই ইহুদি মিথ্যা কসম করে সম্পদ নিয়ে নিতে পারে। তবুও বিচার সেভাবেই করা হয়েছে যেটা নিয়ম।
এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মূলনীতি হলো এই হাদিস, «البينة على المدَّعِي واليمين على من أنكر» বাদী নিজ দাবির পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করবে, অন্যথায় বিবাদী কসম করবে। (৫২)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রত্যেক শাসক, প্রশাসক ও বিচারকের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও আদর্শ রেখে গেছেন। এমনকি তাঁর পুরো জীবন পরিচালিত হয়েছে আল্লাহ তাআলার নির্দেশমতো। এ কারণে প্রতিটি মানুষ তাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে। প্রতিটি অন্তর তাতে শান্তি ও স্বস্তি খুঁজে পেয়েছে এবং তাঁর ন্যায়নিষ্ঠায় পুরো মানবজাতি হয়েছে ধন্য।
পঞ্চম অনুচ্ছেদ
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানশীলতা
ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে দয়া ও দানশীলতার ওপর। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দয়া ও দানশীলতার গুণে গুণান্বিত করেছেন। তিনি কুরআনুল কারিমে বলেন,
إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ وَمَا هُوَ بِقَوْلُ شَاعِرٍ قَلِيلًا مَّا تُؤْمِنُونَ
এটা (কুরআন) এক মহানুভব বার্তাবাহকের বাণী। এটা কোনো কবির বাণী নয়, (কিন্তু) তোমরা খুব অল্পই ঈমান আনো।
[সুরা আলহাক্কা: ৪০-৪১]
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যান্য মহান গুণের মধ্যে শুধু তাঁর মহানুভবতার কথা উল্লেখ করেছেন। কেননা এই গুণের মাঝেই নিহিত রয়েছে তাঁর অন্য সকল গুণ। তাঁর চরিত্রে সমাহার ঘটেছিল বহু উত্তম গুণের, যেগুলোর ভিত্তি ছিল উদারতা, দানশীলতা এবং বদান্যতা। আসমান থেকে তাঁর ওপর ওহি অবতীর্ণ হওয়ার আগ থেকেই তিনি এসব গুণে গুণান্বিত ও প্রসিদ্ধ ছিলেন। যেমন আমরা দেখতে পাই হজরত খাদিজা রা. তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তাঁর গুণাবলি সম্পর্কে বলেছিলেন,
كَلَّا وَاللَّهِ مَا يُخْزِيكَ اللهُ أَبَدًا؛ إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ وَتَحْمِلُ الْكُلَّ وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ وَتَقْرِي الضَّيْفَ وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ»
আল্লাহর কসম! কক্ষনো না। আল্লাহ আপনাকে কখনো অপমানিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন, অসহায় দুর্বলদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন এবং সত্যপথের বিপদ্গ্রস্ত ব্যক্তিদের সাহায্য করেন। (৫৩)
এ সকল চারিত্রিক গুণের উৎস হলো 'উদারতা ও বদান্যতা'। কারণ এই গুণগুলো উদারতা ও বদান্যতার কথাই ব্যক্ত করে। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানশীলতার বর্ণনা দিতে গিয়ে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। এ ছাড়া রমজানে তিনি আরও বেশি বেশি দান করতেন, যখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন। আর রমজানের প্রতি রাতেই জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং তারা পরস্পর কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। নিশ্চয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রহমতের বাতাসের থেকেও অধিক দানশীল ছিলেন। (৫৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়ত-পরবর্তী জীবনেও আমরা দেখতে পাই, তিনি তাঁর সাহাবিদের সর্বদা দান ও বদান্যতার প্রতি উৎসাহ দিতেন। দানের দ্বারা অন্তর প্রশস্ত হয় এবং সম্পদের বৃদ্ধি ঘটে। এজন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সকল সাহাবি ও অনাগত উম্মতের শিক্ষার উদ্দেশ্যে বলেছেন, ما من يوم يصبح العباد فيه إلا ملكان ينزلان فيقول أحدهما : اللهم أعط منفقا خلفا، ويقول الآخر : اللهم أعط ممسكا تلفا»
বান্দার জীবনের প্রতিটি সকালে আসমান থেকে দুজন ফিরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ, দাতাকে তার দানের উত্তম প্রতিদান দিন। আর অন্য ফিরেশতা বলেন, হে আল্লাহ, কৃপণকে ধ্বংস করে দিন। (৫৫)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সারা জীবন যা বিশ্বাস করেছেন এবং বলেছেন, তাঁর সবকিছুই বাস্তবে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন। সেইসব মুসলমান কতই-না সৌভাগ্যবান, যারা তাঁর এই শিক্ষা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন। হজরত সাহল ইবনে সাদ রা. বলেন, একবার এক মহিলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট একটি চাদর নিয়ে এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, পরিধানের জন্য আমি আপনাকে এটি হাদিয়া দিলাম।' তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাদরটি এমনভাবে গ্রহণ করলেন, যেন এটি তাঁর খুব প্রয়োজন ছিল। এরপর তিনি এটি পরিধান করলেন। তখন সাহাবিদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি নবীজির পরিধেয় চাদরটি দেখে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, এটা কতই-না সুন্দর! আপনি এটি আমাকে দিয়ে দিন।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ (দিয়ে দিলাম)।' এরপর নবীজি যখন মজলিস থেকে উঠে গেলেন, তখন অন্য সাহাবিরা উক্ত সাহাবিকে তিরস্কার করে বলতে লাগলেন, 'তুমি ভালো করোনি। তুমি দেখলে যে নবীজি চাদরটি এমনভাবে গ্রহণ করেছেন, যেন এটি তাঁর খুব প্রয়োজন ছিল। এরপরও তুমি এটি চেয়ে বসলে! অথচ তুমি অবশ্যই জানো যে, তাঁর কাছে কখনো কোনো জিনিস চাওয়া হলে তিনি তাকে ফিরিয়ে দেন না।
তখন সেই সাহাবি বললেন, 'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই চাদরটি পরিধান করেছেন, এ কারণে তাঁর বরকত অর্জন করার আকাঙ্ক্ষায় আমি এমনটি করেছি, যাতে আমি এ চাদরটাকে আমার কাফন বানাতে পারি।' অন্য বর্ণনায় আছে, সাহল রা. বলেন, (পরবর্তী সময়ে) এটি তার কাফন হয়েছিল। (৫৬)
এ বিষয়ে আমরা হজরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি। তিনি বলেন-
مَا سُئِلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ شَيْءٍ قَطُّ فَقَالَ: لَا»
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এমন কোনো জিনিস চাওয়া হয়নি, যার উত্তরে তিনি 'না' বলেছেন। (৫৭)
এই হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাস্তব আমলের কিছু উৎকৃষ্ট নিদর্শন। সাধ্যের মধ্যে তিনি কখনো প্রার্থনাকারীকে ফিরিয়ে দেননি এবং নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে তার চাওয়াকে পূরণ করেছেন।
দানশীলতার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য অনেক অনুপম দৃষ্টান্ত ও আদর্শ রেখে গিয়েছেন। যেমন, একবার বাহরাইন থেকে তাঁর কাছে কিছু সম্পদ এলো। তাঁর নিকট ইতিপূর্বে যত সম্পদ আনা হয়েছে, এটার পরিমাণ তারচেয়ে বেশি ছিল। সম্পদগুলো আসার পর তিনি সাহাবিদের বললেন, 'এগুলো মসজিদে রেখে দাও।' (পরে মসজিদ থেকেই তিনি সেগুলো দান করে দেন।) (৫৮)
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সার্বক্ষণিক অভ্যাস ছিল, কারও চাওয়ার আগেই তিনি তাকে দান করতেন। এটা ছিল তার দানশীলতার এক অনুপম বৈশিষ্ট্য। এ প্রসঙ্গে তিনি বলতেন, 'আমার নিকট উহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনা হোক আর ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্য ব্যতীত সেগুলোর একটি দিনারও আমার কাছে জমা থাকুক এবং এ অবস্থায় তিন দিন অতিবাহিত হোক, তা আমাকে আনন্দিত করবে না। তবে আমি তা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এভাবে.. এভাবে... এভাবে... বিলিয়ে দেবো।' তিনি তার হাত দিয়ে ডান, বাম ও পেছনের দিকে ইশারা করলেন। (৫৯)
অনেক মানুষের ইসলামগ্রহণের মাধ্যম ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই দানশীলতার গুণ। কেননা তিনি এভাবে দান করতেন, যাতে দরিদ্রতার ভয় ছিল না। যেমন হজরত আনাস রা. বর্ণনা করে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ইসলামগ্রহণের শর্তে যখনই কিছু চাওয়া হয়েছে, তিনি অবশ্যই তা দান করেছেন। আনাস রা. আরও বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক ব্যক্তি এসে কিছু চাইল। তখন তিনি তাকে এত বিপুল পরিমাণ বকরি দান করলেন, যাতে দুই পাহাড়ের মাঝের জায়গা ভরে যাবে। ওই ব্যক্তি সেগুলো নিয়ে নিজের সম্প্রদায়ের নিকট গিয়ে বলতে লাগল, 'হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা ইসলামগ্রহণ করো। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন উজাড় করে দান করেন যে, নিজের অন্ন-কষ্টের কোনো ভয়ই করেন না।' (৬০)
তাঁর দানশীলতার অনেক ঘটনা রয়েছে। যেমন রুবাইয়া বিনতে মুআওয়িজ ইবনে আফরা রা. বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট একপাত্র ভেজা খেজুর, একঝুড়ি শাকসবজি হাদিয়া হিসেবে পেশ করলাম। এরপর তিনি আমাকে একমুষ্টি অলংকার দান করলেন...। অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'আমাকে স্বর্ণ দিলেন' এবং বললেন, 'এর দ্বারা নিজেকে সজ্জিত করো।'(৬১)
এটা হলো তাঁর অপরিসীম দানের কিছু নমুনা। অথচ তিনি নিজে কঠিন দরিদ্রতার মাঝে জীবন অতিবাহিত করতেন, কখনো কোনো সম্পদের মালিকানা রাখতেন না। কিন্তু যখনই তাঁর নিকট কোনো সম্পদ আসত, দুহাত উজাড় করে তা মুমিনদের দান করে দিতেন। অপরদিকে তিনি একজন অতি সাধারণ মুসলিম মহিলার বিনম্র উপহারও সম্মানের সাথে গ্রহণ করতেন এবং এই গ্রহণ করাটাই ছিল তাঁর বিনয়ের অনন্য নিদর্শন এবং ওই মহিলার চিত্ত-প্রশান্তির কারণ।
দান ও সদকা প্রদানের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যধিক আগ্রহের কথা আমরা জানি। এমনকি ইন্তেকালের আগমুহূর্তে মুমূর্ষু অবস্থায় বিছানায় শায়িত থেকেও তিনি দানের কথা চিন্তা করেছেন! অন্যের প্রয়োজনে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দানশীলতার যে অনুপম দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তাঁর কাছাকাছিও কোনো উপমা নেই। এ প্রসঙ্গে উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুস্থতা বেড়ে গেল। প্রায়ই বেহুঁশ হয়ে পড়ছিলেন। এ সময় আমাদের ঘরে সাতটি বা নয়টি দিনার জমা ছিল। তিনি বললেন, 'হে আয়েশা, ওই স্বর্ণমুদ্রাগুলো কী করেছ?' আমি বললাম, 'আমার নিকটে আছে।' তিনি বললেন, 'সেগুলো সদকা করে দাও।'
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. বলেন, কাজের ব্যস্ততায় আমি সদকা করতে ভুলে যাই। পরে তিনি পুনরায় আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আয়েশা, ওই স্বর্ণমুদ্রাগুলো কী করেছ?' আমি বললাম, 'আমার নিকটে আছে।' তিনি বললেন, 'সেগুলো আমার নিকটে নিয়ে এসো।'
হজরত আয়েশা রা. বলেন, আমি স্বর্ণমুদ্রাগুলো নিয়ে এসে তাঁকে দিলাম। তিনি সেগুলো হাতে নিলেন। অতঃপর বললেন, 'মুহাম্মাদের জন্য কি এটি শোভা পায় যে, সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে অথচ এগুলো তাঁর কাছে রয়ে যাবে? (৬২)
এ সময় সেখানে হজরত উম্মে সালামা রা.(৬৩) প্রবেশ করলেন। তিনি দেখলেন তাঁর চেহারা খুবই বিষণ্ণ। তিনি ভাবলেন, হয়তো রোগের তীব্রতায় এমনটা হয়েছে। এরপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনার মুখ এমন মলিন কেন?’
তিনি বললেন, 'এই সাতটি দিনারের জন্য, যা গতকাল আমার নিকট এসেছে। আমি রাত্রযাপন করেছি অথচ এটা আমার বিছানার পাশে ছিল।' (৬৪)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘এগুলো আমার নিকট এসেছে অথচ এখন পর্যন্ত তা দান করতে পারিনি।' (৬৫)
সুন্দর হয়, যদি বদান্যতা ও দানশীলতার আরেকটি চমৎকার ঘটনা দিয়ে আমাদের এই পরিচ্ছেদের ইতি টানি। ঘটনাটি ছিল হুনাইনের যুদ্ধের সময়ের। এই যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিরা প্রচুর গনিমত অর্জন করেছিলেন। হুনাইন থেকে ফেরার পথে রাসুলের সাথে ছিলেন হজরত জুবাইর ইবনে মুতইম রা.। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনাইনের ময়দান থেকে ফিরে আসছিলেন, তখন আমিও তাঁর সাথে ছিলাম। বেদুইন লোকেরা তাঁর কাছে গনিমতের সম্পদ চাইতে এসে তাঁকে ঠেলতে ঠেলতে একটি বাবলা গাছের সাথে ঠেকিয়ে দিলো এবং গাছের কাঁটায় তাঁর চাদর আটকে গেল। সেখানে তিনি থেমে গেলেন। তারপর বললেন, 'আমার চাদরখানি দাও। আমার নিকট যদি এ সকল কাঁটাদার বন্য বৃক্ষের সমপরিমাণ পশুও থাকত, তবুও সেগুলো আমি তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দিতাম। তোমরা আমাকে কখনো কৃপণ, মিথ্যাবাদী এবং দুর্বলচিত্ত পাবে না।' (৬৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো নিজের জন্য কোনো সম্পদ গচ্ছিত রাখতেন না। সৈন্যবাহিনীর মাঝেও কিছু বিতরণ করতেন। কিন্তু সেই বিতরণের সময় তাদেরকেও তিনি ভালোভাবে সতর্ক করে বলতেন 'দেখো, এ সকল সম্পদ নিছক একটা উপলক্ষ্য ও উপকরণ, কিছুতেই এগুলো চূড়ান্ত কোনো লক্ষ্য নয়।'
বাস্তবেই সম্পদ সব সময় নবীজির নিকট তুচ্ছ উপলক্ষ্যই মনে হয়েছে। এ কারণে সম্পদগুলো তিনি মক্কার বড় বড় নেতাকে আকৃষ্ট করার জন্য এবং তাদের ইসলামগ্রহণে আগ্রহী করে তোলার জন্য ব্যবহার করেছেন। যেমন আবু সুফিয়ান, হাকিম ইবনে হিজাম, হারেস ইবনে হিশাম (আবু জাহালের ভাই), নুজায়ের ইবনে হারেস (কুরাইশের কুখ্যাত দুষ্টলোক ও নবীজির প্রতি প্রচণ্ড বিদ্বেষ পোষণকারী নজর ইবনে হারিসের ভাই) প্রমুখ ব্যক্তিদের ইসলামগ্রহণে আগ্রহী করে তুলতে নবীজি অনেক সম্পদ ব্যয় করেছেন। একইভাবে আরবের কিছু বড় নেতাকেও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য তিনি সম্পদ খরচ করেছেন। যেমন বনু ফাজারার নেতা উয়াইনা ইবনে হাসান, বনু তামিমের নেতা আকরা ইবনে হাবিস। (৬৭) এ সকল ব্যক্তির প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদারতা ও দানশীলতা তাদের অন্তরে ইসলামের বীজ বপন করেছিল এবং এটা হয়েছিল তাদের ইসলামগ্রহণের অন্যতম উপলক্ষ্য।
অবশ্য পরে তারাও প্রকৃত মুসলমান হিসেবে গড়ে উঠেন। সম্পদের মোহ পরিত্যাগ করেন। তাদের অবস্থা সম্পর্কে হজরত আনাস রা.-এর এই উক্তিটি ছিল যথার্থ। তিনি বলেন, এ সময় কোনো ব্যক্তি যখন প্রথম ইসলামগ্রহণ করত, তখন শুধু দুনিয়ার উদ্দেশ্যেই ইসলামগ্রহণ করত। প্রকৃতপক্ষে (আন্তরিকতা নিয়ে) ইসলামগ্রহণ করত না। কিন্তু (ক্রমশ ইসলাম তাদের অন্তরে বদ্ধমূল হলে) অবশেষে দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় সম্পদ থেকে ইসলামই হয়ে উঠত তার নিকট অধিকতর প্রিয়। (৬৮)
ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহসিকতা ও বীরত্ব
কুরআনুল কারিম মুমিনদের সব সময় সাহসী হতে উৎসাহিত করেছে। কুরআনুল কারিমের আয়াতগুলোই হলো সেই উৎসারিত ঝরনাধারা, যার স্রোতধারা থেকেই মুসলিম উম্মাহ পান করে সাহসিকতার পানি। এ কারণে আল্লাহ তাআলা এই উম্মত ও তাঁর রাসুলকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ الَّذِيْنَ يَشْرُوْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ وَمَنْ يُقَاتِلُ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ فَيُقْتَلُ أَوْ يَغْلِبُ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
সুতরাং যারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবনকে বিক্রি করে, তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করুক। যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে, অতঃপর নিহত বা জয়যুক্ত হবে (সর্বাবস্থায়), আমি তাদেরকে মহা পুরস্কার দান করব। [সুরা নিসা : ৭৪]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের সকল কথা এবং কাজ ছিল বীরত্বের উচ্চতম নিদর্শন। আমরা যদি তাঁর জীবনচরিতের দিকে অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিই, তাহলে দেখতে পাব, জীবন চলার পথে যেকোনো পরিস্থিতি কিংবা যেকোনো বিপদে তিনি ছিলেন দৃঢ় মনোবলের অধিকারী, প্রবল বিশ্বাসী এবং অসীম সাহসের অধিকারী। এজন্যই আল্লাহ তাআলা তাঁর উদ্দেশে বলেন,
فَقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا تُكَلِّفُ إِلَّا نَفْسَكَ وَحَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ
(হে নবী) আপনি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করুন। আপনার ওপর আপনার নিজের ছাড়া অন্য কারও দায়ভার নেই এবং মুমিনদের উৎসাহ দিতে থাকুন। [সুরা নিসা : ৮৪]
শৈশব থেকেই এ ধরনের বীরত্ব ও সাহসিকতা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উন্নত চরিত্রের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল। যার নমুনা হিসেবে আমরা দেখতে পাই, তিনি তাঁর চাচাদের সাথে ‘ফিজার’ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, যখন তাঁর বয়স পনেরোও পেরোয়নি।(৬৯) এ ছাড়া নির্জন মরুভূমির সুউচ্চ পর্বতের হেরা গুহায় দীর্ঘদিন তিনি একাকী অবস্থান করেছেন।(৭০) এ কারণে নবুয়ত-পরবর্তী সময়ের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর যে বীরত্বের প্রকাশ ঘটেছে, তাতে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই। সাহসিকতা ছিল তাঁর স্বভাবজাত। আর এগুলো নিছক কোনো কথার কথা নয়, বরং তাঁর জীবনজুড়ে এর অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। কোনো ধরনের দ্বিধা, সংকোচ ও ভীরুতা ছাড়া তিনি সারাজীবন অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। যেমন ইসলামি দাওয়াতের শুরুলগ্নেই তিনি মুশরিকদের বিভিন্ন বাধার মুখোমুখি হন। তিনি তাদের এমন বিষয়ের দাওয়াত দেন যা ছিল তাদের নিকট খুবই অপছন্দের। এজন্য তারা এটা গ্রহণ করতে এবং মেনে নিতে রাজি হয়নি। তারা নতুন এই আহ্বানের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে। তবে তাদের এই বাধা ও ভীতিপ্রদর্শন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াতের রাস্তা থেকে সামান্যতমও বিরত রাখতে পারেনি। এর মাধ্যমে তিনি উম্মতের সামনে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সেটা হলো, দৃঢ় সাহসিকতার সাথে, সাধ্যের সবটুকু শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রকাশ্যে বাতিলের সামনে সত্যের আওয়াজকে তুলে ধরতে হবে, যদিও শত্রুপক্ষ সত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং সর্বশক্তি ব্যয় করে সত্যকে প্রতিহত করতে চায়।
জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসীম সাহসিকতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে জুলুম প্রতিহত করার ক্ষেত্রে। কোনো ধরনের ভয় বা দ্বিধা ছাড়াই তিনি জালেমের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। তিনিই আমাদের সেই নবী, যিনি অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং অত্যাচারীকে প্রতিহত করে অত্যাচারিতের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন। যেমন ইবনে হিশাম রহ. বলেন, ইরাশ গোত্রের এক ব্যক্তি উট বিক্রির উদ্দেশ্যে মক্কায় এলে আবু জাহেল তা ক্রয় করে। কিন্তু দাম পরিশোধে সে টালবাহানা শুরু করে। নিরুপায় হয়ে সেই ইরাশি লোক কুরাইশদের একটি সভাস্থলে এসে উপস্থিত হয়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সেখানে মসজিদের একপাশে বসেছিলেন। ইরাশি লোকটি তাদেরকে বলল, 'হে কুরাইশরা, তোমাদের মধ্যে কেউ আছে কি, যে আবু জাহেলের নিকট থেকে আমার উটের দাম আদায় করে দেবে? আমি একজন বিদেশি মুসাফির। সে আমার অধিকার (মূল্য) আদায়ে গড়িমসি করছে।'
তখন মজলিসের লোকেরা তাকে বলল, 'তুমি কি ওই বসা লোকটি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে দেখতে পাচ্ছ? তুমি তার কাছে যাও। সে আবু জাহেল থেকে তোমার পাওনা আদায় করে দেবে।'
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু জাহেলের মধ্যকার শত্রুতার কথা জানত বলেই তারা মজা করার জন্য এমনটি বলেছিল।
ইরাশি লোকটি নবীজির সামনে এসে বলল, 'হে আল্লাহর বান্দা, আবু জাহেলের কাছে আমার কিছু পাওনা রয়েছে, কিন্তু আমাকে দুর্বল পেয়ে সে তা আদায়ে গড়িমসি করছে। আমি একজন বিদেশি মুসাফির। আমি ওই মজলিসের লোকদের নিকট তার থেকে আমার হক আদায়ের ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা আপনাকে দেখিয়ে দিয়েছে। আপনি আমার পাওনা আদায় করে দিন, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটির কথা শুনে বললেন, 'তার কাছে চলো।'
এ কথা বলে তিনি নিজেও লোকটির সাথে চললেন। এটা দেখে মজলিসের লোকেরা একজনকে বলল, 'তুমি তাঁর অনুসরণ করো আর সে কী করে দেখে এসো।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে বের হয়ে সোজা আবু জাহেলের বাড়ি এসে উপস্থিত হলেন এবং তার দরজার কড়া নাড়লেন।' সে ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করল, 'কে?'
নবীজি বললেন, 'আমি মুহাম্মাদ। বাইরে আসুন।'
আবু জাহেল বাইরে বেরিয়ে এলো। এ সময় ভয়ে-আতঙ্কে তার মুখ ছিল বিবর্ণ। প্রাণ যেন বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'আপনি এই লোকটির পাওনা দিয়ে দিন।'
আবু জাহেল বলল, 'হ্যাঁ, একটু দাঁড়াও, আমি এখনই তার পাওনা দিয়ে দিচ্ছি।' এই বলে সে ভেতরে চলে গেল এবং লোকটির পাওনা এনে তাকে দিয়ে দিলো। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এলেন এবং ইরাশি ব্যক্তিকে বললেন, 'তুমি এবার নিজের কাজে চলে যাও।'
ইরাশি ব্যক্তিটি আবার সেই মজলিসে গিয়ে হাজির হলো এবং তাদের লক্ষ্য করে বলল, 'আল্লাহ তাআলা তাঁকে (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে) উত্তম বিনিময় দিন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার পাওনা আদায় করে দিয়েছেন।'
এদিকে কুরাইশদের প্রেরিত সেই লোকটিও ফিরে এলো। তারা জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কী দেখলে বলো?'
লোকটি বলল, 'আমি আজ এক বিস্ময়কর বিষয় প্রত্যক্ষ করেছি। আল্লাহর কসম! তিনি গিয়ে শুধু আবু জাহেলের দরজায় করাঘাত করলেন, তখন আবু জাহেল বেরিয়ে এলো। ভয়ে তার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। মুহাম্মাদ তাকে বললেন, এই লোকটির পাওনা দিয়ে দিন। আর সে বলল, একটু দাঁড়াও, এক্ষুনি তার পাওনা দিয়ে দিচ্ছি। এই বলে সে ভেতরে গেল এবং তার পাওনা এনে তাকে দিয়ে দিলো।'
একটু পরে আবু জাহেল নিজেও সেই মজলিসে এসে উপস্থিত হলো। তখন মজলিসের লোকেরা তাকে তিরস্কার করে বলল, 'আপনার কী হলো? আল্লাহর কসম! আজ যা করলেন, আমরা কখনো আপনাকে এমন করতে দেখিনি।'
আবু জাহেল বলল, 'ধিক তোমাদের! আল্লাহর কসম! সে গিয়ে যখন আমার দরজায় করাঘাত করল এবং আমি তার সামনে বেরিয়ে এলাম, দেখলাম তাঁর মাথার ওপর একটি ভয়ানক উট দাঁড়িয়ে আছে। উটটির মাথা বৃহদাকার, কাঁধ চওড়া এবং দাঁতগুলো ধারালো। এমন ভয়ংকর উট আমি আগে কখনো দেখিনি। আল্লাহর কসম! তখন আমি যদি তার পাওনা পরিশোধ করতে অস্বীকার করতাম, তবে সেই উট আমাকে আস্ত গিলে ফেলত। (৭১)
একইভাবে তাঁর পরিবার এবং সাহাবিদের বিপদের সময়ও তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত সাহসিকতার স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে। এ বিষয়ে হজরত আনাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে সাহসী এবং সবচেয়ে দানশীল। এক রাতে মদিনাবাসী এক বিকট শব্দ শুনে ঘাবড়ে গেল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু তালহা রা.-এর জিনবিহীন ঘোড়ায় চড়ে তরবারি ঝুলিয়ে সেখানে পৌঁছে গেলেন। তিনি তখন লোকদের লক্ষ্য করে বলছিলেন, 'তোমরা ভীত হয়ো না, তোমরা ভীত হয়ো না।' অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি এটাকে দ্রুতগামী পেয়েছি।' (অর্থাৎ এটি একটি দ্রুতগামী ঘোড়ার আওয়াজ ছিল।) (৭২)
যুদ্ধের ময়দানেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতার অনুপম দৃষ্টান্ত ও আদর্শ রেখে গেছেন। তাঁর বীরত্ব ছিল আলোকিত মশালের ন্যায়। পরবর্তী সময়ে সাহাবায়ে কেরাম যার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে হজরত আলি রা. বলেন, যখন যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত, একদল অন্যদলের ওপর তীব্র গতিতে আক্রমণ করত, আমরা তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে চিন্তিত থাকতাম (না জানি তাঁর কোনো ক্ষতি হয়ে যায়)! কেননা, তাঁর চেয়ে শত্রুবাহিনীর অধিক নিকটে আমাদের মধ্যে আর কেউ যেত না। (৭৩)
উহুদ যুদ্ধের সংকটময় মুহূর্তে শত্রুবাহিনীর তীব্র আক্রমণের ফলে মুসলমানরা যখন সাময়িক পরাজয়ের মুখে আপতিত হয়, তখনও আমরা তাঁকে নির্ভীক ও সাহসী দেখতে পাই। তিনি তখনও মুশরিক নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিলেন। এ সময় উবাই ইবনে খালফ ময়দানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্ধান পেয়ে তাঁর নিকট এগিয়ে এসে বলল, 'হে মুহাম্মাদ, আজ তুমি বেঁচে গেলে আমার আর রক্ষা নেই।' তখন মুসলমানরা জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কেউ কি তার দিকে অগ্রসর হব?'
নবীজি বললেন, 'তাকে তার অবস্থায় ছেড়ে দাও (অর্থাৎ তাকে আসতে দাও)।'
এরপর উবাই ইবনে খালফ যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছাকাছি চলে এলো, তখন নবীজি হারেস ইবনে সিমমা রা. থেকে একটি বর্শা নিয়ে এমন শক্তিমত্তার সাথে ঝাঁকুনি দিলেন যে, আমরা চারদিকে এমনভাবে ছিটকে পড়লাম, ভীমরুলের ঝাঁক যেমন উটের তাড়া খেয়ে উটের পিঠ থেকে উড়ে যায়। এরপর তিনি উবাই ইবনে খালফের দিকে অগ্রসর হলেন এবং তার ঘাড়ে আঘাত হানলে সে ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ে এবং মাটিতে কয়েকবার গড়াগড়ি খায়। অবশেষে মক্কায় ফেরার পথে মারা যায়। (৭৪)
হজরত মিকদাদ ইবনে আমর রা. উহুদ যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃঢ়তা ও সাহসিকতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, সেই সত্তার কসম! যিনি তাঁকে সত্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন! তিনি যুদ্ধ করতে করতে শত্রুবাহিনীর এত নিকটে পৌঁছে যেতেন যে, তাঁর এবং শত্রুর মাঝে মাত্র এক বিঘতের ব্যবধান থাকত। তিনি একেবারে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে যেতেন। সাহাবিরাও যুদ্ধ করতে করতে একসময় তাঁর নিকটে পৌঁছে যেত, আবার তাঁর থেকে দূরে সরে যেত। আমি তাঁকে দেখতাম, তিনি কখনো দাঁড়িয়ে ধনুক থেকে তির নিক্ষেপ করছেন। আবার কখনো পাথর নিক্ষেপ করছেন। ফলে কাফেররা দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আপন স্থানে) অবিচল আছেন। যেমন তিনি তার সাথে যুদ্ধের কষ্ট সহ্যকারী বাহিনীর মাঝে অবিচল থাকতেন। (৭৫)
এ ছাড়া হুনাইনের যুদ্ধের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, মানব সভ্যতার ইতিহাসে তা এক উজ্জ্বল সাহসিকতার দৃষ্টান্ত হিসেবে রয়ে যাবে।
[মানচিত্র নং-১ হুনাইন যুদ্ধ (৮ হিজরি)]
এটা তখন ঘটেছিল, যখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সৈন্যবাহিনী পিছু হটতে লাগল। তখন তিনি নিজের বাহন থেকে নিচে নামলেন এবং (আল্লাহর কাছে) দোয়া করে সাহায্যের প্রার্থনা করলেন। আর বলতে থাকলেন,
«أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِب... أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِب»
আমি যে নবী, তা মিথ্যা নয়, আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।
এবং তিনি দোয়ার মধ্যে বলতে লাগলেন, اَللَّهُمَّ نَزَّلْ نَصْرَكَ — হে আল্লাহ, তুমি তোমার সাহায্য নাজিল করো।(৭৬)
সেদিন যুদ্ধের ময়দানে তাঁর চেয়ে দৃঢ় এবং শত্রুর অধিক নিকটবর্তী আর কাউকে দেখা যায়নি। (৭৭) শত্রুবাহিনীর মোকাবিলায় তিনি সেদিন তাদের সামনে একাই দৃঢ়পদ ছিলেন। তিনি জমিন থেকে একমুষ্টি ধুলামাটি তুলে নিলেন, এরপর شَاهَتِ الوجوه — 'তোমাদের মুখ কালো হোক'(৭৮) বলে তা শত্রুদের দিকে নিক্ষেপ করলেন। তারপর শত্রুদের কেউ তাঁর সামান্যতম ক্ষতিও করতে পারেনি। (৭৯)
আমরা আরও দেখি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে সকল প্রকার ভীরুতা ও কাপুরুষতা থেকে আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। কেননা দুনিয়ার হায়াত, রিজিক এবং সমগ্র বিশ্বজগৎ— সবকিছুই আল্লাহর কুদরতি হাতের নিয়ন্ত্রণে। তিনি যেভাবে ইচ্ছা পরিবর্তন করতে পারেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করতেন,
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ ...» হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি কাপুরুষতা এবং কৃপণতা হতে...।(৮০)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে জীবনের সকল ক্ষেত্রেই সাহসিকতার শিক্ষা দিতেন। সত্যকথন থেকে শুরু করে জিহাদের ময়দান পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই। সাহসিকতা প্রদর্শনের এ সকল বিষয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো জুলুমের প্রতিবাদ। এজন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَفْضَلُ الْجِهَادِ كَلِمَةُ عَدْلٍ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ» স্বৈরাচারী বাদশার সামনে ন্যায়সংগত কথা বলা হলো সর্বোত্তম জিহাদ। (৮১)
এ ছাড়া জিহাদের ফজিলত এবং নিজের জান ও সম্পদ নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার ফজিলত সম্পর্কে তিনি বলেন, لَغَدْوَةُ فِي سَبِيلِ اللهِ أَوْ رَوْحَةٌ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا আল্লাহর রাস্তায় একটি সকাল বা একটি বিকাল অতিবাহিত করা দুনিয়া ও তাতে যা কিছু আছে, তা থেকে উত্তম। (৮২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল সাহসিকতার গুণে গুণান্বিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর সাহসিকতার মধ্যে কোনো আক্রমণাত্মক দিক কিংবা অদূরদর্শিতা ছিল না, বরং তাঁর সাহসিকতা ছিল প্রখর বুদ্ধিমত্তা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমরা তায়েফ দুর্গের অবরোধ নিয়ে তাঁর গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়টি লক্ষ করতে পারি। এই অবরোধ স্থায়ী হয়েছিল চল্লিশ দিনেরও বেশি সময়। এর মাঝে তিনি জানতে পারলেন, দুর্গে যে খাদ্য ও পানীয় মজুদ আছে, তা তাদের পুরো এক বছর কিংবা কয়েক বছরের জন্য যথেষ্ট হবে। তখন আমাদের এই সাহসী নবী ও সেনাপতি অবরোধ অব্যাহত রাখার সম্ভাব্য ক্ষতি ও লাভ সম্পর্কে একটি জরিপ করলেন। তিনি ভেবে দেখলেন, এই স্থানে তার দীর্ঘদিন অবরোধ ও অবস্থানের মাঝে তায়েফবাসীর চেয়ে ইসলামি রাষ্ট্রের ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি। কারণ, ইসলামি শক্তি বা বাহিনী তো নিছক একটি ইসলামি সৈন্যবাহিনীর দল বা অংশ নিয়ে গঠিত নয়; বরং পুরো ইসলামি সমাজ মিলেই তার বাহিনী। অথচ মদিনায় নারী এবং ঘরবাড়ি পাহারার জন্য খুবই অল্পসংখ্যক পুরুষ রেখে আসা হয়েছে। তাই এখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করলে মদিনায় ইহুদি ও মুশরিকদের আক্রমণের ভয় রয়েছে। এ কারণে বলা যায়, অবরোধ উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে নবীজি একটি দূরদর্শী ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। (৮৩)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহসিকতা ছিল দয়া ও অনুগ্রহের গুণেও গুণান্বিত। তিনি তার শক্তি ও সাহসিকতা ব্যবহার করেছেন শুধু জিহাদের ময়দানে। আল্লাহ তাআলার দ্বীনকে সমুন্নত করার জন্য। তিনি কখনো নিজের জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। যুদ্ধের ময়দান ব্যতীত নিজ হাতে কাউকে কোনোদিন আঘাত করেননি। যেমনটি হজরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনোদিন কাউকে নিজ হাতে আঘাত করেননি। এমনকি তাঁর কোনো স্ত্রী ও খাদেমকেও না। কেবল আল্লাহর পথে জিহাদের ক্ষেত্র ছিল এর ব্যতিক্রম। এ ছাড়া নবীজির ওপর (ব্যক্তিগতভাবে) কোনো আঘাত এলে, তিনি প্রতিপক্ষ থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। হ্যাঁ, আল্লাহর কোনো বিধানকে লঙ্ঘন করা হলে, তিনি কেবল আল্লাহর জন্যই দণ্ড প্রয়োগ করতেন। (৮৪)
এমনটাই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহসিকতা, যা প্রতিষ্ঠিত ছিল দৃঢ় বিশ্বাস, উত্তম চরিত্র এবং ন্যায়নিষ্ঠার ওপর। এ কারণে বীরত্ব ও সাহসিকতার ক্ষেত্রে সকল প্রজন্মের জন্য এটা সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং অনুসরণীয় আদর্শ। জগতে তাঁর সাহসিকতার চেয়ে মহৎ কোনো সাহসিকতা নেই!
***
টিকাঃ
১. আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি: ২০৫৭১
১০. শিহাবুদ্দিন আলুসি রহ, রচিত রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআনিল আজিম: ২৯/২৫। (ঈষৎ পরিমার্জিত)
১১. ওমানের বাদশাহ। তার কাছেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের দাওয়াত দিতে দূত হিসেবে হজরত আমর ইবনে আসকে পাঠিয়েছিলেন। দেখুন, আল-ইসাবা: ১/৫৩৮।
১২. কাজি ইয়াজ: আশ-শিফা: ১/২৪৮।
১৩. মুহাম্মাদ সাদেক আরজুন (محمد الصادق عرجون) : মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ: ১/২১১, ২১২।
১৪. ফিরিস্তি হুস্কে: শামসুল আরাব তাসতায়ু আলাল গারব: ৪৬৫।
১৫. সহিহ মুসলিম: ৭৪৬, মুসনাদে আহমাদ: ২৪৩১৪, সুনানে দারেমি: ৬২৯
১৬. তাফসিরে তাবারি: ১৮/১৫৭, তাফসিরে কুরতুবি: ১২/১১৪।
১৭. আস-সিরাতুল হালাবিয়্যা: ২/১৫৬।
১৮. সুনানে তিরমিজি: ২৬১২, মুসনাদে আহমাদ: ২৪২৫০, ২৪৭২১।
১৯. আবু নুয়াইম ইস্পাহানি: মারিফাতুস সাহাবাহ: ৩/১৫০৯।
২০. স্যার উইলিয়াম ম্যুর (William Muir : ১৮১৯-১৯০৫ খ্রি.)। তিনি একজন ইংরেজ ঐতিহাসিক ও প্রাচ্যবিদ। ইসলাম নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচার-আচরণ ও আখলাক নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন। এডিনবার্গ এবং গ্লাসগো ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং পরে এডিনবার্গ ইউনিভার্সিটির প্রিপিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
২১. হায়াতু মুহাম্মাদ: উইলিয়াম ম্যুর। তার থেকে এটি উদ্ধৃত করেছেন সাইদ হাউওয়া। তার কিতাব: আর-রাসুল: ১৪৭।
২২. আস-সুনানুল কুবরা লিল-বাইহাকি : ১২৪৭৭, ইবনে কাছির: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ৯/২/১-৫৯; আল্লামা তাবারি: তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক : ১/৫৬৯।
২৩. সহিহ বুখারি: ৪৭৭০, সহিহ মুসলিম : ৫০৮।
২৪. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা (السيرة النببية) : ১/২৯৯-৩০০, সুহাইলি (السهیلی) : আর-রওজুল উনুফ (الروض الأنف) : ৩/৬৮, ইবনে সাইয়েদিন নাস (ابن سید (الناس : উয়ুনুল আছার (عيون الأثر) : ২/৪২৭।
২৫. ইবনে আশুর (ابن عاشور) : আত-তাহরির ওয়াত-তানবির (التحرير والتنوير) : ২৪/৮৬
২৬. সহিহ মুসলিম: ২৬০৭, সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৮৯, সুনানে তিরমিজি: ১৯৭১, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৮৪৯।
২৭. মুসনাদে আহমাদ: ২২৮০৯, ২২৭৫৭; সহিহ ইবনে হিব্বان: ২৭১।
২৮. সুনানে তিরমিজি: ২৫১৮, ২৫২০; মুসনাদে আহমাদ: ১৭২৩, সুনানে নাসায়ি: ৭২৭৫।
২৯. সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৯৮, মুসনাদে আহমাদ: ১৩৮৪৪।
৩০. ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৩৯৬, ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৬১৫, সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ : ৫/৭৩, ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার ১/৩২৯।
৩১. সহিহ বুখারি: ২৩০৭, সুনানে আবু দাউদ: ২৬৯৩, ২৬৮৪; মুসনাদে আহমাদ: ১৮৯৩৪।
৩২. থমাস কার্লাইল মুসলমানদের এই জনসংখ্যা উল্লেখ করেছিলেন তার গ্রন্থ আল-আবতাল প্রকাশের সময়ের হিসেবে। কিন্তু এখন, ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যা ১.৩ বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। এর জন্য দেখুন, আরবি সংবাদপত্র 'আশ-শারকুল আওসাত'-এর ওয়েবসাইট : www.asharqalawsat.com। (বর্তমান ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে www.worldpopulationriview.com-এর তথ্যমতে মুসলমানদের সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ১.৯ বিলিয়নে। শিয়া-কাদিয়ানি ইত্যাদিসহ কাদিয়ানি ছাড়া ১.৫ বিলিয়ন। অনুবাদক)
৩৩. থমাস কার্লাইল: আবতাল: ৪৩।
৩৪. সুনানে দারেমি: ১৫, মুসতাদরাকে হাকেম: ১০০।
৩৫. সহিহ বুখারি: ৬৪৮৩, ৬০৩৯; সহিহ মুসলিম: ৬০৯৫।
৩৬. সহিহ বুখারি: ১২৮৪, সহিহ মুসলিম: ৯২৩।
৩৭. সুনানে তিরমিজি: ১৯১৯, ১৯২৫; মুসনাদে আহমাদ: ৬৭৩৩, আল-আদাবুল মুফরাদ লিল শিরি: ৩৫৮।
৩৮. সহিহ বুখারি: ১৯৩৬, ১৮১২; সহিহ মুসলিম: ১১১১।
৩৯. সহিহ বুখারি: ৭০৪, ৬৬৩; সহিহ মুসলিম: ৪৬৬।
৪০. তার নাম সাফফানাহ বিনতে হাতিম তায়ি। তার পিতা ছিলেন আরবের বিখ্যাত দানবীর হাতিম তায়ি। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন, ইবনুল আছির: উসদুল গাবাহ : ৬/১৪৬, ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা: জীবনী নং: ১১২৯১।
৪১. আল্লামা তাবারি : তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক: ২/১৮৮, ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৫/২৭৬, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৪/১২৩, ১২৪।
৪২. সহিহ বুখারি: ৩৩২১, সহিহ মুসলিম: ২২৪৫।
৪৩. সুনানে নাসায়ি : ৪৪৪৬, মুসনাদে আহমাদ : ১৯৪৮৮, ১৯৪৭০; সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫৯৯৩।
৪৪. সহিহ মুসলিম: ১৮২৭, সুনানে নাসায়ি : ৫৩৭৯, মুসনাদে আহমাদ: ৬৪৮৫, মুসতাদরাকে হাকেম: ৭০০৬।
৪৫. হিলফ শব্দের অর্থ অঙ্গীকার আর ফুজুল অর্থ মজলুমের প্রাপ্য অধিকার। সুতরাং হিলফুল ফুজুল অর্থ মজলুম ও অত্যাচারিতের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার।-সম্পাদক
৪৬. সহিহ বুখারি: ৬৭৮৮, সহিহ মুসলিম: ১৬৮৮।
৪৭. সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৩৬, সুনানে তিরমিজি: ১৩০৫, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২২০।
৪৮. সহিহ বুখারি: ১১৩৮, সহিহ মুসলিম: ১০৬৩, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৭২, মুসনাদে আহমাদ : ১৪১৫১।
৪৯. সহিহ বুখারি: ১১৩৮, ৫২২৫; সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৬৭, মুসনাদে আহমাদ: ১২০৪৬।
৫০. পুরো নাম আশআস ইবনে কায়েস আল-কিন্দি। নবুয়তের দশম বছরে তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রতিনিধি হিসেবে আগমন করেন। তিনি ছিলেন 'কিন্দাহ' গোত্রের প্রধান। রাসুলের ইনতেকালের পর তিনি মুরতাদ হয়ে যান। অবশ্য এরপর আবার তিনি ইসলামে ফিরে আসেন। তখন আবু বকর সিদ্দিক রা. তার সাথে নিজের বোনের বিবাহ দেন। তিনি কাদেসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সিফফিনের যুদ্ধের সময় তিনি আলি রা.-এর সঙ্গে ছিলেন। হজরত আলি রা.-এর হত্যার চল্লিশ দিন পর তিনি ইনতেকাল করেন। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন, ইবনুল আছির : উসদুল গাবাহ: ১/৯৭। ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা: জীবনী নং: ২০৫।
৫১. সহিহ বুখারি: ২৩৫৭, ২৪১৭; সহিহ মুসলিম: ১৩৮, সুনানে আবু দাউদ: ৩২৪৩, সুনানে তিরমিজি: ২৩৯৬, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩২৩।
৫২. সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩২৩, মুয়াত্তা মালেক: ৮৪৪।
৫৩. সহিহ বুখারি: ৩, সহিহ মুসলিম: ১৬০।
৫৪. সহিহ বুখারি: ৬, সহিহ মুসলিম: ২৩০৮।
৫৫. সহিহ বুখারি: ১৪৪২, ১৩৫৮; মুসনাদে আহমাদ: ২৭২৯৪।
৫৬. সহিহ বুখারি: ৫৬৮৯, ১৯৮৭; সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৫৫৫, মুসনাদে আহমাদ : ২২৮৭৬।
৫৭. সহিহ বুখারি: ৬০৩৪, সহিহ মুসলিম: ২৩১১, সুনানে দারেমি: ৭০।
৫৮. সহিহ বুখারি: ৪১১, আস-সুনানুল কুবরা লিল-বাইহাকি: ১২৮০৭।
৫৯. সহিহ বুখারি: ৬০৭৯, ৬০০০。
৬০. সহিহ মুসলিম: ২৩১২, মুসনাদে আহমদ: ১২৮১৩, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৬৩৭৩।
৬১. মুসনাদে আহমাদ: ২৭০৬৫, শামায়েল তিরমিজি: ২০১।
৬২. সহিহ ইবনে হিব্বান: ৭১৫, মুসনাদে আহমাদ: ২৪৬০৪, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ৮/১৩৪, ১৩৫।
৬৩. তিনি হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া হুজাইফা ইবনুল মুগিরা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে মাখজুম। তিনি ছিলেন একজন কুরাইশি, মাখজুম গোত্রের। তিনি ছিলেন উম্মুল মুমিনিন অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন সম্মানিতা স্ত্রী। বিস্তারিত তথ্যের জন্য দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা: ৮/১৫০, জীবনী নং: ১১৮৪৫।
৬৪. মুসনাদে আহমাদ: ২৬৫৫৭, সহিহ ইবনে হিব্বان: ৫১৬০।
৬৫. মুসনাদে আহমাদ: ৬২৭১৪。
৬৬. সহিহ বুখারি : ২৯৭৯, ২৯২৭; সুনানে নাসায়ি: ৩৬৮৮, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৮৫
৬৭. ইবনুল আছির: উসদুল গাবাহ : ৪/২৮৬, তাফসিরে ইবনে আবু হাতেম: ৬/১৮২২, ১৮২৩, আল্লামা তাবারি : তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক: ২/১৭৫, ইবনে কাছির: আল-বিদায়া ওয়ান- নিহায়া: ৪/৩৬০।
৬৮. সহিহ মুসলিম: ২৩১২, ৫৮৪৯।
৬৯. ফিজার (الفجار) : এই যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির প্রায় ২০-২৫ বছর আগে। কুরাইশ ও তার মিত্রবাহিনী এবং হাওয়াজিন গোত্রের মাঝে এই যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। আবার এটি হয়েছিল পবিত্র মাসগুলোর মধ্যে। তারা যখন এই মাসগুলোতে যুদ্ধ করেছে, তখন তারাই বলেছে আমরা অপরাধ করছি। এ কারণে এটাকে বলা হয় فجار বা অপরাধের যুদ্ধ। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন, ইবনে কাছির : আল-বিদায়া ওয়ান- নিহায়া: ২/২৮৯, ২৯১।
৭০. ইবনে কাছির : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৩৮৫।
৭১. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৩৮৯, ৩৯১।
৭২. সহিহ বুখারি : ২৮২০, সহিহ মুসলিম : ২৩০৭, ৫৮৩৫; সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৮৮, সুনানে তিরমিজি: ১৬৮৭।
৭৩. মুসনাদে আহমাদ : ১৩৪৬, মুসতাদরাকে হাকেম : ২৬৩৩।
৭৪. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/৮৩।
৭৫. বাইহাকি : দালায়িলুন নুবুওয়া : ৩/২৪৬।
৭৬. সহিহ বুখারি : ২৮৬৪, সহিহ মুসলিম : ১৭৭৬, ৪৪৬৭; সুনানে তিরমিজি : ১৬৮৮।
৭৭. ইবনে সাইয়েদিন নাস : উয়ুনুল আছার: ২/৪২২, ইবনুল কাইয়িম : জাদুল মাআদ : ৩/৯০।
৭৮. সহিহ মুসলিম : ১৭৭৭, মুসনাদে আহমাদ : ২৭৬২।
৭৯. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৬২৮, সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ: ১/২২৮, ২২৯।
৮০. সহিহ বুখারি : ৬৩৬৭, সহিহ মুসলিম: ২৭০৬, সুনানে নাসায়ি : ৫৪৮১।
৮১. সুনানে আবু দাউদ: ৪৩৪৪, সুনানে তিরমিজি : ২১৭৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০১১।
৮২. সহিহ বুখারি : ২৭৯২, সহিহ মুসলিম: ১৮৮০।
৮৩. সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ: ২৫৫-২৬৬, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ৩/৬৫২-৭০৯।
৮৪. সহিহ মুসলিম : ২৩২৮, ৫৮৭৭。
📄 মানুষ হিসেবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচার-আচরণ ছিল এতটাই উচ্চ ও সমুন্নত যে, জগতের কেউ কখনো তাঁর সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে না। স্ত্রী, সন্তানসন্ততি ও নাতি-নাতনিদের সাথে তাঁর আচরণ যেমন আদর্শপূর্ণ ছিল, সাহাবিদের সাথেও তাঁর আচরণ ছিল তেমন অনুসরণীয়। সাহাবিদের সাথে তিনি এমনভাবে কথা বলতেন যে, তাঁর প্রভাব তাদের মেধা ও মস্তিষ্কে পৌঁছার আগেই তা হৃদয়ের গহিনে পৌঁছে যেত। এ কারণে সাহাবিরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসতেন। এভাবে সৈন্যদের সাথেও তাঁর আচরণ ছিল উত্তম ও আদর্শনিষ্ঠ। তিনি ছিলেন তাদের শিক্ষক এবং অভিভাবক, যিনি তাদের অন্তরে ও মস্তিষ্কে সুউচ্চ মূল্যবোধ রোপণ করে দিয়েছিলেন। মানুষের জ্ঞাত ইতিহাসের সকল রীতিনীতি ও মূল্যবোধের চেয়ে এগুলো ছিল আরও উন্নত এবং শ্রেষ্ঠতর। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচার-আচরণের এইসব অনন্য বৈশিষ্ট্যই তাঁর নবুয়তের সত্যতার প্রমাণ বহন করে। এই পরিচ্ছেদে কিছু শিরোনামের অধীনে তাঁর সেই অনন্য বৈশিষ্ট্যাবলি নিয়ে আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
প্রথম অনুচ্ছেদ
স্ত্রীদের সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ
আল্লাহ তাআলা মানুষের মধ্যে নারী ও পুরুষ সৃষ্টির ইচ্ছা করেছেন। এই দুই শ্রেণির মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন তাঁরই একটি রীতি ও নিদর্শন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য হতে স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে গিয়ে শান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও সহানুভূতি সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর ভেতর নিদর্শন আছে সেই সব সম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তাভাবনা করে। [সুরা রুম : ২১]
সুতরাং বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে শান্তি, স্বস্তি, ও ভালোবাসা অর্জন করা আল্লাহ তাআলার এক অপার নিদর্শন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৈবাহিক জীবন ছিল কুরআনুল কারিমের এই আয়াতগুলোর বাস্তব নমুনা। এ কারণে আমরা দেখতে পাই, তিনি তাঁর সাহাবিদের বারবার নিজেদের স্ত্রীর সাথে ভালো আচরণের উপদেশ দিতেন। স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণে উৎসাহ দিতেন, যাতে তাদের জীবনযাপন হয়ে ওঠে পবিত্র কুরআনের উক্ত আয়াত অনুপাতে পারস্পরিক প্রীতি, সহানুভূতি ও ভালোবাসাময়। এজন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي» তোমাদের মধ্যে উত্তম হলো সে, যে তার পরিবারের (স্ত্রীর) কাছে উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের (স্ত্রীর) কাছে উত্তম। (৮৫)
নিজ স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক চমৎকার দৃষ্টান্ত ও উপমা রয়েছে। আপনি তাঁকে দেখতে পাবেন যে তিনি স্ত্রীদের বিপদে সান্ত্বনা দিতেন, তাদের অশ্রু মুছে দিতেন। তাদের অনুভূতির মূল্যায়ন করতেন। তিনি তাদের কারও কথায় উপহাস করতেন না। বরং তাদের সকল অভিযোগ-অনুযোগ মন দিয়ে শুনতেন। তাদের দুঃখ-যাতনা লাঘবের চেষ্টা করতেন...। এভাবেই তিনি দাম্পত্যজীবনের সকল ক্ষেত্রে মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ স্থাপন করেছিলেন। ফলে তিনি ছিলেন এমন এক আদর্শ, যুগের পর যুগ মুসলিম পরিবারগুলো যার থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে সক্ষম। যেমন হজরত আনাস রা. বলেন, একবার হজরত সাফিয়া রা.-এর নিকট সংবাদ এলো যে, হজরত হাফসা রা. তাকে 'ইহুদির মেয়ে' বলেছেন। এতে হজরত সাফিয়া রা. অপমানিত বোধ করে কাঁদতে লাগলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তার নিকট এলেন, তখনও তিনি কাঁদছিলেন। নবীজি জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কাঁদছ কেন?'
সাফিয়া রা. বললেন, 'আমাকে হাফসা 'ইহুদির মেয়ে' বলেছেন।' নবীজি তখন তাঁকে বললেন, 'তুমি তো একজন নবীর কন্যা। তোমার চাচাও একজন নবী। আবার এখন তুমি একজন নবীর স্ত্রী। তাহলে কীভাবে সে তোমার ওপর গর্ব করতে পারে?'
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসা রা.-কে লক্ষ্য করে বললেন, 'হে হাফসা, তুমি আল্লাহকে ভয় করো।' (৮৬) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বামী হিসেবে কেমন ছিলেন— তার বর্ণনা দিতে গিয়ে হজরত আয়েশা রা. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজনের সময় নিজের জুতা নিজেই ঠিক করে নিতেন, নিজের কাপড়ে নিজেই তালি দিতেন। (৮৭)
স্ত্রীদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ ছিল সহানুভূতিপূর্ণ এবং ভালোবাসামিশ্রিত। তিনি স্ত্রীদের সাথে সাধারণ মানুষের মতোই স্বাভাবিক আচরণ করতেন। তিনি স্ত্রীদের কাজে সহযোগিতা করাকে নিজের জন্য অপমানজনক মনে করতেন না। তাই প্রয়োজনে স্ত্রীদের কাজে সহযোগিতা করতেন।
স্ত্রীদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার আরেকটি নিদর্শন হলো, তিনি তাদের সাথে একই পাত্রে খাবার খেতেন এবং একই পাত্রে পানি পান করতেন। যেমন উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. বলেন, আমি পানি পান করতাম এবং পরে নবীজির জন্য বাকিটুকু রেখে দিতাম। আমি পাত্রের যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতাম, তিনি পাত্রের সেখানেই মুখ লাগিয়ে পান করতেন। আমি হাড়ের যেখানে মুখ লাগিয়ে গোশত খেতাম, তিনিও সেখানে মুখ লাগিয়ে গোশত খেতেন। (৮৮)
ভালোবাসা বৃদ্ধির জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো স্ত্রীদের সাথে নিয়ে রাতের নির্জনে ভ্রমণে বা হাঁটতে বের হতেন। যেমন সহিহ বুখারির বর্ণনা রয়েছে, রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আয়েশা রা.-এর সাথে হাঁটাহাঁটি করতেন এবং খোশালাপ করতেন। (৮৯)
তিনি স্ত্রীদের অনেক প্রশংসা করতেন। যেমন আয়েশা রা.-এর প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, সকল নারীর ওপর আয়েশার মর্যাদা ঠিক তেমন, যেমন সকল খাদ্যের ওপর সারিদের (আরবদের প্রিয় খাবার) মর্যাদা (বেশি)। (৯০)
এমনইভাবে স্ত্রীদের প্রতি তাঁর মায়া-মমতা ও সহানুভূতিরও প্রকাশ ঘটেছে। যেমন একদিন তিনি হজরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা. (৯১)-এর ঘরে প্রবেশ করে দেখতে পেলেন, দুটি স্তম্ভের মাঝে একটি রশি ঝুলানো রয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'এ রশিটি কী কাজের?' তারা বলল, 'এটি যায়নাবের রশি, তিনি (নামাজ পড়তে পড়তে) অবসন্ন হয়ে পড়লে এটির সাথে নিজেকে আটকে রাখেন।'
এটা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'না, ওটা খুলে ফেলো। তোমাদের সকলের জন্যই প্রফুল্ল ও সজীব থাকা পর্যন্ত নামাজ পড়া উচিত। আর যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে, তখন বিশ্রাম নেবে।' (৯২)
স্ত্রীদের সাথে বিভিন্নপ্রকার আচরণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত ধৈর্যের পরিচয় দিতেন। তাদের ছোট ছোট দুষ্টুমিগুলোকে প্রশস্ত অন্তরে, প্রফুল্ল চিত্তে এবং ভালোবাসার সাথে গ্রহণ করতেন। যেমন একবার হজরত আবু বকর রা. এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। এই সময় তিনি ভেতর থেকে আয়েশা রা.-এর উচ্চ কণ্ঠ শুনতে পেলেন। আবু বকর রা. ভেতরে প্রবেশ করে আয়েশা রা.-কে চড় মারতে উদ্যত হলেন এবং বললেন, 'আমি কি লক্ষ করিনি তুমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলছ?'
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর রা.-কে নিবৃত্ত করলেন। এরপর আবু বকর রা. রাগান্বিত অবস্থায় কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন। আবু বকর রা. চলে যাওয়ার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রা.-কে (কৌতুকের ছলে) বললেন, 'দেখলে তো, আমি তোমাকে ওই লোকটার হাত থেকে কীভাবে রক্ষা করলাম!'
এই ঘটনার দীর্ঘদিন পর আবারও একদিন হজরত আবু বকর রা. এসে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন এবং ভেতরে এসে উভয়কে সন্তুষ্ট অবস্থায় পেয়ে বললেন, 'আজ আমাকেও তোমাদের শান্তির অংশীদার বানিয়ে নাও, যেমনটি তোমাদের আগেকার কলহে আমাকে অংশীদার বানিয়েছিলে।' তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমরা তাই করলাম... আমরা তাই করলাম।' (৯৩)
অনেক সময় স্ত্রীদের ছোট ছোট আত্মাভিমানের সময়েও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সহনশীলতার পরিচয় দিতেন। প্রত্যেক স্ত্রীকে তার উপযুক্ত মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করতেন। যেমন তিনি হজরত খাদিজা রা.-এর কথা বেশি বেশি বলতেন এবং তার প্রতি অনেক ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। এটা নিয়ে হজরত আয়েশা রা. প্রায়ই অভিমান করতেন। অথচ নবীজির সাথে আয়েশা রা.-এর বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার অনেক আগেই হজরত খাদিজা রা. ইনতেকাল করেছেন। এ ব্যাপারে হজরত আয়েশা রা. বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্য কোনো স্ত্রীর ব্যাপারে আমি এতটুকু ঈর্ষাবোধ করিনি, যতটুকু ঈর্ষাবোধ করেছি খাদিজা রা.-এর প্রতি; অথচ আমি কখনো তাকে দেখিনি। প্রায়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা আলোচনা করতেন। কখনো কখনো বকরি জবাই করে গোশত ছোট ছোট ভাগ করে খাদিজা রা.-এর বান্ধবীদের ঘরে পৌঁছে দিতেন। আমি কোনো কোনো সময় অভিমানের সুরে তাঁকে বলতাম, '(আপনার অবস্থাদৃষ্টে) মনে হয়, খাদিজা ব্যতীত পৃথিবীতে আপনার যেন আর কোনো স্ত্রীই নেই!' প্রতি-উত্তরে তিনি বলতেন, 'হ্যাঁ। সে এমন ছিল... সে তেমন ছিল। তার গর্ভেই আমার সন্তান জন্মেছিল।'(৯৪)
অবশ্য এটা বাস্তব যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো তাঁর স্ত্রীদের কোনো কোনো আচরণে ব্যথিত হয়েছেন, কিন্তু তাঁর জীবনে তিনি কখনো তাদের কাউকে প্রহার করেননি। যেমন হজরত আয়েশা রা. বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কাউকে নিজ হাতে প্রহার করেননি, তার কোনো স্ত্রীকেও না...।'(৯৫)
বরং স্ত্রীদের কেউ কখনো কোনো কারণে ব্যথিত হলে তিনি তাদেরকে সান্ত্বনা দিতেন। যেমন বর্ণনা করা হয়, একবার সাফিয়া রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এক সফরে বের হলেন। একসময় তার ঘোড়াটি আরোহী বহনে অক্ষম হয়ে পড়ল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়ার নিকটে গিয়ে দেখলেন তিনি কাঁদছেন। তিনি নবীজিকে বললেন, 'আপনি একটি অক্ষম ঘোড়ায় আমাকে আরোহী করেছেন!' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সাফিয়াকে কাছে টেনে নিজ হাতে তার চোখ মুছে দিলেন এবং সান্ত্বনা দিলেন..।(৯৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে স্ত্রীদেরকে অংশীদার করেছেন। উম্মতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করেছেন। জাতির বিভিন্ন সংকটময় মুহূর্তে স্ত্রীদের পরামর্শ নিয়েছেন। তেমনই একটি জটিল সময় উপস্থিত হয়েছিল হুদাইবিয়ার সন্ধির দিনে। হুদাইবিয়ার সন্ধিপত্র লেখা শেষ হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের বললেন, 'তোমরা ওঠো, কুরবানি করো এবং মাথা কামিয়ে ফেল।' কিন্তু সাহাবিদের কেউ এমনটা করল না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই কথা তিনবার বললেন। তবুও সাহাবিদের কেউ তৎক্ষণাৎ তাঁর আদেশের প্রতি সাড়া দিলেন না।
এভাবে তিনবার বলার পরও কারও সাড়া না পেয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁবুতে হজরত উম্মে সালামা রা.-এর কাছে এসে সাহাবিদের এই আচরণের কথা বললেন। উম্মে সালামা রা. বললেন, 'হে আল্লাহর নবী, আপনি যদি এটা চান, তাহলে এবার বাইরে যান। তাদের সাথে কোনো কথা না বলে আপনিই প্রথম আপনার উটটি কুরবানি করুন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুণ্ডন করে নিন।'
উম্মে সালামা রা.-এর পরামর্শ অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁবু থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং কারও সাথে কোনো কথা না বলে আগে নিজের পশু কুরবানি দিলেন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুণ্ডন করালেন। সাহাবিরা যখন এটা দেখলেন, তখন তারা সকলেই উঠে দাঁড়ালেন এবং তারাও নিজেদের পশু কুরবানি করলেন এবং একে অপরের মাথা কামিয়ে দিলেন। অবস্থা এমন হলো যে, ভিড় ও দ্রুততার কারণে একে অপরের ওপর যেন আছড়ে পড়তে লাগলেন। (৯৭)
দেখুন, এখানে অবস্থাটা ছিল অত্যন্ত জটিল। এ ক্ষেত্রেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের স্ত্রী উম্মে সালামা রা.-এর পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। আর এটা উম্মতের জন্য হয়েছিল কল্যাণকর ও বরকতময়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতের প্রতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণকারী ব্যক্তিমাত্রই দেখতে পাবে, তিনি স্ত্রীদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান করেছেন। অনন্য সহযোগিতা এবং পরম ভালোবাসা নিয়ে তিনি তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেছেন। স্ত্রীদের কাছে তিনি ছিলেন একজন অতি উত্তম স্বামী!
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
বংশধরদের সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ
পিতামাতা ও সন্তানসন্ততির সাথে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের একটি বাস্তবসম্মত মানদণ্ড রয়েছে। সেই মানদণ্ডটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে সন্তানদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পিতার ভালোবাসা, আদর-স্নেহ, সহানুভূতি, পরম যত্ন, বিশুদ্ধ পরিচর্চা এবং সঠিক প্রতিপালনের ওপর। সন্তানদের জন্য পিতা হলো একটি নিরাপদ দুর্গ, যেখানে সন্তানরা সর্বদা আশ্রয় ও নিরাপত্তা খুঁজে পায়। কুরআনুল কারিম সম্পর্কের এই দৃঢ় বন্ধনকে স্থায়িত্ব দান করেছে, সন্তানের উদ্দেশে হজরত লুকমান আলাইহিস সালামের উপদেশ উল্লেখ করে সেখানে সন্তানকে প্রতিপালন করার সকল পদ্ধতিও শিখিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশচ্ছলে বলেছিল, পুত্র আমার, আল্লাহর সাথে শিরক করো না। নিশ্চিত জেনো, শিরক করা চরম জুলুম। [সুরা লুকমান: ১৩]
আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণে পিতা ও কন্যার এক চমৎকার হৃদয়স্পর্শী সম্পর্ক দেখতে পাই। সেই সম্পর্কের শোভা-সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন হজরত আয়েশা রা.। তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চলার ভঙ্গিতে ফাতেমা রা. আমাদের নিকট আগমন করলেন। তাকে দেখে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমার স্নেহের কন্যাকে অনেক অনেক মোবারকবাদ।' তারপর তাকে তাঁর ডান পাশে অথবা বামপাশে বসালেন এবং তার সাথে চুপিচুপি (কী যেন) কথা বললেন। তখন ফাতেমা রা. কেঁদে দিলেন। আমি তাকে বললাম, 'কাঁদছেন কেন?'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় তার সাথে চুপিচুপি কী যেন বললেন। এবার তিনি (ফাতেমা রা.) হেসে উঠলেন। আমি বললাম, 'আজকের মতো দুঃখের সাথে সাথে এমন খুশি আমি আর কখনো দেখিনি।' আমি তাকে (ফাতেমা রা.) জিজ্ঞাসা করলাম, 'তিনি (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আপনাকে কী বললেন?' ফাতেমা রা. বললেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপন কথা এখন প্রকাশ করতে পারব না।'
অবশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আমি আবার ফাতেমাকে সেদিনের বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমবার আমাকে বলেছিলেন, 'জিবরাইল আলাইহিস সালাম প্রতি বছর একবার আমার সাথে কুরআন পাঠের দাওর (শোনাশুনি) করতেন, কিন্তু এ বছর তিনি তা দুইবার করেছেন। আমার মনে হয়, আমার বিদায়কাল ঘনিয়ে এসেছে এবং আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই প্রথম আমার সাথে মিলিত হবে।' এ কথা শুনে আমি কেঁদে দিলাম। দ্বিতীয়বার তিনি আমাকে বলেছিলেন, 'তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, জান্নাতি মহিলাদের অথবা মুমিন মহিলাদের তুমি প্রধান (নেত্রী) হবে!' তখন এ কথা শুনে আমি হেসেছিলাম। (৯৮)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কন্যাকে স্নেহ-ভালোবাসা, আদর ও মমতার সাথে লালনপালন করেছেন। নিজের কন্যাকে গড়ে তুলেছেন।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় পুত্র ইবরাহিম(৯৯) যখন ইন্তেকাল করেন, তখনও প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর স্নেহ ও ভালোবাসার গভীরতা। তিনি যখন নিজের সন্তানকে সম্বোধন করে নিচের কথাগুলো বলেন, তখনও দেখা গিয়েছিল সন্তানের প্রতি পিতার হৃদয় নিংড়ানো স্নেহের অপার নিদর্শন। তিনি সন্তানকে সম্বোধন করে বলেন, 'হে ইবরাহিম, যদি তা (মৃত্যু) অবধারিত ও সত্য ওয়াদা না হতো, কিয়ামতের দিন একত্র হওয়ার কথা না থাকত এবং যদি তা সীমাবদ্ধ কিছু কাল ও সত্য সময় না হতো, তাহলে ইবরাহিম! আমরা তোমার জন্য যে কষ্ট পেয়েছি, তারচেয়ে আরও অধিক কষ্ট পেতাম। আমরা তোমার জন্য অবশ্যই দুঃখিত। চোখ অশ্রু বর্ষণ করছে। হৃদয় ব্যথিত হচ্ছে। তবে আমরা এমন কিছু বলছি না, যা আমাদের প্রভুকে অসন্তুষ্ট করে।'
নবী-পুত্র ইবরাহিমের ইনতেকালের পর তিনি সাহাবিদের বলেছিলেন, 'আমি না দেখা পর্যন্ত তোমরা তাকে কাফনে মুড়ে দিয়ো না।' এরপর তিনি তার নিকট এলেন, শায়িত ইবরাহিমের মৃত শরীরের দিকে ঝুঁকলেন এবং কেঁদে ফেললেন। (১০০)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের নাতি-নাতনিদের ক্ষেত্রেও অনেক যত্নবান ছিলেন। তাদেরকে অনেক আদর করতেন। ভালোবাসতেন। তাদের জন্য সুন্দর সুন্দর নাম নির্বাচন করে দিতেন। এ প্রসঙ্গে হজরত আলি রা. বলেন, যখন হাসান জন্মগ্রহণ করল আমি তার নাম রাখলাম 'হারব'। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন এবং বললেন, 'আমার নাতিকে নিয়ে এসো, তোমরা তার কী নাম রেখেছ? আমি বললাম, 'হারব।' তিনি বললেন, 'না, বরং তার নাম হাসান।' অতঃপর যখন হুসাইন জন্মগ্রহণ করল, তখনও আমি তার নাম 'হারব' রেখেছিলাম। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন এবং বললেন, 'আমার নাতিকে আমার নিকট নিয়ে এসো, তোমরা তার কী নাম রেখেছ?' আমি বললাম, 'হারব।' তিনি বললেন, 'না, বরং তার নাম হুসাইন।' এভাবে যখন আমার তৃতীয় সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো, তখনও আমি তার নাম রেখেছিলাম 'হারব'। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট এলেন এবং বললেন, 'আমার নাতিকে নিয়ে এসো, তোমরা তার কী নাম রেখেছ?' আমি বললাম, 'হারব।' তিনি বললেন, 'না, বরং তার নাম মুহসিন।'
এরপর তিনি বললেন, 'আমি তাদের এই নাম রেখেছি হজরত হারুন আলাইহিস সালামের সন্তানদের নামানুসারে। হারুন আলাইহিস সালাম তাঁর সন্তানদের নাম রেখেছিলেন শাবার, শুবাইর ও মুশবির।'(১০১)
নাতি-নাতনিদের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা ছিল অত্যধিক প্রগাঢ় ও গভীর। এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে বুরাইদা রা.-এর একটি বর্ণনা থেকে। তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে খুতবা দিচ্ছিলেন। এ সময় হজরত হাসান ও হুসাইন রা. লাল ডোরাবিশিষ্ট জামা পরিধান করে সেদিকে আসছিলেন। কিন্তু আসতে গিয়ে (কম বয়সী হওয়ায়) হোঁচট খেয়ে পড়ে যান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা বন্ধ করে মিম্বর থেকে অবতরণ করেন এবং তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় মিম্বরে আরোহণ করেন। এরপর তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা সত্যই বলেছেন,
إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানাদি পরীক্ষাস্বরূপ। [সুরা তাগাবুন : ১৫] আমি উভয়কে (পড়ে যেতে) দেখে আর সহ্য করতে পারিনি।' এরপর নবীজি আবার খুতবা দেওয়া শুরু করলেন। (১০২)
এমন ভালোবাসা তাঁর অন্য নাতি-নাতনিদের ক্ষেত্রেও ছিল। যেমন হজরত আবু কাতাদা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মেয়ে যায়নাবের কন্যা উমামা রা.-কে কাঁধে নিয়ে নামাজ আদায় করতেন। তিনি যখন সেজদায় যেতেন, তখন তাঁকে নামিয়ে রাখতেন। আবার যখন দাঁড়াতেন, তখন তাঁকে কাঁধে তুলে নিতেন। (১০৩)
স্নেহ ও ভালোবাসার এমনই আরেকটি চমৎকার ঘটনা আছে। ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ রা.। তিনি বলেন, একদিন বিকেলের কোনো এক নামাজের সময় (অর্থাৎ জোহর বা আসরে) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আগমন করলেন। তখন তিনি হাসান বা হুসাইন রা.-এর মধ্য থেকে একজনকে বহন করে আনলেন। ইমামতির জন্য সামনে অগ্রসর হয়ে তাকে ডান পাশে রেখে দিলেন। তারপর নামাজের জন্য তাকবির বললেন ও নামাজ শুরু করলেন। নামাজের মধ্যে একটি সেজদা অনেক দীর্ঘ করলেন। আমার বাবা (শাদ্দাদ) বলেন, আমি সেজদা থেকে মাথা উঠিয়ে দেখলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেজদারত আছেন আর বাচ্চাটি (হাসান বা হুসাইন) তাঁর পিঠের ওপর বসে রয়েছে। তারপর আমি আবার সেজদায় চলে গেলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ শেষ করলে লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আপনার নামাজের মধ্যে একটি সেজদা এত বেশি লম্বা করলেন, যা আগে কখনো করেননি। আমরা ধারণা করলাম, হয়তো এভাবেই আপনাকে আদেশ করা হয়েছে অথবা আপনার ওপর ওহি নাজিল হচ্ছে।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এগুলোর কোনোটিই ঘটেনি। বরং আমার নাতি আমাকে বাহন বানিয়েছিল (অর্থাৎ আমার ওপর উঠে বসেছিল)। তাই আমি সেজদা থেকে তাড়াতাড়ি উঠতে অপছন্দ করলাম, যাতে সে তার কাজ সমাধা করতে পারে।' (১০৪)
এমন স্নেহ-ভালোবাসার ঘটনা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে আকস্মিকভাবে দু-একটি ঘটলেও এটি ছিল তাঁর স্বভাবজাত ও উত্তম চরিত্রের অনন্য এক বৈশিষ্ট্য। হজরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার হাসান ইবনে আলি রা.-কে চুম্বন করেন। সেখানে তখন আকরা ইবনে হাবিস তামিমি রা. বসা ছিলেন। এটা দেখে আকরা ইবনে হাবিস রা. বললেন, 'আমার দশটি পুত্র আছে। অথচ আমি তাদের কাউকে কোনোদিন চুম্বন করিনি।' এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ
যে দয়া করে না, তাকেও দয়া করা হয় না। (১০৫)
তবে, সন্তানসন্ততি ও নাতি-নাতনিদের প্রতি এমন অপরূপ ভালোবাসা সত্ত্বেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কারণে কখনো অন্য কোনো মুসলমানকে কষ্টে ফেলেননি। বরং তাদেরকেই অন্য মুসলমানদের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করতে শিখিয়েছেন। যেমন বর্ণিত আছে,
হজরত আলি রা. একদিন হজরত ফাতেমা রা.-এর নিকট অভিযোগ করে বললেন, 'কুয়া থেকে মশক (বালতি) দিয়ে পানি টানতে টানতে আমার বুক ব্যথা হয়ে গেছে।' ফাতেমা রা.-ও বললেন, 'আল্লাহর কসম! আটা ভাঙানোর জাঁতা ঘুরাতে ঘুরাতে আমারও হাতে ফোঁসকা পড়ে গেছে।' তখন আলি রা. বললেন, 'ফাতেমা, তুমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যাও। তাঁর নিকট কিছু বন্দি গোলাম এসেছে, তুমি চাইলে হয়তো একজন গোলামকে তোমার খাদেম হিসেবে দিয়ে দেবেন।'
তখন ফাতেমা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গেলেন, কিন্তু শূন্য হাতেই ফিরে এলেন। পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাদের নিকট আগমন করলেন এবং তাদেরকে বললেন, 'তোমরা একজন খাদেম পাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে আমার নিকট গিয়েছিলে। আমি তোমাদের এমন একটি কথা বলে দিতে পারি, যা তোমাদের জন্য খাদেমের চেয়েও কল্যাণকর হবে। তোমরা যদি চাও, তাহলে আমি তোমাদের এমন একটি বিষয় বলে দেবো, যা তোমাদের জন্য খাদেমের চেয়েও কল্যাণকর হবে। সেটা হলো, তোমরা উভয়েই প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়বে। এরপর রাতে শোয়ার সময়েও একশবার পড়বে।' (১০৬)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তানদের কল্যাণকর বিষয় শিক্ষা দিতেন। তিনি তাদের শিখিয়েছেন যে, (তাদের প্রতি তাঁর অত্যধিক ভালোবাসা সত্ত্বেও) তিনি অন্য মুসলমানদের ওপর প্রাধান্য দিয়ে তাদেরকে ভালোবাসেন না। তিনি আল্লাহ তাআলার সাথে তাদের ভালোবাসার বন্ধন মজবুত করার শিক্ষা দিতেন। কেননা তাদের সকল কর্মে আল্লাহ তাআলাই সর্বোত্তম সাহায্যকারী। শুধু তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনাই একজন মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্যবান করে তোলে।
একজন পিতা ও নানা হিসেবে সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সাথে এমনটাই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পর্ক, যা প্রতিষ্ঠিত ছিল অপার স্নেহ, সহানুভূতি ও ভালোবাসার ওপর। তাঁর মহানুভব ছায়ায় পরিবারের সকলেই শান্তি ও স্বস্তি অনুভব করত। হে আল্লাহর রাসুল, পিতা ও নানা হিসাবে আপনি কতইনা মহান!
তৃতীয় অনুচ্ছেদ
সাহাবিদের সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ
মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি বড় নিয়ামত হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পারস্পরিক ভালোবাসা তথা ( الْحُبُّ فِي الله ) |
এই নিয়ামতের কারণে ইসলামের সূচনা হতেই মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ় ও মজবুত হয়েছে। অথচ এই মানুষগুলোই জাহিলিয়াতের যুগে একজন অপরজনের ‘প্রাণের শত্রু’ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে তারা যখন ইসলামে দীক্ষিত হলেন, তখন তারাই হয়ে গেলেন পরস্পরের প্রতি প্রাণ উৎসর্গকারী মুসলিম ভাই। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا
ফলে তাঁর (আল্লাহর) অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেলে। [সুরা আলে ইমরান : ১০৩] এরপর আল্লাহ তাআলা এই প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকেই একজন বান্দার জন্য তার প্রতিপালকের প্রতি ঈমানের পরিচয় হিসেবে ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
প্রকৃতপক্ষে সকল মুমিন পরস্পর ভাই ভাই। [সুরা হুজুরাত : ১০]
‘আল্লাহর জন্য’ একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা পোষণকারীদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক প্রশংসা করেছেন। আখিরাতের ময়দানে এই ভালোবাসার মহান সফলতার কথাও ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন,
«سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ فِي ظِلَّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ ... وَرَجُلَانِ تَحَابًا فِي اللَّهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ»
সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা সেদিন তাঁর (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দান করবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত কোনো ছায়া থাকবে না...। (সেই সাত শ্রেণির ব্যক্তির মধ্যে) এমন দুজন ব্যক্তি থাকবে, যারা পরস্পরকে ভালোবাসে আল্লাহর জন্য, একত্র হয় আল্লাহর জন্য এবং পৃথকও হয় আল্লাহর জন্য। (১০৭)
অন্যদিকে সাহাবিদের মাঝে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ঝগড়া-বিবাদকে তিনি অত্যন্ত অপছন্দ করেছেন। তিনি বলেন,
«لَا يَحِلُّ لِرَجُلٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ يَلْتَقِيَانِ؛ فَيُعْرِضُ هَذَا وَيُعْرِضُ هَذَا، وَخَيْرُهُمَا الَّذِي يَبْدَأُ بِالسَّلَامِ»
কোনো ব্যক্তির জন্য হালাল নয় যে, সে তার ভাইয়ের (মুসলিম ভাই) সাথে তিন দিনের বেশি এমনভাবে সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে যে, দুজনে সাক্ষাৎ হলেও একজন এদিকে আর অন্যজন ওদিকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। তবে তাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই উত্তম, যে প্রথম সালাম প্রদান করবে। (১০৮)
আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীতে দেখতে পাই, তাঁর আচরণে সাহাবিদের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসার প্রকাশ ঘটত। ফলে সকল সাহাবিই ধারণা করতেন যে, অন্যদের চেয়ে তাকেই বুঝি তিনি বেশি ভালোবাসেন। তাঁর জীবনচরিতে আমরা আরও পাই, তিনি তাঁর সাহাবিদের এমন কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কথা ব্যক্ত করেছেন, যেগুলো তাঁর এবং সাহাবিদের মাঝে গভীর হৃদ্যতা ও নৈকট্যের প্রতি ইঙ্গিত করে। যেমন হজরত জুবাইর ইবনে আওয়াম রা.-এর ক্ষেত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতিটি নবীরই একজন বিশেষ সাহায্যকারী থাকে আর আমার সাহায্যকারী হলো জুবাইর। (১০৯)
হজরত আবু বকর ও উমর রা. সম্পর্কে বলেছেন, প্রত্যেক নবীরই দুনিয়াবাসী থেকে দুজন পরামর্শদাতা থাকে, আমার জন্য তারা হলো আবু বকর ও উমর রা.। (১১০)
হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রা.-এর ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের 'কাতিমু সিররিহি', অর্থাৎ গোপন কথার সঙ্গী। (১১১)
আর হজরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা. সম্পর্কে তিনি বলেছেন, প্রত্যেক উম্মতের একজন আমানতদার থাকে, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা. হলো এই উম্মতের আমানতদার। (১১২)
এভাবে আমরা তাঁর জীবনীতে আরও দেখতে পাই, সান্নিধ্য ও ভালোবাসা বৃদ্ধির জন্য তিনি সাহাবিদের সাথে পানাহারে অংশগ্রহণ করতেন এবং তাদেরকেও তাঁর পানাহারে অংশীদার করাতেন। যেমন হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, একবার আমি আমাদের ঘরে বসা ছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। তিনি ইশারায় আমাকে ডাকলেন। আমি উঠে তাঁর নিকট গেলাম। তিনি আমার হাত ধরলেন। এরপর আমরা উভয়ে রওয়ানা হলাম। অবশেষে তিনি তাঁর এক স্ত্রীর ঘরে প্রবেশ করলেন। কিছুক্ষণ পর আমাকেও প্রবেশের অনুমতি দিলেন। আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম। নবীজির স্ত্রী পর্দার আড়ালে ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'খাওয়ার কিছু আছে কি?'
বললেন, 'হ্যাঁ। অতঃপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য তিনটা রুটি এনে দস্তরখানে রাখা হলো। তিনি একটি রুটি তুলে নিজের সামনে রাখলেন। আরেকটি রুটি তুলে আমার সামনে রাখলেন। এরপর তৃতীয় রুটিটি হাতে নিয়ে দুই ভাগ করে অর্ধেকটা নিজের সামনে এবং বাকি অর্ধেক আমার সামনে রাখলেন। অতঃপর তিনি আবার বললেন, 'কোনো তরকারি আছে কি?'
তারা বললেন, 'না, তবে সামান্য সিরকা আছে।' নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'সেটাই নিয়ে এসো। সেটাও তো উত্তম তরকারি। (১১৩)
এমনইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাস্যরস ও মজার আলোচনার মধ্যেও সাহাবিদের শরিক করতেন। তবে তাঁর হাস্যরসও ছিল সত্যাশ্রিত। সাহাবিদের সাথে এই হাস্যরস ছিল তাঁর নৈকট্য, ঘনিষ্ঠতা ও ভালোবাসা বৃদ্ধির অন্যতম উপকরণ। এমনই এক চমৎকার ও মজার হাস্যরসের ঘটনা বর্ণনা করেছেন হজরত আনাস রা.।
তিনি বলেন, প্রায়ই এক গ্রাম্য বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসত। লোকটির নাম ছিল 'যাহির'। সে গ্রাম থেকে আসার সময় নবীজির জন্য কিছু উপহার নিয়ে আসত। প্রয়োজন সেরে বাড়িতে ফেরার সময় নবীজিও তাকে কিছু হাদিয়া দিয়ে দিতেন। একদিন তিনি মজা করে বললেন, 'যাহির হলো আমাদের গ্রাম আর আমরা হলাম তার শহর।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে খুব ভালোবাসতেন। অথচ লোকটি দেখতে তেমন সুন্দর ছিল না। একবার নবীজি তার নিকট গিয়ে দেখলেন, সে বাজারে পণ্য বিক্রি করছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপিসারে তার পেছনের দিকে গিয়ে তার চোখ ধরে বললেন, 'বলো তো আমি কে?'
সে বলতে থাকল, 'আমাকে ছাড়ো। তুমি কে?' পরে মাথা ঘুরিয়ে দেখল এবং নবীজিকে চিনতে পারল। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ধরে বলতে লাগলেন, 'কে এই গোলামকে (সাহাবি যাহিরকে) ক্রয় করবে?'
তখন বেদুইন যাহির বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কসম! এই গোলাম তো অচল। (এত কুৎসিত গোলামকে কে কিনবে! বিনিময়ে আপনি সামান্য পয়সাও পাবেন না।)'
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'কিন্তু আল্লাহর নিকট তুমি অচল নও।' অথবা তিনি বললেন, 'বরং আল্লাহর নিকট তুমি অনেক মূল্যবান।' (১১৪)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা সাহাবিদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতেন। তাদের সকলের সাথে মিলেমিশে থাকতেন। তাদেরকে মর্যাদা দিতেন। তাদের খুশিতে খুশি হতেন এবং তাদের দুঃখে দুঃখী হতেন।
মুসলমানদের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোতেও সাহাবিদের সাথে আমরা তাঁকে দেখতে পেয়েছি তাদেরই একজন হিসেবে। যে কারণে তারা চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হতেন, তিনিও সে কারণে চিন্তিত হতেন। তারা যে কারণে কষ্ট পেতেন, তিনিও সে কারণে কষ্ট পেতেন। নিজের ক্ষুধার কথা ভুলে তিনি তাদের ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা করতেন। তাদের দুঃখ ও কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করতেন। খন্দকযুদ্ধের ময়দানে মুসলমানদের ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণা থাকা অবস্থায়, জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা.-এর প্রস্তুতকৃত খাবারের স্বল্পতা সত্ত্বেও তিনি সাহাবিদের রেখে নিজে পরিতৃপ্ত হয়ে খাওয়াটা পছন্দ করেননি, অথচ জাবির রা. শুধু তাঁকে একাই খাওয়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে ঘোষণা দিলেন, 'হে খন্দকবাসী! জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. তোমাদের জন্য খাবারের আয়োজন করেছে, তাই তোমরা সকলেই আমার সাথে চলো।'(১১৫)
সাহাবিদের জীবনে আপতিত যেকোনো বিপদ বা সংকটময় মুহূর্তে তিনি তাদের সঙ্গ দিতেন। বিভিন্নভাবে তাদেরকে সান্ত্বনা দিতেন। কখনো আখিরাতে আল্লাহর পক্ষ হতে উত্তম প্রতিদান ও সওয়াব অর্জনের সুসংবাদ দিয়ে। আবার কখনো সংকট থেকে উত্তরণের বাস্তব কোনো সমাধানের পথ বাতলে দিয়ে। এমনই এক সংকটময় মুহূর্তে সুসংবাদের মাধ্যমে সান্ত্বনা প্রদান করেন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা.-কে, যখন আবু সুফিয়ান ইবনে হারব অন্যায়ভাবে তার জমি দখল করে বিক্রি করে দিয়েছিল। আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এই বিপদের কথা উল্লেখ করলেন, তখন নবীজি তাকে সুসংবাদ দিয়ে বললেন, 'হে আবদুল্লাহ, আল্লাহ জান্নাতে তোমাকে এর চেয়ে উত্তম বাড়ি দান করবেন, এতে কি তুমি খুশি নও?' জবাবে তিনি বললেন, 'অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল!' নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাহলে তোমার জন্য সেখানে তা-ই রয়েছে।'(১১৬)
একবার এক সাহাবি ব্যবসার উদ্দেশ্যে ফল খরিদ করে লোকসানের শিকার হলেন। এতে তার ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেল এবং তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়লেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন লোকদের বললেন, 'তোমরা তার জন্য সদকা করো।'
লোকেরা তাকে দানসদকা করল। কিন্তু সেগুলোও তার সকল ঋণ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট হলো না। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণদাতাদের বললেন, 'এখান থেকে তোমরা যে পরিমাণ পাচ্ছ, সেটা গ্রহণ করে নাও। তোমরা এর অধিক আর কিছু পাবে না।' (১১৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সাহাবিদের উত্তম সঙ্গী। তিনি তাদের সঙ্গ দিয়েছেন তাদের হাসি-কান্নায়, তাদের সুখ-দুঃখে এবং তাদের দুর্বলতা ও শক্তিতে। তিনি নিজেকে কখনো বিশেষ মর্যাদায় মর্যাদাবান মনে করে তাদের থেকে পৃথক হয়ে থাকতেন না; বরং তিনি নিজের খাদ্য-খাবার ও পোশাক-আশাকে তাদের মতোই সাধারণ জীবনযাপন করতেন, যেন তিনি তাদেরই একজন। অনেক অমুসলিম তাঁর এই অসাধারণ চারিত্রিক গুণের কারণে যারপরনাই আশ্চর্যবোধ করত। আরও আশ্চর্য হতো তাঁর জন্য সাহাবিদের সুতীব্র ভালোবাসা ও ব্যাকুলতা দেখে। এ কারণে আবু সুফিয়ান ইবনে হারব অমুসলিম অবস্থায় বলেছিলেন, আমি কোনো মানুষকে এত বেশি ভালোবাসতে দেখিনি, যেমন মুহাম্মাদের সাথীরা মুহাম্মাদকে ভালোবাসে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। (১১৮)
চতুর্থ অনুচ্ছেদ
সৈনিকদের সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ
নেতৃত্বের যোগ্যতা এমন একটি গুণ, যার জন্য আল্লাহ তাআলা বিশেষ কিছু ব্যক্তিকে নির্বাচন করেছেন। তারা হলেন অন্যদের তুলনায় নেতৃত্ব প্রদানে অনন্য ও অসাধারণ। এই নেতৃত্বপ্রদানকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বাধিক যোগ্য হলেন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রেরিত নবী ও রাসুলগণ। তারা তাদের জাতি-গোষ্ঠীকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে পরিচালিত করেছেন। কুরআনুল কারিম অনেক নবী ও রাসুলের ঘটনা উল্লেখ করেছে এবং তাদের জাতি-গোষ্ঠীর সাথে নবী-রাসুলদের আচরণের বিষয়গুলো বিস্তারিত বর্ণনা করেছে, যাতে এগুলো আগত এবং অনাগত সকল নেতার জন্য নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الأَلْبَابِ)
নিশ্চয় তাদের ঘটনায় বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের উপাদান আছে। [সুরা ইউসুফ: ১১১]
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এ সকল নবী প্রেরণের ধারাবাহিকতায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়াতে সর্বশেষ নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। সুতরাং তিনি হলেন মানব-ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিতের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, জীবনের সকল বিষয়ে তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ নেতা, হোক তা পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কিংবা সামরিক। নিজের সৈন্যদের মানসিকতা ও সক্ষমতা সম্পর্কে তাঁর যথেষ্ট ও সঠিক ধারণা ছিল। এজন্য তিনি তাদের অন্তরে ইসলামি মূল্যবোধের প্রধান নীতিগুলোর বীজ বপন করেছেন। তিনি সকল কাজে তাদের জন্য সঠিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্থির করে দিয়েছেন। আর সেটা হলো, মানুষকে মানুষের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর আনুগত্যের দিকে বের করে আনা। আর এই ক্ষেত্রেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন উত্তম আদর্শ এবং অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। ফলে আমরা দেখতে পাই, কুরাইশ নেতৃবর্গ যখন তাঁর নিকট দুনিয়ার বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে দাওয়াত থেকে বিরত থাকার প্রস্তাব পেশ করেছিল, তখন তিনি তাদেরকে বলেছিলেন,
'আমি তোমাদের নিকট যে বার্তা নিয়ে এসেছি, এর মাধ্যমে আমি তোমাদের সম্পদ চাই না, তোমাদের মাঝে সম্মান ও মর্যাদাও চাই না। তোমাদের ওপর কর্তৃত্বও করতে চাই না। বরং আল্লাহ তাআলা আমাকে তোমাদের সকলের নিকট রাসুল করে পাঠিয়েছেন এবং আমার ওপর তাঁর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আমাকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তোমাদের (জান্নাতের) সুসংবাদ প্রদান করি এবং (জাহান্নামের) ভীতি প্রদর্শন করি। আমি আমার প্রতিপালকের বার্তা তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। তোমাদের মঙ্গল কামনা করেছি। তোমরা যদি এটা গ্রহণ করে নাও, তবে তোমরা দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণের অধিকারী হবে। আর যদি না মানো, তাহলে আমি আল্লাহ তাআলার জন্যই ধৈর্যধারণ করব, যতক্ষণ না মহিমান্বিত আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সত্য ফয়সালা করে দেন।' (১১৯)
অতএব দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিজের লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার। কাফেরদের শত অস্বীকার ও বিরোধিতা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সাহায্যের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আস্থা ও বিশ্বাস।
এরপর আমরা দেখি, আল্লাহ তাআলার প্রতি নিজের আস্থাশীলতার গুণ তিনি তাঁর সাহাবিদের মাঝেও সঞ্চারিত করেছেন। হজরত খাব্বাব ইবনে আরত রা. তার প্রতি কুরাইশদের নির্মম নির্যাতনের বিষয়ে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অভিযোগ করলেন, তখন নবীজি তাকে বললেন, 'আল্লাহর কসম! আল্লাহ এ দ্বীনকে অবশ্যই পূর্ণতা দান করবেন (এবং সর্বত্র নিরাপদ ও শান্তিময় অবস্থা প্রতিষ্ঠিত করবেন)। তখন একজন উষ্ট্রারোহী সানআ(১২০) থেকে হাজরামাউত (১২১) পর্যন্ত (নিরাপদে) ভ্রমণ করবে, (এ দীর্ঘ পথে সে) আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করবে না। অথবা তার মেষপালের জন্য নেকড়ের ভয়ও করবে না। কিন্তু তোমরা (ওই সময়ের অপেক্ষা না করে) তাড়াহুড়া করছ। (১২২)
আমরা আরও দেখতে পাই, তিনি প্রত্যেক যোগ্য ব্যক্তিকে তার উপযুক্ত স্থানই প্রদান করতেন। ব্যক্তির যোগ্যতা ও সক্ষমতা সম্পর্কেও তিনি খুব ভালোভাবে অবগত ছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে এ সকল অনুগত মানুষের ওপর নির্ভর করেই একজন নেতা তার নেতৃত্ব পরিচালনা করবেন। নেতৃত্বের মূল উপাদানই হলো এ সকল যোগ্য মানুষ। সুতরাং সৈন্যদের সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান নেতা এবং সৈন্যদের মাঝে একটি পারস্পরিক গভীর সম্পর্ক তৈরি করে এবং তাদেরকে যুদ্ধের ময়দানে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করে, এমনকি কাজের প্রতি তাদের অগ্রগামিতা এবং স্বতঃস্ফূর্ততা তৈরি করে। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমরা আমাদের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীতে দেখতে পাই। বদরযুদ্ধের দিন জায়গা নির্বাচনের ক্ষেত্রে হজরত হুবাব ইবনে মুনজির ইবনে জামুহ রা. (যিনি যুদ্ধক্ষেত্র সম্পর্কে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের বর্তমান এই জায়গাটি ভালো নয়। অতএব আপনি সবাইকে নিয়ে এখান থেকে এগিয়ে চলুন। আমরা ওই কূপের কাছে গিয়ে ছাউনি স্থাপন করব, যা কুরাইশদের অতি নিকটে। এরপর আমরা সে জায়গার আশপাশের অন্য কূপগুলো বন্ধ করে দেবো। আমরা আমাদের জায়গায় একটি হাউজ তৈরি করে তাতে পানি ভরে রাখব। পরে আমরা শত্রুপক্ষের সাথে লড়াই করব। তখন আমরা পানি পান করতে পারব কিন্তু ওরা পানি পাবে না।' এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি সঠিক পরামর্শ দিয়েছ।'(১২৩)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক সাহাবির সঠিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত ছিলেন। কারণ, সাহাবিদের মধ্যে একেকজন একেক বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে তাদের এই বিশেষ গুণ ও বৈশিষ্ট্যগুলো খুব ভালোভাবে চিনতেন ও বুঝতেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর মাঝে কোনো দ্বিধা বা অস্পষ্টতা ছিল না। একজন নেতার জন্য এটি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণে তিনি বিভিন্ন সাহাবির বৈশিষ্ট্য বর্ণনার ক্ষেত্রে বলেছেন, 'আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দয়ার্দ্র হলো আবু বকর রা.। আর আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সবচেয়ে কঠোর হলো উমর রা.। তাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি লজ্জাশীল হলো উসমান রা.। আর সবচেয়ে বিচক্ষণ বিচারক হলো আলি ইবনে আবু তালিব রা.। আল্লাহর কিতাবের সর্বোত্তম তিলাওয়াতকারী হলো উবাই ইবনে কাব রা.। আর হালাল-হারাম সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞাত হলো মুআজ ইবনে জাবাল রা. এবং ফারায়েজ (সম্পত্তি বণ্টন) সম্পর্কিত বিষয়ে সবচেয়ে জ্ঞানী হলো যায়েদ ইবনে সাবিত রা. এবং উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম আমানতদার হলো আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা. এবং হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা. হলো আল্লাহর সিংহ।'(১২৪)
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন অসাধারণ নেতা ও পরিচালক। এই ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল সামরিক ক্ষেত্র। বদরযুদ্ধের অবিস্মরণীয় বিজয় ছিল তাঁর যোগ্য নেতৃত্বের বাস্তব প্রতিফলন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তিনি সৈন্যদের সারিবদ্ধভাবে সজ্জিত করেন, যাতে কুরাইশবাহিনীর সম্মুখে তারা তাদের পূর্ণ ক্ষমতা ও যোগ্যতা প্রদর্শন করতে পারে। এরপর কুরাইশরা যখন মল্লযুদ্ধের আহ্বান জানাল, তখন তিনি তিনজন শক্তিশালী সৈন্যকে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য নির্বাচন করলেন। তাঁর নির্বাচন ছিল অত্যন্ত সফল ও কার্যকরী। আগে থেকেই তিনি তাদের অবস্থা ও মানসিকতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন। তাই তিনি সম্মুখ লড়াইয়ের জন্য তিনজনকে আহ্বান করে বললেন, 'ওঠো, হে উবাইদা ইবনে হারেস। ওঠো, হে হামজা এবং ওঠো, হে আলি। আল্লাহর হুকুমে তাদের হাতে উতবা, শাইবা ও ওয়ালিদ ইবনে উতবা নিহত হয় আর উবাইদা রা. কিছুটা আহত হন। মুসলমানদের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধের আগে এটি ছিল মুশরিকদের জন্য একটি মানসিক পরাজয়। এ যুদ্ধে মুসলমানরা কাফেরদের ৭০ জনকে হত্যা করে আর বন্দি করে আরও ৭০ জনকে। (১২৫)
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৈনিকদের মাঝে বিভিন্ন উদ্যম, উদ্যোগ ও সৃজনশীল মানসিকতা তৈরি করেছিলেন। এ সকল গুণ তাদেরকে নতুন কোনো সমস্যায় দ্রুত ও কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম করে তোলে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও এর কিছু প্রকৃষ্ট উদাহরণ ও আদর্শ স্থাপন করেছেন। যেমন আমরা হুদাইবিয়াতে কুরাইশদের সাথে তাঁর সন্ধির বিষয়ে দৃষ্টি দিতে পারি। এটা ছিল একজন রাসুল ও নেতার পক্ষ থেকে গভীর দূরদর্শিতা এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতার এক অভূতপূর্ব উদাহরণ। কারণ, প্রথম এই চুক্তির মাধ্যমেই মুসলমানগণ রাজনৈতিকভাবে কুরাইশদের সমশক্তিসম্পন্ন একটি জাতি-গোষ্ঠী হিসেবে পরিগণিত হয়। এর মাধ্যমেই আসে সবচেয়ে শক্তিশালী শত্রুদের কাছ থেকে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রথম স্বীকৃতি, যারা আরববিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের নেতৃত্ব দিত। এ ছাড়াও এটি (হুদাইবিয়ার সন্ধি) ছিল সকল গোত্রের সমন্বিত একটি চুক্তি, যা মূলত মুসলমানদের সাহায্য করেছিল নিরাপত্তার সাথে নিজেদের ধর্ম পালন করতে এবং অন্য জাতি ও গোত্রের মাঝে সেটাকে প্রচার ও প্রসার করতে। সুতরাং এই চুক্তিটি ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গভীরতম অন্তর্দৃষ্টির একটি উজ্জ্বল প্রমাণ। (১২৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গভীর দূরদর্শিতা ও সৃষ্টিশীলতার আরেকটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো তাঁর হিজরতের নিখুঁত পরিকল্পনা। শুরুতেই তিনি প্রিয় সঙ্গী আবু বকর রা.-কে নির্বাচন করেন, যিনি ছিলেন সাহাবিদের মধ্যে মর্যাদাগত দিক দিয়ে সর্বোত্তম। এরপর নির্বাচন করেন হিজরতের পথ। এ ক্ষেত্রে তিনি সেই পথই নির্বাচন করেন, যা ছিল কুরাইশদের পরিচিত পথ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর, সেটি ছিল উপকূলীয় পথ। তিনি জাবালে সওর বা সওর পাহাড়ের গুহায় তিনদিন অবস্থান করেন। যাতে এ সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়। তিনি মুশরিক আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিতকে পথপ্রদর্শক হিসেবে নির্বাচন করেন এবং আবু বকর রা.-এর ছেলে আবদুল্লাহকে নিযুক্ত করেন কুরাইশদের সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য। এরপর পরিপূর্ণ নিরাপত্তার স্বার্থে গুহা-মুখের চারপাশে বকরি চরানোর জন্য তিনি আমের ইবনে ফুহাইরাকে নিযুক্ত করেন। এটি ছিল এক নিখুঁت পরিকল্পনা। এরপর বাহ্যিক এত ব্যবস্থাপনার পরও নবীজির নেতৃত্বের মহত্ত্ব ও অনন্যতা প্রকাশ পেয়েছে আল্লাহ তাআলার প্রতি তাঁর ঐকান্তিক ভরসা করার মাধ্যমে। (১২৭) তিনি তাঁর সঙ্গী আবু বকর রা.-কে বলেন,
مَا ظَنُّكَ بِاثْنَيْنِ اللَّهُ ثَالِثُهُمَا
আবু বকর! ওই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, যার তৃতীয় হলেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা! (অর্থাৎ ভয়ের কিছু নেই। তিনি আমাদের সাথেই আছেন। তিনিই আমাদের সাহায্য করবেন।) (১২৮)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এইসব মূল্যবোধ ও নীতিমালাকে শুধু মৌখিক শব্দ এবং কর্মহীন কথামালা দ্বারাই প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং তিনি এসব ক্ষেত্রে নিজের পরিচালিত কর্মপন্থা এবং বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে সকলের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ ও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তিনি তাঁর নম্রতা, সহনশীলতা, সহানুভূতি ও ধৈর্যশীল আচরণে এবং তাঁর সকল কথা ও কাজের মাধ্যমে অন্যদের প্রভাবিত করেছেন। খন্দকযুদ্ধের দিকে দৃষ্টি ফেরালে আমরা দেখতে পাই, তিনি সৈন্যদের মনোবল বাড়িয়ে তোলার জন্য এবং মানসিক প্রফুল্লতা অব্যাহত রাখার জন্য খন্দক খননের কাজে নিজেও অংশগ্রহণ করেছেন।
[মানচিত্র নং-২ খন্দক যুদ্ধ (শাওয়াল ৫ হিজরি)]
এই চিত্রটি অতি সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.-এর কথায়। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাটি সরানোর চিত্র বর্ণনা করে বলেন, (আমরা দেখেছি) তিনি তাঁর শুভ্র সুন্দর পেটের ওপরে লেগে থাকা মাটি ঝাড়ছিলেন। (১২৯)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এভাবে সবার সাথে অংশগ্রহণ এবং প্রফুল্লতা প্রদান যুদ্ধের ময়দানে সাহাবিদের কষ্ট লাঘবে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। এমনকি শত্রুদের মদিনায় পৌঁছানোর আগেই কাজ শেষ করার প্রতি এগুলো তাদের মাঝে উৎসাহ, উদ্যমতা ও স্পৃহা তৈরি করেছিল। এসব কারণে খুব সহজেই প্রমাণিত হয়, তিনি ছিলেন জগতের শ্রেষ্ঠ নেতা ও রাসুল।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের মধ্যে অবিচল থাকার মানসিকতা তৈরি করেছিলেন এবং তিনি নিজেও এই মূল্যবান গুণে গুণান্বিত ছিলেন। আমরা তাঁর এই অবিচল থাকার উপমা দেখতে পাই খন্দকযুদ্ধের শেষে তাঁর নির্দেশের মধ্যে। তিনি সাহাবিদের বলেন,
لَا يُصَلِّيَنَّ أَحَدُ الْعَصْرَ إِلَّا فِي بَنِي قُرَيْظَةَ
তোমরা কুরাইজা গোত্রের এলাকায় পৌঁছার আগে কেউ আসরের নামাজ পড়বে না। (১৩০)
এটি ছিল সৈন্যদের প্রতি একজন সেনাপতির সুদৃঢ় নির্দেশ। সেই নির্দেশনায় সাহাবিরা প্রবল উদ্যমে অগ্রসর হয়েছিলেন বিশ্বাসঘাতক এবং শত্রুদের সাহায্যকারী বনু কুরাইজাকে প্রতিহত করার জন্য।
সৈন্যদের প্রতি ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতুলনীয় দৃষ্টান্ত ও আদর্শ স্থাপন করেছিলেন। যেমন, বদরযুদ্ধের দিন তিনি সাহাবিদের কাতার ঠিক করছিলেন। সকলকে সমান কাতারে দাঁড় করাচ্ছিলেন। তিনি তাঁর হাতে থাকা একটি তির দিয়ে কাতার সোজা করছিলেন। এ সময় সাওয়াদ ইবনে গাজিয়া রা. (১৩১) কাতার থেকে একটু সামনে অগ্রসর হয়ে পড়েন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পাশ দিয়ে অতিক্রমের সময় হাতের তির দিয়ে তার পেটে সামান্য খোঁচা দিয়ে বললেন, 'সাওয়াদ, তুমি কাতারে সমান হয়ে দাঁড়াও।'
এ সময় সাওয়াদ রা. বলে উঠলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমাকে ব্যথা দিলেন? অথচ আল্লাহ তাআলা আপনাকে সত্য ও ন্যায়সহ প্রেরণ করেছেন! আপনি আমাকে এর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ দিন।'
সাওয়াদ রা.-এর এই কাণ্ড দেখে সকল সাহাবিই বিস্মিত ও হতভম্ব হয়ে পড়েন। সাওয়াদ এটা কী বলে! কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎক্ষণাৎ তাঁর পেটের কাপড় সরিয়ে নিলেন এবং তাকে প্রতিশোধ নিতে বললেন। তখন সাওয়াদ রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জড়িয়ে ধরে পেটে চুমু খেলেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'সাওয়াদ, তুমি এমন করলে কেন?'
সাওয়াদ রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের সামনে যে ভয়াবহ অবস্থা, লড়াইয়ের দিন, এটা আপনিও দেখছেন। তাই আমার বড় আকাঙ্ক্ষা জাগল জীবনের এই শেষ মুহূর্তে আমার শরীর আপনার পবিত্র শরীরের স্পর্শে ধন্য হোক।'
সাওয়াদ রা.-এর এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কল্যাণের জন্য অনেক দোয়া করলেন। (১৩২)
সৈন্যদের প্রতি এমনই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ। এভাবেই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং প্রতিটি যুদ্ধে তিনি ছিলেন একজন আদর্শবান মানুষ এবং মানবিক নেতা। তাঁর এ সকল পরিচালনা ছিল জগতের নিকট এক নতুন ধরনের উন্নত নেতৃত্ব, যা তিনি প্রাপ্ত হয়েছিলেন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। যাতে কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত সকল নেতা ও শাসক তাঁর এই আদর্শগুলো অনুসরণ করে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পারে।
পঞ্চম অনুচ্ছেদ
অপরিচিতদের সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবী বা রাসুল হওয়ার অন্যতম উজ্জ্বল প্রমাণ হলো, অপরিচিতদের সাথেও তাঁর অনন্যসুন্দর আচরণ।
কেননা, আমরা সাধারণত পরিচিত ব্যক্তিদের সাথে ভালো ব্যবহার করি আর অপরিচিতদের সাথে করি রূঢ় আচরণ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সীমাহীন দয়া করেছেন। তাঁকে একটি বিনয়-নম্র হৃদয় দান করেছেন এবং পরিচিত-অপরিচিত সকলের সাথেই নম্র ব্যবহারের হৃদয়গ্রাহী গুণে গুণান্বিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ﴾
(হে নবী,) এটা আল্লাহর রহমতই ছিল, যার কারণে আপনি মানুষের সাথে কোমল আচরণ করেছেন। আপনি যদি রূঢ় প্রকৃতির ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে গিয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে যেত। [সুরা আলে ইমরান : ১৫৯]
তাঁর জীবনে অপরিচিতদের সাথে চমৎকার ব্যবহারের অনেক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা রয়েছে। যেমন আমরা এখানে উম্মে মাবাদের সাথে সংঘটিত ঘটনাটি স্মরণ করতে পারি। উম্মে মাবাদের ভাই হুবাইশ ইবনে খালেদ বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা থেকে হিজরতের উদ্দেশ্যে মদিনার পথে বের হলেন, সাথে ছিলেন আবু বকর রা., ছিলেন আবু বকরের গোলাম আমের ইবনে ফুহাইরা আর তাদের পথ দেখাচ্ছিলেন আবদুল্লাহ আল-লাইছি। উম্মে মাবাদের তাঁবুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তারা তার থেকে কিছু খেজুর ও গোশত কিনতে চাইলেন। কিন্তু পরিবারটির নিকট তারা এ জাতীয় কিছু পেলেন না। কেননা পরিবারটি ছিল দুর্ভিক্ষপীড়িত। এ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের তাঁবুর একপাশে একটি শীর্ণকায় বকরি দেখতে পেলেন। নবীজি সেটা দেখিয়ে বললেন, 'উম্মে মাবাদ, এই বকরিটার কী অবস্থা?'
উম্মে মাবাদ বলল, 'অতি দুর্বলতার কারণে সে বকরির পালের সাথে অগ্রসর হতে পারেনি, তাই এখানে পড়ে আছে।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এটার কি দুধ দোহন করা সম্ভব?'
উম্মে মাবাদ বলল, 'এমন চেষ্টা করাও অনর্থক হবে।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি কি আমাকে বকরিটির দুধ দোহনের অনুমতি দেবে?'
সে বলল, 'আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক! আপনি যদি সক্ষম হন তবে দুধ দোহন করুন।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বকরিটির নিকটে গিয়ে বকরিটির ওলান স্পর্শ করলেন, বিসমিল্লাহ বললেন এবং বরকতের দোয়া করলেন। আল্লাহ তাআলার কুদরতে তৎক্ষণাৎ বকরিটির ওলান দুধে পূর্ণ হয়ে গেল। শরীর হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠল। মুখে জাবর কাটতে লাগল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি পাত্র চাইলেন। পাত্র প্রদান করা হলে তিনি সেই পাত্র পূর্ণ করে দুধ দোহন করলেন, এমনকি দুধ উপচে পড়ার উপক্রম হলো। এরপর তিনি পরিতৃপ্তির সাথে পান করলেন। তাঁর সঙ্গীরাও পরিতৃপ্তির সাথে পান করলেন। এরপর অন্যরাও (উম্মে মাবাদের পরিবার) তৃপ্তির সাথে দুধ পান করল। অতঃপর পুনরায় তিনি প্রথমবারের মতো দুধ দোহন করে পাত্রটি পূর্ণ করলেন। এরপর এটা উম্মে মাবাদের নিকট অর্পণ করলেন, তার থেকে কিছুটা ক্রয় করলেন অতঃপর আবার সবাইকে নিয়ে সেখান থেকে নিজেদের পথে রওয়ানা করলেন। (১৩৩)
এই ঘটনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্বের প্রকাশ ঘটেছে। তিনি এখানে উম্মে মাবাদের সাথে ন্যায়পূর্ণ আচরণ করেছেন। অথচ তিনি বের হয়েছেন মুহাজির হিসেবে। সাথে তেমন কোনো পাথেয় নেই, না খাবার, না পানি। আর উম্মে মাবাদ তাঁকে চিনত না। খুব সহজেই তিনি তার থেকে সম্পদ নিয়ে নিমেষে চোখের আড়াল হয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে নবীসুলভ আচরণ করেছেন। জোর করে অন্যের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া ডাকাত ও দস্যুদের মতো আচরণ করেননি।
অপরিচিতদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন অনন্যসাধারণ আচরণ অনেক সাহাবির ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার অন্যতম প্রধান উপলক্ষ্য হয়েছে। এভাবে তাদের নিকট তাঁর নবুয়তের সত্যতা এবং উম্মতের প্রতি তাঁর সীমাহীন দরদ ও ভালোবাসা উদ্ভাসিত হয়েছে। নবীজির এই আচরণ তাদেরকে ইসলামের জন্য উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করেছে। যেমন মুনজির ইবনে জারির রা. তার পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন, আমরা একবার সকালের দিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত ছিলাম। এ সময় তাঁর কাছে জুতাহীন, বস্ত্রহীন, গলায় চামড়ার আবা পরিহিত এবং ঝুলন্ত তরবারি সাথে নিয়েই একদল লোকের আগমন ঘটল। এদের অধিকাংশ সদস্য কিংবা সকলেই ছিল মুজার গোত্রের লোক। অভাব-অনটনে তাদের এই করুণ অবস্থা দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখমণ্ডল বিবর্ণ ও বিষণ্ণ হয়ে গেল। তিনি নিজের কামরায় প্রবেশ করলেন। অতঃপর আবার বেরিয়ে এলেন। বিলাল রা.-কে আজান দিতে নির্দেশ দিলেন। বিলাল রা. আজান ও ইকামত দিলেন। নামাজ শেষ করে নবীজি উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন এবং এ আয়াত পাঠ করলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
হে মানবজাতি! তোমরা নিজেদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের মাত্র একজন ব্যক্তি থেকে (আদম আলাইহিস সালাম) সৃষ্টি করেছেন। এবং তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার সঙ্গিনী। এবং তাদের দুজনের মাধ্যমে অনেক পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় করো, যার দোহাই দিয়ে তোমরা একে অন্যের নিকট প্রার্থনা করো। এবং আত্মীয়তার সম্পর্ককেও ভয় করে চলো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। [সুরা নিসা : ১]
অতঃপর তিনি সুরা হাশরের শেষদিকের এই আয়াত পাঠ করলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আর প্রত্যেক ব্যক্তি যেন ভবিষ্যতের (আখিরাতের) জন্য কী সঞ্চয় করেছে সেদিকে লক্ষ করে এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। [সুরা হাশর: ১৮]
এরপর উপস্থিত লোকদের কেউ একটি দিনার, কেউ একটি দিরহাম, কেউ কাপড়, কেউ-বা এক সা'(১৩৪) আটা আবার কেউ এক সা' খেজুর দান করল। অবশেষে তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'অন্তত এক টুকরো খেজুর হলেও তোমরা নিয়ে এসো।' আনসার সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি একটি বড় থলে নিয়ে এলেন। থলের ভারে তার হাত নুয়ে পড়ছিল। এরপর লোকেরা সারিবদ্ধভাবে একের পর এক দান করতে লাগল। ফলে খাদ্য ও কাপড়ের দুটো স্তুপ হয়ে গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মুবারক স্বর্ণের মতো জ্বলজ্বল করতে লাগল। অতঃপর তিনি বললেন, 'যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে কোনো উত্তম কাজের প্রচলন করে, সে তার এই কাজের সওয়াব পাবে এবং তার পরে যারা এ কাজ করবে, সে এর বিনিময়েও সওয়াব পাবে। তবে এতে তাদের সওয়াবের কোনো অংশ কমানো হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে (ইসলাম পরিপন্থী) কোনো খারাপ কাজের প্রচলন করবে, তাকে এ কাজের বোঝা (গুনাহ ও শান্তি) বহন করতে হবে। তারপর যারা এই কাজ করবে, তাদের সমপরিমাণ বোঝা তাকেও বইতে হবে। তবে এতে তাদের অপরাধ ও শান্তির কোনো অংশই কমবে না।' (১৩৫)
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণ অপরিচিত ব্যক্তিদের সাথেও সুন্দর আচরণ করেছেন। বরং তাঁর এই অমায়িক অনন্যসাধারণ আচরণ অন্যদের ইসলামগ্রহণের কারণ হয়েছিল। যেমন যায়েদ ইবনে সাআনা রা.। তিনি ছিলেন একজন ইহুদি পাদরি। তিনি নিজের ইসলামগ্রহণের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, নবুয়তের আলামতসমূহের মধ্যে সকল আলামতই আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু মাত্র দুটি আলামতের পরীক্ষা বা প্রত্যক্ষ দর্শন তখনও আমার বাকি ছিল। আলামত দুটি হলো : ১. সহনশীলতা তাঁর ক্রোধের ওপর প্রবল হবে। ২. তাঁর সাথে যতই মূর্খতাসুলভ আচরণ করা হবে, ততই তাঁর সহনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
তারপর যায়েদ ইবনে সাআনা বললেন, আমি নবীজির এই দুটি আলামত পরীক্ষা করার সুযোগ খুঁজতে লাগলাম। তাঁর সাথে মিশতে লাগলাম, যাতে আলামত দুটি প্রত্যক্ষ করতে পারি। একদিন তিনি নিজের ঘরের বাইরে এলেন। তখন তাঁর সাথে ছিলেন হজরত আলি রা.। ইতিমধ্যে বেদুইনের মতো দেখতে এক লোক এসে আবেদন করল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমার গোত্র ইসলামগ্রহণ করেছে। আমি তাদেরকে বলেছিলাম, মুসলমান হয়ে গেলে তোমাদের রিজিকের আর কোনো অভাব থাকবে না। কিন্তু এখন তারা অনাবৃষ্টির কারণে দুর্ভিক্ষপীড়িত হয়ে পড়েছে। ভীষণ অভাব-অনটন তাদেরকে আঁকড়ে ধরেছে। আমার ভয় হচ্ছে, এ অবস্থায় তারা ইসলাম ছেড়ে না দেয়! তারা হয়তো যে সচ্ছলতার আশা নিয়ে ইসলামগ্রহণ করেছিল, আবার একই আশায় ইসলাম পরিত্যাগ করবে। যদি ভালো মনে করেন, তবে আপনি তাদেরকে কিছু সাহায্য করুন।'
লোকটির এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পাশের ব্যক্তি উমর রা.-এর দিকে তাকালেন। উমর রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, কিছুই তো মজুদ নেই।'
তখন আমি (যায়েদ ইবনে সাআনা) বললাম, 'হে মুহাম্মাদ, যদি আপনি অমুক ব্যক্তির বাগানের এই পরিমাণ খেজুর নির্দিষ্ট মেয়াদের শর্তে আমার নিকট বিক্রি করেন, তবে আমি অগ্রিম মূল্য দিয়ে দেবো এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে খেজুর নিয়ে নেব।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে ইহুদি, এটা হতে পারে না। বরং তুমি যদি বাগান নির্দিষ্ট না করো (শুধু খেজুরের পরিমাণ নির্দিষ্ট করো), তবে আমি এই চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারি।'
আমি তাঁর প্রস্তাব মেনে নিলাম এবং তিনি আমার সাথে চুক্তিবদ্ধ হলেন আর আমি আমার থলের মুখ খুলে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ খেজুরের মূল্য হিসেবে আশি মিছকাল (এক মিছকাল=৪.৫ গ্রাম) স্বর্ণ প্রদান করলাম। তিনি এই স্বর্ণ সেই বেদুইন ব্যক্তির হাতে দিয়ে বললেন, 'এগুলো দিয়ে তাদের অভাব দূর করে দাও।' (যায়েদ ইবনে সাআনা পরবর্তী সময়ে মুসলমান হন এবং তাবুক যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন।) (১৩৬)
সুন্দর হয়, আমরা যদি অপরিচিত ব্যক্তিদের সাথে নবীজির অমায়িক আচরণের একটি চমৎকার ঘটনা দিয়ে এই পরিচ্ছেদটি শেষ করি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ। অতিথিদের আপ্যায়নের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যধিক আগ্রহী। কিন্তু নিজের দরিদ্রতার কারণে তাঁর এই মনোবাসনা অনেক সময় অপূর্ণ রয়ে যেত।
একবার এক অপরিচিত 'আনসারি যুবক' মেহমান হিসেবে তাঁর নিকট আগমন করলেন। ঘটনাটি হজরত আবু হুরাইরা রা. বলেন, যুবকটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, আমি ভীষণ ক্ষুধার্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাঁর একজন স্ত্রীর কাছে কোনো খাবার আছে কি না তা খোঁজ নেওয়ার জন্য পাঠালেন। স্ত্রী বলে পাঠালেন, সেই সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, পানি ছাড়া আমার কাছে কোনো খাবার নেই। এরপর তিনি তাঁর আরেক স্ত্রীর কাছে পাঠালেন। সেখান থেকেও একই উত্তর এলো। এভাবে একে একে শেষ পর্যন্ত সকলেই একই কথা বলে পাঠালেন যে, সেই সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, পানি ছাড়া আমার নিকট এখন কোনো খাবার নেই।
তখন তিনি উপস্থিত লোকদের বললেন, 'এমন কে আছে যে আজ রাতে এই লোকটির মেহমানদারি করতে পারে? আল্লাহ তাআলা তার প্রতি অনুগ্রহ করবেন।' এক আনসারি সাহাবি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমি তার মেহমানদারি করাব...।' (১৩৭)
এভাবেই আমাদের প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপরিচিতদের সাথেও অত্যন্ত সুন্দর ও অমায়িক আচরণ করেছেন। এটা ছিল তাঁর নবুয়তের সত্যতার ওপর অন্যতম প্রমাণ। কেননা, তিনি তাঁর জীবনের সকল কাজে সকলের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত সহানুভূতিশীল, দয়ার্দ্র এবং উদার মনের অধিকারী।
টিকাঃ
৮৫. সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭।
৮৬. সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৪, মুসনাদে আহমাদ : ১২৪১৫।
৮৭. মুসনাদে আহমাদ: ২৪৭৯৩, সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫৭৬৯।
৮৮. সহিহ মুসলিম: ৩০০, সুনানে নাসায়ি: ৭০।
৮৯. সহিহ বুখারি: ৫২১১, সহিহ মুসলিম: ২৪৪৫।
৯০. সহিহ বুখারি: ৩৭৭০, সহিহ মুসলিম: ২৪৪৬।
৯১. তিনি হলেন উন্মুল মুমিনিন সাইয়েদা যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন সম্মানিতা স্ত্রী।
৯২. সহিহ বুখারি : ১১৫০, সহিহ মুসলিম: ৭৮৪।
৯৩. সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৯৯, মুসনাদে আহমাদ : ১৮৪১৮।
৯৪. সহিহ বুখারি: ৩৬০৭, সহিহ মুসলিম: ২৪৩৬।
৯৫. সহিহ মুসলিম: ২৩২৮, সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৮৬, মুসনাদে আহমাদ : ২৪০৮০।
৯৬. মুসনাদে আহমাদ: ২৬৯০৮, আস-সুনানুল কুবরা লিন-নাসায়ি : ৫/৩৬৯ (৯১৬২)।
৯৭. সহিহ বুখারি: ২৭৩১, ২৭৩২; সহিহ ইবনে হিব্বান : ৪৮৭২।
৯৮. সহিহ বুখারি: ৩৬২৩।
৯৯. ইবরাহিম : তিনি মারিয়া কিবতিয়া রা.-এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মুবারকের সাথে তার চেহারা অনেক মিল ছিল।-সম্পাদক
১০০. সহিহ মুসলিম : ২৩১৫। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হজরত আনাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যখন শিশু ইবরাহিমকে নিয়ে আসা হলো, তিনি তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন এবং আল্লাহর যা ইচ্ছা ছিল তাই বললেন। আনাস রা. বলেন, আমি দেখলাম ইবরাহিম অতি কষ্টে শ্বাস নিচ্ছে। (এ করুণ দৃশ্য দেখে) নবীজির দুচোখ বেয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। তিনি বললেন, 'চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে, হৃদয় অস্থির হচ্ছে, তবে আমার প্রভুর যাতে খুশি, তার বিপরীত কিছু বলব না। আল্লাহর কসম! হে ইবরাহিম, তোমার জন্য আমরা সবাই উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত।' সহিহ মুসলিম: ৫৮৫৩।
১০১. মুসনাদে আহমাদ: ৭৬৯, মুসতাদরাকে হাকেম : ৪৭৭৩।
১০২. সুনানে আবু দাউদ: ১১০৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬০০।
১০৩. সহিহ বুখারি : ৫১৬, সহিহ মুসলিম: ৫৪৩।
১০৪. সুনানে নাসায়ি : ১১৪১, মুসনাদে আহমাদ: ১৬০৭৬, মুসতাদরাকে হাকেম : ৪৭৭৫।
১০৫. সহিহ বুখারি : ৫৯৯৭, ৫৫৭১; সুনানে আবু দাউদ: ৫২১৮।
১০৬. সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫৫২৪, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ৭/৩৮।
১০৭. সহিহ বুখারি : ৬৬০, ৬২৭।
১০৮. সহিহ বুখারি : ৬০৭৭।
১০৯. সহিহ বুখারি : ২৮৪৬।
১১০. সুনানে তিরমিজি : ৩৬৮০, মুসতাদরাকে হাকেম : ৩০৪৬।
১১১. সহিহ বুখারি : ৩৭৪২।
১১২. সহিহ বুখারি : ৪৩৮০।
১১৩. সহিহ মুসলিম : ২০৫২।
১১৪. মুসনাদে আহমাদ: ১২৬৬৯।
১১৫. সহিহ বুখারি : ২৯০৫, ২৮৫৩; সহিহ মুসলিম : ২০৩৯।
১১৬. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/২৮, সুহাইলি : আর-রওজুল উনুফ: ৪/১৬৬।
১১৭. সহিহ মুসলিম : ১৫৫৬, ৩৮৩৬, সুনানে তিরমিজি : ৬৫৫, সুনানে নাসায়ি : ৪৫৩০, সুনানে আবু দাউদ : ৩৪৬৯।
১১৮. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/১৭২।
১১৯. সহিহ বুখারি : ৪০৮, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৪৭৯।
১২০. ইয়ামেনের রাজধানী।-সম্পাদক
১২১. ইয়ামেনের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি শহর।-সম্পাদক
১২২. সহিহ বুখারি : ৩৪১৬, সুনানে আবু দাউদ: ২৬৪৯, মুসনাদে আহমাদ: ২১০৯৫।
১২৩. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৬২০, সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ : ৩/৬২, ইমাম তাবারি : তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক : ২/২৯।
১২৪. হাদিসটিকে ইমাম বুখারি রহ. 'মানাকিবুস সাহাবা' ও মুসলিম রহ. 'ফাজায়িলুস সাহাবা' অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। আর ইমাম তিরমিজি রহ. উল্লেখ করেছেন 'মানাকিব' অধ্যায়ে। সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৫৪।
১২৫. ইবনে কাছির : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/৪২৩, ইবনে সাইয়েদিন নাস : উয়ুনুল আছার : ১/৩৭১, ইমাম তাবারি : তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক : ২/২২।
১২৬. মাহমুদ শিত খাত্তাব : আর-রাসুলুল কায়িদ : ২৮৮।
১২৭. সুহাইলি : আর-রওজুল উনুফ: ২/৩১৫, ইবনে কাছির: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৩/১৭৯-১৮২, ইবনুল কাইয়িম: জাদুল মাআদ : ৩/৪৫।
১২৮. সহিহ বুখারি : ৩৬৫৩, ৩৯২২, ৩৩৯১; সহিহ মুসলিম: ২৩৮১, সুনানে তিরমিজি : ৩০৯৬।
১২৯. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ১/৪৯৫। ইবনে কাছির : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/৩০৬। সুহাইলি : আর-রওজুল উনুফ : ২/৩৩৬।
১৩০. সহিহ বুখারি : ৯৪৬, সহিহ মুসলিম : ১৭৭০, সহিহ ইবনে হিব্বান : ১৪৮৪।
১৩১. তিনি সাওয়াদ ইবনে গাজিয়া আনসারি। বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। এরপর আরও বহু যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তিনিই বদরযুদ্ধের দিন খালেদ ইবনে হিশাম আল-মাখজুমিকে বন্দি করেছিলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে খায়বারের গভর্নর নিযুক্ত হন। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন ইবনুল আছির : উসদুল গাবাহ : ২/৫৬১, ইবনে আবদুল বার : আল-ইসতিআব: ২/৬৭৩।
১৩২. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৬২৬, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ২/৪১০।
১৩৩. মুসতাদরাকে হাকেম : ৪২৭৪।
১৩৪. এক সা' = ৩২৭০.৬০ গ্রাম (প্রায়)। সূত্র: মাসিক আল কাউসার, জুলাই-আগস্ট ২০১১।-সম্পাদক
১৩৫. সহিহ মুসলিম: ২৩৯৮, সুনানে নাসায়ি: ২৫৫৪, মুসনাদে আহমাদ : ১৯২২৫।
১৩৬. সহিহ ইবনে হিব্বান : ২৮৮, মুসতাদরাকে হাকেম : ৬৫৪৭।
১৩৭. সহিহ মুসলিম : ২০৫৪, সহিহ ইবনে হিব্বان : ৫২৮৬।
১৩৮. ঈষৎ পরিমার্জিত।-সম্পাদক
১৩৯. সহিহ বুখারি : ৪৪০৬, ৪৬৬২, ১৬৭১; সহিহ মুসলিম: ১৬৭৯, সুনানে আবু দাউদ : ১৯৪৭, মুসনাদে আহমাদ: ১৯৮৭৩।
১৪০. সহিহ বুখারি : ২৬৫৩, সুনানে নাসায়ি: ৪০০৯, মুসনাদে আহমাদ: ৬৮৮৪।
১৪১. সহিহ বুখারি: ৫৭৭৮, সহিহ মুসলিম : ১০৯।
১৪২. সহিহ মুসলিম: ২৬১৩, ৬৪৬৯, সুনানে আবু দাউদ: ৩০৪৫, মুসনাদে আহমাদ: ১৫৩৬৬।
১৪৩. মুসনাদে আহমাদ: ২৩৫৩৬। ইমাম তাবারানি: মুজামুল কাবির : ১৪৪৪৪।
১৪৪. ইমাম বাইহাকি : শুআবুল ঈমান: ৫১৩৫।
১৪৫. সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৭৩, সুনানে তিরমিজি: ১৩২২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৩১৫।
১৪৬. সহিহ বুখারি : ২৩০৬, ২৩৯০, সহিহ মুসলিম : ১৬০১, সুনানে তিরমিজি : ১৩১৭, সুনানে নাসাঈ: ৪৬১৮।
১৪৭. সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৮২, সুনানে তিরমিজি: ১৩৩১, মুসনাদে আহমাদ: ৮৮২।
১৪৮. স্বাধীন ধর্ম লালনের ক্ষেত্রে 'অধিকার' শব্দের বদলে 'ছাড়/সুযোগ দেওয়া হয়েছে' কথাটুকু এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত। কারণ, ইসলাম নিন্দাহীনভাবে কারও জন্য কুফরি বিশ্বাস লালন করার অধিকার দেয়নি। যেমন, এ প্রসঙ্গে উল্লিখিত আয়াতের পরবর্তী অংশটি হচ্ছে, ﴿قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ﴾ (হেদায়েতের পথ পথভ্রষ্টতার পথ থেকে স্পষ্টরূপে পৃথক হয়ে গেছে)। অতএব আয়াতটির মর্ম হচ্ছে, আল্লাহর পথ আর শয়তানের পথের পার্থক্য হয়ে গেছে। এখন দুনিয়ার এই পরীক্ষাগৃহে যার যেটা ইচ্ছা গ্রহণ করে আখেরাতে আগমন করুক!-সম্পাদক
১৪৯. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৪১১, তাবারি : তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক : ২/৫৫, ইবনে কাছির: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ৪/৩০১।
১৫০. বাইহাকি : আস-সুনানুল কুবরা : ১৩০৬১, সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ: ৫/২৪৫, ২৪৬, ইবনে সাইয়েদিন নাস : উয়ুনুল আছার: ১/৪১২, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ৩/২৪।
১৫১. মুসতাদরাকে হাকেম : ৭৩০৭, ইমাম তাবারানি: মুজামুল কাবির : ৭৫০, ইমাম বাইহাকি : শুআবুল ঈমান : ৩২৩৮।
১৫২. সহিহ বুখারি : ২৪৮৬, সহিহ মুসলিম : ২৫০০।
১৫৩. উল্লেখ্য, ইসলাম মানুষ হিসেবে মৌলিকভাবে নারী-পুরুষকে সমান দৃষ্টিতে বিচার করেছে। পক্ষান্তরে আনুষঙ্গিক বিধিবিধানের ক্ষেত্রে উভয়ের প্রাকৃতিক অবস্থা ও যোগ্যতা-সামর্থ্যের প্রতি লক্ষ রেখে অনেক ক্ষেত্রে পার্থক্যপূর্ণ অধিকার ও কর্তব্য প্রদান করেছে। আধুনিক নারীবাদী মানসে সকল ক্ষেত্রে সাম্যের যে ধারণা, ইসলাম সেই সাম্য অস্বীকার করে। বস্তুত তা অদূরদর্শী চিন্তাচেতনা থেকে উদ্ভূত।-সম্পাদক
১৫৪. সুনানে তিরমিজি: ১১৩, সুনানে আবু দাউদ: ২৩৬, মুসনাদে আহমাদ : ২৬৩২৮।
১৫৫. সহিহ বুখারি: ৩৩৩১, সহিহ মুসলিম: ১৪৬৮, সুনানে তিরমিজি: ১১৮৮, মুসনাদে আহমাদ : ১০৪৭৫।
১৫৬. সহিহ বুখারি : ৬০০১, সুনানে তিরমিজি: ৩১৮২, মুসনাদে আহমাদ: ৪১৩১।
১৫৭. সহিহ বুখারি : ৫৯৯৫, সহিহ মুসলিম: ২৬২৯।
১৫৮. সহিহ বুখারি: ৪৭৯৫।
১৫৯. সহিহ মুসলিম : ১৪২১, সহিহ মুসলিম: ৩৩৪০, সুনানে তিরমিজি : ১১০৮।
১৬০. সহিহ বুখারি : ৫১৩৬, সহিহ মুসলিম : ২৬২৯।
১৬১. মুসনাদে আহমাদ: ১৭১৯৫, ইমাম তাবারানি: মুজামুল কাবির : ১৫৩৫৬।
১৬২. সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬৭৮, মুসনাদে আহমাদ: ৯৬৬৪, মুসতাদরাকে হাকেম: ২১১।
১৬৩. সহিহ বুখারি : ৫২৭৬।
১৬৪. সহিহ বুখারি: ৩০৩৩, সহিহ মুসলিম: ২৪১৫, সুনানে নাসায়ি: ৮২৪৩।
১৬৫. কোনো কিছুর প্রতি আশ্চর্য প্রকাশ বা উৎসাহ প্রদানের জন্য আরবরা এ বাক্যটি ব্যবহার করত।-সম্পাদক
১৬৬. সহিহ বুখারি: ৫০৯০, সহিহ মুসলিম: ১৪৬৬।
১৬৭. সুনানে তিরমিজি: ১০০৪。
১৬৮. গর্ভবতী মায়ের জন্য রমজানের রোজা না রাখার এ বিধান নিঃশর্ত নয়। যদি রোজা রাখার কারণে গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা হয়, কিংবা গর্ভবতী মায়ের মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয় থাকে, তাহলে রোজা রাখবে না। তার জন্য রোজা না রাখা ও ভাঙা জায়েজ আছে। পরবর্তী সময়ে এর কাজা করে নেবে। (ফাতাওয়ায়ে রহিমিয়া: ৭/৪০৪, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া: ৩/৪০৪)-সম্পাদক।
১৬৯. সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৫০, মুসনাদে আহমাদ: ১৯০৫৪।
১৭০. সুনানে আবু দাউদ: ২৮৪৪, মুসনাদে আহমাদ: ৬৮২২, মুসতাদরাকে হাকেম: ৭৫৯২।
১৭১. সহিহ বুখারি: ২৫৮৭, সহিহ মুসলিম: ১৬২৩।
১৭২. সহিহ মুসলিম: ৩০০৯, সুনানে আবু দাউদ: ১৫৩২।
১৭৩. সুনানে আবু দাউদ: ২৯২০, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৭৫০।
১৭৪. সহিহ বুখারি: ১৩১, সহিহ মুসলিম: ২৮১১।
১৭৫. তিনি হলেন উমর ইবনে আবু সালামা রা.। অধিক তথ্যের জন্য দেখুন, ইবনে আবদুল বার রহ. রচিত আল-ইসতিআব: জীবনী নং: ১৬৯৯, ইবনে হাজার আসকালানি রহ. রচিত: আল-ইসাবা: জীবনী নং: ৫৭৪৪।
১৭৬. সহিহ বুখারি: ৫৩৭৬।
📄 নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের প্রমাণ
এই ছোট্ট পৃথিবীতে কত মানুষের সমাগম! কতরকম তাদের সম্মান ও মর্যাদার বাহার! এই বিশাল মানবগোষ্ঠীর মাঝে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড় কারণ হলো, তিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত একজন রাসুল। এ কারণে তাঁর পরিচয়ে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ
আর মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একজন রাসুল ছাড়া অন্য কিছু নন! [সুরা আলে ইমরান : ১৪৪]
তিনি ছাড়া আরও অনেক রাসুল (আলাইহিমুস সালাতু ওয়াসসালাম) মানুষকে তাঁর প্রতিপালকের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য জগতে আগমন করেছেন। তাঁরা আনুগত্যশীল মানুষদের জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন আর অবাধ্য ব্যক্তিদের জাহান্নাম সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। আর এটাই ছিল সকল রাসুল ও নবীর দায়িত্ব-কর্তব্য। যেমনটা আমাদের প্রতিপালক কুরআনুল কারিমে উল্লেখ করেছেন,
رُسُلًا مُّبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا
এ সকল রাসুল এমন, যাদেরকে (সওয়াবের) সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নাম সম্পর্কে) সতর্ককারীরূপে পাঠানো হয়েছিল, যাতে রাসুলগণের (আগমনের) পর আল্লাহর সামনে মানুষের কোনো অজুহাত বাকি না থাকে। আর আল্লাহ মহা ক্ষমতাবান, প্রজ্ঞাময়। [সুরা নিসা: ১৬৫]
কিন্তু তাঁর রিসালাত প্রমাণিত হবে কীভাবে? কারণ, খুব সহজেই যেকোনো মানুষ দাবি করে বসতে পারে যে, সে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে একজন রাসুল। (২৩১) এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রত্যেক রাসুলকে বিশেষ কিছু মুজিজা প্রদান করেছেন। এগুলোই প্রমাণ করে প্রকৃতই তাঁরা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসুল ও বার্তাবাহক। এ মুজিজাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, জগতের সকল মানুষ মিলেও এ ধরনের মুজিজা বা অলৌকিক কিছু দেখাতে বা উপস্থিত করতে পারবে না। এ কারণে জগতের সকলেই এই মুজিজাগুলোর মহত্ত্ব, বড়ত্ব ও অনন্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। আর যেহেতু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও একজন রাসুল ছিলেন, এ কারণে তাঁর প্রতিপালক তাঁকেও এমন অনেক মুজিজা প্রদান করেছেন, যেগুলো তাঁর নবুয়তের সত্যতাকে প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত করে।
আমরা এখানে খুবই সংক্ষেপে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিজার প্রধান ও শক্তিশালী কিছু দিক উপস্থাপন করতে চাই। তবে সেইসাথে এটাও বলে রাখি, আসলে এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল মুজিজা একত্র করা কিংবা উপস্থাপন করার ইচ্ছা আমরা রাখি না। কারণ, সকল মুজিজা একত্র করতে গেলে বড় বড় অনেকগুলো খণ্ডের প্রয়োজন পড়বে, একটি বিশাল বিশ্বকোষ হয়ে দাঁড়াবে। আমরা জানি, বিষয়ের ভিন্নতা অনুযায়ী এ সকল মুজিজা কয়েক প্রকার। এগুলো আমরা নিচের কয়েকটি শিরোনামে উপস্থাপন করার ইচ্ছা রাখি।
নিচের পরিচ্ছেদগুলোয় আমরা তাঁর কিছু মুজিজা ও নবুয়তের প্রমাণ উপস্থাপন করার চেষ্টা করব।
টিকাঃ
২৩১. পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে। অনেকেই মিথ্যা দাবি করে বসেছে যে, সে স্রষ্টা বা ঈশ্বরের পক্ষ থেকে নবী বা বিশেষ বার্তাবাহক। কিংবা বিশেষ আশীর্বাদপ্রাপ্ত, সাধারণ মানুষের মতো নয়। এটা সুদূর অতীতে যেমন ঘটেছে, ঘটেছে নিকট অতীতেও, এমনকি বর্তমানেও ঘটে চলেছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল ও নবীদের বিশেষ মুজিজার মাধ্যমে তাদের সত্যতা প্রমাণিত করেছেন এবং নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে তাঁর রিসালাতের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। এ কারণে তাঁর পরবর্তী নবুয়তের দাবিদার সকলেই মিথ্যাবাদী ভণ্ড প্রতারক ও কাফের হিসেবে গণ্য হবে।-অনুবাদক
📄 অমুসলিমদের সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ
আল্লাহ তাআলা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেছেন এবং তাঁর মাধ্যমেই রিসালাতের সমাপ্তি টেনেছেন। তাঁর রিসালাত বা বার্তা জগদ্বাসীর জন্য রহমত ও পথনির্দেশনা। সুতরাং নবী হিসেবে তিনি এজন্য আগমন করেননি যে, তিনি এসে অন্যদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবেন এবং তাদের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতার আগুন জ্বালিয়ে দেবেন। তিনি এসেছেন সঠিক পথের দিশা দিতে, মানুষকে তাদের ভালো কাজের সুসংবাদ এবং মন্দ কাজের জন্য সতর্কবাণী শোনাতে। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, অন্য নবীগণ (তাদের ওপর আল্লাহ তাআলার রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক) হুবহু ওই শিক্ষাই এনেছিলেন, যা তিনি এনেছেন, এটা ভিন্নকিছু নয়। এজন্য তিনি সর্বদাই মানুষের মাঝে এই অভিন্ন মর্মবাণী প্রকাশের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। কুরআনুল কারিমের অনেক আয়াতে তাঁকে এ বিষয়টি ঘোষণা করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
قُلْ مَا كُنْتُ بِدْعَا مِنَ الرُّسُلِ
আপনি বলে দিন, আমি নতুন কোনো নবী নই (অর্থাৎ আমার আগে কোনো নবীর আগমন ঘটেনি, আমিই প্রথম, বিষয়টি এমন নয়)। [সুরা আহকাফ: ৯]
অন্য ধর্মানুসারীদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচার-ব্যবহার ছিল খুবই মার্জিত ও উন্নত। তিনি এর প্রেরণা লাভ করেছিলেন আল্লাহ তাআলার এই বাণী থেকে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
(وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا)
বাস্তবিকপক্ষে আমি আদমসন্তানকে মর্যাদা দান করেছি এবং স্থলে ও জলে তাদের জন্য বাহনের ব্যবস্থা করেছি, তাদের উত্তম রিজিক দান করেছি এবং আমার বহু মাখলুকের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। [সুরা ইসরা: ৭০]
এ কারণে একদিনের জন্যেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারও ওপর জুলুম করা বা কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার চিন্তাও করেননি। কাউকে নিজের ধর্ম ত্যাগ করে ইসলামগ্রহণে বাধ্য করেননি। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
(وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَا مَنَ مَنْ فِي الْأَرْضِ كُلُّهُمْ جَمِيعًا أَفَأَنْتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّى يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ)
আপনার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে ভূপৃষ্ঠে বসবাসকারী সকলেই ঈমান আনত। তবে কি আপনি মানুষের ওপর চাপ প্রয়োগ করবেন, যাতে তারা সকলে মুমিন হয়ে যায়? (অর্থাৎ আপনি ইসলামগ্রহণের ওপর কাউকে চাপ প্রয়োগ করবেন না)। [সুরা ইউনুস: ৯৯]
এরপরও কিছু বিদ্বেষী মানুষ ইসলাম ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে নানা ধরনের অভিযোগ ও আপত্তি ওঠায় এবং বিভিন্নপ্রকার সন্দেহ-সংশয় আরোপ করে, অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন এগুলো থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এ কারণে আমরা এখানে অমুসলিমদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাচার নিয়ে স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় প্রতিষ্ঠা করেছি। যাতে অমুসলিমদের সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচার-আচরণ এবং শিষ্টাচার উঠে আসে। আর এই অধ্যায়টির আলোচনা নিচের কয়েকটি শিরোনামে উপস্থাপিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
নিচের পরিচ্ছেদগুলোয় আমরা অমুসলিমদের সাথে তাঁর আচার- আচরণ ও শিষ্টাচার সংক্রান্ত আলোচনা উপস্থাপন করার চেষ্টা করব।