📘 উলুমুল কুরআন 📄 তাসলিম স্বীকৃতি ভিত্তিক দলীল

📄 তাসলিম স্বীকৃতি ভিত্তিক দলীল


(৫) তাসলীম-স্বীকৃতি ভিত্তিক দলীল :
যুক্তি দলীলের চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ দলীল হলো "তাসলীম”। অর্থাৎ প্রতিপক্ষের কোনো কথা অথবা দাবীকে মেনে নিয়ে এ কথা বলা যে, এটা মেনে নেওয়ার পরও উদ্দেশ্য হাসিল হয় না। কাফেররা বলে বেড়াত যে, আমাদের নিকট কোনো মানুষের পরিবর্তে কোনো ফেরেশতাকে নবী বানিয়ে প্রেরণ করা হলো না কেন? তাদের এই প্রশ্নের জবাব আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা কয়েকভাবে দিয়েছেন। সেগুলোর মধ্যে হতে একটি হচ্ছে— وَلَوْ جَعَلْنَاهُ مَلَكًا لَّجَعَلْنَاهُ رَجُلًا 'আমি যদি তাঁকে ফেরেশতা করেও প্রেরণ করতাম, তাহলে তাঁকে মানুষের আকৃতিতেই প্রেরণ করতাম।' অর্থাৎ প্রথম কথা তো হলো, কোনো নবীর জন্য ফেরেশতা হওয়া আবশ্যক নয়। কিন্তু তারপরও তোমাদের কথা মেনে নিয়ে আমি যদি ফেরেশতাও প্রেরণ করতাম তাহলেও তোমাদের উদ্দেশ্য হাসিল হতো না। কারণ আমি ফেরেশতাকেও তার আসল গঠন-আকৃতিতে প্রেরণ করতাম না। কারণ তোমাদের মধ্যে তার আসল গঠন-আকৃতি দেখার যোগ্যতা নেই। কাজেই তাকে মানব-আকৃতিতেই প্রেরণ করা হতো। আর তখনও তোমরা তার প্রতি ঈমান আনতে না।

টিকাঃ
৪২৫. সূরা আনআম: ৯

📘 উলুমুল কুরআন 📄 ইন্তেকাল –পরিবর্তন ভিত্তিক দলীল

📄 ইন্তেকাল –পরিবর্তন ভিত্তিক দলীল


(৬) ইন্তেকাল-পরিবর্তন ভিত্তিক দলীল :
মানতিকী পদ্ধতিতে মুনাযিরা-বিতর্কের ক্ষেত্রে কখনো কখনো এমনও হয় যে, বাদী একটি দলীল পেশ করে। প্রতিপক্ষ বক্র বুঝসম্পন্ন হবার কারণে এর উপর পাল্টা কোনো প্রশ্ন করে বসে। এমতাবস্থায় বাদী তার এই পাল্টা প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে অন্য আরেকটি দলীল পেশ করে। এর উদ্দেশ্য হলো এটা প্রকাশ করা যে, তোমার এই প্রশ্ন করাটা নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক। এই পদ্ধতিকে বলা হয় "ইন্তেকাল”।

হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর একটি ঘটনায় এর উজ্জ্বল উদাহরণ রয়েছে। নমরূদের সাথে যখন তাঁর বিতর্ক হয়েছিল, হযরত ইবরাহীম (আ.) দলীল পেশ করলেন— رَبِّيَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ 'আমার প্রভু তো তিনি, যিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন।' তখন নমরূদ একজন নিরপরাধ লোককে হত্যা করে এবং অন্যকে মুক্ত করে বলল— أَنَا أُحْيِي وَأُمِيتُ 'আমিও জীবন দান করি এবং মৃত্যু দান করি।' হযরত ইবরাহীম (আ.) বুঝতে পারলেন যে, এই আহাম্মক তো জীবন ও মৃত্যুর অর্থই বুঝে না। তাই তিনি সঙ্গে সঙ্গেই তাকে নির্বাক করে দেওয়ার মতো আরেকটি দলীল পেশ করলেন— فَإِنَّ اللَّهَ يَأْتِي بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ 'নিশ্চয়ই আল্লাহ পূর্বদিক থেকে সূর্য আনেন। অতএব, তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে আন।' এটা ছিল “ইন্তেকাল”। যার দ্বারা নমরূদের বাকপটুতা নিমেষেই চুপসে যায়। فَبُهِتَ الَّذِي كَفَرَ 'ফলে কাফের ব্যক্তি হতভম্ব হয়ে গেল।'

টিকাঃ
৪২৬. সূরা বাকারা: ২৫৮

📘 উলুমুল কুরআন 📄 চাক্ষুষ দলীল : প্রত্যক্ষ অবলোকন ভিত্তিক দলীল

📄 চাক্ষুষ দলীল : প্রত্যক্ষ অবলোকন ভিত্তিক দলীল


(৭) চাক্ষুষ দলীল : প্রত্যক্ষ অবলোকন ভিত্তিক দলীল :
দলীলের তৃতীয় প্রকার হলো চাক্ষুষ দলীল (যা প্রত্যক্ষ বস্তুর সাথে সম্পর্ক রাখে)। পবিত্র কুরআনুল কারীম এ ধরনের দলীল অধিকহারে ব্যবহার করেছে। কারণ মোশাহাদা এমন একটি চাক্ষুষ বিষয়, যা দেখে একজন সাধারণ মানুষও স্রষ্টার অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারে। এ জন্য মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন বারবার নতুন নতুন ভঙ্গিতে চাক্ষুষ দলীলসমূহ উল্লেখ করেছেন। তাওহীদের দলীল পেশ করতে গিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা সূরা আন-নামালে চমৎকার উপমা দিয়েছেন—
أَمَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَأَنزَلَ لَكُم مِّنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَنبَتْنَا بِهِ حَدَائِقَ ذَاتَ بَهْجَةٍ... أَمَّن جَعَلَ الْأَرْضَ قَرَارًا وَجَعَلَ خِلَالَهَا أَنْهَارًا... أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ... 'নাকি তিনি, যিনি সৃষ্টি করেছেন আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং আকাশ হতে তোমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করেন... আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাস্য আছে কি?'

অর্থাৎ, যে সত্ত্বা একাই এত বিরাট-বিশাল কাজ আঞ্জাম দিয়ে থাকেন তার জন্য ছোট ছোট কাজের ক্ষেত্রে তাঁর জন্য কোনো সহকারীর প্রয়োজন হবে কেন? অন্যস্থানে পরকালের সত্যতা প্রমাণকল্পে ইরশাদ করেছেন— أَفَلَمْ يَنظُرُوا إِلَى السَّمَاءِ فَوْقَهُمْ كَيْفَ بَنَيْنَاهَا وَزَيَّنَاهَا... 'তারা কি তাদের উপরে অবস্থিত আকাশের দিকে তাকায় না, কীভাবে আমি তাকে বানিয়েছি, তাকে সুশোভিত করেছি...।'

পবিত্র কুরআনুল কারীমে মানুষের দেহ, আত্মা, সৃষ্টি রহস্য, জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদির সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব কথা বর্ণিত হয়েছে, তার অধিকাংশ ই মোশাহাদা বা চাক্ষুষ দলীলের আওতাভুক্ত। মহাশূন্য ও সৃষ্টি জগতের উপর গভীর চিন্তা-গবেষণা করার তাকিদ এসেছে এ জন্যই যে, মানুষ স্রষ্টার কুদরতের স্বীকৃতি দেয়। এই আলোচনার মাধ্যমে কুরআন বহু বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের পর্দা উন্মোচন করেছে, তবে এটাকে স্বতন্ত্র সাইন্সের বই মনে করা ভুল হবে।

টিকাঃ
৪২৭. সূরা আন-নামাল, ৬০-৬৩
৪২৮. আরবের কাফের সম্প্রদায় জানত যে, এ সকল কাজ আল্লাহ তাআলাই করেন। তবে তারা মনে করত তাঁর সহকারী প্রয়োজন। মুহাম্মদ তাকী।
৪২৯. সূরা ক্বাফ: ৬-১১

📘 উলুমুল কুরআন 📄 তারেবা তথা অভিজ্ঞতালব্ধ দলীল

📄 তারেবা তথা অভিজ্ঞতালব্ধ দলীল


(৮) তাজরেবা তথা অভিজ্ঞতালব্ধ দলীল :
পবিত্র কুরআন মাজীদ পূর্ববর্তী জাতির কৃতকর্ম ও পরিণতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বহু স্থানে ইরশাদ করেছে— أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ... 'তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? তাহলে তারা দেখত যে, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কী হয়েছিল।' অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে— وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِن قَرْيَةٍ بَطِرَتْ مَعِيشَتَهَا... 'আমি কত জনপদকে ধ্বংস করেছি যারা তাদের জীবনে চরম উৎকর্ষ সাধন করেছিল।'

পবিত্র কুরআন মাজীদ এ ধরনের অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষামূলক ঘটনাগুলো আলোচনা করে এ কথা প্রমাণ করতে চায় যে, যেসব জাতি স্বীয় জীবনকে ভ্রান্ত মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং হেদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, আমি সর্বদা তাদেরকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করেছি।

টিকাঃ
৪৩০. সূরা রূম : ৯
৪৩১. সূরা কাসাস : ৫৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px