📄 মানতিকী দলীল বা যুক্তিনির্ভর
(২) মানতিকী দলীল বা যুক্তিনির্ভর :
মানতিকী দলীলসমূহেরও অনেকগুলো প্রকার রয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও সর্বাধিক ব্যবহৃত প্রকারটিকে পরিভাষায় "কেয়াসে ইকতেরানী" বলা হয়। এই “কেয়াসে ইকতেরানী”র মধ্যে সাধারণত একটি ব্যাপক মূলনীতি বর্ণনা করা হয় এবং নিজের দাবীকে ওই নীতিমালার সাথে মিলানো হয়। পবিত্র কুরআনুল কারীমে এর অনেক উদাহরণ রয়েছে। সূরা ত্বহা'র মধ্যে রয়েছে— যখন হযরত মূসা (আ.) যাদুকরদের মুকাবিলায় উপনীত হলেন এবং তাদের রশি ও লাঠিগুলো সাপে পরিণত হয়ে চলতে লাগল, তখন হযরত মূসা (আ.) কিছুটা ভয় অনুভব করলেন। ওই সময় আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা তাঁকে অভয় ও সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বললেন, ভয়ের কোনো কারণ নেই। আপনিই বিজয়ী হবেন। কেননা- إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرٍ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى 'তারা যা করেছে, তাতো কেবল যাদুকরের কৌশল। আর যাদুকর যেখানেই আসুক না কেন, সে সফল হবে না'।
এটি হচ্ছে 'কেয়াসে ইকতেরানী'র উদাহরণ। যার মধ্যে সুগরা এবং কুবরা উভয়টি রয়েছে। আর এ ধরনের উদাহরণ তো পবিত্র কুরআনুল কারীমে অনেক রয়েছে, যার মধ্যে কোনো মুকাদ্দিমা বা পটভূমি উহ্য থাকে। যেমন, কাফের সম্প্রদায় বলে বেড়াত যে, যখন মানুষের অস্থিমজ্জা মাটিতে পরিণত হয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে, তখন এটা কিভাবে সম্ভব যে, কেয়ামতের দিন সেগুলোকে নতুন করে আবার জীবিত করা হবে? মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, এটা অবশ্যই সম্ভব। কেননা- بَلَى قَادِرِينَ عَلَى أَن تُسَوِّيَ بَنَانَهُ 'হ্যাঁ, আমি তার আঙুলের অগ্রভাগসমূহও পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম।'
এটি হলো সুগরা। এখানে কুবরা উহ্য আছে। অর্থাৎ যিনি অঙ্গুলির অগ্রভাগকে সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম, তিনি অবশ্যই অস্থিমজ্জাকেও দ্বিতীয় বার জীবিত করতে সক্ষম। কারণ আঙুলের অগ্রভাগে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা যে রেখা-চিহ্ন অঙ্কন করেছেন, তা মহান আল্লাহ পাকের পূর্ণাঙ্গ কুদরত ও পরিপূর্ণ প্রজ্ঞার এক বিরল ও বিস্ময়কর নিদর্শন যে, কোটি কোটি মানুষ যারা এই দুনিয়ায় এসেছে, তাদের মধ্য হতে কারো রেখা অপর কারো রেখার সাথে মিলে না। এই আধা ইঞ্চি জায়গায় মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন কেমন অলৌকিক নিদর্শন রেখে দিয়েছেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তির হস্তরেখা অপর ব্যক্তির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
টিকাঃ
৪২০. সূরা ত্বহা : ৬৯
৪২১. মানতিকের পরিভাষায় কেয়াসে ইকতেরানীর প্রথমাংশ কে বলা হয় 'সুগরা'। আর দ্বিতীয় অংশকে বলা হয় 'কুবরা।
৪২২. সূরা কেয়ামাহ: ৪
📄 কেয়াসে ইতেসায়ী বা পার্থক্যকরন কেয়াসী দলীল
(৩) কেয়াসে ইস্তেস্নায়ী বা পার্থক্যকরন কেয়াসী দলীল :
মানতিকী দলিলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকার হলো কেয়াসে ইস্তেস্নায়ী। এই দলীলটি সাধারণত কোনো বিষয়কে নেতিবাচক করার জন্য ব্যবহার করা হয়। এর দু'টি অংশ থাকে। প্রথম অংশ তথা সুগরার মধ্যে যে বিষয়টিকে নেতিবাচক করা উদ্দেশ্য হয়, সেটাকে অন্য একটা বিষয়ের উপর নির্ভরশীল করে দেওয়া হয়। আর দ্বিতীয় অংশ তথা কুবরার মধ্যে ওই বিষয়টিকে নেতিবাচক করা হয়, যার উপর প্রথম অংশকে নির্ভরশীল করা হয়েছিল। যেমন, আমাকে এটা প্রমাণ করতে হবে যে, "এখন দিন নয়।” তখন আমি বলব, “এখন যদি দিনই হতো, তাহলে সূর্য বিদ্যমান থাকতো। কিন্তু যখন সূর্য বিদ্যমান নেই। কাজেই এখন দিন নয়।" এ ধরনের আরো বহু দলীল পবিত্র কুরআনুল কারীমে রয়েছে। যেমন, শিরককে অস্বীকৃতি ও তাওহীদকে সাব্যস্ত করতে গিয়ে ইরশাদ হয়েছে— لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا 'অর্থাৎ যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া বহু ইলাহ থাকত, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত।' এটি হচ্ছে সুগরা। এর কুবরা উহ্য রয়েছে—তা হচ্ছে, “জমিন ও আসমান ধ্বংস হয়নি”। অতএব, বুঝা গেল যে, জমিন ও আসমানে আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা ব্যতীত আর কোনো মা'বুদ বা ইলাহ নেই।
টিকাঃ
৪২৩. কেননা এক ইলাহ এক ধরনের কাজ করতে চাইতেন, আর অন্য ইলাহ আরেকটি কাজের ইচ্ছা করতেন। ফলে উভয়ের মাঝে লড়াই বেঁধে যেত। আর এভাবে ফেতনা-ফ্যাসাদ ছড়িয়ে পড়ত।
📄 সাবর ও তাকসীম অনুসন্ধানও বিভাজন রীতি
(৪) সাবর ও তাকসীম অনুসন্ধানও বিভাজন রীতি :
প্রকাশ থাকে যে যুক্তি ভিত্তিক দলীলসমূহের মধ্য হতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলীল হলো, “সাবর ও তাকসীম” বা বিভাজন রীতি। যার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের দাবীকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। এর পদ্ধতি হলো এই যে, প্রতিপক্ষকে বলা হবে যে, তোমার দাবী প্রমাণিত হওয়ার জন্য এই সম্ভাব্য বিষয়গুলোর মধ্য হতে যে কোনো একটি পাওয়া যাওয়া জরুরী। আর যেহেতু এগুলোর মধ্য হতে একটি সম্ভাব্য বিষয়ও পাওয়া যাচ্ছে না; তাই বুঝা যাচ্ছে তোমার দাবী সঠিক নয়।
পবিত্র কুরআন মাজীদে এর অত্যন্ত স্পষ্ট দলীল বিদ্যমান রয়েছে। কাফের সম্প্রদায় কখনো কখনো হালাল পশুর নরগুলোকে নিজেদের জন্য হারাম করে নিত আবার কখনো মাদীগুলোকে। মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন তাদের এই কর্মরীতিকে প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে বলেছেন যে, তোমাদের এই হারাম করার কারণ কি? যুক্তিগতভাবে সম্ভাব্য চারটি কারণ হতে পারে— (১) হয়তো নর হওয়ার কারণে হারাম বলবে (২) অথবা মাদী হওয়ার কারণে (৩) অথবা যে গর্ভাশয়ে তা জন্ম নিয়েছে, তাতে হারাম হওয়ার কোনো কারণ পাওয়া যাবে (৪) অথবা আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা হারাম করেছেন, বিধায় তোমরাও তা হারাম করেছ। আর এই চারটির সবকটিই অসম্ভব। কারণ আল্লাহ তা'আলা এ ধরনের কোনো আদেশ নাযিল করেননি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী পন্থায় "সাবর ও তাকসীম" এর মাধ্যমে তাদের ধারণাগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন।
টিকাঃ
৪২৪. সূরা আনআম: ১৪৪
📄 তাসলিম স্বীকৃতি ভিত্তিক দলীল
(৫) তাসলীম-স্বীকৃতি ভিত্তিক দলীল :
যুক্তি দলীলের চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ দলীল হলো "তাসলীম”। অর্থাৎ প্রতিপক্ষের কোনো কথা অথবা দাবীকে মেনে নিয়ে এ কথা বলা যে, এটা মেনে নেওয়ার পরও উদ্দেশ্য হাসিল হয় না। কাফেররা বলে বেড়াত যে, আমাদের নিকট কোনো মানুষের পরিবর্তে কোনো ফেরেশতাকে নবী বানিয়ে প্রেরণ করা হলো না কেন? তাদের এই প্রশ্নের জবাব আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা কয়েকভাবে দিয়েছেন। সেগুলোর মধ্যে হতে একটি হচ্ছে— وَلَوْ جَعَلْنَاهُ مَلَكًا لَّجَعَلْنَاهُ رَجُلًا 'আমি যদি তাঁকে ফেরেশতা করেও প্রেরণ করতাম, তাহলে তাঁকে মানুষের আকৃতিতেই প্রেরণ করতাম।' অর্থাৎ প্রথম কথা তো হলো, কোনো নবীর জন্য ফেরেশতা হওয়া আবশ্যক নয়। কিন্তু তারপরও তোমাদের কথা মেনে নিয়ে আমি যদি ফেরেশতাও প্রেরণ করতাম তাহলেও তোমাদের উদ্দেশ্য হাসিল হতো না। কারণ আমি ফেরেশতাকেও তার আসল গঠন-আকৃতিতে প্রেরণ করতাম না। কারণ তোমাদের মধ্যে তার আসল গঠন-আকৃতি দেখার যোগ্যতা নেই। কাজেই তাকে মানব-আকৃতিতেই প্রেরণ করা হতো। আর তখনও তোমরা তার প্রতি ঈমান আনতে না।
টিকাঃ
৪২৫. সূরা আনআম: ৯