📄 পবিত্র কুরআনুল কারীমের সংরক্ষণ
পবিত্র কুরআনুল কারীমের পূর্বে যে সকল আসমানী কিতাব বিভিন্ন নবী-রাসূলগণের উপর নাযিল করা হয়েছে, মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার পক্ষ হতে সেগুলোর সংরক্ষণের কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। আর তাই তো সেগুলো নিজেদের প্রকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত থাকেনি। মুসলমানদের তো এই শুভ বিশ্বাস যে, বর্তমানে তাওরাত, ইঞ্জিল ও যাবুরের নামে যেসব কিতাবে প্রচার-প্রসার করা হচ্ছে, তা কখনো অবিকল ওই কিতাব নয়, যা আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়েছিল। বরং এগুলোতে বহু হের-ফের ও বিকৃতি সাধিত হয়েছে। বরং স্বয়ং আহলে কিতাব সম্প্রদায়ও এই হাকীকতকে স্বীকার করতে বাধ্য। কট্টর থেকে কট্টরপন্থী কোনো ইহুদী বা খ্রিস্টানও এই দাবী করতে পারে না যে, তাদের (বর্তমান) কিতাবের প্রত্যেকটি শব্দ আল্লাহ তা'আলা প্রদত্ত এবং সেগুলোর কোথাও কোনো ভুল বা পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়নি। পক্ষান্তরে পবিত্র কুরআনুল কারীম নিজের ব্যাপারে এই ভবিষ্যদ্বাণী ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল—
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
'নিশ্চয়ই আমিই এই কুরআনকে অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী।'
এই প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে সত্যে প্রমাণিত হয়েছে। চৌদ্দশত বছরের এই দীর্ঘ সময়ে পবিত্র কুরআনুল মাজীদের কোনো নুকতা বা বিন্দুও বিনষ্ট হয়নি। আর না এতে বিকৃতি ও পরিবর্তন-পরিবর্ধনের কোনো অপচেষ্টা সফল হয়েছে। ইসলাম সর্বদাই বিরোধিতা ও শত্রুতার বেষ্টনীতে ছিল এবং শত্রুরা এটাকে পরাস্ত করার অপচেষ্টায় কোনো ধরনের কার্পণ্য করেনি। কিন্তু ওই যুগেও কোনো শত্রু পবিত্র কুরআনুল কারীমকে নিশ্চিহ্ন, বিনষ্ট বা পরিবর্তন-পরিবর্ধন করার অপচেষ্টায় সফল হতে পারেনি। যখন পবিত্র কুরআনের কপি সংখ্যা ছিল একেবারেই সীমিত এবং প্রচার ও প্রকাশনার উপকরণও ছিল অনুপস্থিত।
আর তাওরাতের অবস্থা দেখুন, বাবেলের বাদশা বুখতে নসর কীভাবে নিপীড়ন চালিয়ে নিশ্চিহ্ন করেছিল? বনী ইসরাঈলের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত উযাইর (আ.) ব্যতীত কারো তাওরাত মুখস্থ ছিল না। তাই সমস্ত কপি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর তারা নিজেদের স্মৃতিতে রক্ষিত তাওরাত পুনরায় লিপিবদ্ধ করিয়ে নেয়। অতঃপর রোম সম্রাট আন্তিওকাস নিজের শক্তিমত্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। স্বয়ং বনী ইসরাঈলের বর্ণনা অনুযায়ী সে তাওরাতের এক একটি করে সবকটি কপি ছিঁড়ে পুড়িয়ে ফেলেছে। এমনকি একটি কপিও অবশিষ্ট ছিল না। অনুরূপভাবে ইঞ্জিলের প্রতি দৃষ্টিপাত করুন। কিভাবে রোমান বাদশাহ তীতুস, শাহ নীরূন, ডোমিশীয়ান ও ডিউক্ল্যাশীয়ানের আক্রমণে এর আসল কপিগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
কিন্তু পবিত্র কুরআনুল কারীমের অবস্থা হলো এই যে, শত-সহস্র আক্রমণকারীর সম্মুখীন হয়, বহু স্থানে মুসলমানদের উপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, তাদের গ্রন্থাগারগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং পুরাতন গ্রন্থাদির বিশাল সংগ্রহ ভান্ডার সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। কারামেতা বা শিয়া সম্প্রদায়ের মহা প্লাবন সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে তছনছ করে দেয় এবং পবিত্র কুরআনুল কারীমের বিকৃতি সাধনের অপচেষ্টায় তারা কোনো কার্পণ্য করেনি। কিন্তু মহা গ্রন্থ আল-কুরআন আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোনো ধরনের বিকৃতি ও পরিবর্তন-পরিবর্ধন ছাড়াই শুধু সংরক্ষিত নয়; বরং পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত তথা সারা বিশ্বে এর প্রচার ও প্রসারের গতি বেড়েই চলেছে। (আল্লাহ না করুন) যদি কথার কথা আজও পবিত্র কুরআন মাজীদের লিখিত সমস্ত কপি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তাহলে লক্ষ লক্ষ তাওহীদী মানব সন্তানের স্মৃতিশক্তি এর পরিপূর্ণ আমানতদার। কেউ যদি পবিত্র কুরআনুল কারীমের একটি শব্দও পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে মুসলমানদের ছোট্ট শিশুরাও তাকে ধরে ফেলতে পারে।
অতঃপর পবিত্র কুরআন মাজীদের শুধু শব্দরাজিই নয়; বরং অর্থ ও তাফসীর সংরক্ষণের যে ব্যবস্থাপনা মহান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে করা হয়েছে, তা স্বয়ং স্বতন্ত্র একটি ইতিহাস। যেমন সেই প্রাচীনকাল থেকেই প্রত্যেক ভাষায় অর্থের আলোকে শব্দমালার মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ যে ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছিল অর্থাৎ ইবরানী, সুরইয়ানী ও কালদানী ইত্যাদি ভাষা ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অথবা সেগুলোতে এমন আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে যে, তা আজ নতুন এক ভাষায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু পবিত্র কুরআনুল কারীমের ভাষাকে মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন এমন বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা দান করেছেন যে, হাজারো বিপ্লব, উত্থান-পতন ও পরিবর্তন-পরিবর্ধন হওয়া সত্ত্বেও তা পুরোপুরি সংরক্ষিত রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি জানতে চায় যে, পবিত্র কুরআন মাজীদের অমুক শব্দটি সেই যুগে কোন্ অর্থে ব্যবহৃত হতো? তাহলে অতি সহজেই সে তা জানতে সক্ষম।
আরবী ভাষাকে কি অসাধারণ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে? নিম্নোক্ত ঘটনা থেকে তার কিছুটা ধারণা লাভ করা যায়। ইয়ামেনের প্রসিদ্ধ শহর 'যারায়েব'-এর কোল ঘেঁষে 'উকাজ' নামক দু'টি পাহাড় ছিল। পাহাড় দু'টিতে বসবাসকারীরা এই সংকল্প করে নিয়েছিল যে, নিজেদের বসতি এলাকার বাইরে কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে না, কারো সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে না এবং এলাকা ছেড়ে বাইরে কোথাও যাবে না। এমনকি বাইরের কোনো ব্যক্তিও তাদের এখানে তিন দিনের চেয়ে বেশি অবস্থান করতে পারতো না। এ সবের কারণ ছিল একটাই যে, তারা মনে করতো যদি বাইরের লোকজনের সাথে আমাদের মেলামেশা বেড়ে যায়, তাহলে আমাদের বিশুদ্ধ আরবী ভাষা বিকৃত হয়ে যাবে। তারা নিজেদের এই নিয়ম-নীতিকে কঠোরভাবে পালন করতো। ঐতিহাসিকগণ লিখেন যে, এটিই একমাত্র গ্রুপ, যাদের আরবী ভাষা একেবারে ইসলামপূর্ব জাহেলিয়্যাত যুগের ভাষা এবং তাতে এক চুল পরিমাণও পার্থক্য সাধিত হয়নি। আসল কথা হলো, পবিত্র কুরআন মাজীদ যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার এই কিতাব সর্বদা সংরক্ষিত থাকবে এবং স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর সংরক্ষণ করবেন, এর সত্যতা দিন দিন আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠছে এবং এ ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছে।
এখানে পবিত্র কুরআনুল কারীমের সবগুলো ভবিষ্যদ্বাণী সমবেত করা নয়; বরং শুধু কয়েকটি উদাহরণ পেশ করা উদ্দেশ্য ছিল। আর এই কয়েকটি উদাহরণ থেকেই এ কথাটি সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয় যে, পবিত্র কুরআন মাজীদ যে ভবিষ্যদ্বাণী বা অগ্রিম সংবাদ প্রদান করেছিল, সেগুলো এমন অলৌকিক পদ্ধতিতে বাস্তবায়িত হয়েছে, যার মধ্যে মানবিক শক্তির বিন্দুমাত্র কোনো দখল নেই।
টিকাঃ
৩৮৮. এর বিস্তারিত ও অনস্বীকার্য দলীলের জন্য দেখুন: মাওলানা রহমাতুল্লাহ কেরানভী রচিত এবং অধম [গ্রন্থকার] কর্তৃক সম্পাদিত "কুরআন ছে বাইবেল তক"।
৩৮৯. দেখুন, ইনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটেনিকা: ৩/৫০১, প্রবন্ধ বাইবেল।
৩৯০. দেখুন: বাইবেল, ম্যাকমিলান, লন্ডন, ১৯৬৩ খ্রি. মুকাবিউ কী পহলী কিতাব: ১/৫৯
৩৯১. ইয়াকুব হামাভী রচিত : “মু'জামুল বুলদান” : ৪/১৪৩, বৈরত ১৩৭৬ হিজরী।
পবিত্র কুরআনুল কারীমের পূর্বে যে সকল আসমানী কিতাব বিভিন্ন নবী-রাসূলগণের উপর নাযিল করা হয়েছে, মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার পক্ষ হতে সেগুলোর সংরক্ষণের কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। আর তাই তো সেগুলো নিজেদের প্রকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত থাকেনি। মুসলমানদের তো এই শুভ বিশ্বাস যে, বর্তমানে তাওরাত, ইঞ্জিল ও যাবুরের নামে যেসব কিতাবে প্রচার-প্রসার করা হচ্ছে, তা কখনো অবিকল ওই কিতাব নয়, যা আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়েছিল। বরং এগুলোতে বহু হের-ফের ও বিকৃতি সাধিত হয়েছে। বরং স্বয়ং আহলে কিতাব সম্প্রদায়ও এই হাকীকতকে স্বীকার করতে বাধ্য। কট্টর থেকে কট্টরপন্থী কোনো ইহুদী বা খ্রিস্টানও এই দাবী করতে পারে না যে, তাদের (বর্তমান) কিতাবের প্রত্যেকটি শব্দ আল্লাহ তা'আলা প্রদত্ত এবং সেগুলোর কোথাও কোনো ভুল বা পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়নি। পক্ষান্তরে পবিত্র কুরআনুল কারীম নিজের ব্যাপারে এই ভবিষ্যদ্বাণী ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল—
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
'নিশ্চয়ই আমিই এই কুরআনকে অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী।'
এই প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে সত্যে প্রমাণিত হয়েছে। চৌদ্দশত বছরের এই দীর্ঘ সময়ে পবিত্র কুরআনুল মাজীদের কোনো নুকতা বা বিন্দুও বিনষ্ট হয়নি। আর না এতে বিকৃতি ও পরিবর্তন-পরিবর্ধনের কোনো অপচেষ্টা সফল হয়েছে। ইসলাম সর্বদাই বিরোধিতা ও শত্রুতার বেষ্টনীতে ছিল এবং শত্রুরা এটাকে পরাস্ত করার অপচেষ্টায় কোনো ধরনের কার্পণ্য করেনি। কিন্তু ওই যুগেও কোনো শত্রু পবিত্র কুরআনুল কারীমকে নিশ্চিহ্ন, বিনষ্ট বা পরিবর্তন-পরিবর্ধন করার অপচেষ্টায় সফল হতে পারেনি। যখন পবিত্র কুরআনের কপি সংখ্যা ছিল একেবারেই সীমিত এবং প্রচার ও প্রকাশনার উপকরণও ছিল অনুপস্থিত।
আর তাওরাতের অবস্থা দেখুন, বাবেলের বাদশা বুখতে নসর কীভাবে নিপীড়ন চালিয়ে নিশ্চিহ্ন করেছিল? বনী ইসরাঈলের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত উযাইর (আ.) ব্যতীত কারো তাওরাত মুখস্থ ছিল না। তাই সমস্ত কপি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর তারা নিজেদের স্মৃতিতে রক্ষিত তাওরাত পুনরায় লিপিবদ্ধ করিয়ে নেয়। অতঃপর রোম সম্রাট আন্তিওকাস নিজের শক্তিমত্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। স্বয়ং বনী ইসরাঈলের বর্ণনা অনুযায়ী সে তাওরাতের এক একটি করে সবকটি কপি ছিঁড়ে পুড়িয়ে ফেলেছে। এমনকি একটি কপিও অবশিষ্ট ছিল না। অনুরূপভাবে ইঞ্জিলের প্রতি দৃষ্টিপাত করুন। কিভাবে রোমান বাদশাহ তীতুস, শাহ নীরূন, ডোমিশীয়ান ও ডিউক্ল্যাশীয়ানের আক্রমণে এর আসল কপিগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
কিন্তু পবিত্র কুরআনুল কারীমের অবস্থা হলো এই যে, শত-সহস্র আক্রমণকারীর সম্মুখীন হয়, বহু স্থানে মুসলমানদের উপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, তাদের গ্রন্থাগারগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং পুরাতন গ্রন্থাদির বিশাল সংগ্রহ ভান্ডার সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। কারামেতা বা শিয়া সম্প্রদায়ের মহা প্লাবন সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে তছনছ করে দেয় এবং পবিত্র কুরআনুল কারীমের বিকৃতি সাধনের অপচেষ্টায় তারা কোনো কার্পণ্য করেনি। কিন্তু মহা গ্রন্থ আল-কুরআন আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোনো ধরনের বিকৃতি ও পরিবর্তন-পরিবর্ধন ছাড়াই শুধু সংরক্ষিত নয়; বরং পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত তথা সারা বিশ্বে এর প্রচার ও প্রসারের গতি বেড়েই চলেছে। (আল্লাহ না করুন) যদি কথার কথা আজও পবিত্র কুরআন মাজীদের লিখিত সমস্ত কপি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তাহলে লক্ষ লক্ষ তাওহীদী মানব সন্তানের স্মৃতিশক্তি এর পরিপূর্ণ আমানতদার। কেউ যদি পবিত্র কুরআনুল কারীমের একটি শব্দও পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে মুসলমানদের ছোট্ট শিশুরাও তাকে ধরে ফেলতে পারে।
অতঃপর পবিত্র কুরআন মাজীদের শুধু শব্দরাজিই নয়; বরং অর্থ ও তাফসীর সংরক্ষণের যে ব্যবস্থাপনা মহান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে করা হয়েছে, তা স্বয়ং স্বতন্ত্র একটি ইতিহাস। যেমন সেই প্রাচীনকাল থেকেই প্রত্যেক ভাষায় অর্থের আলোকে শব্দমালার মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ যে ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছিল অর্থাৎ ইবরানী, সুরইয়ানী ও কালদানী ইত্যাদি ভাষা ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অথবা সেগুলোতে এমন আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে যে, তা আজ নতুন এক ভাষায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু পবিত্র কুরআনুল কারীমের ভাষাকে মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন এমন বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা দান করেছেন যে, হাজারো বিপ্লব, উত্থান-পতন ও পরিবর্তন-পরিবর্ধন হওয়া সত্ত্বেও তা পুরোপুরি সংরক্ষিত রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি জানতে চায় যে, পবিত্র কুরআন মাজীদের অমুক শব্দটি সেই যুগে কোন্ অর্থে ব্যবহৃত হতো? তাহলে অতি সহজেই সে তা জানতে সক্ষম।
আরবী ভাষাকে কি অসাধারণ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে? নিম্নোক্ত ঘটনা থেকে তার কিছুটা ধারণা লাভ করা যায়। ইয়ামেনের প্রসিদ্ধ শহর 'যারায়েব'-এর কোল ঘেঁষে 'উকাজ' নামক দু'টি পাহাড় ছিল। পাহাড় দু'টিতে বসবাসকারীরা এই সংকল্প করে নিয়েছিল যে, নিজেদের বসতি এলাকার বাইরে কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে না, কারো সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে না এবং এলাকা ছেড়ে বাইরে কোথাও যাবে না। এমনকি বাইরের কোনো ব্যক্তিও তাদের এখানে তিন দিনের চেয়ে বেশি অবস্থান করতে পারতো না। এ সবের কারণ ছিল একটাই যে, তারা মনে করতো যদি বাইরের লোকজনের সাথে আমাদের মেলামেশা বেড়ে যায়, তাহলে আমাদের বিশুদ্ধ আরবী ভাষা বিকৃত হয়ে যাবে। তারা নিজেদের এই নিয়ম-নীতিকে কঠোরভাবে পালন করতো। ঐতিহাসিকগণ লিখেন যে, এটিই একমাত্র গ্রুপ, যাদের আরবী ভাষা একেবারে ইসলামপূর্ব জাহেলিয়্যাত যুগের ভাষা এবং তাতে এক চুল পরিমাণও পার্থক্য সাধিত হয়নি। আসল কথা হলো, পবিত্র কুরআন মাজীদ যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার এই কিতাব সর্বদা সংরক্ষিত থাকবে এবং স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর সংরক্ষণ করবেন, এর সত্যতা দিন দিন আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠছে এবং এ ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছে।
এখানে পবিত্র কুরআনুল কারীমের সবগুলো ভবিষ্যদ্বাণী সমবেত করা নয়; বরং শুধু কয়েকটি উদাহরণ পেশ করা উদ্দেশ্য ছিল। আর এই কয়েকটি উদাহরণ থেকেই এ কথাটি সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয় যে, পবিত্র কুরআন মাজীদ যে ভবিষ্যদ্বাণী বা অগ্রিম সংবাদ প্রদান করেছিল, সেগুলো এমন অলৌকিক পদ্ধতিতে বাস্তবায়িত হয়েছে, যার মধ্যে মানবিক শক্তির বিন্দুমাত্র কোনো দখল নেই।
টিকাঃ
৩৮৮. এর বিস্তারিত ও অনস্বীকার্য দলীলের জন্য দেখুন: মাওলানা রহমাতুল্লাহ কেরানভী রচিত এবং অধম [গ্রন্থকার] কর্তৃক সম্পাদিত "কুরআন ছে বাইবেল তক"।
৩৮৯. দেখুন, ইনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটেনিকা: ৩/৫০১, প্রবন্ধ বাইবেল।
৩৯০. দেখুন: বাইবেল, ম্যাকমিলান, লন্ডন, ১৯৬৩ খ্রি. মুকাবিউ কী পহলী কিতাব: ১/৫৯
৩৯১. ইয়াকুব হামাভী রচিত : “মু'জামুল বুলদান” : ৪/১৪৩, বৈরত ১৩৭৬ হিজরী।
📄 কুরআনের সত্যতা ও পশ্চিমা লেখকবৃন্দের স্বীকারোক্তি
একটা যুগ ছিল যখন পশ্চিমা লেখকরা খ্রিস্টানদের কঠোর পক্ষপাতিত্ব করতে গিয়ে প্রকাশ্য-খোলামেলাভাবে বলতো যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম [নাঊযুবিল্লাহ] রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মস্তিষ্ক-প্রসূত রচনা। কিন্তু বর্তমানে স্বয়ং পশ্চাত্যের অমুসলিম-লেখকদের বক্তব্য হলো যে, পূর্বের পাশ্চাত্য লেখকদের এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নিছক এক শত্রুরা-প্রসূত দাবী, যার স্বপক্ষে কোনো দলীল ছিল না এবং নবী কারীম (সা.)-এর পুরো জীবন ব্যবস্থা তাদের এই দাবীকে মিথ্যা প্রমাণিত করে। বর্তমান যুগের প্রসিদ্ধ পাশ্চাত্য পণ্ডিত প্রফেসর মন্টেগুমরী ওয়াট লিখেন—
"মধ্যযুগীয় ইউরোপে এই ধারণাকে ব্যাপক করা হয়েছিল যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) একজন (নাউযুবিল্লাহ) মিথ্যা নবী ছিলেন। যিনি ভুলবশতঃ এই দাবী করতেন যে, তাঁর নিকট আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার পক্ষ হতে ওহী নাযিল হয়। কিন্তু মধ্যযুগীয় এই ধারণা প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধজনিত প্রোপাগান্ডা ছিল। যা আজ ধীরে ধীরে ইউরোপ ও খ্রিস্টজগতের মাথা থেকে বেরিয়ে আসছে।”
প্রফেসর ওয়াট সত্যিই বলেছেন যে, নবী কারীম (সা.)-এর প্রতি এই মিথ্যারোপ কোনো তথ্যভিত্তিক দলীলের উপর ভিত্তি করে ছিল না। বরং তা ছিল প্রোপাগান্ডারই একটি অংশ। তারা বলেছে যে, বর্তমান যুগের পাশ্চাত্য লেখকদের নিকট সুস্পষ্ট দলীল থাকার কারণে তারা সেসব অপবাদকে মেনে নিচ্ছে না। পরিশেষে তিনি লিখেন— "অতএব, নবী কারীম (সা.)-এর ব্যাপারে মধ্যযুগীয় এই ধ্যান-ধারণাকে তো এখন আলোচনার অযোগ্য মনে করা উচিত এবং নবী কারীম (সা.)-কে এমন এক ব্যক্তি মনে করা উচিত, যিনি সম্পূর্ণ নিষ্ঠা ও সৎ উদ্দেশ্যে মানুষকে ওই সব পয়গাম (ওহী) শোনতেন। যার ব্যাপারে তাঁর এই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এগুলো মহান আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর নিকট ওহী হিসেবে এসেছে।”
এই স্বীকারোক্তির পর ইনসাফের দাবী তো এটাই ছিল যে, পরিষ্কার ভাষায় দু'জাহানের সর্দার হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর নবুওয়াত ও রেসালতের স্বীকৃতি প্রদান করবে। কিন্তু শতাব্দীকাল থেকে মস্তিষ্কে বেঁকে বসা ভ্রান্ত ধারণাগুলো তো এত সহজেই মিটবার নয়। তাইতো মন্টেগুমরী ওয়াট এবং তার মতো অন্যান্য লেখকরাও এক দিকে তো এই স্বীকারোক্তি প্রদান করে যে, রাসূলে খোদা (সা.) নিজের নবুওয়াতের দাবীতে নিষ্ঠাবান ছিলেন। অপর দিকে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে নিজেদের মাযহাব ও মতাদর্শকে ত্যাগ করে ইসলামের ছায়া তলে আসাও তাদের জন্য মুশকিল ব্যাপার। তাই তারা মধ্যবর্তী একটি পথ বেছে নেওয়ার জন্য নবী কারীম (সা.)-এর নবুওয়াতের দাবীর এক আশ্চর্য ও অভিনব ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে।
তাদের বক্তব্য হলো, নবী কারীম (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ ওহী মূলত বাহ্যিক ও বাস্তবিক কোনো বিষয় ছিল না। বরং (নাউযুবিল্লাহ) এটা ছিল ভেতরগত ও আধ্যাত্মিক একটি অবস্থা। যা তাঁর দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনা ও সাধনার ফলে সৃষ্টি হতো। আর তিনি অত্যন্ত সততার সাথে এটাকে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা বা কোনো ফেরেশতার আওয়াজ মনে করতেন। তিনি তাঁর শৈশবকাল থেকেই স্বীয় সম্প্রদায়ের মাযহাব ও মতাদর্শ থেকে বিমুখ ছিলেন। তাই তিনি নির্জনে একাকী গভীর চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যানমগ্নে লিপ্ত থাকতেন। এই উদ্দেশ্যেই তিনি হেরা গুহার নির্জনে কাটাতে শুরু করলেন। ওই দীর্ঘ চিন্তা-ফিকির ও সাধনার ফলে তাওহীদী আকীদার উপর তাঁর বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে যায়। হেরা পর্বতের ওই নির্জন-নিস্তব্ধতায় এই ধারণাগুলো তাঁর মন-মস্তিষ্কে এমনভাবে ছেয়ে যায় যে, অন্তরের এই উপলব্ধিকে তাঁর কাছে বাহ্যিক ও বাস্তব আওয়াজ মনে হতে লাগল। আর সেটাকেই তিনি আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা বা কোনো ফেরেশতার আওয়াজ মনে করে পূর্ণ বিশ্বাস ও নিষ্ঠার সাথে নবুওয়াতের দাবী করে বসলেন!
এই হলো দু'জাহানের সর্দার নবী কারীম (সা.)-এর নবুওয়াতের দাবীর সেই ব্যাখ্যা, যা বর্তমানে পশ্চিমা বিজ্ঞজনদের মাঝে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। পশ্চাত্যের পণ্ডিতদের মধ্যে বহু গবেষক এর প্রবক্তা। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন, এই ব্যাখ্যার পেছনে এ ছাড়া আর কি মানসিকতা কাজ করছে যে, ওই পণ্ডিতরা আগ থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে যে, নবী কারীম (সা.)-এর নবুওয়াতের স্বীকারোক্তি তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রকৃত কথা হচ্ছে, প্রফেসর ওয়াট ও বর্তমান যুগের অন্যান্য পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ রাসূলে খোদা (সা.)-এর প্রতি নাযিলকৃত ওহীর যে ব্যাখ্যা করেছেন এর যুক্তিনির্ভর কোনো জবাব দিতেও লজ্জাবোধ হয়। তথাপি নিম্নোক্ত বাস্তব তথ্যগুলোর উপর চিন্তা করুন।
১. দু'জাহানের সর্দার নবী কারীম (সা.)-এর ব্যাপারে তাদেরই স্বীকারোক্তি হলো যে, তিনি ছিলেন সর্বোত্তম মেধা ও বাস্তব কর্মপন্থার যোগ্যতায় টইটম্বুর ব্যক্তিত্ব। তাহলে তাঁর ব্যাপারে এই উদ্ভট কথা বিবেক মেনে নিতে পারে না যে, তিনি দীর্ঘ তেইশ বছর যাবৎ ধারাবাহিকভাবে নিজের ভেতরের আধ্যাত্মিক একটি অবস্থাকে কোনো ফেরেশতার আওয়াজ মনে করতেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি জানতেই পারেননি যে, এই অস্বাভাবিক অবস্থার হাকীকত কি? তাঁর প্রতি দীর্ঘ তেইশ বছরে শত-সহস্র বার ওহী অবতীর্ণ হয়েছে। তাহলে কি তিনি এই পুরোটা সময় এ ভুলের মধ্যে নিমজ্জিত ছিলেন?
২. অতঃপর যদি তাঁর উপর তথাকথিত এই “আধ্যাত্মিক অবস্থা” স্বীয় সম্প্রদায়কে দেখে প্রকাশ পেত, তাহলে সূত্রানুযায়ী দাবী এটাই ছিল যে, এই আধ্যাত্মিক অবস্থার সর্বপ্রথম অভিজ্ঞতায় তাদের ভ্রষ্টতার প্রত্যাখ্যান ও তাওহীদী আকীদার বর্ণনা করা। কিন্তু আমরা দেখতে পাই যে, তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হওয়া প্রথম ওহীতে কুফর-শিরিকের প্রত্যাখ্যানমূলক কোনো কথা নেই। নেই তাওহীদী আকীদার আলোচনাও। বরং এর পরিবর্তে 'ইকরা' (পাঠ করুন) দিয়ে ওহীর সূচনা হয়—
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ * خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ * اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ * الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ * عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمُ
'সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট-বাঁধা রক্তপিণ্ড হতে। পাঠ কর, আর তোমার রব বড়ই অনুগ্রহশীল। যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলম দিয়ে, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।'
৩. অতঃপর এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার যে, এই "আধ্যাত্মিক হালাত” বা ভেতরগত অবস্থা একবার সৃষ্টি হবার পর সঙ্গে সঙ্গে নিষ্প্রভ হয়ে গেল এবং তিন বছর যাবৎ তিনি আর কোনো আওয়াজ শুনতে পেলেন না! এ দীর্ঘ সময় ওহী বন্ধ থাকার কারণে তিনি পেরেশানও থাকতেন। কিন্তু এই তিন বছর পুরোপুরি নিশ্চুপ থাকার পর যখন আবার ওহী অবতীর্ণ হতে শুরু করল, তখনও তাতে সুস্পষ্টভাবে শিরিকের বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করা হলো না।
৪. যদি এটা কোনো আধ্যাত্মিক হালাত বা ভেতরগত অবস্থা হতো তাহলে তা তো সম্পূর্ণরূপে নবী কারীম (সা.)-এর ধ্যান-ধারণার সাথে মিলে যাওয়া উচিত ছিল। অথচ কুরআনুল কারীমের অনেক স্থানে তাঁর ব্যক্তিগত ধ্যান-ধারণার বিপরীত দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বরং কোনো কোনো স্থানে তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করতঃ এর উপর তিরস্কারও করা হয়েছে। যেমন—
(ক) إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ
(খ) সূরা আনফালের ৬৭ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে- مَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَن يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ
(গ) সূরা তাওবা'র ৪৩ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে- عَفَا اللَّهُ عَنكَ لِمَ أَذِنْتَ لَهُمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكَاذِبِينَ
৫. যদি মেনেও নেওয়া হয় যে, কোনো চিন্তা-কল্পনার চরম প্রবলতা মানুষের কাছে "বাস্তব ধ্বনি”র ন্যায় অনুভূত হতে থাকে, তাহলে এর কি কারণ যে, এই "বাস্তব ধ্বনি” যে ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকে, তা সর্বদা সত্যে পরিণত হয়? যে নির্দেশনা প্রদান করে তা অবশেষে সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। যে শব্দমালা বলে দেয় তা এমন পাথরে খোদাই করা চিহ্নে পরিণত হয়ে যায় যে, সারা দুনিয়ার সাহিত্যিক ও বাগ্মিরা এর মুকাবেলা করতে অক্ষম হয়ে যায়!
৬. যদি মেনেও নেওয়া হয় যে, ধ্যান-ধারণার প্রবলতার কারণে অনুভূত ধ্বনির কোনো হাকীকত আছে, তাহলে তা ওই ব্যক্তিরই জ্ঞানের প্রতিচ্ছায়া হয়ে থাকে। কিন্তু আপনি পবিত্র কুরআন মাজীদ পাঠ করে দেখুন যে, তাতে এমন বহু কথা রয়েছে, যা ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলে খোদা (সা.)-এর জানা ছিল না। ওহীর বাণীই প্রথম তাঁকে এর জ্ঞান দান করেছে। যেমন— مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ 'তুমি জানতে না কিতাব কী, ঈমান কী...।'
৭. বিশেষ করে পূর্ববর্তী উম্মতদের অধিকাংশ ঘটনাবলী, ঐতিহাসিকভাবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, ওহী অবতীর্ণ হবার পূর্বে রাসূলে আকরাম (সা.) সেগুলো সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। পবিত্র কুরআনুল কারীমই সর্বপ্রথম তাঁকে এই জ্ঞান দান করেছে। যেমন, সূরা হুদে হযরত নূহ (আ.)-এর ঘটনা বর্ণনা করার পর ইরশাদ হয়েছে— تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ مَا كُنتَ تَعْلَمُهَا أَنتَ وَلَا قَوْمُكَ مِن قَبْلِ هَذَا 'এ সব হল অদৃশ্যের খবর যা তোমাকে ওয়াহী দ্বারা জানিয়ে দিচ্ছি, যা এর পূর্বে না তুমি জানতে, না তোমার জাতির লোকেরা জানত।'
৮. মন্টেগুমরী ওয়াট ও তার সহচররা এ কথা স্বীকার করেন যে, রাসূলে খোদা (সা.) কখনো মিথ্যা কথা বলেননি। সুতরাং তাদের মত অনুযায়ীও পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোনো আয়াতের ব্যাপারে ভুল বর্ণনা করা অসম্ভব। এখন প্রশ্ন হলো, যদি এই "ওহী" বাস্তবিক কোনো জ্ঞান লাভের মাধ্যম না হতো, তাহলে তিনি কি করে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সেসব ঘটনা জানতে পারলেন, যা পূর্বে তাঁর জানা ছিল না?
টিকাঃ
৩৯৫. Watt: Bell's Introduction to the Quran Ch. 2 P. 17.
৩৯৬. Watt: Bell's Introduction to the Quran Ch. 2 P. 18
৩৯৭. সূরা আলাক : ১-৫
৩৯৮. সূরা হিজর, আয়াত-৪২
৩৯৯. সূরা শুরা: ৫২
৪০০. সূরা হুদ : ৪৯
৪০১. সূরা ইউসুফ: ১০২
৪০২. Watt: Bell's Introduction to the Quran Ch. 2 P. 25
একটা যুগ ছিল যখন পশ্চিমা লেখকরা খ্রিস্টানদের কঠোর পক্ষপাতিত্ব করতে গিয়ে প্রকাশ্য-খোলামেলাভাবে বলতো যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম [নাঊযুবিল্লাহ] রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মস্তিষ্ক-প্রসূত রচনা। কিন্তু বর্তমানে স্বয়ং পশ্চাত্যের অমুসলিম-লেখকদের বক্তব্য হলো যে, পূর্বের পাশ্চাত্য লেখকদের এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নিছক এক শত্রুরা-প্রসূত দাবী, যার স্বপক্ষে কোনো দলীল ছিল না এবং নবী কারীম (সা.)-এর পুরো জীবন ব্যবস্থা তাদের এই দাবীকে মিথ্যা প্রমাণিত করে। বর্তমান যুগের প্রসিদ্ধ পাশ্চাত্য পণ্ডিত প্রফেসর মন্টেগুমরী ওয়াট লিখেন—
"মধ্যযুগীয় ইউরোপে এই ধারণাকে ব্যাপক করা হয়েছিল যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) একজন (নাউযুবিল্লাহ) মিথ্যা নবী ছিলেন। যিনি ভুলবশতঃ এই দাবী করতেন যে, তাঁর নিকট আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার পক্ষ হতে ওহী নাযিল হয়। কিন্তু মধ্যযুগীয় এই ধারণা প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধজনিত প্রোপাগান্ডা ছিল। যা আজ ধীরে ধীরে ইউরোপ ও খ্রিস্টজগতের মাথা থেকে বেরিয়ে আসছে।”
প্রফেসর ওয়াট সত্যিই বলেছেন যে, নবী কারীম (সা.)-এর প্রতি এই মিথ্যারোপ কোনো তথ্যভিত্তিক দলীলের উপর ভিত্তি করে ছিল না। বরং তা ছিল প্রোপাগান্ডারই একটি অংশ। তারা বলেছে যে, বর্তমান যুগের পাশ্চাত্য লেখকদের নিকট সুস্পষ্ট দলীল থাকার কারণে তারা সেসব অপবাদকে মেনে নিচ্ছে না। পরিশেষে তিনি লিখেন— "অতএব, নবী কারীম (সা.)-এর ব্যাপারে মধ্যযুগীয় এই ধ্যান-ধারণাকে তো এখন আলোচনার অযোগ্য মনে করা উচিত এবং নবী কারীম (সা.)-কে এমন এক ব্যক্তি মনে করা উচিত, যিনি সম্পূর্ণ নিষ্ঠা ও সৎ উদ্দেশ্যে মানুষকে ওই সব পয়গাম (ওহী) শোনতেন। যার ব্যাপারে তাঁর এই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এগুলো মহান আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর নিকট ওহী হিসেবে এসেছে।”
এই স্বীকারোক্তির পর ইনসাফের দাবী তো এটাই ছিল যে, পরিষ্কার ভাষায় দু'জাহানের সর্দার হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর নবুওয়াত ও রেসালতের স্বীকৃতি প্রদান করবে। কিন্তু শতাব্দীকাল থেকে মস্তিষ্কে বেঁকে বসা ভ্রান্ত ধারণাগুলো তো এত সহজেই মিটবার নয়। তাইতো মন্টেগুমরী ওয়াট এবং তার মতো অন্যান্য লেখকরাও এক দিকে তো এই স্বীকারোক্তি প্রদান করে যে, রাসূলে খোদা (সা.) নিজের নবুওয়াতের দাবীতে নিষ্ঠাবান ছিলেন। অপর দিকে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে নিজেদের মাযহাব ও মতাদর্শকে ত্যাগ করে ইসলামের ছায়া তলে আসাও তাদের জন্য মুশকিল ব্যাপার। তাই তারা মধ্যবর্তী একটি পথ বেছে নেওয়ার জন্য নবী কারীম (সা.)-এর নবুওয়াতের দাবীর এক আশ্চর্য ও অভিনব ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে।
তাদের বক্তব্য হলো, নবী কারীম (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ ওহী মূলত বাহ্যিক ও বাস্তবিক কোনো বিষয় ছিল না। বরং (নাউযুবিল্লাহ) এটা ছিল ভেতরগত ও আধ্যাত্মিক একটি অবস্থা। যা তাঁর দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনা ও সাধনার ফলে সৃষ্টি হতো। আর তিনি অত্যন্ত সততার সাথে এটাকে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা বা কোনো ফেরেশতার আওয়াজ মনে করতেন। তিনি তাঁর শৈশবকাল থেকেই স্বীয় সম্প্রদায়ের মাযহাব ও মতাদর্শ থেকে বিমুখ ছিলেন। তাই তিনি নির্জনে একাকী গভীর চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যানমগ্নে লিপ্ত থাকতেন। এই উদ্দেশ্যেই তিনি হেরা গুহার নির্জনে কাটাতে শুরু করলেন। ওই দীর্ঘ চিন্তা-ফিকির ও সাধনার ফলে তাওহীদী আকীদার উপর তাঁর বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে যায়। হেরা পর্বতের ওই নির্জন-নিস্তব্ধতায় এই ধারণাগুলো তাঁর মন-মস্তিষ্কে এমনভাবে ছেয়ে যায় যে, অন্তরের এই উপলব্ধিকে তাঁর কাছে বাহ্যিক ও বাস্তব আওয়াজ মনে হতে লাগল। আর সেটাকেই তিনি আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা বা কোনো ফেরেশতার আওয়াজ মনে করে পূর্ণ বিশ্বাস ও নিষ্ঠার সাথে নবুওয়াতের দাবী করে বসলেন!
এই হলো দু'জাহানের সর্দার নবী কারীম (সা.)-এর নবুওয়াতের দাবীর সেই ব্যাখ্যা, যা বর্তমানে পশ্চিমা বিজ্ঞজনদের মাঝে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। পশ্চাত্যের পণ্ডিতদের মধ্যে বহু গবেষক এর প্রবক্তা। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন, এই ব্যাখ্যার পেছনে এ ছাড়া আর কি মানসিকতা কাজ করছে যে, ওই পণ্ডিতরা আগ থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে যে, নবী কারীম (সা.)-এর নবুওয়াতের স্বীকারোক্তি তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রকৃত কথা হচ্ছে, প্রফেসর ওয়াট ও বর্তমান যুগের অন্যান্য পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ রাসূলে খোদা (সা.)-এর প্রতি নাযিলকৃত ওহীর যে ব্যাখ্যা করেছেন এর যুক্তিনির্ভর কোনো জবাব দিতেও লজ্জাবোধ হয়। তথাপি নিম্নোক্ত বাস্তব তথ্যগুলোর উপর চিন্তা করুন।
১. দু'জাহানের সর্দার নবী কারীম (সা.)-এর ব্যাপারে তাদেরই স্বীকারোক্তি হলো যে, তিনি ছিলেন সর্বোত্তম মেধা ও বাস্তব কর্মপন্থার যোগ্যতায় টইটম্বুর ব্যক্তিত্ব। তাহলে তাঁর ব্যাপারে এই উদ্ভট কথা বিবেক মেনে নিতে পারে না যে, তিনি দীর্ঘ তেইশ বছর যাবৎ ধারাবাহিকভাবে নিজের ভেতরের আধ্যাত্মিক একটি অবস্থাকে কোনো ফেরেশতার আওয়াজ মনে করতেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি জানতেই পারেননি যে, এই অস্বাভাবিক অবস্থার হাকীকত কি? তাঁর প্রতি দীর্ঘ তেইশ বছরে শত-সহস্র বার ওহী অবতীর্ণ হয়েছে। তাহলে কি তিনি এই পুরোটা সময় এ ভুলের মধ্যে নিমজ্জিত ছিলেন?
২. অতঃপর যদি তাঁর উপর তথাকথিত এই “আধ্যাত্মিক অবস্থা” স্বীয় সম্প্রদায়কে দেখে প্রকাশ পেত, তাহলে সূত্রানুযায়ী দাবী এটাই ছিল যে, এই আধ্যাত্মিক অবস্থার সর্বপ্রথম অভিজ্ঞতায় তাদের ভ্রষ্টতার প্রত্যাখ্যান ও তাওহীদী আকীদার বর্ণনা করা। কিন্তু আমরা দেখতে পাই যে, তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হওয়া প্রথম ওহীতে কুফর-শিরিকের প্রত্যাখ্যানমূলক কোনো কথা নেই। নেই তাওহীদী আকীদার আলোচনাও। বরং এর পরিবর্তে 'ইকরা' (পাঠ করুন) দিয়ে ওহীর সূচনা হয়—
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ * خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ * اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ * الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ * عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمُ
'সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট-বাঁধা রক্তপিণ্ড হতে। পাঠ কর, আর তোমার রব বড়ই অনুগ্রহশীল। যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলম দিয়ে, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।'
৩. অতঃপর এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার যে, এই "আধ্যাত্মিক হালাত” বা ভেতরগত অবস্থা একবার সৃষ্টি হবার পর সঙ্গে সঙ্গে নিষ্প্রভ হয়ে গেল এবং তিন বছর যাবৎ তিনি আর কোনো আওয়াজ শুনতে পেলেন না! এ দীর্ঘ সময় ওহী বন্ধ থাকার কারণে তিনি পেরেশানও থাকতেন। কিন্তু এই তিন বছর পুরোপুরি নিশ্চুপ থাকার পর যখন আবার ওহী অবতীর্ণ হতে শুরু করল, তখনও তাতে সুস্পষ্টভাবে শিরিকের বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করা হলো না।
৪. যদি এটা কোনো আধ্যাত্মিক হালাত বা ভেতরগত অবস্থা হতো তাহলে তা তো সম্পূর্ণরূপে নবী কারীম (সা.)-এর ধ্যান-ধারণার সাথে মিলে যাওয়া উচিত ছিল। অথচ কুরআনুল কারীমের অনেক স্থানে তাঁর ব্যক্তিগত ধ্যান-ধারণার বিপরীত দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বরং কোনো কোনো স্থানে তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করতঃ এর উপর তিরস্কারও করা হয়েছে। যেমন—
(ক) إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ
(খ) সূরা আনফালের ৬৭ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে- مَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَن يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ
(গ) সূরা তাওবা'র ৪৩ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে- عَفَا اللَّهُ عَنكَ لِمَ أَذِنْتَ لَهُمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكَاذِبِينَ
৫. যদি মেনেও নেওয়া হয় যে, কোনো চিন্তা-কল্পনার চরম প্রবলতা মানুষের কাছে "বাস্তব ধ্বনি”র ন্যায় অনুভূত হতে থাকে, তাহলে এর কি কারণ যে, এই "বাস্তব ধ্বনি” যে ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকে, তা সর্বদা সত্যে পরিণত হয়? যে নির্দেশনা প্রদান করে তা অবশেষে সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। যে শব্দমালা বলে দেয় তা এমন পাথরে খোদাই করা চিহ্নে পরিণত হয়ে যায় যে, সারা দুনিয়ার সাহিত্যিক ও বাগ্মিরা এর মুকাবেলা করতে অক্ষম হয়ে যায়!
৬. যদি মেনেও নেওয়া হয় যে, ধ্যান-ধারণার প্রবলতার কারণে অনুভূত ধ্বনির কোনো হাকীকত আছে, তাহলে তা ওই ব্যক্তিরই জ্ঞানের প্রতিচ্ছায়া হয়ে থাকে। কিন্তু আপনি পবিত্র কুরআন মাজীদ পাঠ করে দেখুন যে, তাতে এমন বহু কথা রয়েছে, যা ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলে খোদা (সা.)-এর জানা ছিল না। ওহীর বাণীই প্রথম তাঁকে এর জ্ঞান দান করেছে। যেমন— مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ 'তুমি জানতে না কিতাব কী, ঈমান কী...।'
৭. বিশেষ করে পূর্ববর্তী উম্মতদের অধিকাংশ ঘটনাবলী, ঐতিহাসিকভাবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, ওহী অবতীর্ণ হবার পূর্বে রাসূলে আকরাম (সা.) সেগুলো সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। পবিত্র কুরআনুল কারীমই সর্বপ্রথম তাঁকে এই জ্ঞান দান করেছে। যেমন, সূরা হুদে হযরত নূহ (আ.)-এর ঘটনা বর্ণনা করার পর ইরশাদ হয়েছে— تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ مَا كُنتَ تَعْلَمُهَا أَنتَ وَلَا قَوْمُكَ مِن قَبْلِ هَذَا 'এ সব হল অদৃশ্যের খবর যা তোমাকে ওয়াহী দ্বারা জানিয়ে দিচ্ছি, যা এর পূর্বে না তুমি জানতে, না তোমার জাতির লোকেরা জানত।'
৮. মন্টেগুমরী ওয়াট ও তার সহচররা এ কথা স্বীকার করেন যে, রাসূলে খোদা (সা.) কখনো মিথ্যা কথা বলেননি। সুতরাং তাদের মত অনুযায়ীও পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোনো আয়াতের ব্যাপারে ভুল বর্ণনা করা অসম্ভব। এখন প্রশ্ন হলো, যদি এই "ওহী" বাস্তবিক কোনো জ্ঞান লাভের মাধ্যম না হতো, তাহলে তিনি কি করে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সেসব ঘটনা জানতে পারলেন, যা পূর্বে তাঁর জানা ছিল না?
টিকাঃ
৩৯৫. Watt: Bell's Introduction to the Quran Ch. 2 P. 17.
৩৯৬. Watt: Bell's Introduction to the Quran Ch. 2 P. 18
৩৯৭. সূরা আলাক : ১-৫
৩৯৮. সূরা হিজর, আয়াত-৪২
৩৯৯. সূরা শুরা: ৫২
৪০০. সূরা হুদ : ৪৯
৪০১. সূরা ইউসুফ: ১০২
৪০২. Watt: Bell's Introduction to the Quran Ch. 2 P. 25
📄 রাসূল সা: ও আহলে কিতাব
প্রকাশ থাকে যে, কোনো কোনো পাশ্চাত্য লেখক রাসূলে আকরাম (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ ওহীকে মূলত তাঁর "আধ্যাত্মিক অবস্থা” হিসেবে প্রমাণ করার জন্য বহু চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, নবী কারীম (সা.) পূর্ববর্তী উম্মতদের ঘটনাবলী (নাঊযুবিল্লাহ) আরবের ইহুদী ও খ্রিস্টানদের কাছ থেকে শুনেছিলেন। এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে বুহাইরা ও নাসতূরা নামক দু'জন পাদ্রীর নাম উল্লেখযোগ্য। সিরিয়া সফরের সময় যাদের সাথে তাঁর সাক্ষাত হওয়ার ঘটনা সীরাত ও ইতিহাসের বিভিন্ন কিতাবে উল্লেখ রয়েছে। কোনো কোনো পাশ্চাত্য লেখক এ ধারণা প্রকাশ করেছেন যে, এই পাদ্রী ছিলেন আরয়ূসী গ্রুপের মধ্য হতে। ওই পাদ্রীর কাছে থেকেই তিনি (নাঊযুবিল্লাহ) তাওহীদের ধারণা লাভ করেন এবং পূর্ববর্তী উম্মতদের ঘটনাবলী সম্পর্কে অবগত হন।
যদি ইনসাফ পৃথিবী থেকে একেবারে ওঠে গিয়ে না থাকে, তাহলে একজন সামান্য জ্ঞান সম্পন্ন মানুষও এ কথা মেনে নিতে পারে না যে, সিরিয়া সফরকালে এই সংক্ষিপ্ত সময়ের সাক্ষাতে ওই পাদ্রীরা নিজেদের বক্ষে সংরক্ষিত সম্পূর্ণ জ্ঞানভান্ডার নবী কারীম (সা.)-এর সামনে উপুড় করে ঢেলে দিলেন। প্রথমতঃ এ কথা একেবারেই দলীল-প্রমাণহীন যে বুহাইরা ও নাসতূরা আরয়ূসী গ্রুপের মধ্য হতে ছিলেন। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতেই আরয়ূসী গ্রুপকে নাস্তিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং এথানাসিউস ও তার সহচররা এই গ্রুপটিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টায় কোনো অবহেলা করেনি।
দ্বিতীয়তঃ পাদ্রীদের সাথে নবী কারীম (সা.)-এর সাক্ষাত অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটেছিল। এখানে আমরা বুহাইরা পাদ্রীর সাথে নবী কারীম (সা.)-এর সাক্ষাত সংক্রান্ত বিস্তারিত বর্ণনাটি উদ্ধৃত করছি। সুনানে তিরমিযী শরীফে হযরত আবু মূসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার আবু তালেব কুরাইশদের সাথে মিলে সিরিয়া সফরে রওয়ানা হলেন। সেখানে একজন পাদ্রী থাকতেন। এবার যখন ব্যবসায়ী কাফেলা সেখানে অবতরণ করল, তখন পাদ্রী নিজের খানকা থেকে বেরিয়ে আসলেন এবং এক পর্যায়ে রাসূলে খোদা (সা.)-এর হাত ধরে ফেললেন। তারপর বললেন— 'ইনি হলেন, সমগ্র জাহানের প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রেরিত রাসূল।' পাদ্রী কুরাইশদের জানালেন যে, আপনারা যখন উপত্যকা থেকে বেরিয়ে এসেছেন, তখন কোনো বৃক্ষলতা ও পাথর এমন ছিল না, যা তাঁকে সিজদা করেনি। পাদ্রী কুরাইশদের লক্ষ্য করে বললেন, আপনারা তাঁকে রোমের দিকে নিয়ে যাবেন না, রোমানরা তাঁকে চিনে ফেললে হত্যা করে ফেলবে। এরপর পাদ্রী আবু তালেবকে একের পর এক কসম দিয়ে বললেন, তুমি অবশ্যই তাঁকে ফেরত পাঠাও। এমনকি আবু তালেব তাঁকে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন।
এই সাক্ষাতটি ওই সময়ে হয়েছে যখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র বার কিংবা তের বৎসর। কোনো সুস্থ বিবেক সম্পন্ন মানুষ কি এ কথা মেনে নিতে পারে যে, এত অল্প বয়সে মাত্র কয়েকটি ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাত তাঁকে পূর্ববর্তী উম্মতদের এমন গভীর জ্ঞান দান করেছে যে, তিনি আহলে কিতাবদের চ্যালেঞ্জ করে তাদের কিতাবের বিকৃতির বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন! নবী কারীম (সা.) যদি আহলে কিতাবদের কাছ থেকে এই ঘটনাগুলো শুনেই থাকতেন, তাহলে মক্কার কাফের সম্প্রদায়—যারা নবী কারীম (সা.)-কে প্রত্যাখ্যান করার জন্য প্রস্তুত থাকতো—তারা ওই সময় কেন নিশ্চুপ থাকল? তারা এই দাবী কেন করল না যে, আপনাকে তো অমুক অমুক আহলে কিতাব এই কথাগুলো শিখিয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারীমে এর প্রত্যাখ্যান এভাবে করা হয়েছে—
وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ لِّسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهُذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُّبِينٌ
'আমি জানি, তারা বলে, 'এক মানুষ তাকে শিখিয়ে দেয়।' অথচ তারা যে লোকটির কথা বলছে তার ভাষা তো অনারব, অপরপক্ষে কুরআনের ভাষা হল স্পষ্ট আরবী।'
টিকাঃ
৪০৩. J.M. Rodwell কর্তৃক অনূদিত ইংরেজি কুরআনের ভূমিকা, পৃ: ৭।
৪০৪. "নবী স.-এর নবুওয়াত লাভ” শীর্ষক অধ্যায়: ২/২২৫: জামে' তিরমিযী।
৪০৫. হাফেয যাহাবী এ বর্ণনাকে অনির্ভরযোগ্য সাব্যস্ত করেছেন, কিন্তু ইবনে হাযার আসকালানী প্রমুখ বর্ণনাটিকে বিশুদ্ধ বলে সাব্যস্ত করেছেন। (শরহুল মাওয়াহিব: ১/১৯৬)।
৪০৬. আলামা হালবী এ বর্ণনায় বয়স ৯ বছর বলেছেন, হাফেয ইবনে আবদুল বার 'তের বছর' বলেছেন। যুরকানী বলেন অধিকাংশের মত ১২ বছর।
৪০৭. সূরা নাহল: ১০৩
প্রকাশ থাকে যে, কোনো কোনো পাশ্চাত্য লেখক রাসূলে আকরাম (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ ওহীকে মূলত তাঁর "আধ্যাত্মিক অবস্থা” হিসেবে প্রমাণ করার জন্য বহু চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, নবী কারীম (সা.) পূর্ববর্তী উম্মতদের ঘটনাবলী (নাঊযুবিল্লাহ) আরবের ইহুদী ও খ্রিস্টানদের কাছ থেকে শুনেছিলেন। এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে বুহাইরা ও নাসতূরা নামক দু'জন পাদ্রীর নাম উল্লেখযোগ্য। সিরিয়া সফরের সময় যাদের সাথে তাঁর সাক্ষাত হওয়ার ঘটনা সীরাত ও ইতিহাসের বিভিন্ন কিতাবে উল্লেখ রয়েছে। কোনো কোনো পাশ্চাত্য লেখক এ ধারণা প্রকাশ করেছেন যে, এই পাদ্রী ছিলেন আরয়ূসী গ্রুপের মধ্য হতে। ওই পাদ্রীর কাছে থেকেই তিনি (নাঊযুবিল্লাহ) তাওহীদের ধারণা লাভ করেন এবং পূর্ববর্তী উম্মতদের ঘটনাবলী সম্পর্কে অবগত হন।
যদি ইনসাফ পৃথিবী থেকে একেবারে ওঠে গিয়ে না থাকে, তাহলে একজন সামান্য জ্ঞান সম্পন্ন মানুষও এ কথা মেনে নিতে পারে না যে, সিরিয়া সফরকালে এই সংক্ষিপ্ত সময়ের সাক্ষাতে ওই পাদ্রীরা নিজেদের বক্ষে সংরক্ষিত সম্পূর্ণ জ্ঞানভান্ডার নবী কারীম (সা.)-এর সামনে উপুড় করে ঢেলে দিলেন। প্রথমতঃ এ কথা একেবারেই দলীল-প্রমাণহীন যে বুহাইরা ও নাসতূরা আরয়ূসী গ্রুপের মধ্য হতে ছিলেন। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতেই আরয়ূসী গ্রুপকে নাস্তিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং এথানাসিউস ও তার সহচররা এই গ্রুপটিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টায় কোনো অবহেলা করেনি।
দ্বিতীয়তঃ পাদ্রীদের সাথে নবী কারীম (সা.)-এর সাক্ষাত অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটেছিল। এখানে আমরা বুহাইরা পাদ্রীর সাথে নবী কারীম (সা.)-এর সাক্ষাত সংক্রান্ত বিস্তারিত বর্ণনাটি উদ্ধৃত করছি। সুনানে তিরমিযী শরীফে হযরত আবু মূসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার আবু তালেব কুরাইশদের সাথে মিলে সিরিয়া সফরে রওয়ানা হলেন। সেখানে একজন পাদ্রী থাকতেন। এবার যখন ব্যবসায়ী কাফেলা সেখানে অবতরণ করল, তখন পাদ্রী নিজের খানকা থেকে বেরিয়ে আসলেন এবং এক পর্যায়ে রাসূলে খোদা (সা.)-এর হাত ধরে ফেললেন। তারপর বললেন— 'ইনি হলেন, সমগ্র জাহানের প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রেরিত রাসূল।' পাদ্রী কুরাইশদের জানালেন যে, আপনারা যখন উপত্যকা থেকে বেরিয়ে এসেছেন, তখন কোনো বৃক্ষলতা ও পাথর এমন ছিল না, যা তাঁকে সিজদা করেনি। পাদ্রী কুরাইশদের লক্ষ্য করে বললেন, আপনারা তাঁকে রোমের দিকে নিয়ে যাবেন না, রোমানরা তাঁকে চিনে ফেললে হত্যা করে ফেলবে। এরপর পাদ্রী আবু তালেবকে একের পর এক কসম দিয়ে বললেন, তুমি অবশ্যই তাঁকে ফেরত পাঠাও। এমনকি আবু তালেব তাঁকে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন।
এই সাক্ষাতটি ওই সময়ে হয়েছে যখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র বার কিংবা তের বৎসর। কোনো সুস্থ বিবেক সম্পন্ন মানুষ কি এ কথা মেনে নিতে পারে যে, এত অল্প বয়সে মাত্র কয়েকটি ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাত তাঁকে পূর্ববর্তী উম্মতদের এমন গভীর জ্ঞান দান করেছে যে, তিনি আহলে কিতাবদের চ্যালেঞ্জ করে তাদের কিতাবের বিকৃতির বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন! নবী কারীম (সা.) যদি আহলে কিতাবদের কাছ থেকে এই ঘটনাগুলো শুনেই থাকতেন, তাহলে মক্কার কাফের সম্প্রদায়—যারা নবী কারীম (সা.)-কে প্রত্যাখ্যান করার জন্য প্রস্তুত থাকতো—তারা ওই সময় কেন নিশ্চুপ থাকল? তারা এই দাবী কেন করল না যে, আপনাকে তো অমুক অমুক আহলে কিতাব এই কথাগুলো শিখিয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারীমে এর প্রত্যাখ্যান এভাবে করা হয়েছে—
وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ لِّسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهُذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُّبِينٌ
'আমি জানি, তারা বলে, 'এক মানুষ তাকে শিখিয়ে দেয়।' অথচ তারা যে লোকটির কথা বলছে তার ভাষা তো অনারব, অপরপক্ষে কুরআনের ভাষা হল স্পষ্ট আরবী।'
টিকাঃ
৪০৩. J.M. Rodwell কর্তৃক অনূদিত ইংরেজি কুরআনের ভূমিকা, পৃ: ৭।
৪০৪. "নবী স.-এর নবুওয়াত লাভ” শীর্ষক অধ্যায়: ২/২২৫: জামে' তিরমিযী।
৪০৫. হাফেয যাহাবী এ বর্ণনাকে অনির্ভরযোগ্য সাব্যস্ত করেছেন, কিন্তু ইবনে হাযার আসকালানী প্রমুখ বর্ণনাটিকে বিশুদ্ধ বলে সাব্যস্ত করেছেন। (শরহুল মাওয়াহিব: ১/১৯৬)।
৪০৬. আলামা হালবী এ বর্ণনায় বয়স ৯ বছর বলেছেন, হাফেয ইবনে আবদুল বার 'তের বছর' বলেছেন। যুরকানী বলেন অধিকাংশের মত ১২ বছর।
৪০৭. সূরা নাহল: ১০৩
📄 পবিত্র কুরআনুল কারীমের উপর কয়েকটি সংশয় উত্থাপন
কোনো কোনো পাশ্চাত্য বিশারদ পণ্ডিত পবিত্র কুরআন মাজীদে বর্ণিত কিছু কিছু ঘটনার উপর অভিযোগ উত্থাপন করে এর দ্বারা তারা এ কথা বুঝাতে চেয়েছেন যে, (নাউযুবিল্লাহ) নবী কারীম মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) এ সব ঘটনাবলী আহলে কিতাবের কোনো আলেমের কাছ থেকে মৌখিকভাবে শুনেছিলেন। অতঃপর তা বর্ণনা করার সময় কিছু ভুল হয়ে গেছে।
কোনো কোনো পাশ্চাত্য বিশারদ পণ্ডিত পবিত্র কুরআন মাজীদে বর্ণিত কিছু কিছু ঘটনার উপর অভিযোগ উত্থাপন করে এর দ্বারা তারা এ কথা বুঝাতে চেয়েছেন যে, (নাউযুবিল্লাহ) নবী কারীম মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) এ সব ঘটনাবলী আহলে কিতাবের কোনো আলেমের কাছ থেকে মৌখিকভাবে শুনেছিলেন। অতঃপর তা বর্ণনা করার সময় কিছু ভুল হয়ে গেছে।