📄 কালাম পাকের বর্ণনাশৈলীর অলৌকিক বৈশিষ্ট্য
পবিত্র কুরআন মাজীদের অলৌকিকত্ব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় তার বর্ণনাশৈলীর মাঝে।
(১) পবিত্র কুরআন মাজীদের শব্দমালা এমন গদ্য সম্বলিত, যার মধ্যে পদ্যের নিয়ম-নীতি না থাকা সত্ত্বেও এমন এক স্বাদ ও মাধুর্যতাপূর্ণ সুরেলা ধ্বনি পাওয়া যায়, যা পদ্যের চেয়েও অধিক শ্রুতিমধুর। মানুষের স্বভাবগত রুচিবোধ ছন্দময় কবিতার মাঝে যে স্বাদ পায়, পবিত্র কুরআন মাজীদ গদ্য হওয়া সত্ত্বেও তার চেয়ে অধিক প্রাঞ্জলতা দান করে। আরবের কাফেররা এ কারণেই কুরআনকে কবিতা বলে আখ্যা দিয়েছিল যে, এর সুরেলা ধ্বনির মাঝে তারা কবিতার চেয়ে অধিক স্বাদ অনুভব করেছিল।
(২) বালাগাত বিশেষজ্ঞগণ বর্ণনাভঙ্গির তিনটি প্রকার নির্ধারণ করেছেন— সম্বোধনসূচক রীতি, সাহিত্যরীতি এবং ইলম ও তথ্যভিত্তিক রীতি। পবিত্র কুরআন মাজীদের অলৌকিক বৈশিষ্ট্য এই যে, সে উপরোক্ত তিনটি রীতিকে একই সঙ্গে বহন করে চলে।
(৩) নিরক্ষর গ্রাম্য লোক থেকে শুরু করে বিজ্ঞ দার্শনিক—পবিত্র কুরআন মাজীদের একই বর্ণনাভঙ্গি যুগপৎভাবে প্রত্যেক স্তরের সম্বোধিত লোকদেরকে প্রভাবিত করে।
(৪) একটি কথাকেই যদি বারবার পুনরাবৃত্তি করা হয়, তাহলে শ্রোতা সাধারণত বিরক্ত হয়। কিন্তু পবিত্র কুরআন মাজীদের অবস্থা হলো এই যে, একই ঘটনা বারবার উল্লেখ করা হলেও প্রত্যেক বারেই নতুন নতুন ভঙ্গিমা ও স্বাদ অনুভব হয়।
(৫) কালামের প্রভাব ও মাধুর্যতা—এই গুণ দু'টিকে একই রচনার মাঝে উপস্থিত করানো মানবীয় ক্ষমতার ঊর্ধ্বে, কিন্তু কুরআনী শৈলীতে তা সম্ভব হয়েছে।
(৬) উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়াবলীর ন্যায় শুষ্ক ও রসহীন বিষয়কেও পবিত্র কুরআনুল কারীম অত্যন্ত চমৎকার ভঙ্গিমায় বর্ণনা করেছে।
(৭) পবিত্র কুরআন মাজীদে এত পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের বিষয় আলোচনা করা হয়েছে, যার প্রতিটি ক্ষেত্রে এর বর্ণনাভঙ্গি বালাগাতের সুউচ্চ শিখরে পৌঁছেছে।
(৮) আলোচনা সংক্ষিপ্তকরণ পবিত্র কুরআনুল কারীমের বর্ণনাভঙ্গির অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ একটি গুণ। এটা সংক্ষিপ্ত কয়েকটি বাক্যে রাজনীতি, বিজ্ঞান ও বিশ্ব পরিচালনার এমন সব নীতিমালা বর্ণনা করেছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতিকে দিক-নির্দেশনা দিবে।
টিকাঃ
৩৮২. হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রচিত “আল-ফাউযুল কাবীর" থেকে সংকলিত।
📄 আল কুরআনের শব্দ বিন্যাস-গত অলৌকিক বৈশিষ্ট্য
পবিত্র কুরআন মাজীদের আয়াতসমূহের পারস্পরিক যোগসূত্র ও শব্দমালার বিন্যাসের মাঝে এক সূক্ষ্ম অলৌকিকত্ব নিহিত রয়েছে। লিপিবদ্ধ করার সময় মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) যে একটি বিন্যাস দিয়েছেন, পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলোর মাঝে যোগসূত্র থাকার এটাই সবচেয়ে বড় দলীল। এই যোগসূত্রগুলো এতই জটিল ও সূক্ষ্ম যে তা মানুষের অনুসরণের উর্ধ্বে। পবিত্র কুরআনুল কারীমের শব্দমালার বিন্যাসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ইমাম রাযী (রহ.) ও কাযী আবুস সাউদ (রহ.) বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ সূরা হিজরের এক স্থানে নেক বান্দাদের জান্নাতের সংবাদ এবং নাফরমানদের আযাবের সংবাদের পরপরই হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর অতিথিদের কথা বলা হয়েছে। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, ইবরাহীম (আ.)-এর কাছে আসা ফেরেশতারা তাঁকে সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন (রহমতের উদাহরণ) এবং কওমে লূতকে ধ্বংস করেছিলেন (আযাবের উদাহরণ)।
টিকাঃ
৩৮৪. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, হযরত মাওলানা রহমাতুল্লাহ কেরানভী রচিত "বাইবেল ছে কুরআন তক" এবং আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী রচিত "ই'জাযুল কুরআন"।
📄 পবিত্র কুরআনুল কারীমের ভবিষ্যদ্বাণী
মহান আল্লাহ পাকের চিরাচরিত নিয়ম যে, তিনি যখন কাউকে নিজের মনোনীত পয়গাম্বর বানিয়ে প্রেরণ করেন, তখন মানুষের নিকট তা আল্লাহর কালাম হিসেবে প্রমাণ করার জন্য তাতে ভবিষ্যতে ঘটবে এমন কিছু ঘটনার অগ্রিম সংবাদ দিয়ে দেওয়া হয়। পবিত্র কুরআনুল কারীম মহান আল্লাহ তা'আলার কালাম হওয়ার সাথে বিশটি অগ্রিম সংবাদ প্রদান করেছে, যার প্রত্যেকটিই পরিপূর্ণভাবে সঠিক বলে সাব্যস্ত হয়েছে।
📄 রোমানদের বিজয়
নবীজী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মক্কায় কাফেরদের হাতে নির্যাতিত হচ্ছিলেন, ঠিক ওই সময়ে পৃথিবীর দুই পরাশক্তি রোম ও পারস্যের মাঝে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছিল। ওই যুদ্ধে পারস্য সৈন্যরা একের পর এক রোমানদের উপর বিজয় লাভ করতে থাকে। ইরানীরা অগ্নিপূজক হওয়ায় মক্কার কাফেরদের পছন্দের ছিল আর রোমানরা আহলে কিতাব হওয়ায় মুসলমানদের পছন্দের ছিল। এমতাবস্থায় সূরা রূমের প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলো- الم * غُلِبَتِ الرُّومُ * فِي أَدْنَى الْأَرْضِ وَهُم مِّن بَعْدِ غَلَبِهِمْ سَيَغْلِبُونَ * فِي بِضْعِ سِنِينَ... 'নিকটস্থ ভূমিতে, কিন্তু তারা তাদের পরাজয়ের পর শীঘ্রই জয়লাভ করবে কয়েক (তিন থেকে নয়) বছরের মধ্যেই... এটা আল্লাহর ওয়াদা।'
ভবিষ্যদ্বাণী করার সময় তা বাস্তবায়িত হবার কোনো লক্ষণ ছিল না। এমনকি কুরাইশ নেতা উবাই ইবনে খালফ হযরত আবু বকর (রা.)-এর সাথে বাজি ধরেছিল। কিন্তু সাত বছর পর রোমের বাদশাহ কায়সার সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে ইরানিদেরকে বহুস্থানে পরাজিত করেন। ঠিক যখন বদর প্রান্তরে মুসলমানরা বিজয় লাভ করছিল, সেই সময় সংবাদ পাওয়া গেল যে, রোমক বাহিনী ইরানিদের পর্যুদস্ত করেছে। পবিত্র কুরআন মাজীদের ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল।
টিকাঃ
৩৮৫. সূরা রোম: ১-৬