📄 পবিত্র কুরআন মাজীদের অলৌকিক বৈশিষ্ট্য
আমরা এখানে সংক্ষিপ্তাকারে ওই সব বৈশিষ্ট্যগুলোর আলোচনা করতে চাই, যেগুলোর উপর ভিত্তি করে পবিত্র কুরআন মাজীদের কালামকে মু'জিযা (অক্ষমকারী) হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। মানুষের সীমিত উপলব্ধি অনুযায়ী ওই বৈশিষ্ট্যগুলোকে চারটি শিরোনামে বিভক্ত করা যেতে পারে। যথা- ১. শব্দগত অলৌকিক বৈশিষ্ট্য। ২. বাক্য গঠন সম্পর্কিত অলৌকিক বৈশিষ্ট্য। ৩. রচনাশৈলীর সম্পর্কিত অলৌকিক বৈশিষ্ট্য। ৪. ছন্দবদ্ধ গদ্যের অলৌকিক বৈশিষ্ট্য।
পবিত্র কুরআন মাজীদের শব্দগত অলৌকিক বৈশিষ্ট্য :
সমগ্র কুরআনুল কারীমে “আল-হামদু” থেকে শুরু করে “আন্নাস” পর্যন্ত কোথাও একটি শব্দও ফাসাহাতহীন ব্যবহৃত হয়নি শুধু তাই নয়; বরং প্রতিটি শব্দ যে স্থানে যেভাবে এসেছে, ফাসাহাত ও বালাগাতের বিচারে এমন স্থির ও সমীচীন বিবেচিত হয়েছে যে, ওই শব্দটিকে পরিবর্তন করে অন্য কোনো শব্দ ব্যবহারের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।
আরবী ভাষা সীমাহীন সুপ্রশস্ত ও ব্যাপক ভাষা। এই বিশাল শব্দ ভাণ্ডারের মধ্য হতে পবিত্র কুরআনুল কারীম স্বীয় উদ্দেশ্য আদায়ে ওই শব্দটিকেই চয়ন করে, যা বাক্যের পূর্বাপর সম্পর্ক, ভাব প্রকাশ ও রচনাশৈলীর প্রবাহের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত সমীচীন ও সুবিন্যস্ত।
📄 পবিত্র কুরআনে বাক্যগঠন সম্পর্কিত অলৌকিক বৈশিষ্ট্য
সাধারণত শব্দের পর আসে শব্দরাজি দ্বারা গঠিত বাক্যের গঠন, তারকীব ও বিন্যাসের বিষয়টি। এ ক্ষেত্রেও পবিত্র কুরআনুল কারীমের অলৌকিকতা চরম শিখরে আসীন। হত্যাকারী থেকে কেসাস (প্রতিশোধ) গ্রহণ করা আরবদের নিকট প্রশংসাযোগ্য ছিল এবং এর জন্য তাদের কিছু প্রবাদবাক্য প্রসিদ্ধ ছিল। যেমন— القتلُ إِحْياء للجميع (হত্যা সবার জন্য জীবন) অথবা القتل انفی للقتل (হত্যাই হত্যার গতিরোধক)। পবিত্র কুরআনুল কারীম এ ভাবটি প্রকাশ করেছে অন্য উচ্চতায়: وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ 'তোমাদের জন্য কেসাসে রয়েছে জীবন।' এই বাক্যের সংক্ষেপণ, সমৃদ্ধতা ও শক্তিমত্তার সামনে পূর্বের সব প্রবাদ বাক্য নতি স্বীকার করতে বাধ্য।
📄 কালাম পাকের বর্ণনাশৈলীর অলৌকিক বৈশিষ্ট্য
পবিত্র কুরআন মাজীদের অলৌকিকত্ব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় তার বর্ণনাশৈলীর মাঝে।
(১) পবিত্র কুরআন মাজীদের শব্দমালা এমন গদ্য সম্বলিত, যার মধ্যে পদ্যের নিয়ম-নীতি না থাকা সত্ত্বেও এমন এক স্বাদ ও মাধুর্যতাপূর্ণ সুরেলা ধ্বনি পাওয়া যায়, যা পদ্যের চেয়েও অধিক শ্রুতিমধুর। মানুষের স্বভাবগত রুচিবোধ ছন্দময় কবিতার মাঝে যে স্বাদ পায়, পবিত্র কুরআন মাজীদ গদ্য হওয়া সত্ত্বেও তার চেয়ে অধিক প্রাঞ্জলতা দান করে। আরবের কাফেররা এ কারণেই কুরআনকে কবিতা বলে আখ্যা দিয়েছিল যে, এর সুরেলা ধ্বনির মাঝে তারা কবিতার চেয়ে অধিক স্বাদ অনুভব করেছিল।
(২) বালাগাত বিশেষজ্ঞগণ বর্ণনাভঙ্গির তিনটি প্রকার নির্ধারণ করেছেন— সম্বোধনসূচক রীতি, সাহিত্যরীতি এবং ইলম ও তথ্যভিত্তিক রীতি। পবিত্র কুরআন মাজীদের অলৌকিক বৈশিষ্ট্য এই যে, সে উপরোক্ত তিনটি রীতিকে একই সঙ্গে বহন করে চলে।
(৩) নিরক্ষর গ্রাম্য লোক থেকে শুরু করে বিজ্ঞ দার্শনিক—পবিত্র কুরআন মাজীদের একই বর্ণনাভঙ্গি যুগপৎভাবে প্রত্যেক স্তরের সম্বোধিত লোকদেরকে প্রভাবিত করে।
(৪) একটি কথাকেই যদি বারবার পুনরাবৃত্তি করা হয়, তাহলে শ্রোতা সাধারণত বিরক্ত হয়। কিন্তু পবিত্র কুরআন মাজীদের অবস্থা হলো এই যে, একই ঘটনা বারবার উল্লেখ করা হলেও প্রত্যেক বারেই নতুন নতুন ভঙ্গিমা ও স্বাদ অনুভব হয়।
(৫) কালামের প্রভাব ও মাধুর্যতা—এই গুণ দু'টিকে একই রচনার মাঝে উপস্থিত করানো মানবীয় ক্ষমতার ঊর্ধ্বে, কিন্তু কুরআনী শৈলীতে তা সম্ভব হয়েছে।
(৬) উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়াবলীর ন্যায় শুষ্ক ও রসহীন বিষয়কেও পবিত্র কুরআনুল কারীম অত্যন্ত চমৎকার ভঙ্গিমায় বর্ণনা করেছে।
(৭) পবিত্র কুরআন মাজীদে এত পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের বিষয় আলোচনা করা হয়েছে, যার প্রতিটি ক্ষেত্রে এর বর্ণনাভঙ্গি বালাগাতের সুউচ্চ শিখরে পৌঁছেছে।
(৮) আলোচনা সংক্ষিপ্তকরণ পবিত্র কুরআনুল কারীমের বর্ণনাভঙ্গির অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ একটি গুণ। এটা সংক্ষিপ্ত কয়েকটি বাক্যে রাজনীতি, বিজ্ঞান ও বিশ্ব পরিচালনার এমন সব নীতিমালা বর্ণনা করেছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতিকে দিক-নির্দেশনা দিবে।
টিকাঃ
৩৮২. হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রচিত “আল-ফাউযুল কাবীর" থেকে সংকলিত।
📄 আল কুরআনের শব্দ বিন্যাস-গত অলৌকিক বৈশিষ্ট্য
পবিত্র কুরআন মাজীদের আয়াতসমূহের পারস্পরিক যোগসূত্র ও শব্দমালার বিন্যাসের মাঝে এক সূক্ষ্ম অলৌকিকত্ব নিহিত রয়েছে। লিপিবদ্ধ করার সময় মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) যে একটি বিন্যাস দিয়েছেন, পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলোর মাঝে যোগসূত্র থাকার এটাই সবচেয়ে বড় দলীল। এই যোগসূত্রগুলো এতই জটিল ও সূক্ষ্ম যে তা মানুষের অনুসরণের উর্ধ্বে। পবিত্র কুরআনুল কারীমের শব্দমালার বিন্যাসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ইমাম রাযী (রহ.) ও কাযী আবুস সাউদ (রহ.) বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ সূরা হিজরের এক স্থানে নেক বান্দাদের জান্নাতের সংবাদ এবং নাফরমানদের আযাবের সংবাদের পরপরই হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর অতিথিদের কথা বলা হয়েছে। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, ইবরাহীম (আ.)-এর কাছে আসা ফেরেশতারা তাঁকে সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন (রহমতের উদাহরণ) এবং কওমে লূতকে ধ্বংস করেছিলেন (আযাবের উদাহরণ)।
টিকাঃ
৩৮৪. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, হযরত মাওলানা রহমাতুল্লাহ কেরানভী রচিত "বাইবেল ছে কুরআন তক" এবং আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী রচিত "ই'জাযুল কুরআন"।