📄 পবিত্র কুরআন মাজীদের অলৌকিকত্ব
পবিত্র কুরআন মাজীদের সত্যতার আরেকটি উজ্জ্বল দলীল হচ্ছে, এর অলৌকিক বিষয়বস্তু। অর্থাৎ এমন এক কালাম যা মানবীয় ক্ষমতার বাইরে। এ কারণেই এটাকে দু'জাহানের সর্দার নবী কারীম (সা.)-এর সবচেয়ে বড় মু'জিযা বা অলৌকিক বিষয় বলে অভিহিত করা হয়। আমরা এখানে সংক্ষিপ্ত পরিসরে পবিত্র কুরআন মাজীদের ওই সব মু'জিযার প্রতি ইঙ্গিত করার প্রয়াস চালাব, যেগুলোর নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম অবশ্যই অবশ্যই মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের কালাম। মানবীয় দখলদারিত্বের লেশমাত্র এতে নেই। মূল আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে মৌলিকভাবে দু'টি কথা সম্মানিত পাঠকবর্গের সামনে পেশ করা আবশ্যক বলে মনে করছি।
প্রথমতঃ ফাসাহাত-বালাগাত বা ভাষা অলংকার এবং ভাষার যাদুকরী উপস্থাপনা এমন একটি গুণ, যার সম্পর্ক হলো উপলব্ধি ও অনুভূতির সাথে। পুরো হাকীকত ও তত্ত্ব শব্দের মাধ্যমে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। আপনি তালাশ ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে ফাসাহাত ও বালাগাতের মূলনীতি নির্ধারণ করতে পারবেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ওই নিয়ম ও নীতির অবস্থান সিদ্ধান্তকারী হয় না। কেননা কোনো কালামের সৌন্দর্য ও অসৌন্দর্যের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রুচি ও মেধার উপরই নির্ভরশীল।
দ্বিতীয়তঃ ফাসাহাত-বালাগাতের ব্যাপারে রুচিটাও শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট ভাষাধারীদের ক্ষেত্রেই ধর্তব্য হবে। কোনো ব্যক্তি নিজের ভাষা ছাড়া অন্যের ভাষায় চাই যতই পাণ্ডিত্য লাভ করুক, কিন্তু সুরুচিবোধের ব্যাপারে সে কখনো ওই ভাষাধারীদের ধারে কাছেও পৌঁছতে পারবে না।
তখন একটু জাহেলী যুগের আরববাসীদের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে কল্পনা করুন। বক্তৃতা ও কাব্য চর্চা ছিল তাদের সমাজের চালিকাশক্তি। আরবী কবিতা ও সাহিত্য চর্চার স্বভাব-রুচি তাদের ছোট ছোট শিশুদের মধ্যেও প্রোথিত ছিল। ফাসাহাত ও বালাগাত জীবন সঞ্চালক রক্ত কণিকা হয়ে তাদের শিরা-উপশিরায় বিচরণ করতো। তাদের মঞ্চের উজ্জ্বলতা, মেলার বর্ণাঢ্যতা, তাদের গর্ব ও অহঙ্কারের মূলধন এবং প্রচার ও প্রসারের সবকিছুই ছিল কবিতা ও সাহিত্য। আর এর উপর তাদের এতই অহংবোধ ছিল যে, তারা নিজেদের ব্যতীত অন্য সকল জাতিকে "আজম" তথা "বোবা" হিসেবে অভিহিত করতো।
এমন পরিবেশে একজন উম্মী নবী (সা.) এমন এক কালাম পেশ করলেন এবং ঘোষণা করলেন যে, এটা আল্লাহর কালাম। কেননা- قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَن يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيراً 'বল, 'এ কুরআনের মত একখানা কুরআন আনার জন্য যদি সমগ্র মানব আর জ্বীন একত্রিত হয় তবুও তারা তার মত আনতে পারবে না, যদিও তারা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য ও সহযোগিতা করে।'
এই ঘোষণাটি কোনো সাধারণ ব্যাপার ছিল না। মহান প্রভুর এই বাণী সেই মহান ব্যক্তির জবান হতে উদ্ধৃত হয়েছিল, যিনি সমসাময়িক নামকরা কোনো সাহিত্যিক ও কবির কাছ থেকে কোনো জ্ঞান লাভ করেননি। কখনও কোনো কবিতার আসরে একটি কবিতাও আবৃত্তি করেননি। কখনো কোনো গণকের সাহচর্য গ্রহণ করেননি। স্বরচিত কবিতা তো দূরের কথা, অন্য কারো কবিতাও তাঁর স্মৃতিতে ছিল না।
যদি এই ঘোষণা সত্য প্রমাণিত হয়ে যায়, তাহলে তাদের পিতৃ পুরুষের লালিত ধর্মের সমস্ত প্রাসাদ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে এবং তাদের শতাব্দী কাল পুরানো প্রথা ও রেওয়াজের সমস্ত ভান্ডার ধুলোয় মিশে একাকার হয়ে যাবে। কেননা প্রকৃতপক্ষে এ ঘোষণা ছিল তাদের সাহিত্য কীর্তির প্রতি এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এটা ছিল তাদের ধর্ম ও মতবাদের উপর এক কুঠারাঘাত।
এ ঘোষণার পর সেই অগ্নিঝরা বক্তা আর অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টিকারী কবিদের আড্ডাখানায় হতাশার কালো মেঘ নেমে এল। কেউ এই চ্যালেঞ্জ মুকাবিলা করার জন্য এগিয়ে আসল না। কিছুদিন পর পবিত্র কুরআনুল কারীম আবারো ঘোষণা করল- وَإِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ * فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا وَلَن تَفْعَلُوا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ 'আমি আমার বান্দাহর প্রতি যা নাযিল করেছি তাতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকলে তোমরা তার মত কোন সূরাহ এনে দাও আর তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে আহ্বান কর। যদি তোমরা না পার এবং কক্ষনো পারবেও না, তাহলে সেই আগুনকে ভয় কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, যা প্রস্তুত রয়েছে কাফিরদের জন্য।'
ইহার উপর যথারীতি নীরবতা বিরাজ করল। কোনো ব্যক্তি এই কালামের মুকাবিলায় কয়েকটি বাক্যও রচনা করে পেশ করতে সক্ষম হয়নি। আল্লামা যুরজানী (রহ.)-এর উক্তি মতে সে সম্প্রদায়ের অবস্থা এমন ছিল যে, যদি তারা জানতে পারত যে, পৃথিবীর সর্বশেষ প্রান্তেও কোনো ব্যক্তি নিজের ফাসাহাত ও বালাগাতের মধ্যে অস্বাভাবিক দক্ষতা রাখে, তাহলে তারা তার সমালোচনা করতে এবং নিজেদের কবিতার মধ্যে তার প্রতি টিপ্পনীকাটা থেকে বিরত থাকতে পারতো না। এই কথার এ ছাড়া আর কোনো ব্যাখ্যা হতে পারে না যে, ফাসাহাত ও বালাগাতের এই যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিরা পবিত্র কুরআন মাজীদের মুকাবিলা করতে অক্ষম হয়ে পড়েছিল।
তাছাড়া শুধু এখানেই শেষ নয় যে, সেই অগ্নিঝরা বক্তা আর অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টিকারী কবিরা এই পবিত্র কুরআন মাজীদের মুকাবিলা করতে পারেনি। বরং তাদের অনেকেই এই কালামের বিস্ময়কর প্রভাবের কথা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে স্বীকার করেছে। ইমাম হাকেম ও বায়হাকী (রহ.) পবিত্র কুরআনুল কারীমের ব্যাপারে ওলীদ ইবনে মুগীরার নিম্নোক্ত মন্তব্যটি বর্ণনা করেছেন- وَاللَّهِ إِنَّ لِقَوْلِهِ الَّذِي يَقُولُ حَلَاوَةٌ، وَإِنَّ عَلَيْهِ لَطَاوَةٌ، وَإِنَّهُ لَيَعْلُو وَمَا يُعْلَى عَلَيْهِ 'আল্লাহর শপথ! নিশ্চয়ই তিনি যা বলেন, তার মধ্যে রয়েছে এক তৃপ্তিময় স্বাদ ও মনোহারী চমক। আর এই কালাম বিজয়ীই হয়ে থাকে, পরাজয় হয় না কখনো।'
ওলীদ ইবনে মুগীরা ছিল আবু জাহেলের ভাতিজা। আবু জাহেল যখন অনুভব করতে পারল যে, তার ভাতিজা কালামের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে পড়ছে, তখন সে তাকে সতর্ক করার জন্য তার কাছে ছুটে আসল। ওলীদ বলল, আল্লাহর শপথ! তোমাদের মধ্যে কেউ কবিতার ভালো-মন্দের ব্যাপারে আমার চেয়ে জ্ঞানী নেই। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (সা.) যা বলছে, কবিতার সাথে এর সামান্যতম সম্পর্ক ও সামঞ্জস্য নেই। অবশেষে অক্ষমতাবশতঃ এর উপরই সিদ্ধান্ত হয় যে, তাঁকে যাদুকর বলা হবে। কেননা এটা এমন এক যাদু যা পিতা-পুত্র এবং ভাই-ভাইয়ের মাঝে বিচ্ছেদের দেয়াল সৃষ্টি করে দেয়।
অনুরূপভাবে উতবা ইবনে রবী'আ ছিলেন কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় লোকদের অন্যতম। সে একবার সমঝোতার আলোচনা করার জন্য রাসূলে আকরাম (সা.)-এর নিকট আসল। রাসূলে খোদা (সা.) তার সামনে সূরা হা-মীম সাজদা'র শুরুর আয়াতগুলো পাঠ করলেন। সে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে শুনছিল। এমনকি তিনি সাজদার আয়াত পাঠ করে সাজদায় লুটিয়ে পড়লে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সোজা উঠে চলে গেল। লোকেরা তার কাছে আলোচনার ফলাফল জানার জন্য ছুটে আসলে সে বলল, "আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ আমাকে এমন কালাম শুনিয়েছে যা আমার এই কর্ণযুগল গোটা জীবনে শোনেনি। এখন আমার বুঝে আসছে না আমি কি জবাব দেব?"
কোনো কোনো অমুসলিম লেখক এ ধারণা প্রকাশ করে যে, হতে পারে কেউ পবিত্র কুরআন মাজীদের মুকাবিলায় কোনো কালাম পেশ করেছে। কিন্তু আমাদের পর্যন্ত সে কালাম এসে পৌঁছায়নি! আল্লামা আবু সুলাইমান খত্তাবী (রহ.) এ ব্যাপারে সুন্দর একটি বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেন- "এ ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। কারণ পৃথিবীর শুরু থেকেই সাধারণ এবং বিশেষ বিশেষ লোকদের এ অভ্যাস প্রচলিত হয়ে আসছে যে, তারা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীকে অবশ্যই লিখিত আকারে সংরক্ষণ করে রাখতেন। কেউ যদি ওই চ্যালেঞ্জের মুকাবিলা করত তাহলে আমাদের পর্যন্ত সে সংবাদ না পৌঁছাটা একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার ছিল।"
অবশ্য কতক মন্ত্রমুগ্ধ ব্যক্তি পবিত্র কুরআন মাজীদের চ্যালেঞ্জের জবাবে কিছু হাস্যকর বাক্য পেশ করেছিল। তাই ইতিহাসের পাতায় আজও সংরক্ষিত আছে। আরবরা সর্বদা এগুলো বলে বলে হাসির খোরাক জোগায়। মুসাইলামাতুল কাযযাব কুরআনের মুকাবিলায় তার উপর অবতীর্ণ ওহী বলে নিম্নোক্ত বাক্যগুলো পেশ করেছিল- يا ضفدع نقي كم تنقين لا الماء تكدرين ولا الوارد تنفرين। অতঃপর পবিত্র কুরআন মাজীদ অবতীর্ণের বহুদিন পর তৎকালীন আরবীর বিখ্যাত পন্ডিত ও সাহিত্যিক আবদুল্লাহ ইবনে মুকাফ্ফা পবিত্র কুরআনুল কারীমের জবাব লেখার মনস্থ করেছিলেন। কিন্তু ওই সময় সে কোনো এক শিশুকে নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করতে শুনে- يَا أَرْضُ ابْلَعِي مَاءَكِ وَيَا سَمَاءُ أَقْلِعِي তখন সে চিৎকার করে বলে উঠল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এ কালামের মুকাবিলা করা অসম্ভব।
টিকাঃ
৩৬৭. বনী ইসরাঈল: ৮৮
৩৬৮. সূরা বাকারা : ২৩-২৪
৩৬৯. আবদুল কাহের যুরজানী কৃত : “আর-রিসালাতুশ শাফিয়্যাহ” পৃ: ১০৯
৩৭০. আল্লামা সুয়ূতী রচিত "আল-খাসায়েসুল কুবরা" ১/১১৩, আল-ইতকান: ২/১১৭
৩৭১. হাকেম ও বায়হাকী (রহ.) ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে এটাকে সংকলন করেছেন।
৩৭২. ইমাম বায়হাকী ও ইবনে ইসহাক (রহ.) তা সংকলন করেছেন। (খাসায়েসুল কুবরা: ১/১১৩)
৩৭৩. ইমাম বায়হাকী ও ইবনে ইসহাক (রহ.) মুহাম্মদ ইবনে কা'ব (রহ.) থেকে তা সংকলন করেছেন। খাসায়েসুল কুবরা : ১/১১৫
৩৭৪. ছালাছু রাসায়িল ফী ই'জাযিল কুরআন : পৃ: ৫০
৩৭৫. আল্লামা খাত্তাবী (রহ.) রচিত "বয়ানু ই'জাযিল কুরআন"
৩৭৬. আল্লামা বাকিল্লানী (রহ.) রচিত "ই'জাযুল কুরআন" : ১/৫০
📄 পবিত্র কুরআন মাজীদের অলৌকিক বৈশিষ্ট্য
আমরা এখানে সংক্ষিপ্তাকারে ওই সব বৈশিষ্ট্যগুলোর আলোচনা করতে চাই, যেগুলোর উপর ভিত্তি করে পবিত্র কুরআন মাজীদের কালামকে মু'জিযা (অক্ষমকারী) হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। মানুষের সীমিত উপলব্ধি অনুযায়ী ওই বৈশিষ্ট্যগুলোকে চারটি শিরোনামে বিভক্ত করা যেতে পারে। যথা- ১. শব্দগত অলৌকিক বৈশিষ্ট্য। ২. বাক্য গঠন সম্পর্কিত অলৌকিক বৈশিষ্ট্য। ৩. রচনাশৈলীর সম্পর্কিত অলৌকিক বৈশিষ্ট্য। ৪. ছন্দবদ্ধ গদ্যের অলৌকিক বৈশিষ্ট্য।
পবিত্র কুরআন মাজীদের শব্দগত অলৌকিক বৈশিষ্ট্য :
সমগ্র কুরআনুল কারীমে “আল-হামদু” থেকে শুরু করে “আন্নাস” পর্যন্ত কোথাও একটি শব্দও ফাসাহাতহীন ব্যবহৃত হয়নি শুধু তাই নয়; বরং প্রতিটি শব্দ যে স্থানে যেভাবে এসেছে, ফাসাহাত ও বালাগাতের বিচারে এমন স্থির ও সমীচীন বিবেচিত হয়েছে যে, ওই শব্দটিকে পরিবর্তন করে অন্য কোনো শব্দ ব্যবহারের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।
আরবী ভাষা সীমাহীন সুপ্রশস্ত ও ব্যাপক ভাষা। এই বিশাল শব্দ ভাণ্ডারের মধ্য হতে পবিত্র কুরআনুল কারীম স্বীয় উদ্দেশ্য আদায়ে ওই শব্দটিকেই চয়ন করে, যা বাক্যের পূর্বাপর সম্পর্ক, ভাব প্রকাশ ও রচনাশৈলীর প্রবাহের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত সমীচীন ও সুবিন্যস্ত।
📄 পবিত্র কুরআনে বাক্যগঠন সম্পর্কিত অলৌকিক বৈশিষ্ট্য
সাধারণত শব্দের পর আসে শব্দরাজি দ্বারা গঠিত বাক্যের গঠন, তারকীব ও বিন্যাসের বিষয়টি। এ ক্ষেত্রেও পবিত্র কুরআনুল কারীমের অলৌকিকতা চরম শিখরে আসীন। হত্যাকারী থেকে কেসাস (প্রতিশোধ) গ্রহণ করা আরবদের নিকট প্রশংসাযোগ্য ছিল এবং এর জন্য তাদের কিছু প্রবাদবাক্য প্রসিদ্ধ ছিল। যেমন— القتلُ إِحْياء للجميع (হত্যা সবার জন্য জীবন) অথবা القتل انفی للقتل (হত্যাই হত্যার গতিরোধক)। পবিত্র কুরআনুল কারীম এ ভাবটি প্রকাশ করেছে অন্য উচ্চতায়: وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ 'তোমাদের জন্য কেসাসে রয়েছে জীবন।' এই বাক্যের সংক্ষেপণ, সমৃদ্ধতা ও শক্তিমত্তার সামনে পূর্বের সব প্রবাদ বাক্য নতি স্বীকার করতে বাধ্য।
📄 কালাম পাকের বর্ণনাশৈলীর অলৌকিক বৈশিষ্ট্য
পবিত্র কুরআন মাজীদের অলৌকিকত্ব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় তার বর্ণনাশৈলীর মাঝে।
(১) পবিত্র কুরআন মাজীদের শব্দমালা এমন গদ্য সম্বলিত, যার মধ্যে পদ্যের নিয়ম-নীতি না থাকা সত্ত্বেও এমন এক স্বাদ ও মাধুর্যতাপূর্ণ সুরেলা ধ্বনি পাওয়া যায়, যা পদ্যের চেয়েও অধিক শ্রুতিমধুর। মানুষের স্বভাবগত রুচিবোধ ছন্দময় কবিতার মাঝে যে স্বাদ পায়, পবিত্র কুরআন মাজীদ গদ্য হওয়া সত্ত্বেও তার চেয়ে অধিক প্রাঞ্জলতা দান করে। আরবের কাফেররা এ কারণেই কুরআনকে কবিতা বলে আখ্যা দিয়েছিল যে, এর সুরেলা ধ্বনির মাঝে তারা কবিতার চেয়ে অধিক স্বাদ অনুভব করেছিল।
(২) বালাগাত বিশেষজ্ঞগণ বর্ণনাভঙ্গির তিনটি প্রকার নির্ধারণ করেছেন— সম্বোধনসূচক রীতি, সাহিত্যরীতি এবং ইলম ও তথ্যভিত্তিক রীতি। পবিত্র কুরআন মাজীদের অলৌকিক বৈশিষ্ট্য এই যে, সে উপরোক্ত তিনটি রীতিকে একই সঙ্গে বহন করে চলে।
(৩) নিরক্ষর গ্রাম্য লোক থেকে শুরু করে বিজ্ঞ দার্শনিক—পবিত্র কুরআন মাজীদের একই বর্ণনাভঙ্গি যুগপৎভাবে প্রত্যেক স্তরের সম্বোধিত লোকদেরকে প্রভাবিত করে।
(৪) একটি কথাকেই যদি বারবার পুনরাবৃত্তি করা হয়, তাহলে শ্রোতা সাধারণত বিরক্ত হয়। কিন্তু পবিত্র কুরআন মাজীদের অবস্থা হলো এই যে, একই ঘটনা বারবার উল্লেখ করা হলেও প্রত্যেক বারেই নতুন নতুন ভঙ্গিমা ও স্বাদ অনুভব হয়।
(৫) কালামের প্রভাব ও মাধুর্যতা—এই গুণ দু'টিকে একই রচনার মাঝে উপস্থিত করানো মানবীয় ক্ষমতার ঊর্ধ্বে, কিন্তু কুরআনী শৈলীতে তা সম্ভব হয়েছে।
(৬) উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়াবলীর ন্যায় শুষ্ক ও রসহীন বিষয়কেও পবিত্র কুরআনুল কারীম অত্যন্ত চমৎকার ভঙ্গিমায় বর্ণনা করেছে।
(৭) পবিত্র কুরআন মাজীদে এত পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের বিষয় আলোচনা করা হয়েছে, যার প্রতিটি ক্ষেত্রে এর বর্ণনাভঙ্গি বালাগাতের সুউচ্চ শিখরে পৌঁছেছে।
(৮) আলোচনা সংক্ষিপ্তকরণ পবিত্র কুরআনুল কারীমের বর্ণনাভঙ্গির অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ একটি গুণ। এটা সংক্ষিপ্ত কয়েকটি বাক্যে রাজনীতি, বিজ্ঞান ও বিশ্ব পরিচালনার এমন সব নীতিমালা বর্ণনা করেছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতিকে দিক-নির্দেশনা দিবে।
টিকাঃ
৩৮২. হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রচিত “আল-ফাউযুল কাবীর" থেকে সংকলিত।